01/30/2026 অশান্ত পৃথিবীতে শান্তির পথ: সংঘাত ও সংকটে মুসলিমের নৈতিক কর্তব্য /The Moral Duties of Muslims in Conflict and Crisis
Dr Mahbub
৩০ January ২০২৬ ১০:৫৯
—বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম
সংঘাত ও সংকটের এই সময়ে একজন মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব কী? ফরজ আইন ও ফরজ কিফায়াহ, মানবিক সহায়তা, ইনসাফ, ফেতনা এবং বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে কোরআন ও সুন্নাহভিত্তিক বিশ্লেষণ। The Path to Peace in a Turbulent World.
একবিংশ শতাব্দীর এই সময়টা যেন ইতিহাসের এক অস্থির মোড়। চারদিকে যুদ্ধ, দখল, আদর্শিক দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আর তথ্যের স্রোত—সব মিলিয়ে পৃথিবী আজ এক অদ্ভুত উত্তেজনার ভেতর দিয়ে হাঁটছে। কোথাও বোমার শব্দ, কোথাও ক্ষুধার্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, আবার কোথাও গুজব আর বিদ্বেষের আগুনে পুড়ছে সমাজ। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে একজন সাধারণ মুসলিমের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এই সংঘাতের দুনিয়ায় আমার ভূমিকা কী? ইসলাম কি কেবল নামাজ-রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি এই অশান্ত সময়েও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় কোরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামী আইনশাস্ত্র বা ফিকাহর কাছে। সেখানে দেখা যায়, ইসলাম কখনোই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ধর্ম নয়। বরং মানুষের ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র এবং এমনকি যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত—সবখানেই নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে।
ইসলামী জীবনদর্শনে দায়িত্বের বিষয়টি আবেগ দিয়ে নয়, বরং সুস্পষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ফিকাহ শাস্ত্র আমাদের শেখায়, সব দায়িত্ব এক রকম নয়। কিছু দায়িত্ব প্রত্যেক মুসলিমের উপর ব্যক্তিগতভাবে ফরজ, যাকে বলা হয় ফরজ আইন। যেমন—নামাজ, রোজা, সততা, সত্যবাদিতা। এগুলো কেউ আমার হয়ে পালন করতে পারে না।
Let’s Tune In to a Beautiful Playlist of Islamic Spiritual Songs
অন্যদিকে আছে ফরজ কিফায়াহ—যে দায়িত্ব সমাজের একটি অংশ আদায় করলে বাকিরা দায়মুক্ত হয়ে যায়। জানাজার নামাজ, সমাজের নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা—এসব এর উদাহরণ। সংঘাত বা যুদ্ধের প্রশ্নে এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয়। অনেক সময় আবেগী প্রচারণায় মনে করা হয়, যে কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রত্যেক মুসলিমের সরাসরি অস্ত্র হাতে নেওয়া ফরজ। অথচ ফিকাহর দৃষ্টিতে বিষয়টি এত সরল নয়।
যতক্ষণ কোনো রাষ্ট্র বা সমাজে সুসংগঠিত কর্তৃপক্ষ ও পেশাদার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ যুদ্ধ বা প্রতিরোধ সাধারণত ফরজ কিফায়াহ হিসেবেই বিবেচিত হয়। অর্থাৎ, দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনী সেই কাজ করছে মানে সাধারণ নাগরিকের ওপর অস্ত্র ধরার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে যদি এমন অবস্থা তৈরি হয়, যেখানে শত্রুর আক্রমণে ঘরবাড়ি, পরিবার, জীবন সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে এবং প্রতিরোধের আর কোনো উপায় থাকে না—তখন পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত আবেগে নয়, বরং অভিজ্ঞ আলেম ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরামর্শে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। — কিন্তু এখানেই দায়িত্ব শেষ নয়। বরং যুদ্ধের বাইরে যে বিশাল নৈতিক ও মানবিক ক্ষেত্র রয়েছে, সেখানে প্রত্যেক মুসলিমের ভূমিকা ব্যক্তিগতভাবেই অপরিহার্য।
