02/15/2026 ফাল্গুনের নীলকণ্ঠ, আলোকবর্তিকা ও আধ্যাত্মিক জাগরণ —২০২৬-এর মহাশিবরাত্রি ও নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশের সম্প্রীতি-সূর্য
Dr Mahbub
১৫ February ২০২৬ ০৯:২৪
—বিশেষ সম্পাদকীয় ফিচার | ঢাকা
২০২৬ সালের মহাশিবরাত্রি ১৫ ফেব্রুয়ারি। এই মহাপুণ্য তিথির সময়সূচি, পূজা-বিধি এবং দেবাদিদেব মহাদেবের ত্যাগের মহিমা জানতে পড়ুন আমাদের বিশেষ সম্পাদকীয় ফিচার। নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে শান্তি, সহনশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় শিবরাত্রির আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও সামাজিক তাৎপর্য নিয়ে এখানে উপস্থাপিত হয়েছে এক বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা। অন্ধকার ও অজ্ঞতা দূর করে একটি সমৃদ্ধ ও মানবিক দেশ গড়ার অঙ্গীকার হোক এই শিবরাত্রির মূল বার্তা।
বি.দ্র. এই বিশেষ সম্পাদকীয় নিবন্ধে মহাশিবরাত্রি ২০২৬ উপলক্ষে শিবপুরাণের আলোচ্য ভাবধারা, পূজার নির্ঘণ্ট, শিবতত্ত্ব, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে শিবের অবস্থান এবং নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে ঐক্য ও সম্প্রীতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। বিষয়বস্তুর ব্যাপ্তির কারণে নিবন্ধটি কিছুটা বিস্তৃত হলেও তা নাতিদীর্ঘ ও পাঠযোগ্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। শিব ও শিবরাত্রি সম্পর্কে নতুন কিছু জ্ঞানীয় ও ভাবগত দিক উন্মোচনে এটি সহায়ক হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। তাই অনুরোধ রইল—সময় নিয়ে, মনোযোগ সহকারে পুরো নিবন্ধটি পড়ুন; কারণ আলোচনার প্রতিটি অংশই আমাদের বর্তমান সামাজিক ও জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
ফাল্গুনের উদাস হাওয়ায় যখন শিমুল-পলাশের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ছে বাংলার প্রকৃতিতে, তখনই এক মহিমান্বিত আধ্যাত্মিক রজনীর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে এ দেশের সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী কোটি প্রাণ। আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬; রবিবার। আজ শ্রী শ্রী মহাশিবরাত্রি ব্রত। পঞ্জিকার হিসেবে ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে দেবাদিদেব মহাদেব ও আদ্যাশক্তি মাতা পার্বতীর সেই চিরন্তন মিলনের রাত। কিন্তু ২০২৬ সালের এই শিবরাত্রি কেবল সনাতন ধর্মের একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে এক শান্তিকামী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রতীকী সূচনালগ্ন হিসেবেই ধরা দিচ্ছে ভক্ত ও সাধারণ মানুষের কাছে।
রমজান মাসের প্রাক্কালে এই উৎসব উদযাপন একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে। বাংলাদেশ বহু ধর্মের সহাবস্থানের দেশ। শান্তিপূর্ণ আয়োজন কেবল ভক্তির প্রকাশ নয়; এটি ধর্মীয় সম্প্রীতির বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে। অপপ্রচার বা বিভেদের বিরুদ্ধে এ এক কার্যকর সামাজিক জবাব, যা আবারও বিশ্বকে মনে করিয়ে দেবে হাজার বছরের ঐতিহ্যে এ দেশের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি লালন করে আসছে। এ ধরনের ধর্মীয় পার্বণ ও আচার-অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনই প্রমাণ করবে—‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’; আর এই চেতনার ধারাবাহিকতাই বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে আবারো পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবে। আর এদেশের সংস্কৃতির এটাই যে প্রকৃত সৌন্দর্য, প্রকৃত মহত্ত্ব।
এই পবিত্র উপলক্ষ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—বাংলার সংস্কৃতি বহু ধর্ম, ভাষা ও ঐতিহ্যের মিলনে গড়ে ওঠা এক অপূর্ব সহাবস্থানের রূপকথা। শিমুল-পলাশের রাঙা ঋতুচক্র, বাউল-ভাটিয়ালির সুর ও মন্দির-মসজিদের সম্মিলিত ধ্বনি মিলেই গড়ে উঠেছে সেই চিরন্তন সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য, যা সম্প্রীতি ও মানবতার আলোয় আজও উজ্জ্বল। ইতিহাস বলছে, আজকের এরূপ আয়োজন মনে করিয়ে দেয়, বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা এদেশে বারবার হয়েছে; তবে সামাজিক সংহতিই শেষ পর্যন্ত টিকে থেকেছে। তাই হাজারো ষড়যন্ত্র ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ঐক্য, মানবতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার শক্তিকে ধারণ করে বাংলাদেশ সামনের দিকেই এগিয়ে যাবে দৃঢ় প্রত্যয়ে। হাজারো মানুষের স্বপ্নের সাম্যের বাংলাদেশ নির্মিত হবে—যেখানে কেউ সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু হিসেবে চিহ্নিত হবে না; সবাই পরিচিত হবে গর্বিত বাংলাদেশী নাগরিক, সমঅধিকারসম্পন্ন বঙ্গসন্তান হিসেবে।
