06/16/2026 ইরান-মার্কিন চুক্তির পরও কাটেনি ধোঁয়াশা: হরমুজ প্রণালীর টোল নিয়ে মুখোমুখি ট্রাম্প ও তেহরান
Special Correspondent
১৫ June ২০২৬ ২০:১০
নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
দীর্ঘ সামরিক উত্তেজনা ও বন্দর অবরোধের পর অবশেষে একটি কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। দুই দেশের পক্ষ থেকেই এই চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, গত সপ্তাহের শেষভাগে ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে চুক্তিটি ইতিমধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম গত তিন মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। তবে এই ঐতিহাসিক চুক্তির পূর্ণাঙ্গ টেক্সট (দলিল) এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ না করায় এবং প্রধান কিছু ইস্যুতে দুই দেশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে এখনো বড় ধরনের ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত ও টোল বিতর্ক
চুক্তির অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হবে এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ স্থায়ীভাবে টোল-মুক্ত (Toll-free) হিসেবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। ট্রাম্প সোশ্যালে লিখেছেন, জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে ফ্রিলি চলাচল শুরু করেছে। তবে ট্রাম্পের এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এবং দেশটির বিপ্লবী গার্ডসের সাথে সংশ্লিষ্ট সংবাদ সংস্থাগুলো (ফার্স ও তাসনিম) জানিয়েছে ইরান স্থায়ীভাবে কোনো টোল-মুক্ত চলাচলের অনুমতি দেয়নি। আগামী ৬০ দিনের একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ফ্রি চলাচলের সুযোগ দেওয়া হলেও, এরপর থেকে ওই রুট দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ফি বা শুল্ক আদায় করা হবে। ইরান স্পষ্ট করেছে যে তারা সরাসরি ট্রানজিট টোল না নিলেও নেভিগেশন সেবা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জাহাজ ইন্সুরেন্সের নামে খরচ উসুল করতে প্রয়োজনীয় ফি ঠিকই আদায় করবে।
সাগরে নৌ-মাইন ও নিরাপত্তার ঝুঁকি
চুক্তি হলেও আন্তর্জাতিক শিপিং অ্যাসোসিয়েশন (BIMCO) এখনো হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চালানোকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছে। বিমকো-র নিরাপত্তা কর্মকর্তা জ্যাকব লারসেন সতর্ক করেছেন যে, যুদ্ধকালীন সময়ে ইরান এই প্রণালীতে ব্যাপক হারে ‘নৌ-মাইন’ (Naval Mines) মোতায়েন করেছে। এই মাইনগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এগুলো অপসারণ করার মতো বিশেষায়িত নৌ-প্রস্তুতি বা প্রযুক্তি এই অঞ্চলে খুব সীমিত। ফলে আপাতত ইরান ও ওমানের উপকূল ঘেঁষে দুটি অত্যন্ত সরু ও সংকীর্ণ লেনে জাহাজ চলাচল করতে হবে, যা সমুদ্রে তীব্র জটলার (Bottleneck) সৃষ্টি করবে।
ইসরায়েল ও লেবানন পরিস্থিতি
ইরানের দাবি অনুযায়ী, এই চুক্তির আওতায় লেবাননে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটার কথা থাকলেও ইসরায়েল তা মানছে না। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের বাহিনী দক্ষিণ লেবানন থেকে পিছু হটবে না। এদিকে চুক্তি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বৈরুতে বিমান হামলা চালানোয় ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
চুক্তির ভবিষ্যৎ ও জি-৭ সম্মেলন
জি-৭ (G7) সম্মেলনে যোগ দিতে বর্তমানে ফ্রান্সে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত বছর (২০২৫) ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর সৃষ্ট উত্তেজনার কারণে ট্রাম্প জি-৭ সম্মেলন মাঝপথে ফেলে দেশে ফিরেছিলেন। তবে এবার তিনি একটি ফ্রেমওয়ার্ক হাতে নিয়ে বিশ্বনেতাদের মুখোমুখি হচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই চুক্তির কঠোর সমালোচনা হচ্ছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রক্ষণশীল বিশ্লেষক মার্ক লেভিনসহ অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—কেন চুক্তির মূল দলিল বা MOU জনগণের সামনে আনা হচ্ছে না। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আশ্বাস দিয়েছেন, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই চুক্তির মূল টেক্সট প্রকাশ করা হতে পারে।
কাগজে-কলমে চুক্তি হলেও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ, কর আদায় এবং সাগরে পুঁতে রাখা মাইনের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটটি কতটা নিরাপদ হবে, তা নিয়ে সংশয় কাটেনি। আগামী ৬০ দিনের টেকনিক্যালnegotiations বা কারিগরি আলোচনাই নির্ধারণ করবে এই চুক্তির চূড়ান্ত ভবিষ্যৎ।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র