02/26/2026 মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার সেতুবন্ধন: ‘জামিয়া’ মডেলে নতুন বাংলাদেশের শিক্ষা বিপ্লব এবং একজন প্রকৃত মাওলানার রূপরেখা
Dr Mahbub
২৬ February ২০২৬ ১৪:২২
— একজন মাওলানার গল্প থেকে শিক্ষা সংস্কারের রূপরেখা-৩ । অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক (পর্ব ৫/৩)
অধিকারপত্রের শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের পর্ব ৫/৩-এ বিশ্লেষিত হয়েছে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের ‘জামিয়া’ মডেল এবং বাংলাদেশের মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বিত সংস্কারের বাস্তব কৌশল। সমন্বিত কারিকুলাম, ভাষাগত দক্ষতা, বৃত্তিমূলক সংযুক্তি, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং আন্তঃবিভাগীয় গবেষণার মাধ্যমে কীভাবে একটি অভিন্ন জাতীয় শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব—তা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি প্রস্তাব করা হয়েছে একটি পাইলট ‘আজাদী শিক্ষা কমপ্লেক্স’, যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতা একই ক্যাম্পাসে মিলিত হবে। প্রশ্ন এখন স্পষ্ট: বাংলাদেশ কি বিভাজনের দেয়াল ভেঙে জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা বিপ্লবের পথে হাঁটতে সাহস করবে?
ফিরে দেখা গত পর্ব (৫/২)-এর সংক্ষিপ্ত পুনরালোচনা / রিক্যাপ
পর্ব ৫/২-এ আমরা প্রবেশ করব সেই দর্শনের গভীরে, যেখানে শিক্ষা মানে কেবল পাঠ নয়—মানসিক মুক্তির বিপ্লব। পর্ব ৫/২–এ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে মাওলানা আজাদের গভীর শিক্ষা দর্শন, যেখানে মানসিক মুক্তিকে রাজনৈতিক স্বাধীনতার চেয়েও মৌলিক বলে দেখা হয়; সেখানে উঠে আসবে ধর্মনিরপেক্ষ ও সমন্বিত মানবিক শিক্ষার ধারণা, যা মানুষকে সংকীর্ণতা থেকে বের করে বৃহত্তর মানবিক চেতনায় স্থাপন করে। পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়, বিশেষ করে নারীর শিক্ষাকে জাতিগত অগ্রগতির শর্ত হিসেবে তাঁর অবস্থান বিশ্লেষণ করা হবে। নৈতিকতা, চরিত্রগঠন ও দায়িত্ববোধকে তিনি শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করতেন—ডিগ্রি নয়, সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক গড়াই ছিল লক্ষ্য। আরও আলোচিত হবে শিক্ষা ও গণতন্ত্রের গভীর সম্পর্ক, যেখানে সচেতন নাগরিক ছাড়া গণতন্ত্র টেকে না। সব মিলিয়ে প্রশ্নটি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠবে: বাংলাদেশ কি শিক্ষাকে কেবল পেশার সোপান হিসেবে দেখবে, নাকি জাতির মানসিক মুক্তির একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে নতুন করে ভাবতে সাহস করবে? এই পর্বে আলোচনার প্রশ্নটি এখন আরও গভীর— বাংলাদেশ কি শিক্ষাকে পেশার সোপান হিসেবে দেখবে, নাকি জাতির মানসিক মুক্তির প্রকল্প হিসেবে পুনর্নির্মাণ করবে?
🔗 একজন মাওলানার গল্প থেকে শিক্ষা সংস্কারের রূপরেখা-২
—অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক (পর্ব ৫/৩)
এই পর্বে উপস্থাপিত একজন মাওলানার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষা সংস্কার কেবল পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন নয়, মানসিকতার রূপান্তর। ধর্ম ও বিজ্ঞানকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নয়, পাশাপাশি বসিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণের যে দর্শন তিনি দেখিয়েছিলেন, তা আজ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষার বিভাজন দূর করে একটি সমন্বিত বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে কুরআনের নৈতিকতা ও আধুনিক বিজ্ঞানের অনুসন্ধিৎসা একই শিক্ষার্থীর ভেতরে বিকশিত হবে। এই সংস্কারের লক্ষ্য হবে এমন প্রজন্ম তৈরি করা, যারা ধর্মীয়ভাবে সচেতন, বৈজ্ঞানিকভাবে দক্ষ এবং সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল। এক মাওলানার শিক্ষা বিপ্লব আমাদের দেখায়—ঐতিহ্যকে অস্বীকার নয়, আধুনিকতাকে ভয় নয়; বরং দুয়ের সৃজনশীল সমন্বয়ই পারে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে একটি মানবিক, জ্ঞানভিত্তিক ও উৎপাদনশীল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব ছিল—তিনি প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যে কোনো প্রাচীর নির্মাণ করেননি। ১৯২০ সালে তাঁর প্রতিষ্ঠিত জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ছিল