08/29/2026 একই দেশের দুই শিক্ষা | বিশেষ গবেষণাভিত্তিক কভার স্টোরি
Dr Mahbub
২৯ August ২০২৬ ২১:৪৪
একই জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে জন্মস্থান, পরিবারের আয়, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা, শিক্ষক ও অবকাঠামো, ডিজিটাল সুযোগ এবং সামাজিক পুঁজির পার্থক্য কীভাবে শিক্ষার্থীর শেখা, টিকে থাকা ও ভবিষ্যৎ সুযোগ নির্ধারণ করছে—তার তাত্ত্বিক, পরিসংখ্যানভিত্তিক ও নীতিগত ব্যবচ্ছেদ।
|
উচ্চমাধ্যমিক উপস্থিতি
|
Poorest–Richest parity
|
Rural–Urban parity
|
নিম্নমাধ্যমিক Girls–Boys
|
|---|---|---|---|
|
৫০.৮%
|
০.৪৯
|
০.৯১
|
১.৩৬
|
অধিকারপত্রের আজকের ফিচারটি নিচে একটি গবেষণাভিত্তিক দীর্ঘ ফিচার, যাতে শহর–গ্রাম ও নারী–পুরুষের বৈষম্যকে শুধু ভর্তি বা পরীক্ষার ফলের প্রশ্ন হিসেবে নয়, বরং শিক্ষার মান, পারিবারিক অর্থনীতি, ডিজিটাল বিভাজন, শিক্ষক ও অবকাঠামো, সামাজিক প্রত্যাশা, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ এবং ভবিষ্যৎ সুযোগের অসম বণ্টন—এই বৃহত্তর কাঠামোয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তথ্যগত ভিত্তি হিসেবে BANBEIS-এর Bangladesh Education Statistics 2024, BBS–UNICEF-এর MICS 2025, UNICEF-এর শিক্ষা ও multidimensional poverty-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের গবেষণাভিত্তিক এই বিশেষ ফিচারে রয়েছে: শহর–গ্রাম × ছেলে–মেয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ, ধনী–দরিদ্র ও আঞ্চলিক বৈষম্য, প্রতিবন্ধিতা ও intersectionality, ডিজিটাল বিভাজন, শিক্ষক ও অবকাঠামোগত বৈষম্য, SDG 4 ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ, শিক্ষা অর্থায়ন এবং ১৫ দফা নীতি-সংস্কার রোডম্যাপ। এখানে ব্যবহৃত মূল MICS পরিসংখ্যানের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো wealth inequality: উচ্চমাধ্যমিকে poorest-to-richest attendance parity মাত্র 0.49, যেখানে rural-to-urban parity 0.91। একই সঙ্গে gender parity মেয়েদের পক্ষে—lower secondary-তে girls-to-boys index 1.36। ফলে নীতিগতভাবে “গ্রামের মেয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে”—এমন পূর্বনির্ধারিত ধারণার বদলে কোন স্তরে কোন গোষ্ঠী পিছিয়ে, তা disaggregated data দিয়ে নির্ধারণ করা জরুরি। অপরদিকে BANBEIS-এর Bangladesh Education Statistics 2024-ও এখন সরকারি সাইটে প্রকাশিত রয়েছে এবং ২০২৬ সালের জুনে পৃষ্ঠাটি হালনাগাদ করা হয়েছে। UNESCO-র SDG 4 পরিসংখ্যান কাঠামোও parity, learning, teachers, learning environment ও education financing-কে পৃথকভাবে পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেয়। এই ফিচারের সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫, ১৭, ১৯, ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদ, SDG 4.5, CRC, CRPD, CEDAW এবং UNESCO-এর শিক্ষা-বৈষম্যবিরোধী কাঠামো যুক্ত করে দেখানোর প্রয়াস রয়েছে যে—শিক্ষার এই বৈষম্য শুধু development problem নয়, কোন কোন ক্ষেত্রে এটি rights and social-justice problem হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশে জন্মের পর থেকেই আমরা গ্রামকে ঘিরে এক আশ্চর্য রোমান্টিকতা শুনে আসছি। কোনো এক রাষ্ট্রনায়কের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল—“ষাট হাজার গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। ” তারপর এল গ্রামকে শহর বানানোর স্বপ্ন। এল একটি বাড়ি একটি খামার। এল সমন্বিত গ্রাম উন্নয়ন। এল কৃষি উন্নয়ন, পল্লী উন্নয়ন, সমবায়, ক্ষুদ্রঋণ, যুব উন্নয়ন, কিশোর-কিশোরী কর্মসূচি। প্রতিষ্ঠিত হলো গ্রাম উন্নয়ন নিয়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণের প্রতিষ্ঠান; BARD, BADC, BRDB—নাম যত, উদ্যোগও তত। কাগজে-কলমে গ্রাম যেন উন্নয়নের ল্যাবরেটরি; প্রকল্পের শিরোনাম শুনলে মনে হয়, গ্রামের মানুষ আর শহরের দিকে তাকাবেই না।
কিন্তু বাস্তবতা একটু রসিক। গ্রাম উন্নয়ন হলো কি না, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়—গ্রামের কিছু মানুষের উন্নয়ন হয়েছে, আর উন্নত হওয়া মাত্রই তাঁরা গ্রাম ছেড়ে শহরে উঠে এসেছেন। যেন উন্নয়নের সনদ পাওয়ার পর প্রথম কর্তব্য—ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বা বিভাগীয় শহরে একটি ফ্ল্যাট খোঁজা। গ্রামে পাকা বাড়ি তৈরি হলো, কিন্তু মালিক থাকেন শহরে; গ্রামের বাড়িতে বছরে দু-একবার ঈদে যান। গ্রামের জমি আছে, পুকুর আছে, গাছ আছে, পূর্বপুরুষের ভিটা আছে—কিন্তু সন্তানের স্কুল নেই “মানসম্মত”; কলেজ আছে, কিন্তু “ভালো” কলেজ নয়; শিক্ষক আছেন, কিন্তু “ওই মানের” শিক্ষক নন; ইন্টারনেট আছে, কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার মতো ecosystem নেই। ফলে পিতার যুক্তি খুব সরল—“গ্রামে থাকা যায়, কিন্তু সন্তানকে রাখা যায় না। ”
এখানেই বাংলাদেশের গ্রাম উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গটি লুকিয়ে আছে। আমরা গ্রামের রাস্তা করেছি, কিন্তু গ্রামের শিশুর জন্য একই মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারিনি। আমরা বিদ্যুৎ নিয়েছি, কিন্তু মানসম্মত বিজ্ঞানাগার সর্বত্র নিতে পারিনি। আমরা মোবাইল নেটওয়ার্ক দিয়েছি, কিন্তু digital learning ecosystem তৈরি করতে পারিনি। আমরা কৃষকের উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলেছি, কিন্তু কৃষকের সন্তানকে এমন শিক্ষা দিতে পারিনি যাতে সে নিজের গ্রামেই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসা, উদ্ভাবন কিংবা আধুনিক পেশার ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। অতএব প্রশ্নটি “মানুষ কেন শহরে আসে? ” নয়। প্রশ্নটি হলো—রাষ্ট্র কি এমন গ্রাম তৈরি করেছে, যেখানে একজন শিক্ষিত বাবা-মা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারেন—‘আমার সন্তানকে ভালো শিক্ষা দিতে হলে আমাকে শহরে যেতে হবে না’?
