07/13/2026 হিংসার বাংলাদেশে নজরুলের প্রত্যাবর্তন কেন আজ অনিবার্য?
odhikarpatra
২১ May ২০২৬ ২৩:৫৯
অধিকারপত্র বিশেষ সম্পাদকীয় কলাম
বাংলার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে এই বিশেষ সম্পাদকীয় নিবন্ধে উঠে এসেছে তাঁর দ্রোহ, সাম্যবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক চেতনার কালজয়ী প্রাসঙ্গিকতা। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ, সামাজিক বিভাজন ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে নজরুলের সাহিত্য, গান ও বিদ্রোহী আত্মাকে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কেন আজকের তরুণ সমাজের জন্য ‘বিদ্রোহী’ কবির স্পর্ধা ও সাম্যের বাণী সবচেয়ে বড় প্রেরণা—তা গভীর আবেগ ও গবেষণাধর্মী বিশ্লেষণে তুলে ধরা হয়েছে এই ফিচার প্রবন্ধে।
ধূমকেতুর আলোয় অনিমেষ পথ চলা: জন্মজয়ন্তীতে নজরুলের কালজয়ী বন্দনা
জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুরে, যখন রুদ্র প্রকৃতির রুক্ষ রূপ চারপাশকে গ্রাস করতে চায়, তখনই অবলীলায় মনে পড়ে যায় এক ঝড়ের দেবতার কথা। বাংলা সাহিত্যের আকাশে যিনি ধূমকেতুর মতো আকস্মিক উদিত হয়ে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিলেন জরাজীর্ণতার সমস্ত বেড়াজাল, তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আজ ৭ই জ্যৈষ্ঠ, আর ০৪ দিন পরেই এই মহান দ্রোহী ও প্রেমের কবির শুভ জন্মজয়ন্তী। শতবর্ষ পেরিয়েও তাঁর সৃষ্টির তেজ একটুও ম্লান হয়নি, বরং শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তাঁর গান ও কবিতা আজও রণতূর্যের মতো বেজে ওঠে।
নজরুলের আবির্ভাব ছিল এক ঐতিহাসিক প্রয়োজনে। পরাধীনতার শৃঙ্খলে অবরুদ্ধ, আত্মবিস্মৃত বাঙালি জাতিকে জাগিয়ে তুলতে তাঁর মতো এক বজ্রকণ্ঠের বড় প্রয়োজন ছিল। "বল বীর— বল উন্নত মম শির!"— কবির এই অমর বাণী কেবল একটি কবিতার পংক্তি নয়, এটি ছিল পরাধীনতার অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত একটি জাতির মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর মন্ত্র। ব্রিটিশ রাজের রাজদণ্ডকে উপেক্ষা করে বুক চিতিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার যে অসীম সাহস নজরুল দেখিয়েছিলেন, তা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে বিরল। কবি কেবল লেখনী ধারণ করেননি, রাজদ্রোহের অপরাধে কারাবরণ করে প্রমাণ করেছিলেন— তাঁর দ্রোহ ও দেশপ্রেম সস্তা কোনো সস্তা আবেগ ছিল না, তা ছিল রক্তে কেনা সত্য।
তবে নজরুল কেবল ভাঙনের কবি নন, তিনি ছিলেন এক পরম সৃজনশীল গড়ার কারিগর। তাঁর এক হাতে যেমন ছিল অগ্নিবীণা, অন্য হাতে ছিল বিষের বাঁশি। যুদ্ধের হুঙ্কারের সমান্তরালেই তিনি গেয়েছেন প্রেমের গান, বিরহের রাগিণী। নজরুলের গানে বাঙালি খুঁজে পায় তার হৃদয়ের গভীরতম আবেগ। রাগপ্রধান গান, গজল, কীর্তন, শ্যামাসংগীত থেকে শুরু করে ইসলামী গান— সুরের এমন বৈচিত্র্যময় ভুবন বাংলা সঙ্গীতে আর কেউ সৃষ্টি করতে পারেননি। চার হাজারেরও বেশি গানের রচয়িতা নজরুল সুরের যে ইন্দ্রজাল বুনেছিলেন, তা আজও বাঙালি সংস্কৃতির এক অমূল্য পাথেয়।
