03/03/2026 ২ মার্চ — পতাকার মান ও উচ্চশিক্ষার বিপন্ন গরিমা: স্মৃতির আয়নায় সেই ফাগুন ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা (সম্পাদকীয়)
Dr Mahbub
২ March ২০২৬ ২১:৪৩
— অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক (পর্ব ৮): বিশেষ সম্পাদকীয়
ঐতিহাসিক বটতলার শপথ কি আজ বিশ্ববিদ্যালয় ভুলতে বসেছে? এই সম্পাদকীয়তে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষকের মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে ঘিরে গত দেড় বছরের অস্বস্তিকর বাস্তবতার বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে। ২ মার্চের ঐতিহাসিক পতাকা উত্তোলনের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সংকট, শিক্ষক লাঞ্ছনা, প্রশাসনিক নীরবতা এবং উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে রচিত হয়েছে শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের বিশেষ এই অধিকারপত্র।
এই লেখায় অনুসন্ধান করা হয়েছে—স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর কেন সেই পবিত্র পতাকা উত্তোলনের ভূমিতেই শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মুখোমুখি অবস্থান নিতে হচ্ছে? পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থার জায়গায় কেন জন্ম নিচ্ছে বিভাজন ও অস্থিরতা? যে চত্বর একদিন স্বাধীনতার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল, সেখানে আজ কেন শিক্ষকের মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে?
এ কি কেবল সাময়িক অস্থিরতা, নাকি জাতির জন্য এক গভীর অশনি-সংকেত? উচ্চশিক্ষার আকাশে কি সত্যিই জমে উঠছে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের মেঘ? আমরা কি সেই সংকেত পড়তে পারছি—নাকি ইচ্ছাকৃত নীরবতায় তাকে উপেক্ষা করছি?
১৯৭১ সালের ২ মার্চ। বসন্তের তপ্ত দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সেই ঐতিহাসিক বটতলা সাক্ষী হয়েছিল এক অমর মহাকাব্যের। ছাত্রজনতার উত্তাল সমুদ্রে প্রথম উত্তোলিত হয়েছিল গাঢ় সবুজের মাঝে লাল বৃত্তের সেই পতাকা— আমাদের পরিচয়, আমাদের অস্তিত্ব। কিন্তু অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে আজ যখন আমরা সেই ‘জাতীয় পতাকা উত্তোলন দিবস’ পালন করছি, তখন সেই পবিত্র মাটির বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেজে উঠছে। যে প্রাঙ্গণ আমাদের শিখিয়েছিল অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করতে, সেই প্রাঙ্গণেই গত দেড় বছরে শিক্ষকতা ও শিক্ষার মর্যাদা বারবার হোঁচট খেয়েছে।
১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঐতিহাসিক বটতলার উত্তাল জনসমুদ্রে প্রথমবার উড্ডীন স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা। সেদিন উচ্চরিত হলো মর্যাদার বাণী, সেই ফাগুনের তপ্ত দুপুরে শিক্ষক আর শিক্ষির্থীকর্র্তক উচ্চারিত হলো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াইয়ের শপথ, রচিত হলো একটি জাতির আত্মপরিচয় ও শৃঙ্খলমুক্তির এক অবিনাশী মহাকাব্য। কিন্তু অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে আজ যখন আমরা সেই ‘জাতীয় পতাকা উত্তোলন দিবস’ পালন করছি, তখন সেই পবিত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটির বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেজে উঠছে। যে প্রাঙ্গণ আমাদের শিখিয়েছিল অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করতে এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চায় সমাজকে আলোকিত করতে, সেই প্রাঙ্গণেই গত দেড় বছরে শিক্ষকতা ও শিক্ষার মর্যাদা বারবার ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। আজ পতাকা দিবসের গৌরবের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে গত ১৮ মাসের সেই ধূসর দিনলিপি, যেখানে গুরু-শিষ্যের চিরায়ত সম্পর্কের দেয়ালে ধরেছে বিশাল ফাটল এবং উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ আজ এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে।
২ মার্চের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ শুধু একটি কাপড় ওড়ানোর ঘটনা ছিল না; ওটা ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম দৃশ্যমান বিদ্রোহ। শিক্ষকদের আদর্শ আর ছাত্রদের সংকল্প মিলেমিশে একাকার হয়েছিল সেদিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেদিন ছিলেন বাতিঘরের মতো, যাদের হাত ধরে জন্মেছিল একটি জাতি। কিন্তু আজকের চিত্রপট যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের গল্প বলছে। গত আঠারো মাসে এই চত্বরেই আমরা দেখেছি গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের চিরায়ত দেয়ালে ফাটল ধরতে।