যদি উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে গ্রাম থেকে শহরে migration-কে শুধু কর্মসংস্থানের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একটি education-driven migration-ও। একজন সরকারি কর্মকর্তা গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরে থাকেন কেন? শুধু অফিসের জন্য নয়—সন্তানের স্কুলের জন্য। একজন ব্যবসায়ী উপজেলা শহর ছেড়ে ঢাকায় কেন আসেন? শুধু বাজারের জন্য নয়—সন্তানের কলেজ, coaching, ইংরেজি শিক্ষা, admission preparation-এর জন্য। একজন প্রবাসী দেশে ফিরে গ্রামের বাড়িতে না থেকে শহরে ফ্ল্যাট কেনেন কেন? বহু ক্ষেত্রে একই উত্তর—“বাচ্চাদের পড়াশোনা। ”তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না—বাংলাদেশে শিক্ষা শুধু social mobility-এর মাধ্যম নয়; এটি spatial mobility-এরও চালক।
শিক্ষার ভালো সুযোগ যেখানে, মানুষ সেখানেই পরিবার স্থানান্তর করে। ফলে একটি অদ্ভুত চক্র তৈরি হয়।
ভালো শিক্ষা শহরে কেন্দ্রীভূত → শিক্ষিত ও সক্ষম পরিবার শহরে যায় → শহরে আরও demand তৈরি হয় → আরও ভালো প্রতিষ্ঠান শহরে তৈরি হয় → গ্রামের social capital কমে → গ্রামের শিক্ষা আরও দুর্বল হয় → আরও পরিবার শহরে চলে আসে।
এ যেন উন্নয়নের নিজের তৈরি conveyor belt—গ্রাম মানুষ তৈরি করে, শহর সেই মানুষ শুষে নেয়। তারপর আমরা আবার নতুন প্রকল্প করি—“গ্রাম বাঁচাও”। কিন্তু গ্রামের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তো রাস্তা বা ভবন নয়; গ্রামের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ মানুষ। আর যদি গ্রামের মেধাবী শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও শিক্ষিত পরিবারগুলো একে একে শহরে চলে যায়, তাহলে গ্রামের অবকাঠামো দাঁড়িয়ে থাকলেও তার মানবিক ও জ্ঞানগত capital ক্ষয়ে যায়। — এই কারণেই গ্রাম উন্নয়নের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন নতুনভাবে করতে হবে।
উত্তর শুধু সড়ক নয়। শুধু সেচ নয়। শুধু বাজার নয়। শুধু খামার নয়। প্রথম সারিতে থাকতে হবে—মানসম্মত শিক্ষা। একটি গ্রামীণ শিশু যেন স্থানীয় বিদ্যালয়েই পায় দক্ষ গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষক, আধুনিক ভাষা শিক্ষা, বিজ্ঞানাগার, library, digital learning, AI literacy, career counselling, sports, arts এবং উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় guidance।
গ্রামের একজন প্রতিবন্ধী শিশুকে যেন জেলা শহরে গিয়ে accommodation খুঁজতে না হয়। একজন কিশোরীকে যেন কলেজে যেতে নিরাপদ পরিবহনের অভাবে পড়াশোনা বন্ধ করতে না হয়। একজন কিশোরকে যেন উচ্চমাধ্যমিকের আগেই শ্রমবাজারে যেতে না হয়। — এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে গ্রাম কেবল বসবাসের জায়গা থাকবে না; গ্রাম একটি viable educational and social ecosystem-এ পরিণত হবে। আমাদের উন্নয়ন ভাবনায় তাই একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। একসময় আমরা বলেছি— “গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। ” —কথাটি এখনো যদি বলি, তাহলে কী ভুল হবে?
না। কথাটি ভুল নয়। এখনো বললেও ভুল হবার নয়। শুধু নিজেদের একটু পরিবর্তন, মানসিকতায় পরিবর্তন, নাগরিক সুবিধা প্রাপ্তিতে একটু পরিবর্তন। কিন্তু আজ তার সঙ্গে আরেকটি বাক্য যোগ করতে হবে— “গ্রামের শিক্ষা বাঁচলে গ্রাম বাঁচবে। ” কারণ মানুষকে প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে গ্রামে রাখা যায় না। তাকে গ্রামে থাকার কারণ দিতে হয়। এক্ষেত্রে তার সন্তান যদি সেখানে ভালো শিক্ষা পায়, পরিবার যদি স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির সুযোগ পায়, কর্মসংস্থানের পথ যদি তৈরি হয়—তাহলে গ্রামের মানুষকে শহরে ঠেলে দেওয়ার শক্তিটাই দুর্বল হবে। নতুবা আমরা হয়তো আরও অনেক Integrated Village Development Programme করব, আরও প্রতিষ্ঠান বানাব, আরও স্লোগান দেব। কিন্তু ফল হবে সেই পুরোনো কৌতুকের মতো—গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্প সফল হয়েছে; তাই গ্রামের সফল মানুষটি এখন ঢাকায় থাকে।
বাংলাদেশের জন্য প্রকৃত গ্রাম উন্নয়ন সেদিনই শুরু হবে, যেদিন একজন বাবা আর সন্তানের হাত ধরে শহরের বাসে উঠতে উঠতে বলবেন না—“কী করব বাবা, তোমার পড়াশোনার জন্য গ্রাম ছাড়তেই হলো। ”
এই জায়গায় পাঠকের কাছে একটি কথা পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন। অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের এই বিশেষ ফিচারটি শুধু গ্রাম ও শহরের বিদ্যালয়ের একটি তুলনামূলক বিবরণ নয়। এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ ও শহুরে শিক্ষা ব্যবস্থার একটি ব্যবচ্ছেদ—একটি theoretical, empirical এবং social diagnosis। আমরা খুঁজে দেখার চেষ্টা করছি, একই দেশের, একই জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার এবং প্রায় একই পাঠ্যক্রমের অধীনে থেকেও একজন গ্রামীণ শিশু ও একজন শহুরে শিশুর শিক্ষাজীবনের সুযোগ কেন এক রকম হয় না।
এই অনুসন্ধানে তাই শুধু প্রশ্ন করা হয়নি—গ্রামে কতটি বিদ্যালয় আছে, শহরে কতটি আছে; কোথায় কতজন শিক্ষক আছেন কিংবা কোন অঞ্চলে পরীক্ষার ফল ভালো। বরং আরও গভীর প্রশ্ন তোলা হয়েছে—কোথায় ভালো শিক্ষক কেন্দ্রীভূত হচ্ছেন, কার কাছে বিজ্ঞানাগার ও প্রযুক্তি পৌঁছাচ্ছে, কে private tuition ও coaching পাচ্ছে, কার পরিবার university admission সম্পর্কে জানে, কার হাতে নিজের digital device আছে, কে career counselling পাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কে নিজের শিক্ষাকে উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগে রূপান্তর করতে পারছে। এই ফিচারের আরও একটি অলিখিত প্রশ্ন আছে—বাংলাদেশের মানুষ এত শহরমুখী কেন?