নজরুলের সবচেয়ে বড় প্রাসঙ্গিকতা বোধহয় তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনায়। সংকীর্ণ ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর আজীবন আপসহীন লড়াই বর্তমানের অস্থির পৃথিবীতে বড় বেশি জরুরি। তিনি গেয়েছিলেন সাম্যের গান, যেখানে মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই। হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন তিনি তাঁর প্রাত্যহিক জীবনে ও সাহিত্যে। একাধারে 'শ্যামাসঙ্গীত' ও 'ইসলামী গজল' রচনা করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, শিল্প ও বিশ্বাসের জগৎ সংকীর্ণ সীমানায় আবদ্ধ নয়। আজ যখন ধর্মের নামে হানাহানি চারপাশকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়, তখন নজরুলের "গাহি সাম্যের গান" আমাদের শুভবুদ্ধির উদয় ঘটায়, সম্প্রীতির পথ দেখায়।
যাঁকে ভালোবাসলে বুক চওড়া হয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আঙুল উঁচিয়ে দাঁড়ানোর সাহস পাওয়া যায়, তিনিই নজরুল। তরুণ প্রজন্মের কাছে নজরুল এক চিরকালীন যৌবনের প্রতীক। প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে কীভাবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়, তা নজরুলের জীবন ও সাহিত্য থেকে শেখা যায়। আজ কবির জন্মজয়ন্তীতে আমাদের অঙ্গীকার হোক— কেবল উৎসবের আনুষ্ঠানিকতায় নয়, আমাদের চিন্তায়, মননে এবং প্রাত্যহিক আচরণে নজরুলের সাম্যবাদী ও মানবিক আদর্শকে ধারণ করা।
জ্যৈষ্ঠের এই পুণ্যলগ্নে বাংলার এই চিরবিদ্রোহী, চিরপ্রেমিক কবির চরণে বিনম্র শ্রদ্ধা। কবিহীন এই বঙ্গে আজও তাঁর সুর ও বাণী আমাদের প্রেরণা যোগায় শৃঙ্খল ভাঙার, আলো জ্বালাবার।
চেতনার বাতিঘর: নজরুলের জন্মবার্ষিকীতে হিংসাদীর্ণ বাংলাদেশে এক অনিবার্য ফেরা
আজ ০৭ই জ্যৈষ্ঠ। আরমাত্র ৯৬ ঘন্টা। তারপরেই বাঙালির মনন ও চৈতন্যের আকাশে এক ধূমকেতুর আবির্ভাবের দিন। ১১ই জ্যৈষ্ঠ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী। কিন্তু এবারের জন্মজয়ন্তী কেবলই ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানো আনুষ্ঠানিকতা কিংবা উৎসবের চাদরে ঢাকা কোনো পার্বণ নয়; বরং এক গভীর আত্মোপলব্ধি এবং বেদনার্ত আরতির দিন। চারপাশে যখন পরমতসহিষ্ণুতার চরম আকাল, রাজনীতির নামে যখন চলে হানাহানি, আর ধর্মের নামে যখন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে উগ্রতা—তখন এই হিংসাদীর্ণ বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে বারবার একটি কথাই মনে হয়: নজরুল, আজ আপনাকে আমাদের বড় বেশি প্রয়োজন ছিল।
আজকের বাংলাদেশ এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যে সম্প্রীতির রক্তস্নাত ভিতের ওপর এই পলিমাটি দাঁড়িয়েছিল, সেখানে আজ প্রতিনিয়ত ফাটল ধরাচ্ছে ক্ষুদ্র স্বার্থ, পরশ্রীকাতরতা আর অন্ধ হিংস্রতা। মানুষে মানুষে তৈরি হচ্ছে অদৃশ্য কিন্তু সুউচ্চ দেয়াল। তুচ্ছ কারণে এখানে ভাই ভাইয়ের রক্ত ঝরাচ্ছে, ভিন্নমতের কারণে পিটিয়ে মারা হচ্ছে মানুষকে, আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে উঠেছে বিষোদগারের নরককুণ্ড। এই যে হৃদয়ের দৈন্য আর পরমতসহিষ্ণুতার সংকট, এর থেকে মুক্তির দাওয়াই তো নজরুল বহু আগেই তাঁর কলমে মাখিয়ে রেখেছিলেন। নজরুল সেই জাদুকর, যিনি একই হাতে লিখেছিলেন শ্যামাসংগীত ও ইসলামিক গজল। তাঁর চেতনার ক্যানভাসে একদিকে যেমন ছিল কৃষ্ণের বাঁশি, অন্যদিকে তেমনি ছিল মরুর ভাস্কর। আজ যখন একদল মানুষ ধর্মকে তলোয়ার বানিয়ে সমাজকে টুকরো টুকরো করতে চায়, তখন নজরুলের সেই অমোঘ বাণী—“মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান”—আমাদের মুখে সপাটে চড় মেরে মনে করিয়ে দেয় আমরা আমাদের ঐতিহ্য থেকে কতটা দূরে সরে এসেছি।
