08/11/2026 একটি কারখানা হলে জরুরি সভা হতো—শিক্ষাব্যবস্থা বলে বলেই কি ৩৭.৭৫ শতাংশ ব্যর্থতা স্বাভাবিক? │ অধিকারপত্র এসএসসি ফলাফল প্রতিক্রিয়া-০৪
Dr Mahbub
১১ August ২০২৬ ০৫:৩৬
অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক│ এসএসসি ফলাফল প্রতিক্রিয়া-০৪│দেশ চিন্তা
এই লেখায়—কারখানার উপমাটি শিক্ষার্থীর মানবিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার জন্য নয়, বরং শিক্ষা-সরবরাহব্যবস্থা, বিনিয়োগ ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিকে পরীক্ষার মুখে দাঁড় করাতে ব্যবহার করা হয়েছে। Input–Process–Output–Outcome–Impact কাঠামো নিবন্ধটিকে শিক্ষাবৈজ্ঞানিক ভিত্তিও দিয়েছে।২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ পরীক্ষার্থী—মোট অংশগ্রহণকারীর ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ—উত্তীর্ণ হতে পারেনি। একটি শিল্পকারখানার প্রায় ৩৮ শতাংশ উৎপাদন চূড়ান্ত মান পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে জরুরি পরিচালনা পর্ষদ সভা, স্বাধীন অডিট, লোকসানের হিসাব এবং পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হতো। অথচ প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থীর দশ বছরের শিক্ষাযাত্রা প্রত্যাশিত ফল না দেওয়ার পর রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থায় একই মাত্রার জরুরি পর্যালোচনা কোথায়? এই অনুসন্ধানী ফিচারে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী-কোহর্টের সরকারি ও পারিবারিক শিক্ষাবিনিয়োগ, শেখার অর্জন, অনুত্তীর্ণতা, শ্রেণি পুনরাবৃত্তি, ঝরে পড়া, ভবিষ্যৎ আয়হানি এবং সম্ভাব্য শিক্ষাগত রিটার্ন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রাথমিক দৃশ্যকল্পভিত্তিক হিসাবে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের পেছনে প্রায় ৩৫ হাজার ১২৪ কোটি টাকার মোট বিনিয়োগ জড়িত থাকতে পারে; সম্ভাব্য নেট অপচয় বা অনর্জিত শিক্ষাগত রিটার্নের পরিমাণ ৯ হাজার ১৮৫ কোটি থেকে ১৬ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা—যদিও এগুলো সরকারি নিরীক্ষিত হিসাব নয়। শিক্ষার্থীকে পণ্য নয়, অধিকারসম্পন্ন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে নিবন্ধটি রাষ্ট্রের ইনপুট, পাঠদানপ্রক্রিয়া, শিক্ষকপ্রাপ্যতা, অর্থায়ন, তদারকি, মূল্যায়ন এবং পুনরুদ্ধারব্যবস্থাকে জবাবদিহির পরীক্ষায় বসানোর দাবি জানিয়েছে। প্রস্তাব করা হয়েছে স্বাধীন Cohort Expenditure and Learning Return Audit, শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়ের উন্মুক্ত ড্যাশবোর্ড, বিষয়ভিত্তিক ব্যর্থতা বিশ্লেষণ এবং অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য বিনা মূল্যের পুনরুদ্ধারমূলক শিক্ষা।
ধরা যাক, একটি বৃহৎ শিল্পকারখানা দশ বছর ধরে বিপুল অর্থ, শ্রম, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি বিনিয়োগ করে পণ্য উৎপাদন করল। দশ বছর শেষে চূড়ান্ত মান পরীক্ষায় দেখা গেল, উৎপাদিত পণ্যের ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ নির্ধারিত মান অর্জন করতে পারেনি। সেই ব্যাচের ব্যর্থ উৎপাদনের পেছনে মোট বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার ১২৪ কোটি টাকা এবং সম্ভাব্য নেট অপচয়ের পরিমাণ ৯ হাজার ১৮৫ কোটি থেকে ১৬ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা; মধ্যম প্রাক্কলনে প্রায় ১২ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা।
তখন সেই কোম্পানি কী করত?
পরদিনই পরিচালনা পর্ষদের জরুরি সভা বসত। প্রধান নির্বাহী, অর্থ কর্মকর্তা, উৎপাদন ব্যবস্থাপক, মাননিয়ন্ত্রণ বিভাগ ও নিরীক্ষককে তলব করা হতো। কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, কর্মীদের দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা, তদারকি এবং সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ পরীক্ষা করা হতো। স্বাধীন অডিট কমিটি গঠন করা হতো। শেয়ারহোল্ডারদের কাছে লোকসানের ব্যাখ্যা দিতে হতো। দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জবাবদিহি, পদত্যাগ কিংবা অপসারণও ঘটতে পারত। পরবর্তী উৎপাদনচক্র রক্ষার জন্য জরুরি পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হতো।
কারণ কোনো প্রতিষ্ঠান তার উৎপাদনের প্রায় ৩৮ শতাংশ মানহীন হওয়ার পরও শুধু সফল ৬২ শতাংশ নিয়ে আতশবাজি করে না।
কিন্তু ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় প্রায় প্রতি পাঁচ পরীক্ষার্থীর দুজন অনুত্তীর্ণ হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া কী? ফল প্রকাশের অনুষ্ঠান হয়েছে, পাসের হার ও জিপিএ–৫-এর সংখ্যা ঘোষণা করা হয়েছে, বোর্ডভিত্তিক তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। অথচ ১১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশ্য সরকারি ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, এই বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নেতৃত্বে কোনো জাতীয় জরুরি পর্যালোচনা, স্বাধীন ব্যয়–ফলাফল নিরীক্ষা কিংবা সময়সীমাবদ্ধ পুনরুদ্ধার কর্মসূচির ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
৩১২টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে না পারা, ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ শিক্ষার্থীর অনুত্তীর্ণ হওয়া এবং কয়েক লাখ পরিবারের দশ বছরের বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়া—এসবকে কি রাষ্ট্র জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের জরুরি সংকট হিসেবে দেখছে? নাকি এগুলোকে প্রতিবছরের ফল প্রকাশের একটি পরিচিত পরিসংখ্যান হিসেবেই গ্রহণ করা হচ্ছে?
