08/21/2026 গুণগত শিক্ষা কি মরীচিকা, না অর্জনযোগ্য বাস্তবতা: পাঠ্যবইয়ের প্রতিশ্রুতি থেকে শ্রেণিকক্ষের সত্য
Dr Mahbub
২১ August ২০২৬ ০৬:০১
বাংলাদেশে বিদ্যালয়ে ভর্তি, বিনা মূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং নারীশিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকা আর গুণগত শিক্ষা পাওয়া এক বিষয় নয়। জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ২০২২ দেখিয়েছে, পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলায় মাত্র অর্ধেক এবং গণিতে মাত্র ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী শ্রেণি-উপযোগী দক্ষতা অর্জন করেছে। অর্থাৎ পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা শেষ হলেও বহু শিশুর শেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। গুণগত শিক্ষা তাই কেবল ভালো বই, আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ, নতুন শিক্ষাক্রম বা উচ্চ পাসের হারের নাম নয়; এটি অর্থবহ শেখা, যুক্তিবোধ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, মানবিক মর্যাদা, অন্তর্ভুক্তি ও জীবনোপযোগী সক্ষমতার সমন্বিত ফল। এই নিবন্ধে গুণগত শিক্ষার ধারণা ও তাত্ত্বিক ভিত্তি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, বাংলাদেশের বাস্তব সংকট, পাঠ্যবইকেন্দ্রিক প্রতারণার স্বরূপ, শিক্ষকের পরিবর্তিত ভূমিকা, প্রমাণভিত্তিক শিক্ষণ, ন্যায়সংগত মূল্যায়ন, প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও ঝুঁকি এবং শিক্ষা-শাসনের দায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সিঙ্গাপুর, এস্তোনিয়া ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতার আলোকে দেখানো হয়েছে, শিক্ষককে নির্দেশ পালনের কর্মচারী নয়, জ্ঞাননির্ভর পেশাজীবী হিসেবে সক্ষম ও স্বাধীন না করলে গুণগত শিক্ষা বাস্তব হবে না। নিবন্ধটি শেষে বাংলাদেশে বাস্তবায়নযোগ্য একটি সমন্বিত সংস্কারপথও প্রস্তাব করেছে।
বছরের প্রথম দিনে একটি শিশু নতুন বই হাতে বাড়ি ফেরে। বইয়ের রঙিন প্রচ্ছদে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি, ভেতরে আনন্দময় শিক্ষা, অনুসন্ধান, মূল্যবোধ ও দক্ষতার কথা। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর তার দিনযাপন আটকে যায় মুখস্থ প্রশ্ন, নোটবই, কোচিং, শ্রেণিকক্ষের একমুখী বক্তৃতা এবং পরীক্ষায় অনুমোদিত বাক্য পুনরুৎপাদনের মধ্যে। তখন বইটি জ্ঞানের জানালা না হয়ে পরীক্ষার টিকিটে পরিণত হয়। এখানেই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সামনে আসে—আমরা কি শিশুকে শিক্ষা দিচ্ছি, নাকি শিক্ষার অভিনয় দেখাচ্ছি? গুণগত শিক্ষা কোনো বিলাসী রাষ্ট্রের অলংকার নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়, উৎপাদনশীলতা, গণতন্ত্র ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি। বাংলাদেশ বিদ্যালয়ে প্রবেশাধিকার বাড়াতে সফল হলেও শেখার গুণমান, সমতা এবং জবাবদিহির পরীক্ষায় এখনও গুরুতর ঘাটতির মুখে। অতএব গুণগত শিক্ষা মরীচিকা কি না, তার উত্তর কোনো স্লোগানে নয়—মিলবে শিশুর শেখা, শিক্ষকের সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের সততার ভেতরে।
শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, শেখার নিশ্চয়তা কি এসেছে?
বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাস কেবল ব্যর্থতার ইতিহাস নয়। প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন ভর্তির দিকে অগ্রগতি, মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, বিনা মূল্যে পাঠ্যবই, উপবৃত্তি, বিদ্যালয় অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং প্রান্তিক এলাকায় শিক্ষার সুযোগ তৈরির মতো অর্জন অস্বীকার করা অন্যায় হবে। শিক্ষায় প্রবেশাধিকার যে কয়েক দশক আগের তুলনায় অনেক বিস্তৃত হয়েছে, তা দৃশ্যমান। কিন্তু বিদ্যালয়ের দরজা খুলে দেওয়া এবং প্রতিটি শিশুর শেখা নিশ্চিত করা এক নয়। প্রথমটি উপস্থিতির হিসাব; দ্বিতীয়টি শিক্ষার প্রকৃত ফল।
