07/23/2026 বাংলাদেশে কবে হবে? ফ্রান্সের মতো আইন? শিশু সুরক্ষায় সোশ্যাল মিডিয়া ও স্মার্টফোন নিয়ন্ত্রণের এখনই কি সময়?
Dr Mahbub
২৩ July ২০২৬ ০২:৪৮
ইউরোপ শিশুদের ডিজিটাল আসক্তি রোধে আইন করছে, আর বাংলাদেশে পর্দার আলোয় হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব। এই নীরব সংকটের দায় নেবে কে—রাষ্ট্র, পরিবার, নাকি প্রযুক্তি কোম্পানি? আর এই মমহামূল্যবান প্রশ্নটির অনুসন্ধানেই এই নিবন্ধটির র্মূল প্রয়াস। বাংলাদেশে কবে হবে ফ্রান্সের মতো আইন? শিশু সুরক্ষায় সোশ্যাল মিডিয়া ও স্মার্টফোন নিয়ন্ত্রণের এখনই কি সময়?—এই গবেষণাধর্মী বিশেষ ফিচারে ফ্রান্সের ২০২৬ সালের শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ আইনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ডিজিটাল শিশুসুরক্ষা, শিক্ষা, পরিবার, প্রযুক্তি ও রাষ্ট্রীয় নীতির বহুমাত্রিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রবন্ধটি দেখিয়েছে, সমস্যা কেবল শিশুদের হাতে স্মার্টফোন নয়; বরং অ্যালগরিদম-নির্ভর ডিজিটাল অর্থনীতি, অভিভাবকীয় চ্যালেঞ্জ, বিদ্যালয়ের প্রস্তুতি, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত ফল। ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া এবং বৈশ্বিক শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য গবেষণার অভিজ্ঞতার আলোকে এখানে আলোচনা করা হয়েছে বয়সভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, ডিজিটাল নাগরিকত্ব শিক্ষা, বিদ্যালয়ে মনোযোগবান্ধব পরিবেশ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অভিভাবক শিক্ষা, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, অনলাইন নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল বৈষম্যের প্রশ্ন। একই সঙ্গে একটি সম্ভাব্য বাংলাদেশ মডেল উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি গুরুত্ব পেয়েছে গবেষণাভিত্তিক নীতি, পারিবারিক সংস্কৃতি, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, শিশুর অধিকার, গোপনীয়তা, সমতাভিত্তিক ডিজিটাল প্রবেশাধিকার এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক ডিজিটাল সুস্থতা শিক্ষা। এটি কেবল একটি আইন নিয়ে আলোচনা নয়; বরং বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের শৈশব, শিক্ষা, মানসিক বিকাশ এবং ডিজিটাল ভবিষ্যৎকে ঘিরে একটি সময়োপযোগী নীতিগত, শিক্ষাবিষয়ক ও সামাজিক অনুসন্ধান।
শিশুটি তখনো স্পষ্ট করে ‘মা’ বলতে শেখেনি। কিন্তু আঙুল দিয়ে পর্দা সরাতে জানে। ছড়া শোনার জন্য নয়, তার সামনে চলছে একের পর এক উজ্জ্বল ভিডিও। মা রান্নাঘরে, বাবা অফিসের কাজে ব্যস্ত। ঘর শান্ত রাখার সহজতম উপায় হিসেবে শিশুটির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে একটি স্মার্টফোন।
—এই দৃশ্য এখন আর কোনো একটি পরিবারের গল্প নয়। শহরের বহুতল ভবন থেকে গ্রামের বাজারঘেঁষা বাড়ি—অসংখ্য পরিবারে স্মার্টফোন হয়ে উঠেছে শিশুকে শান্ত রাখার ডিজিটাল চুষনি। শিশুর কান্না থামছে, কিন্তু ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে কথোপকথন, খেলাধুলা, গল্প শোনা, প্রশ্ন করা এবং মানুষের মুখ পড়ে আবেগ বোঝার স্বাভাবিক অনুশীলন।
ঠিক এই সময়ে ফ্রান্সের পার্লামেন্ট ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার আইন চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করেছে। আইনটি ২১ জুলাই ২০২৬ দুই কক্ষেই গৃহীত হয়। নতুন অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা; আগে থেকে থাকা অপ্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাকাউন্টের জন্য চার মাসের রূপান্তরকাল রাখা হয়েছে। তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার আগে সাংবিধানিক পর্যালোচনা এবং ইউরোপীয় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যের প্রশ্নও সামনে রয়েছে।
