01/26/2026 ইসলামিক ন্যাটো কি আসছে? সৌদি আরবের নতুন প্রতিরক্ষা কৌশল
Special Correspondent
২৫ January ২০২৬ ২২:১০
নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে সৌদি আরবের সম্ভাব্য নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো। সৌদি আরব বর্তমানে সোমালিয়া, মিসর ও তুরস্কের সঙ্গে পৃথক ও যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে যা বাস্তবায়িত হলে পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠকে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় ছাড়াও সম্ভাব্য নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সময়ে সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ শিগগিরই সৌদি আরব সফরে গিয়ে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারেন বলে জানা গেছে। যদি এই চুক্তিতে মিসরও অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে একটি ত্রিপক্ষীয় জোট গড়ে উঠবে, যা লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্তকারী গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব আল-মন্দেব প্রণালিতে সৌদি ও মিসরের প্রভাব আরও শক্তিশালী করবে।
ইসলামিক ন্যাটো গঠনের সম্ভাবনা?
ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে তুরস্কও সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট এ যোগ দিতে আগ্রহী। এই তিন দেশের সমন্বয়ে গঠিত জোটকে কেউ কেউ ইসলামিক ন্যাটো বলেও আখ্যা দিচ্ছেন। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক সার্জিও রেস্টেল্লির মতে, এই জোট গড়ে উঠলে তা হবে একটি কার্যকর সামরিক ও কৌশলগত ব্লক, যেখানে পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি, সৌদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও তুরস্কের সামরিক দক্ষতা একত্রিত হবে। এতে ভূমধ্যসাগর থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এক নতুন নিরাপত্তা অক্ষ গড়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছায়া সরে যাওয়ায় নতুন হিসাব:
বিশ্লেষকদের মতে সৌদি আরবের এই উদ্যোগের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নির্ভরতা নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা। লন্ডনভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক সামি হামদি বলেন এই অঞ্চলে এখন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। তিনি ২০১৯ সালে হুথিদের সৌদি তেল স্থাপনায় হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া না দেখানো এবং ২০২৫ সালে দোহায় হামাস নেতাদের ওপর ইসরায়েলি হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
সৌদি-ইউএই উত্তেজনা ও নতুন মেরুকরণ:
এদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা বেড়েছে। ইয়েমেন ও সুদানে দুই দেশের ভিন্ন ভিন্ন পক্ষ সমর্থনের কারণে সম্পর্কের টানাপোড়েন স্পষ্ট হচ্ছে। সম্প্রতি ইয়েমেনে ইউএই-সমর্থিত বাহিনীর ওপর সৌদি বিমান হামলা এবং সুদানে অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে অভিযোগ বিষয়টিকে আরও ঘনীভূত করেছে। অন্যদিকে ইউএই ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, যা সৌদি আরবের কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে কিছুটা সাংঘর্ষিক।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের গবেষক সিনজিয়া বিয়াঙ্কো মনে করেন, সৌদি আরব ও ইউএই-এর মধ্যে এখনই বড় ধরনের বিচ্ছেদ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ উভয় দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখছে এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বোর্ড অব পিস-এ দু’দেশই যুক্ত। তিনি আরও বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে এই অঞ্চলে কোনো বড় সামরিক জোট কার্যকরভাবে টিকে থাকা কঠিন। সব মিলিয়ে বলা যায়, সৌদি আরবের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি করতে পারে, তবে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ বাস্তবে রূপ নেওয়া এখনই নিশ্চিত নয়। এসব উদ্যোগ মূলত প্রযুক্তি স্থানান্তর, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র