কারখানার উপমাটি ব্যবহারে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সীমারেখা মনে রাখা দরকার। শিক্ষার্থী কোনো যন্ত্রে তৈরি পণ্য নয়; সে স্বতন্ত্র মর্যাদা, সম্ভাবনা, আবেগ ও অধিকারসম্পন্ন মানুষ। কোনো পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ার কারণে তাকে “ত্রুটিপূর্ণ পণ্য” বলা যাবে না। বরং কারখানা-উপমার মান-পরীক্ষায় বসাতে হবে রাষ্ট্রের শিক্ষা উৎপাদনব্যবস্থাকে। এখানে মূল্যায়নের বিষয় হবে:
শিক্ষার্থীকে কাঁচামাল বা পণ্য হিসেবে নয়, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান অধিকারধারী এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্র হিসেবে দেখতে হবে। ব্যর্থতার প্রশ্নটি তাই “শিক্ষার্থী কেন পাস করল না”—এখানে থামতে পারে না। প্রশ্ন করতে হবে—রাষ্ট্র কেন তাকে শেখাতে পারল না?
একটি শিশুর এসএসসি পরীক্ষার ফল শুধু পরীক্ষার হলে লেখা কয়েক ঘণ্টার উত্তরের ফসল নয়। এর শিকড় ছড়িয়ে থাকে তার প্রথম বিদ্যালয়-প্রবেশের দিন থেকে দশম শ্রেণির শেষ পাঠ পর্যন্ত দীর্ঘ এক শিক্ষাযাত্রায়। সেই যাত্রায় রাষ্ট্র কত টাকা বিনিয়োগ করেছে, কেমন শিক্ষক দিয়েছে, বিদ্যালয়ে কী ধরনের পরিবেশ তৈরি করেছে, কতটা নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করেছে এবং শেখার ঘাটতি ধরা পড়ার পর কী সহায়তা দিয়েছে—সবকিছুর সম্মিলিত প্রতিফলন ঘটে চূড়ান্ত ফলাফলে। অথচ ফল প্রকাশের দিন আলোচনার কেন্দ্রে থাকে শুধু পরীক্ষার্থীর নম্বর, পাসের হার ও জিপিএ। যে রাষ্ট্র দশ বছর ধরে পুরো শিক্ষা-প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করল, তার অর্জন কিংবা ব্যর্থতার কোনো পৃথক ফলপত্র প্রকাশিত হয় না।
মানবসম্পদ উন্নয়ন ও শিক্ষা-ব্যবস্থাপনায় বহুল ব্যবহৃত Input–Process–Output–Outcome–Impact কাঠামোর আলোকে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ করলে এই অদৃশ্য রাষ্ট্রীয় ফলপত্রটি কিছুটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই কাঠামো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষার ফলাফল কোনো বিচ্ছিন্ন সংখ্যা নয়; এটি সম্পদ, প্রক্রিয়া, তাৎক্ষণিক অর্জন, ভবিষ্যৎ পরিণতি এবং জাতীয় প্রভাবের একটি ধারাবাহিক কার্যকারণ-শৃঙ্খল। শৃঙ্খলের প্রথম কয়েকটি কড়ি দুর্বল রেখে শেষ কড়িতে শক্তিশালী ফল প্রত্যাশা করা শিক্ষাবৈজ্ঞানিকভাবে অবাস্তব।
এই ধারাবাহিকতার প্রথম স্তর হলো ইনপুট—অর্থাৎ শিক্ষা অর্জনের জন্য রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজ শিশুটির হাতে শুরুতে কী কী উপাদান তুলে দিয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষা বাজেট, বিদ্যালয়, যোগ্য ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, পাঠ্যপুস্তক, শ্রেণিকক্ষ, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, নিরাপদ যাতায়াত, শিক্ষা-সহায়ক উপকরণ এবং পরিবারের বহন করা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যয়। শিশুর পুষ্টি, স্বাস্থ্য, মানসিক নিরাপত্তা এবং পরিবারের শিক্ষাগত সহায়তাও এই ইনপুটের বিস্তৃত অংশ।
কিন্তু সব শিশুর শিক্ষা-বীজতলা কি একইভাবে প্রস্তুত ছিল? রাজধানীর একটি সম্পদসমৃদ্ধ বিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক, ব্যবহারযোগ্য বিজ্ঞানাগার, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ ও নিয়মিত সহশিক্ষা কার্যক্রম থাকতে পারে। অন্যদিকে চর, হাওর, পাহাড়, উপকূল কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের একটি বিদ্যালয়ে ইংরেজি বা গণিতের পদ বছরের পর বছর শূন্য থাকতে পারে; বিজ্ঞানের বই থাকলেও পরীক্ষাগার নাও থাকতে পারে; কম্পিউটার কাগজে থাকলেও বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের অভাবে তা ব্যবহারযোগ্য নাও হতে পারে। একই রাষ্ট্রের দুই বিদ্যালয় যখন এমন ভিন্ন ইনপুট পায়, তখন তাদের শিক্ষার্থীদের শেষ পর্যন্ত একই ফল অর্জনের প্রত্যাশা করা ন্যায়সংগত হতে পারে না।
এখানে মূল প্রশ্ন শুধু রাষ্ট্র কত টাকা বরাদ্দ করেছে, তা নয়; বরং সেই বরাদ্দ কোথায়, কার জন্য এবং কতটা ন্যায়সংগতভাবে ব্যয় হয়েছে। শিক্ষার্থীপ্রতি প্রকৃত ব্যয় কত ছিল? দরিদ্র, প্রতিবন্ধী ও দুর্গম অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কি তাদের অতিরিক্ত প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি সহায়তা পেয়েছে? নাকি মাথাপিছু সমতার নামে আগে থেকেই সুবিধাপ্রাপ্ত ও পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানকে একই অঙ্ক দিয়ে বৈষম্য অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে? ইনপুটের মূল্যায়ন ছাড়া ফলাফলের বৈষম্যকে শিক্ষার্থীর মেধার বৈষম্য বলে ব্যাখ্যা করা হবে অসম সুযোগকে আড়াল করার কৌশল।
দ্বিতীয় স্তর হলো প্রসেস—বরাদ্দ করা সম্পদ শ্রেণিকক্ষে কীভাবে জীবন্ত শিক্ষায় রূপান্তরিত হয়েছে। একটি বিদ্যালয় ভবন নির্মিত হয়েছে, শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়েছে—এতেই শিক্ষা সম্পন্ন হয় না। শিক্ষক নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত ছিলেন কি না, পাঠদান শিক্ষার্থীর বয়স ও সক্ষমতার উপযোগী ছিল কি না, শিশুরা প্রশ্ন করতে পেরেছে কি না, দুর্বল শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত সহায়তা পেয়েছে কি না এবং মূল্যায়নের তথ্য পরবর্তী পাঠপরিকল্পনায় ব্যবহৃত হয়েছে কি না—এসবের ভেতর দিয়েই প্রকৃত শিক্ষা-প্রক্রিয়া গড়ে ওঠে।
প্রসেসের মধ্যে তাই রয়েছে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের উপস্থিতি, কার্যকর শিক্ষাঘণ্টা, শ্রেণিকক্ষের আন্তঃক্রিয়া, ধারাবাহিক মূল্যায়ন, বিদ্যালয় পরিদর্শন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রতিকারমূলক শিক্ষা, কাউন্সেলিং এবং পরিবার–বিদ্যালয় যোগাযোগ। প্রশ্ন হলো, এই পরীক্ষার্থীদের দশ বছরের শিক্ষাজীবনে এসব প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর ছিল? কোনো শিশু তৃতীয় শ্রেণিতে স্বচ্ছন্দে পড়তে না পারলে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভগ্নাংশ বুঝতে না পারলে কিংবা অষ্টম শ্রেণিতে ইংরেজি বাক্য গঠন করতে না পারলে সেই ঘাটতি কখন শনাক্ত করা হয়েছিল? শনাক্ত হওয়ার পর তাকে কি অতিরিক্ত শেখার সময়, প্রশিক্ষিত শিক্ষক কিংবা বিনা মূল্যের সহায়তা দেওয়া হয়েছিল?
