01/28/2026 বদলে যাওয়া ভোটের হাওয়া: রাজনীতির খতিয়ান ও বাঙালির ‘নির্বাচন বিলাস’এবং বাঙালির ভোট–সংস্কৃতির নতুন গণিত
Dr Mahbub
২৮ January ২০২৬ ০৮:৩৪
আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে এই রম্য ধাঁচের ফিচার কলামে বদলে যাওয়া নির্বাচন সংস্কৃতির বাস্তবতার একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ, যা সমাজের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে। আসলেই বদলে যাওয়া ভোটের আবহে বাঙালির রাজনীতি আজ যেন এক অভিনব নাট্যমঞ্চ। যেখানে একসময় নির্বাচন মানেই ছিল আদর্শের লড়াই, আজ সেখানে জায়গা করে নিয়েছে ব্যবসায়িক লাভ–লোকসানের হিসাব, ভুঁইফোড় দলে ভরা রাজনীতির সার্কাস, আর পারিবারিক মনোনয়ন প্রতিযোগিতা। এই বিশেষ রম্য–ব্যঙ্গধর্মী ফিচারটি তুলে ধরে আমাদের নির্বাচন সংস্কৃতির সেই পরিবর্তনশীল চেহারা—যেখানে ক্ষমতার টান জিতে যায় নীতির ওপরে, প্রচারের মাঠ ভরে ওঠে ভাড়াটে কর্মীতে, আর তৃণমূলের ত্যাগী কর্মীরা হারিয়ে যান ‘বসন্তের কোকিলদের’ চিৎকারে। তাই এখন নিজেকে প্রশ্ন করার সময় এসেছে—এই বদলে যাওয়া নির্বাচন কি আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা খুলছে, নাকি ইতিহাসের আরেকটি ট্র্যাজেডির দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
এই রচনা সম্পূর্ণ ব্যঙ্গ–ব্যঙ্গাত্মক ও রম্যধর্মী; এতে বর্ণিত কোনো চরিত্র, বক্তব্য বা পরিস্থিতিকে বাস্তব ব্যক্তি বা ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা অনুচিত। এটি কেবল সামাজিক–রাজনৈতিক প্রবণতার স্যাটায়ারিক উপস্থাপনা। আসলে লেখাটি ব্যঙ্গ ও রম্যের শিল্পভাষায় রচিত; কারো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা উদ্দেশ্য নয়। সমস্ত বিশ্লেষণ পরিস্থিতিনির্ভর, লেখকের ব্যক্তিগত মতমাত্র।
বাঙালির নতুন নির্বাচনী সংস্কৃতি
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। কিন্তু সব পার্বণকে ছাপিয়ে যখন ‘ভোটের’ আমেজ আসে, তখন গ্রাম-বাংলার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে শহরের ড্রয়িংরুম পর্যন্ত সবখানে যেন এক অন্যরকম বিদ্যুতিক তরঙ্গ প্রবাহিত হয়। তবে সময় বদলেছে। যে বাঙালির নির্বাচনে এককালে ত্যাগের মহিমা আর আদর্শের লড়াই মুখ্য ছিল, সেখানে আজ জায়গা করে নিয়েছে ‘ব্যবসায়িক লজিক’ আর ‘করপোরেট ব্র্যান্ডিং’। আগে রাজনীতি ছিল সাধনা, এখন তা অনেকটা লাভজনক ইনভেস্টমেন্ট। আসুন, আজকের এই বিশেষ কলামে দেখে নেওয়া যাক, কীভাবে সময়ের স্রোতে আমাদের প্রিয় নির্বাচনগুলো তার খোলস বদলে এক নতুন রূপে হাজির হয়েছে।
এক সময় নিয়ম ছিল বড় বড় ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদের পেছনে ছায়ার মতো থাকতেন। তাঁরা টাকা দিতেন, রসদ জোগাতেন আর বিনিময়ে নির্বাচনের পর একটু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নিতেন। কিন্তু ব্যবসায়ীরা এক সময় মাথা চুলকে ভাবলেন, “আরে! আমি হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে টাকা ইনভেস্ট করছি মফিজ সাহেবকে জেতাতে, আর জেতার পর মফিজ সাহেব আমার দিকেই বাঁকা চোখে তাকাচ্ছেন। তার চেয়ে সেই টাকাটা নিজের ওপর ইনভেস্ট করলেই তো হয়!”
