02/21/2026 শোক ও শুদ্ধির মহামিলন: পবিত্র রমজানের আবহে একুশের নব অঙ্গীকার
Dr Mahbub
২১ February ২০২৬ ০২:০৮
— সম্পাদকীয়
পবিত্র মাহে রমজানের আত্মশুদ্ধি ও মহান একুশে ফেব্রুয়ারির ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত এক অনন্য সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ বাংলাদেশ। নবগঠিত সরকারের পথচলার প্রারম্ভে জাতীয় ভাষা নীতি প্রণয়ন, সর্বস্তরে বাংলার প্রবর্তন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মাতৃভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার আহবানে সাজানো একটি বিশ্লেষণধর্মী সম্পাদকীয়।
পবিত্র মাহে রমজানের আত্মশুদ্ধির আবহে এ বৎসর এক অনন্য মাহেন্দ্রক্ষণে উপস্থিত হইয়াছে আমাদের জাতীয় জীবন। নবগঠিত সরকারের শপথগ্রহণের পর প্রথম মহত্তম জাতীয় অনুষ্ঠান রূপে আসিয়াছে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি— আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও মহান শহীদ দিবস। একদিকে সংযমের কৃচ্ছ্রসাধন ও পারলৌকিক মুক্তির ব্যাকুলতা, অন্যদিকে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় আত্মদানের রক্তিম ইতিহাস; এই দুইয়ের সংমিশ্রণে বাঙালির মানসপটে আজ এক অপূর্ব ভাবগাম্ভীর্য বিরাজ করিতেছে। রমজান মাস আমাদিগকে শিখায় ভোগ বিসর্জন দিয়া ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হইতে। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতেও আমাদের পূর্বসূরিগণ জীবনের মায়া তুচ্ছ করিয়া রাজপথ রঞ্জিত করিয়াছিলেন এক মহত্তর ত্যাগের উদ্দীপনায়। বর্তমান সরকারের জন্য এই দিবসটি এক বিশেষ পরীক্ষা ও অঙ্গীকারের নামান্তর। নবনির্বাচিত সরকারের যাত্রাপথের প্রারম্ভেই একুশের এই আয়োজন স্মরণ করাইয়া দেয় যে, জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষা করাই সু শাসনের মূল ভিত্তি। রফিক, সালাম, বরকত ও জব্বারের স্মৃতিধন্য এই দিবসে রমজানের পবিত্রতা আমাদের শাসনব্যবস্থায় ন্যায়বিচার ও শুদ্ধতা আনয়নে সহায়ক হইবে বলিয়া আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা এবং সর্বস্তরে ইহার শুদ্ধ প্রয়োগ নিশ্চিত করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। পবিত্র রমজান যেমন নফস বা প্রবৃত্তিকে দমনের শিক্ষা দেয়, অমর একুশে তেমনই শিখায় সকল প্রকার সাংস্কৃতিক পরাধীনতা ও অপশক্তির বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া খাড়া করিয়া দাঁড়াইতে। বায়ান্নর সেই রক্তঝরা ফাল্গুনের পর সুদীর্ঘকাল অতিবাহিত হইলেও আজ বাঙালির মনে এই প্রশ্ন জাগে— মাতৃভাষার প্রকৃত অধিকার কবে পূর্ণাঙ্গরূপে প্রতিষ্ঠিত হইবে? আজ পর্যন্ত একটি সুসংহত ও সুদূরপ্রসারী জাতীয় ভাষা নীতি ব্যতীত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হইতেছে, যাহা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। ঔপনিবেশিক মানসিকতার বলয় হইতে বাহির হইয়া সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রবর্তন আজ সময়ের দাবি। উচ্চশিক্ষা হইতে শুরু করিয়া উচ্চ আদালত পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে মাতৃভাষার ব্যবহার নিশ্চিত না হইলে শহীদদের আত্মা শান্তি পাইবে না। কেবল আবেগ দিয়া নহে, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের মাধ্যমে ভাষাকে টিকাইয়া রাখিতে হয়। আমরা বিস্ময়ের সহিত লক্ষ্য করিতেছি যে, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সৃষ্টিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার আজও অত্যন্ত নগণ্য। বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্ব ও আধুনিক গবেষণাসমূহ কবে নাগাদ সহজতর বাংলার মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিকট পৌঁছাইবে, তাহার কোনো সুনির্দিষ্ট পথনকশা আমাদের সম্মুখে নাই। নতুন সরকারের নিকট জাতির সনির্বন্ধ অনুরোধ, তাঁহারা যেন কেবল দিবস-ভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতায় মগ্ন না থাকিয়া বিজ্ঞানের পরিভাষা প্রণয়ন ও উচ্চতর গবেষণায় বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেন।
জাতীয় শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের এই পবিত্র লগ্নে আমাদের অঙ্গীকার হউক— আমরা যেন নিজ ভাষাকে অবজ্ঞা না করি। একটি জাতির মেরুদণ্ড তাহার ভাষা ও সংস্কৃতি। নবগঠিত সরকারের নিকট প্রত্যাশা রহিয়াছে, তাঁহারা যেন অবিলম্বে একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী জাতীয় ভাষা নীতি প্রণয়ন করেন এবং প্রশাসনিক ও বিচারবিভাগীয় কার্যে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জয়যাত্রায় বাংলা পরিভাষা সমৃদ্ধ করিয়া গবেষণাপত্র প্রকাশের পথ সুগম করা আজ একান্ত আবশ্যক। ভাষা কেবল ভাব প্রকাশের মাধ্যম নহে, ইহা একটি জাতির টিকে থাকিবার রক্ষাকবচ; বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় বাংলা ভাষাকে যুক্ত করিতে না পারিলে আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছাইয়া পড়িব। পরিশেষে বলিবার বিষয় এই যে, শোকের এই দিবসটি আজ কেবল ক্রন্দনের নহে, বরং নব শক্তিতে জাগিয়া উঠিবার দিন। নবগঠিত সরকার একুশের এই অবিনাশী চেতনাকে ধারণ করিয়া একটি ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও দুর্নীতিমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়িয়া তুলিবে— পবিত্র এই মাসে ইহাই আপামর জনসাধারণের একান্ত প্রার্থনা। বর্ণমালার অমর শহীদগণ অমর হউন, মাহে রমজানের শিক্ষা আমাদের পাথেয় হউক।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#একুশেফেব্রুয়ারি #আন্তর্জাতিকমাতৃভাষাডিবিস #রমজান২০২৬ #জাতীয়ভাষানীতি #বাংলাভাষা #বাংলাদেশসরকার #শহীদদিবস #ভাষাআন্দোলন #সম্পাদকীয়