শেখার ঘাটতি অনেকটা দেয়ালের সূক্ষ্ম ফাটলের মতো। শুরুতে তা ছোট ও সহজে মেরামতযোগ্য থাকে; অবহেলা করলে ধীরে ধীরে পুরো কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। প্রাথমিক শ্রেণির পাঠদক্ষতার ঘাটতি যদি বছরের পর বছর অশনাক্ত থাকে, তবে মাধ্যমিকে এসে শিশুটি বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের প্রশ্নও বুঝতে পারে না। মৌলিক সংখ্যাজ্ঞান দুর্বল থাকলে পরবর্তী সময়ে বীজগণিত বা জ্যামিতি তার কাছে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। দশম শ্রেণির শেষ দিকে কয়েকটি অতিরিক্ত ক্লাস দিয়ে বহু বছরের জমে থাকা সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
তাই ২০২৬ সালের ফল আমাদের শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির শেষ কয়েক মাস নিয়ে প্রশ্ন করতে বলে না; এটি পুরো দশ বছরের শিক্ষা-প্রক্রিয়ার দিকে ফিরে তাকাতে বাধ্য করে। বিদ্যালয় পরিদর্শন কি শুধু রেজিস্টার, ভবন ও প্রশাসনিক কাগজপত্র দেখেছে, নাকি শ্রেণিকক্ষে শিশুর শেখা পর্যবেক্ষণ করেছে? দুর্বল বিদ্যালয়ের জন্য পরিদর্শন-পরবর্তী সহায়তা ছিল কি? কাউন্সেলিং কি কেবল সংকটের পরে এসেছে, নাকি শিশুর ভয়, অনুপস্থিতি, হতাশা ও ঝরে পড়ার ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করেছে? এসব প্রশ্নের উত্তরই প্রসেসের মান নির্ধারণ করবে।
তৃতীয় স্তর হলো আউটপুট—শিক্ষা-প্রক্রিয়ার তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান ফল। এসএসসি পাসের হার, জিপিএ, বিষয়ভিত্তিক নম্বর, সনদ এবং নির্ধারিত দক্ষতা অর্জন এই স্তরের অন্তর্ভুক্ত। সংবাদমাধ্যম, শিক্ষা বোর্ড এবং প্রশাসনিক আলোচনায় মূলত এই আউটপুটেরই একটি সংকীর্ণ অংশ প্রাধান্য পায়। কতজন পাস করেছে, কতজন জিপিএ–৫ পেয়েছে এবং কোন বোর্ড এগিয়ে—এসব তথ্য দ্রুত প্রকাশিত হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীরা বাস্তবে কতটা পড়তে, লিখতে, যুক্তি করতে, সমস্যা সমাধান করতে এবং অর্জিত জ্ঞান জীবনের বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছে, সেই প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে আড়ালে থেকে যায়।
২০২৬ সালের ফলাফলে ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণতার ন্যূনতম মান অর্জন করতে পারেনি। এই সংখ্যাকে যদি শুধু পরীক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়, তবে আউটপুটের পেছনে থাকা ইনপুট ও প্রসেসের ব্যর্থতা অদৃশ্য হয়ে যাবে। প্রায় প্রতি পাঁচজনের মধ্যে দুজন কেন নির্ধারিত মানে পৌঁছাতে পারল না? তাদের সবাই কি সমানভাবে অমনোযোগী ছিল? নাকি কোনো কোনো বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক ছিল না, শেখার সময় হারিয়েছে, মূল্যায়নের পদ্ধতি দুর্বল ছিল অথবা বছরের পর বছর জমে থাকা ঘাটতি পূরণের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি?