এই ব্যবধানটি স্পষ্ট করেছে সরকারের জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন ২০২২। মূল্যায়ন অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির ৫১ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণির ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলায় শ্রেণি-উপযোগী দক্ষতা অর্জন করেছে। গণিতে এ হার যথাক্রমে ৩৯ ও ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পৌঁছেও প্রতি দশজনের সাতজন গণিতে প্রত্যাশিত মান অর্জন করতে পারেনি। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, জ্ঞান স্মরণ করার তুলনায় গাণিতিক ধারণার প্রয়োগে শিক্ষার্থীরা বেশি সমস্যায় পড়েছে।
ইউনিসেফের বাংলাদেশবিষয়ক তথ্যেও দেখা যায়, বিদ্যালয়ে প্রবেশের পর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে; মাত্র ৬৪ শতাংশ শিশু মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে। দরিদ্র শিশু, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এবং দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের শিশুরা সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে থাকে। ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন মূল প্রশ্ন “কতজন বিদ্যালয়ে গেল” নয়; “কে কী শিখল, কতটা শিখল এবং সেই শেখা জীবনে ব্যবহার করতে পারল কি না”—এটাই আসল প্রশ্ন।
গুণগত শিক্ষার একক, চিরস্থায়ী সংজ্ঞা নেই। কারণ শিক্ষা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত বিকাশ, সামাজিকীকরণ, নাগরিকতা, কর্মদক্ষতা, সংস্কৃতি, মানবাধিকার এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবু বিভিন্ন তাত্ত্বিক ধারা ও আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্যে একটি মৌলিক ঐকমত্য আছে: গুণগত শিক্ষা এমন শিক্ষা, যা প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশে অর্থবহ জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সামর্থ্য অর্জনের সুযোগ দেয়।
মানব-পুঁজি তত্ত্ব শিক্ষাকে উৎপাদনশীলতা, আয় ও জাতীয় উন্নয়নের বিনিয়োগ হিসেবে দেখে। সক্ষমতা-ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রশ্ন তোলে—শিক্ষা একজন মানুষকে বাস্তবে কী করতে ও কী হতে সক্ষম করছে? অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মানসম্মত শিক্ষা রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়, শিশুর অধিকার। সমালোচনামূলক শিক্ষাতত্ত্ব আবার সতর্ক করে, শিক্ষা যদি কেবল তথ্য জমা রাখার পাত্র বানায়, তবে তা মুক্তির পরিবর্তে আনুগত্য তৈরি করতে পারে। নির্মাণবাদী ধারণায় শিক্ষার্থী নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা নয়; অভিজ্ঞতা, অনুসন্ধান ও সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে সে অর্থ নির্মাণ করে।
এই ধারাগুলো একত্র করলে গুণগত শিক্ষার পাঁচটি স্তম্ভ দৃশ্যমান হয়: প্রাসঙ্গিক পাঠ্যক্রম, দক্ষ শিক্ষক, সক্রিয় শিক্ষণ, ন্যায়সংগত মূল্যায়ন এবং সহায়ক শাসনব্যবস্থা। এর ফলও বহুমাত্রিক—পঠন ও গণনাদক্ষতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রশ্ন করার সাহস, সহযোগিতা, নৈতিক বিচার, বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান, ডিজিটাল বিচক্ষণতা এবং জীবনের অনিশ্চয়তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও জরুরি। পরীক্ষায় শতভাগ নম্বর পেয়েও যদি একজন শিক্ষার্থী ভিন্নমত সহ্য করতে না পারে, সমস্যার নতুন সমাধান খুঁজতে না পারে বা মিথ্যা তথ্য শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই শিক্ষাকে পূর্ণাঙ্গ গুণগত শিক্ষা বলা যায় না।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের চতুর্থ লক্ষ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সংগত গুণগত শিক্ষা এবং সবার জন্য আজীবন শেখার সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলে। এই ভাষ্যের গুরুত্ব হলো, এখানে “গুণমান”কে কেবল গড় পরীক্ষার ফল দিয়ে বিচার করা হয়নি; সুযোগ, সমতা, শেখার ফল, নিরাপত্তা, শিক্ষক, অবকাঠামো ও অর্থায়নকে একই কাঠামোর অংশ ধরা হয়েছে। একটি শিক্ষাব্যবস্থা তখনই মানসম্মত, যখন সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত শিশুর পাশাপাশি দরিদ্র, প্রতিবন্ধী, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর, চরাঞ্চল বা দুর্গম পাহাড়ের শিশুও কার্যকরভাবে শিখতে পারে।