শিবরাত্রির পৌরাণিক আখ্যান ও আধ্যাত্মিক দর্শন
বৈদিক ও পুরাণীয় সাহিত্যে শিবতত্ত্বকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে সৃষ্টির চিরন্তন নীতি হিসেবে—যেখানে ধ্বংস মানেই সমাপ্তি নয়, বরং নবসৃষ্টির প্রস্তুতি। শিব পুরাণ ও লিঙ্গ পুরাণে বর্ণিত আছে যে, শিব হলেন সেই পরম চেতনা, যিনি রূপের ঊর্ধ্বে থেকেও জগতের কল্যাণে সগুণ রূপ ধারণ করেন; তাই মহাশিবরাত্রির তাৎপর্য কেবল আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি অস্তিত্বের গভীর দর্শনের অনুশীলন।
এই আলোচনার উদ্দেশ্য হলো মহাশিবরাত্রির পৌরাণিক তাৎপর্য ও আধ্যাত্মিক দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা। একই সঙ্গে এই পবিত্র তিথির অন্তর্নিহিত শিক্ষা আমাদের ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে কীভাবে প্রাসঙ্গিক, তা অনুধাবনের আহ্বান জানানো। পুরাণ মতে, এই বিশেষ তিথিতেই দেবাদিদেব শিব সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের সেই বিশ্বখ্যাত ‘তাণ্ডব নৃত্য’ করেছিলেন। আবার অনেকের বিশ্বাস, এই রাতেই হিমালয়কন্যা পার্বতীর সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন শিব। শৈব দর্শনে মহাশিবরাত্রি হলো অন্ধকার ও অজ্ঞতা দূর করার ব্রত। এটি সেই রাত, যা আমাদের বিনাশ এবং পুনর্জন্মের মাঝখানের শূন্যতায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ ধাম—সর্বত্রই এখন সাজ সাজ রব। আজ রবিবার বিকেল ৫টা ০৪ মিনিটে চতুর্দশী তিথি শুরু হওয়ার পর থেকে চলবে আগামীকাল ১৬ ফেব্রুয়ারি সোমবার বিকেল ৫টা ৩৪ মিনিট পর্যন্ত। ভক্তরা সারাদিন নির্জলা উপবাস থেকে রাতের চার প্রহরে শিবলিঙ্গে অর্পণ করবেন গঙ্গাজল, দুধ, দই, ঘৃত, মধু এবং বিল্বপত্র। এই ব্রত ও আরাধনার মাধ্যমে ভক্তরা আত্মশুদ্ধি, পাপক্ষয় ও অন্তরের অশুভ শক্তির বিনাশ কামনা করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাশিবরাত্রির এই সাধনা মানুষকে নৈতিক দৃঢ়তা, মানসিক শান্তি এবং মোক্ষলাভের পথে অগ্রসর হওয়ার প্রেরণা জোগায়।
শাস্ত্রীয় বচনে বলা হয়েছে—“ज्ञानं महेश्वरात् इच्छेत्” (প্রকৃত জ্ঞান মহেশ্বরের কাছ থেকেই কাম্য)। অর্থাৎ শৈব শাস্ত্রে মহেশ্বরকে প্রকৃত জ্ঞানের উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আবার পঞ্চাক্ষরী মন্ত্র “ওঁ নমঃ শিবায়” শৈব আগম ও উপনিষদে আত্মসমর্পণ ও আত্মবোধের মন্ত্র হিসেবে ব্যাখ্যাত। এই দর্শনের যৌক্তিক তাৎপর্য হলো—মানুষ যখন অহং ত্যাগ করে বৃহত্তর কল্যাণের পথে অগ্রসর হয়, তখনই ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক মুক্তি সম্ভব হয়। অতএব, মহাশিবরাত্রির সাধনা কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি আত্মসংযম, নৈতিক শুদ্ধি ও মানবকল্যাণের এক সুসংহত জীবনদর্শন, যা ব্যক্তি থেকে সমাজ—সব স্তরেই আলোর পথ নির্মাণ করতে সক্ষম।
শিবগীতায় ভক্তির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে—
भक्त्या तु मामभिज्ञाय तत्त्वतो हृदि संस्थितम्।
त्यक्त्वा सर्वमिदं देहं मोक्षमाप्नोति मानवः॥
(শিবগীতা, পদ্মপুরাণ)
অর্থাৎ—যে ভক্তি দিয়ে হৃদয়ে ঈশ্বরকে তত্ত্বরূপে উপলব্ধি করে, সে দেহাতীত চেতনায় মুক্তির পথে অগ্রসর হয়। অতএব, শিবরাত্রির উপবাস, জাগরণ ও জপ কেবল আচারগত অনুশীলন নয়; তা আত্মসংযম ও আত্মোপলব্ধির একটি সচেতন প্রক্রিয়া।
মহাদেব তথা শিবের পরিচয়: নির্গুণ ব্রহ্ম ও সগুণ ঈশ্বর