পাশাপাশি আরেকটি সতর্কতাও জরুরি—পাস করলেই যে প্রত্যাশিত শেখা নিশ্চিত হয়েছে, তা-ও বলা যায় না। পরীক্ষানির্ভর প্রস্তুতি, মুখস্থকরণ, কোচিং ও সম্ভাব্য প্রশ্নের অনুশীলন একজন শিক্ষার্থীকে সনদ এনে দিতে পারে; কিন্তু তা সব সময় গভীর অনুধাবন, সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা বা বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতা নিশ্চিত করে না। অতএব, পাসের হার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও সেটিই শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ মান নয়। আউটপুটের বিচার করতে হলে সনদের পাশাপাশি প্রকৃত শেখা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা এবং প্রয়োগক্ষমতার তথ্যও প্রয়োজন।
চতুর্থ স্তর হলো আউটকাম—পরীক্ষার তাৎক্ষণিক ফল শিক্ষার্থীর পরবর্তী জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করে। একজন শিক্ষার্থী এসএসসিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর উচ্চমাধ্যমিক, কারিগরি শিক্ষা, প্রশিক্ষণ কিংবা কর্মজীবনের পথে প্রবেশ করতে পারে। অন্যদিকে অনুত্তীর্ণতা তার শিক্ষাজীবনে বিরতি, শ্রেণি পুনরাবৃত্তি, অতিরিক্ত পারিবারিক ব্যয়, আত্মমর্যাদাহানি, বিদ্যালয়ত্যাগ, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম কিংবা অনিরাপদ কর্মসংস্থানের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই আউটকাম শুধু পরবর্তী শ্রেণিতে ভর্তির পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে দক্ষতা, আয়, মানসিক সুস্থতা, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়ার সক্ষমতা।
প্রশ্ন হলো, ২০২৬ সালে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের পরবর্তী তিন থেকে পাঁচ বছর রাষ্ট্র অনুসরণ করবে কি? কতজন পুনঃপরীক্ষায় অংশ নেবে, কতজন উত্তীর্ণ হবে, কতজন কারিগরি বা বিকল্প শিক্ষায় যাবে এবং কতজন নীরবে শিক্ষা থেকে হারিয়ে যাবে—এসব তথ্য কি সংগ্রহ করা হবে? ফল প্রকাশের দিন তাদের একটি পরিসংখ্যান হিসেবে গণনা করে পরদিন ভুলে গেলে রাষ্ট্র আউটকামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটিই অদৃশ্য করে রাখবে।
একটি পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণতা জীবনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা নয়। উপযুক্ত পুনরুদ্ধারমূলক শিক্ষা, নমনীয় পুনঃপরীক্ষা, কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক বিকল্প পথ, কাউন্সেলিং এবং পারিবারিক সহায়তা পেলে একজন শিক্ষার্থী আবারও এগিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ নেতিবাচক আউটকাম অনিবার্য নয়; রাষ্ট্রীয় প্রতিকার ও দ্বিতীয় সুযোগের মাধ্যমে তা বদলানো সম্ভব। কিন্তু সেই সুযোগ অনুপস্থিত থাকলে পরীক্ষার একটি ফল ধীরে ধীরে সামাজিক বর্জন ও অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতার স্থায়ী পরিচয়ে পরিণত হতে পারে।
পঞ্চম এবং সবচেয়ে বিস্তৃত স্তর হলো ইমপ্যাক্ট—শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ও সামাজিক প্রভাব। একটি প্রজন্ম কী ধরনের শিক্ষা পেল, তার প্রতিফলন কয়েক বছর পর শ্রমবাজার, অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, সামাজিক সম্পর্ক, নাগরিক সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে দেখা যায়। গুণগত শিক্ষা উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন, আয়, সামাজিক গতিশীলতা এবং দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব বাড়ায়। বিপরীতে দুর্বল ও বৈষম্যপূর্ণ শিক্ষা অদক্ষ শ্রমশক্তি, বেকারত্ব, কম উৎপাদনশীলতা, দারিদ্র্যের পুনরুৎপাদন, সামাজিক হতাশা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দুর্বলতার ঝুঁকি বাড়ায়।
শিক্ষাব্যবস্থা যখন শহরের সচ্ছল শিশুকে উৎকৃষ্ট সুযোগ এবং প্রত্যন্ত বা দরিদ্র শিশুকে ন্যূনতম মানের নিচের শিক্ষা দেয়, তখন বিদ্যালয় বৈষম্য দূর করে না; বরং জন্মসূত্রে পাওয়া অসমতাকে রাষ্ট্রীয় সনদের মাধ্যমে পুনরায় বৈধতা দেয়। সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা, ভালো কর্মসংস্থান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্থানে পৌঁছে যায়; বঞ্চিত শিক্ষার্থী কম দক্ষতা, কম আয় ও সীমিত সামাজিক গতিশীলতার চক্রে আটকা পড়ে। এভাবে একটি অসম শ্রেণিকক্ষ ধীরে ধীরে অসম শ্রমবাজার, অসম আয়বণ্টন এবং অসম নাগরিক ক্ষমতার জন্ম দেয়।
এই ইমপ্যাক্ট কোনো একটি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন পুরোপুরি দৃশ্যমান হয় না। এর ছায়া দীর্ঘ হয়ে পড়ে ভবিষ্যতের ওপর। আজকের শেখার ঘাটতি আগামী দিনের দক্ষতার ঘাটতি; আজকের শিক্ষকসংকট আগামী দিনের উৎপাদনশীলতার সংকট; আজকের বিদ্যালয়ভিত্তিক বৈষম্য আগামী দিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক অসমতার ভিত্তি। তাই এসএসসি ফলাফলকে শুধু শিক্ষা বোর্ডের প্রশাসনিক ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না—এটি জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
আমাদের প্রচলিত ফল প্রকাশ সংস্কৃতি মূলত আউটপুটের একটি মাত্র সূচক—পাসের হার—নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু আউটপুটের পেছনে থাকা ইনপুটের বৈষম্য, প্রসেসের দুর্বলতা, ভবিষ্যৎ আউটকাম এবং দীর্ঘমেয়াদি ইমপ্যাক্ট নিয়মিতভাবে পরিমাপ ও প্রকাশ করা হয় না। ফলে আমরা জানতে পারি কোন শিক্ষার্থী কত নম্বর পেয়েছে, কিন্তু জানতে পারি না তাকে শেখানোর দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্র কত নম্বর পাওয়ার যোগ্য।
রাষ্ট্রের ফলপত্রে তাই শুধু জাতীয় পাসের হার থাকলে চলবে না। সেখানে থাকতে হবে শিক্ষার্থীপ্রতি প্রকৃত ব্যয়, শিক্ষকশূন্য পদের হার, বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের সময়, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি, শেখার ঘাটতি শনাক্তকরণের সময়, প্রতিকারমূলক সহায়তা, অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য, পুনঃপরীক্ষায় প্রত্যাবর্তন, ঝরে পড়া এবং পরবর্তী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের তথ্য। এই সূচকগুলো একসঙ্গে প্রকাশ করলেই বোঝা যাবে—ব্যর্থতা শিশুর ছিল, নাকি তাকে ঘিরে নির্মিত ব্যবস্থার।
২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফল তাই কেবল পরীক্ষার্থীদের ফল নয়; এটি রাষ্ট্রীয় শিক্ষা-পরিকল্পনারও একটি আয়না। সেই আয়নায় প্রায় সাত লাখ অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর মুখের পাশাপাশি বাজেট, শিক্ষকনীতি, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা, মূল্যায়ন, পরিদর্শন ও সামাজিক বৈষম্যের প্রতিচ্ছবিও দেখা যায়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শুধু শিশুকে দোষারোপ করলে সত্য আড়াল হবে। বরং রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে হবে—প্রয়োজনীয় ইনপুট কি দেওয়া হয়েছিল, শেখার প্রসেস কি কার্যকর ছিল, আউটপুট কেন দুর্বল হলো, আউটকাম কীভাবে উদ্ধার করা যাবে এবং এই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ইমপ্যাক্ট জাতিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?