এমন এক প্রজ্ঞালয়, যেখানে কুরআনের দরসের পাশাপাশি আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি চর্চা সমান গুরুত্ব পেত। এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই আজ বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের জন্য এক কার্যকর দিকনির্দেশনা হতে পারে। বর্তমান দ্বিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে ‘আজাদী মডেল’ আমাদের জন্য হতে পারে এক বাস্তবসম্মত ও সাহসী পথনির্দেশ। আজকের ‘অধিকারপত্র’ পর্বে আমরা সেই পাঁচটি কৌশল নিয়ে আলোচনা করছি, যা মাদরাসা ও সাধারণ শিক্ষাকে একটি অভিন্ন জাতীয় কাঠামোয় যুক্ত করতে পারে।
সত্যিকারের শিক্ষা সংস্কার — দৃষ্টিভঙ্গির শক্তি ও নতুন জাগরণের অঙ্গীকার
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ কোনো প্রথাগত স্কুলে অধ্যয়ন না করেও আধুনিক ভারতের শিক্ষা স্থপতি হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর জীবন আমাদের সামনে এক অমোঘ সত্য উন্মোচন করে—প্রশ্নটি মেধার নয়, প্রশ্নটি দৃষ্টিভঙ্গির। তাই বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মাদরাসা ও সাধারণ ধারার শিক্ষার্থী পিছিয়ে থাকবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। প্রতিবন্ধকতা তাদের সামর্থ্যে নয়; বরং আমাদের কাঠামোগত বিভাজন, সংকীর্ণ মানসিকতা এবং রাজনৈতিক প্রভাববলয়ে আবদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থায়।
বাংলার ধুলোবালি মাখা শ্রেণিকক্ষ আর মুখস্থ বিদ্যার চাপে আমরা যখন দিশেহারা, তখন ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা মেলে এমন এক মহীরুহের, যার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট ছিল না, অথচ যিনি একটি জাতির আধুনিক শিক্ষার ভিত নির্মাণ করে গেছেন। আমরা তাঁকে কেবল রাজনীতিবিদ হিসেবে জানি, কিন্তু তাঁর সত্তার গভীরে ছিলেন এক অনন্য শিক্ষা সংস্কারক—একজন educational reformist, যিনি পারিবারিক শিক্ষা, মুক্তচিন্তা ও বিশ্বজনীন প্রজ্ঞাকে একসূত্রে গেঁথেছিলেন।
আজাদ ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক। ব্রিটিশ ভাইসরয় থেকে শুরু করে গান্ধী-নেহরু—সবাই তাঁর প্রজ্ঞার স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, নিজের ধর্মে অবিচল থেকেও কীভাবে আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও বিশ্বজনীন হওয়া যায়। দেশভাগের অগ্নিগর্ভ সময়ে যখন সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প সমাজকে গ্রাস করছিল, তখন তিনি শিক্ষাকেই পুনর্গঠনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর ‘কালি ও কলমের জিহাদ’ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—প্রজ্ঞা কোনো সার্টিফিকেটে বন্দি থাকে না; তা বিকশিত হয় মুক্ত চিন্তা, নৈতিক সাহস ও মানবিক দায়বদ্ধতায়।
আমরা যদি সত্যিই একটি মেধাভিত্তিক ও জ্ঞাননির্ভর বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে প্রয়োজন রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিমুক্ত, জ্ঞানতাপস ও সংস্কারক নেতৃত্ব। এমন ‘মাওলানা’, যারা মিম্বর ও ল্যাবরেটরি—উভয়কেই সমানভাবে পবিত্র জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র হিসেবে দেখবেন; যারা ঐতিহ্য ও আধুনিকতার দ্বন্দ্বে নয়, তাদের সৃজনশীল সংলাপে বিশ্বাস করবেন।
মাদরাসা ও আধুনিক শিক্ষার দ্বন্দ্ব প্রকৃতপক্ষে কৃত্রিম। আজাদের ‘জামিয়া’ মডেল দেখিয়েছে—একজন মানুষ একই সঙ্গে গভীর ধর্মপ্রাণ এবং আধুনিক বিজ্ঞানের ধারক হতে পারেন। সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থাই একটি জাতির মেরুদণ্ডকে দৃঢ়ভাবে দাঁড় করাতে পারে। সংস্কার শুরু হতে হবে ভেতর থেকে—মাদরাসাগুলোকে কেবল ইবাদতের স্থান নয়, বরং গবেষণা, বিজ্ঞানচর্চা ও মানবিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে।
অর্জিত শিক্ষা স্পষ্ট: শিক্ষা কেবল তথ্যের সঞ্চয় নয়; এটি সত্যের অনুসন্ধান, চিন্তার মুক্তি এবং জাতির আত্মিক ও বৌদ্ধিক পুনর্জাগরণের পথ। আজাদের স্বপ্ন ছিল এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে জ্ঞান বিভক্ত নয়—সমন্বিত; যেখানে ধর্ম মানুষকে সংকীর্ণ নয়—উদার করে; আর যেখানে শিক্ষক কেবল পেশাজীবী নন, বরং একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়ভার গ্রহণকারী।
এখন প্রশ্ন আমাদের সামনে—আমরা কি সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস রাখি?
মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো দেশে টেকসই শিক্ষা সংস্কার সম্ভব নয় যদি সেখানে জ্ঞানকে দ্বিখণ্ডিত করে দেখা হয়—একদিকে “ধর্মীয় শিক্ষা”, অন্যদিকে “আধুনিক শিক্ষা”। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, এই বিভাজন ইসলামের মূল জ্ঞানদর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসলামের স্বর্ণযুগে ইবনে সিনা, আল-বিরুনি, ইবনে হাইসমের মতো মনীষীরা ছিলেন একাধারে ধর্মতাত্ত্বিক ও বিজ্ঞানী। তাদের কাছে ‘ইলম’ ছিল অবিভাজ্য—জ্ঞান মানেই আল্লাহর সৃষ্টির রহস্য অনুধাবন। অতএব, শিক্ষা সংস্কারের প্রথম শিক্ষা হলো—ধর্ম ও বিজ্ঞানকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ছাড়া একটি জাতি আধুনিক বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে না। আবার নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক ভিত্তি ছাড়া সেই উন্নয়ন মানবিক থাকে না। কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতা একটি সমাজকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে পারে, কিন্তু নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে কেবল ধর্মীয় অনুশাসন, যদি তা সমকালীন জ্ঞানচর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা সমাজকে কর্মক্ষমতার দিক থেকে পিছিয়ে দিতে পারে। তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন—যেখানে বিজ্ঞানমনস্কতা নৈতিক দায়িত্ববোধ দ্বারা পরিচালিত হবে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ যুক্তিবোধ ও সমালোচনামূলক চিন্তার সঙ্গে সহাবস্থান করবে।
মুসলিম দেশে শিক্ষা সংস্কারের আরেকটি বড় শিক্ষা হলো—অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে শিক্ষার সরাসরি সম্পর্ক। যদি মাদরাসা শিক্ষার্থীরা আধুনিক বিজ্ঞান, গণিত, তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ না পায়, তবে তারা জাতীয় অর্থনীতির মূল স্রোতে যুক্ত হতে পারবে না। এর ফলে একটি বড় জনগোষ্ঠী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে। সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষার্থীরাও ইঞ্জিনিয়ার, চিকিৎসক, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা বা গবেষক হতে পারে—তাদের ঈমান অটুট রেখেই।
এই সমন্বয় সামাজিক সম্প্রীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা মানসিক বিভাজন তৈরি করে—একদল মনে করে তারা “ধর্মের রক্ষক”, অন্যদল মনে করে তারা “আধুনিকতার প্রতিনিধি”। অথচ একটি জাতির শক্তি নিহিত থাকে ঐক্যে। সমন্বিত শিক্ষার মাধ্যমে শৈশব থেকেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বোঝাপড়া এবং সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। ফলে সাম্প্রদায়িকতা ও সংকীর্ণতার ঝুঁকি কমে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—গবেষণা ও উদ্ভাবন সংস্কৃতি ছাড়া কোনো মুসলিম দেশ জ্ঞাননির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারবে না। ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গবেষণাগার, প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, উদ্ভাবন কেন্দ্র এবং আধুনিক লাইব্রেরি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নৈতিক দর্শন, ধর্মীয় চিন্তা ও সভ্যতার ইতিহাসের পাঠকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই আন্তঃবিভাগীয় সংলাপ থেকেই নতুন ধারণা জন্ম নেয়।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—সংস্কারের প্রশ্নটি কেবল কারিকুলামের নয়; এটি দৃষ্টিভঙ্গির। মুসলিম দেশে শিক্ষা সংস্কার মানে ঐতিহ্যকে পরিত্যাগ করা নয়, বরং ঐতিহ্যকে আধুনিকতার সঙ্গে যুক্ত করে নতুন শক্তিতে রূপান্তর করা। ইসলাম জ্ঞানবিরোধী নয়; বরং জ্ঞান অনুসন্ধানকে ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাই শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন মানুষ গড়া, যারা একাধারে ধর্মপ্রাণ, বিজ্ঞানমনস্ক, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক।
অতএব, ইসলামী শিক্ষা ও বিজ্ঞান–প্রযুক্তির সমন্বয় কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মুসলিম দেশের শিক্ষা পুনর্জাগরণের পূর্বশর্ত। যে জাতি এই সমন্বয় ঘটাতে পারবে, তারাই ভবিষ্যতের বিশ্বে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।
ইসলামী স্কলার বা মাওলানা কেমন হওয়া উচিত—এই প্রশ্ন আজ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, বিশেষত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। এখানে আমরা প্রায়ই দুই ধরনের আলেম দেখি। একদল আছেন, যারা রাজনীতির প্রান্তে নয়, কেন্দ্রে থাকতে চান; ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা তাঁদের প্রভাবের মাপকাঠি। তাঁদের বক্তব্যে দলীয় অবস্থান স্পষ্ট, কিন্তু সামাজিক সংস্কারের দৃষ্টিভঙ্গি অস্পষ্ট। অন্যদিকে ইতিহাস আমাদের দেখায় আরেক ধরনের আলেমের চিত্র—যিনি ক্ষমতার নয়, সত্যের পক্ষ নেন; যিনি মঞ্চ দখল করেন না, বরং বিবেক জাগ্রত করেন।
