07/04/2026 এইচএসসি: একটি পরীক্ষার নয়, একটি সভ্যতার ইতিহাস — ইন্টারমিডিয়েট, প্রবেশিকা, পরিচয় সংকট ও শিক্ষা সংস্কারের সন্ধানে
Dr Mahbub
৪ July ২০২৬ ০১:৪৮
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির নীরব সংকেতকে কেন্দ্র করে প্রাচীন চীনের সাম্রাজ্যিক পরীক্ষা, ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রিটিশ ভারতের ইন্টারমিডিয়েট শিক্ষা, প্রবেশিকা পরীক্ষার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গবেষণাভিত্তিক অনুসন্ধান করা হয়েছে এই নিবন্ধে ।
এইচএসসি পরীক্ষা কি কেবল দ্বাদশ শ্রেণির একটি পাবলিক পরীক্ষা, নাকি এটি হাজার বছরের শিক্ষা-ইতিহাসের উত্তরাধিকার? কেন একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিকে ‘ইন্টারমিডিয়েট’ বলা হয়? প্রবেশিকা পরীক্ষার উৎপত্তি কোথায়? ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় বিপুল অনুপস্থিতি কি কেবল পরিসংখ্যান, নাকি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি নীরব সতর্কবার্তা? এই গবেষণাভিত্তিক বাংলা ফিচার নিবন্ধে প্রাচীন চীনের সাম্রাজ্যিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষা সংস্কার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রবেশিকা, ম্যাট্রিকুলেশন, আইএ-আইএসসি এবং বর্তমান এইচএসসি পরীক্ষার দীর্ঘ বিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে কেন উচ্চমাধ্যমিক স্তরটি কৈশোর থেকে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে উত্তরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধ, কেন আজও একটি জাতীয় পাবলিক পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে এবং একবিংশ শতাব্দীর দক্ষতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ধারাবাহিক মূল্যায়নের যুগে বাংলাদেশের এইচএসসি পরীক্ষা কীভাবে পুনর্গঠিত হতে পারে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হলে আমরা সাধারণত আলোচনা করি প্রশ্নপত্র, পরীক্ষাকেন্দ্র, ফলাফল কিংবা জিপিএ নিয়ে। কিন্তু খুব কম মানুষই প্রশ্ন করি—এই পরীক্ষার জন্ম কেন? কেন মাধ্যমিকের পর আরও একটি পৃথক পাবলিক পরীক্ষার প্রয়োজন হলো? কেন একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিকে আজও 'ইন্টারমিডিয়েট' বলা হয়? এই পরীক্ষা কি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির একটি সনদ, নাকি এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্র, সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসন এবং মানবসভ্যতার দীর্ঘ শিক্ষা-ইতিহাস?
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনেই নিবন্ধিত ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৪ হাজার ৭৮৪ জন অনুপস্থিত ছিল। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দুই বছর আগে এসএসসি পাস করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে এবার নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে ফরম পূরণ করেছে মাত্র প্রায় সাড়ে ৯ লাখ। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় ৩৬ শতাংশ—সংখ্যায় সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি—এই পরীক্ষার দোরগোড়াতেই পৌঁছায়নি।
এই পরিসংখ্যানকে কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থা, পরিবার, সমাজ, কলেজ-সংস্কৃতি, শিক্ষার্থী সহায়তা ব্যবস্থা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সম্মিলিত কার্যকারিতা নিয়ে বড় একটি প্রশ্ন তুলে ধরে। প্রতিটি অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর পেছনে রয়েছে একটি অসমাপ্ত জীবনকাহিনি—কোথাও দারিদ্র্য, কোথাও পারিবারিক ভাঙন, কোথাও মানসিক চাপ, কোথাও ডিজিটাল আসক্তি, কোথাও আবার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর অনিশ্চয়তা।
তাই এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য কেবল এইচএসসি পরীক্ষার ইতিহাস বলা নয়; বরং একটি পরীক্ষার মাধ্যমে আধুনিক রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয়, মূল্যায়ন ব্যবস্থা এবং শিক্ষা-সংস্কারের দীর্ঘ বিবর্তনকে বোঝা। প্রাচীন চীনের সাম্রাজ্যিক পরীক্ষা থেকে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রিটিশ ভারতের প্রবেশিকা, ইন্টারমিডিয়েট শিক্ষার জন্ম এবং স্বাধীন বাংলাদেশের এইচএসসি পর্যন্ত বিস্তৃত এই যাত্রাপথ আমাদের সামনে এক মৌলিক প্রশ্ন রেখে যায়—একবিংশ শতাব্দীতে আমরা কেমন মানুষ গড়তে চাই, আর সেই মানুষ গড়ার জন্য আমাদের পরীক্ষা কেমন হওয়া উচিত?
