02/23/2026 এই শিক্ষা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
Dr Mahbub
২২ February ২০২৬ ২৩:১০
বাংলাদেশে শিক্ষা বিস্তার ঘটেছে দ্রুত, কিন্তু গুণগত মান, নৈতিকতা ও নাগরিক চেতনার সংকট কি ক্রমেই গভীর হচ্ছে? “এই শিক্ষা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?”—অধিকারপত্রের শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের এই পর্বে বিশ্লেষণ করা হয়েছে ডিগ্রি-নির্ভর সংস্কৃতি, জিপিএ-কেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা, গবেষণার দুর্বলতা, কারিগরি শিক্ষার অবমূল্যায়ন ও নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতার বাস্তবতা। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে পাঁচ দফা সংস্কার প্রস্তাবসহ এই সম্পাদকীয় প্রশ্ন তুলেছে—আমরা কি দক্ষ কর্মচারী তৈরি করছি, নাকি দায়িত্বশীল নাগরিক? শিক্ষা কি ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাফল্যের সিঁড়ি, নাকি সামাজিক দায়বদ্ধতার পাঠশালা? এখনই সময় শিক্ষা সংস্কারকে প্রকল্প নয়, জাতীয় নৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখার।
আমরা আজ এমন এক অদ্ভুত সময়ের দাঁড়িপাল্লায় দাঁড়িয়ে আছি, যার একদিকে পাহাড়সম ডিগ্রির স্তূপ, আর অন্যদিকে মানুষের ভাঙা ভেতর। একটি জাতির ভবিষ্যৎ বোঝার সবচেয়ে বড় মানদণ্ড হলো তার শিক্ষাব্যবস্থা। কারণ, শিক্ষা কেবল জীবিকা অর্জনের কৌশল নয়; এটি মূলত একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক তৈরি করার কারিগর। বাংলাদেশে আজ শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে সত্য—স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। কিন্তু একই সাথে রাজপথে, কর্মক্ষেত্রে আর লোকালয়ে প্রতিধ্বনি হচ্ছে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন— এই শিক্ষা আমাদের 'মানুষ' বানাচ্ছে তো?
আজ শিক্ষিতের হার বাড়ছে, কিন্তু দায়িত্বশীল নাগরিকের বড় আকাল। দেয়ালে টাঙানোর মতো উজ্জ্বল সার্টিফিকেট আছে, কিন্তু মনের গভীরে সহনশীলতা নেই। পেশাগত যোগ্যতা আছে, কিন্তু চারিত্রিক দৃঢ়তা নেই। অধিকার নিয়ে আমরা খুব সচেতন, কিন্তু দায়িত্ব পালনের কথা উঠলেই আমাদের উৎসাহে ভাটা পড়ে। এই বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কোথাও তার আদি ও অসল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলেছে।
আমাদের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে আজ বিশ্ববিদ্যালয় আছে কিন্তু গবেষণা নেই; স্কুল আছে কিন্তু শৈশব নেই; কারিগরি শিক্ষা আছে কিন্তু সামাজিক মর্যাদা নেই; মাদ্রাসা আছে কিন্তু মূলধারায় সংযোগ নেই। বইয়ের পাতায় নৈতিকতার সবক থাকলেও যাপিত জীবনে তার লেশমাত্র নেই। আমরা দক্ষ 'কর্মচারী' বানাতে পারছি ঠিকই, কিন্তু সংবেদনশীল 'মানুষ' বানাতে পারছি না।
আমাদের বুঝতে হবে, শিক্ষা সংস্কার মানে কেবল নতুন পাঠ্যবই ছাপানো বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবন তোলা নয়। সংস্কার মানে দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন। শিক্ষাকে কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের সিঁড়ি না বানিয়ে একে সামাজিক দায়বদ্ধতার পাঠশালা হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। শিক্ষার্থীকে কেবল একজন 'পরীক্ষার্থী' নয়, বরং আগামীর সুনাগরিক হিসেবে দেখা প্রয়োজন। আর শিক্ষককে কেবল সিলেবাস শেষ করার যন্ত্র নয়, বরং মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে শিক্ষার বিস্তার অস্বীকার করার উপায় নেই। বিদ্যালয় বেড়েছে, কলেজ বেড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও বেড়েছে। উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এই বিস্তার নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু বিস্তারের এই ছবির আড়ালে একটি নীরব সংকট জমতে জমতে আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে—গুণগত শিক্ষা, মানবিক শিক্ষা এবং নাগরিক চেতনার শিক্ষা আমরা দিতে পারছি কি না।