নজরুলের প্রয়োজন আজ কেবল তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্য নয়, বরং এই সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বাঁধা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর জন্য। আমরা আজ অন্যায় দেখেও চুপ থাকতে শিখে গেছি, আপস করতে শিখে গেছি ক্ষমতার সাথে। আমাদের মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্বে আজ সুবিধাবাদের জয়জয়কার। এই ক্লীবতার যুগে নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতা কিংবা 'কারার ঐ লৌহকপাট' কেবল কিছু ছন্দোবদ্ধ লাইন নয়, তা এক একটি চাবুক। শোষকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে কীভাবে বুক চিতিয়ে বলতে হয়—“বল বীর— বল উন্নত মম শির!”—সেই স্পর্ধা আজ আমাদের তরুণ প্রজন্মের বড় বেশি দরকার। নজরুল কোনো দলের ছিলেন না, কোনো গোষ্ঠীর খাঁচায় তাঁকে বন্দি করা যায়নি। তিনি ছিলেন শাশ্বত যৌবনের প্রতীক। আজকের স্থবির, মেরুদণ্ডহীন ও হিংসাশ্রয়ী তরুণ সমাজকে এক ধাক্কায় জাগিয়ে তোলার জন্য নজরুলের সেই দ্রোহের আগুন আজ বড্ড দরকার।
কবি নিজেই তাঁর ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতায় লিখেছিলেন, “প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তিরিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!” আজ তিরিশ কোটির বদলে সতেরো কোটি মানুষের এই বাংলাদেশে যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য আকাশচুম্বী, যখন একদল মানুষের সীমাহীন লোভ আর দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত, তখন নজরুলের সাম্যবাদী চেতনা ছাড়া আমাদের আর কোনো গতি নেই। নজরুলকে বাদ দিয়ে যে বাংলাদেশ আমরা গড়তে চাচ্ছি, তা আসলে এক হিংস্র, আত্মাহীন যান্ত্রিক কঙ্কাল।
তাই নজরুলের জন্মবার্ষিকীতে শুধু তাঁর প্রতিকৃতিতে মালা দিয়ে আর মঞ্চে তাঁর গান গেয়ে দায় সারলে চলবে না। আজকের দিনে নজরুলের প্রয়োজনকে অনুধাবন করার অর্থ হলো—আমাদের নিজেদের ভেতরের হিংসা, অহংকার আর সংকীর্ণতাকে বিসর্জন দেওয়া। নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা আজ কোনো কাগুজে তর্কের বিষয় নয়, এটি এই ক্ষয়ে যাওয়া সমাজের বেঁচে থাকার অক্সিজেন। হিংসার এই তপ্ত মরুভূমিতে নজরুলই হতে পারেন সেই শীতল জলের ধারা, যা আমাদের আবার মানুষ হতে শেখাবে, আবার ভালোবাসতে শেখাবে। হে রুদ্র-ভৈরব, হে সাম্যের কবি, এই অবক্ষয়ের বাংলাদেশে আপনার প্রত্যাবর্তন আজ অনিবার্য, বড় বেশি জরুরি।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#KaziNazrulIslam #NazrulJayanti #বিদ্রোহী_কবি #সাম্যের_কবি #BangladeshSociety #HumanityAndResistance
Keywords: কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল জন্মজয়ন্তী , সাম্যবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতা , বিদ্রোহী কবি, বাংলাদেশের সামাজিক সংকট , মানবিক ও প্রগতিশীল চেতনা