ব্যাস, অমনি রাজনীতির ময়দান হয়ে গেল স্টক এক্সচেঞ্জ। এবারের নির্বাচনী হলফনামাগুলো ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রার্থীদের পেশার কলামে ‘ব্যবসায়ী’ পরিচয়টি যেন এখন আভিজাত্যের সিলমোহর। শতকরা হিসেবে তা যে কত বিশাল, তা দেখে পরিসংখ্যানবিদরাও হোঁচট খান। কেন হবে না? ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে নির্বাচন এখন আর স্রেফ সেবা নয়, বরং এটি একটি ‘মেগা প্রজেক্ট’। কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রচার করাটা এখন ‘কস্ট অব ইনভেস্টমেন্ট’। পাস করার পর সেই টাকাটা সুদে-আসলে তুলে নেওয়াটাই যেন এখন অলিখিত নিয়ম। আগে নেতা হওয়া মানে ছিল সম্পদ বিলিয়ে দেওয়া, আর এখন নেতা হওয়া মানে হলো সম্পদ দ্বিগুণ-ত্রিগুণ করার লাইসেন্স পাওয়া।
নির্বাচনীফয়েড ও পারিবারিক সংকট
এরই মাঝে সমাজে এক নতুন ও মারাত্মক ব্যাধি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে না পাওয়া গেলেও রাজনীতির অভিধানে আমরা বলতে পারি ‘নির্বাচনীফয়েড’। এই রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এখন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এদের বড় অংশই আসলে জয়ের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতে নিজের বায়োডাটা ভারী করার জন্য এবং লোকদেখানো আভিজাত্যের লোভে ইলেকশনে নাম লেখাচ্ছেন। পাড়া-মহল্লায় বা বিয়ের দাওয়াতে নিজের পরিচয় দিতে পারবেন— ‘আমি অমুক নির্বাচনে এমপি পদপ্রার্থী ছিলাম’। এই ‘সাবেক প্রার্থী’ তকমাটি গায়ে লাগিয়ে পরবর্তী পাঁচ বছর নানাবিধ তদ্বির আর ধান্দাবাজির পথ প্রশস্ত করাই এদের আসল উদ্দেশ্য।
এই রোগের সংক্রমণ এতটাই তীব্র যে, তা এখন বাঙালির চিরায়ত পারিবারিক বন্ধনকেও তছনছ করে দিচ্ছে। ঘরের অন্দরমহলের আদর্শিক দেয়ালগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। তাই তো এবার এমন আজব সব দৃশ্য দেখা যাচ্ছে যা আগে কল্পনাও করা যেত না— টগবগে তরুণ ছেলে এক দল থেকে প্রার্থী হয়ে মাঠ কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে, আর তাঁরই অভিজ্ঞ বৃদ্ধ বাবা ছেলের সেই কথিত আদর্শকে থোড়াই কেয়ার করে প্রকাশ্য জনসভায় ছেলের বিপক্ষ দলের হয়ে ভোট চাচ্ছেন। রক্তের সম্পর্কের চেয়েও যখন গদি আর প্রতীকের সম্পর্ক বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন বুঝতে হবে রাজনীতির এই ‘নির্বাচনীফয়েড’ আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধের হাড়-মাংস সব চিবিয়ে খেতে শুরু করেছে।
আগে রাজনীতির মাঠে দলের আদর্শ ছিল হিমালয়ের মতো অটল। কর্মীরা বলতেন, “আমার নেতা যে-ই হোক, মার্কা আমাদের বড় পরিচয়।” কিন্তু এবারের দৃশ্যপট দেখে মনে হচ্ছে, দলের আদর্শ এখন সিজনাল ফলের মতো। এমপি হওয়ার স্বাদ আর ক্ষমতার মধু চেটে দেখার জন্য অনেক নিবন্ধিত বড় বড় রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতারা যেন রাতারাতি জাদুর মন্ত্রে বদলে যাচ্ছেন।
