02/16/2026 আদম-ইভ ও একমুঠো আটার লড়াই: স্বর্গচ্যুতি থেকে আধুনিক ক্লাসরুম
Dr Mahbub
১৬ February ২০২৬ ১২:১১
—অধিকারপত্র বিশেষ ধারাবাহিকের প্রথমপর্ব
স্বর্গচ্যুতি থেকে আধুনিক ক্লাসরুম—আদম (আ.)-এর সেই আদিম শ্রমের শিক্ষা কি আজ আমরা ভুলে গিয়েছি? গত ১৮ মাসের অস্থিরতা আর শিক্ষকদের অবমাননা কি কোনো বড় বিপদের পূর্বাভাস? শিক্ষা সংস্কারের নামে হাজার কোটি টাকার অপচয় রুখতে এবং শিক্ষকদের মর্যাদা ও অথরিটি ফিরিয়ে আনতে বিশেষ নিবন্ধ। সঙ্গে থাকছে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুবের নতুন ধারাবাহিক—'শিক্ষা সংস্কার: মরীচিকা না বাস্তবতা'। বিস্তারিত পড়ুন অধিকারপত্রে।
মহাকালের ডায়েরি যদি কেউ খুলে বসেন, তবে শুরুর পাতাতেই দেখবেন এক বিরাট ‘ভুল’ আর তার চেয়েও বড় এক ‘শাস্তি’র বয়ান। তবে এই শাস্তিটা কিন্তু জেলের গারদ ছিল না; ছিল একজোড়া হাত আর একখন্ড মাটির সঙ্গে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি। ঈশ্বর যখন বললেন, "যাও মর্ত্যে, নিজের গায়ের ঘাম ঝরিয়ে রুটির সংস্থান করো,"—তখন থেকেই শুরু হলো আমাদের এই অদ্ভুত পৃথিবী।
আদম (আ.) যখন নিষিদ্ধ ফলের স্বাদ নিয়ে স্বর্গের চিরস্থায়ী লিজ হারালেন, তখন তাঁর মনে যে অপরাধবোধ জমেছিল, তা বোধহয় আজকের কোনো মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানির সিইও-র টার্গেট মিস করার চেয়েও কয়েক কোটি গুণ বেশি ছিল। তিনি বুঝলেন, শয়তানের প্রোপাগান্ডা বা আইটি সেল-এর চটকদার বিজ্ঞাপনে ভুলে তিনি গড-এর ডিরেক্টিভ অমান্য করেছেন। কিন্তু ততক্ষণে ট্রেনের বাঁশি বেজে গেছে; ইডেন গার্ডেনের টিকিট বাতিল।
ঈশ্বর কিন্তু দয়ালু। তিনি আমাদের পাঠালেন এক বিশাল 'পরীক্ষাকেন্দ্রে' (যাকে আমরা এখন পৃথিবী বলি)। শর্ত একটাই: জীবনটা হবে সংক্ষিপ্ত, অপশন থাকবে দুটো। এক, সৎ পথে ঘাম ঝরিয়ে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা (যাকে স্বর্গীয় পথ বলা হয়)। দুই, শয়তানের দেওয়া 'শর্টকাট' বা দুর্নীতির গোল্ডেন অফার গ্রহণ করা।
আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে মনে হয়, ইবলিস বা শয়তান বোধহয় কোনো নামকরা বিজনেস স্কুল থেকে মার্কেটিং-এ পিএইচডি করেছে। সে আমাদের শেখাচ্ছে, "নিজের ঘামে রুটি কেন? অন্যের ঘামে এসি গাড়ি কেনো!"
আজকের মানুষ যখন অন্যের সম্পদ গ্রাস করে, লবিং করে কাজ বাগিয়ে নেয়, কিংবা দুর্নীতির পাহাড়ে চড়ে বসে—তখন বুঝতে হবে সেই আদিম 'নিষিদ্ধ ফল' খাওয়ার প্রবণতা এখনো কাটেনি। শয়তানের প্রলোভনটা এখন ডিজিটাল; সেখানে কোনো আপেল নেই, আছে অবৈধ টাকা, ক্ষমতার দম্ভ আর অন্যকে দাবিয়ে রাখার আদিম প্রবৃত্তি। আমরা ভুলে গেছি যে, এই দুনিয়াটা একটা 'Exam Field'। আমরা প্রশ্নের উত্তর ভুল লিখছি কি না, সেটা বড় কথা নয়; বড় কথা হলো আমরা পাশের জনের খাতা দেখে লিখছি কি না!
