07/23/2026 শিক্ষার সংস্কার নাকি সংস্কারের শিক্ষা? বাংলাদেশের সংস্কারের নাটক
Dr Mahbub
২৩ July ২০২৬ ০২:৫৬
শিক্ষার সংস্কার নাকি সংস্কারের শিক্ষা? বাংলাদেশের সংস্কারের নাটক—এই গবেষণাধর্মী, হাস্য-ব্যঙ্গাত্মক ও বিশ্লেষণমূলক ফিচারে বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের প্রকৃত অর্থ, নীতিগত বিভ্রান্তি, বাজেট, শিক্ষক, পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন, PISA, প্রশাসনিক জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে এক গভীর অনুসন্ধান উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে—সংস্কার কি কেবল নতুন বই, নতুন সিলেবাস ও নতুন স্লোগানের নাম, নাকি এটি মানুষ গড়ার দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রদর্শন? কেন শিক্ষকের কণ্ঠ নীতিনির্ধারণে অনুপস্থিত? কেন শেখার পরিবর্তে এখনো পরীক্ষাই শিক্ষার কেন্দ্র? কেন বিপুল বাজেটের পরও শিক্ষার্থীর শেখার মান কাঙ্ক্ষিতভাবে উন্নত হচ্ছে না? ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, রুয়ান্ডা এবং বৈশ্বিক শিক্ষা-অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করে এই ফিচার দেখায়—প্রকৃত শিক্ষা সংস্কার শুরু হয় শ্রেণিকক্ষে, শিক্ষকের হাতে এবং শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতায়। এটি কেবল একটি ব্যঙ্গাত্মক লেখা নয়; বরং বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার নিয়ে আত্মসমালোচনা, নীতিগত পুনর্বিবেচনা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনের এক চিন্তাজাগানিয়া আহ্বান।
সেই অমর প্রশ্ন
রাত পৌনে বারোটা। সামনে এসএসসি পরীক্ষা। রিমা বারবার পড়ছে—"বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাতীয়..."—হঠাৎ থামে। মোবাইলে নোটিফিকেশন: "চাকরির পরীক্ষায় ২৮০০ পদে আবেদন ১২ লাখ!" রিমার মাথা ঘুরে যায়। সে কি ভাববে? ভাববে—"আমি তো শাপলা-কাঁঠাল মুখস্থ করছি, অথচ চাকরির বাজারে চাই ডেটা অ্যানালাইটিক্স!"
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে এই দৃশ্যের মিল আছে—আমরা সংস্কারের নামে করি সংস্কারের নাটক।
শিক্ষা সংস্কার—শব্দটা শুনলেই মনে হয়, বুঝি কোনো মন্ত্র পড়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে সোনার হাঁস বানিয়ে ফেলা যাবে। কিন্তু বাস্তবে? বাস্তবে সংস্কার মানে হলো—পাতা পাল্টানো, অথচ পুরনো গল্পই থেকে যায়।
শিক্ষা সংস্কার আসলে কী? এটা কোনো একদিনের ইভেন্ট না, এটা প্রক্রিয়া—যেখানে পাঠ্যক্রম, শিক্ষক, পরীক্ষা, বাজেট, প্রশাসন—সবকিছু একসঙ্গে বদলাতে হয়। তবে আমাদের দেশে সংস্কার মানে হলো—নতুন বই ছাপানো, আর পুরনো শিক্ষকেরা নতুন বই নিয়ে পুরনো ঢংয়ে পড়ানো।
শিক্ষা সংস্কার মানে ঘড়ির কাঁটা বদলানো নয়, ঘড়িটার ডিজাইন বদলানো।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জটিলতা বুঝতে হলে একটা ছবি আঁকতে হয়—সেটা হলো গোলকধাঁধাঁ।
একদিকে আছে সাধারণ শিক্ষা—পিএসসি থেকে এইচএসসি, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়। অন্যদিকে আছে মাদ্রাসা শিক্ষা—ইবতেদায়ি থেকে কামিল। আর আছে কারিগরি শিক্ষা—ভোকেশনাল থেকে ডিপ্লোমা। তিনটি ধারা, তিনটি বোর্ড, তিনটি নিয়ম। শিক্ষার্থী যদি এক ধারা থেকে অন্য ধারায় যেতে চায়? তা হলে তাকে সাঁতারে সাঁতারে যেতে হয়!
