06/12/2026 যুদ্ধবিরতির ধোঁয়াশা: ট্রাম্পের শান্তিচুক্তির দাবি কি কেবলই নির্বাচনী সমীকরণ
Special Correspondent
১২ June ২০২৬ ১৪:৫০
নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তিন মাস ধরে চলা বিধ্বংসী যুদ্ধ অবসানে একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে দুই দেশের শীর্ষ মহলে তৈরি হয়েছে চরম ধোঁয়াশা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে দুই দেশ। তবে তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা চললেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে এই সংঘাত চলছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে তীব্র সংকট তৈরি করেছে।
ট্রাম্পের কণ্ঠে আশাবাদ, বাতিল হলো সামরিক হামলা
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী সুর মেলালেন। তিনি বলেন, আমরা ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের এক সমঝোতায় পৌঁছেছি। চুক্তিটি খুব শিগগিরই হতে পারে সম্ভবত ইউরোপে চলতি সপ্তাহের শেষের দিকেই। ট্রাম্প জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারেন। এমনকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি এই চুক্তির অনুমোদন দিয়েছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, আমি যতটুকু বুঝেছি, উত্তর হলো হ্যাঁ।
আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করে ইরান অভিমুখে একটি বড় ধরনের সামরিক হামলার পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তে বাতিল করেন ট্রাম্প। এর আগে তিনি ইরানের অর্থনীতি ও তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখলেরও হুমকি দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের এই সমঝোতার ঘোষণার পরপরই বিশ্ব শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায় এবং অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, ট্রাম্পের দাবি ওড়াল ইরান
ট্রাম্পের এমন উৎসবমুখর দাবির বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর তেহরানের। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই (বাকাই) বলেন, আলোচনা চলতে থাকা চুক্তির খসড়ার বড় অংশ নিয়ে সমঝোতা হয়েছে ঠিকই, তবে আমরা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাইনি। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ইরানের কাছে অগ্রহণযোগ্য কোনো শর্তের বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা 'তাসনিম' ট্রাম্পের এই দাবিকে তীব্র সন্দেহের চোখে দেখছে। তারা এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, গত দুই মাসে ট্রাম্প অন্তত ৩৮ বার এমন চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন, যার একটিও বাস্তবে রূপ নেয়নি। ফলে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না করা পর্যন্ত ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে পূর্বের ফাঁপা বার্তার মতোই বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
পর্দার আড়ালে চুক্তির শর্ত ও আঞ্চলিক চাপ
ট্রাম্প বারবার জোর দিয়ে বলছেন, যেকোনো শান্তিচুক্তিতে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা কিনতে পারবে না। অন্যদিকে, ইরানের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার।
বিভিন্ন দেশে জব্দ থাকা কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদ ছাড় করা।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালি'র ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি দেওয়া।
পাশাপাশি, লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি হামলা বন্ধের দাবিও জানাচ্ছে তেহরান।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, ইসরায়েল, সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছে। তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইসরায়েল এই সমঝোতা স্মারকের কোনো পক্ষ নয়। তবে তারা আশা করে, চুক্তিতে যেন তেহরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ, ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ধ্বংস এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের অর্থায়ন বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকে।
যুদ্ধক্ষেত্রের বর্তমান পরিস্থিতি
এপ্রিলের শুরুতে একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হলেও চলতি সপ্তাহে দুপক্ষই একে অপরের ওপর তীব্র হামলা চালিয়েছে। মার্কিন একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর ট্রাম্প হরমুজ প্রণালির আশপাশে দুই দিন ধরে নতুন করে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। জবাবে ইরানও ওই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
বাহরাইনে ইরানের একটি ড্রোন ভূপাতিত করার পর ধ্বংসাবশেষের আঘাতে এক কিশোরী আহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। আজ শুক্রবার ভোরেও ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সমন্বয় ছাড়া পারাপারের চেষ্টা করা একটি তেলের ট্যাংকারকে ইরানি বাহিনী ফিরিয়ে দিয়েছে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হলেও যুদ্ধের কারণে এটি বর্তমানে কার্যত বন্ধ।
ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ
এই যুদ্ধ এখন হোয়াইট হাউসের জন্য বড় রাজনৈতিক মাথাচথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনমত জরিপ অনুযায়ী, জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে, যার ফলে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে। আগামী নভেম্বর মাসে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে এর বড় খেসারত দিতে হতে পারে বলে খোদ রিপাবলিকান নেতারাই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতেই ট্রাম্প তড়িঘড়ি করে এই চুক্তির ঢাক পেটাচ্ছেন কি না, সেই প্রশ্নও তুলছেন বিশ্লেষকরা।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র