প্রশ্নটি তাই শুধু ফ্রান্স কী করল, তা নয়। আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাংলাদেশের হবে কবে? —শিশুর হাতে ফোন তুলে দিয়ে আমরা সাময়িক নীরবতা কিনছি; বিনিময়ে হয়তো তার শৈশবের স্বাভাবিক শব্দগুলো হারাচ্ছি।
ফ্রান্সের আইনটি শুধু ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা স্ন্যাপচ্যাট নিয়ে নয়। এর রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত বার্তা আরও গভীর: শিশুর মনোযোগ, মানসিক সুস্থতা, ব্যক্তিগত তথ্য এবং স্বাভাবিক বিকাশকে আর প্রযুক্তি কোম্পানির সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না।
আইনের আওতায় ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে অনলাইন বিশ্বকোষ, শিক্ষা ও বিজ্ঞানবিষয়ক তথ্যভান্ডার এবং মুক্ত সফটওয়্যার উন্নয়ন প্ল্যাটফর্মকে এর বাইরে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করছে না; ক্ষতিকর বা আসক্তি-উদ্দীপক ডিজিটাল পরিবেশ এবং শিক্ষামূলক প্রযুক্তির মধ্যে পার্থক্য করছে। আইনে শিশুদের উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্ল্যাটফর্মগুলো আইন লঙ্ঘন করছে কি না, তা তদারক করবে ফ্রান্সের ডিজিটাল যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আরকম।
ফ্রান্সই প্রথম নয়। অস্ট্রেলিয়ায় ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১৬ বছরের কম বয়সীদের অ্যাকাউন্ট খোলা বা ধরে রাখা ঠেকাতে নির্দিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে যুক্তিসংগত ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে অস্ট্রেলিয়ার সরকার জানিয়েছে, আইন কার্যকর হওয়ার পর ৫০ লাখের বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক অ্যাকাউন্ট অপসারণ, নিষ্ক্রিয় বা সীমিত করা হয়েছে।
বিশ্বের বহু শিক্ষা ব্যবস্থাও বিদ্যালয়ে স্মার্টফোন নিয়ন্ত্রণ করছে। ইউনেসকোর ২০২৬ সালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১১৪টি শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদ্যালয় পর্যায়ে জাতীয়ভাবে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত—যা বিশ্বের প্রায় ৫৮ শতাংশ শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করে। বিশ্ব এগোচ্ছে ডিজিটাল শিশুসুরক্ষার দিকে। আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
বাংলাদেশে শিশুকে ফোন দেওয়ার পেছনে সব সময় অবহেলা কাজ করে না। কখনো ক্লান্ত মা-বাবা একটু বিশ্রাম চান। কখনো কর্মজীবী মা বৈঠকে বসেছেন। কখনো পরিবারের হাতে নিরাপদ খেলার জায়গা নেই। কখনো অভিভাবক মনে করেন, ইউটিউব দেখলে শিশু ইংরেজি শিখবে। আবার কোনো কোনো পরিবারে দামি ফোন ব্যবহার করাকে আধুনিকতার চিহ্ন হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সুবিধাটি যখন অভ্যাসে এবং অভ্যাসটি নির্ভরতায় পরিণত হয়, তখন পরিবারের অজান্তেই শিশুর সময়, মনোযোগ ও আবেগের ওপর একটি অদৃশ্য কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, জীবনের প্রথম পাঁচ বছর দ্রুত শারীরিক ও জ্ঞানীয় বিকাশের সময়। এক বছরের কম বয়সীদের জন্য বসিয়ে রেখে পর্দা দেখানো সুপারিশ করা হয় না। এক বছর বয়সীদের ক্ষেত্রেও স্ক্রিনভিত্তিক নিষ্ক্রিয় সময় নিরুৎসাহিত করা হয়েছে; দুই বছর বয়সীদের