বাংলাদেশে আমরা প্রায় সবাই "ইন্টারমিডিয়েট", "ইন্টার", "কলেজ লাইফ" কিংবা "এইচএসসি"—এই শব্দগুলো ব্যবহার করি। কিন্তু খুব কম মানুষই ভেবে দেখি, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির এই স্তরকে কেন ইন্টারমিডিয়েট বলা হয়। এটি কি কেবল একটি পরীক্ষার নাম, নাকি এর পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘ শিক্ষাদর্শ, ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের একটি সুপরিকল্পিত ধারণা?
"Intermediate" শব্দটি এসেছে ল্যাটিন intermedius থেকে। Inter অর্থ "মাঝখানে" এবং medius অর্থ "মধ্য"। অর্থাৎ ইন্টারমিডিয়েট-এর আক্ষরিক অর্থ হলো "মধ্যবর্তী", "অন্তর্বর্তী" বা "দুই স্তরের মাঝখানে অবস্থিত"।
উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি প্রবেশের আগে একটি পৃথক প্রস্তুতিমূলক স্তরের ধারণা ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকে। ভারতীয় উপমহাদেশেও একই চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়। প্রথমদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই কলেজগুলোতে "First Arts (F.A.)" এবং "First Science (F.Sc.)" ধরনের কোর্স পরিচালিত হতো, যা মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক শিক্ষায় প্রবেশের প্রস্তুতিমূলক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হতো। পরবর্তীকালে বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মধ্যে একটি পৃথক "Intermediate" স্তর গঠনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে। এর উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তরণের সময় শিক্ষার্থীদের বৌদ্ধিক পরিপক্বতা, বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি এবং উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করা।
বাংলাদেশের বর্তমান উচ্চমাধ্যমিক ব্যবস্থার শিকড়ও সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার মধ্যেই নিহিত। ব্রিটিশ ভারত, পরে পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ—প্রতিটি পর্যায়েই এই স্তরের প্রশাসনিক কাঠামো, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা পদ্ধতি এবং পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু এর মৌলিক দর্শন অপরিবর্তিত থেকেছে। সেটি হলো—এটি একটি অন্তর্বর্তী শিক্ষা (Intermediate Education), যা মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করা একজন কিশোর-কিশোরীকে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত করে।
এ কারণেই একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শুধু আরেকটি পাবলিক পরীক্ষার পরীক্ষার্থী হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এই দুই বছর হওয়ার কথা বৌদ্ধিক পরিপক্বতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, গবেষণামুখী মনোভাব, বিষয়ভিত্তিক গভীরতা এবং ভবিষ্যৎ পেশাগত পরিচয় গঠনের প্রস্তুতির সময়। বিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন জ্ঞানজগতের দিকে যাত্রার জন্য এটি একটি সেতুবন্ধন। তাই এর নাম Intermediate—কারণ এটি সত্যিকার অর্থেই একটি "মধ্যবর্তী" শিক্ষা; শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্কতা, বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্দেশনানির্ভর শিক্ষা থেকে আত্মনির্ভর শিক্ষাজীবনের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক ও শিক্ষাদর্শগত সংযোগস্থল।
আজ বাংলাদেশের কোনো কলেজের পরীক্ষাকেন্দ্রে যখন একজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষার খাতা খুলে বসে, তখন সে হয়তো কল্পনাও করতে পারে না—তার সামনে রাখা প্রশ্নপত্রটির পেছনে রয়েছে প্রায় দুই হাজার বছরের এক বিস্ময়কর ইতিহাস। এই ইতিহাস কেবল একটি পরীক্ষার নয়; এটি রাষ্ট্রগঠন, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম, শিল্পবিপ্লব, গণশিক্ষার বিস্তার এবং মানবসমাজে 'যোগ্যতা' (Merit) কীভাবে নির্ধারিত হবে—সেই দীর্ঘ বিতর্কের ইতিহাস।
