03/01/2026 ১৮ মাসের ‘মবসন্ত্রাস’ ও দুঃশাসনে ক্ষতবিক্ষত শিক্ষাঙ্গন: একাডেমিক ন্যায়বিচার ও শৃঙ্খলা ফেরানোর দাবি প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের
odhikarpatra
১ March ২০২৬ ১৫:৩৩
– ঢাকা | ১লা মার্চ, ২০২৬
জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে শিক্ষাঙ্গনে অরাজকতা, শিক্ষক নিগ্রহ ও বাকস্বাধীনতা হরণের অভিযোগ তুলে ১৪ দফা দাবি পেশ করেছে। বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার, মিথ্যা মামলা বাতিল, পেশাজীবীদের মুক্তি এবং শিক্ষার পরিবেশ পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানানো হয় সম্মেলনে।
ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন ১৮ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ‘প্রতিহিংসার শাসন’ আখ্যা দিয়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম অরাজকতার চিত্র তুলে ধরেছে বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ। আজ সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তারা এই দাবি জানান।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দুলাল চন্দ্রের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ড. এম অহিদুজ্জামান। সভায় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. জিনাত হুদা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান। সাংবাদিক সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলদলের আহ্বায়ক আকম জামালউদ্দিন, অধ্যাপক ড. তৌহিদা রশীদ, অধ্যাপক ড. সুরাইয়া আক্তার, অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান, অধ্যাপক ড. শবনম জাহান, অধ্যাপক ড. বআজমল হোসেন ভূইয়া, অধ্যাপক ড. জামিলা এ চৌধূরী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. কামাল উদ্দিন, গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তা এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের, রাজশাহী বিশ্বাবিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রতিনিধিরা।
ভয় আর কান্নার ১৮ মাস
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, গত ১৮ মাসে অসাংবিধানিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ছায়ায় শিক্ষাঙ্গন এক ‘মৃত্যুকূপে’ পরিণত হয়েছিল। শিক্ষকদের দাবি, ‘ট্যাগিং’ ও ‘মব সন্ত্রাসের’ মাধ্যমে বরণ্যে শিক্ষকদের জনসমক্ষে অপদস্থ করা হয়েছে, যা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত হাজার হাজার শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনাকে তারা ‘জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার ষড়যন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করেন।
বক্তারা বলেন, "ড. ইউনুসের শাসনামলে জ্ঞানচর্চার পবিত্র চত্বরগুলো হয়ে উঠেছিল কুৎসিত প্রতিহিংসা চর্চার চারণভূমি। মেধাবী শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট বাতিল এবং নিয়মিত ছাত্রদের ছাত্রত্ব কেড়ে নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেওয়া হয়েছে।"
কণ্ঠরোধ ও পেশাজীবী নিগ্রহ
শিক্ষাঙ্গনের গণ্ডি পেরিয়ে বক্তারা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করেন। তারা অভিযোগ করেন, বাক-স্বাধীনতার নামে ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা এবং অসংখ্য গণমাধ্যমকর্মীর অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল করে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। একই সাথে শিল্প-কলকারখানা বন্ধ করে লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে বেকার করার জন্য তারা বিগত প্রশাসনকে দায়ী করেন।
নতুন সরকারের কাছে ১৪ দফা দাবি
বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষাঙ্গনে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ ১৪টি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেছে। এখানে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত ১৪ দফা দাবিনামা পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরা হলো:
১. বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার: গত ১৮ মাসে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে যে সকল শিক্ষককে বহিষ্কার বা সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে, তাদের বহিষ্কারাদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করে দ্রুত শ্রেণিকক্ষে ফেরার সুযোগ দিতে হবে।
২. মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার: শিক্ষকদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দায়েরকৃত সকল মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
৩. পেশাজীবীদের মুক্তি: কারাবন্দি শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, সাহিত্যিক, শিল্পী, প্রকৌশলীসহ সকল নিরপরাধ পেশাজীবীকে অবিলম্বে বিনাশর্তে মুক্তি দিতে হবে।
৪. মব সন্ত্রাস বন্ধ ও তদন্ত বাতিল: মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে শিক্ষকদের একাডেমিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা এবং তাদের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘তদন্ত কমিটির’ নামে হয়রানি ও একাডেমিক বয়কটের সকল আদেশ বাতিল করতে হবে।
৫. পদোন্নতি ও বঞ্চনা নিরসন: অবৈধভাবে পদ অবনমন (Demotion) এবং বাধ্যতামূলক অবসরের আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। একই সাথে যোগ্য শিক্ষকদের বকেয়া একাডেমিক পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে।
৬. প্রশাসনিক পদে পুনর্বহাল: বেআইনিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদ থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বা পদত্যাগে বাধ্য করা শিক্ষকদের সসম্মানে তাদের স্বপদে পুনর্বহাল করতে হবে।
৭. বেতন-ভাতা পরিশোধ: শিক্ষকদের বন্ধ রাখা বেতন-ভাতা বকেয়াসহ অবিলম্বে চালু করতে হবে।
৮. শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেওয়া: রাজনৈতিক কারণে বহিষ্কৃত সাধারণ শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারাদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করে তাদের শিক্ষাজীবনে ফেরার পথ সুগম করতে হবে।
৯. সার্টিফিকেট পুনর্বহাল: ডিগ্রিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের বাতিল করা সার্টিফিকেট বা সনদপত্রের আদেশ দ্রুত প্রত্যাহার করতে হবে।
১০. কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুরক্ষা: অন্যায়ভাবে বহিষ্কৃত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে।
১১. পেশাজীবীদের পুনর্বহাল: সাংবাদিক, ডাক্তার, প্রকৌশলীসহ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুত সকল পেশাজীবীকে তাদের নিজ নিজ কর্মস্থলে পুনর্বহাল করতে হবে।
১২. জোরপূর্বক পদত্যাগের প্রতিকার: সারাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসার যে সকল অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের মব জাস্টিসের মাধ্যমে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল, তাদের চাকরিতে পুনঃনিয়োগ ও যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
১৩. শ্রমিকদের কর্মসংস্থান: বন্ধ হওয়া কলকারখানা খুলে দিয়ে চাকরিচ্যুত লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে কাজে পুনর্বহাল করতে হবে।
১৪. বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ: গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ বন্ধ করে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং বাতিলকৃত অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডগুলো অবিলম্বে ফিরিয়ে দিতে হবে।
‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে শেষ হওয়া এই সম্মেলনে শিক্ষকরা আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন সরকার দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে দেশের শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষকদের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করবে।
(প্রেস বিজ্ঞপ্তি-02/03/26)
#ঢাকা #১লা_মার্চ_২০২৬ #সংবাদ_সম্মেলন #প্রগতিশীল_শিক্ষক_সমাজ #শিক্ষাঙ্গনে_অরাজকতা #অন্তর্বর্তীকালীন_সরকার #শিক্ষা_সংকট #শিক্ষক_নিগ্রহ #বাকস্বাধীনতা #১৪দফা_দাবি #শিক্ষা_পুনরুদ্ধার #মব_সন্ত্রাস #শিক্ষক_পুনর্বহাল #জয়_বাংলা