জন্য তা দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা এবং যত কম, তত ভালো। তিন থেকে চার বছর বয়সীদের ক্ষেত্রেও দৈনিক এক ঘণ্টার বেশি নয়। এর পরিবর্তে গল্প বলা, বই পড়া, গান, ধাঁধা এবং সক্রিয় খেলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সমস্যা শুধু স্ক্রিনের আলো নয়। কোন কনটেন্ট শিশু দেখছে, কেন দেখছে, কতক্ষণ দেখছে, কার সঙ্গে দেখছে এবং দেখার পর তার আচরণ কেমন হচ্ছে—এসবও গুরুত্বপূর্ণ। একটি শিশু যখন মায়ের মুখের বদলে ভিডিওর চরিত্র দেখে শান্ত হতে শেখে, তখন তার আবেগ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াটিও যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়তে পারে। সে বিরক্ত হলেই ফোন চায়, খেতে বসলে ফোন চায়, ঘুমের আগে ফোন চায়, অতিথির সামনে ফোন চায়। একসময় ফোনটি আর বিনোদনের মাধ্যম থাকে না; হয়ে ওঠে পুরস্কার, ঘুষ, শাস্তি, সঙ্গী ও নীরব পরিচর্যাকারী।
শিশু পর্দা থেকে তথ্য পেতে পারে; কিন্তু মানুষের মুখ, স্পর্শ, অপেক্ষা ও কথোপকথন থেকেই সে সম্পর্ক শেখে।
—এই তৃতীয় কেস দেখায়, সব সমাধান আইন দিয়ে শুরু বা শেষ হয় না। পরিবারের সংস্কৃতি, বিদ্যালয়ের নির্দেশনা এবং শিশুর অংশগ্রহণ—তিনটির সম্মিলন প্রয়োজন।
ফ্রান্সের আইন আমাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে, কিন্তু হুবহু অনুকরণ করা যথেষ্ট নয়।
বয়স যাচাই করতে গিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ বাড়তে পারে। শিশুরা ভুয়া বয়স ব্যবহার করতে পারে। ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা পরিবারের অন্য সদস্যের অ্যাকাউন্ট দিয়ে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও দেখা গেছে, কিশোরেরা বয়স যাচাইয়ের প্রযুক্তিগত বাধা পরীক্ষা করে এবং কখনো তা পাশ কাটানোর পথ খোঁজে।
বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা গোপনীয়তার নতুন ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। যুক্তরাজ্যের অনলাইন বয়স যাচাইয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর ভিপিএন-সংক্রান্ত অনুসন্ধান ও আলোচনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবেষকেরা এটিকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নজরদারি এবং যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি নীতি, যা শুধু ‘নিষিদ্ধ’ বলবে না; বরং শিশুর বয়স, বিকাশ, অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা এবং গোপনীয়তাকে একসঙ্গে বিবেচনা করবে। শিশুকে ডিজিটাল পৃথিবী থেকে নির্বাসিত করা যাবে না। তাকে সেই পৃথিবীতে নিরাপদ, সমালোচনামুখী এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে প্রবেশ করতে শেখাতে হবে।
“আগে ক্লাসে গল্প শুরু করলে শিশুরা চোখ তুলে তাকাত। এখন কেউ কেউ গল্পের প্রথম মিনিটেই অস্থির হয়ে যায়। তারা দ্রুত দৃশ্য বদলাতে অভ্যস্ত। কিন্তু ফোন কেড়ে নিলেই সমস্যার সমাধান হয় না। আমাদের ক্লাসকেও আরও অংশগ্রহণমূলক করতে হবে। পরিবারকে বোঝাতে হবে, শিশুর বিরক্ত হওয়াও শেখার অংশ। প্রতিটি নীরব মুহূর্ত ভিডিও দিয়ে পূরণ করলে শিশুটি নিজের কল্পনা ব্যবহার করবে কখন?”
—একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, কল্পিত সাক্ষাৎকার
২০৩১ সালের এক শীতের সকাল। ময়মনসিংহের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুরা শ্রেণিকক্ষে ঢুকেই ফোন জমা দেয় না—কারণ অধিকাংশের ব্যক্তিগত ফোন আনার প্রয়োজনই নেই। দেয়ালে ঝোলানো একটি ছোট ডিজিটাল চার্টে আজকের পাঠ: “একটি অনলাইন খবর সত্য কি না বুঝব কীভাবে?”