১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে চত্বরে প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল, সেই মাটি আজ এক নীরব হাহাকারের সাক্ষী। যে তর্জনী হেলনে একদিন অধিকার আদায়ের লড়াই শুরু হয়েছিল, আজ সেই প্রাঙ্গণেই শিক্ষকরা লাঞ্ছিত, অপদস্থ এবং অধিকারবঞ্চিত। গত দেড় বছরে উচ্চশিক্ষার আঙিনায় যে নজিরবিহীন অরাজকতা আমরা প্রত্যক্ষ করছি, তা কেবল শিক্ষার পরিবেশ নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডকেই আজ প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বিগত দেড় বছরের খতিয়ান খুললে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই গণতান্ত্রিক ও জ্ঞানভিত্তিক পরিবেশ আজ এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কেবল ভিন্ন মতাদর্শ পোষণ করার কারণে প্রায় ৮০ জন শিক্ষককে তাদের নিয়মিত একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখা হয়েছে। এটি কেবল কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভিন্নমতের ওপর এক চূড়ান্ত খড়গহস্ত। আমরা প্রত্যক্ষ করেছি কীভাবে একদল বিপথগামী মব বা উগ্র জনতাকে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের উৎসাহিত করা হয়েছে প্রবীণ শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলতে কিংবা কুরুচিপূর্ণ ভাষায় অপমান করতে। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র চত্বরে প্রকাশ্যে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর বিচার বা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বরং এক ধরনের রহস্যজনক নীরবতা পালন করে এই মব জাস্টিস বা গণপিটুনির সংস্কৃতিকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, যা একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্য চরম লজ্জার ও নৈতিক পরাজয়ের শামিল।
নিপীড়নের এই ধারা কেবল কায়িক লাঞ্ছনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে ডিজিটাল জগতের অন্ধকার অলিগলিতেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে 'ব্যানারি টালিতে' বা কুরুচিপূর্ণ ভাষায় চরম অপমানজনক প্রচার চালানো হচ্ছে। ব্যক্তিগত চরিত্র হরণ থেকে শুরু করে পারিবারিক কুৎসা রটানোর মাধ্যমে শিক্ষকদের সামাজিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার এক নারকীয় উল্লাস আমরা দেখছি। এই ধরণের অপপ্রচার বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শৃঙ্খলা বিধি এবং রাষ্ট্রীয় আইনে পরিষ্কারভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি অনেক শিক্ষকের ব্যক্তিগত অফিস কক্ষ মাসের পর মাস তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে, যা একজন জ্ঞানতাপসের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপমানের। যখন একজন শিক্ষক তার নিজের কর্মস্থলে প্রবেশের অধিকার হারান এবং প্রতিষ্ঠান তার সুরক্ষায় এগিয়ে আসে না, তখন সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বের সংকট প্রকট হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর চিরকালীন পবিত্র সম্পর্কে যে অবিশ্বাসের বিষবাষ্প পরিকল্পিতভাবে প্রবেশ করানো হলো, তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব হবে ভয়াবহ। শিক্ষক যখন ক্লাসরুমে ছাত্রের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে ভয় পান, কিংবা শিক্ষার্থী যখন তার শিক্ষকের প্রতিটি কথাকে শ্রদ্ধার বদলে সন্দেহের চশমায় বিচার করে, তখন সেখানে আর শিক্ষা থাকে না—থাকে কেবল এক ধরনের যান্ত্রিক লেনদেন। এই কৃত্রিম দূরত্ব ও ঘৃণা তৈরির রাজনীতি আমাদের উচ্চশিক্ষার মেরুদণ্ডকেই পঙ্গু করে দিচ্ছে। এর ফলে আগামী দিনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আর মুক্ত চিন্তার বিচরণভূমি থাকবে না, বরং তা পরিণত হবে একদল বশংবদ ও আজ্ঞাবহ গোষ্ঠী তৈরির কারখানায়। শিক্ষকের প্রতি অবজ্ঞা আর এই প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাসের সংস্কৃতি যদি একবার শিকড় গেড়ে বসে, তবে একটি মেধাবী প্রজন্ম কেবল জ্ঞান থেকেই বিচ্যুত হবে না, বরং তারা নৈতিকভাবেও চরম দেউলিয়া হয়ে পড়বে, যা কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