সংঘাতের সময় সবচেয়ে বড় যে পরীক্ষাটি হয়, তা হলো চরিত্রের পরীক্ষা। উত্তেজনা, ক্ষোভ আর প্রতিশোধস্পৃহা যখন মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন করে ফেলে, তখনই ইনসাফ বজায় রাখা সবচেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে। অথচ ইসলাম এই জায়গাটিতেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। শত্রু-মিত্রের বিভাজন ভুলে গিয়ে ন্যায়বিচারের ওপর অটল থাকার শিক্ষা ইসলামের মৌলিক আদর্শ। কোরআনে আল্লাহ স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানে অবিচল থাকো এবং কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে ইনসাফ না করতে প্ররোচিত না করে।” (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫: ৮) — এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইনসাফ কোনো আবেগের বিষয় নয়; এটি ঈমানের দাবি। যে সমাজে উত্তেজনার মুহূর্তেও ন্যায়বোধ অটুট থাকে, সেখানে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ব্যক্তিগত আচরণ থেকে শুরু করে সামাজিক সিদ্ধান্ত—সবখানেই এই ইনসাফের চর্চা ফেতনা প্রতিরোধের অন্যতম শক্তিশালী উপায়।
ইসলামী ধর্মতত্ত্বে ‘ফেতনা’ (فتنة) একটি গভীর ও বহুস্তরবিশিষ্ট ধারণা। এর অর্থ শুধু দাঙ্গা বা সংঘর্ষ নয়। ফেতনা মানে একদিকে পরীক্ষা, অন্যদিকে মতবিরোধ ও সামাজিক নৈরাজ্য। ইতিহাসে দেখা যায়, ফেতনা সমাজকে ধ্বংস করে দেয় ধীরে, নীরবে।
আধুনিক বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই ফেতনা প্রধানত তিনটি রূপে প্রকাশ পাচ্ছে। প্রথমত, মতাদর্শগত ফেতনা—যেখানে ধর্মের নামে উগ্রপন্থা, সহনশীলতার অভাব এবং চরমপন্থী ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, নৈতিক ফেতনা—দুর্নীতি, লোভ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও ভোগবাদ সমাজের স্বাভাবিক মূল্যবোধকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তৃতীয়ত, সামাজিক ফেতনা—গুজব, মিথ্যা তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানো এবং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার পতন।
এই তিনটি ফেতনা একে অন্যকে শক্তিশালী করছে। ফলে সমাজে বিভাজন বাড়ছে, সহনশীলতা কমছে এবং মানুষ দ্রুত উত্তেজিত হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতায় কেবল আইন বা শক্তি দিয়ে ফেতনা দমন সম্ভব নয়; প্রয়োজন নৈতিক পুনর্গঠন।
আজকের যুগে ফেতনার বড় উৎস অজ্ঞতা ও হুজুগ। যাচাই না করে বিশ্বাস করা, না বুঝে প্রচার করা—এই প্রবণতা সমাজকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তাই সংঘাতকালীন বাস্তবতায় একজন মুসলিমের প্রথম দায়িত্ব হলো ব্যক্তিগত পর্যায়ে আত্মশুদ্ধি। এর মূল ভিত্তি হলো বিশুদ্ধ জ্ঞান বা ‘ইলম’ অর্জন। প্রজ্ঞা ছাড়া তথ্য কেবল বিভ্রান্তি বাড়ায়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন, “একজন মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই প্রচার করে।” — এই হাদিস আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে যেন প্রতিটি মানুষের জন্য আয়নার মতো। আত্মশুদ্ধির অর্থ শুধু বেশি ইবাদত করা নয়; বরং নিজের কথা, শেয়ার, মন্তব্য—সবকিছুর দায় নেওয়া। উত্তেজনার মুহূর্তে চুপ থাকা, যাচাই করা এবং প্রজ্ঞার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়াও তাকওয়ার অংশ।
ইসলাম শুধু রণক্ষেত্রের কথা বলে না। বরং সংঘাতের সময় মানবিকতার যে পরীক্ষা হয়, সেটাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। এই দায়িত্বগুলোকে অনেক আলেম ‘মানবিক জিহাদ’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন—যেখানে অস্ত্র নয়, বরং সহমর্মিতা, ধৈর্য আর নৈতিক দৃঢ়তাই প্রধান হাতিয়ার।