কর্মসংস্থান অবশ্যই একটি বড় কারণ। প্রশাসন, ব্যবসা, চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রীকরণও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এর পাশে আরেকটি শক্তিশালী অথচ তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত কারণ রয়েছে—সন্তানের শিক্ষা। অনেক পরিবার হয়তো গ্রাম ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কোনো গবেষণাপত্র পড়ে না, Rural–Urban Parity Index হিসাব করে না, Bourdieu কিংবা Sen-এর তত্ত্বও জানে না। তাদের সিদ্ধান্তটি আসে দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ একটি হিসাব থেকে—“আমার সন্তান কোথায় ভালো পড়াশোনা করতে পারবে? ”
আর এই একটি প্রশ্নের উত্তর যদি বারবার “শহরে” হয়, তাহলে সেটি শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকে না। হাজার হাজার পরিবারের একই সিদ্ধান্ত একত্র হয়ে তৈরি করে একটি বৃহত্তর education-induced rural-to-urban migration। —সেখানেই এই ফিচারের অনুসন্ধানটি গ্রাম–শহর শিক্ষাবৈষম্যের সীমানা ছাড়িয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নের মডেলকেই প্রশ্ন করে।
আমরা কয়েক দশক ধরে গ্রাম উন্নয়নের কথা বলেছি। কিন্তু একটি গ্রামের রাস্তা পাকা হলো, বিদ্যুৎ পৌঁছাল, বাজার বড় হলো, মানুষের আয়ও কিছুটা বাড়ল—তারপর সেই পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি প্রথম বড় সিদ্ধান্ত হয় “এবার সন্তানদের পড়াশোনার জন্য শহরে চলে যাই”, তাহলে আমাদের গ্রাম উন্নয়ন মডেলের কোথাও একটি মৌলিক অসম্পূর্ণতা থেকে গেছে।
এই বিশেষ ফিচার সেই অসম্পূর্ণতারই অলিখিত উত্তর খোঁজার চেষ্টা। এখানে তাই গ্রাম–শহর শিক্ষাবৈষম্যকে কেবল educational problem হিসেবে দেখা হয়নি। এটি একই সঙ্গে spatial inequality, socioeconomic inequality, opportunity inequality, migration এবং social justice-এর সমস্যা।
ফিচারটির কেন্দ্রীয় অনুসন্ধান তাই খুব সরল, কিন্তু উত্তরটি গভীর—মানুষ কি শুধু শহরের আকর্ষণে গ্রাম ছাড়ছে, নাকি গ্রামের ভেতরে মানসম্মত শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ সুযোগের ঘাটতিই তাকে শহরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
যদি দ্বিতীয় কারণটির গুরুত্ব সত্যিই বড় হয়, তাহলে বাংলাদেশের নগরায়ণ ও গ্রাম উন্নয়ন নীতিতেও শিক্ষাকে নতুন করে দেখতে হবে। তখন মানসম্মত গ্রামীণ শিক্ষা আর শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয় থাকবে না; এটি হয়ে উঠবে গ্রাম রক্ষা, পরিকল্পিত নগরায়ণ, আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস এবং টেকসই জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত।
আর ঠিক এই কারণেই অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিকের এই বিশেষ ফিচারটি গ্রাম ও শহরের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যবচ্ছেদের মধ্য দিয়ে আসলে আরেকটি বড় প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—বাংলাদেশের মানুষ কেন ক্রমাগত শহরমুখী হচ্ছে?
হয়তো তার একটি উত্তর বহুদিন ধরেই আমাদের চোখের সামনে লেখা আছে—মানুষ শুধু চাকরির খোঁজে শহরে যায় না; অনেক বাবা-মা শহরে যান সন্তানের ভবিষ্যতের খোঁজে। আর যদি সন্তানের ভবিষ্যৎ খুঁজতে একটি পরিবারকে নিজের গ্রাম ছাড়তেই হয়, তাহলে সমস্যাটি শুধু সেই পরিবারের নয়—সমস্যাটি আমাদের শিক্ষা ও উন্নয়নের ভূগোলের।
বাংলাদেশের শিক্ষায় বৈষম্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি প্রচলিত ধারণা আগে সংশোধন করা প্রয়োজন। অনেক সময় বলা হয়, গ্রামের শিশুরা বিদ্যালয়ে যায় না, শহরের শিশুরা যায়; অথবা মেয়েরা শিক্ষায় পিছিয়ে আছে, ছেলেরা এগিয়ে আছে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা এত সরল নয়।
বরং সর্বশেষ তথ্য একটি অনেক বেশি জটিল চিত্র তুলে ধরছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শহর ও গ্রামের ব্যবধান তুলনামূলক কম। এমনকি বিদ্যালয়ে উপস্থিতির ক্ষেত্রে মেয়েরা অনেক পর্যায়ে ছেলেদের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু শিক্ষার্থীর বয়স বাড়তে থাকলে এবং সে মাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে যেতে থাকলে অর্থনৈতিক শ্রেণি, লিঙ্গ এবং ভৌগোলিক অবস্থানের প্রভাব ক্রমেই প্রকট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ Multiple Indicator Cluster Survey 2025 অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে adjusted net attendance rate প্রায় ৮৫ শতাংশ। কিন্তু নিম্নমাধ্যমিকে তা নেমে আসে ৬০.১ শতাংশে এবং উচ্চমাধ্যমিকে মাত্র ৫০.৮ শতাংশে। আরও উদ্বেগজনক হলো completion rate। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে প্রায় ৮৩.৭ শতাংশ শিশু; নিম্নমাধ্যমিকে এটি ৬৯.৩ শতাংশ; উচ্চমাধ্যমিকে গিয়ে মাত্র ৪৩.৯ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে উচ্চমাধ্যমিক বয়স পর্যন্ত পৌঁছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাস্তর সম্পন্ন করতে পারে আনুমানিক ৪৪ জন। এখানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে—শিশু বিদ্যালয়ে ঢুকছে, কিন্তু কতজন শেষ পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় টিকে থাকছে?
MICS 2025-এর তথ্যকে সহজ করে দেখলে পরিস্থিতিটি এমন—
|
শিক্ষা সূচক
|
জাতীয় হার
|
|
প্রাক্-প্রাথমিক/শৈশবকালীন শিক্ষায় অংশগ্রহণ
|
১৬.৬%
|
|
প্রাথমিক পর্যায়ে adjusted net attendance
|
৮৫.০%
|
|
নিম্নমাধ্যমিকে adjusted net attendance
|
৬০.১%
|
|
উচ্চমাধ্যমিকে adjusted net attendance
|
৫০.৮%
|
|
প্রাথমিক বয়সী বিদ্যালয়ের বাইরে
|
৬.৫%
|
|
নিম্নমাধ্যমিক বয়সী বিদ্যালয়ের বাইরে
|
১৩.১%
|
|
উচ্চমাধ্যমিক বয়সী বিদ্যালয়ের বাইরে
|
৩৩.৯%
|
|
প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন
|
৮৩.৭%
|
|
নিম্নমাধ্যমিক সম্পন্ন
|
৬৯.৩%
|
|
উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন
|
৪৩.৯%
|
|
৭–১৪ বছর বয়সীদের মৌলিক reading skill
|
৫০.২%
|
|
৭–১৪ বছর বয়সীদের মৌলিক numeracy skill
|
৩৯.২%
|