শিক্ষক রুবিনা শিশুদের তিনটি খবর দেখান। তারা দল বেঁধে উৎস, ছবি ও ভাষা যাচাই করে। বিরতিতে মাঠ ভরে যায় দৌড়ঝাঁপে। পাশের কক্ষে অভিভাবকদের মাসিক ডিজিটাল প্যারেন্টিং সেশন চলছে। বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন এমন শিশুর জন্য বিদ্যালয়ের ট্যাবলেটে প্রবেশযোগ্য পাঠ রয়েছে, কিন্তু কোনো অ্যালগরিদমিক বিজ্ঞাপন নেই।
রাতে বাড়িতে শিশুরা নির্দিষ্ট সময় শিক্ষামূলক প্রযুক্তি ব্যবহার করে। খাবারের টেবিলে ফোন থাকে না। আইন আছে, কিন্তু আইনকে জীবন্ত করেছে পরিবার, বিদ্যালয়, স্থানীয় সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের যৌথ দায়িত্ব।
বাস্তবে শুরু করার নোট: কয়েকটি উপজেলা বা সিটি করপোরেশন এলাকায় পরীক্ষামূলক ‘শিশু ডিজিটাল সুস্থতা অঞ্চল’ চালু করা যেতে পারে। বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও অভিভাবক সমিতিকে এক প্ল্যাটফর্মে এনে ফলাফল মূল্যায়ন করে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
রোডম্যাপের ব্যাখ্যা
শিশুকে দায়ী করা সবচেয়ে সহজ। বলা যায়, তারা ফোনে আসক্ত। কিন্তু যে প্ল্যাটফর্মের ব্যবসায়িক সাফল্য নির্ভর করে ব্যবহারকারী কতক্ষণ আটকে থাকল, সেখানে শিশুর আত্মনিয়ন্ত্রণকে একমাত্র প্রতিরক্ষা বানানো অন্যায্য। অন্তহীন স্ক্রল, স্বয়ংক্রিয় ভিডিও, ক্ষণস্থায়ী স্টোরি, লাইক ও নোটিফিকেশন—এসব নিছক প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য নয়; এগুলো মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য নির্মিত নকশা। অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক বিধিতেও এ ধরনের বৈশিষ্ট্যকে শিশুদের আসক্তিমূলক ব্যবহার বাড়ানোর ঝুঁকির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাই শিশুকে ফোন থেকে সরানোর পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মকেও শিশুর মনোযোগের ওপর সীমাহীন বাণিজ্য করার সুযোগ থেকে সরাতে হবে।
রাষ্ট্র বলবে, পরিবারের দায়িত্ব। পরিবার বলবে, শিশুর বন্ধুরা সবাই ব্যবহার করে। বিদ্যালয় বলবে, বাড়ি থেকে ফোন নিয়ে আসে। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বলবে, অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ আছে। এই দায় ঠেলাঠেলির মধ্যেই একটি প্রজন্ম বড় হচ্ছে। বাস্তবতা হলো—দায়িত্ব সবার, কিন্তু ক্ষমতা সমান নয়।
শিশু সবচেয়ে কম ক্ষমতাবান। পরিবার পরামর্শ ও সহায়তা ছাড়া একা লড়তে পারে না। বিদ্যালয় নীতিমালা ছাড়া সীমিত। আর রাষ্ট্রই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যে প্ল্যাটফর্মকে জবাবদিহির আওতায় আনতে, বিদ্যালয়কে নির্দেশনা দিতে, পরিবারকে সহায়তা করতে এবং শিশুর অধিকার সুরক্ষিত করতে পারে।
ফ্রান্সের আইন নিখুঁত কি না, তার উত্তর সময় দেবে। কিন্তু তারা অন্তত স্বীকার করেছে—শিশুর শৈশব কেবল পরিবারের ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, অধিকার ও রাষ্ট্রীয় নীতির প্রশ্ন। —বাংলাদেশ সেই স্বীকৃতি দেবে কবে?