হিন্দুধর্মে শিব ত্রিদেবের অন্যতম, যিনি সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের চিরন্তন চক্রকে ধারণ করেন। তিনি ভক্তির সহজলভ্য দেবতা—অল্প আহ্বানেই সন্তুষ্ট হন বলেই তিনি ‘আশুতোষ’ নামে পূজিত এবং যুগে যুগে সাধক-ভক্তের নিকট আধ্যাত্মিক শক্তির প্রধান আশ্রয়স্থল। সনাতন ধর্ম মতে, শিব বা মহাদেব কেবল ধ্বংসের দেবতা নন, তিনি অনাদি ও অনন্তের প্রতীক। সনাতন ধর্মে তাঁকে 'দেবতাদের দেব' বা দেবাদিদেব বলা হয়। তিনি একদিকে যেমন যোগীবেশে শ্মশানে বৈরাগ্যের সাধনা করেন, অন্যদিকে তিনিই গৃহী ভক্তের কাছে পরম করুণাময় আশুতোষ। শিবের নীলকণ্ঠ রূপটি ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর—সমুদ্র মন্থনের বিষ পান করে তিনি সৃষ্টিকে রক্ষা করেছিলেন। তাঁর জটায় প্রবহমান গঙ্গা পবিত্রতার প্রতীক, ললাটে স্থিত অর্ধচন্দ্র সময়ের নিয়ন্ত্রক এবং কপালে থাকা ত্রিনয়ন জ্ঞান ও সত্যের আলোকবর্তিকা।
হিন্দুধর্মে দেবাদিদেব শিবের অসংখ্য নাম প্রচলিত, আর প্রতিটি নামই তাঁর ভিন্ন ভিন্ন গুণ, রূপ ও মহিমার প্রতিফলন। মহাদেব, শঙ্কর, শম্ভু, ভোলানাথ, রুদ্র, পশুপতি, নীলকণ্ঠ ও মহেশ্বর—এই নামগুলো কেবল সম্বোধন নয়; এগুলো তাঁর সৃষ্টিকর্তা, সংহারক, করুণাময় ও ত্যাগী সত্তার বহুমাত্রিক পরিচয় বহন করে। পৌরাণিক ঐতিহ্য অনুযায়ী শিবের ১০৮টি পবিত্র নাম—‘শিব অষ্টোত্তর শতনাম’—বিশেষভাবে শ্রদ্ধেয় ও জপযোগ্য। সেখানে আশুতোষ (সহজে প্রসন্ন হন যিনি), গঙ্গাধর (জটায় গঙ্গাধারী), ভৈরব (অসুরসংহারক রূপ) এবং হর (পাপ ও দুঃখ হরণকারী) প্রভৃতি নাম বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই বহুনামধারী শিব একাধারে ভক্তের আশ্রয়, তপস্যার প্রতীক এবং চিরন্তন নৈতিক শক্তির উৎস।
শিব পুরাণ অনুসারে, তিনি নির্গুণ ব্রহ্মের সগুণ সাকার রূপ, যিনি জগৎকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে পরিচালিত করেন। পদ্মপুরাণের অন্তর্গত ‘শিবগীতা’-এর একটি শ্লোকে মহাদেব বলেন, “আমি দেহ নই, প্রাণ নই, ইন্দ্রিয় বা মনও নই; আমি চিদানন্দরূপ শম্ভু—এই ভাবেই ধ্যান কর [nāhaṃ deho na ca prāṇo na cendriya-manoguṇāḥ; cid-ānanda-rūpaḥ śambhur aham ity eva bhāvayet]”।— তাই তাঁর পূজা কেবল আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা জীবনের পরম সত্য এবং অন্তরের কুপ্রবৃত্তি নাশের এক আধ্যাত্মিক পথ। শাস্ত্রমতে, ভক্তিভরে শিবের উপাসনা করলে পাপক্ষয়, মানসিক শান্তি ও সংসার জীবনে কল্যাণ লাভ হয়। আন্তরিক আরাধনা ও ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ জপের মাধ্যমে ভক্ত আত্মশুদ্ধি অর্জন করে এবং মোক্ষলাভের পথে অগ্রসর হওয়ার আশীর্বাদ প্রাপ্ত হন।
শিবতত্ত্বের এই নির্গুণ-সগুণ সমন্বয় শিবগীতাতেও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যাত। পদ্মপুরাণের অন্তর্গত শিবগীতায় মহাদেব বলেন—
एकोऽहं सर्वभूतस्थो भिन्नो नास्ति कदाचन।
मयि सर्वमिदं प्रोतम् सूत्रे मणिगणा इव॥
(শিবগীতা, পদ্মপুরাণ)
অর্থাৎ—আমি এক এবং সকল জীবের অন্তরে বিরাজমান; সমগ্র জগৎ আমার মধ্যে গাঁথা, যেমন সূতোয় গাঁথা থাকে মণিমালা। এই দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ভেদ নয়—অন্তর্নিহিত ঐক্যই চূড়ান্ত সত্য। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব স্তরেই এই চেতনা প্রাসঙ্গিক।
এক নজরে ২০২৬ সালের মহাশিবরাত্রির নির্ঘণ্ট
হিন্দু শাস্ত্রমতে তিথি, নক্ষত্র ও মুহূর্ত কেবল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গণনা নয়; এগুলো মানুষের আধ্যাত্মিক সাধনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ধর্মশাস্ত্র ও শিব পুরাণে উল্লেখ আছে যে, নির্দিষ্ট তিথিতে উপবাস ও জাগরণ আত্মশুদ্ধির শক্তিকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে—কারণ সেই সময় মানসিক সংযম ও ভক্তিভাব সর্বাধিক ফলদায়ক হয়।
এটি দেশের তথা বিশ্বের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য এক মহিমান্বিত রাত্রির প্রতীক্ষা—২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি, রবিবার, যখন সন্ধ্যা নেমে আসার ঠিক আগে বিকেল ৫টা ০৪ মিনিটে শুরু হবে মহাশিবরাত্রির পবিত্র তিথি, আর তার সমাপ্তি ঘটবে পরদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টা ৩৪ মিনিটে। এই সময়সীমার ভেতরেই ভক্ত হৃদয় জেগে উঠবে উপবাসের সংযমে, চার প্রহরের পূজায় এবং শিবলিঙ্গে রুদ্রাভিষেকের নিবেদনে—যেন প্রতিটি প্রহর একেকটি অন্তর্লোকের প্রদীপ প্রজ্বলন। এই দিনটি কেবল পঞ্জিকার একটি তারিখ নয়; এটি আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক অনুধ্যানের আহ্বান, যার মর্যাদায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘোষণা করা হয় সাধারণ ছুটি, আর সরকারি বিধান অনুযায়ী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য থাকে ঐচ্ছিক ছুটির সুযোগ—সমাজের ব্যস্ত ছন্দ থামিয়ে ভক্তি, প্রার্থনা ও ধ্যানের এক গভীর নিশীথে প্রবেশের নিমন্ত্রণ।