প্রশাসনিক কাঠামো আরও মজার। প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে, মাধ্যমিক আছে শিক্ষা বোর্ড আর এনটিআরসিএর জটিল জালে, মাদ্রাসা আছে মাদ্রাসা বোর্ডের হাতে। তার ওপর এমপিওভুক্ত শিক্ষক, অ-এমপিওভুক্ত শিক্ষক—ব্যপারটা যেন চার রাজার পাঁচ গল্প। একটা শিক্ষাব্যবস্থা, অথচ তিনটা স্বর্গ-নরক! শিক্ষাবিদেরা বলেন, "বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এত জটিল ও বহুধাবিভক্ত, যা অন্য কোনো দেশের সাথে তুলনীয় নয়"। তুলনীয় নয় মানে? মানে আমরা বিশ্বরেকর্ড গড়েছি—জটিলতার!
২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা—যা জিডিপির ২ শতাংশ। আগের বছরে ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১.৩৯ শতাংশ। টাকার অঙ্কে বেড়েছে, কিন্তু জিডিপির শতাংশে এখনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনেক নীচে। UNESCO বলে, শিক্ষায় জিডিপির ৪-৬ শতাংশ বরাদ্দ করতে হয়। আমরা দিচ্ছি ২ শতাংশ। বাকি ২-৪ শতাংশ কোথায়? সেটা হয়তো অন্য কোনো ম্যাজিক বক্সে!
তবে আশার কথা—সরকার বলেছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষায় বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। মানে এখন যদি ২ শতাংশ হয়, ৫ শতাংশ করতে গেলে বাড়াতে হবে ১৫০%! সেটা কি সম্ভব? সময়ই বলে দেবে। কিন্তু বরাদ্দ বাড়লেই কি হয়? না। খরচের মান বদলাতে হবে। গত বছর উন্নয়ন বাজেটের ৫৩ শতাংশ অব্যবহৃত থেকে ফেরত গেছে! মানে টাকা আছে, কিন্তু খরচ করার ক্ষমতা নেই। এটা যেন পেটে খিদে, কিন্তু মুখে খাবার তুলে দিতে কসরত!
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ বলেছিল—"অ-সরকারি শিক্ষকদের জন্য শালীন জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা হবে"। ১৫ বছর পরে? অনেক শিক্ষক এখনো এমপিওভুক্ত হননি, বেতন পান না সময়মতো, আর প্রশিক্ষণের নামে বছরে এক-দুদিনের ওয়ার্কশপ—যেখানে চা-বiscuit খেয়েই সময় কাটে।
শিক্ষকদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ফিনল্যান্ডে শিক্ষক হতে হলে মাস্টার্স ডিগ্রি বাধ্যতামূলক, আর সপ্তাহের ৩০% সময় তারা পেশাগত উন্নয়নে ব্যয় করে। বাংলাদেশে? এখানে শিক্ষকতা পেশা অনেকের কাছে শেষ উপায়—বেকার না থেকে যদি কিছু করা যায়! আসলে, যে শিক্ষকের হাতে ভবিষ্যৎ, সেই শিক্ষকেরই যদি ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত—তা হলে কার হাতে দেশ?
৪) পাঠ্যক্রম বনাম বাস্তবতা
২০২৩ সালে বাংলাদেশ দক্ষতা-ভিত্তিক পাঠ্যক্রম চালু করেছে। ২০২৬ থেকে সেটা বাস্তবায়িত হবে। শুনতে ভালো লাগে—দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা—এই সব শব্দগুলো ফ্যাশনেবল।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—আমরা এখনো পরীক্ষামুখী শিক্ষা থেকে বের হতে পারিনি। কোচিং সেন্টার, গাইডবুক, প্রশ্নব্যাংক—এই তিন তীর্থে এখনো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ঘুরছে। শিক্ষার্থীরা জানে—মুখস্থ করতে পারলেই GPA-৫ পাওয়া যায়। আর GPA-৫ পেলে সমাজ তাকে মেধাবী বলে ডাকে। অথচ ওই শিক্ষার্থী যদি বাস্তব জীবনের কোনো সমস্যার সমাধান করতে বলে? তাহলে? 🤐
শিক্ষাক্রমে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভালো উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন—যে স্কুলে বাংলা-ইংরেজি ভালোভাবে পড়ানো হয় না, সেখানে তৃতীয় ভাষা দিয়ে কী হবে? এটা যেন দশতলা বাড়ি বানাতে গিয়ে ভিত্তিটাই না মজবুত করা!