একজন প্রকৃত ইসলামী স্কলার কখনো কেবল রাজনৈতিক পক্ষপাতের ধারক নন। তিনি কোনো দলের প্রচারক নন, বরং সমাজের নৈতিক দিকনির্দেশক। তাঁর অবস্থান ক্ষমতার কেন্দ্র ঘিরে নয়, বরং ন্যায় ও সত্যের কেন্দ্র ঘিরে। তিনি জানেন, রাজনীতি সাময়িক; কিন্তু নৈতিক নেতৃত্ব দীর্ঘস্থায়ী। তাই তিনি দলীয় স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করেন না; বরং ধর্মের নৈতিক শক্তি দিয়ে সমাজকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করেন।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় “মাওলানা” উপাধি অনেক সময় সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাবের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কিন্তু প্রকৃত মাওলানা হওয়া মানে প্রভাবশালী হওয়া নয়; প্রভাবিত করা। তিনি জনতাকে উত্তেজিত করেন না, শিক্ষিত করেন। তিনি বিভাজন বাড়ান না, বিবেক জাগান। তিনি ক্ষমতার সঙ্গে সমঝোতা করে নীরব থাকেন না, অন্যায়ের মুখে কথা বলেন—যদিও তা অজনপ্রিয় হয়।
একজন সত্যিকারের ইসলামী স্কলার সমাজের দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের দিকে তাকান। তিনি শিক্ষা, নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায় এবং মানবিক সহাবস্থানের প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দেন। তিনি তরুণদের হাতে বই তুলে দেন, ঘৃণা নয়; যুক্তি শেখান, অন্ধ আনুগত্য নয়। তাঁর লক্ষ্য রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন নয়, রাষ্ট্রকে নৈতিক ভিত্তিতে দাঁড় করানো।
এই প্রেক্ষাপটে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ-এর জীবন একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি আলেম ছিলেন, কিন্তু কেবল ধর্মীয় ব্যাখ্যাকারী নন; তিনি ছিলেন চিন্তক, শিক্ষাবিদ এবং রাষ্ট্রনির্মাতা। তিনি দেওবন্দের তাত্ত্বিক দৃঢ়তা গ্রহণ করেছেন, কিন্তু সংকীর্ণতা নয়। তিনি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানমনস্কতা গ্রহণ করেছেন, কিন্তু নৈতিকতা বিসর্জন দেননি। তিনি রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন, কিন্তু ধর্মকে দলীয় অস্ত্র বানাননি।
বাংলাদেশে আজ যে ইসলামী স্কলার প্রয়োজন, তিনি ক্ষমতাকেন্দ্রিক নন, আদর্শকেন্দ্রিক। তিনি দলীয় মঞ্চের বক্তা নন, সমাজের শিক্ষক। তিনি শিকড়ে দৃঢ়—কুরআন, সুন্নাহ ও ঐতিহ্যে প্রতিষ্ঠিত; কিন্তু চিন্তায় মুক্ত—সমকালীন জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতি উন্মুক্ত। তিনি জানেন, মিম্বর কেবল আবেগ জাগানোর স্থান নয়; এটি সমাজ পরিবর্তনের সূচনাবিন্দু।
এই আলোচনায় আমরা দেখব, কীভাবে দেওবন্দ থেকে জামিয়া, মাদ্রাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, এবং আধ্যাত্মিকতা থেকে রাষ্ট্রনির্মাণ—এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় একজন আলেম কীভাবে আধুনিকতার সঙ্গী হতে পারেন। আর সেই পথনির্দেশনা আমাদের জন্য রেখে গেছেন একজন মাওলানা—যিনি উপাধিতে নয়, আদর্শে বড়।
দেওবন্দ থেকে জামিয়া তথা মাদ্রাসা থেকে রাষ্ট্রনির্মাণ: ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মাওলানা আজাদের বৌদ্ধিক সংলাপের মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষার আধুনিক রূপান্তর
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ-এর জীবন ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কেবল আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের নয়, এক বৌদ্ধিক সংলাপের ইতিহাস। তিনি দারস-ই-নিজামি ধারায় শিক্ষিত হয়ে এমন এক আলেমে পরিণত হন, যাঁর চিন্তার ভেতর দারুল উলুম দেওবন্দ-এর তাত্ত্বিক দৃঢ়তা ও আত্মমর্যাদাবোধের প্রতিধ্বনি শোনা যায়; কিন্তু তিনি সেই ঐতিহ্যকে সংকীর্ণ রাজনৈতিক সীমায় আবদ্ধ রাখেননি। বঙ্গভঙ্গ ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি দেওবন্দপন্থী আলেমদের মতোই উপনিবেশবিরোধী অবস্থান নেন, তবে একই সঙ্গে সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদে মুসলমানদের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা-কেন্দ্রিক আধুনিক শিক্ষিত মুসলিম সমাজের সঙ্গে তাঁর ভাববিনিময় মুসলিম শিক্ষার সংস্কার প্রশ্নকে নতুন মাত্রা দেয়; তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরতা বজায় রেখেও আধুনিক বিজ্ঞান ও ইতিহাসচর্চা অপরিহার্য। Aligarh Muslim University-এর ক্ষেত্রে তিনি স্যার সাইয়েদ আহমদের বিজ্ঞানমনস্কতার প্রশংসা করেন, কিন্তু সতর্ক করেন যেন শিক্ষা কেবল অভিজাত মুসলিম মধ্যবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে—এই