ইসলামের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো—এটি যুদ্ধের অনুমতি দিলেও যুদ্ধকে লাগামহীন করে ছাড়ে না। বরং কঠোর নৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ করে। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর যুদ্ধনীতিতে স্পষ্ট নির্দেশ ছিল—নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং নিরীহ মানুষকে আঘাত করা যাবে না। ফসল, গাছপালা, পানির উৎস ধ্বংস করা নিষিদ্ধ। উপাসনালয় রক্ষা করতে হবে। এমনকি শত্রুর সঙ্গেও চুক্তি ভঙ্গ করা যাবে না।
এই নৈতিকতা দেখিয়ে দেয়, ইসলাম কোনো অন্ধ প্রতিশোধের ধর্ম নয়। বরং ন্যায়, ইনসাফ আর সংযমই এর মূল ভিত্তি। সংঘাতের সময় এই সীমা লঙ্ঘন করা মানে নিজের নৈতিক অবস্থান হারানো।
সংঘাতের বাস্তবতায় যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারা কখনোই অস্ত্রধারী পক্ষ নয়—বরং সাধারণ মানুষ। ঘরছাড়া পরিবার, আহত শিশু, চিকিৎসাবঞ্চিত বৃদ্ধ—এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ, খাদ্য, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা শুধু মানবিক কাজ নয়, বরং একটি ফরজ নৈতিক কর্তব্য।
কোরআনে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে উৎসাহ দিয়েছেন মানবকল্যাণে অর্থ ব্যয়ের জন্য, “আর তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং নিজ হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না। আর তোমরা সদাচারণ করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সদাচারণকারীদের ভালোবাসেন।” (সূরা আল-বাকারা, ২: ১৯৫) —এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাহায্য না করা মানে কেবল উদাসীন থাকা নয়—বরং সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া। মানবিক সহায়তা হলো সেই পথ, যেখানে জীবন বিপন্ন না করেও ইসলামের মূল উদ্দেশ্য—কল্যাণ ও শান্তি—বাস্তবায়ন করা যায়।
আধুনিক বাংলাদেশে ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুতি, দুর্নীতি, সহিংসতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতার উত্থান পরিলক্ষিত হচ্ছে। অথচ কুরআনের বাণী স্পষ্ট: “إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ...” — "আল্লাহ আদেশ দেন ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়দের প্রতি সদ্ব্যবহারের" (সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০) —এখানে আদল (ন্যায়), ইহসান (পরোপকার), এবং সিলা রাহিম (সম্পর্ক রক্ষা)—এই তিনটি মূল্যবোধ সমাজে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য।
বিশ্বের বড় বড় সংঘাতের বাইরে আমাদের নিজেদের সমাজও কি শান্ত? বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানে হয়তো প্রকাশ্য যুদ্ধ নেই, কিন্তু এক ধরনের অদৃশ্য ‘ফেতনা’ ধীরে ধীরে সমাজকে গ্রাস করছে। ইসলামী পরিভাষায় ফেতনা মানে শুধু দাঙ্গা নয়; এটি পরীক্ষা, বিভ্রান্তি, সামাজিক বিশৃঙ্খলার নাম।
আজ এই ফেতনার রূপ নানা রকম। কোথাও অর্থনৈতিক বৈষম্য, কোথাও দুর্নীতি, কোথাও মতাদর্শগত উগ্রতা। একদিকে দ্রুত উন্নয়ন, অন্যদিকে সুযোগ-বঞ্চিত মানুষের হতাশা—এই বৈপরীত্য সমাজে ক্ষোভ তৈরি করছে। তার ওপর আছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহার। যাচাই না করা খবর, অর্ধসত্য ভিডিও, উত্তেজক মন্তব্য—সব মিলিয়ে বিভাজন গভীর হচ্ছে। ধর্মীয় জ্ঞানের ক্ষেত্রেও সমস্যা কম নয়। গভীর ইলম ও প্রজ্ঞার বদলে স্লোগান আর আবেগ দিয়ে অনেক সময় ধর্ম ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। ফলে মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে, সহনশীলতা হারাচ্ছে।