৫) PISA-র অভাবে কী হয়?
বাংলাদেশ PISA-তে অংশ নেয় না। PISA হলো বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিক্ষা মূল্যায়ন—যেখানে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়া, গণিত ও বিজ্ঞানে পারফরম্যান্স যাচাই করা হয়। বাংলাদেশ কেন অংশ নেয় না? খরচের কথা বলা হয়—প্রায় ৯১ লক্ষ টাকা বার্ষিক। ৯১ লক্ষ টাকা! যেখানে শিক্ষা বাজেট ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা—সেখানে ৯১ লক্ষ টাকা নগণ্য। অথচ এই টাকা খরচ করলে আমরা জানতে পারতাম—আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের কোথায় দাঁড়ায়।
পাশের দেশ ফিলিপাইন PISA-তে অংশ নিয়ে খারাপ ফল করেও সেটা স্বীকার করেছে, আর সংস্কারের পথ খুঁজেছে। কম্বোডিয়া ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে তিনটি বিষয়েই পারফরম্যান্স বাড়িয়েছে। তারা ফল দেখে ব্যবস্থা নিয়েছে। আমরা ফল দেখতে চাই না—কারণ ফল দেখলে হয়তো লজ্জা পেতে হবে! এবার আরেকটু পরিাস্কার করি, আসলে পিসা কী?
৫.১) PISA: বিশ্বের আয়নায় শিক্ষার মান মাপার পরীক্ষাগার
আজকের বিশ্বে একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য কেবল কতজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় পাস করল বা কতজন জিপিএ–৫ পেল—তা দিয়ে আর বিচার করা হয় না। বরং দেখা হয়, একজন ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান করতে পারে কি না, তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে কি না, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না এবং নতুন পরিস্থিতিতে শেখা জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারে কি না। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই Organisation for Economic Co-operation and Development (OECD) ২০০০ সাল থেকে পরিচালনা করছে Programme for International Student Assessment (PISA)। প্রতি তিন বছর অন্তর অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের গণিত, পাঠদক্ষতা (Reading Literacy) এবং বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা (Scientific Literacy) মূল্যায়ন করা হয়। পাশাপাশি প্রতিটি চক্রে একটি নতুন বা উদ্ভাবনী দক্ষতার ক্ষেত্রও যুক্ত করা হয়। ২০২২ সালে সেই ক্ষেত্র ছিল Creative Thinking, আর ২০২৫ সালের মূল্যায়নে প্রধান গুরুত্ব পাবে বিজ্ঞান, পাশাপাশি Learning in the Digital World বা ডিজিটাল বিশ্বে শেখার সক্ষমতাও মূল্যায়িত হবে। বর্তমানে ৮০টিরও বেশি দেশ ও অর্থনীতি এই মূল্যায়নে অংশ নেয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, PISA কোনো শিক্ষার্থীর মুখস্থ জ্ঞান বা পাঠ্যবইয়ের তথ্য যাচাই করে না; বরং সে বাস্তব জীবনের জটিল পরিস্থিতিতে তার জ্ঞান, দক্ষতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে, সেটিই পরিমাপ করে। ফলাফল ব্যক্তিগত শিক্ষার্থী বা বিদ্যালয়ের জন্য প্রকাশ করা হয় না; বরং জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রকাশিত হয়, যাতে সরকার, শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের শিক্ষাব্যবস্থার শক্তি ও দুর্বলতা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মূল্যায়ন করে প্রমাণভিত্তিক সংস্কারের পথ নির্ধারণ করতে পারেন। এই কারণেই PISA আজ শুধু একটি আন্তর্জাতিক পরীক্ষা নয়; এটি শিক্ষা নীতি, শিক্ষা সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থাগুলোর একটি।
কোনো রাষ্ট্র যখন বলে—"আমরা শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি", তখন প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত: কাগজে, নাকি শ্রেণিকক্ষে?