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে—“भक्त्या माम् अभिजानाति” অর্থ্যাৎ ভক্ত্যা মাং অভিজানাতি [শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, ১৮.৫৫] —একান্ত ভক্তির মাধ্যমেই ঈশ্বরকে তত্ত্বরূপে জানা যায়। আর শিব এই বক্তির উপর গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, একান্ত ভক্তির মাধ্যমেই আমাকে সত্যরূপে জানা যায়। এই নির্ঘণ্ট মেনে উপবাস, জাগরণ ও পূজা সম্পাদন করার মধ্যে রয়েছে আত্মনিয়ন্ত্রণের যুক্তিসংগত অনুশীলন, যা ব্যক্তিকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও নৈতিকভাবে দৃঢ় করে তোলে। অতএব, মহাশিবরাত্রির এই নির্দিষ্ট সময়সীমা কেবল আচার পালনের জন্য নয়; এটি এক সুসংগঠিত আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষ আত্মসংযম, অন্তর্দৃষ্টি ও ঈশ্বরস্মরণের মাধ্যমে জীবনের উচ্চতর উদ্দেশ্যের দিকে অগ্রসর হতে পারে।
শিব ও শিবরাত্রি: বাঙালির গণমানুষের সংস্কৃতির এক অভিন্ন প্রতীক
শিব বাঙালির গণমানুষের সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত এক অভিন্ন প্রতীক। গ্রামীণ বাংলার প্রায় সর্বত্র শিবমন্দির, শিবলিঙ্গ কিংবা শিবচত্বরের উপস্থিতি তাঁর জনপ্রিয়তার সুস্পষ্ট প্রমাণ। চড়ক পূজা, গাজন কিংবা শিবের গাজনের মতো উৎসবগুলো কেবল ধর্মীয় আচারে সীমাবদ্ধ নয়; এগুলো গ্রামীণ জীবনের সামষ্টিক আনন্দ ও ঐতিহ্যের অংশ। ব্রতকথা, পালাগান ও লোককাহিনিতে শিবকে সহজ-সরল, দরিদ্রের আপন দেবতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে—যা তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
বাংলা সাহিত্যেও শিব এক সর্বজনীন সাংস্কৃতিক প্রতীক। মঙ্গলকাব্য থেকে আধুনিক কবিতা পর্যন্ত তিনি শক্তি, ত্যাগ ও নবসৃষ্টির রূপক হিসেবে উপস্থিত। রবীন্দ্রনাথের ধ্যানমগ্ন শিব যেমন বিশ্বচেতনার প্রতীক, তেমনি নজরুলের প্রলয়মূর্তি শিব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা। এমনকি মুসলিম সাহিত্যিকদের রচনাতেও শিব বিদ্রোহ, মানবতা ও তপস্যার প্রতীক হয়ে উঠেছেন, যা তাঁর সাম্প্রদায়িক সীমা অতিক্রমী অবস্থানকে সুদৃঢ় করে।
সংগীত, নাট্য ও লোকশিল্পেও শিবের প্রভাব সুস্পষ্ট। শিবভজন, গাজনের গান, তাণ্ডবনৃত্য কিংবা যাত্রাপালায় শিব চরিত্রের উপস্থিতি তাঁকে কেবল উপাস্য দেবতা নয়, বরং লোকসংস্কৃতির জীবন্ত অংশে পরিণত করেছে। নজরুলের রচিত শিবসংগীত কিংবা বিভিন্ন রাগভিত্তিক ভক্তিগান শিবচেতনার সাংস্কৃতিক গভীরতাকে আরও বিস্তৃত করেছে (যা আরো বিস্তারিতভাবে পরবর্তী অনুচ্ছেদে তুলে ধরা হয়েছে) ।
সাম্প্রদায়িক সহাবস্থান ও সামাজিক ঐক্যের ক্ষেত্রেও শিব এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। শিবসংক্রান্ত লোকউৎসবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ বাংলার বহুত্ববাদী সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। গ্রামীণ সমাজে তাঁকে প্রায়শই ‘গণদেবতা’ হিসেবে মান্য করা হয়। তাঁর নীলকণ্ঠ রূপ ত্যাগ ও সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়, যা সামষ্টিক নৈতিকতার ভিত্তিকে শক্তিশালী করে। সব মিলিয়ে, শিব কেবল ধর্মীয় উপাস্য নন—তিনি বাঙালির ইতিহাস, সাহিত্য ও লোকজ জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক প্রতীক।
বাংলা সাহিত্যে শিবরাত্রি: আধ্যাত্মিকতা, প্রলয় ও নবসৃষ্টির নন্দনরূপ
বাংলা সাহিত্যে শিবরাত্রি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি আধ্যাত্মিক অন্বেষণ, তপস্যা ও মানবিক বোধের এক গভীর সাংস্কৃতিক প্রতীক। মধ্যযুগীয় মঙ্গলকাব্যে—বিশেষত ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের কাব্যে—শিবকে কখনো মহাতপস্বী, কখনো সহজ-সরল গৃহস্থ দেবতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে; সেখানে তাঁর লৌকিক ও অলৌকিক রূপ মিলেমিশে একাকার। গ্রামীণ বাংলার উপবাস, ব্রতকথা ও লোকবিশ্বাস সাহিত্যে প্রাণ পেয়েছে এমনভাবে, যেখানে শিব আধ্যাত্মিক শক্তির আধার হওয়ার পাশাপাশি মানবজীবনের দুঃখ-দুর্দশার সহমর্মী সঙ্গী।