নিজের এত দিনের পরিচয়, নিজের হাতে গড়া দল ‘টা-টা বাই-বাই’ বলে অবলীলায় অন্য দলের প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এটা যেন অনেকটা এক ক্লাবের খেলোয়াড় ট্রান্সফার উইন্ডোতে অন্য ক্লাবে চলে যাওয়ার মতো। তবে এখানে গোল করার চেয়ে গদিতে বসার আকুতিই বেশি। এই দলবদল আর প্রতীক বদলের মহোৎসব সাধারণ ভোটারদের এই বার্তাই দেয় যে—আজকের রাজনীতিতে ‘আদর্শ’ বলে কিছু নেই, আসল হলো ‘এমপি’ হওয়া। লাল বাতিওয়ালা গাড়ি আর ক্ষমতার স্বাদ পেতে হলে নিজের আদর্শের শার্টটি খুলে অন্যের দেওয়া চাদর গায়ে জড়াতেও এখন আর কেউ লজ্জা পায় না।
বৃষ্টির পর যেমন ঘাসের ওপর মাশরুম গজে ওঠে, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে তেমনি আমাদের দেশে হরেক রকমের রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। এদের নাম আগে কেউ শোনেনি, এদের কোনো অফিস আছে কি না তাও কেউ জানে না। অথচ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর দেখা যায় এদের সরব উপস্থিতি। এদের আমরা আদর করে বলি ‘ভুঁইফোড় দল’।
এই দলগুলোর মূলত তিনটি কাজ থাকে। এক—বড় দলের ডামি হিসেবে কাজ করা। দুই—টেলিভিশনের টকশোতে এসে নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়া। আর তিন—ভোটের বাজারে নিজের একটু দরদাম বাড়িয়ে নেওয়া। এদের ইশতেহার দেখলে মনে হবে তারা দেশটাকে এক রাতে সিঙ্গাপুর বানিয়ে ফেলবে, অথচ বাস্তবতা হলো এদের নিজের বাড়ির লোকজনও হয়তো এদের দলের নাম ঠিকমতো বলতে পারবে না। এই ভুঁইফোড় দলগুলোর উপস্থিতি নির্বাচনকে যেমন হাস্যকর করে তুলছে, তেমনি রাজনীতির সিরিয়াসনেসকেও ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে।
আগেকার নির্বাচনে প্রচার হতো উৎসবের মতো। পাড়ার বেকার ছেলেরা নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে আঠা দিয়ে পোস্টার লাগাত। প্রার্থীর জন্য এক গ্লাস পানি খেয়ে মাইকিং করত। ওটার নাম ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা। কিন্তু এখন সেই চিত্র যেন মিউজিয়ামে চলে গেছে।
এখন সব কিছু ‘পেইড’। ঘণ্টার হিসেবে টাকা দিলে স্লোগান দেয়, টাকা ফুরোলে স্লোগানও বন্ধ। সমাবেশের ভিড় দেখে এখন আর প্রার্থীর জনপ্রিয়তা বোঝার উপায় নেই। ট্রাকে করে মানুষ ভাড়া করে আনা হয় জেলা-উপজেলা থেকে। সাথে থাকে প্যাকেটজাত বিরিয়ানি আর হাতে কিছু কড়কড়ে নোট। সমাবেশে মানুষ বেশি হলে প্রার্থীর মহত্ত্ব জাহির করা সহজ হয়, কিন্তু সেই ভিড়ের মাঝে কতজন প্রকৃত ভোটার আর কতজন ভাড়ার মানুষ—তা কেবল প্রার্থীর হিসাবরক্ষকই জানেন। মানুষের হৃদয়ের চেয়ে পকেটের গরমটাই এখন প্রচারের মূল জ্বালানি।