২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১ লক্ষ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। সংখ্যাটি শুনতে বিশাল। সংবাদ সম্মেলনে করতালির মতোই বড়। কিন্তু পরিসংখ্যানের আরেকটি ভাষা আছে, যা সংখ্যাকে প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে শেখায়। সেই ভাষা বলছে—এই বরাদ্দও দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র প্রায় ২ শতাংশ। অথচ ইউনেস্কো বহু বছর ধরে সুপারিশ করে আসছে, একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ হওয়া উচিত জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, আমরা যেন এমন এক ছাত্র, যে পরীক্ষায় ৩৩ পেয়ে পাশ করেছে, কিন্তু নিজেই নিজেকে ৯০ পাওয়ার অভিনন্দন জানাচ্ছে।
সংস্কারের প্রথম শর্ত হলো—নিজের অবস্থান সম্পর্কে সৎ হওয়া। গত অর্থবছরে শিক্ষায় বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা, যা ছিল জিডিপির মাত্র ১.৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থের পরিমাণ বেড়েছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—বিনিয়োগের দর্শন কি বদলেছে? বেশি টাকা মানেই কি ভালো শিক্ষা? নাকি পুরোনো ব্যবস্থার ওপর আরও নতুন রঙের প্রলেপ? সংস্কারের আলোচনায় আমরা প্রায়ই টাকার হিসাব করি; কিন্তু টাকার গন্তব্যের হিসাব করি না।
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার সমাপ্তির হার এখন ৮৪ শতাংশ। সংখ্যাটি আশাব্যঞ্জক। কিন্তু একই শিশু যখন মাধ্যমিকে পৌঁছায়, তখন চিত্রটি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। মাধ্যমিক সম্পন্ন করতে পারে মাত্র ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ, প্রতি একশো শিশুর মধ্যে যারা আনন্দের সঙ্গে প্রথম শ্রেণিতে বই হাতে বিদ্যালয়ে ঢুকেছিল, তাদের অর্ধেকেরও বেশি মাঝপথে কোথাও হারিয়ে যায়। তারা কোথায় যায়?
কেউ অর্থনৈতিক সংকটে শ্রমবাজারে। কেউ অল্প বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে। কেউ কোচিং আর পরীক্ষাভিত্তিক চাপে ক্লান্ত হয়ে। কেউ আবার এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থায়, যেখানে তার শেখার আনন্দের চেয়ে পরীক্ষার নম্বর বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাহলে কি সংস্কার শুধু বই বদলানোর বিষয়? নাকি সেই পথটাকেও বদলানো দরকার, যেখানে শিশু প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত হাঁটে?
উপরের অভিজ্ঞতা থেকে বলাই যায়, "যে শিক্ষা শিশুকে বিদ্যালয়ে আনতে পারে, কিন্তু বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে পারে না—সেই শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এখনো অসম্পূর্ণ।"
২০০৫ সালে প্রাথমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ছিল ৪৭.২ শতাংশ। এক দশক পরে, ২০১৫ সালে তা নেমে এসেছে ২০.৪ শতাংশে। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু এখানেই একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রশ্ন জেগে ওঠে—বিদ্যালয়ে থাকা আর শেখা—এই দুটো কি একই বিষয়?