আধুনিক কাব্যে শিবচেতনার রূপান্তর:আধুনিক বাংলা সাহিত্য শিবকে নতুন দৃষ্টিতে আবিষ্কার করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবনায় তিনি কখনো ধ্যানের নিস্তব্ধতা, কখনো প্রলয়ের ভেতর দিয়ে নবসৃষ্টির ইঙ্গিতবাহী বিশ্বচেতনা। অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলাম শিবকে রূপ দিয়েছেন বিদ্রোহ ও বিপ্লবের মহাশক্তি হিসেবে। তাঁর কাব্যে তাণ্ডব মানে কেবল ধ্বংস নয়; তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বজ্রনিনাদ এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার আহ্বান। ফলে শিবরাত্রি আধুনিক কাব্যে হয়ে ওঠে অন্ধকার ভেদ করে আলোর অভিযাত্রার প্রতীক।
মুসলিম সাহিত্যধারায় শিবের অনুরণন: শিবের উপস্থিতি কেবল হিন্দু সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ নয়; উপমহাদেশের মুসলিম সাহিত্যেও তাঁর প্রতীকী অনুরণন লক্ষ্য করা যায়। সুফি ভাবধারায় শিবের ধ্যান ও বৈরাগ্যকে আত্মবিলোপের (ফনা) আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। বাংলা মুসলিম কবিদের রচনায় শিব কখনো প্রকৃতির শক্তির রূপক, কখনো লোকায়ত ঐতিহ্যের অংশ—যা বহুধর্মীয় সহাবস্থানের প্রমাণ বহন করে। উর্দু ও ফারসি সাহিত্যেও শিবের নীলকণ্ঠ রূপ আত্মত্যাগ ও সহিষ্ণুতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যাত হয়েছে।
নজরুলের কাব্যে প্রলয়শক্তির প্রতীক: কাজী নজরুল ইসলামের রচনায় শিব এক অনন্য ব্যঞ্জনা লাভ করেছেন। “বিদ্রোহী” কবিতায় তাঁর ঘোষণা—“আমি শিব-শিব! আমি অকাল-বৈশাখী”, “আমি প্রলয়-উল্লাস”, “আমি ধ্বংস-পিতা”—শিবের ধ্বংসরূপকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিপ্লবী শক্তিতে রূপান্তরিত করে। “প্রলয়োল্লাস” কবিতার পঙক্তি—“তোরা সব জয়ধ্বনি কর! / ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়”—ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নবযুগ নির্মাণের আহ্বান জানায়। “রুদ্র-মঙ্গল” গদ্যে তিনি রুদ্ররূপকে সমাজজাগরণের শক্তি হিসেবে দেখিয়েছেন; আবার ‘আহির ভৈরব’ রাগে শিবভক্তিগীতি রচনা করে শিবচেতনার সঙ্গে নিজের সৃষ্টিশীল উন্মাদনাকে যুক্ত করেছেন।
সবশেষে বলা যায়, বাংলা সাহিত্যে শিব ও শিবরাত্রি ধর্মীয় সীমানা অতিক্রম করে মানবমুক্তি, ন্যায়বোধ ও চিরন্তন সৃষ্টিশীলতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। প্রলয়ের ভেতর দিয়ে নবজাগরণের যে দর্শন শিবতত্ত্ব ধারণ করে, বাংলা সাহিত্য তাকে রূপ দিয়েছে সাংস্কৃতিক সংলাপ ও মানবিক ঐক্যের এক দীপ্ত প্রকাশ হিসেবে।
যেকোনো গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর একটি জাতির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিভাজনের রাজনীতি অতিক্রম করে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথে অগ্রসর হওয়া। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—টেকসই অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সমাজে স্থায়ী বিভেদের রূপ নেয় না এবং নাগরিকেরা বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন।
২০২৬ সালের এই শিবরাত্রি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশ জাতীয় নির্বাচনের পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি। নির্বাচনোত্তর সময়ে একটি দেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি হয়ে ওঠে সামাজিক সম্প্রীতি পুনর্গঠন এবং অভ্যন্তরীণ ‘অন্ধকার’—অর্থাৎ সংকীর্ণতা, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা—দূর করা। হিন্দু দর্শনে শিবরাত্রির মূল মন্ত্র “ওঁ নমঃ শিবায়” কেবল একটি জপ নয়; এটি আত্মশুদ্ধি ও নেতিবাচকতা পরিশুদ্ধ করার এক অন্তর্মুখী সাধনা। শিবের জটাজুটে শোভিত অর্ধচন্দ্র যেমন শান্তির প্রতীক, তাঁর কণ্ঠে ধারণ করা বিষ যেমন ত্যাগ ও সহিষ্ণুতার পরিচায়ক, তেমনি আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনেও আজ প্রয়োজন সংযম, সহনশীলতা ও ত্যাগের মহিমা।
এই প্রেক্ষাপটে শিবগীতার একটি শ্লোক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে— देवनागरी: कामक्रोधादिदोषेभ्यो मुक्तो यः शरणं गतः।; स मे भक्तः प्रियः शान्तः स याति परमां गतिम्॥ — IAST: kāma-krodhādi-doṣebhyo mukto yaḥ śaraṇaṃ gataḥ; sa me bhaktaḥ priyaḥ śāntaḥ sa yāti paramāṃ gatim —ভাবার্থ: যে কাম-ক্রোধ প্রভৃতি দোষ থেকে মুক্ত হয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে, সেই শান্ত ভক্তই প্রিয়; এবং সে-ই পরমগতি লাভ করে।