এখন প্রশ্ন জাগে, আমাদের বর্তমান শিক্ষা কি আমাদের সেই 'স্বর্গীয় প্রতিনিধি' (Representative of God) হিসেবে গড়ে তুলছে? উত্তরটা একটু তেতো। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখন মূলত 'দক্ষ শ্রমিক' তৈরির কারখানা, 'ভালো মানুষ' তৈরির তপোবন নয়।
আমরা জিপিএ-৫ আর গোল্ডেন মেডেলের পেছনে ছুটতে গিয়ে বাচ্চাদের শেখাচ্ছি কীভাবে প্রতিযোগিতায় অন্যকে কনুই দিয়ে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিতে হয়। আমরা তাদের হাতে ল্যাপটপ দিচ্ছি, কিন্তু হাতে হাত রেখে চলার নৈতিকতা দিচ্ছি না।
শিক্ষা সংস্কারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত তিনটি:
ঈশ্বরের ইচ্ছা ছিল মানুষ হবে তাঁর ছায়া। অর্থাৎ, দয়া, ন্যায়বিচার আর সততা হবে মানুষের ভূষণ। শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যেন একজন শিক্ষিত মানুষ মানেই তিনি হবেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেয়াল। তিনি হবে এমন একজন, যিনি অন্যের জমি দখল করবেন না, ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না এবং মনে রাখবেন যে—এই পরীক্ষার হল থেকে বের হওয়ার সময় খাতাটা কিন্তু ওপরে জমা দিতে হবে। স্মরণে থাকতে হবে, "মানুষ হিসেবে জন্ম নেওয়াটা ভাগ্যের বিষয়, কিন্তু মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাটা হলো সাধনার বিষয়।"
আদম (আ.)-এর সেই অপরাধবোধ আমাদের জন্য এক মহান শিক্ষা। ভুল করা মানুষের স্বভাব, কিন্তু সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সৎ পথে ফেরাটাই হলো সত্যিকারের বীরত্ব। আজকের আধুনিক পৃথিবীতে শয়তান আমাদের 'টেম্পোরারি রিচনেস' বা সাময়িক প্রাচুর্যের লোভ দেখাবেই। কিন্তু আমাদের শিক্ষা যেন আমাদের শেখায় যে, পরকালের সেই অনন্ত ধ্বংসের চেয়ে এই দুনিয়ার স্বল্প মেয়াদী অভাব অনেক ভালো।
আসুন, এমন এক প্রজন্ম গড়ি যারা ঘাম ঝরিয়ে রুটি রুজি করবে, যারা স্রষ্টার প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের সেবা করবে, আর যারা পৃথিবীকে শয়তানের চক্রান্ত থেকে মুক্ত করে পুনরায় সেই হারানো স্বর্গের এক টুকরো আবহে রূপান্তর করবে।
মহাকালের সেই আদি ডায়েরিটা যদি আজ খোলা হয়, তবে দেখা যাবে গত ১৮ মাসের পাতায় বিস্রস্ত কালিতে লেখা হয়েছে এক চরম অবমাননার উপাখ্যান। আমরা যখন ভাবছিলাম আদম (আ.)-এর সেই ভুল থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েছি, ঠিক তখনই বাংলার পলিমাটিতে দেখা গেল এক বিসদৃশ দৃশ্য। অন্তর্বর্তীকালীন এই সময়ে সামাজিক সম্প্রীতির যে ‘স্বর্গীয় নির্দেশনা’ ছিল, তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আমরা মেতে উঠলাম এক আত্মঘাতী খেলায়। বিশেষ করে, আমাদের শিক্ষাগুরুদের ওপর যে লাঞ্ছনার খড়্গ নেমে এল, তা যেন সেই আদিম শয়তানি প্রোপাগান্ডারই এক আধুনিক ও বীভৎস সংস্করণ।
ভিন্নমতের অজুহাতে শিক্ষকদের কান ধরে ওঠবস করানো, তাঁদের পদত্যাগে বাধ্য করা কিংবা শারীরিক-মানসিক নিগ্রহ—এসবই প্রমাণ করে আমরা আমাদের ‘এক্সাম ফিল্ড’-এ কতটা শোচনীয়ভাবে ফেল করছি। মনে রাখতে হবে, শিক্ষক কেবল একজন বেতনভুক্ত কর্মচারী নন; তিনি স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত জ্ঞানের মশালবাহী। যখন একজন শিক্ষকের চোখের জলে বাংলার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, তখন সেই হাহাকার সরাসরি গিয়ে আঘাত করে খোদায়ী আরশে। শয়তানি চক্রান্তে মত্ত হয়ে আমরা ভুলে গেছি যে, শিক্ষকের অপমান মানেই হলো একটি জাতির মেরুদণ্ডে কুঠারাঘাত করা, যা প্রকারান্তরে স্রষ্টার ইচ্ছারই বিরুদ্ধাচরণ।
আজকের এই অস্থিরতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি ‘পবিত্র সতর্কবাণী’। যখন কোনো জাতি তার পথপ্রদর্শক বা শিক্ষকদের সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই জাতির ভাগ্যাকাশে কালো মেঘ জমে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আল্লাহ ধৈর্যশীল, তিনি সুযোগ দেন, সংশোধন হওয়ার অবকাশ দেন; কিন্তু যখন সীমা লঙ্ঘিত হয়, তখন নেমে আসে ‘গায়েবি দুর্যোগ’। শিক্ষকদের এই নিপীড়ন আর তাঁদের দীর্ঘশ্বাসে আজ সপ্ত আসমান কেঁপে উঠছে। যদি এখনই আমরা এই পথ থেকে ফিরে না আসি, তবে শয়তানের সেই ‘ফলস প্রমিজ’ বা সাময়িক জয়ের নেশা আমাদের এক স্থায়ী ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।