এই সংখ্যাগুলো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সত্য প্রকাশ করে: বিদ্যালয়ে উপস্থিতি আর শেখা এক জিনিস নয়। শিশু শ্রেণিকক্ষে বসে আছে—এটি একটি input indicator। কিন্তু সে পড়তে, বুঝতে, হিসাব করতে এবং অর্জিত জ্ঞান ব্যবহার করতে পারছে কি না—সেটিই learning outcome।
যখন ৭–১৪ বছর বয়সী শিশুদের মাত্র প্রায় অর্ধেক মৌলিক reading skill এবং চারজনের মধ্যে আনুমানিক দেড়জন মৌলিক numeracy skill অর্জন করছে, তখন বাংলাদেশের শিক্ষাসংকটকে কেবল dropout-এর সমস্যা বললে বাস্তবতার বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। —এটি একই সঙ্গে learning inequality-এর সংকট।
বৈষম্য (Discrimination/Inequality) বলতে এমন একটি অবস্থা, প্রক্রিয়া বা আচরণকে বোঝায়, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে তার লিঙ্গ, আর্থসামাজিক অবস্থান, জন্মস্থান, জাতিগত পরিচয়, ভাষা, ধর্ম, প্রতিবন্ধিতা বা অন্য কোনো পরিচয়/অবস্থানের কারণে অন্যদের তুলনায় কম সুযোগ, অধিকার, সম্পদ, মর্যাদা বা সুবিধা দেওয়া হয় কিংবা এমন ব্যবস্থা বজায় থাকে যার ফলাফল কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রতিকূল হয়।
শিক্ষায় বৈষম্য (Educational Inequality/Discrimination) হলো এমন পরিস্থিতি, যেখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যালয়ে প্রবেশ, উপস্থিতি, মানসম্মত শিক্ষক, শিক্ষা-উপকরণ, প্রযুক্তি, নিরাপদ পরিবেশ, reasonable accommodation, শেখার ফলাফল, শিক্ষা সম্পন্ন করা, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ সমভাবে বা ন্যায়সংগতভাবে নিশ্চিত হয় না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে: অসমতা (Inequality) হলো ফারাক বা অসম ফলাফলের অবস্থা; আর বৈষম্য (Discrimination) সাধারণত এমন পার্থক্যমূলক আচরণ, নীতি বা চর্চাকে নির্দেশ করে, যা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অন্যায্যভাবে বঞ্চিত করে। অতএব, সব অসমতা বৈষম্য নয়; কিন্তু বৈষম্য অসমতা সৃষ্টি বা স্থায়ী করতে পারে। তাই এই ফিচারের জন্য নিম্নোক্ত সংজ্ঞাটি বিবেচনায় নেওয়া হয়েরেছ:
“শিক্ষায় বৈষম্য হলো এমন কাঠামোগত বা আচরণগত অসমতা, যার ফলে জন্মস্থান, লিঙ্গ, অর্থনৈতিক অবস্থা, প্রতিবন্ধিতা বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে কোনো শিক্ষার্থী অন্য শিক্ষার্থীর তুলনায় মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণ, শেখা, শিক্ষা সম্পন্ন করা এবং সেই শিক্ষাকে ভবিষ্যৎ সুযোগে রূপান্তরের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে। ”
শিক্ষায় বৈষম্য সূচক (Educational Inequality/Equity Indicators) বলতে এমন পরিমাপককে বোঝায়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী—যেমন শহর–গ্রাম, নারী–পুরুষ, ধনী–দরিদ্র, প্রতিবন্ধী–অপ্রতিবন্ধী, অঞ্চল ও সামাজিক গোষ্ঠী—শিক্ষার সুযোগ, অংশগ্রহণ, মান, অর্জন ও ফলাফলে কতটা সমান বা অসম অবস্থানে আছে তা নির্ণয় করা হয়।
শিক্ষায় বৈষম্যকে একটি সূচক দিয়ে যথাযথভাবে বোঝা যায় না। অন্তত নিচের আটটি মাত্রা একসঙ্গে দেখা প্রয়োজন:
|
মাত্রা
|
গুরুত্বপূর্ণ সূচক
|
কী ধরনের বৈষম্য প্রকাশ করে
|
|
১. প্রবেশাধিকার
|
Gross/Net Enrolment Rate, Out-of-School Rate
|
কারা শিক্ষায় ঢুকতে পারছে বা পারছে না
|
|
২. অংশগ্রহণ
|
Attendance Rate, Absenteeism
|
ভর্তি হওয়ার পর কারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে থাকছে
|
|
৩. টিকে থাকা
|
Dropout, Retention, Survival Rate
|
কোন গোষ্ঠী বেশি ঝরে পড়ছে
|
|
৪. শিক্ষা সম্পন্ন
|
Completion Rate, Transition Rate
|
প্রাথমিক→মাধ্যমিক→উচ্চমাধ্যমিক অতিক্রমে বৈষম্য
|
|
৫. শেখার ফল
|
Literacy, Numeracy, Learning Achievement
|
একই শ্রেণিতে থেকেও কে কতটা শিখছে
|
|
৬. শিক্ষার মান ও সম্পদ
|
Teacher–Student Ratio, qualified teachers, laboratory/library, expenditure per student
|
ভালো শিক্ষা-সম্পদ কারা পাচ্ছে
|
|
৭. ডিজিটাল সুযোগ
|
Internet, device ownership/access, digital literacy
|
Digital Divide
|
|
৮. শিক্ষা-পরবর্তী ফলাফল
|
Higher education entry, TVET, employment, NEET, earnings
|
শিক্ষা ভবিষ্যৎ সুযোগে কতটা রূপান্তরিত হচ্ছে
|
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈষম্য-বিভাজক
উপরের প্রতিটি সূচককে আবার disaggregated data দিয়ে তুলনা করতে হবে। যেমন:
Gender: মেয়ে বনাম ছেলে Location: শহর বনাম গ্রাম Wealth: সবচেয়ে দরিদ্র ২০% বনাম সবচেয়ে ধনী ২০% Disability: প্রতিবন্ধী বনাম প্রতিবন্ধিতা নেই এমন শিক্ষার্থী Region: বিভাগ/জেলা/উপজেলা Social group: জাতিগত, ভাষাগত বা অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
GPI যদি 1.00 হয়, দুই গোষ্ঠীর হার সমান। ১-এর নিচে বা ওপরে যাওয়া ব্যবধান নির্দেশ করে—তবে কোন দিকটি সুবিধাপ্রাপ্ত, তা সংশ্লিষ্ট সূচকের প্রকৃতি দেখে ব্যাখ্যা করতে হয়। Dropout-এর মতো নেতিবাচক সূচকে সরলভাবে একই ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।
Access → Participation → Learning → Completion → Transition → Opportunity
এবং প্রতিটি পর্যায়ে পরীক্ষা করা হবে: Gender × Urban/Rural × Wealth × Disability × Region
যেমন, শুধু “মাধ্যমিকে ৬০% শিক্ষার্থী উপস্থিত” বললে বৈষম্য বোঝা যাবে না। একই সূচক যদি দেখায় মেয়ে ৬৯%, ছেলে ৫১%; ধনী ৭২%, দরিদ্র ৪৬%, তখন বোঝা যায় একই জাতীয় গড়ের আড়ালে একাধিক বৈষম্য লুকিয়ে রয়েছে।
সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো Intersectional Inequality Indicator। একজন শিক্ষার্থী একই সঙ্গে গ্রামীণ + দরিদ্র + মেয়ে + প্রতিবন্ধী হতে পারে। তখন শুধু gender বা rural–urban comparison তার প্রকৃত বঞ্চনা প্রকাশ করবে না।
“শিক্ষায় বৈষম্য সূচক হলো এমন পরিমাপকসমষ্টি, যার মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক, লিঙ্গ ও সক্ষমতাভিত্তিক গোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষায় প্রবেশ, অংশগ্রহণ, শেখার অর্জন, টিকে থাকা, শিক্ষা সম্পন্ন করা, শিক্ষা-সম্পদ এবং ভবিষ্যৎ সুযোগের ব্যবধান পরিমাপ করা হয়।”