মনে পরে যায় সেই গান, কত রঙ দেখাইলিরে প্রভু। কেননা দেখলাম, নির্বাচনে প্রাথিৃতা সকালে বাতিল, বিকেলে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার জাদুকরী ম্যাজিক। তাই এবারের নির্বাচনে তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে এইবারের নির্বাচনে এক অদ্ভুত ‘ম্যাজিক শো’ বা সার্কাসের দৃশ্য বারবার মঞ্চস্থ হতে দেখা যাচ্ছে, যা সচেতন নাগরিকদের কপালে গভীর চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সাধারণ মানুষের মনে হচ্ছে, রাজনীতির প্রকাশ্য মঞ্চের বাইরে পর্দার আড়ালে বসে কোনো এক ‘মাস্টার অফ দ্য রিং’ অদৃশ্য সুতোর টানে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন। সকালে কোনো এক অঘোষিত গর্জনে প্রার্থীতালিকা থেকে প্রভাবশালী নেতার নাম বাতিল হয়ে যাচ্ছে, আবার বিকেলের চা খাওয়ার আগেই জাদুর মতো সেই প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া যাচ্ছে। এটি যেন এক অদ্ভুত গোলকধাঁধা! নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত যেন এখন লটারি বা জুয়া খেলার মতো অনিশ্চিত—কেউ কারো সিদ্ধান্তে এক ঘণ্টার বেশি অটল থাকতে পারছেন না। এই যে ‘সকালে এক আর বিকেলে আরেক’ নীতি, এটি আসলে কোনো রাজনৈতিক রণকৌশল নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত সার্কাস; যেখানে সাধারণ মানুষ কেবলই দর্শক, আর মূল সিদ্ধান্তগুলো গৃহিত হচ্ছে কোনো এক অদৃশ্য আঁধার ঘরে।
জোটের যাঁতাকলে ত্যাগীদের বিদায় ও বসন্তের কোকিলদের জয়জয়াগান
নির্বাচনের এই আধুনিক সার্কাসে সবচেয়ে করুণ দৃশ্যটি দেখা যায় যখন ‘বসন্তের কোকিল’ আর ‘জোটের সমীকরণ’ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এককালে রাজনীতিতে নিয়ম ছিল—যে নেতা বছরের পর বছর রাজপথের ধুলো মেখেছেন, কর্মীদের আগলে রেখেছেন আর জেল-জুলুমের বিষে নীল হয়েছেন, মনোনয়নের সময় দল তাঁকেই সবার আগে মনে রাখবে। কিন্তু এবারের ধারা যেন এক নিষ্ঠুর পরিহাস। দেখা যাচ্ছে, যারা সারাবছর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে আয়েশ করেছেন কিংবা রাজনীতির ত্রিসীমানায় যাদের দেখা মেলেনি, ভোটের মৌসুম আসতেই তারা টাকার থলি নিয়ে হাজির হয়েছেন। দলগুলোও যেন আদর্শের ওজন না মেপে টাকার ওজন মাপতে বেশি ব্যস্ত; ফলে ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে ‘মনোনয়ন’ নামক সোনার হরিণ তুলে দেওয়া হচ্ছে সেইসব বসন্তের কোকিলদের হাতে, যাঁদের একমাত্র পুঁজি হলো কাড়ি কাড়ি অর্থ।
এর সাথে যোগ হয়েছে তথাকথিত ‘জোট রাজনীতির’ যাঁতাকল। দীর্ঘদিন ধরে যে এলাকায় একজন দলীয় নেতা নিজের রক্ত-ঘাম এক করে সংগঠন দাঁড় করিয়েছেন, কর্মীদের মনে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছেন, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে তাঁকে হুট করে বলে দেওয়া হচ্ছে— “সরি ভাই, জোট রক্ষার খাতিরে এই আসনটি অন্য দলকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।” ফলে সেই মাঠের নেতা এবং তাঁর শত শত কর্মীর মনোবল এক নিমিষেই চুরমার হয়ে যাচ্ছে। যাকে সারাজীবন আদর্শিক শত্রু বলে স্লোগান দিল, জোটের মারপ্যাঁচে এখন তাঁকেই ‘বসন্তের কোকিল’ হিসেবে বরণ করে নিতে হচ্ছে। এই যে ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন আর জোটের নামে দলীয় কর্মীদের আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি—এটি আসলে দীর্ঘমেয়াদে রাজনীতিকে একটি মরুভূমিতে পরিণত করছে, যেখানে নিষ্ঠাবান কর্মীরা এখন শুধুই দীর্ঘশ্বাসের কারিগর।