পাবলিক পরীক্ষার ধারণা হঠাৎ করে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে জন্ম নেয়নি। এর বীজ রোপিত হয়েছিল প্রাচীন চীনের সাম্রাজ্যিক প্রশাসনে। হান যুগে মেধার ভিত্তিতে সরকারি কর্মকর্তা নির্বাচনের ধারণা বিকশিত হতে শুরু করলেও সুই (৫৮১–৬১৮) এবং বিশেষ করে তাং রাজবংশের সময় কেজু (Keju) বা সাম্রাজ্যিক পরীক্ষা একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিণত হয়। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে যুগান্তকারী বৈশিষ্ট্য ছিল—অন্তত নীতিগতভাবে জন্ম, বংশ বা অভিজাত পরিচয়ের পরিবর্তে পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতা যাচাই। আধুনিক "মেরিটোক্রেসি" বা মেধাভিত্তিক প্রশাসনের অন্যতম ঐতিহাসিক পূর্বসূরি হিসেবে তাই কেজু ব্যবস্থাকে আজও শিক্ষা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ইউরোপে এসে এই ধারণা সম্পূর্ণ নতুন এক রূপ পায়। মধ্যযুগীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে—বিশেষত প্যারিস, বোলোনিয়া, অক্সফোর্ড কিংবা কেমব্রিজে—পরীক্ষা ছিল মূলত মৌখিক। শিক্ষার্থীকে প্রকাশ্য বিতর্কে অংশ নিতে হতো, নিজের থিসিস রক্ষা করতে হতো এবং যুক্তির শক্তি দিয়ে শিক্ষকদের সন্তুষ্ট করতে হতো। সেই যুগে পরীক্ষার লক্ষ্য ছিল তথ্য মুখস্থ করা নয়; বরং যুক্তি, দর্শন এবং বাগ্মিতার উৎকর্ষ প্রদর্শন।
কিন্তু শিল্পবিপ্লব ইউরোপের শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেয়। বিদ্যালয় বাড়তে থাকে, শিক্ষার্থী বাড়তে থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুর সংখ্যা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। তখন একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের পরিবর্তে প্রয়োজন হয়ে পড়ে এমন একটি মানসম্মত মূল্যায়ন ব্যবস্থা, যা হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে একই মানদণ্ডে বিচার করতে পারে। উনবিংশ শতাব্দীতে লিখিত পরীক্ষা, নম্বরভিত্তিক মূল্যায়ন, ম্যাট্রিকুলেশন এবং বিশ্ববিদ্যালয়-নিয়ন্ত্রিত পাবলিক পরীক্ষার দ্রুত বিস্তার মূলত এই প্রশাসনিক ও সামাজিক বাস্তবতারই ফল।
এই ধারণাই পরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। ১৮৩৫ সালের ম্যাকলের শিক্ষা-নীতির পর এবং ১৮৫৪ সালের উডের ডেসপ্যাচ-এর মাধ্যমে একটি আধুনিক, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা কাঠামো গড়ে ওঠে। ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর "এন্ট্রান্স" বা প্রবেশিকা পরীক্ষা চালু হয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রথম দিকে মূলত শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; বরং পরীক্ষা গ্রহণকারী ও ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিল। ফলে পাবলিক পরীক্ষা উপনিবেশিক প্রশাসনের কেন্দ্রীয় স্তম্ভে পরিণত হয়।
বাংলা ভাষায় 'প্রবেশিকা' শব্দের আক্ষরিক অর্থ 'প্রবেশ করার উপকরণ' বা 'প্রবেশের সনদ'। ব্রিটিশ আমলে এই শব্দটি দ্বারা মূলত মাধ্যমিক স্তর সমাপনী পরীক্ষাকেই বোঝানো হতো, যা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য 'প্রবেশ'-এর সনদ। ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথম প্রবেশিকা পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় মার্চ মাসে কলকাতা টাউন হলে। এই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন ২৪৪ জন পরীক্ষার্থী। পরবর্তীতে এই 'প্রবেশিকা পরীক্ষা'-ই 'ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা' নামে পরিচিতি লাভ করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে 'প্রবেশিকা পরীক্ষা' শব্দটি সময়ের সাথে সাথে অর্থপরিবর্তন ঘটিয়েছে:
ভারতীয় উপমহাদেশে "আইএ (Intermediate in Arts)" এবং "আইএসসি (Intermediate in Science)" নামের যে পরীক্ষা দীর্ঘদিন প্রচলিত ছিল, সেটিই পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশে "Higher Secondary Certificate (HSC)" নামে পরিচিতি লাভ করে। নাম বদলেছে, প্রশাসনিক কাঠামো বদলেছে, কিন্তু মূল দর্শন অপরিবর্তিত রয়েছে—বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পূর্ববর্তী সর্বজনীন মূল্যায়ন।
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনেই কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতি এবং নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশের ফরম পূরণ না করার ঘটনা কেবল একটি পরীক্ষা-সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা। শিক্ষাবিদদের ভাষায়, কোনো পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া বা অংশগ্রহণ না করা আসলে একটি system indicator—যা জানিয়ে দেয় সমস্যাটি কেবল শিক্ষার্থীর নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরেই কোথাও একটি গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি হয়েছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই ধরনের সংকট নতুন নয়। ১৯০৬ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষার ফল অত্যন্ত হতাশাজনক হলে শিক্ষা প্রশাসন এটিকে কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখেনি। তারা উপলব্ধি করেছিল যে পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়া মানে শিক্ষাদান, বিদ্যালয় পরিচালনা, শিক্ষক প্রস্তুতি এবং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার কোথাও একটি মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে। সেই সময়ের বঙ্গ সরকারের শিক্ষা বিভাগের পরিচালক (Director of Public Instruction—DPI) অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "সম্ভবত উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের গুণগত মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব হবে না, যতদিন পর্যন্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ প্রতিষ্ঠিত না হয়।"
এই উপলব্ধিই নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা করে। সমস্যার জন্য শিক্ষার্থীদের এককভাবে দোষারোপ না করে ব্রিটিশ প্রশাসন শিক্ষক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯০৮ সালে কলকাতায় ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ এবং ঢাকার আরমানিটোলায় টিচার্স ট্রেনিং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরের বছর, ১৯০৯ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গ সরকারের শিক্ষা বিভাগের আদেশ নং ৫৩-এর মাধ্যমে ঢাকার শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে। অর্থাৎ একটি পরীক্ষার দুর্বল ফলাফল শেষ পর্যন্ত একটি নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নতুন শিক্ষক-প্রস্তুতি ব্যবস্থা এবং একটি নতুন নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিয়েছিল।
এই ইতিহাস আজও আমাদের জন্য গভীর শিক্ষণীয়। ১৯০৬ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষার সংকট ব্রিটিশ প্রশাসনকে শিক্ষক শিক্ষার দিকে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে, যখন এইচএসসি পরীক্ষার আগেই নিয়মিত শিক্ষার্থীদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি মূলধারা থেকে ছিটকে পড়ছে এবং প্রথম দিনেই হাজার হাজার পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকছে, তখন আমরা কি একই ধরনের নীতিগত আত্মসমালোচনা করছি? নাকি আমরা কেবল অনুপস্থিতির সংখ্যা গণনা করে পরের বছরের পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি?