আন্তর্জাতিকভাবে SDG 4.5-এ শিক্ষা-সংক্রান্ত সূচকগুলোকে sex, rural/urban, wealth এবং disability-সহ বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যে parity indices দিয়ে পরিমাপ করার কাঠামো রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তাই GPI-এর পাশাপাশি Rural–Urban Parity Index, Wealth Parity Index এবং Disability Parity Index একসঙ্গে ব্যবহার করলে বৈষম্যের অনেক বেশি নির্ভুল চিত্র পাওয়া যায়।
—এই তিনটি সূচক SDG 4.5.1-এর অধীনে শিক্ষায় সমতা/বৈষম্য পরিমাপের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপায়। জাতিসংঘ ও UNESCO UIS-এর পদ্ধতিতে parity index মূলত একটি গোষ্ঠীর শিক্ষা-সূচকের মানকে অন্য গোষ্ঠীর মান দিয়ে ভাগ করে নির্ণয় করা হয়; সাধারণত অপেক্ষাকৃত বঞ্চিত বলে বিবেচিত গোষ্ঠী numerator-এ থাকে। ১.০০ মানে পূর্ণ parity; বিশ্লেষণী প্রয়োজনে 0.97–1.03-কেও সাধারণত parity হিসেবে ধরা হয়।
এটি দেখায় কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষা-সূচকে গ্রামীণ ও শহুরে শিক্ষার্থীদের অবস্থানের অনুপাত।
সাধারণ সূত্র:
উদাহরণ হিসেবে, যদি উচ্চমাধ্যমিকে attendance হয়—
গ্রাম = 45%
শহর = 60%
তাহলে,
অর্থাৎ শহরের প্রতি ১০০ একক অর্জনের বিপরীতে গ্রামের অর্জন ৭৫ একক। এখানে উল্লেখযোগ্য rural disadvantage রয়েছে।
RUPI = Rural indicator ÷ Urban indicator | 1.00 = সমতা; 1.00-এর নিচে (ইতিবাচক সূচকে) গ্রামীণ পিছিয়ে থাকা নির্দেশ করে।
তবে dropout বা out-of-school rate-এর মতো নেতিবাচক সূচকে ব্যাখ্যা উল্টোভাবে করতে হয়।
বাংলাদেশের শিক্ষাবৈষম্য বিশ্লেষণে এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। SDG 4.5.1 সরাসরি bottom/top wealth quintile তুলনার কথা বলে।
সাধারণ সূত্র:
ধরা যাক উচ্চমাধ্যমিকে attendance—
সবচেয়ে দরিদ্র ২০% = 35%
সবচেয়ে ধনী ২০% = 70%
তাহলে, এর অর্থ—সবচেয়ে ধনী পরিবারের প্রতি ১০০ একক অর্জনের বিপরীতে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের অর্জন মাত্র ৫০ একক।
শুধু জাতীয় enrolment rate দেখলে এই বৈষম্য লুকিয়ে যেতে পারে।
ধরা যাক জাতীয় হার 55%। দেখে মনে হতে পারে পরিস্থিতি মোটামুটি সন্তোষজনক। কিন্তু disaggregation করলে দেখা গেল: Poorest = 35% | Richest = 70%
তখন বোঝা যায় জাতীয় গড়ের নিচে একটি গভীর socioeconomic inequality লুকিয়ে আছে।
বাংলাদেশের সরকারি SDG ব্যবস্থাতেও 4.5.1-এর অধীনে wealth ও geographic-location disaggregation ব্যবহৃত হচ্ছে।
এটি দেখায় প্রতিবন্ধী এবং প্রতিবন্ধিতা নেই এমন শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো শিক্ষা-সূচকে কতটা ব্যবধান রয়েছে।
সাধারণভাবে:
উদাহরণ:
ধরা যাক মাধ্যমিক শিক্ষা completion rate—
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী = 40%
প্রতিবন্ধিতা নেই এমন শিক্ষার্থী = 65%
তাহলে,
অর্থাৎ, DPI ≈ 0.62
অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ইতিবাচক শিক্ষা-সূচকে প্রতিবন্ধিতা নেই এমন শিক্ষার্থীদের প্রতি ১০০ একক অর্জনের বিপরীতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অর্জন প্রায় ৬২ একক। এটি শুধু enrolment-এর জন্য নয়। সম্ভব হলে Disability Parity Index হিসাব করা উচিত—
Enrolment → Attendance → Learning → Retention → Completion → Transition → Tertiary Education → TVET → Employment
প্রতিটি পর্যায়ে।
SDG Target 4.5 বিশেষভাবেই persons with disabilities-সহ vulnerable groups-এর জন্য সব স্তরের শিক্ষা ও vocational training-এ সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে।
|
সূচক
|
তুলনা
|
সাধারণ সূত্র
|
কী প্রকাশ করে
|
|
Rural–Urban Parity Index
|
গ্রাম বনাম শহর
|
Rural ÷ Urban
|
ভৌগোলিক বৈষম্য
|
|
Wealth Parity Index
|
দরিদ্র বনাম ধনী
|
Bottom quintile ÷ Top quintile
|
অর্থনৈতিক/শ্রেণিগত বৈষম্য
|
|
Disability Parity Index
|
প্রতিবন্ধী বনাম অপ্রতিবন্ধী
|
With disability ÷ Without disability
|
প্রতিবন্ধিতাজনিত বৈষম্য
|
বাংলাদেশের জন্য শুধু তিনটি index আলাদাভাবে হিসাব করলেই পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। কারণ একজন শিক্ষার্থী একই সঙ্গে গ্রামীণ + দরিদ্র + প্রতিবন্ধী + মেয়ে হতে পারে।
তাই আরও শক্তিশালী বিশ্লেষণ হবে: Rural/Urban × Wealth × Gender × Disability
উদাহরণস্বরূপ: শহরের ধনী ছেলে বনাম গ্রামের দরিদ্র প্রতিবন্ধী মেয়ে। দুই গোষ্ঠীর enrolment, attendance, learning proficiency, completion এবং higher-education transition তুলনা করলে বাংলাদেশের সবচেয়ে গভীর intersectional educational inequality চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
এই ধারণাটিই SDG 4.5.1-এর মূল দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—female/male, rural/urban, bottom/top wealth quintile, disability status ইত্যাদিতে disaggregated শিক্ষা-সূচকের parity পরিমাপ করা। তাই বলা যায়:
“বাংলাদেশে শিক্ষার জাতীয় গড় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই গড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা Rural–Urban Parity, Wealth Parity এবং Disability Parity; কারণ জাতীয় গড় বলে কতজন এগিয়েছে, কিন্তু parity index বলে—কারা পেছনে পড়ে আছে। ”
বাংলাদেশে গ্রাম–শহর শিক্ষাবৈষম্য বলতে শুধু শহরে ভালো স্কুল আর গ্রামে খারাপ স্কুল—এমন সরল বিভাজন বোঝায় না। বরং শিক্ষায় প্রবেশ, শিক্ষক, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, পারিবারিক সক্ষমতা, অতিরিক্ত শিক্ষা-সহায়তা, শেখার ফলাফল এবং উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে যাওয়ার সুযোগ—এই পুরো education pathway-এ অসম সুযোগ সৃষ্টি হওয়াই গ্রাম–শহর বৈষম্যের মূল বিষয়।
একটি সহজ causal chain দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যায়:
জন্মস্থান → পারিবারিক আর্থসামাজিক অবস্থা → বিদ্যালয়ের মান → শিক্ষক ও শিক্ষা-সম্পদ → ডিজিটাল ও অতিরিক্ত শিক্ষা-সুযোগ → শেখার অর্জন → পরীক্ষার ফল → উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ → কর্মসংস্থান → আয়
এই শৃঙ্খলের প্রথম কয়েকটি পর্যায়েই শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হলে শেষ পর্যায়ে গিয়ে সেই ব্যবধান আরও বড় হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রধান কারণগুলো হলো:
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগত সতর্কতা আছে। গ্রামের শিক্ষার্থী সব সূচকেই শহরের শিক্ষার্থীর চেয়ে পিছিয়ে—এমন সিদ্ধান্ত আগে থেকে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কোনো পর্যায়ে enrolment বা attendance প্রায় সমান হতে পারে, অথচ learning outcome, completion, digital access, higher-secondary transition বা university admission-এ বড় ব্যবধান থাকতে পারে।
তাই ব্যবহার করা যায়: যেমন উচ্চমাধ্যমিক completion যদি গ্রামে ৪০% এবং শহরে ৫০% হয়: 40/50=0.8040/50=0.80
অর্থাৎ শহরের প্রতি ১০০ একক অর্জনের বিপরীতে গ্রামের অর্জন ৮০ একক। তবে dropout-এর মতো নেতিবাচক সূচকের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা ভিন্ন হবে।
এটাই সবচেয়ে গভীর সমস্যা:
দরিদ্র/প্রত্যন্ত পরিবার → তুলনামূলক কম শিক্ষা-সম্পদ → learning gap → উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সম্ভাবনা কম → দক্ষ ও উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থানের সুযোগ কম → পরবর্তী প্রজন্মেও সীমিত শিক্ষা-সম্পদ।
একে বলা যায় intergenerational reproduction of educational inequality। অর্থাৎ শিক্ষা যদি এই চক্র ভাঙতে না পারে, তাহলে যে ব্যবস্থাকে সামাজিক গতিশীলতার সিঁড়ি হওয়ার কথা, সেটিই কখনো কখনো বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য পুনরুৎপাদন করতে পারে।
বাংলাদেশে গ্রাম–শহর শিক্ষাবৈষম্য বিদ্যালয়ের দরজায় শুরু হয়ে বিদ্যালয়ের দরজাতেই শেষ হয় না। একই পাঠ্যবই হাতে পেলেও দুই শিক্ষার্থী একই শিক্ষার সুযোগ পায় না, যদি একজনের পাশে থাকে দক্ষ শিক্ষক, বিজ্ঞানাগার, ইন্টারনেট, ব্যক্তিগত ডিভাইস, কোচিং, শিক্ষিত পরিবারের সহায়তা ও ক্যারিয়ার নির্দেশনা, আর অন্যজনকে লড়তে হয় শিক্ষকসংকট, দূরত্ব, দারিদ্র্য, দুর্বল সংযোগ এবং শ্রমের চাপের সঙ্গে। তাই শিক্ষায় সমতা মানে একই বই, একই পরীক্ষা বা একই পাঠ্যক্রম নয়; বরং প্রত্যেক শিশুর জন্য মানসম্মতভাবে শেখা এবং নিজের সম্ভাবনাকে বিকশিত করার ন্যায়সংগত সুযোগ নিশ্চিত করা।
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। দূরের ধানখেতের ওপর কুয়াশার পাতলা চাদর। গ্রামের সরু পথ ধরে একটি শিশু বইয়ের ব্যাগ কাঁধে স্কুলের দিকে হাঁটছে। বর্ষায় এই পথ কাদায় ডুবে যায়, কোথাও নৌকা লাগে; শুষ্ক মৌসুমে ধুলো মাড়িয়ে কয়েক কিলোমিটার যেতে হয়। তার ব্যাগে পাঠ্যবই আছে, খাতা আছে, হয়তো সরকারের দেওয়া বিনামূল্যের বইও আছে। কিন্তু বাড়িতে আলাদা পড়ার ঘর নেই, দ্রুতগতির ইন্টারনেট নেই, কাছাকাছি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি বা বিজ্ঞানাগার নেই। পরিবারে হয়তো সে-ই প্রথম, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটিকে নিজের ভবিষ্যতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সাহস করছে।
একই সকালে ঢাকার আরেকটি শিশু ঘুম থেকে ওঠে অন্য এক শিক্ষাজগতে। তার স্কুল হয়তো গাড়িতে বিশ মিনিট দূরে। বাড়িতে বইয়ের তাক, কম্পিউটার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, আলাদা পড়ার টেবিল। বাবা-মা জানেন কোন বিষয়ে পড়লে কী পেশায় যাওয়া যায়, কখন ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করা উচিত, কোথায় বৃত্তির তথ্য পাওয়া যায়। রাতের খাবারের টেবিলেও হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, প্রযুক্তি, বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা ভবিষ্যৎ পেশা নিয়ে কথা হয়।
দুই শিশুই বাংলাদেশের নাগরিক। দুজনের হাতে একই জাতীয় পাঠ্যক্রমের বই থাকতে পারে, একই শ্রেণিতে একই অধ্যায় পড়তে পারে, এমনকি একদিন একই পাবলিক পরীক্ষার একই প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারে। রাষ্ট্রের কাগজে তাদের সুযোগ তাই প্রায় সমান বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু তাদের শুরুর রেখাটি কি সত্যিই একই জায়গায়?
বাংলাদেশের শিক্ষাবৈষম্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত এখানেই। বৈষম্য শুধু কে স্কুলে গেল আর কে গেল না, কে পাস করল আর কে ফেল করল—এই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি শিশুর জন্মস্থান, পরিবারের আয়, বাবা-মায়ের শিক্ষা, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা, সামাজিক পরিচয়, তথ্যপ্রাপ্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং চারপাশের সুযোগের কাঠামো মিলিয়ে তার জন্য একটি অদৃশ্য শিক্ষাজগৎ তৈরি হয়। সেই জগৎ কখনো তাকে সামনে ঠেলে দেয়, কখনো অদৃশ্য হাতে পিছনে টেনে ধরে।
পিয়েরে বুর্দিয়োর ভাষায়, একটি শিশু বিদ্যালয়ে শুধু ব্যক্তিগত মেধা নিয়ে প্রবেশ করে না; তার সঙ্গে আসে পরিবারের accumulated advantage বা accumulated disadvantage। কারও সঙ্গে আসে বই পড়ার অভ্যাস, ভাষাগত আত্মবিশ্বাস, সাংস্কৃতিক পরিচিতি, শিক্ষিত অভিভাবকের দিকনির্দেশনা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা। কারও সঙ্গে আসে সীমিত আয়, প্রথম-প্রজন্মের শিক্ষার্থী হওয়ার অনিশ্চয়তা এবং এমন একটি পারিবারিক বাস্তবতা, যেখানে উচ্চশিক্ষার পথ কেউ আগে হেঁটে দেখেনি।
শহরের শিক্ষিত পরিবারের একটি শিশুর কাছে বিশ্ববিদ্যালয় কোনো অজানা মহাদেশ নয়। সে হয়তো ছোটবেলা থেকেই জানে ভর্তি পরীক্ষা কী, scholarship কোথায় পাওয়া যায়, কোন বিষয়ে পড়লে কোন পেশায় যাওয়া সম্ভব। বিপরীতে গ্রামের একটি অত্যন্ত মেধাবী প্রথম-প্রজন্মের শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদনপদ্ধতিটিও নতুন হতে পারে।
তখন প্রশ্ন ওঠে—পরীক্ষার খাতায় আমরা কি কেবল শিশুর মেধা পরিমাপ করছি, নাকি তার পরিবারের বহু বছরের সঞ্চিত সুবিধাকেও ‘মেধা’ নামে পুরস্কৃত করছি?