আজ অনেক শিশু বিদ্যালয়ে আছে, কিন্তু তারা কি সত্যিই শিখছে? তারা কি পড়া বুঝে? তারা কি প্রশ্ন করতে পারে? তারা কি যুক্তি দিয়ে ভাবতে পারে? তারা কি দলবদ্ধভাবে সমস্যা সমাধান করতে পারে? আসলে সংস্কারের প্রকৃত পরীক্ষা উপস্থিতির খাতায় নয়; শেখার গভীরতায়। ভবিষ্যতের নাগরিক তৈরির সফলতায়। পরীক্ষায় নয়, জীবনে ভালো মানুষ হয়ে ওঠার সফলতায়।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখন শিক্ষার গুণগত মান যাচাই করে PISA (Programme for International Student Assessment)-এর মতো আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের মাধ্যমে। সেখানে শুধু মুখস্থ বিদ্যা নয়; দেখা হয়—
বাংলাদেশ এখনো এই মূল্যায়নে অংশগ্রহণ করেনি। অর্থাৎ আমরা এখনো জানিই না, আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের সমবয়সী শিক্ষার্থীদের তুলনায় কোথায় দাঁড়িয়ে। এ যেন ক্রিকেট না খেলেই নিজেদের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করার মতো।
শিক্ষা সংস্কারে বাধা অনেক। কয়েকটা প্রধান বাধা—
প্রতিটি শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার কথা শিক্ষক। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষক উন্নয়নের প্রশ্নটি প্রায়ই আলোচনার শেষ পাতায় চলে যায়। নতুন বই আসে। নতুন কারিকুলাম আসে। নতুন পরীক্ষানীতি আসে। নতুন স্লোগান আসে। কিন্তু শিক্ষক কি সেই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?
যদি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন, গবেষণা, প্রযুক্তি ব্যবহার, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষাদর্শে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হয়, তবে নতুন কারিকুলামও পুরোনো অভ্যাসের বন্দি হয়ে যায়। কারণ, পাঠ্যবই পরিবর্তন করা সহজ; শ্রেণিকক্ষের সংস্কৃতি পরিবর্তন করা কঠিন।
দুপুরের শেষ ক্লাস। ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে লিখতে লিখতে শিক্ষক একটু থামলেন। জানালার বাইরে খেলছে কয়েকটি শিশু। ভিতরে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের দিকে তাকিয়ে তিনি মৃদু হেসে বললেন—
"আমি পনেরো বছর ধরে স্কুলে পড়াই। প্রতি বছর নতুন বই আসে, নতুন নীতি আসে। কিন্তু আমার বেতন বাড়ে না, আমার প্রশিক্ষণ বাড়ে না, আমার সম্মান বাড়ে না। শিক্ষার্থীরা এখনো মুখস্থ করে পাস করে। আমি পরিবর্তন চাই—কিন্তু সেই পরিবর্তন কীভাবে আনতে হবে, কে বলবে? আমরা শিক্ষকরা নীতি বানাই না; আমরা শুধু বাস্তবায়ন করি। আর যে নীতি বাস্তবায়নযোগ্য নয়, সেটা বাস্তবায়ন করাও যায় না।"
এই কথাগুলো শুধু একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত হতাশা নয়। এটি বাংলাদেশের হাজারো শ্রেণিকক্ষের প্রতিধ্বনি। যেখানে শিক্ষক পরিবর্তনের শত্রু নন; বরং পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। কিন্তু তাঁকেই অনেক সময় পরিবর্তনের পরিকল্পনা থেকে সবচেয়ে দূরে রাখা হয়। শিক্ষা সংস্কারের নাটকে শিক্ষক যেন প্রধান চরিত্র, কিন্তু চিত্রনাট্য লেখার সময় তাঁর জন্য কোনো আসন রাখা হয় না।
বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের আলোচনা শুরু হলেই প্রথমে চোখে পড়ে নতুন বই, নতুন কারিকুলাম, নতুন স্লোগান, নতুন কমিটি এবং নতুন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সংবাদপত্রের শিরোনাম বদলায়, মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপনা বদলায়, এমনকি বইয়ের প্রচ্ছদও বদলায়। কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যায়—শ্রেণিকক্ষ কি বদলায়? একটি শিশুর শেখার আনন্দ, একজন শিক্ষকের আত্মবিশ্বাস, একজন অভিভাবকের আস্থা এবং একটি বিদ্যালয়ের শেখার সংস্কৃতি—এসব কি সত্যিই পরিবর্তিত হয়?