প্রকৃত প্রশ্নটি আরও গভীর। উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বর্তমান পাঠ্যক্রম কি শিক্ষার্থীদের জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত? কলেজ কি এখনও কেবল কোচিংনির্ভর পরীক্ষার প্রস্তুতিকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে? কৈশোর থেকে তারুণ্যে উত্তরণের এই সংকটময় সময়ে শিক্ষার্থীদের জন্য কি পর্যাপ্ত পরামর্শদান, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, ক্যারিয়ার নির্দেশনা এবং একাডেমিক সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে? শিক্ষকরা কি এই বয়সের শিক্ষার্থীদের সামাজিক-মানসিক বিকাশের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত? নাকি এখনও আমরা ধরে নিচ্ছি, ভালো প্রশ্নপত্র, কয়েকটি মডেল টেস্ট এবং একটি পাবলিক পরীক্ষাই শিক্ষার সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড?
ইতিহাসের একটি বড় শিক্ষা হলো—যে সমাজ পরীক্ষার ফলকে কেবল ফলাফল হিসেবে দেখে, সে সমস্যার উপসর্গ নিয়ে ব্যস্ত থাকে; আর যে সমাজ পরীক্ষার ফলকে শিক্ষা ব্যবস্থার আয়না হিসেবে পড়তে শেখে, সেই সমাজই সংস্কারের পথে এগিয়ে যায়।
বর্তমান বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল পোর্টফোলিও, ধারাবাহিক মূল্যায়ন এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার যুগে এখনও কি একদিনের একটি পাবলিক পরীক্ষা শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে?
বিশ্বের অনেক দেশে ইতোমধ্যে কেবল লিখিত পরীক্ষার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্কুলভিত্তিক মূল্যায়ন, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণা, মৌখিক উপস্থাপনা এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের সমন্বিত ব্যবস্থা চালু হয়েছে। তবুও অধিকাংশ দেশ সম্পূর্ণভাবে উচ্চমাধ্যমিক-পরবর্তী জাতীয় পরীক্ষা বাতিল করেনি। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি ন্যূনতম তুলনামূলক মানদণ্ড নির্ধারণের জন্য এখনো একটি কেন্দ্রীয় মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে মনে করা হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি তাই এই নয় যে এইচএসসি থাকবে কি থাকবে না; বরং প্রশ্ন হলো—এইচএসসি কি শুধুই মুখস্থবিদ্যার পরীক্ষা থাকবে, নাকি এটি ভবিষ্যতের দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং বাস্তব জীবনের সক্ষমতা মূল্যায়নের একটি আধুনিক প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত হবে?