নির্বাচনোত্তর বাস্তবতায় এই শ্লোক আমাদের রাজনৈতিক সংযম ও নৈতিক শুদ্ধির শিক্ষা দেয়। ক্ষমতার প্রতিযোগিতা যদি কামনা ও ক্রোধের দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে তা বিভাজন ডেকে আনে; কিন্তু যদি তা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও বৃহত্তর কল্যাণবোধে নিয়ন্ত্রিত হয়, তবে তা জাতিকে এগিয়ে নেয় শান্তির পথে।
আজ এই পবিত্র তিথি আমাদের আহ্বান জানাচ্ছে—ভেদাভেদ ভুলে সংলাপ, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে এক শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে। মতের ভিন্নতা থাকলেও হৃদয়ের ঐক্য অটুট রেখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করাই হোক আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার। রাজনৈতিক ও সামাজিক সংযমের প্রসঙ্গে শিবগীতার আরেকটি শিক্ষা প্রাসঙ্গিক—
कामक्रोधादिदोषेभ्यो मुक्तो यः शरणं गतः।
स मे भक्तः प्रियः शान्तः स याति परमां गतिम्॥
(শিবগীতা, পদ্মপুরাণ)
অর্থাৎ—যে কাম, ক্রোধ প্রভৃতি দোষ থেকে মুক্ত হয়ে শান্তচিত্তে আশ্রয় নেয়, সেই ভক্তই প্রিয় এবং সে পরমগতি লাভ করে। আর আজকের নির্বাচনোত্তর বাস্তবতায় এই বাণী আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সংযম, সহিষ্ণুতা ও নৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো সমাজ দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে না।
যুক্তির নিরিখে দেখলে, সামাজিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না; আর সেই স্থিতিশীলতার ভিত্তি হলো পারস্পরিক আস্থা ও নৈতিক সংযম। শিবরাত্রির আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের দর্শন যদি ব্যক্তি ও রাষ্ট্রজীবনে প্রতিফলিত হয়, তবে তা কেবল আধ্যাত্মিক জাগরণই নয়—একটি দায়িত্বশীল, সহনশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথ নির্মাণেও বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্ধকার দূর করে আলোর পথে যাত্রা
বেদে প্রার্থনা করা হয়েছে—“তমসো মা জ্যোতির্গময়”, অর্থাৎ অন্ধকার থেকে আমাদের আলোয় নিয়ে চলো। এই চিরন্তন বৈদিক আহ্বানই মানবজীবনের অন্তর্গত জাগরণের মূলমন্ত্র, যা আত্মশুদ্ধি ও সত্যের পথে অগ্রসর হওয়ার শিক্ষা দেয়। আর এই শিক্ষায় প্রধানতম শিক্ষক হিসেবে সনাতনদের কাছে মর্যাদার আসনে আছেন কৈলাসে ধ্যানমগ্ন মহাদেব শিব।—হিন্দু ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত ‘শৈব তত্ত্বে’ বলা হয়, শিব শুধু কৈলাসের ঠাকুর নন, তিনি আমাদের অন্তরের চৈতন্য।, পদ্মপুরাণের শিবগীতায় বলা হয়েছে, “नाहं देहो न च प्राणो न चेन्द्रियमनोगुणाः।चिदानन्दरूपः शम्भुरहमित्येव भावयेत्॥ [অর্থ—আমি দেহ নই, প্রাণ নই; আমি চিদানন্দরূপ শম্ভু—এই ভাবনায় ধ্যান কর।] —এখানে শিব নিজেকে অন্তরের চৈতন্যরূপে উপলব্ধির আহ্বান জানিয়েছেন—যা বাহ্যিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে এক অভ্যন্তরীণ জাগরণের পথ নির্দেশ করে।
এবারের শিবরাত্রির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে পণ্ডিতগণ বলছেন, নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে যে বিভেদ বা মতপার্থক্য তৈরি হয়, তা দূর করার জন্য শিবের ‘নীলকণ্ঠ’ রূপটি সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে। সমাজের সকল বিষ পান করে নীলকণ্ঠ যেমন জগৎকে রক্ষা করেছিলেন, তেমনি আমাদেরও ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও হিংসা বিসর্জন দিয়ে একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষে এক হতে হবে। তাইতো বলা হয়, “মহাশিবরাত্রির সময় আমাদের অন্তরের মন্দকে নির্মূল করতে হবে এবং পুণ্যের বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করতে হবে। শিব আমাদের বাইরে নয়, আমাদের মধ্যেই আছেন” (থিওসফিক্যাল মুভমেন্ট, ভলিউম ৭২, ১৯৬২)। অপরদিকে ঋগ্বেদের বাণী—“একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি” — আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সত্য এক, তবে তার প্রকাশ বহু রূপে। সেই বৈদিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শিবরাত্রির এই পবিত্র সাধনা আমাদের অন্তরে সত্য, শুদ্ধতা ও ঐক্যের দীপ প্রজ্বলিত করুক, এবং জাতি হিসেবে আমাদের আলোকিত ভবিষ্যতের পথে পরিচালিত করুক। শিবগীতার ভাষায়, “कामक्रोधादिदोषेभ्यो मुक्तो…”—যে কাম-ক্রোধ ত্যাগ করে, সেই শান্ত ভক্তই প্রিয়। আজকের সামাজিক বাস্তবতায় এই শিক্ষাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক।
