03/01/2026 ক্ষতবিক্ষত শিক্ষাঙ্গন: ড. ইউনুস সরকারের ১৮ মাসের ‘দুঃশাসন’ শেষে ন্যায়বিচারের আর্তনাদ
odhikarpatra
১ March ২০২৬ ১১:১০
বিশেষ সংবাদদাতা | ঢাকা
ফাল্গুনের তপ্ত সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হল আজ এক অন্যরকম গুমোট আবহাওয়ার সাক্ষী হলো। দেয়ালে টাঙানো ব্যানার বলছে ‘বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’-এর সংবাদ সম্মেলন। কিন্তু আয়োজকদের চোখেমুখে ছিল দীর্ঘ ১৮ মাসের এক রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতার ছাপ। ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সেই দেড় বছরের সময়কালকে ‘মব সন্ত্রাসের রাজত্ব’ হিসেবে অভিহিত করে শিক্ষাঙ্গনে একাডেমিক ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি তুললেন বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা।
রোববার (১ মার্চ, ২০২৬) বেলা ১১টায় আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত শিক্ষকরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তব্য শুরু করেন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ সেইসব বন্ধুরাষ্ট্রের প্রতি, যারা একাত্তরে বাংলাদেশের পাশে ছিল। তবে বক্তব্যের মূল সুরটি দ্রুতই মোড় নেয় গত ১৮ মাসের ‘অরাজকতার’ ক্যানভাসে।
মব সন্ত্রাস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মৃত্যুকূপ’
লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম অহিদুজ্জামান। সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালযয়ের শিক্ষকরা উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, ড. ইউনুসের শাসনামলে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক একটি ‘মৃত্যুকূপে’ পরিণত করা হয়েছিল। তাদের দাবি, তথাকথিত ‘ট্যাগিং’ বা তকমা লাগিয়ে শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয় করা, মারধর এবং জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
বক্তারা বলেন, "শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যে পবিত্র আত্মিক বন্ধন, তা সুকৌশলে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। যে হাতে ছাত্ররা কলম ধরবে, সেই হাতে শিক্ষকদের অপমান করানোর এক সংস্কৃতি চালু করা হয়েছিল। এটি শুধু ব্যক্তির অপমান নয়, বরং পুরো জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার এক সুগভীর ষড়যন্ত্র।"
সংখ্যা আর কান্নার খতিয়ান
সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসে এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান। বক্তারা জানান, শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কয়েক হাজার নিয়মিত শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়েছে। এমনকি ডিগ্রি অর্জন করা শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট পর্যন্ত বাতিলের নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত হাজার হাজার শিক্ষককে অপমানজনকভাবে বিদায় দেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা এবং অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিলের বিষয়টিও তীব্র নিন্দার সাথে স্মরণ করা হয়।
১৪ দফার ‘মুক্তিসনদ’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায় ও নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এখন ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন শিক্ষকরা। এই লক্ষ্যে তারা ১৪ দফা দাবি পেশ করেছেন। যার মধ্যে প্রধান দাবিগুলো হলো:
* পুনর্বহাল: বহিষ্কৃত ও সাময়িকভাবে বরখাস্ত হওয়া সকল শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে অবিলম্বে স্বপদে ফিরিয়ে আনা।
* মামলা প্রত্যাহার: শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক’ মামলা দ্রুত প্রত্যাহার করা।
* কারামুক্তি: বন্দি অবস্থায় থাকা শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও প্রকৌশলীসহ সকল পেশাজীবীর মুক্তি।
* আর্থিক সুরক্ষা: বন্ধ রাখা বেতন-ভাতা বকেয়াসহ পরিশোধ করা এবং পদোন্নতি বঞ্চনার অবসান ঘটানো।
* শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা: যাদের ছাত্রত্ব ও সার্টিফিকেট বাতিল করা হয়েছে, তাদের শিক্ষাজীবন ফিরিয়ে দেওয়া।
শেষ কথা: শান্তির প্রত্যাশা
সংবাদ সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্যে শিক্ষক নেতারা বলেন, শিক্ষা কোনো প্রতিহিংসা চর্চার চারণভূমি হতে পারে না। এটি রাষ্ট্রের পবিত্র প্রতিষ্ঠান। গত ১৮ মাসে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা সারাতে নতুন সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা। ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে শেষ হওয়া এই সম্মেলনটি যেন কেবল একগুচ্ছ দাবি নয়, বরং দীর্ঘ দেড় বছরের অবদমিত ক্ষোভ আর বিচার পাওয়ার আকুতির এক জীবন্ত দলিল হয়ে রইল।
এখন দেখার বিষয়, নতুন প্রশাসন এই ‘ক্ষতবিক্ষত’ শিক্ষাঙ্গনের আর্তনাদ শুনে কতটা দ্রুত মলম লাগাতে পারে।
প্রেস বিজ্ঞপ্তি