এই জায়গাতেই শিক্ষা কখনো বৈষম্যের দেয়াল ভাঙার পরিবর্তে সামাজিক সুবিধা ও অসুবিধাকে পরবর্তী প্রজন্মে পুনরুৎপাদন করতে পারে। আজকের শিক্ষিত ও সুযোগপ্রাপ্ত শিশুটি আগামী দিনে নিজের সন্তানকে আরও বেশি cultural capital দিতে পারে; আর যে শিশু আজই পিছিয়ে পড়ল, তার সন্তানের শুরুর রেখাটিও হয়তো আবার পেছনে থেকে যাবে।
জেমস কোলম্যানের Social Capital ধারণা এই বৈষম্যের আরও একটি অদৃশ্য মাত্রা দেখায়। একটি শিশুর পরিবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক, আইটি পেশাজীবী কিংবা বিদেশে পড়াশোনা করা আত্মীয় থাকলে সে শুধু কয়েকজন পেশাজীবীকে চেনে না; সে আসলে একটি বিশাল information network-এর মধ্যে বেড়ে ওঠে।
কোন বিষয়ে পড়লে কী করা যায়, কোথায় scholarship পাওয়া যায়, IELTS বা SAT কী, বিশ্ববিদ্যালয়ের admission test-এর প্রস্তুতি কখন শুরু করতে হয়, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে—এসব তথ্য অনেক সময় তাকে খুঁজতেই হয় না। তথ্য নিজেই তার কাছে পৌঁছে যায়।
অন্যদিকে প্রত্যন্ত গ্রামের প্রথম-প্রজন্মের শিক্ষার্থী হয়তো একই তথ্য জানতে জানতে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বছর হারিয়ে ফেলে। কখনো তথ্যটি তার কাছে পৌঁছায়ই না। ফলে বাংলাদেশের শিক্ষাবৈষম্যের একটি বড় অথচ কম আলোচিত মাত্রা হলো Information Inequality। কারণ ভবিষ্যৎ শুধু আপনি কী জানেন তার ওপর নির্ভর করে না; আপনার চারপাশের মানুষ কী জানে এবং ঠিক সময়ে কোন তথ্যটি আপনার কাছে পৌঁছায়—সেটিও জীবন বদলে দিতে পারে।
অমর্ত্য সেনের Capability Approach এই প্রশ্নটিকে আরও গভীরে নিয়ে যায়। রাষ্ট্র দুই শিশুকে একই বই দিল—কাগজে সমতা প্রতিষ্ঠিত হলো। কিন্তু একজনের ঘরে বিদ্যুৎ, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, আলাদা পড়ার জায়গা এবং শিক্ষিত অভিভাবক আছেন। অন্যজন স্কুল থেকে ফিরে পরিবারের কাজে সাহায্য করে, রাতে পড়ার নিরিবিলি জায়গা পায় না, ইন্টারনেট দুর্বল, কঠিন কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে সাহায্য করার মানুষও নেই।
দুজনের হাতে একই resource থাকলেও সেই resource-কে learning-এ রূপান্তরের ক্ষমতা তাই এক নয়। Resource Equality মানেই Capability Equality নয়। এই কারণেই শিক্ষা-নীতির সাফল্য শুধু কত কোটি বই বিতরণ হলো, কতটি বিদ্যালয় নির্মিত হলো কিংবা কত শিশু ভর্তি হলো—এই সংখ্যায় মাপলে বাস্তবতার বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বইটি হাতে পাওয়ার পর শিশুটি আসলে কী শিখতে সক্ষম হলো।
জন রলসের Justice as Fairness ধারণাও একই জায়গায় আরেকটি সতর্কতা দেয়। ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয় এবং দুর্গম চরাঞ্চলের একটি বিদ্যালয়কে একই বরাদ্দ দেওয়া দেখতে সমান মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে তা ন্যায়সংগত নাও হতে পারে। চরাঞ্চলের বিদ্যালয়ে শিক্ষক ধরে রাখতে অতিরিক্ত ভাতা, আবাসন, নৌপরিবহন, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো, শক্তিশালী ডিজিটাল সংযোগ এবং বাড়তি learning support প্রয়োজন হতে পারে।
অতএব সমতা সবাইকে একই জিনিস দেওয়ার নাম হলেও ন্যায্যতা হলো যার বাধা বেশি, তাকে প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি সহায়তা দেওয়া। আর justice আরও এক ধাপ এগিয়ে জানতে চায়—কোন কাঠামোটি বারবার একই শিশুকে পিছিয়ে দিচ্ছে এবং সেটি পরিবর্তন করা হচ্ছে কি না।
এই বহুমাত্রিক বৈষম্যের ভেতরে বাংলাদেশের gender story-ও বদলে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের পরিচিত ধারণা—ছেলেরা শিক্ষায় এগিয়ে, মেয়েরা পিছিয়ে—বর্তমান attendance data দিয়ে আর সরলভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। MICS 2025-এর প্রাথমিক শিক্ষা-স্ন্যাপশট অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে adjusted net attendance মেয়েদের আনুমানিক ৮৭ শতাংশ, ছেলেদের ৮২ শতাংশ। নিম্নমাধ্যমিকে ব্যবধান নাটকীয়—মেয়ে প্রায় ৬৯ শতাংশ, ছেলে প্রায় ৫১ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিকেও মেয়েদের উপস্থিতি প্রায় ৫৫ শতাংশ, ছেলেদের ৪৬ শতাংশ।
Attendance-এর girls-to-boys Gender Parity Index প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ১.০৭, নিম্নমাধ্যমিকে ১.৩৬ এবং উচ্চমাধ্যমিকে প্রায় ১.২১। এই সংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—বাংলাদেশের gender disadvantage এখন একমুখী নয়; বরং দ্বিমুখী এবং ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক শক্তি দ্বারা পরিচালিত।
একটি দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের পনেরো বছরের মেয়েটিকে হয়তো এক সন্ধ্যায় বলা হয়, “আর কত পড়বে? ভালো সম্বন্ধ এসেছে।” একই পরিবারের পনেরো বছরের ছেলেটিকে বলা হয়, “বাবার একার আয়ে সংসার চলে না, এবার কিছু একটা কাজ ধরো।” দুই শিশুই শেষ পর্যন্ত বিদ্যালয় থেকে হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু তাদের বেরিয়ে যাওয়ার দরজা দুটি আলাদা।
মেয়েটিকে ঠেলে দিতে পারে বাল্যবিবাহ, নিরাপত্তাহীনতা, unpaid domestic work এবং gendered social expectation। ছেলেটিকে টেনে নিতে পারে child labour, পারিবারিক আয়ের চাপ এবং অল্প বয়সেই breadwinner হয়ে ওঠার সামাজিক প্রত্যাশা। ফলে শুধু gender parity অর্জন করলেই সমস্যার সমাধান হয় না; প্রয়োজন এমন gender-responsive retention policy, যা ছেলে ও মেয়ের ঝরে পড়ার ভিন্ন কারণকে আলাদাভাবে শনাক্ত করবে।
নিম্নমাধ্যমিকে মেয়েদের attendance প্রায় ৬৯ শতাংশ, অথচ ছেলেদের প্রায় ৫১ শতাংশ—এই ব্যবধান বাংলাদেশের সামনে একটি নতুন শিক্ষা-নীতি প্রশ্ন হাজির করে। ছেলেরা কোথায় যাচ্ছে?
অনেক দরিদ্র পরিবারের ছেলে কৈশোরেই কৃষি, দোকান, পরিবহন, নির্মাণকাজ, ওয়ার্কশপ, পারিবারিক ব্যবসা কিংবা অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে ঢুকে পড়ে। কেউ বিদ্যালয়ের শিক্ষার সঙ্গে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের দৃশ্যমান সম্পর্ক খুঁজে পায় না, কেউ পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর আর ফিরে আসে না, আবার কারও সামনে সংসারের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বইয়ের চেয়ে বেশি জরুরি হয়ে দাঁড়ায়।
MICS 2025 অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫–১৭ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৯.২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত। ফলে boys’ dropout-কে শুধু “পড়াশোনায় অনাগ্রহ” বলে ব্যাখ্যা করলে আমরা সমস্যাটির সামাজিক-অর্থনৈতিক চরিত্র আড়াল করি। একটি ছেলের বই বন্ধ হওয়ার আগে হয়তো তার পরিবারের বাজারের হিসাব, বাবার সীমিত আয়, ঋণের চাপ কিংবা নিজের উপার্জনক্ষম হয়ে ওঠার সামাজিক প্রত্যাশা কাজ করছে।
এটি তাই শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমস্যা নয়; শিক্ষা, শ্রমবাজার এবং সামাজিক সুরক্ষার একটি যৌথ সংকট।
বিদ্যালয়ে মেয়েদের উপস্থিতি বৃদ্ধি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নীতিগত বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। যে মেয়েদের একসময় মাধ্যমিকের আগেই হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, তাদের একটি বড় অংশ এখন শ্রেণিকক্ষে টিকে থাকছে, পরীক্ষা দিচ্ছে, উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছে।
কিন্তু attendance advantage-কে gender equality হিসেবে ঘোষণা করা হবে আরেকটি ভুল। একটি মেয়ের শিক্ষাগত সমতা বিচার করতে হবে পুরো জীবনচক্রে—বিদ্যালয়ে প্রবেশ থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করা, উচ্চশিক্ষায় যাওয়া, পছন্দের বিষয় নির্বাচন, STEM-এ অংশগ্রহণ, দক্ষতা অর্জন, কর্মসংস্থান, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, নেতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পর্যন্ত।
এখানেই নতুন প্রশ্ন—School parity কি life-opportunity parity-তে রূপান্তরিত হচ্ছে?
