06/07/2026 অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভ্যাকসিনের ‘গ্যাপ’-এই হামের পুনরুত্থান: অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম
odhikarpatra
৬ June ২০২৬ ২৩:৩২
বিশেষ প্রতিবেদক | অধিকারপত্র
ঢাকা: বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে আবারও উদ্বেগজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হাম (Measles)। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক নিয়ন্ত্রণে থাকা এ রোগের পুনরুত্থানের পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামের টিকাদানে সৃষ্ট ‘ভ্যাকসিন গ্যাপ’-কে দায়ী করেছেন ঢাকা শিশু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ও শিশু রেসপাইরেটরী বিভাগের অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম।
অধিকারপত্র (Odhikarpatra.com)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ও মারাত্মক রোগ। রোগটির একটি মাত্র সেরোটাইপ (Serotype) থাকায় সাধারণত জীবনে একবার আক্রান্ত হলে দ্বিতীয়বার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। তবে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কারণে গত প্রায় ৩০ বছর ধরে দেশে হাম কার্যত নিয়ন্ত্রণে ছিল।
তিনি জানান, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী শিশুদের ৯ মাস ও ১৪ মাস বয়সে হামের দুটি টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় অনেক শিশু প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত হয়।
অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ভ্যাকসিন গ্যাপের কারণে যেসব শিশু হামের টিকা পায়নি, তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি। ফলে ওয়াইল্ড হাম ভাইরাসের সংস্পর্শে এসে তারা আক্রান্ত হয়েছে। অনেক শিশুকে আমরা ইতোমধ্যে হারিয়েছি। এ ধরনের অবহেলার জবাবদিহি হওয়া প্রয়োজন।”
হামের লক্ষণ কী?
হামের লক্ষণ সম্পর্কে তিনি বলেন, রোগটি সাধারণত দুই ধাপে প্রকাশ পায়।
প্রথম ধাপে আক্রান্ত শিশুর উচ্চমাত্রার জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
পরবর্তী ধাপে, সাধারণত জ্বরের চতুর্থ দিনে শরীরে লালচে র্যাশ বা দানা দেখা দেয়, যা ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় জ্বরের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে এবং চোখ দিয়ে পিচুটি পড়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
নিউমোনিয়াসহ মারাত্মক জটিলতার আশঙ্কা
অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম জানান, হাম শুধু একটি ভাইরাসজনিত রোগ নয়; এটি থেকে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়ে শিশুর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, হামের কারণে বিভিন্ন ধরনের নিউমোনিয়া হতে পারে। কখনও ভাইরাস সরাসরি ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায়, আবার কখনও দ্বিতীয় পর্যায়ের ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ নিউমোনিয়ার কারণ হয়।
এছাড়া আক্রান্ত শিশুর ডায়রিয়া হতে পারে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ায় দীর্ঘ সময় পরও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
সবচেয়ে ভয়াবহ জটিলতা হিসেবে তিনি এনকেফালাইটিস বা মস্তিষ্কে প্রদাহের কথা উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, “হামের ভাইরাস যদি কোনোভাবে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে, তাহলে এনকেফালাইটিস হতে পারে। এ অবস্থায় মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।”
বর্তমান সরকারের পদক্ষেপে পরিস্থিতির উন্নতি
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করে অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সরকার ইতোমধ্যে হামের টিকা সরবরাহ ও বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করেছে।
তিনি জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া বিশেষ টিকাদান কার্যক্রমের ফলে হামের সংক্রমণ ও তীব্রতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করেছে। এজন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।
অভিভাবকদের জন্য জরুরি পরামর্শ
হাম প্রতিরোধ ও আক্রান্ত শিশুর সুরক্ষায় অভিভাবকদের প্রতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন তিনি—
প্রতিটি শিশুর নির্ধারিত সময়ের হামের টিকা নিশ্চিত করতে হবে।
কোনো শিশু হাম আক্রান্ত হলে তাকে অন্যান্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখতে হবে।
জ্বর, র্যাশ বা জটিলতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
আক্রান্ত শিশুকে নিয়মিত মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো অব্যাহত রাখতে হবে।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না।
_copy_919x1347.jpg)