পারিবারিক মনোনয়নের নতুন দিগন্ত
এবার মাঠের রাজনীতি করা ত্যাগী মহিলারা দলের কাছে হয়েছেন অপাংতেয়। সার্বিকভাবে নির্বাচনে বিভিন্ন দলের নারী নমিনেশন দেখে মনে হয়েছে, এ যেনো ড্রয়িংরুমের গিন্নীদের রাজপথে নামানোর ‘প্যাকেজ’ রাজনীতি। সবশেষে নির্বাচনের এই আধুনিক রেসিপিতে যে নতুন এবং সবচেয়ে চমকপ্রদ মসলাটি যোগ হয়েছে, তা হলো—‘ইনডোর মনোনয়ন’। আগে রাজনৈতিক দলগুলোর নারী প্রার্থীদের জন্য নিয়ম ছিল রাজপথের লড়াই, মিছিল-মিটিং আর জেল-জুলুম সহ্য করে উঠে আসা। কিন্তু এবারের ধারা একদম ভিন্ন এবং অদ্ভুত। এখন রাজনীতির মাঠের পোড়খাওয়া নেত্রীদের চেয়েও ড্রয়িংরুমের গিন্নীদের কদর যেন বহুগুণ বেড়ে গেছে। মনোনয়ন এখন আর রাজনৈতিক ত্যাগের ওপর নির্ভর করছে না, বরং তা নির্ভর করছে ‘পারিবারিক প্যাকেজের’ ওপর।
দেখা যাচ্ছে, স্বামী বড় নেতা কিংবা ভাই প্রভাবশালী মন্ত্রী—ব্যস, এটুকুই প্রার্থী হওয়ার জন্য যথেষ্ট যোগ্যতা। যিনি জীবনে কোনোদিন মিছিলে যাননি, রোদে পুড়ে স্লোগান দেননি কিংবা রাজনীতির ‘র’ টুকুও যাদের অভিধানে ছিল না, রাতারাতি তাঁরাই হয়ে যাচ্ছেন ঝানু প্রার্থী। এই নারী প্রার্থীরা আসলে রাজনীতির মাঠের চেয়ে রান্নার ঘর বা পার্লারের তকমাতেই বেশি অভ্যস্ত ছিলেন, কিন্তু হঠাৎ ক্ষমতার স্বাদ আর পারিবারিক ইমেজের চাপে তাদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে ‘জনপ্রতিনিধি’র আলখেল্লা। ফলে রাজপথের সেই সাহসী নেত্রীদের জায়গা দখল করে নিয়েছেন পারিবারিক উত্তরাধিকারের মোহগ্রস্ত নতুন এক ঘরানা। এটি কেবল রাজনীতির গুণগত মানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং সাধারণ কর্মীদের মনেও দীর্ঘশ্বাসের এক গভীর মেঘ জমিয়ে দিচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো ভোটারের রুচি ও বিশ্লেষণের পরিবর্তন। আগে মানুষ প্রার্থীর ব্যাকগ্রাউন্ড বিশ্লেষণ করত। দেখত লোকটা উচ্চশিক্ষিত কি না, তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কেমন, সে কি সাত চড়ে রা কাটে না কি মানুষের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে? প্রার্থীর পারিবারিক ঐতিহ্য বা ‘হোম’ ছিল বড় ফ্যাক্টর।
আর এখন? ভোটাররা দেখেন প্রার্থীর ‘পাওয়ার’ বা পকেটের জোর কতটুকু। মার্কাটা পরিচিত কি না আর প্রার্থীর ‘কানেকশন’ ওপরতলায় কতদূর—এটাই এখন বড় বিবেচ্য বিষয়। প্রার্থী ব্যক্তিগত জীবনে কী করেন, তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। অনেকটা ‘যার লাঠি তার মাটি’ থিওরিতে ভোটাররা এখন সিদ্ধান্ত নেন। আদর্শবাদী কিন্তু অর্থহীন প্রার্থীর চেয়ে দাপুটে কিন্তু জনবিচ্ছিন্ন প্রার্থীই এখনকার বাজারে বেশি কাটতি পায়।
বর্তমান নির্বাচনের ধারায় আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো কর্মীদের আনুগত্যের ধরন। আগে কর্মীরা নেতার ভুল ধরতেন, দলের ভেতরে সমালোচনা হতো। আর এখন টিকে থাকার একমাত্র উপায় হলো ‘চাটুকারিতা’। নেতার প্রতিটি কথাকে বেদবাক্য মনে করা আর সোশ্যাল মিডিয়ায় নেতার স্তুতি গেয়ে পোস্ট দেওয়াই হলো এখনকার রাজনীতির বড় কাজ। এই যে পরিবর্তন, এটি আসলে সুস্থ ধারার রাজনীতির কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে।