শিক্ষার্থীর নম্বর প্রকাশিত হয়েছে। এখন প্রকাশিত হোক রাষ্ট্রের নম্বরও—কারণ শেখার দায়িত্ব শুধু শিশুর নয়; তাকে শেখানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রেরও। ৩৫ হাজার কোটি টাকা পুরোপুরি ‘লোকসান’ নয়, কিন্তু জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না
অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের পেছনে বিনিয়োগ করা আনুমানিক ৩৫ হাজার ১২৪ কোটি টাকার পুরোটাই নষ্ট হয়েছে—এমন দাবি যথার্থ নয়। তারা দশ বছরে সাক্ষরতা, সংখ্যাজ্ঞান, সামাজিকতা ও জীবনদক্ষতার কিছু অংশ অর্জন করেছে; অনেকে পরবর্তী পরীক্ষায় পাস করবে।
তবে এই সতর্কতা যেন রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আড়াল করার অজুহাত না হয়। কারণ মধ্যম প্রাক্কলনে প্রায় ১২ হাজার ২৯৩ কোটি টাকার বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাগত রিটার্ন না দেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর সঙ্গে পুনঃপরীক্ষা, অতিরিক্ত শিক্ষাবর্ষ, ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, মানসিক সংকট এবং ভবিষ্যৎ আয়হানি যোগ করলে জাতীয় ক্ষতি আরও বড় হবে।
একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ১২ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য নেট ক্ষতি হলে তা জাতীয় অর্থনৈতিক সংবাদ হয়ে উঠত। সংসদীয় কমিটি, নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা সক্রিয় হতো। কিন্তু একই পরিমাণ অর্থ মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রত্যাশিত ফল না দিলে আমরা কেন সেটিকে একই মাত্রার জাতীয় সংকট হিসেবে দেখি না?
সম্ভবত কারণ শিক্ষার ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হিসাবের খাতায় লাল কালিতে দেখা যায় না। এর ক্ষত প্রকাশ পায় ধীরে—ঝরে পড়া তরুণে, অদক্ষ শ্রমশক্তিতে, বেকারত্বে, কম উৎপাদনশীলতায়, সামাজিক অস্থিরতায় এবং প্রজন্মান্তরে চলতে থাকা দারিদ্র্যে।
২০২৬ সালের ফলাফলের দায় শুধু বর্তমান সরকারের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার ঐতিহাসিক গভীরতা আড়াল হবে। এই পরীক্ষার্থীরা দশ বছর ধরে একাধিক সরকার, মন্ত্রী, সচিব, শিক্ষা প্রশাসন, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা-পদ্ধতি এবং কোভিডকালীন দীর্ঘ শিক্ষাবিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে এসেছে। অতএব এটি কোনো একটি সরকারের তৈরি এক দিনের সংকট নয়। এটি কয়েক দশক ধরে জমে থাকা:
কিন্তু বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে সংকট পেয়েছে বলে বর্তমান দায় থেকে মুক্ত হতে পারে না। রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা আছে। আগের ব্যর্থতা শনাক্ত করে তা সংশোধনের দায়িত্ব বর্তমান নীতিনির্ধারকদেরই নিতে হবে।
২০২৬ সালের এসএসসি ফল নিয়ে প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষা, অর্থ, পরিকল্পনা, স্থানীয় সরকার, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের জরুরি সভা হওয়া উচিত। সভাটি আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ না রেখে কয়েকটি সময়সীমাবদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে হবে:
শুধু তদন্ত কমিটি গঠন যথেষ্ট নয়। কার দায়িত্বে কোন কাজ, কত দিনের মধ্যে, কোন সূচকে এবং কত টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হবে—তা প্রকাশ করতে হবে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে ছিল রাজনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ। কিন্তু শিক্ষা যদি জন্মস্থান, পারিবারিক আয় এবং বিশেষ কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সুযোগের ওপর নির্ভর করে, তাহলে সামাজিক বৈষম্য কমার পরিবর্তে বিদ্যালয়ের ভেতরেই পুনরুৎপাদিত হবে।
একদিকে শহরের নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাসের আলো; অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়ে শূন্য পাসের অন্ধকার—এটি শুধু ফলাফলের ব্যবধান নয়। এটি একই রাষ্ট্রে দুই ধরনের নাগরিক তৈরির বিপজ্জনক প্রক্রিয়া।
গুণগত শিক্ষা ছাড়া উৎপাদনশীল মানবসম্পদ তৈরি হবে না। সমতাভিত্তিক শিক্ষা ছাড়া সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে না। সমালোচনামূলক চিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা ছাড়া গণতন্ত্রও টেকসই হবে না।
প্রশ্ন তাই শুধু ২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীদের নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র হিসেবে আমরা কবে ফল প্রকাশের উৎসব থেকে ফলাফলের দায় গ্রহণের সংস্কৃতিতে প্রবেশ করব?
একটি কোম্পানি ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ ব্যর্থ উৎপাদনের পর আগের নিয়মে পরবর্তী উৎপাদন শুরু করলে তাকে দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান বলা যায় না। একইভাবে একটি রাষ্ট্র প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থীর অনুত্তীর্ণতাকে বিশ্লেষণ না করে পরবর্তী ব্যাচকে একই ব্যবস্থার ভেতর ঠেলে দিলে সেটিও দায়িত্বশীল মানবসম্পদ উন্নয়ন নয়।
এখন প্রয়োজন আতশবাজি নয়—অডিট। আত্মতুষ্টি নয়—আত্মসমালোচনা। বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়—কাঠামোগত সংস্কার। আর শিক্ষার্থীকে দোষারোপ নয়—রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে জবাবদিহির পরীক্ষায় বসানো। কারণ একটি দেশের সবচেয়ে বড় লোকসান টাকা হারানো নয়; সবচেয়ে বড় লোকসান হলো—বিনিয়োগ করেও একটি প্রজন্মের সম্ভাবনাকে পূর্ণ বিকাশের সুযোগ না দেওয়া।
একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা কোনো কারখানা নয় এবং একজন শিক্ষার্থী কোনো উৎপাদিত পণ্য নয়। তার মূল্য একটি পরীক্ষার নম্বর, জিপিএ কিংবা সনদ দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। সে নিজস্ব মর্যাদা, অনুভূতি, স্বপ্ন, অভিজ্ঞতা ও বিকাশের সম্ভাবনাসম্পন্ন মানুষ। কিন্তু এই মানবিক সত্য রাষ্ট্রীয় শিক্ষা-সরবরাহব্যবস্থাকে জবাবদিহির বাইরে রাখার যুক্তিও হতে পারে না। বরং মানুষ নিয়েই শিক্ষা কাজ করে বলে তার ব্যর্থতার মূল্য কোনো শিল্পকারখানার আর্থিক লোকসানের চেয়েও গভীর, দীর্ঘস্থায়ী এবং বহুমাত্রিক।
কারখানার উপমার উদ্দেশ্য তাই শিক্ষার্থীকে মান পরীক্ষায় বসানো নয়; উদ্দেশ্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে পরীক্ষায় বসানো। দশ বছর ধরে বই, শিক্ষক, বিদ্যালয়, বাজেট, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে যে শিক্ষা-প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে, সেই ব্যবস্থার প্রায় ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ পরীক্ষার্থী কেন নির্ধারিত উত্তীর্ণতার মান অর্জন করতে পারল না—তার প্রমাণভিত্তিক উত্তর রাষ্ট্রকে দিতে হবে। একটি শিশুর ফল প্রকাশিত হলে তার শিক্ষকের, বিদ্যালয়ের, পরিদর্শনব্যবস্থার, শিক্ষা বোর্ডের এবং নীতিনির্ধারণী কাঠামোর ফলও একই সঙ্গে প্রকাশিত হওয়া উচিত।
২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফল কোনো এক দিনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই পরীক্ষার্থী-কোহর্ট প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত একাধিক সরকার, শিক্ষামন্ত্রী, সচিব, প্রকল্প, পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন-পদ্ধতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে এসেছে। তাদের শিক্ষাজীবনের ওপর কোভিডকালীন দীর্ঘ বিদ্যালয় বন্ধ, শেখার ক্ষতি, পারিবারিক অর্থনৈতিক সংকট, ডিজিটাল বিভাজন এবং পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের প্রভাবও রয়েছে। অতএব, বর্তমান সংকটের দায় কোনো একটি সরকার, একজন মন্ত্রী কিংবা একদল শিক্ষকের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে সমস্যার ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত চরিত্র আড়াল হবে।
তবে সংকট উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া মানে বর্তমান সরকারের দায়মুক্তি নয়। রাষ্ট্র একটি ধারাবাহিক প্রতিষ্ঠান। পূর্ববর্তী নীতির দুর্বলতা শনাক্ত করা, জমে থাকা শেখার ঘাটতি পূরণ করা এবং ভবিষ্যৎ ব্যর্থতা প্রতিরোধের দায়িত্ব বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদেরই। ইতিহাস কারণ ব্যাখ্যা করতে পারে; নিষ্ক্রিয়তাকে বৈধতা দিতে পারে না।
প্রাথমিক প্রাক্কলনে অনুত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের দশ বছরের সরকারি ও পারিবারিক শিক্ষাবিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার ১২৪ কোটি টাকা হতে পারে। এই অর্থের পুরোটিকে ‘অপচয়’ বলা শিক্ষাবৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরাও সাক্ষরতা, সংখ্যাজ্ঞান, সামাজিক যোগাযোগ, জীবনদক্ষতা এবং বিভিন্ন মাত্রার বিষয়জ্ঞান অর্জন করেছে। তাদের অনেকে পুনঃপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণে ফিরে আসবে এবং সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখবে।
কিন্তু আংশিক শেখা হয়েছে বলে প্রত্যাশিত রিটার্নের ঘাটতিকে অস্বীকার করা যাবে না। দৃশ্যকল্পভিত্তিক হিসাবে সম্ভাব্য নেট অপচয় বা অনর্জিত শিক্ষাগত রিটার্ন ৯ হাজার ১৮৫ কোটি থেকে ১৬ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা হতে পারে; মধ্যম প্রাক্কলনে প্রায় ১২ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। এগুলো সরকারি নিরীক্ষিত হিসাব নয়—বরং একটি জাতীয় অডিটের প্রয়োজনীয়তা বোঝানোর প্রাথমিক অনুমান। সঠিক অঙ্ক জানতে পরীক্ষার্থীদের প্রথম শ্রেণি থেকে এসএসসি পর্যন্ত সরকারি ব্যয়, পারিবারিক ব্যয়, উপস্থিতি, শ্রেণি পুনরাবৃত্তি, শেখার অর্জন, ঝরে পড়া এবং পরবর্তী শিক্ষায় অগ্রগতি অনুসরণ করতে হবে।
শিক্ষার ক্ষতি সাধারণ আর্থিক লোকসানের মতো সঙ্গে সঙ্গে হিসাবের খাতায় দৃশ্যমান হয় না। এর ক্ষত ধীরে প্রকাশিত হয়—বিদ্যালয়ত্যাগী কিশোরের জীবনে, বাল্যবিবাহে, শিশুশ্রমে, অদক্ষ কর্মসংস্থানে, কম আয় ও উৎপাদনশীলতায়, মানসিক সংকটে এবং প্রজন্মান্তরে চলতে থাকা দারিদ্র্যে। একটি শিল্পকারখানার লোকসান একটি অর্থবছরের ব্যালান্স শিটে ধরা পড়ে; দুর্বল শিক্ষার লোকসান একটি জাতির কয়েক দশকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে ছড়িয়ে পড়ে।
এ কারণেই ৩৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ অনুত্তীর্ণতাকে নিয়মিত বার্ষিক পরিসংখ্যান হিসেবে গ্রহণ করা বিপজ্জনক। এটি কোনো স্বাভাবিক ‘সিস্টেম লস’ নয়, যার সঙ্গে সমাজকে অভ্যস্ত হয়ে যেতে হবে। বরং এটি একটি জরুরি সতর্কসংকেত—দশ বছরের শিক্ষা-প্রক্রিয়ার কোথাও ইনপুট অপর্যাপ্ত ছিল, কোথাও সম্পদের বণ্টন বৈষম্যমূলক ছিল, কোথাও পাঠদান কার্যকর হয়নি, কোথাও শেখার ঘাটতি শনাক্ত হলেও প্রতিকার দেওয়া হয়নি এবং কোথাও মূল্যায়নব্যবস্থা শিক্ষার্থীর প্রকৃত সক্ষমতা ধরতে ব্যর্থ হয়েছে।
রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া তাই শুধু ফলাফল ঘোষণায় সীমিত থাকতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে শিক্ষা, অর্থ, পরিকল্পনা, স্থানীয় সরকার, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় পর্যালোচনা প্রয়োজন। কারণ প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থীর অনুত্তীর্ণতা শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি মানবসম্পদ, দারিদ্র্য, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, জনস্বাস্থ্য এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতার প্রশ্ন।
প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি স্বাধীন Cohort Expenditure and Learning Return Audit। এই নিরীক্ষায় শুধু কত টাকা ব্যয় হয়েছে তা নয়, কোথায়, কার জন্য, কোন খাতে এবং কী ফল অর্জনের উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যয় হয়েছে—তা দেখতে হবে। একই অঙ্কের বরাদ্দ কি শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে একই শিক্ষা-সুযোগ সৃষ্টি করেছে? শিক্ষক বেতন, ভবন বা প্রযুক্তিতে ব্যয় করা অর্থ শ্রেণিকক্ষের কার্যকর শেখায় রূপান্তরিত হয়েছে কি? দরিদ্র পরিবার রাষ্ট্রীয় শিক্ষার ঘাটতি পূরণে কত টাকা কোচিং, গাইডবই ও যাতায়াতে ব্যয় করেছে? এসব প্রশ্ন ছাড়া বিনিয়োগের রিটার্ন বোঝা যাবে না।
একই সঙ্গে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে পরবর্তী বছরের অপেক্ষায় রেখে দেওয়া চলবে না। তাদের জন্য দ্রুত বিষয়ভিত্তিক ডায়াগনস্টিক মূল্যায়ন, বিনা মূল্যের পুনরুদ্ধারমূলক পাঠদান, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও টিউটর সহায়তা, পুনঃনিরীক্ষা ও পুনঃপরীক্ষার পরিষ্কার নির্দেশনা, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং এবং পরবর্তী শিক্ষায় ফিরে আসার সুনির্দিষ্ট পথ তৈরি করতে হবে। অডিট যদি শুধু অতীতের ভুল গণনা করে, কিন্তু বর্তমান শিক্ষার্থীকে সহায়তা না করে, তবে সেটি মানবিক শিক্ষা-সংস্কার নয়—পরিসংখ্যানগত ময়নাতদন্ত মাত্র।
জবাবদিহির অর্থও কেবল কাউকে বরখাস্ত করা নয়। প্রকৃত জবাবদিহির মধ্যে থাকবে ব্যর্থতার কারণ শনাক্ত করা, দায়িত্বের স্তর নির্ধারণ, সময়সীমাবদ্ধ সংশোধন, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, অগ্রগতির সূচক প্রকাশ এবং নাগরিকের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়া। যেখানে অবহেলা, অনিয়ম বা দায়িত্বহীনতা প্রমাণিত হবে, সেখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে; আর যেখানে সম্পদ, দক্ষতা বা নীতির ঘাটতি রয়েছে, সেখানে প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও সহায়তা দিতে হবে।
এসএসসি ফলের আলোচনায় এত দিন আমরা প্রধানত সফল শিক্ষার্থীর সংখ্যা, জিপিএ–৫ এবং বোর্ডভিত্তিক পাসের হার দেখেছি। এখন আমাদের দেখতে হবে শিক্ষার ইনপুট, প্রসেস, আউটকাম ও দীর্ঘমেয়াদি ইমপ্যাক্ট। কতজন সনদ পেল—এই প্রশ্নের পাশাপাশি জানতে হবে কতজন সত্যিকার অর্থে পড়তে, যুক্তি করতে, গণিত প্রয়োগ করতে, বিজ্ঞান বুঝতে এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন গড়তে সক্ষম হলো। পাসের হার বাড়লেও শেখা না বাড়লে সেটি কাগুজে সাফল্য; আবার অনুত্তীর্ণতার হার কমাতে শুধু পরীক্ষার মান শিথিল করলে সেটিও শিক্ষা সংস্কার নয়।
স্বাধীনতার মূল অঙ্গীকার ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, সাম্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষ্ঠান বিদ্যালয়। কিন্তু বিদ্যালয় যদি শিশুর জন্মস্থান, পরিবারের আয় এবং কোচিং কেনার সামর্থ্য অনুযায়ী ভিন্ন মানের ভবিষ্যৎ বিতরণ করে, তবে শিক্ষা বৈষম্য ভাঙবে না; বরং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে সেই বৈষম্যকে পুনরুৎপাদন করবে।
সুতরাং এখন প্রয়োজন সাফল্যের আতশবাজির পাশাপাশি ব্যর্থতার অন্ধকারে রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধান। প্রয়োজন আত্মতুষ্টির পরিবর্তে আত্মসমালোচনা, বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে কাঠামোগত সংস্কার এবং শিক্ষার্থীকে দোষারোপের পরিবর্তে শিক্ষা-সরবরাহব্যবস্থাকে জবাবদিহির পরীক্ষায় বসানো।
একটি দেশের সবচেয়ে বড় লোকসান কেবল টাকা হারানো নয়। সবচেয়ে বড় লোকসান হলো—বিনিয়োগ, প্রতিষ্ঠান ও সময় থাকা সত্ত্বেও একটি প্রজন্মের সম্ভাবনাকে পূর্ণ বিকাশের সুযোগ না দেওয়া। ২০২৬ সালের ফলাফল সেই লোকসানের বিপৎসংকেত বাজিয়েছে। রাষ্ট্র এখনই যদি জরুরি সভা, স্বাধীন অডিট এবং শিক্ষার্থী পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা গ্রহণ না করে, তবে পরবর্তী ব্যাচকে একই অপরিবর্তিত ব্যবস্থায় পাঠানো হবে জেনেশুনে একই ঝুঁকির পুনরুৎপাদন।
শিক্ষার্থীদের ফল প্রকাশিত হয়েছে। এখন রাষ্ট্রেরও ফল প্রকাশের সময়—সে কতটা বিনিয়োগ করেছে, কতটা শেখাতে পেরেছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে এবং সেই ব্যর্থতা সংশোধনে ঠিক কবে, কত টাকা ব্যয়ে ও কার নেতৃত্বে কী করবে।
এই নিবন্ধে উল্লিখিত ৩৫ হাজার ১২৪ কোটি টাকার কোহর্ট বিনিয়োগ এবং ৯ হাজার ১৮৫ কোটি থেকে ১৬ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকার সম্ভাব্য নেট অপচয় কোনো চূড়ান্ত সরকারি হিসাব নয়। এগুলো নির্দিষ্ট অনুমান, ব্যয়-দৃশ্যকল্প ও শিক্ষাগত রিটার্নের ভিত্তিতে নির্মিত প্রাথমিক প্রাক্কলন। তাই সংখ্যাগুলোকে নিশ্চিত ‘লোকসান’ হিসেবে নয়, একটি স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় নিরীক্ষার যৌক্তিকতা নির্দেশকারী সতর্কসংকেত হিসেবে পড়তে হবে।
একইভাবে, এসএসসিতে অনুত্তীর্ণ হওয়া মানে দশ বছরের সব শিক্ষা ব্যর্থ হয়েছে—এমনও নয়। একজন শিক্ষার্থী সনদ অর্জন করতে না পারলেও সে বিভিন্ন স্তরের জ্ঞান, দক্ষতা ও সামাজিক সক্ষমতা অর্জন করে থাকতে পারে। কিন্তু ন্যূনতম প্রত্যাশিত ফল অর্জিত না হওয়া, পুনঃপরীক্ষার ব্যয়, ঝরে পড়ার ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও আয়ের ক্ষতি জবাবদিহির প্রশ্ন সৃষ্টি করে। মানবিক সংবেদনশীলতা ও আর্থিক নিরীক্ষা—দুটিকেই একসঙ্গে ধারণ করতে হবে।