এই সংকট থেকে বের হওয়ার পথ কেবল রাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র—তিন স্তরেই দায়িত্ব আছে।
ব্যক্তিগতভাবে প্রথম দায়িত্ব হলো ইলম অর্জন। কোরআনের নির্দেশ স্পষ্ট, "যদি তোমরা না জানো, তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা করো।" (সূরা আন-নাহল, ১৬: ৪৩) —হুজুগে না মেতে, যাচাই করে কথা বলা, নিজের রাগ ও অহংকার নিয়ন্ত্রণ করা—এসবই আত্মশুদ্ধির অংশ। কেননা স্বয়ং আল্লাহর রাসূল (সা.) প্রচারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে বলেছিলেন। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে যাচাই না করে কোনো কথা ছড়ানো বড় অপরাধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোরভাবে সাবধান করে বলেছেন: "কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই না করে) তাই বর্ণনা করে।" (সহীহ মুসলিম)
এরপর সামাজিক দায়িত্ব। ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো সমাজ টিকে থাকতে পারে না। যখন মানুষ বিচার পায় না, তখন তারা নিজের হাতে আইন তুলে নিতে চায়, যা ফেতনাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো—এসব শুধু রাজনৈতিক বিষয় নয়, নৈতিক দায়িত্বও।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন, গুজব বন্ধ করা, বিদ্বেষ নয় বরং সমাধানমুখী আলোচনা তৈরি করা—এগুলো সময়ের দাবি।
আজকের শিক্ষিত সমাজে ডিগ্রি আছে, কিন্তু আদর্শ নেই; প্রযুক্তি আছে, কিন্তু নৈতিকতা নেই। কর্পোরেট জগতের উদাহরণ, যেখানে মানবতা বিসর্জিত হয় লাভের জন্য, কিংবা রাজনীতির ক্ষেত্র, যেখানে ন্যায় হারিয়ে যায় দলীয় স্বার্থে—সবই দেখায় ইসলামি জীবনদর্শনের প্রাসঙ্গিকতা। মহানবি (সা.) বলেন:“তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই, যে মানুষের জন্য উত্তম।” (সহীহ বুখারী) —এই হাদীস একদিকে যেমন আত্ম উন্নয়নের কথা বলে, অন্যদিকে সমাজকল্যাণকে মানুষের মূল পরিচয় হিসেবে তুলে ধরে।
সংঘাত ও সংকটের এই সময় চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোর তত কাছাকাছি আসে। তবে প্রশ্ন হলো—এই অন্ধকার সময়ে আমরা কেমন মানুষ হয়ে উঠলাম? একজন মুসলিমের পরিচয় কেবল তার ইবাদতে নয়, বরং তার নৈতিক দৃঢ়তা, ধৈর্য আর আর্তমানবতার পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতায়।
ফেতনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র কোনো বাহ্যিক শক্তি নয়; এটি নিজের ভেতরের লোভ, অহংকার আর ঘৃণাকে দমন করা। আসুন, আমরা গুজবের বিপরীতে সত্যের, অবিচারের বিপরীতে ইনসাফের এবং ঘৃণার বিপরীতে ভালোবাসার প্রদীপ জ্বালাই। তবেই অশান্ত পৃথিবীর মাঝেও শান্তির পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।
চারিত্রিক দৃঢ়তা, ইনসাফ, আত্মশুদ্ধি, বিশুদ্ধ জ্ঞান এবং মানবিক সহায়তা—এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই একজন মুসলিম সংঘাতের যুগে নিজের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করতে পারে। ফেতনার বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু বাইরের অস্থিরতার বিরুদ্ধে নয়; এটি নিজের ভেতরের দুর্বলতার বিরুদ্ধেও সংগ্রাম।
এই মূল্যবোধগুলো যদি ব্যক্তি ও সমাজে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সংঘাতের মাঝেও মানবিকতা টিকে থাকবে। আর সেখান থেকেই জন্ম নেবে প্রকৃত শান্তি—যা অস্ত্র দিয়ে নয়, নৈতিকতা দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#সংঘাত_ও_ইসলাম #মুসলিমের_নৈতিক_দায়িত্ব #ইসলামী_দৃষ্টিভঙ্গি #ফরজ_কিফায়াহ #ফরজ_আইন #ফেতনা_ও_সমাজ #বাংলাদেশের_সমাজ #ইসলামে_ইনসাফ #মানবিকতা_ও_ইসলাম #গুজব_ও_সত্য #ইসলামী_নৈতিকতা #শান্তির_পথ #কোরআন_ও_সুন্নাহ