06/14/2026 দুবাইয়ে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ গ্রেফতার: ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু
Special Correspondent
১৪ June ২০২৬ ১৭:২৭
নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় ইন্টারপোলের সহযোগিতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেফতার হয়েছেন বাংলাদেশের পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। দুবাই পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। গত ১২ জুন একটি চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে এই গ্রেফতারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। এদিকে বেনজীর আহমেদের গ্রেফতারকে 'পুলিশের ঐতিহাসিক সাফল্য' হিসেবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
ইন্টারপোলের 'রেড নোটিশ' ও গ্রেফতারের প্রেক্ষাপট
পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের এআইজি এ.এইচ.এম. শাহাদাত হোসাইন বেনজীর আহমেদের গ্রেফতারের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে দুদকের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। এরপর গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি (২০২৫) আদালতের আদেশের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে 'রেড নোটিশ' জারি করা হয়। দীর্ঘ নজরদারির পর অবশেষে দুবাইয়ে তিনি গ্রেফতার হলেন।
বেনজীর ও তার পরিবারের দুর্নীতির খতিয়ান
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কয়েক মাস আগেই বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পর্বতসম অভিযোগ সামনে আসে। এরপরই তিনি গোপনে দেশত্যাগ করেন। ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদক বেনজীর আহমেদ, তার স্ত্রী জীশান মীর্জা এবং দুই মেয়ে ফারহীন রিশতা ও তাহসীন রাইসার বিরুদ্ধে পৃথক চারটি মামলা দায়ের করে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের অবৈধ সম্পদ এবং তথ্য গোপনের বিবরণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
বেনজীর আহমেদ: তাঁর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদের পরিমাণ ৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা এবং তিনি ২ কোটি ৬২ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন।
জীশান মীর্জা (স্ত্রী): তাঁর জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদের পরিমাণ ৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং তিনি ১৬ কোটি ১ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন।
ফারহীন রিশতা (বড় মেয়ে): তাঁর অর্জিত অবৈধ সম্পদের পরিমাণ ৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
তাহসীন রাইসা (মেজ মেয়ে): তাঁর অর্জিত অবৈধ সম্পদের পরিমাণ ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।
সম্পত্তি ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ
বেনজীর আহমেদের দুর্নীতির অনুসন্ধানে নেমে আদালত তার ও তার পরিবারের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও অবরুদ্ধ করার আদেশ দেন। এর মধ্যে রয়েছে:
জমি ও ফ্ল্যাট: গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুরে ৬২১ বিঘা জমি; নারায়ণগঞ্জ, বান্দরবান ও উত্তরায় ২৫ একর ২৭ কাঠা জমি; এবং গুলশান, বাড্ডা ও আদাবরে ১২টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।
অন্যান্য সম্পদ: ১৯টি কোম্পানির শেয়ার, ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব এবং ৩টি বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব।
এছাড়াও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, বেনজীর আহমেদ ভয় দেখিয়ে সংখ্যালঘুদের জমিও জবরদখল করেছিলেন। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও প্রভাব খাটিয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি নেওয়ার তথ্যও সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।
বিতর্কিত অতীত
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন। র্যাবের প্রধান থাকাকালীন গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, তার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নাম অন্যতম ছিল।
বেনজীর আহমেদকে দুবাইয়ের কোন সুনির্দিষ্ট মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া কী হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ পুলিশ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করাই এখন প্রধান লক্ষ্য বলে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে জানানো হয়েছে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র