এইচএসসি পরীক্ষা আজ এমন এক সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যা কেবল শিক্ষার্থীর নয়, পুরো পরিবারের জীবনকে প্রভাবিত করে। ফল প্রকাশের দিন শুধু পরীক্ষার্থী নয়, উদ্বিগ্ন থাকেন বাবা-মা, শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন, এমনকি প্রতিবেশীরাও। সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষায়, এটি একটি "Rite of Passage"—অর্থাৎ জীবনের এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে প্রবেশের সামাজিক আচার। যেমন কোনো সমাজে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার জন্য বিশেষ আচার পালিত হয়, তেমনি আধুনিক রাষ্ট্রে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে প্রবেশের অন্যতম সামাজিক স্বীকৃতি হয়ে উঠেছে এইচএসসি।
এই কারণেই এইচএসসি পরীক্ষার গুরুত্ব কেবল নম্বরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামাজিক মর্যাদা, উচ্চশিক্ষার সুযোগ, কর্মজীবনের সম্ভাবনা এবং অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক প্রত্যাশার প্রতীক হিসেবেও কাজ করে। তাই এই পরীক্ষার সংস্কার মানে শুধু প্রশ্নপত্র বা মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন নয়; এটি সমাজের প্রত্যাশা, শিক্ষার দর্শন এবং জাতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গভীর পুনর্বিবেচনা।
বাংলাদেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। নিম্নে একটি সম্ভাব্য সংস্কার রূপরেখা তুলে ধরা হলো:
শেষ পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষার ইতিহাস আমাদের একটি গভীর সত্যের সামনে দাঁড় করায়—পরীক্ষা কখনোই কেবল পরীক্ষা নয়। এটি একটি সমাজের জ্ঞানদর্শন, রাষ্ট্রদর্শন এবং মানুষ গড়ার দর্শনের প্রতিফলন। প্রাচীন চীনের সাম্রাজ্যিক পরীক্ষা থেকে ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রিটিশ ভারতের প্রবেশিকা, ইন্টারমিডিয়েট শিক্ষা এবং বর্তমান বাংলাদেশের এইচএসসি—প্রতিটি পরিবর্তনই ঘটেছে সমাজের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। পরীক্ষা স্থির নয়; পরিবর্তনই তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ধারাবাহিক মূল্যায়ন, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষতানির্ভর অর্থনীতির যুগে বাংলাদেশের জন্যও মূল প্রশ্নটি আর এই নয় যে এইচএসসি থাকবে কি থাকবে না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো—এইচএসসি কি এখনও শিক্ষার্থীর মুখস্থবিদ্যা যাচাই করবে, নাকি তার চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, নৈতিক বোধ, সহযোগিতামূলক দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ নাগরিকত্বের প্রস্তুতিকে মূল্যায়ন করবে?
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার অনুপস্থিতির সংখ্যা আমাদের সামনে একটি নীরব সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে সমাজ পরীক্ষার ফলকে কেবল সংখ্যা হিসেবে দেখে, সে সমস্যার উপসর্গ নিয়ে ব্যস্ত থাকে; আর যে সমাজ পরীক্ষাকে শিক্ষা ব্যবস্থার আয়না হিসেবে পড়তে শেখে, সেই সমাজই সংস্কারের পথ খুঁজে পায়।
তাই বাংলাদেশের আগামী শিক্ষা সংস্কারের সূচনা হওয়া উচিত এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থেকে নয়, বরং এই মৌলিক প্রশ্ন থেকে—আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য কেমন শিক্ষা চাই, কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই এবং সর্বোপরি কেমন মানুষ গড়তে চাই। সেই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ধারিত হবে ভবিষ্যতের এইচএসসি, ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশ।
ইতিহাস আমাদের শেখায়, কোনো পরীক্ষা চিরস্থায়ী নয়। পরিবর্তিত সমাজ নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থা সৃষ্টি করে। তাই প্রশ্নটি কেবল এই নয়—এইচএসসি থাকবে কি থাকবে না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য কেমন মানুষ গড়তে চাই। কারণ একটি জাতির পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত সেই জাতির ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবিই নির্মাণ করে।
–অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#HSC2026 #উচ্চমাধ্যমিক #ইন্টারমিডিয়েট #প্রবেশিকা #পাবলিকপরীক্ষা #শিক্ষাইতিহাস #বাংলাদেশশিক্ষা #শিক্ষাসংস্কার #EducationReform #Assessment #HigherSecondary #ExaminationHistory #EducationalResearch #EducationPolicy #BangladeshEducation #LearningBeyondExams #FutureOfEducation #Odhikarpatra