এই চরম দুঃসময়ে শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত 'শিক্ষক সমিতি' আজ এক অকার্যকর ও স্থবির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শিক্ষকদের স্বার্থ রক্ষা বা তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নে সমিতি যে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার কথা ছিল, তা আজ রাজনৈতিক মেরুকরণ আর ভয়ের সংস্কৃতির নিচে চাপা পড়ে গেছে। আমরা ব্যথিত হয়ে দেখছি, যখন একাধিক শিক্ষককে আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের পাশে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, ন্যূনতম মানবিক সহমর্মিতাও প্রদর্শন করেনি। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে, যার ফলে আজ সাধারণ শিক্ষকরা নিজেদের ক্লাসরুম কিংবা করিডোরেও এক ধরনের অদৃশ্য আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। শিক্ষার ভবিষ্যৎ আজ অন্ধকারাচ্ছন্ন, কারণ মেধা ও মুক্তচিন্তার বদলে আজ পেশিশক্তি আর চাটুকারিতা ক্যাম্পাস দখল করে নিয়েছে।
২ মার্চের সেই লাল-সবুজের পতাকা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আত্মমর্যাদা আর অদম্য সাহসের কথা। কিন্তু আজ যখন ক্যাম্পাসে সত্যের চেয়ে রাজনীতি বড় হয়ে ওঠে এবং শিক্ষকের চোখের জল নিজেরই ছাত্রের উস্কানিতে পড়ে, তখন সেই পতাকার মান রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। উচ্চশিক্ষার এই সংকট কাটাতে হলে কেবল ভূখণ্ড রক্ষা নয়, বরং সেই ভূখণ্ডের জ্ঞানালোকবাহী শিক্ষকদের সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র মাটি থেকে মব সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং শিক্ষকদের হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে না পারলে, আমাদের আগামীর প্রজন্ম এক বিশাল বৌদ্ধিক শূন্যতার মুখে পড়বে। পতাকার লাল বৃত্তটি যেমন ত্যাগের প্রতীক, তেমনি সবুজ অংশটি আমাদের সমৃদ্ধির; আর সেই সমৃদ্ধি তখনই সম্ভব যখন শিক্ষকের কলম আর সম্মান— দুই-ই সুরক্ষিত থাকবে এই বাংলার মাটিতে।
আগামীর অন্ধকার ও আমাদের করণীয়
২ মার্চের চেতনা ছিল শৃঙ্খল ভাঙার, মুক্তির প্রত্যয়ে দৃঢ় হয়ে ওঠার। অথচ আজ সেই একই চত্বরে যখন শিক্ষকদের অফিস কক্ষ তালাবদ্ধ পড়ে থাকে, তখন অনিবার্যভাবে প্রশ্ন জাগে—আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি আবারও অদৃশ্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে? এই স্থবিরতা কেবল প্রশাসনিক সংকট নয়; এটি বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার ওপর নীরব আঘাত। তাই অচলাবস্থা কাটাতে আমাদের সুস্পষ্ট ও সাহসী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রথমত, যে ৮০ জন শিক্ষককে কাজ থেকে বিরত রাখা হয়েছে, তাঁদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে অবিলম্বে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা উচিত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অসম্মান ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে দিলে তার অভিঘাত পড়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মে। দ্বিতীয়ত, সাইবার বুলিং ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষকদের চরিত্রহননে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি ও দেশের প্রচলিত আইনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এমন দুঃসাহস আর কেউ না দেখায়।
একই সঙ্গে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর হাতিয়ার হয়ে নয়, প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক হিসেবে প্রশাসনকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর শিক্ষক সমিতিরও সময় এসেছে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি পরিহার করে শিক্ষকদের সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষায় সক্রিয় ও সুস্পষ্ট ভূমিকা নেওয়ার। নীরবতা এখানে প্রকারান্তরে অন্যায়ের সহমত।
জাতীয় পতাকা আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। কিন্তু সেই সার্বভৌমত্ব তখনই অর্থবহ হয়, যখন দেশের জ্ঞানতাপসরা নিরাপদ ও মর্যাদাবান থাকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটি আজ শিক্ষক নিগ্রহের নীরব স্বীকৃতিতে কলঙ্কিত হতে বসেছে। ২ মার্চের এই ঐতিহাসিক দিনে আমাদের শপথ হওয়া উচিত—পতাকার মর্যাদা রক্ষা করতে হলে আগে তার কারিগরদের, অর্থাৎ শিক্ষকদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় উচ্চশিক্ষা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে; বাস্তবে তা রূপ নেবে এক মেধাশূন্য, অনুর্বর প্রান্তরে।
২ মার্চ — পতাকার মান ও উচ্চশিক্ষার বিপন্ন গরিমা
১৯৭১ সালের ২ মার্চ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের ঐতিহাসিক বটতলায় প্রথম উত্তোলিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত লাল-সবুজ পতাকা। সেটি কেবল একটি পতাকা ওড়ানোর মুহূর্ত ছিল না; ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার দৃশ্যমান ঘোষণা। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কণ্ঠে সেদিন উচ্চারিত হয়েছিল মর্যাদা, স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়ের শপথ। সেই দিনটি আমাদের জাতীয় চেতনার এক উজ্জ্বল স্তম্ভ হয়ে আছে।
অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে আজ যখন আমরা ‘জাতীয় পতাকা উত্তোলন দিবস’ স্মরণ করি, তখন একই প্রাঙ্গণের বর্তমান বাস্তবতা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। গত দেড় বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও শিক্ষার পরিবেশ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। গুরু-শিষ্যের চিরায়ত আস্থার সম্পর্ক প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, আর উচ্চশিক্ষার পরিসর ক্রমে সংকুচিত হয়েছে ভীতি, বিভাজন ও অনিশ্চয়তায়।
শুধু ভিন্ন মত পোষণের অভিযোগে প্রায় ৮০ জন শিক্ষককে নিয়মিত একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয়েছে—এমন ঘটনা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গভীর উদ্বেগের। এটি নিছক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বহুত্ববাদের জন্য অশনিসংকেত। যখন শিক্ষক নিজের কর্মস্থলে অনিশ্চয়তায় থাকেন, তখন শিক্ষার্থীর শেখার পরিবেশও স্বাভাবিক থাকে না।
এই সংকট কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকদের প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও উগ্র জনতার চাপ, কোথাও সংগঠিত অপমান—এসব ঘটনার যথাযথ ও দৃশ্যমান বিচার না হলে তা নীরব সমর্থনের শামিল হয়ে দাঁড়ায়। একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতা কেবল নীতিগত শব্দ নয়; এটি তার অস্তিত্বের ভিত্তি।
ডিজিটাল পরিসরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত কুৎসা, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও চরিত্রহননের প্রবণতা দেখা গেছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি ও প্রচলিত আইনে দণ্ডনীয় হলেও কার্যকর প্রতিকার দৃশ্যমান না হলে ভয়ের সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে ওঠে। শিক্ষক যদি সামাজিকভাবে অপদস্থ হওয়ার আতঙ্কে থাকেন, তবে মুক্তচিন্তার চর্চা বাধাগ্রস্ত হওয়াই স্বাভাবিক।
প্রশাসনের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পক্ষের প্রতি আনুগত্য নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক হিসেবে নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়াই তাদের দায়িত্ব। একইভাবে শিক্ষক সমিতিরও প্রয়োজন সক্রিয় ও সাহসী ভূমিকা। শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় সুস্পষ্ট অবস্থান না নিলে সংগঠনের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের অবনতি দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। যখন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কথা বলতে শঙ্কিত হন, কিংবা শিক্ষার্থী তার শিক্ষকের প্রতি আস্থা হারায়, তখন শিক্ষা জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র থেকে সরে গিয়ে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় তখন আর মুক্ত চিন্তার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ থাকে না; হয়ে ওঠে আনুগত্যনির্ভর কাঠামো।
এই প্রেক্ষাপটে ২ মার্চের স্মরণ আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। পতাকার লাল বৃত্ত ত্যাগের প্রতীক, সবুজ অংশ সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধির। কিন্তু সেই সমৃদ্ধি তখনই অর্থবহ, যখন জ্ঞানচর্চার পরিবেশ নিরাপদ ও সম্মানজনক থাকে। শিক্ষকের সম্মান রক্ষা করা মানে কেবল একটি পেশার মর্যাদা রক্ষা করা নয়; বরং রাষ্ট্রের বৌদ্ধিক ভিত্তি সুরক্ষিত রাখা।
অতএব, বর্তমান অচলাবস্থা কাটাতে প্রয়োজন সংলাপ, ন্যায়বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা। বিরত রাখা শিক্ষকদের বিষয়ে স্বচ্ছ ও ন্যায্য সিদ্ধান্ত, অপপ্রচার ও লাঞ্ছনার ঘটনায় কার্যকর তদন্ত, এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা—এসব পদক্ষেপ জরুরি। অন্যথায় উচ্চশিক্ষা কাগজে-কলমে টিকে থাকলেও তার প্রাণশক্তি নিঃশেষ হবে।
২ মার্চ আমাদের কেবল অতীতের গৌরব স্মরণ করায় না; এটি বর্তমানের দায়িত্বও স্মরণ করায়। পতাকার মান রক্ষা করতে হলে সেই পতাকার আদর্শকে ধারণ করতে হবে—মর্যাদা, ন্যায় ও স্বাধীন চিন্তার প্রতি অঙ্গীকারে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা পুনর্গঠন ছাড়া সেই অঙ্গীকার পূর্ণতা পাবে না। উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখাই আজকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শিক্ষা_সংস্কার #বটতলা #২_মার্চ #জাতীয়_পতাকা_উত্তোলন_দিবস #উচ্চশিক্ষা #ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় #AcademicFreedom