আজ আমরা এমন এক সমাজ দেখছি, যেখানে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু দায়িত্বশীল নাগরিকের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। ডিগ্রি আছে, কিন্তু সহনশীলতা কম। দক্ষতা আছে, কিন্তু নৈতিক দৃঢ়তা নড়বড়ে। অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা আছে, কিন্তু দায়িত্ব পালনের সংস্কৃতি দুর্বল। এই বৈপরীত্য কেবল ব্যক্তিগত চরিত্রের সমস্যা নয়; এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতার ইঙ্গিত।
এই সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষা যেন হয়ে উঠেছে একটি অসম্পূর্ণ যন্ত্র—যা চালু আছে, কিন্তু সঠিক দিকে যাচ্ছে না।
আজকের শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে নম্বর, GPA, সার্টিফিকেট আর প্রতিযোগিতা। শিখনপ্রক্রিয়া ক্রমেই পরিণত হয়েছে ফলাফল-উৎপাদনের যন্ত্রে। পরীক্ষায় কী আসবে, কীভাবে নম্বর বাড়ানো যাবে, কীভাবে অন্যকে পেছনে ফেলা যাবে—এই চিন্তাই হয়ে উঠেছে শিক্ষার চালিকাশক্তি।
ফলে মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা, সহমর্মিতা, নৈতিকতা, নাগরিক দায়িত্ব—এসব বিষয় পাঠ্যক্রমের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী শিখছে কীভাবে প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়, কিন্তু শিখছে না কীভাবে প্রশ্নের দায় নিতে হয়। সে জানে কীভাবে অধিকার দাবি করতে হয়, কিন্তু জানে না দায়িত্ব পালনের মূল্য কী।
এই ব্যবস্থার সরাসরি ফল আমরা দেখতে পাচ্ছি কর্মক্ষেত্রে ও সমাজে। শিক্ষিত তরুণেরা চাকরিতে ঢুকছে, কিন্তু অনেক সময় সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নে দ্বিধায় ভুগছে। তারা দক্ষ কর্মচারী হতে পারছে, কিন্তু সচেতন নাগরিক হয়ে উঠতে পারছে না।
একটি রাষ্ট্র শুধু দক্ষ কর্মচারী দিয়ে চলে না। রাষ্ট্র চলে ন্যায়বোধ, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক আস্থার ওপর। শিক্ষা যদি এই গুণগুলো তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই শিক্ষা যত আধুনিকই হোক, তা রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রশ্নটা তাই খুব সরল, কিন্তু গভীর—আমরা কি মানুষ বানাচ্ছি, নাকি কেবল যোগ্যতা জোগাড় করছি?
আজকের শিক্ষা আমাদের শেখাচ্ছে কীভাবে পাশ করতে হয়, কীভাবে প্রতিযোগিতা জিততে হয়, কীভাবে অন্যকে ছাড়িয়ে যেতে হয়। কিন্তু শেখাচ্ছে না—কীভাবে হেরে গিয়ে উঠে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে অন্যকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে হয়, কিংবা ক্ষমতা পেলে কীভাবে সংযত থাকতে হয়।
আমরা স্মার্ট গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছি, কিন্তু সংবেদনশীল মানুষ তৈরি করতে পারছি না। আমরা যোগ্য লোক তৈরি করছি, কিন্তু বিবেকবান নাগরিক তৈরি করতে পারছি না।
আমাদের শিক্ষা ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। আমি কী পেলাম, আমি কোথায় গেলাম, আমি কতটা এগোলাম—এই “আমি”-র ভিড়ে “আমরা” হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ রাষ্ট্র চলে “আমরা” দিয়ে। সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে সম্মিলিত দায়িত্ববোধে। মানবতা টিকে থাকে সহমর্মিতার ওপর।
যে শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য শেখায়, সে শিক্ষা একসময় সমাজকে শূন্য করে দেয়। তখন সবাই দৌড়ায়, কিন্তু কেউ কাউকে দেখে না।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে শিক্ষা সংস্কার মানে নতুন ভবন, নতুন সিলেবাস বা নতুন স্লোগান নয়। সংস্কার মানে শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। শিক্ষাকে কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের সিঁড়ি না বানিয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতার পাঠশালা হিসেবে পুনর্গঠন করা।