মান নির্ধারণের প্রথম সূচক হলো ভিত্তিমূলক সাক্ষরতা ও গণনাদক্ষতা। দ্বিতীয়টি উচ্চতর চিন্তন—শিক্ষার্থী ব্যাখ্যা, প্রয়োগ, বিশ্লেষণ, বিচার ও সৃজন করতে পারছে কি না। তৃতীয়টি সমতা—পরিবারের আয়, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা, ভাষা বা ভৌগোলিক অবস্থান শেখার ভাগ্য নির্ধারণ করছে কি না। চতুর্থটি সুস্থতা ও নিরাপত্তা—বিদ্যালয় কি ভয়, অপমান, সহিংসতা ও বৈষম্য থেকে মুক্ত? পঞ্চমটি শিক্ষকতার মান—শিক্ষক বিষয়বস্তু জানেন কি না, শেখানোর কৌশল বোঝেন কি না এবং শিক্ষার্থীর অগ্রগতি অনুযায়ী পাঠ পরিবর্তন করতে পারেন কি না। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিদ্যালয় নেতৃত্ব, পর্যাপ্ত শেখার সময়, গ্রন্থাগার, আলো-বাতাস, পানি ও পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, সহায়ক প্রযুক্তি এবং পরিবার-বিদ্যালয় সম্পর্ক।
অতএব মানদণ্ড কোনো দেয়ালে ঝোলানো তালিকা নয়; এটি শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার পরিমাপ। উন্নত ভবন কিন্তু অনুপস্থিত শিক্ষক, বিতরণ করা ট্যাবলেট কিন্তু দুর্বল পাঠবোধ, কিংবা শতভাগ পাস কিন্তু অপ্রতুল দক্ষতা—এসবই মানের বিভ্রম। গুণগত শিক্ষা জানতে হলে সরবরাহের হিসাবের পাশাপাশি শেখার প্রমাণ দেখতে হবে।
পাঠ্যবই নিজে প্রতারক নয়; প্রতারণা ঘটে তখন, যখন রাষ্ট্র বই বিতরণকে শিক্ষা নিশ্চিত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে, অথচ বইয়ের বিষয়বস্তু, বয়সোপযোগিতা, তথ্যগত নির্ভুলতা, ভাষা, ব্যবহারযোগ্যতা এবং শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগ যথেষ্টভাবে নিশ্চিত করে না। বই শিশুর হাতে পৌঁছানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বই পৌঁছানো একটি উপকরণ সরবরাহ; শেখা তার সম্ভাব্য ফল। এই দুইয়ের মাঝখানে শিক্ষক, সময়, বোঝাপড়া, অনুশীলন, প্রতিক্রিয়া, পারিবারিক পরিবেশ এবং মূল্যায়নের দীর্ঘ সেতু রয়েছে।
পাঠ্যবইকেন্দ্রিক প্রতারণার প্রথম রূপ হলো বিষয় শেষ করাকে শেখা শেষ বলে ধরে নেওয়া। দ্বিতীয়টি হলো পাঠ্যক্রমে সৃজনশীলতা ও দক্ষতার কথা লিখে পরীক্ষায় মুখস্থ উত্তর চাওয়া। তৃতীয়টি হলো জাতীয় জীবনের বৈচিত্র্যকে পাতায় স্বীকার করেও শ্রেণিকক্ষে প্রতিবন্ধী শিশু, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার্থী বা দরিদ্র পরিবারের শিশুর প্রয়োজন উপেক্ষা করা। চতুর্থটি হলো ভুল, অস্পষ্ট বা বিতর্কিত তথ্যের যথাসময়ে সংশোধন না করা। পঞ্চমটি হলো শিক্ষকের প্রস্তুতি ছাড়াই নতুন বই বা পদ্ধতি চালু করে ব্যর্থতার দায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর ওপর চাপানো।
এখানে সতর্ক ভারসাম্য প্রয়োজন। পাঠ্যবইয়ে বিচ্ছিন্ন ভুল থাকলেই পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রতারণা বলা অতিরঞ্জন হবে। আবার ভুলকে “সামান্য মুদ্রণপ্রমাদ” বলে এড়িয়ে যাওয়াও দায়িত্বহীনতা। পাঠ্যবই রাষ্ট্রীয় জ্ঞানের দলিল; শিশুর কাছে এর বাক্য প্রায় সত্যের মর্যাদা পায়। তাই রচনা, পর্যালোচনা, পরীক্ষামূলক ব্যবহার, প্রকাশ, সংশোধন এবং জনসমক্ষে ভুল স্বীকারের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা প্রয়োজন। বইকে পবিত্র ও অপরিবর্তনীয় বস্তু না বানিয়ে প্রমাণ, প্রতিক্রিয়া ও সময়ের সঙ্গে সংশোধনযোগ্য শিক্ষাসম্পদ হিসেবে দেখতে হবে।
শ্রেণিকক্ষ বাইরে থেকে চার দেয়াল, কয়েকটি বেঞ্চ এবং একটি বোর্ডের সমষ্টি। ভেতরে এটি যেন একই সময়ে চলা বহু স্রোতের নদী। শিক্ষার্থীদের ভাষা, অভিজ্ঞতা, ক্ষমতা, আগ্রহ, ভয়, পারিবারিক অবস্থা ও শেখার গতি আলাদা। শিক্ষককে একই সঙ্গে পাঠ বোঝাতে, মনোযোগ ধরে রাখতে, আচরণ সামলাতে, প্রশ্নের উত্তর দিতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং কারা পিছিয়ে পড়ছে তা শনাক্ত করতে হয়। সংযুক্ত শিক্ষণ-উপকরণে শ্রেণিকক্ষের এই দাবিগুলোকে বহুমাত্রিকতা, সমকালীনতা, তাৎক্ষণিকতা, অনিশ্চয়তা, প্রকাশ্যতা ও ইতিহাসের প্রভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশের বড় শ্রেণি, সীমিত উপকরণ এবং পরীক্ষার চাপ এ জটিলতাকে আরও বাড়ায়।
