02/28/2026 আর হলো না বাড়ি ফেরা: পুরোনো কাব্যগ্রন্থ কি বাংলা একাডেমি পুরস্কার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু
Special Correspondent
২৭ February ২০২৬ ২২:০০
নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
ঘোষণা করা হয়েছিল নাম। অংশ নিয়েছিলেন পুরস্কার গ্রহণের মহড়ায় (রিহার্সাল) এমনকি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিতও ছিলেন। কিন্তু মঞ্চ থেকে ডাক এল না কবি মোহন রায়হানের। ২০২৫ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের কবিতা বিভাগে মনোনীত হয়েও শেষ মুহূর্তে কবি মোহন রায়হানের পুরস্কার স্থগিত করা নিয়ে এখন দেশজুড়ে বইছে বিতর্কের ঝড়। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উঠছে প্রশ্ন এটি কি কেবলই প্রক্রিয়াগত স্থগিতাদেশ নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নতুন রূপ?
ঘটনার সূত্রপাত ও নাটকীয় মোড়
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনীতদের নাম ঘোষণা করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে কবিতা বিভাগে জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি মোহন রায়হানের নাম জানানো হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। কিন্তু দেখা যায় তালিকায় নাম থাকলেও মঞ্চে মোহন রায়হানের নাম ঘোষণা করা হয়নি।
কবি মোহন রায়হানের অভিযোগ:
ক্ষুব্ধ ও অপমানিত কবি অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত আর হলো না বাড়ি ফেরা কাব্যগ্রন্থের তাহেরের স্বপ্ন কবিতায় কর্নেল তাহেরকে নিয়ে লেখার কারণে একটি মহলের প্ররোচনায় প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে তাঁর পুরস্কার বাতিল করানো হয়েছে। ৪১ বছর আগে কর্নেল তাহেরকে নিয়ে লেখা আমার তাহেরের স্বপ্ন কবিতার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিয়ে একটি মহল আমার পুরস্কার বাতিল করিয়েছে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য: অভিযোগ বনাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা
পুরস্কার স্থগিতের বিষয়ে সরকার ও বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ অভিযোগ খতিয়ে দেখার কথা বলছে। সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম জানিয়েছেন, কবির বিরুদ্ধে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ আসায় বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে। তবে অভিযোগগুলো ঠিক কী প্রকৃতির তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি তাঁরা। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন মোহন রায়হানের কবিতা ও লেখালেখি সম্পর্কে কিছু অভিযোগ ওঠায় কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে পুরস্কার স্থগিত করেছে। এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়ে গেলে আমরা অবিলম্বে জানাব।
নেপথ্যে কি রাজনৈতিক সমীকরণ?
পুরস্কার ঘোষণার পর থেকেই জাতীয়তাবাদী ঘরানার ২৭ জন লেখক একটি যৌথ বিবৃতিতে মোহন রায়হানের নাম প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল মোহন রায়হান তাঁর কবিতায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নেতিবাচকভাবে চিত্রায়িত করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই চাপের মুখেই কি বাংলা একাডেমি তাদের স্বায়ত্তশাসিত অবস্থান থেকে পিছু হঠল?
প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এক বিবৃতিতে একে মুক্তবুদ্ধি চর্চার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি অবিলম্বে কবিকে যথাযথ মর্যাদায় পুরস্কার প্রদান করা। কার প্ররোচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তা স্পষ্ট করা। সৃজনশীল কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা।
জিজ্ঞাসার মুখে কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন
১. পদ্ধতিগত ত্রুটি: যদি অভিযোগ থেকেই থাকে, তবে চূড়ান্ত মনোনয়নের আগে কেন তা খতিয়ে দেখা হলো না?
২. প্রতিষ্ঠানিক মর্যাদা: পুরস্কার ঘোষণার পর তা স্থগিত করা কি বাংলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও ঐতিহ্যকে ক্ষুণ্ণ করছে না?
৩. শিল্পের স্বাধীনতা: চার দশক আগের কোনো কবিতার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কি বর্তমানে একজন লেখকের সাহিত্যিক মূল্যায়নের অন্তরায় হতে পারে?
৪. ভবিষ্যৎ: সরকার সাময়িক স্থগিত বললেও রাজনৈতিক বিরোধের এই জল কতদূর গড়াবে?
মোহন রায়হানের পুরস্কার প্রাপ্তি এখন ঝুলে আছে তদন্তের ফিতায়। সাহিত্যিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে পুরস্কার কি তবে এখন কেবল সাহিত্যের মানের ওপর নয় বরং রাজনৈতিক মতাদর্শের শুদ্ধি পরীক্ষার ওপরও নির্ভর করবে?
---মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র