শিক্ষাগুরুদের চোখের জল কোনো সাধারণ জল নয়, এ যেন এক আধ্যাত্মিক অভিশাপ যা আমাদের আগামী প্রজন্মকে পঙ্গু করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। দুর্নীতি আর ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে আমরা যদি শিক্ষকদের অথরিটি বা মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে না পারি, তবে শিক্ষা সংস্কারের যত বড় এজেন্ডাই আমরা নিই না কেন—তা কেবল বালির বাঁধ হয়েই থাকবে।
এখনই সময় এই ‘মহাপাপ’ থেকে তওবা করার। শিক্ষা সংস্কারের প্রথম এবং প্রধান ধাপ হতে হবে শিক্ষকদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার। আমাদের এমন এক সমাজ গড়তে হবে যেখানে শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষের শাসক নন, বরং আত্মার কারিগর হিসেবে পরম শ্রদ্ধার পাত্র হবেন। সরকারের এবং সমাজের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, শিক্ষকদের কষ্ট লাঘব না করে এবং তাঁদের যথাযথ সম্মান ও কর্তৃত্ব (Authority) প্রতিষ্ঠা না করে কোনো জাতির মুক্তি সম্ভব নয়।
আমরা যদি আদমের মতো আমাদের ভুল বুঝতে দেরি করে ফেলি, তবে এই অভিশপ্ত অন্ধকার থেকে বের হওয়ার পথ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। আসুন, আমরা দম্ভ পরিহার করি, শয়তানি ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করি এবং শিক্ষকদের চোখের জল মোছানোর মধ্য দিয়ে স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট হই। নতুবা, ইতিহাসের পাতায় আমরা কেবল এক ‘অভিশপ্ত জাতি’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকব, যারা নিজেদের পথপ্রদর্শককে অপমান করে নিজেদের ধ্বংস নিজেই ডেকে এনেছিল।
পরিশেষে, রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার নীতিনির্ধারকদের কাছে আমার আকুল আবেদন—জাতীয় স্বার্থে শিক্ষকদের সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণে অবিলম্বে একটি বিশেষ 'জাতীয় আচরণবিধি' বা সুনির্দিষ্ট পলিসি গাইডলাইন (শিক্ষক সুরক্ষা ও মর্যাদা জাতীয় নীতিমালা বা National Policy on Teacher Protection and Dignity) তৈরি ও তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিন। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, দালানকোঠা বা প্রযুক্তির পেছনে হাজার কোটি টাকা ঢেলে শিক্ষা সংস্কারের যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তা ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো সুফল বয়ে আনবে না, যতক্ষণ শিক্ষার মূল কারিগর শিক্ষকদের হৃত আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা না যাবে। শিক্ষাব্যবস্থা যদি একটি বিশাল জাহাজ হয়, তবে শিক্ষকরা হলেন তার দক্ষ চালক। সেই চালক যদি অবমাননা আর আতঙ্কের কাঁটা গায়ে নিয়ে স্টিয়ারিং ধরেন, তবে সেই জাহাজ কূলে ভেড়া অসম্ভব। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে চূড়ান্ত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে আজই শিক্ষকদের 'অথরিটি' ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। নতুবা ইতিহাসের কাঠগড়ায় আমাদের দাঁড়াতে হবে এক লক্ষ্যহীন ও পথভ্রষ্ট প্রজন্ম তৈরির কারিগর হিসেবে।
বিশেষ ঘোষণা
শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, শিক্ষকদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার এবং আগামীর প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে তাঁর এই গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণগুলো দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। তাই, শিক্ষা সংস্কারের প্রকৃত স্বরূপ জানতে এবং আগামীর প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের অধিকারপত্রের অনলাইন পাতায়।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শিক্ষা_সংস্কার #শিক্ষকের_মর্যাদা #অধিকারপত্র #EducationReformation #BangladeshEducation #নৈতিক_শিক্ষা #অধ্যাপক_ড_মাহবুব #মানবিক_শিক্ষা #SaveOurTeachers #EthicalEducation #শিক্ষা_সংস্কার_মরীচিকা_না_বাস্তবতা #মানুষ_গড়ার_কারিগর #জাতীয়_আচরণবিধি