05/04/2026 শ্রীলঙ্কার মত্তলা বিমানবন্দর ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বোঝা: একটি অর্থনৈতিক ট্র্যাজেডি
Special Correspondent
৪ May ২০২৬ ০০:০৫
নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলে হাম্বানটোটা জেলায় অবস্থিত মত্তলা রাজাপাকসে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (MRIA)। উদ্বোধনের এক দশক পেরিয়ে গেলেও এই বিমানবন্দরটি এখন শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বোঝা বা শ্বেত হস্তী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৩ সালে চালু হওয়ার পর থেকে এটি এতটাই অলাভজনক। এর বিদ্যুৎ বিল মেটানোর মতো আয়ও এখান থেকে হয় না। সম্প্রতি এই বিমানবন্দরটিকে ব্যক্তিগত বিনিয়োগের মাধ্যমে সচল করার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে শ্রীলঙ্কা সরকার। তবে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার বিষয়টি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বনাম বাণিজ্যিক বাস্তবতা
সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসের নামে নামকরণ করা এই বিমানবন্দরটি তার নিজ জেলায় নির্মিত হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে এটি কোনো বাণিজ্যিক প্রয়োজন থেকে নয় বরং রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি করা একটি ভ্যানিটি প্রজেক্ট। চীনের কাছ থেকে বিশাল অংকের ঋণ নিয়ে এটি নির্মাণ করা হলেও শুরু থেকেই এখানে নিয়মিত কোনো ফ্লাইটের দেখা মেলেনি। এমনকি ২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কার জাতীয় এয়ারলাইন্সও এখান থেকে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দেয়। যা বছরে ১৮ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করে।
কেন ব্যর্থ মত্তলা বিমানবন্দর?
পর্যটন এবং এভিয়েশন বিশ্লেষক গ্যারি বোয়ারম্যানের মতে মত্তলা বিমানবন্দরের প্রধান সমস্যা এর অবস্থান। তিনি বলেন শ্রীলঙ্কা মূলত একটি ইন-আউট পর্যটন গন্তব্য, কোনো হাব নয়। কলম্বো থেকে ২৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বিমানবন্দরে মানুষ কানেক্টিং ফ্লাইট নিয়ে যেতে চায় না। এয়ারলাইন্সগুলো কলম্বোতে যেতেই বেশি আগ্রহী। এছাড়া বিমানবন্দরের আশেপাশে বন্যপ্রাণীর উপদ্রব—যেমন হাতি, হরিণ এবং পাখির বিচরণ—ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। ১ মিলিয়ন যাত্রী ধারণক্ষমতা থাকলেও ২০১৫ সালে সর্বোচ্চ মাত্র ১.৫ লাখ যাত্রী এটি ব্যবহার করেছিল।
নতুন বিনিয়োগের আহ্বান ও সম্ভাবনা
শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারিকরণের চেষ্টা করছে। মত্তলা বিমানবন্দরের জন্য দেওয়া নতুন প্রস্তাবে শুধু যাত্রী পরিবহন নয় বরং রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত (MRO), কার্গো লজিস্টিকস, খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং শিল্প উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এভিয়েশন ডাটা অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান OAG-এর বিশেষজ্ঞ ময়ূর প্যাটেল মনে করেন প্রথাগত বিমানবন্দর মডেল থেকে সরে এসে একে একটি লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তুললে হয়তো কিছুটা প্রাণ ফিরতে পারে। তবে তার জন্য দক্ষ বিনিয়োগকারী এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসায়িক পরিকল্পনার প্রয়োজন।
ঋণের বোঝা ও ভবিষ্যৎ
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা যখন নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে তখন চীনের নেওয়া এই বিশাল ঋণ বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে আইএমএফ (IMF)-এর বেইলআউট প্যাকেজের অধীনে দেশটি অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। তবে মত্তলা বিমানবন্দরের মতো প্রকল্পগুলো থেকে কার্যকর রিটার্ন না আসা পর্যন্ত ঋণের চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। একটি ভারত-রাশিয়া যৌথ উদ্যোগের সাথে ৩০ বছরের লিজ চুক্তি ব্যর্থ হওয়ার পর নতুন করে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এই নির্জন বিমানবন্দরে কতটা পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন সেটাই এখন দেখার বিষয়।
মত্তলা বিমানবন্দরের এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে যথাযথ বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই না করে কেবল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নেওয়া মেগা প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির জন্য চরম বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিদেশি ঋণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত প্রকল্প যদি নিজস্ব আয় থেকে দায়বদ্ধতা পরিশোধে ব্যর্থ হয় তবে তা দেশের সার্বভৌম অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। যা যেকোনো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য একটি বড় শিক্ষণীয় উদাহরণ।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র