পুরোনো ধারণায় শিক্ষক জ্ঞানের মালিক, শিক্ষার্থী নীরব শ্রোতা। আধুনিক গুণগত শিক্ষায় শিক্ষক জ্ঞানের একমাত্র উৎস নন; তিনি শেখার নকশাকার, পর্যবেক্ষক, সহায়ক, মূল্যায়নকারী এবং নৈতিক আদর্শ। তাঁকে বিষয়জ্ঞান জানার পাশাপাশি জানতে হয় শিশুর বিকাশ, ভাষা, অন্তর্ভুক্তি, শ্রেণি-ব্যবস্থাপনা, মূল্যায়ন এবং প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার। “নিয়ন্ত্রণ” এবং “স্বাধীনতা”—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যও জরুরি। লাগামহীন শ্রেণিকক্ষ শেখাকে ব্যাহত করতে পারে; আবার ভয়ভিত্তিক কর্তৃত্ব কৌতূহলকে হত্যা করে।
আচরণগত সমস্যায় শাস্তি, অপমান বা বহিষ্কার তাৎক্ষণিক নীরবতা আনতে পারে, কিন্তু সমস্যার কারণ দূর করে না। অনেক ক্ষেত্রে অমনোযোগের পেছনে থাকতে পারে না-বোঝা পাঠ, ক্ষুধা, প্রতিবন্ধিতা, পারিবারিক সংকট, ভাষাগত বাধা কিংবা বারবার ব্যর্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা। দক্ষ শিক্ষক আচরণকে শুধু অপরাধ হিসেবে দেখেন না; সেটিকে প্রয়োজন, সম্পর্ক ও পরিবেশের সংকেত হিসেবেও পড়েন।
শিক্ষায় নতুন নতুন পদ্ধতির নাম দ্রুত জনপ্রিয় হয়। কিন্তু কোনো পদ্ধতি আধুনিক শোনালেই তা কার্যকর হয়ে যায় না। প্রমাণভিত্তিক শিক্ষণ বলতে এমন কৌশল বোঝায়, যার উদ্দেশ্য স্পষ্ট, প্রয়োগের ধাপ নির্ধারিত এবং নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ফল তৈরির বিশ্বাসযোগ্য গবেষণা-প্রমাণ আছে। প্রমাণের মান যাচাইয়ে গবেষণার নকশা, শিক্ষার্থীর বৈশিষ্ট্য, ফলের মাত্রা, পুনরাবৃত্ত গবেষণা, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, বাস্তব শ্রেণিকক্ষে কার্যকারিতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং ব্যয়—সবই বিবেচ্য।
সংযুক্ত নথিতে সহযোগিতামূলক দলীয় শিক্ষা, সহপাঠী-সহায়তা, পুনরালোচনা ও অনুশীলন, গঠনমূলক মূল্যায়ন, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, চিন্তার কৌশল শেখানো, স্বনিয়ন্ত্রিত শিক্ষা, পারস্পরিক পাঠদান, ইতিবাচক আচরণ-সহায়তা, সামাজিক দক্ষতা, সক্রিয় শেখার সময়, অভিযোজিত পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, সহশিক্ষণ এবং অভিভাবক-অংশগ্রহণের মতো কৌশল তুলে ধরা হয়েছে। এগুলোর কেন্দ্রীয় কথা একটিই: শিক্ষক শুধু “কী শেখাবেন” তা নয়, “কে কতটা শিখল এবং এরপর কী পরিবর্তন করতে হবে”—সেটিও জানবেন।
পাঁচ ধাপের অনুসন্ধানমূলক পাঠ—আগ্রহ সৃষ্টি, অনুসন্ধান, ব্যাখ্যা, বিস্তার ও মূল্যায়ন—বিজ্ঞানসহ বহু বিষয়ে কার্যকর হতে পারে। তবে এটি কোনো যান্ত্রিক মন্ত্র নয়। একই শ্রেণির সব শিক্ষার্থীর জন্য একই গতি বা সহায়তা কার্যকর নাও হতে পারে। শিক্ষককে পাঠের তথ্য, শিক্ষার্থীর কাজ, প্রশ্নের উত্তর ও ভুলের ধরন দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রমাণভিত্তিক শিক্ষা মানে শিক্ষককে গবেষণাপত্রের দাস বানানো নয়; গবেষণা, পেশাগত বিচার এবং স্থানীয় বাস্তবতার সংলাপ ঘটানো।
বাংলাদেশে শিক্ষক উন্নয়ন প্রায়ই স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, নির্দেশিকা ও উপস্থিতির সনদে সীমাবদ্ধ থাকে। কয়েক দিনের প্রশিক্ষণে নতুন পরিভাষা শেখা যায়, কিন্তু শ্রেণিকক্ষের চর্চা স্থায়ীভাবে বদলাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা, অনুশীলন, পর্যবেক্ষণ, সহকর্মীর প্রতিক্রিয়া এবং সমস্যা সমাধানের সুযোগ। প্রশিক্ষণ শেষে শিক্ষক যখন অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, পরীক্ষার চাপ, উপকরণের ঘাটতি ও প্রশাসনিক কাজের ভিড়ে ফেরেন, তখন শেখা কৌশল দ্রুত পুরোনো অভ্যাসের নিচে চাপা পড়ে।
শিক্ষক সক্ষমায়নের প্রথম ধাপ হওয়া উচিত শক্তিশালী প্রাক্-চাকরি শিক্ষা। বিষয়জ্ঞান, শিশুবিকাশ, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, মূল্যায়ন, পাঠ-পরিকল্পনা এবং বাস্তব বিদ্যালয়ে তত্ত্বাবধানে অনুশীলন ছাড়া কাউকে শ্রেণিকক্ষের পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়। দ্বিতীয় ধাপ ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন—বিদ্যালয়ভিত্তিক পাঠ-পর্যবেক্ষণ, সহকর্মী আলোচনা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকচক্র, পরামর্শক সহায়তা এবং শ্রেণিকক্ষের ছোট গবেষণা। তৃতীয় ধাপ উপকরণ ও সময়। একজন শিক্ষককে যদি প্রতিদিন অতিরিক্ত ক্লাস, দাপ্তরিক প্রতিবেদন এবং বহির্ভূত দায়িত্বে ডুবিয়ে রাখা হয়, তবে উন্নত পাঠ প্রস্তুতের আহ্বান অর্থহীন।
জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের নিয়মিত পেশাগত আলোচনা, মূল্যায়ন সম্পর্কে শিক্ষকের আত্মবিশ্বাস, শিক্ষক-প্রেরণা এবং পেশাগত সন্তুষ্টির সঙ্গে ভালো শেখার ফলের ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এই ফল কারণ-সম্পর্কের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, তবে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশ দেয়। শিক্ষককে দায়ী করার আগে তাঁকে সক্ষমতা, সম্মান, উপকরণ, পেশাগত স্বাধীনতা এবং শেখার মতো কর্মপরিবেশ দিতে হবে। জবাবদিহি প্রয়োজন, কিন্তু সহায়তাহীন জবাবদিহি শাস্তির আরেক নাম।
বাংলাদেশের একটি জাতীয় পাঠ্যবই হয়তো একই দিনে ঢাকা, সুনামগঞ্জের হাওর, কুড়িগ্রামের চর, পার্বত্য চট্টগ্রাম, উপকূলীয় দ্বীপ এবং নগরের বস্তিতে পৌঁছায়। কিন্তু বইটি যে শিশুর হাতে যায়, তাদের জীবন এক নয়। কারও ঘরে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট আছে, কারও পড়ার টেবিলও নেই। কারও প্রথম ভাষা বাংলা, অন্য কেউ বিদ্যালয়ে এসে নতুন ভাষার মুখোমুখি হয়। কেউ চোখে দেখে শেখে, কেউ ব্রেইল, শব্দ, স্পর্শ বা সহায়ক প্রযুক্তির প্রয়োজন অনুভব করে। সমান বই দেওয়া ন্যায়সংগত সূচনা হতে পারে; সমান ফলের জন্য ভিন্ন সহায়তা দিতে হয়।
সংস্কৃতিসংবেদী শিক্ষক শিক্ষার্থীর পরিবার, ভাষা ও অভিজ্ঞতাকে ঘাটতি হিসেবে দেখেন না; শেখার সম্পদে রূপ দেন। স্থানীয় নদী, বাজার, কৃষি, কারুশিল্প বা জনজীবনের উদাহরণ দিয়ে বিমূর্ত ধারণা ব্যাখ্যা করলে পাঠ পরিচিত জমিতে শিকড় গাঁথে। তবে স্থানীয়তার নামে শিশুকে কেবল পরিচিত জগতের মধ্যে আটকে রাখা যাবে না। ভালো শিক্ষা পরিচিত অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে তাকে বৃহত্তর বিশ্বে নিয়ে যায়—যেমন একটি সেতু দুই তীরকে যুক্ত করে।
অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও কেবল বিদ্যালয়ে ভর্তি যথেষ্ট নয়। প্রতিবন্ধী শিশুকে পেছনের বেঞ্চে বসিয়ে, উপযোগী পাঠ্যসামগ্রী বা মূল্যায়ন না দিয়ে উপস্থিতির খাতায় নাম রাখা অন্তর্ভুক্তি নয়। অভিযোজিত পাঠ্যক্রম, গ্রহণযোগ্য সুবিধা, সহজগম্য অবকাঠামো, বিকল্প যোগাযোগ, সহায়ক প্রযুক্তি এবং সহপাঠীদের ইতিবাচক অংশগ্রহণ প্রয়োজন। গুণগত শিক্ষা তখনই বাস্তব, যখন দুর্বল বলে চিহ্নিত শিশুর সম্ভাবনা আগেভাগে বন্ধ না করে তার শেখার পথটি নতুনভাবে নির্মাণ করা হয়।
পরীক্ষা শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী বার্তা দেয়—কোন জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ, কীভাবে পড়তে হবে এবং কোন ধরনের চিন্তা পুরস্কৃত হবে। পাঠ্যক্রমে যদি বিশ্লেষণ, সহযোগিতা ও সৃজনশীলতার কথা থাকে, কিন্তু পরীক্ষায় মুখস্থ সংজ্ঞা ও পূর্বনির্ধারিত বাক্য চাওয়া হয়, তবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী যৌক্তিকভাবেই পরীক্ষার দিকে ঝুঁকবে। ফলে পাঠ্যক্রম একদিকে হাঁটে, মূল্যায়ন অন্যদিকে; মাঝখানে শিশুর শিক্ষা ছিঁড়ে যায়।
গুণগত মূল্যায়নের কাজ কেবল কে পাস বা ফেল করেছে তা বলা নয়; শিক্ষার্থী কোথায় আছে, কোথায় যেতে হবে এবং সেখানে পৌঁছাতে কী সহায়তা প্রয়োজন—তা জানানো। এজন্য শ্রেণিকক্ষে ছোট প্রশ্ন, পর্যবেক্ষণ, কাজের নমুনা, আলোচনা, ব্যবহারিক কাজ, প্রকল্প, পাঠ-অনুধাবন, স্বমূল্যায়ন ও সহপাঠী প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন। গঠনমূলক মূল্যায়নের তথ্য শিক্ষককে পাঠের গতি ও কৌশল পরিবর্তনে সাহায্য করে। সময়োচিত, নির্দিষ্ট এবং ব্যবহারযোগ্য প্রতিক্রিয়া নম্বরের চেয়ে বেশি শিক্ষণক্ষম হতে পারে।
তবে ধারাবাহিক মূল্যায়নও ঝুঁকিমুক্ত নয়। বড় শ্রেণি, অস্পষ্ট মানদণ্ড এবং শিক্ষককে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না দিলে এটি নথিপত্রের বোঝা বা ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তে পরিণত হতে পারে। তাই স্পষ্ট মূল্যায়ন-মানদণ্ড, নমুনা কাজ, পরিমিত কাজের চাপ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক মান যাচাই প্রয়োজন। জাতীয় মূল্যায়নের তথ্যও কেবল প্রতিবেদন প্রকাশে আটকে থাকলে লাভ নেই। জেলা, বিদ্যালয়ের ধরন, বিষয় ও শিক্ষার্থীগোষ্ঠী অনুযায়ী ঘাটতি শনাক্ত করে অর্থ, শিক্ষক এবং পুনরুদ্ধার কর্মসূচি বণ্টনে তা ব্যবহার করতে হবে। মান মাপার উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীকে লেবেল দেওয়া নয়; ব্যবস্থাকে সংশোধন করা।