দৃষ্টিভঙ্গিই পরে তাঁর সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার জোরালো অবস্থানে প্রতিফলিত হয়। জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে Jamia Millia Islamia-র প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল কেবল আনুষ্ঠানিক নয়; তিনি এটিকে উপনিবেশমুক্ত, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মুসলিম শিক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখতেন। আন্তর্জাতিক পরিসরে Al-Azhar University-এর ঐতিহ্য সম্পর্কে তাঁর শ্রদ্ধা ছিল সুস্পষ্ট, তবে তিনি আল-আজহারের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সময়োপযোগী ব্যাখ্যা ও জ্ঞানচর্চার আহ্বান জানান—যেমন তিনি নিজেই ‘Ghubar-e-Khatir’-এ যুক্তিবাদী মনন ও আত্মসমালোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। তাঁর জীবন আমাদের দেখায়, ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তিনি অতীতের স্মৃতিস্তম্ভ বানাতে চাননি; বরং চেয়েছিলেন এগুলো হোক নৈতিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও জাতীয় পুনর্গঠনের প্রাণকেন্দ্র।
মক্কা ও মদীনার প্রভাব: আজাদের মানসগঠনের আধ্যাত্মিক ভিত্তি
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ-এর চিন্তা ও চরিত্রের গভীরে যদি আমরা প্রবেশ করি, তবে তার শিকড় খুঁজে পাই মক্কা ও মদীনার পবিত্র পরিমণ্ডলে। তাঁর জন্ম ১৮৮৮ সালে মক্কায়। তাঁর পিতা মাওলানা খৈরুদ্দিন ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এক স্বনামধন্য আলেম, যিনি দীর্ঘদিন হিজাজে অবস্থান করেছিলেন। ফলে আজাদের শৈশব কেটেছে এমন এক পরিবেশে, যেখানে কুরআনিক শিক্ষা, তাফসির, হাদিস ও ফিকহের পাঠ ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
মক্কার পরিবেশ তাঁকে দিয়েছিল ইসলামের বিশ্বজনীনতার বোধ। হজের মৌসুমে নানা ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতির মুসলমানদের সমাবেশ ছোটবেলাতেই তাঁকে শিখিয়েছিল—ইসলাম কেবল কোনো ভূখণ্ডের নয়; এটি একটি বৈশ্বিক উম্মাহর ধারণা। এই অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী জীবনে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে অবস্থানের ভিত গড়ে দেয়। তিনি ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে ইসলামের বিরোধী মনে করেননি; বরং মানবিক সহাবস্থানের একটি রূপ হিসেবে দেখেছেন।
মদীনার ঐতিহ্য তাঁকে দিয়েছিল নৈতিকতা ও রাষ্ট্রচিন্তার এক ঐতিহাসিক মডেল। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মদীনায় প্রতিষ্ঠিত বহুধর্মীয় সামাজিক চুক্তির ধারণা—যেখানে মুসলিম ও অমুসলিম একত্রে নাগরিক সমাজ গঠন করেছিলেন—আজাদের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রদর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ভারতকে তিনি “দুটি চোখ”-এর উপমায় দেখেছিলেন—হিন্দু ও মুসলমান—যা এই মদীনাকেন্দ্রিক সহাবস্থানের ঐতিহ্যেরই আধুনিক প্রতিধ্বনি।
মক্কার আধ্যাত্মিক পরিবেশ তাঁর মধ্যে গভীর আত্মশৃঙ্খলা ও ধ্যানমগ্নতা তৈরি করেছিল। পরে ‘Ghubar-e-Khatir’-এ আমরা যে অন্তর্মুখী, দার্শনিক, আত্মসমালোচনামূলক ভাষা দেখি, তার শিকড় এই আধ্যাত্মিক শিক্ষায়। কিন্তু তিনি সেখানে থেমে থাকেননি। মক্কা তাঁকে দিয়েছিল বিশ্বাস; ভারতীয় বাস্তবতা তাঁকে দিয়েছে কর্মক্ষেত্র।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মক্কার ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় পরিবেশে বড় হলেও তিনি কখনো অন্ধ অনুকরণে আবদ্ধ হননি। বরং সেই আধ্যাত্মিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তিনি আধুনিক বিজ্ঞান, ইতিহাস ও রাজনৈতিক চিন্তার দিকে অগ্রসর হন। ফলে তাঁর শিক্ষা-দর্শনে আমরা দেখি এক বিরল সমন্বয়: গভীর ধর্মীয় নৈতিকতা ও মুক্তবুদ্ধির সাহস।
সংক্ষেপে বলা যায়, মক্কা তাঁকে দিয়েছিল শিকড়—ঈমান, নৈতিকতা ও বিশ্বজনীনতা। মদীনা তাঁকে দিয়েছিল সহাবস্থান, সামাজিক ন্যায় ও রাজনৈতিক ভারসাম্যের আদর্শ। আর ভারত তাঁকে দিয়েছিল কর্মমঞ্চ—যেখানে তিনি এই আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষাকে রূপ দিয়েছিলেন শিক্ষা সংস্কার, জাতীয় ঐক্য ও আধুনিক রাষ্ট্রনির্মাণের প্রকল্পে।
আজকের বাংলাদেশে তাঁর এই অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে যায়: ধর্মীয় শিকড় যদি মানবিকতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে দাঁড়ায়, তবে তা আধুনিক রাষ্ট্রগঠনের প্রতিবন্ধক নয়; বরং প্রেরণার উৎস হতে পারে।
প্রকৃত মাওলানা হওয়ার পথ: জ্ঞান, নৈতিকতা ও সমাজসংস্কারের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি
মাওলানা আজাদের শিক্ষা আমাদের একজন সত্যিকারের ইসলামী স্কলার গড়ার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রদান করে। তাঁর মতে, এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো আদর্শ—উপাধি নয়। অর্থাৎ সমাজ রূপান্তরে প্রকৃত আলেম শিকড়ে দৃঢ় থাকেন, কিন্তু চিন্তায় মুক্তমনা হন। একজন প্রকৃত ইসলামী স্কলার বা মাওলানা হওয়া শুধু দাড়ি, পাগড়ি বা উপাধির বিষয় নয়; এটি দীর্ঘ আত্মগঠন, গভীর জ্ঞানচর্চা এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের একটি অবিরাম সাধনা। সমাজ সংস্কারের জন্য যে আলেম প্রয়োজন, তিনি কেবল ফিকহের মাসআলা জানেন না—তিনি সময়কে বোঝেন, মানুষের কষ্ট অনুভব করেন এবং নৈতিক সাহসে সত্য কথা বলেন। প্রকৃত মাওলানা হওয়ার শর্ত হলো ধারাবাহিক সাধনা, আত্মশুদ্ধি এবং মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে মিম্বর থেকে সমাজ পরিবর্তনের সূচনা করা।
সবশেষে, আধ্যাত্মিক গভীরতা। আলেমের শক্তি আসে অন্তরের পরিশুদ্ধতা থেকে। নিয়মিত ইবাদত, আত্মসমালোচনা, ধ্যান ও আল্লাহভীতি তাঁর সিদ্ধান্তকে সৎ রাখে। কিন্তু এই আধ্যাত্মিকতা পালিয়ে যাওয়ার পথ নয়; এটি সমাজে ন্যায় ও মানবতার জন্য কাজ করার শক্তি। একজন প্রকৃত ইসলামী স্কলার বা মাওলানা তাই কেবল ধর্মীয় উপাধিধারী নন। তিনি জ্ঞানের অনুসন্ধানী, নৈতিক আদর্শ, মানবিক কণ্ঠস্বর এবং সামাজিক পরিবর্তনের কর্মী। সমাজ সংস্কারের জন্য এমন আলেম দরকার, যিনি শিকড়ে দৃঢ়, চিন্তায় মুক্ত, এবং কাজে সাহসী।
একজন মাওলানার গল্প আমাদের সামনে যে আলোকবর্তিকা তুলে ধরে, তা কেবল অতীতের কোনো স্মৃতিচারণ নয়; এটি ভবিষ্যতের এক স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ দেখিয়েছেন—ধর্মপ্রাণ হওয়া মানে আধুনিকতার বিরোধিতা নয়; বরং প্রকৃত ধর্মবোধ মানুষকে আরও উদার, যুক্তিনিষ্ঠ ও জ্ঞানান্বেষী করে তোলে। তিনি প্রমাণ করেছেন, কিতাব ও বিজ্ঞান, ঈমান ও যুক্তি, ঐতিহ্য ও আধুনিকতা—এগুলো পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক শক্তি।
আজ বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি আর তাত্ত্বিক নয়; এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। আমাদের হাজার হাজার কওমি ও আলিয়া মাদরাসা কি কেবল প্রথাগত পাঠে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সেগুলো একদিন জ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তির শক্তিকেন্দ্রে রূপান্তরিত হবে? আমরা কি এমন এক প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারব, যারা একই সঙ্গে কুরআনের গভীর তাফসির বুঝবে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বা মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে পারবে?
বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট—আমরা এমন মাওলানা চাই, যিনি মিম্বরের ভাষণেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না; ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি ও গবেষণাগারের পথও দেখাবেন। আমরা এমন আলেম চাই, যিনি মাদরাসাকে কেবল ইবাদতের পরিসর হিসেবে নয়, বরং জ্ঞানের পাওয়ার হাউস হিসেবে গড়ে তুলবেন। যিনি বুঝবেন, ইসলামি ঐতিহ্যের স্বর্ণযুগে ইবনে সিনা, আল-বিরুনি, ইবনে হাইসমদের মতো বিজ্ঞানীরা ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
আমাদের মাদরাসাগুলোও পারে—যদি নেতৃত্ব সৎ হয়, দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়, এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এক একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। একটি “জামিয়া আলিয়া” ধাঁচের জ্ঞানকেন্দ্রিক মডেল—যেখানে থাকবে সমন্বিত কারিকুলাম, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা, ভাষাগত দক্ষতা, গবেষণাগার, উদ্ভাবনী কেন্দ্র, এবং মানবিক মূল্যবোধের চর্চা—সেটিই হতে পারে আগামী বাংলাদেশের শিক্ষা বিপ্লবের ভিত্তি।
আমরা এমন এক বাংলাদেশ কল্পনা করি— যেখানে মাদরাসা থেকে বেরিয়ে আসা তরুণ কেবল ইমাম বা খতিবই নয়, হতে পারে বিজ্ঞানী, নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিদ কিংবা মানবাধিকার গবেষক। যেখানে সাধারণ শিক্ষার শিক্ষার্থীও নিজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক শিকড় সম্পর্কে সচেতন ও শ্রদ্ধাশীল।
যেখানে দ্বিমুখী শিক্ষাব্যবস্থার বিভাজন ভেঙে একটি অভিন্ন জাতীয় জ্ঞান কাঠামো গড়ে ওঠে।