অনেক সময় আমাদের সংস্কার যেন বাড়ির রং পরিবর্তনের মতো। দেয়াল চকচকে হয়, কিন্তু ভিতরের ফাটল রয়ে যায়। শিক্ষাব্যবস্থাও তেমনই—কাঠামো একই থাকে, কেবল ভাষা বদলায়; সমস্যা একই থাকে, শুধু প্রকল্পের নাম বদলায়। কারণ, শিক্ষা সংস্কার কেবল নতুন বই ছাপানোর প্রকল্প নয়; এটি মানুষ গড়ার দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রদর্শন।
একটি রাষ্ট্র যদি সত্যিই শিক্ষা সংস্কার করতে চায়, তবে তাকে প্রথমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—সে কি পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া নাগরিক তৈরি করতে চায়, নাকি যুক্তিবাদী, নৈতিক, সৃজনশীল ও মানবিক মানুষ গড়ে তুলতে চায়? এই প্রশ্নের উত্তর না বদলালে বই বদলালেও শিক্ষা বদলায় না। তাই বলা হয়ে থাকে, সংস্কারের সবচেয়ে বড় শত্রু—সংস্কার করার ভান!, হঠাৎ নীতি নির্ধারণে পৌছে আকাশ কুসুম সব একসাথে চিন্তা করা আর একদিনেই সব ঠিক করে ফেলার প্রয়াস!
প্রতিটি শিক্ষা সংস্কারের সফলতা বা ব্যর্থতার শেষ ঠিকানা হলো শ্রেণিকক্ষ। আর সেই শ্রেণিকক্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন শিক্ষক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, নীতি প্রণয়নের টেবিলে যাঁদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, অনেক সময় তাঁরাই সবচেয়ে কম উপস্থিত থাকেন।
ঢাকায় নীতি লেখা হয়, জেলা পর্যায়ে নির্দেশনা যায়, বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণহীন শিক্ষক সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেন। ব্যর্থ হলে সমালোচনা হয় শিক্ষকের; সফল হলে কৃতিত্ব যায় নীতিনির্ধারকের।
এ যেন নাটকের প্রধান অভিনেতাকে মহড়ায় ডাকাই হলো না, অথচ প্রথম প্রদর্শনীর দিন তাঁর অভিনয়ের বিচার করা হচ্ছে। তাই সত্যটি নির্মম হলেও স্পষ্ট— যে রাষ্ট্র শিক্ষককে পরিবর্তনের অংশীদার বানায় না, সে শেষ পর্যন্ত পরিবর্তনের পোস্টার ছাপায়—পরিবর্তন নয়।
শিক্ষককে যদি কেবল নির্দেশ পালনের কর্মচারী হিসেবে দেখা হয়, তবে শিক্ষা কখনোই জীবন্ত হয়ে উঠবে না। একজন অনুপ্রাণিত শিক্ষক শত নীতিপত্রের চেয়ে শক্তিশালী; আর একজন অবহেলিত শিক্ষক শত সংস্কারকেও নিষ্প্রাণ করে দিতে পারেন।
প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার পর বড় বড় অঙ্ক সংবাদ শিরোনাম হয়। হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ দেখে মনে হয় শিক্ষা বুঝি নতুন যুগে প্রবেশ করছে। কিন্তু বাজেট একটি উপায়, লক্ষ্য নয়। যদি সেই অর্থের বড় অংশ প্রশাসনিক ব্যয়ে শেষ হয়, যদি শিক্ষক প্রশিক্ষণ সীমিত থাকে, যদি বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার তালাবদ্ধ থাকে, যদি শিশুরা এখনো মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাস করে, তবে সেই বাজেটের গৌরব কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা-পরিসংখ্যান হলো—
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না বদলালে বাজেটের অঙ্ক যতই বাড়ুক, সংস্কারের গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কারণ—সংস্কারের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বাজেট কত নয়; বরং প্রতিটি টাকার বিনিময়ে একটি শিশুর শেখা কতটা বদলালো।
এই দেশগুলোর সাফল্যের মূলমন্ত্র—ধারাবাহিকতা, বিনিয়োগ, ও প্রমাণভিত্তিক নীতি। আমরা যদি শিখতে চাই, তাহলে শিখতে হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে—অনুকরণ নয়, প্রাসঙ্গিক রূপান্তর করতে হবে।
শিক্ষা সংস্কার কোনো জাদুমন্ত্র নয়। এটা কঠিন, সময়সাপেক্ষ, আর বেদনাদায়ক প্রক্রিয়া। কিন্তু এটা না করলে আমাদের ভবিষ্যত—রিমা, নয়ন, আর লক্ষাধিক শিক্ষার্থী—পিছিয়ে পড়বে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অর্জন অস্বীকার করার উপায় নেই—সাক্ষরতা বেড়েছে, মেয়েদের অংশগ্রহণ বেড়েছে, স্কুলের সংখ্যা বেড়েছে। কিন্তু মান, দক্ষতা, অন্তর্ভুক্তি—এই তিনটি এখনো স্বপ্ন।
সংস্কার করতে হলে প্রথমে স্বীকার করতে হবে—আমরা সমস্যায় আছি। তারপর প্রমাণভিত্তিক নীতি, ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—রাজনৈতিক ইচ্ছা। নইলে আমাদের অবস্থা হবে ওই শিক্ষার্থীর মতো—যে শাপলা-কাঁঠাল মুখস্থ করে, অথচ চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্ন আসে ডেটা সায়েন্সের!