সিঙ্গাপুর, এস্তোনিয়া বা ভিয়েতনামের শিক্ষা-সাফল্যকে প্রায়ই কয়েকটি কৌশলের সহজ তালিকায় নামিয়ে আনা হয়। বাস্তবে প্রতিটি দেশের ইতিহাস, জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা আলাদা। তাই তাদের নীতি হুবহু নকল করা বিপজ্জনক। তবে কিছু সাধারণ শিক্ষা নেওয়া যায়—শিক্ষকের মানে বিনিয়োগ, পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়নের সামঞ্জস্য, ভিত্তিমূলক শিক্ষায় গুরুত্ব, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত, বিদ্যালয় নেতৃত্ব এবং সমতার প্রতি ধারাবাহিক মনোযোগ।
ওইসিডির পিসা ২০২২ মূল্যায়নে সিঙ্গাপুর গণিতে শীর্ষে ছিল। দেশটির ৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, অধিকাংশ গণিত ক্লাসে শিক্ষক প্রত্যেকের শেখার প্রতি আগ্রহ দেখান; ৮৬ শতাংশ বলেছে, প্রয়োজন হলে শিক্ষক অতিরিক্ত সহায়তা দেন। অর্থাৎ ফলের পেছনে কেবল কঠোর পরীক্ষা নয়, শিক্ষকের মনোযোগও রয়েছে। এস্তোনিয়ায় গণিতে ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অন্তত ন্যূনতম দক্ষতার স্তরে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে এস্তোনিয়ার দেশ-নোট জানায়, ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী এমন বিদ্যালয়ে পড়ে, যেখানে শেখার উপকরণ নির্বাচনে শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব আছে। এখানে পেশাগত স্বাধীনতা ও জবাবদিহি পাশাপাশি চলে।
ভিয়েতনাম তুলনামূলক সীমিত সম্পদ নিয়েও ভিত্তিমূলক শিক্ষা, ন্যূনতম বিদ্যালয়মান, শেখার সময় এবং শিক্ষক সহায়তায় ধারাবাহিক মনোযোগ দিয়ে উল্লেখযোগ্য ফল দেখিয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষা হলো—আকর্ষণীয় একটি প্রকল্প নয়, দীর্ঘস্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সামঞ্জস্য ফল দেয়। শিক্ষক নিয়োগ এক নীতিতে, প্রশিক্ষণ আরেক নীতিতে, পাঠ্যবই তৃতীয় পথে এবং পরীক্ষা চতুর্থ পথে চললে কোনো আন্তর্জাতিক মডেল উদ্ধার করতে পারবে না।
গুণগত শিক্ষার আলোচনা প্রায়ই শ্রেণিকক্ষে শুরু হয়ে শিক্ষককে দায়ী করেই শেষ হয়। অথচ শিক্ষক কোন বই পড়াবেন, কত সময়ে শেষ করবেন, কীভাবে পরীক্ষা হবে, কতজন শিক্ষার্থী থাকবে, কী উপকরণ পাওয়া যাবে এবং বদলি বা পদোন্নতি কীভাবে হবে—এসবের বড় অংশ নির্ধারিত হয় শ্রেণিকক্ষের বাইরে। তাই শিক্ষা-শাসন মানের অদৃশ্য স্থপতি। নীতি, অর্থ, প্রতিষ্ঠান, তথ্য, জনবল ও জবাবদিহির সমন্বয় ব্যর্থ হলে দক্ষ শিক্ষকও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েন।
বাংলাদেশে দায়িত্ব বহু সংস্থা ও স্তরে বিভক্ত। এই বিভাজন প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু দায়িত্ব অস্পষ্ট হলে ব্যর্থতার মালিক খুঁজে পাওয়া যায় না। পাঠ্যবইয়ে ভুল হলে লেখক, পর্যালোচক, কর্তৃপক্ষ ও মুদ্রণপ্রক্রিয়ার মধ্যে দায় ঘোরে; শেখার ফল খারাপ হলে পরিবার, শিক্ষক, কোচিং বা প্রযুক্তিকে আলাদাভাবে দোষ দেওয়া হয়। অথচ মান নিশ্চিত করতে প্রয়োজন প্রকাশ্য দায়িত্ব-মানচিত্র—কোন সিদ্ধান্ত কে নেবে, কোন সূচকে ফল মাপা হবে এবং ব্যর্থ হলে কী সংশোধন হবে।
সুশাসনের অর্থ অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ নয়। কেন্দ্রীয়ভাবে ন্যূনতম মান, অর্থায়ন, শিক্ষকযোগ্যতা, অধিকার ও জাতীয় ফল নির্ধারিত হতে পারে; বিদ্যালয়কে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠ-সহায়তা ও উপকরণ ব্যবহারে যুক্তিসংগত স্বাধীনতা দিতে হবে। স্বাধীনতার সঙ্গে থাকবে স্বচ্ছ ফল, সামাজিক নিরীক্ষা, বিদ্যালয় উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বৈষম্যবিরোধী সুরক্ষা। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আনুগত্য যদি নেতৃত্ব নির্বাচনের মানদণ্ড হয়, তবে বিদ্যালয়ের পেশাগত সংস্কৃতি দুর্বল হয়। শিক্ষা-প্রশাসনের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—“শিশুর শেখা কীভাবে বাড়বে?”—“কাগজপত্র ঠিক আছে কি?” শুধু সেটি নয়।