এই রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন “মাওলানা-সংস্কার”—অর্থাৎ এমন নেতৃত্ব, যারা ভয় নয়, জ্ঞান বিতরণ করবেন; বিভাজন নয়, ঐক্যের শিক্ষা দেবেন; অন্ধ আনুগত্য নয়, সমালোচনামূলক চিন্তার দীক্ষা দেবেন। কেননা মাওলানা আজাদ প্রমাণ করেছিলেন—একজন আলেম একটি জাতির আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার স্থপতি হতে পারেন। বাংলাদেশও পারে সেই ইতিহাস পুনর্লিখন করতে—যদি আমরা সাহস করি। আজ সময় এসেছে স্বপ্ন দেখার— প্রতিটি মাদরাসা হবে গবেষণাকেন্দ্র। প্রতিটি মাওলানা হবেন জ্ঞানতাপস। প্রতিটি শিক্ষার্থী হবে মানবিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও দায়িত্বশীল নাগরিক। তখনই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে একটি জ্ঞাননির্ভর, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে— আমরা কি সেই মাওলানাকে গড়ে তুলতে প্রস্তুত? নাকি আমরা অপেক্ষা করব, যতক্ষণ না ইতিহাস আবার আমাদের সামনে কোনো আজাদকে পাঠায়? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমাদের এই সিদ্ধান্তের ওপর।
এই আলোচনার সবচেয়ে গভীর শিক্ষা হলো—একটি মুসলিম দেশকে ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হয় না; বরং প্রয়োজন এ দুয়ের সৃজনশীল সমন্বয়। সত্যিকারের শিক্ষা সংস্কার মানে ইসলামী শিক্ষাকে সরিয়ে আধুনিক ব্যবস্থা বসানো নয়, আবার আধুনিক বিজ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করে কেবল প্রথার আশ্রয় নেওয়াও নয়; বরং একটি সমন্বিত জ্ঞানব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সব ধারার জ্ঞান একে অপরকে সমৃদ্ধ করে। সেখানে ঈমান অনুসন্ধিৎসাকে গভীর করে, বিজ্ঞান সমাজকে শক্তিশালী করে, নৈতিকতা উদ্ভাবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে, এবং শিক্ষা এমন মানুষ তৈরি করে যারা কেবল দক্ষ কর্মী নয়, বরং চিন্তাশীল, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক। এই ভারসাম্য অর্জিত হলেই একটি মুসলিম জাতি আধুনিক বিশ্বে বৌদ্ধিক জাগরণ, অর্থনৈতিক স্থিতি এবং নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।
উপরের আলোচনা থেকে বলা যায়, একজন প্রকৃত ইসলামী স্কলার হওয়া মানে কেবল উপাধি ধারণ করা নয়, বরং জ্ঞান, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্বের সমন্বয়ে একটি সচেতন জীবন গড়ে তোলা। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ আমাদের দেখিয়েছেন—ঐতিহ্যে দৃঢ় থেকে আধুনিকতায় উন্মুক্ত হওয়া যায়; ধর্মীয় শিকড় ধারণ করেও বিজ্ঞান, যুক্তি ও রাষ্ট্রচিন্তার পথপ্রদর্শক হওয়া যায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাঁর জীবন একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: ক্ষমতাকেন্দ্রিক নয়, আদর্শকেন্দ্রিক আলেম দরকার; বিভাজনের নয়, সংলাপের কণ্ঠ দরকার; আবেগের নয়, জ্ঞান ও নৈতিক সাহসের নেতৃত্ব দরকার। শিক্ষা, আত্মসমালোচনা ও মানবিক দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়েই মিম্বর থেকে সমাজ পরিবর্তনের প্রকৃত সূচনা সম্ভব।
শেষ কথা হিসেবে বলা যায়, একজন যখন মাওলানা হবেন আধুনিকতার সারথি। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ মক্কা থেকে কলকাতা, আর কলকাতা থেকে দিল্লির যে দীর্ঘ যাত্রা পাড়ি দিয়েছিলেন, তা ছিল মূলত অন্ধত্ব থেকে আলোর পথে যাত্রা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একজন সত্যকারের 'মাওলানা' কখনোই প্রগতির বিরোধী হতে পারেন না। বাংলাদেশে যদি আমরা এমন একটিও পাইলট প্রজেক্ট সফল করতে পারি, তবে সেটিই হবে আগামী দিনের শিক্ষা বিপ্লবের ব্লু-প্রিন্ট। রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি করা নেতৃত্বের ভিড়ে আমরা যদি আজাদের মতো 'শিক্ষক-রাজনীতিবিদ' তৈরি করতে পারি, তবেই আমাদের স্বাধীনতা ও শিক্ষা সার্থক হবে।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের শিক্ষা দর্শনের মূল কথা ছিল—এক হাত থাকবে ঐতিহ্যে, অন্য হাত আধুনিকতায়। তিনি দিল্লির উপকণ্ঠে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়াকে কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নয়, বরং একটি জীবন্ত পরীক্ষাগার হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে জাতীয়তা, নৈতিকতা ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয় ঘটেছিল বাস্তব চর্চায়। সেই আলোকে বাংলাদেশে একটি সমন্বিত পাইলট প্রকল্প—‘আজাদী শিক্ষা কমপ্লেক্স’—গড়ে তোলার প্রস্তাব করা যায়, যা মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষার বিভাজন দূর করে এক নতুন শিক্ষামডেল উপস্থাপন করবে।
প্রথমত, অবকাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। আমাদের দেশে মাদ্রাসা ও সাধারণ বিদ্যালয় সাধারণত ভৌগোলিকভাবে আলাদা। ফলে শিশুদের মনেও অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হয়। প্রস্তাবিত মডেলে একই ক্যাম্পাসে থাকবে ‘হিফজ/তাকমিল’ বিভাগ এবং ‘বিজ্ঞান/মানবিক’ বিভাগ। খেলার মাঠ, গ্রন্থাগার, ল্যাবরেটরি, মিলনকেন্দ্র ও ক্যাফেটেরিয়া হবে সবার জন্য উন্মুক্ত। একসাথে খেলবে, একসাথে পড়বে, একসাথে বিতর্ক করবে—শৈশব থেকেই সামাজিক সেতুবন্ধ গড়ে উঠবে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতা একই প্রাঙ্গণে সহাবস্থান করবে।