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি নতুন পাঠ্যবই, নতুন কারিকুলাম বা নতুন কমিশনের নয়; প্রশ্নটি আমাদের রাষ্ট্রদর্শনের। আমরা কি এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যেখানে শিশুর সাফল্য মুখস্থ উত্তরের সংখ্যায় মাপা হবে, নাকি এমন একটি সমাজ গড়তে চাই, যেখানে শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিতে, সহমর্মী হতে, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে এবং পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে শেখায়? এই ফিচারের প্রতিটি ব্যঙ্গ, প্রতিটি রূপক এবং প্রতিটি পরিসংখ্যান শেষ পর্যন্ত একটি কথাই মনে করিয়ে দেয়—সংস্কার কোনো একদিনের ঘোষণাপত্র নয়; এটি একটি দীর্ঘ, ধারাবাহিক, প্রমাণভিত্তিক এবং অংশগ্রহণমূলক সামাজিক চুক্তি।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে—ভর্তি বেড়েছে, সাক্ষরতা বেড়েছে, অবকাঠামো বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে শেখার মান, শিক্ষক উন্নয়ন, নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং ভবিষ্যৎ দক্ষতা গঠনের প্রশ্নগুলো এখনো আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাই শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় সাহস হবে সমস্যাকে অস্বীকার না করে তাকে স্বীকার করা; আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শেখা, কিন্তু অন্ধ অনুকরণ না করা; এবং শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সমাজকে একসঙ্গে নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় অঙ্গীকার গড়ে তোলা।
হয়তো একদিন কোনো রিমাকে আর শাপলা-কাঁঠাল মুখস্থ করতে করতে হঠাৎ চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে আতঙ্কিত হতে হবে না। কারণ তখন তার শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য নয়, জীবনকে বুঝতে, সমাজকে বদলাতে এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে তাকে প্রস্তুত করবে। সেই দিনই আমরা বলতে পারব—বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের নাটক শেষ হয়েছে; শুরু হয়েছে প্রকৃত শিক্ষা সংস্কার।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব রহমান (লিটু), উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শিক্ষা_সংস্কার #বাংলাদেশের_শিক্ষা #শিক্ষানীতি #PISA#বাংলাদেশ #অধিকারপত্র #শিক্ষাব্যবস্থা #শিক্ষক #পাঠ্যক্রম #PISA #UNESCO #PolicyAnalysis #EvidenceBasedPolicy #LearningOutcomes #TeacherDevelopment #CurriculumReform #PublicPolicy #QualityEducation #FutureOfEducation #CriticalThinking #EducationGovernance #EducationPolicy #EducationResearch #BangladeshEducation #অধিকারপত্র_শিক্ষা_সংস্কার #সংস্কারের_বিতর্ক #মানসম্মত_শিক্ষা #জাতিগঠন #শিক্ষাবিদ #ResearchBasedJournalism