গুণগত শিক্ষা ব্যয়সাপেক্ষ, কিন্তু অদক্ষ ব্যয়ও গুণমান নিশ্চিত করে না। পর্যাপ্ত অর্থ এবং অর্থের সুবিবেচিত ব্যবহার—দুটিই প্রয়োজন। শিক্ষকসংখ্যা, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, পরিচ্ছন্ন পানি, শৌচাগার, প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো, শেখার উপকরণ, বিদ্যালয় রক্ষণাবেক্ষণ এবং মূল্যায়নব্যবস্থায় স্থায়ী বিনিয়োগ ছাড়া মানসম্মত শিক্ষার দাবি খালি কলসের শব্দ। আবার কেবল ভবন নির্মাণ বা যন্ত্র কেনায় অর্থ ব্যয় করে শিক্ষক সহায়তা ও শেখার ফল উপেক্ষা করলে বিনিয়োগের শিক্ষাগত মূল্য কমে যায়।
জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নে গ্রন্থাগার ব্যবহার, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, নিরাপদ পানি এবং কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষাসামগ্রী ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে ভালো ফলের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এসব সুবিধাকে “অতিরিক্ত” ভাবার সুযোগ নেই। ক্ষুধার্ত, অসুস্থ, আতঙ্কিত বা অতিরিক্ত গরমে ক্লান্ত শিশু জটিল ধারণা আয়ত্ত করতে পারে না। মানসিক ও শারীরিক পরিবেশ শিক্ষার পূর্বশর্ত।
জলবায়ু পরিবর্তন নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ইউনিসেফ জানিয়েছে, ২০২৪ সালে তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশুর বিদ্যালয়জীবন ব্যাহত হয়েছে। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষা-পরিকল্পনায় তাপসহনীয় ভবন, পানি, নমনীয় শিক্ষাপঞ্জি, দুর্যোগকালীন বিকল্প পাঠব্যবস্থা এবং শেখা পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা থাকতে হবে। একই বরাদ্দে সব বিদ্যালয়কে সমান অর্থ দেওয়া সব সময় ন্যায়সংগত নয়; দুর্গম, দরিদ্র ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার জন্য প্রয়োজনভিত্তিক অতিরিক্ত অর্থায়নই প্রকৃত সমতা।
ডিজিটাল প্রযুক্তি পাঠ্যসামগ্রী বিস্তার, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর সহায়তা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, দ্রুত মূল্যায়ন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক অনুশীলনে বড় সুযোগ তৈরি করেছে। শব্দে রূপান্তর, পর্দা-পাঠক, স্বয়ংক্রিয় উপশিরোনাম, ডিজিটাল ব্রেইল, শিক্ষামূলক অনুকরণ এবং বহুভাষিক সম্পদ অনেক শিক্ষার্থীর জন্য শেখার দরজা খুলতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষককে প্রশ্ন তৈরি, পাঠের ভিন্ন সংস্করণ প্রস্তুত, শিক্ষার্থীর সাধারণ ভুল শনাক্ত বা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
কিন্তু প্রযুক্তি কোনো নিরপেক্ষ জাদুদণ্ড নয়। যন্ত্র আছে কিন্তু বিদ্যুৎ নেই, সংযোগ আছে কিন্তু মানসম্পন্ন বাংলা উপকরণ নেই, সফটওয়্যার আছে কিন্তু শিক্ষক প্রশিক্ষণ নেই—এমন ডিজিটালায়ন নতুন সাজে পুরোনো বৈষম্য তৈরি করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্যও দিতে পারে; ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, নকল এবং চিন্তার ওপর অতিনির্ভরতার ঝুঁকিও আছে। শিশুকে যদি উত্তর তৈরির যন্ত্র দেওয়া হয় কিন্তু উত্তর যাচাইয়ের জ্ঞান না দেওয়া হয়, তবে প্রযুক্তি শেখাকে গভীর না করে আরও অগভীর করতে পারে।
তাই প্রযুক্তির মানদণ্ড হওয়া উচিত শিক্ষাগত প্রয়োজন। প্রথমে সমস্যাটি নির্ধারণ করতে হবে—শিশু কোথায় আটকে আছে, শিক্ষক কী সহায়তা চান—তারপর প্রযুক্তি নির্বাচন। তথ্য সুরক্ষা, বয়সোপযোগিতা, বাংলা ভাষার মান, প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীর প্রবেশগম্যতা এবং স্বাধীন মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি শিক্ষকের বিচারকে সমৃদ্ধ করবে; তাকে অ্যালগরিদমের নির্দেশ পালনকারী কর্মীতে পরিণত করবে না।