দ্বিতীয়ত, রুটিন ও পাঠক্রমে সমন্বয় আনতে হবে। একপাক্ষিক ধর্মীয় বা একপাক্ষিক সেক্যুলার শিক্ষার পরিবর্তে দিনের সময়সূচি হবে ভারসাম্যপূর্ণ। সকাল সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত কুরআন, হাদিস, আরবি ভাষা, পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষা। সকাল এগারোটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি। বিকেলে থাকবে বৃত্তিমূলক ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ—যেমন গ্রাফিক ডিজাইন, কৃষি প্রযুক্তি, রোবোটিক্স, ইলেকট্রনিক্স, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ। ফলে একজন শিক্ষার্থী একই সাথে ধর্মীয় জ্ঞান, আধুনিক বিজ্ঞান ও বাস্তব জীবনের দক্ষতা অর্জন করবে।
তৃতীয়ত, ‘আজাদী লাইব্রেরি’ হবে এই প্রকল্পের প্রাণকেন্দ্র। এটি শুধু বই রাখার ঘর নয়, জ্ঞানের উৎসবস্থল। এখানে যেমন ইমাম গাজ্জালীর ‘এহইয়াউ উলুমিদ্দীন’ থাকবে, তেমনি থাকবে সমকালীন বিজ্ঞানচিন্তার বই, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি বিষয়ক গ্রন্থ। মাদ্রাসার ছাত্র যেন মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে পড়তে পারে, আর সাধারণ ধারার ছাত্র যেন ইসলামের স্বর্ণযুগের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হতে পারে। পাঠচক্র, মুক্ত আলোচনা, বিতর্ক ও গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমে লাইব্রেরিকে সক্রিয় শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে।
চতুর্থত, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। এই পাইলট প্রকল্পের গভর্নিং বডিতে কোনো দলীয় রাজনীতির প্রতিনিধি থাকবে না। থাকবেন শিক্ষাবিদ, আলেম, প্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী। ক্যাম্পাসে কোনো ছাত্ররাজনীতি বা দলীয় ব্যানার থাকবে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা হবে এই মডেলের মূল নীতি। লক্ষ্য হবে জ্ঞানচর্চা, দলীয় প্রভাব নয়।
পঞ্চমত, মূল্যায়ন পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। কেবল পরীক্ষার নম্বর দিয়ে শিক্ষার্থীর সাফল্য নির্ধারণ করা হবে না। মূল্যায়নের অংশ হবে সমালোচনামূলক চিন্তা, গবেষণামূলক প্রকল্প, সামাজিক সেবা এবং নৈতিক আচরণ। প্রতি শিক্ষার্থীকে বছরে অন্তত একটি কমিউনিটি সার্ভিস প্রকল্পে অংশ নিতে হবে—যেমন প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পড়ানো, বৃক্ষরোপণ, স্বাস্থ্যসচেতনতা কর্মসূচি। ফলে শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির মাধ্যম না হয়ে সামাজিক দায়িত্ববোধের ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।
ষষ্ঠত, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মানোন্নয়নকে কেন্দ্রে রাখতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষকরা আধুনিক পেডাগজি ও প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষিত হবেন, আর বিজ্ঞান ও সাধারণ শিক্ষার শিক্ষকরা ইসলামী ঐতিহ্য ও নৈতিক দর্শন সম্পর্কে ধারণা পাবেন। দুই ধারার শিক্ষকদের মধ্যে নিয়মিত একাডেমিক সংলাপ হবে। এতে পারস্পরিক সম্মান ও সমন্বয় গড়ে উঠবে।
সপ্তমত, অর্থায়ন ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি অনুদান, ওয়াকফ সম্পদ, প্রবাসী দাতাদের সহায়তা এবং সামাজিক উদ্যোক্তা কার্যক্রমের মাধ্যমে স্বনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের তৈরি পণ্য বা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বাজারজাত করে আয়ের পথও তৈরি করা সম্ভব।
এই ‘আজাদী শিক্ষা কমপ্লেক্স’ কেবল একটি স্কুল বা মাদ্রাসা হবে না; এটি হবে একটি সামাজিক রূপান্তরের পরীক্ষাগার। এখানে একজন শিক্ষার্থী কেবল হাফেজ বা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হবে না; সে হবে নৈতিক, বিজ্ঞানমনস্ক, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক। ঐতিহ্যকে অস্বীকার নয়, আধুনিকতাকে ভয় নয়—বরং দুই ধারার সৃজনশীল মিলনই হবে এই মডেলের ভিত্তি।
বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারের দীর্ঘ আলোচনায় এটি একটি পাইলট হিসেবে শুরু হতে পারে। সফল হলে এই মডেল ধীরে ধীরে অন্যান্য অঞ্চলে বিস্তৃত হতে পারে। কারণ শেষ পর্যন্ত শিক্ষা দালানকোঠা নির্মাণ নয়; এটি মানুষ গড়ার প্রকল্প। আর সেই মানুষ হবে শিকড়ে দৃঢ়, চিন্তায় মুক্ত, এবং কাজে মানবিক।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
📌 SEO Hashtags (Online Publication | One Line Format)
#শিক্ষা_সংস্কার #মাদরাসা_ও_সাধারণ_শিক্ষা #জামিয়া_মডেল #আজাদী_মডেল #মাওলানা_আবুল_কালাম_আজাদ #সমন্বিত_কারিকুলাম #বাংলাদেশের_শিক্ষা #শিক্ষা_বিপ্লব #ধর্ম_ও_বিজ্ঞান #রাজনৈতিক_নিরপেক্ষতা #বৃত্তিমূলক_শিক্ষা #গবেষণাভিত্তিক_শিক্ষা #শিক্ষা_ও_গণতন্ত্র #EducationReform #IntegratedEducation #MadrasahReform #BangladeshEducation