সার্বিক প্রতিফলন: আমজনতার আবেগ ও তৃণমূলের বোবা কান্না
সবশেষে বড় সত্য এটাই যে, আজকের এই দ্রুতগতির যুগে মানুষ আর কোনো কিছু নিয়েই গভীরভাবে ভাবতে চায় না। আমরা এখন স্রেফ উত্তেজনার স্রোতে ভাসতে পছন্দ করি। পাঁচ বছরের একঘেয়েমি কাটাতে ভোট আমাদের কাছে এখন কেবলই একটা বিনোদন। অথচ এই বিনোদনের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে হাজারো মানুষের স্বপ্ন। যে আমজনতার আবেগ নিয়ে রাজনীতির এই বিশাল মঞ্চ সাজানো হয়, দিনশেষে সেই মানুষেরা কেবল দাবার ঘুঁটি হয়েই থেকে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো সেইসব তৃণমূল নেতাকর্মীদের জন্য, যাঁরা দল এবং নেতার জন্য নিজেদের জীবন-যৌবন, সহায়-সম্পদ সব উজাড় করে দিয়েছিলেন। আজ যখন টাকার থলি হাতে ‘বসন্তের কোকিল’রা এসে তাঁদের জায়গা দখল করে নেয়, কিংবা জোটের বলি হয়ে যখন তাঁদের আজীবনের লালিত স্বপ্নগুলো নিলামে ওঠে, তখন তাঁদের সেই আর্তনাদ কোনো মিডিয়ার হেডলাইন হয় না। ক্ষমতার এই চোখধাঁধানো রোশনাইয়ে তৃণমূলের সেই একনিষ্ঠ নিবেদিতপ্রাণ মানুষগুলোর বোবা কান্নায় আজ আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠছে। রাজনীতির এই বদলে যাওয়া ধারা হয়তো আধুনিকতার তকমা পাবে, কিন্তু যে হাহাকার রাজপথের ধুলোয় মিশে আছে, তার হিসাব কি কোনোদিন কোনো হলফনামায় লেখা থাকবে?
চূড়ান্ত প্রশ্ন: আমরা কোন পথে?
বাঙালির এই বদলে যাওয়া নির্বাচনের ধারা আমাদের এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রাজনীতি এখন আর কেবল মেহনতি মানুষের কথা বলে না, এটি এখন ক্ষমতার এক জটিল খেলা। যেখানে বড় ব্যবসায়ীরা খেলোয়াড়, আর সাধারণ মানুষ হলো গ্যালারিতে বসা দর্শক। যারা কেবল তালি বাজায় অথবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
তবুও বাঙালির রক্তে যেহেতু রাজনীতির নেশা, তাই হাজারো অসঙ্গতির মাঝেও মানুষ স্বপ্ন দেখে। কোনো এক ভোরে হয়তো আবার এমন এক নির্বাচন আসবে, যেখানে টাকা নয়—সততা জিতবে। যেখানে মার্কা নয়—মানুষ জিতবে। যেখানে ভাড়াটে কর্মী নয়—আদর্শবাদী সৈনিকেরা রাজপথ কাঁপাবে। সেই সোনালী দিনের প্রত্যাশায় বাঙালির ‘নির্বাচন বিলাস’ চলুক আপন গতিতে।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা্ সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#নির্বাচনবিলাস #ভোটেরহাওয়া #বাংলাদেশরাজনীতি #নির্বাচনীবিশ্লেষণ #ভুঁইফোড়দল #বসন্তেরকোকিল #তৃণমূলেরকান্না #রাজনৈতিকব্যঙ্গ #নির্বাচনীসংস্কৃতি #বাংলাদেশনির্বাচন২০২৬ #রাজনৈতিকরসিকতা #ভোটেরবাজার #রাজনীতিরপরিবর্তন
#ElectionSatire #BangladeshPolitics #VoteCulture #PoliticalHumor #ElectionAnalysis #PowerAndPolitics #DemocracyDebate #ElectionSeason #PoliticalParody #VoterBehavior #PoliticalTrends