প্রযুক্তি মানবসভ্যতার অন্যতম বড় অর্জন; কিন্তু প্রযুক্তি তখনই মানবিক থাকে, যখন মানুষ তার নিয়ন্ত্রক থাকে—প্রযুক্তি মানুষের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে না। আজকের শিশুরা এমন এক পৃথিবীতে বড় হচ্ছে, যেখানে তাদের প্রথম খেলনা অনেক সময় একটি পর্দা, প্রথম গল্প একটি ভিডিও, প্রথম বন্ধু একটি অ্যালগরিদম এবং প্রথম সামাজিক অভিজ্ঞতা একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয়। আবার প্রযুক্তির হাতে শৈশবকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করেও কোনো সুস্থ, সৃজনশীল ও মানবিক সমাজ গড়ে ওঠে না।
ফ্রান্সের আইন বাংলাদেশের জন্য কোনো চূড়ান্ত নকশা নয়; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সূচনা—শিশুর ডিজিটাল জীবন কি কেবল পারিবারিক সিদ্ধান্ত, নাকি এটি শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নীতিরও বিষয়? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বাংলাদেশকে নিষেধাজ্ঞা ও স্বাধীনতার কৃত্রিম দ্বন্দ্ব অতিক্রম করে প্রমাণভিত্তিক, শিশুকেন্দ্রিক এবং অধিকারসম্মত ডিজিটাল নীতি গড়ে তুলতে হবে। পরিবারকে হতে হবে প্রথম শিক্ষালয়, বিদ্যালয়কে ডিজিটাল নাগরিকত্বের অনুশীলন ক্ষেত্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে হতে হবে জবাবদিহিমূলক, আর রাষ্ট্রকে হতে হবে শিশুস্বার্থের নিরপেক্ষ অভিভাবক।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিশুরা কত দ্রুত স্ক্রল করতে পারে, তা দিয়ে নয়; বরং তারা কত গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে, কত মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারে, কত সাহস নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে এবং কত মানবিকভাবে অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, তা দিয়ে। যদি আমরা সত্যিই একটি জ্ঞানভিত্তিক, সৃজনশীল ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে আমাদের ডিজিটাল নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে শিশুর অধিকার, শেখার আনন্দ এবং মানবিক বিকাশকে। কারণ একটি শিশুর প্রথম স্ক্রল নয়—তার প্রথম গল্প, প্রথম খেলা, প্রথম প্রশ্ন এবং প্রথম মানবিক সংলাপই একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রকৃত সূচনা।
শিশুর হাত থেকে সব প্রযুক্তি কেড়ে নেওয়া ভবিষ্যৎ নয়; প্রযুক্তির কাছে তার শৈশব সমর্পণ করাও উন্নয়ন নয়। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে এমন বাংলাদেশ, যেখানে শিশু পর্দা ব্যবহার করবে জ্ঞান অর্জনে—কিন্তু তার ভাষা, কল্পনা, খেলা, ঘুম, সম্পর্ক ও মনোযোগের ওপর কর্তৃত্ব করবে না কোনো অদৃশ্য অ্যালগরিদম।
ফোনটি শিশুর হাতে—কিন্তু রিমোট কন্ট্রোলটি কার হাতে? শৈশবকে অফলাইনে ফেরানো নয়; তাকে অনলাইনেও মানুষ হিসেবে বাঁচানোই আসল লক্ষ্য। বাংলাদেশের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ শুরু হবে শিশুর প্রথম স্ক্রল থেকে নয়—তার প্রথম গল্প, প্রথম খেলা এবং প্রথম প্রশ্ন থেকে।
– –অধ্যাপক ড. মাহবুব রহমান (লিটু), উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শিশু_সুরক্ষা #ডিজিটাল_শিশুসুরক্ষা #সোশ্যালমিডিয়া #স্মার্টফোন #শিশু #বাংলাদেশ #ফ্রান্স #EducationReform #DigitalWellbeing #DigitalCitizenship #OnlineSafety #ChildRights #ScreenTime #Parenting #DigitalParenting #EducationPolicy #ChildDevelopment #MentalHealth #UNICEF #UNESCO #WHO #SocialMediaRegulation #DigitalLiteracy #MediaLiteracy #CyberSafety #EvidenceBasedPolicy #অধিকারপত্র #শিক্ষা_সংস্কার #ResearchBasedJournalism #FutureOfChildren