মহাশিবরাত্রি, বৈশ্বিক ব্যাপ্তি ও বাংলাদেশের চিত্র
মহাশিবরাত্রি কেবল একটি ধর্মীয় তিথি নয়, এটি বিশ্বব্যাপী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হৃদয়ের মিলনক্ষেত্র। ভৌগোলিক সীমারেখা, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা সত্ত্বেও এই পবিত্র রজনী এক অভিন্ন ভক্তিধারায় কোটি মানুষকে যুক্ত করে।
কেবল বাংলাদেশেই নয়, নেপালের পশুপতিনাথ থেকে শুরু করে ভারতের জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরগুলোতে আজ লাখো ভক্তের ভিড়। এমনকি পাকিস্তানের করাচির শ্রী রত্নেশ্বর মহাদেব মন্দিরেও হাজারো হিন্দু ধর্মাবলম্বী আজ উপবাস ও আরাধনায় রত। বৈশ্বিক এই উদযাপন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভক্তির কোনো সীমানা নেই। এ বিষয়ে আমাদের দেশও পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশে ঢাকেশ্বরী মন্দিরসহ বিভিন্ন উপাসনালয়ে আজ রাতে রুদ্রাভিষেক ও কীর্তনের বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে। সরকারি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটির কারণে উৎসবে যোগ দিতে পারবেন দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা। ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের শিবালয়গুলো আজ মুখরিত হবে পঞ্চাক্ষরী মন্ত্রে।
এই বৈশ্বিক ভক্তিস্রোত আমাদের শেখায়—আধ্যাত্মিকতা মানবতার এক সর্বজনীন ভাষা। বাংলাদেশও সেই বিশ্বজনীন চেতনার অংশ হয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল বার্তা বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিচ্ছে।
বাংলার মাটি চিরকালই বহুধর্ম, বহুভাষা ও বহুসংস্কৃতির এক অনন্য মিলনভূমি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ ভূখণ্ডের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহাবস্থানের চেতনায় গড়ে তুলেছে এক সমৃদ্ধ সামাজিক ঐতিহ্য। ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়—বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসে ধর্মীয় সম্প্রীতি কেবল একটি শ্লোগান বা আনুষ্ঠানিক শব্দ নয়; এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনচর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০২৬ সালের নির্বাচন-পরবর্তী এই সময়ে মহাশিবরাত্রির উদযাপন যেন সেই আন্তধর্মীয় বন্ধনকেই পুনরায় দৃঢ় ও উজ্জ্বল করে তোলে। বাংলাদেশে শিবরাত্রির উৎসবে যেমন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ভক্তি ও আচার-অনুষ্ঠানে মগ্ন থাকেন, তেমনি তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন অন্যান্য ধর্মের মানুষও। এই সামাজিক সংহতিই একটি দেশের প্রকৃত সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি।
এই চেতনার দার্শনিক ভিত্তি আমরা পাই প্রাচীন শাস্ত্রীয় বাণীতে— পদ্মপুরাণের অন্তর্গত শিবগীতায় মহাদেব বলেন—“एकोऽहं सर्वभूतस्थो…”—আমি এক এবং সকল জীবের অন্তরে বিরাজমান। এই বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিভেদ নয়, ঐক্যই চূড়ান্ত সত্য। —এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ঈশ্বর এক, তাঁর প্রকাশ বহু। মানবসমাজের বহুবর্ণ সত্তা আসলে এক অখণ্ড সুতায় গাঁথা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যুক্তিগত ভিত্তি এখানেই নিহিত: ভিন্নতার মাঝেও ঐক্য, বৈচিত্র্যের মধ্যেও একত্ব।
‘প্রত্যেকের ধর্ম তার নিজস্ব, কিন্তু উৎসব সবার জন্য’—এই বোধ লালন করেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দরবারে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। শিবরাত্রির শিক্ষা আমাদের ভেদবুদ্ধি দূর করতে আহ্বান জানায়; আর সেই আহ্বান থেকেই আমাদের অঙ্গীকার হোক এমন এক দেশ গড়া, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার স্বকীয়তা বজায় রেখে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে। এই ঐক্যের শক্তিতেই নির্মিত হবে এক শান্তিময় ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির এই ধারাবাহিক চর্চাই প্রমাণ করে—বাংলাদেশের সামাজিক ভিত্তি গভীর মানবিক মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখা এবং আরও সুদৃঢ় করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব।
সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন
২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়-পরাজয় ছাপিয়ে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন। শিবরাত্রির জাগরণ আমাদের শেখায় আলস্য ত্যাগ করতে। সারারাত জেগে ধ্যানের মাধ্যমে যেমন ভক্তরা আত্মিক মুক্তি খোঁজেন, তেমনি নাগরিক হিসেবে আমাদেরও সজাগ থাকতে হবে দেশের উন্নয়নের পাহারাদার হিসেবে। শিবের ‘ত্রিনয়ন’ যেমন সত্যকে দেখার চোখ, তেমনি আমাদেরও উচিত সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থেকে একটি শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়া।
সনাতন ধর্মমতে, শিব ও শক্তির মিলন যেমন সৃষ্টির আদিম উৎস, তেমনি সরকার ও জনগণের সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রয়াসই হতে পারে একটি স্বনির্ভর বাংলাদেশের প্রকৃত প্রাণশক্তি। সৃষ্টির সেই শাশ্বত ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই মহাশিবরাত্রি যুগে যুগে মানবসমাজকে স্মরণ করিয়ে দেয়—এই জীবনচক্রের কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাতা নেই, নেই আদি-অন্তের সীমানা; আছে কেবল এক অভিন্ন, চিরন্তন সত্যের আহ্বান। এই শিবরাত্রি সনাতন দর্শনের মর্মকথাকে উজ্জ্বল করে তোলে, যার কেন্দ্রে রয়েছে—ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয় (ব্রহ্ম), বেদ পরম জ্ঞানের আধার, আর মানবতা, সততা, করুণা ও আত্মসংযম তার অনিবার্য সারমর্ম। অপরদিকে ত্রিদেবের অন্যতম মহাদেব শিব বারবার স্মরণ করিয়ে দেন—কর্মফল অবধারিত, পুনর্জন্ম এক অনিবার্য সত্য, আর মোক্ষপ্রাপ্তির পথই মানবজীবনের চূড়ান্ত সাধনা।
শেষ কথা ও প্রত্যাশা
উপনিষদে বলা হয়েছে—“অসতো মা সদ্গময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়”, অর্থাৎ অসত্য থেকে সত্যে এবং অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের প্রার্থনাই মানবজীবনের চূড়ান্ত সাধনা। শিব পুরাণে মহাদেবকে কল্যাণের আধার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে—যিনি ভক্তের অন্তর শুদ্ধ করে সমাজকল্যাণের পথে পরিচালিত করেন। অতএব, শিবরাত্রির এই পবিত্র সাধনা কেবল ব্যক্তিগত আচার নয়; এটি নৈতিক পুনর্জাগরণ ও সামষ্টিক কল্যাণের এক যুক্তিসংগত আহ্বান।
সনাতন ধর্ম মতে, আজকের এই পুণ্য তিথিতে ভক্তদের প্রার্থনা কেবল ব্যক্তিগত মোক্ষ বা সুখী দাম্পত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার নয়; এবারের প্রার্থনা হোক—হিংসামুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত এবং মানবিক এক বাংলাদেশের জন্য। ফাল্গুনের এই কৃষ্ণপক্ষের রজনী শেষে যখন কাল সকালে সূর্য উঠবে, সেই আলো যেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে সহনশীলতা ও দেশপ্রেমের সঞ্চার করে। অন্ধকার আর অজ্ঞতা দূর করার এই ব্রত সফল হোক প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি মনে। আর প্রতিধ্বনিত হোক—
শৈব শাস্ত্রে বারবার বলা হয়েছে—যে ভক্ত নিষ্ঠাভরে ঈশ্বরস্মরণ করে, তিনি তার রক্ষাকর্তা ও পথপ্রদর্শক। যেমন ভগবান শিব ঘোষণা করেন—“যঃ মাং ভজতি নিত্যশঃ, তস্যাহং পরিত্রাতা”, অর্থাৎ যে নিষ্ঠাভরে আমার স্মরণ করে, আমি তার রক্ষক ও পথপ্রদর্শক। এই বাণীর যুক্তিসংগত তাৎপর্য হলো—ভক্তি মানে দায়িত্ববোধ, আর আত্মশুদ্ধি মানেই সমাজশুদ্ধির পথে অগ্রসর হওয়া। তাই শিবরাত্রির এই মহামন্ত্র আমাদের কেবল ধর্মীয় অনুশীলনে নয়, বরং ন্যায়, সহমর্মিতা ও মানবকল্যাণের বাস্তব প্রয়োগে উদ্বুদ্ধ করুক—এই হোক সকলের চূড়ান্ত অঙ্গীকার।
Disclaimer
এই নিবন্ধটি বাঙালি সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ভাবনার আলোচনাভিত্তিক রচনা। গবেষণা, পাঠচর্চা ও জনস্বার্থে যে কেউ এর সম্পূর্ণ বা আংশিক অংশ ব্যবহার, উদ্ধৃতি বা পুনর্মুদ্রণ করতে পারেন—তবে যথাযথ সূত্র উল্লেখ ও কৃতিত্ব প্রদান করা আবশ্যক। লেখাটির আরও সমৃদ্ধি ও বিকাশের লক্ষ্যে গঠনমূলক মতামত, পরামর্শ ও সমালোচনা সাদরে আহ্বান করা হচ্ছে। অধিকারপত্র মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলে এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#মহাশিবরাত্রি২০২৬ #MahaShivratri2026 #শিবরাত্রি_ব্রত #দেবাদিদেব_মহাদেব #ওঁ_নমঃ_শিবায় #সম্প্রীতির_বাংলাদেশ #শান্তিময়_বাংলাদেশ #সনাতন_ধর্ম #আধ্যাত্মিক_জাগরণ #BangladeshFestival #ShivratriBlessings #BangladeshUnity