বাংলাদেশে গুণগত শিক্ষা বাস্তব করতে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের বদলে একটি ধারাবাহিক সামাজিক চুক্তি প্রয়োজন। প্রথমে জাতীয়ভাবে স্পষ্ট করতে হবে—প্রতিটি শ্রেণির শেষে শিক্ষার্থী কী জানবে, কী করতে পারবে এবং কোন মূল্যবোধ চর্চা করবে। এই প্রত্যাশা পাঠ্যক্রম, বই, শিক্ষকশিক্ষা ও পরীক্ষায় একইভাবে প্রতিফলিত হতে হবে। প্রতি দুই বা তিন বছরে নির্ভরযোগ্য জাতীয় শেখা মূল্যায়ন করে ফল জনসমক্ষে প্রকাশ এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চল ও গোষ্ঠীর জন্য সময়বদ্ধ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগে বিষয়জ্ঞান ও শিক্ষণক্ষমতা উভয়ই যাচাই, মানসম্মত প্রাক্-চাকরি শিক্ষা, এক বছরের সহায়ক প্রবেশকাল এবং ধারাবাহিক বিদ্যালয়ভিত্তিক পেশাগত উন্নয়ন চালু করা জরুরি। প্রশিক্ষণের সাফল্য অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দিয়ে নয়, শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তন ও শিক্ষার্থীর অগ্রগতি দিয়ে বিচার করতে হবে। প্রধান শিক্ষককে কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা নয়, শিক্ষণ-নেতা হিসেবে প্রস্তুত করতে হবে।
তৃতীয়ত, পাঠ্যবইয়ের জন্য স্বাধীন সম্পাদকীয় ও বিষয়ভিত্তিক পর্যালোচনা, ভাষা ও অন্তর্ভুক্তি নিরীক্ষা, নির্বাচিত বিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলক ব্যবহার এবং দ্রুত প্রকাশ্য সংশোধনব্যবস্থা প্রয়োজন। লেখক ও পর্যালোচক নির্বাচন, স্বার্থের সংঘাত এবং সংশোধনের ইতিহাস যতটা সম্ভব উন্মুক্ত থাকা উচিত। চতুর্থত, মূল্যায়নে মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে অনুধাবন, প্রয়োগ, সমস্যা সমাধান ও যোগাযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে; একই সঙ্গে শিক্ষকের কাজের চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
পঞ্চমত, শিক্ষা অর্থায়নে ন্যূনতম প্রয়োজন ও বৈষম্য—দুই বিবেচনায় বরাদ্দ দিতে হবে। প্রতিবন্ধী, ভাষাগত সংখ্যালঘু, দরিদ্র এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য বাড়তি সহায়তা দিতে হবে। শেষত, পাঁচ থেকে দশ বছরের সংস্কারসূচিকে সরকার পরিবর্তন বা প্রশাসনিক রদবদলের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। শিক্ষা গাছের মতো—প্রতিদিন শিকড় তুলে অগ্রগতি মাপলে কোনো দিন ফল পাওয়া যায় না।
গুণগত শিক্ষা কোনো কাল্পনিক স্বর্গ নয়। বহু দেশ দেখিয়েছে, শিক্ষককে শক্তিশালী করা, ভিত্তিমূলক শেখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, সমতা রক্ষা, নির্ভরযোগ্য তথ্য ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে এটি অর্জন করা সম্ভব। তবে এটি এমন বাস্তবতাও নয়, যা নতুন বই, নতুন শিক্ষাক্রম, ডিজিটাল যন্ত্র বা ভালো পাসের হার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে জন্ম নেয়। গুণমান একটি অবিরাম প্রক্রিয়া—শোনা, শেখা, মাপা, ভুল স্বীকার এবং সংশোধনের সংস্কৃতি।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিপদ সম্পদের সীমাবদ্ধতা একা নয়; প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধানকে স্বাভাবিক মেনে নেওয়া। পাঠ্যবইয়ে অনুসন্ধানের কথা লিখে প্রশ্নকে নিরুৎসাহিত করা, অন্তর্ভুক্তির ছবি ছেপে প্রতিবন্ধী শিশুকে বাদ দেওয়া, দক্ষতার কথা বলে মুখস্থ উত্তর পুরস্কৃত করা এবং শিক্ষককে পরিবর্তনের দূত ঘোষণা করে সিদ্ধান্তের বাইরে রাখা—এসবই শিক্ষাগত অসততার রূপ। এই অসততা ভাঙতে হলে রাষ্ট্রকে শিশুর কাছে একটি পরিমাপযোগ্য প্রতিশ্রুতি দিতে হবে: তুমি যেখানেই জন্ম নাও, তোমার বিদ্যালয় তোমাকে পড়তে, বুঝতে, গণনা করতে, প্রশ্ন করতে, সহমর্মী হতে এবং মর্যাদার সঙ্গে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে শেখাবে।
শেষ বিচারে গুণগত শিক্ষা কোনো বইয়ের অধ্যায় নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্রের পরীক্ষা। আমরা যদি উপস্থিতিকে শেখা, সনদকে সক্ষমতা এবং প্রচারকে অগ্রগতি বলে চালিয়ে দিই, তবে তা মরুভূমিতে আঁকা নদীর মতোই থাকবে। আর যদি শিশুর বাস্তব শেখাকে নীতির কেন্দ্র করি, শিক্ষককে বিশ্বাস ও সক্ষমতা দিই এবং শাসনব্যবস্থাকে জবাবদিহির আয়নায় দাঁড় করাই, তবে সেই নদীতে সত্যিই পানি বইতে পারে।
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#গুণগত_শিক্ষা #শিক্ষাসংস্কার #পাঠ্যবই #শিক্ষকের_ক্ষমতায়ন #শিক্ষায়_সুশাসন #QualityEducation #EducationReform #TeacherEmpowerment #TextbookQuality #SDG4