অধিকারপত্রের এই বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীকে অর্থনৈতিক পণ্য হিসেবে দেখা নয়; বরং তার শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক সম্পদের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা। কোনো শিক্ষার্থীকে ‘অপচয়’ বলা যাবে না। অপচয়, যদি থেকে থাকে, তা হবে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার ব্যর্থতা, অসম সম্পদ বণ্টন, শিক্ষকসংকট, অকার্যকর তদারকি এবং সময়মতো শেখার সহায়তা না দেওয়ার মধ্যে।
সমালোচনাকে তাই বিরোধিতা নয়, সংশোধনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ফলাফলের প্রতিরক্ষামূলক ব্যাখ্যার পরিবর্তে উন্মুক্ত তথ্য, স্বাধীন অডিট এবং সময়সীমাবদ্ধ পুনরুদ্ধার কর্মসূচি নিয়ে সামনে আসতে হবে। নাগরিকের করের টাকা কোথায় ব্যয় হলো, কতটা শেখায় রূপান্তরিত হলো এবং পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য কী প্রতিকার দেওয়া হবে—এই হিসাব চাওয়া কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহের আবেদন নয়; এটি গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অধিকার।
এখন আর একটি তদন্ত কমিটির নাম ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, বাজেট, সময়সীমা, পরিমাপযোগ্য সূচক এবং প্রকাশ্য অগ্রগতি প্রতিবেদন। প্রাক্কলনকে নিরীক্ষিত হিসাবে, উদ্বেগকে পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় এবং সমালোচনাকে কাঠামোগত সংস্কারে রূপান্তর করাই হবে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল উত্তর।
শিক্ষার্থী ব্যর্থতার পণ্য নয়—সে রাষ্ট্রের অধিকারধারী নাগরিক। অতএব, এবার পরীক্ষায় বসুক শিক্ষাব্যবস্থা; আর ফলের সঙ্গে প্রকাশিত হোক রাষ্ট্রের হিসাবও।
২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল কেবল কতজন শিক্ষার্থী পাস বা ফেল করেছে, কোন শিক্ষা বোর্ড এগিয়ে কিংবা পিছিয়ে রয়েছে—সেই সংখ্যাগত হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই ফলাফলের গভীরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অর্জন ও সীমাবদ্ধতা, অঞ্চলভেদে সুযোগের বৈষম্য, প্রতিষ্ঠানগত দুর্বলতা, শিক্ষার্থীদের আর্থসামাজিক বাস্তবতা এবং রাষ্ট্রীয় সহায়তার ঘাটতির এক বিস্তৃত চিত্র।
এসব বিষয় নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করা এবং সবার জন্য কল্যাণমুখী, গুণগত, সাম্যভিত্তিক ও একীভূত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অধিকারপত্র ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে মোট আটটি প্রতিক্রিয়ামূলক ও বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ প্রকাশ করতে যাচ্ছে। এই ধারাবাহিকে ফলাফলের অন্তর্নিহিত কারণ, বিদ্যমান বৈষম্য, শিক্ষার্থী–শিক্ষক–প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা, নীতিগত সীমাবদ্ধতা এবং উত্তরণের সম্ভাব্য পথগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে ধরা হবে।
সম্মানিত পাঠকদের কাছে আমাদের আন্তরিক অনুরোধ—এই আটটি নিবন্ধই ধারাবাহিকভাবে পড়ুন। কারণ প্রতিটি নিবন্ধ বৃহত্তর সংকটের একটি স্বতন্ত্র দিক উন্মোচন করলেও, সব কটি লেখা একসঙ্গে পাঠ করলেই বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা, এর বৈষম্য ও সংকট এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
এই ধারাবাহিক কেবল ফলাফল নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়; এটি শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবার, প্রচলিত ব্যাখ্যাকে প্রশ্ন করার এবং প্রতিটি শিশুর জন্য ন্যায়সংগত ও মানসম্মত শিক্ষার পথ অনুসন্ধানের একটি সম্মিলিত প্রয়াস। তাই নিবন্ধগুলো পড়ুন, অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করুন এবং আপনার অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও গঠনমূলক মতামত আমাদের জানান। আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণই শিক্ষা সংস্কারের এই জনপরিসরকে আরও সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কার্যকর করে তুলবে।
আসুন, এসএসসি ফলাফলকে শুধু সাফল্য–ব্যর্থতার পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়না হিসেবে বিবেচনা করি।
(লিংক সহ নিচে দেওয়া হলো):
#অধিকারপত্র #অধিকারপত্রএসএসসিফলাফলপ্রতিক্রিয়া #এসএসসিফলাফল২০২৬ #SSCResult2026 #শিক্ষাসংস্কারধারাবাহিক #দেশচিন্তা #শিক্ষাবিনিয়োগ #শিক্ষাবিনিয়োগঅডিট #শিক্ষারিটার্ন #শিক্ষাগতঅপচয় #কোহর্টঅডিট #CohortExpenditureAudit #LearningReturnAudit #রাষ্ট্রীয়জবাবদিহি #শিক্ষাজবাবদিহি #শিক্ষাব্যবস্থারফল #৩৭দশমিক৭৫শতাংশ #প্রায়সাতলাখশিক্ষার্থী #শিক্ষার্থীপণ্যনয় #শিক্ষারঅধিকার #মানসম্মতশিক্ষা #সবারজন্যশিক্ষা #শিক্ষাবৈষম্য #শিক্ষাগতন্যায়বিচার #শহরগ্রামবৈষম্য #শিক্ষার্থীপ্রতিব্যয় #প্রয়োজনভিত্তিকঅর্থায়ন #শেখারঘাটতি #শেখারপুনরুদ্ধার #পুনরুদ্ধারমূলকশিক্ষা #শিক্ষকসংকট #বিদ্যালয়মাননিয়ন্ত্রণ #শিক্ষাঅর্থনীতি #মানবসম্পদউন্নয়ন #জাতীয়শিক্ষাঅডিট #শিক্ষাব্যয়ড্যাশবোর্ড #করদাতারটাকারহিসাব #জরুরিশিক্ষাপর্যালোচনা #EvidenceBasedEducation #EducationInvestment #EducationEconomics #EducationEquity #EducationJustice #LearningRecovery #QualityEducation #HumanCapitalDevelopment #PublicAccountability #SDG4 #BangladeshEducation