সংস্কার মানে—
সংস্কার মানে সাহস—নিজেদের ভুল স্বীকার করার সাহস।
মাননীয় নীতিনির্ধারকবৃন্দ, এই লেখা কোনো দলের বিরুদ্ধে নয়, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধেও নয়। এটি একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের প্রকাশ।
আমাদের শিক্ষা নীতিমালা আছে, পরিকল্পনা আছে, ভিশন আছে। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে তার প্রতিফলন সীমিত। শিক্ষার্থী এখনো মুখস্থের চাপে ক্লান্ত, শিক্ষক ফলাফলের বোঝায় বন্দী, আর শিক্ষা প্রশাসন কাগজ আর সভার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এই ব্যবস্থায় মানবিকতা, সৃজনশীলতা ও নাগরিক চেতনা ক্রমেই প্রান্তিক হয়ে পড়ছে।
শিক্ষা সংস্কারকে প্রকল্প হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা সরাসরি দেখতে হবে। শিক্ষকের কথা শুনতে হবে। শিক্ষার্থীর মানসিক চাপ বুঝতে হবে। অভিভাবকের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হবে।
মাননীয় নীতিনির্ধারকবৃন্দ, বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজন। এই ব্যবস্থার খোলনলচে পাল্টাতে ৫টি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি:
শিক্ষা এমন একটি খাত, যার ফল দ্রুত পাওয়া যায় না। একটি শিক্ষানীতির ফল পেতে সময় লাগে অন্তত এক দশক। তাই দ্রুত ফলের আশায় শিক্ষা সংস্কারকে অবহেলা করা রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী। শিক্ষা হলো সেই জায়গা, যেখানে বিনিয়োগের ফল দেরিতে আসে, কিন্তু তার প্রভাব সবচেয়ে গভীর হয়।
রাষ্ট্র যদি আজ এই জায়গায় সাহসী সিদ্ধান্ত না নেয়, আগামী প্রজন্ম আমাদের জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
শিক্ষা হলো জাতির আয়না। সেই আয়নায় যদি আমরা শুধু সার্টিফিকেটের জৌলুস দেখি কিন্তু মানুষের সত্যিকারের মুখ দেখতে না পাই, তবে বুঝতে হবে সেই আয়না ভাঙা। আমরা কি এমন এক প্রজন্ম গড়ে তুলব যারা অধিকার চেনে কিন্তু দায়িত্ব এড়ায়? যারা বলে "দেশটা এমন কেন?" কিন্তু নিজেকে প্রশ্ন করে না "আমি কেমন?"
মাননীয় নীতিনির্ধারকবৃন্দ, শিক্ষাকে দয়া করে কেবল পাশের হার বা জিপিএ-র পরিসংখ্যানে মূল্যায়ন করবেন না। পরিসংখ্যান দিয়ে রাষ্ট্র চালানো যায়, কিন্তু রাষ্ট্র টিকে থাকে মানুষ দিয়ে। এই শিক্ষা যদি আমাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তবে আগামীর প্রজন্ম আমাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।
আমাদের লক্ষ্য হোক—যোগ্যতা কেবল কাগুজে নয়, যোগ্যতাই হোক মানুষের প্রকৃত পরিচয়।
শিক্ষা হলো জাতির আয়না। সেই আয়নায় যদি আমরা শুধু সার্টিফিকেট দেখি, কিন্তু মুখ না দেখি—তবে সেই আয়না ভাঙা। আজ সময় এসেছে থামার, নিজেদের দিকে তাকানোর।
আমরা কী চাই—একটি শিক্ষিত কিন্তু উদাসীন সমাজ, নাকি কম নম্বর পাওয়া, কিন্তু দায়িত্বশীল ও মানবিক সমাজ?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে—এই শিক্ষা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ?
রাষ্ট্র যদি দায়িত্বশীল নাগরিক চায়, তবে শিক্ষাকে আগে মানুষ গড়ার দায়িত্ব দিতে হবে।
শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক—এখানে শেষ নয়।
কারণ প্রশ্ন তোলা শেষ হলে, শিক্ষা আসলে সেখানেই থেমে যায়।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শিক্ষা_সংস্কার #বাংলাদেশের_শিক্ষা #গুণগত_শিক্ষা #নৈতিকতা #ডিগ্রি_সংস্কৃতি #জিপিএ_দৌড় #মানুষ_গড়া #EducationReform #BangladeshEducation #CivicResponsibility #EthicalEducation #PolicyReform