স্কুলের বেঞ্চে মেয়েদের সংখ্যা সমান বা বেশি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই শিক্ষা যদি চাকরি, আয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নেতৃত্বের টেবিলে সমান উপস্থিতিতে রূপান্তরিত না হয়, তবে gender transformation অসম্পূর্ণই থেকে যায়। স্কুলের বেঞ্চে জায়গা পাওয়া আর জীবনের সিদ্ধান্তের টেবিলে জায়গা পাওয়া একই বিষয় নয়।
গ্রাম–শহর বৈষম্যের ক্ষেত্রেও প্রচলিত ধারণাকে তথ্য নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। MICS 2025 অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ে adjusted attendance আনুমানিক ৮৫ শতাংশ গ্রামে এবং ৮২ শতাংশ শহরে। নিম্নমাধ্যমিকে দুই এলাকাতেই প্রায় ৬০ শতাংশ। অর্থাৎ attendance-এর ক্ষেত্রে প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিকে “শহর এগিয়ে, গ্রাম পিছিয়ে”—এই পরিচিত ধারণাটি সরলভাবে খাটে না।
উচ্চমাধ্যমিকে এসে অবশ্য ব্যবধান দৃশ্যমান হতে শুরু করে। সেখানে শহরের attendance আনুমানিক ৫৪ শতাংশ, গ্রামের ৪৯ শতাংশ। Area Parity Index প্রাথমিক পর্যায়ের প্রায় ১.০৩ এবং নিম্নমাধ্যমিকের ১.০০ থেকে উচ্চমাধ্যমিকে প্রায় ০.৯১-এ নেমে আসে।
এই তথ্যের তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের rural–urban inequality সম্ভবত school access-এর চেয়ে educational opportunity-তে অনেক বেশি গভীর। গ্রামের শিশু স্কুলে যাচ্ছে, শহরের শিশুও যাচ্ছে; কিন্তু স্কুলের বাইরে তাদের চারপাশে তৈরি হওয়া শেখার জগৎ এক নয়।
শহরের শিশু হয়তো পাচ্ছে ভালো কোচিং, ইংরেজি শেখার সুযোগ, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, বিজ্ঞানাগার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, career counselling, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত exposure এবং extracurricular platform। গ্রামের শিশুটির attendance একই হতে পারে, কিন্তু তার চারপাশে একই opportunity infrastructure না থাকলে একই উপস্থিতি শেষ পর্যন্ত একই শিক্ষাগত ফল তৈরি করবে না।
আর এখানেই বাংলাদেশের শিক্ষা-বৈষম্যের সবচেয়ে নির্মম রেখাটি দৃশ্যমান হয়—অর্থনৈতিক শ্রেণি।
প্রাথমিক পর্যায়ে adjusted attendance ধনী পরিবারের শিশুদের আনুমানিক ৮৬ শতাংশ এবং দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ৮১ শতাংশ। ব্যবধান মাত্র পাঁচ শতাংশ পয়েন্টের মতো। প্রথম কয়েক বছর দেখে মনে হতে পারে, বাংলাদেশের বিদ্যালয়ব্যবস্থা ধনী ও দরিদ্রকে মোটামুটি একই ছাদের নিচে ধরে রাখতে পেরেছে।
কিন্তু বয়স বাড়তেই ছবিটি পাল্টে যায়। নিম্নমাধ্যমিকে ধনী পরিবারের attendance প্রায় ৭২ শতাংশ, দরিদ্র পরিবারের মাত্র ৪৬ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিকে ব্যবধান আরও ভয়াবহ—ধনী পরিবারের শিশুদের attendance প্রায় ৭০ শতাংশ, দরিদ্র পরিবারের মাত্র ৩৪ শতাংশ।
Wealth Parity Index প্রাথমিক পর্যায়ের প্রায় ০.৯৪ থেকে নিম্নমাধ্যমিকে ০.৬৪ এবং উচ্চমাধ্যমিকে মাত্র ০.৪৯-এ নেমে যায়। অর্থাৎ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উঠানে যে দুই শিশুকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল, উচ্চমাধ্যমিকে পৌঁছানোর আগেই তাদের একটি বড় অংশ দুই বিপরীত দিকে চলে গেছে।
বাংলাদেশের শিক্ষা-বৈষম্যের সবচেয়ে শক্তিশালী দেয়ালগুলোর একটি তাই গ্রাম ও শহরের মাঝখানে নয়; এটি ধনী ও দরিদ্রের মাঝখানে।
শিক্ষাকে আমরা দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে শক্তিশালী সিঁড়িগুলোর একটি বলি। কিন্তু দরিদ্র শিশুর জন্য সেই সিঁড়ির কয়েকটি ধাপ যদি মাধ্যমিকেই ভেঙে যায়, সামাজিক গতিশীলতার প্রতিশ্রুতি কীভাবে পূরণ হবে?
দরিদ্র পরিবারের শিশুর জন্য শিক্ষার opportunity cost তুলনামূলক বেশি। সে বিদ্যালয়ে থাকলে পরিবার একটি সম্ভাব্য শ্রমশক্তিকে হারায়। পড়াশোনার সঙ্গে যাতায়াত, খাতা-কলম, পরীক্ষা প্রস্তুতি, ডিজিটাল ডিভাইস, ইন্টারনেট, প্রাইভেট টিউশন কিংবা কোচিংয়ের ব্যয় যুক্ত হতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে বড় অদৃশ্য ব্যয়টি হলো—শিশুটি যদি কাজ করত, পরিবার যে আয়টি পেতে পারত।
তাই দরিদ্র পরিবারের কাছে “বিনামূল্যের শিক্ষা”ও সব সময় পুরোপুরি বিনামূল্যের নয়। দারিদ্র্য শিশুকে বিদ্যালয়ের বাইরে ঠেলে দেয়; আবার বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়া ভবিষ্যতে তার আয় ও সামাজিক গতিশীলতার সম্ভাবনা কমিয়ে তাকে দারিদ্র্যের মধ্যেই আটকে রাখতে পারে। এভাবেই একটি বৃত্ত তৈরি হয়—poverty interrupts education, and interrupted education reproduces poverty।
এই পুরো আলোচনায় আরেকটি বিপজ্জনক ভ্রম ভাঙা প্রয়োজন—শিশু স্কুলে যাচ্ছে মানেই সে শিক্ষা পাচ্ছে।
MICS 2025-এর foundational learning তথ্য অনুযায়ী ৭–১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মৌলিক reading skill রয়েছে আনুমানিক ৫০.২ শতাংশের এবং মৌলিক numeracy skill প্রায় ৩৯.২ শতাংশের। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক শিশুর মৌলিক পড়ার দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, আর সংখ্যাজ্ঞানের ক্ষেত্রে সংকট আরও গভীর।
বাংলাদেশের শিক্ষানীতির সামনে তাই দুটি আলাদা প্রশ্ন দাঁড়ায়। প্রথমটি হলো—শিশুটি বিদ্যালয়ে আছে কি? দ্বিতীয়টি আরও কঠিন—বিদ্যালয় শিশুটিকে শেখাতে পারছে কি?
দশ বছর বিদ্যালয়ে কাটানো এবং দশ বছরের সমমানের শিক্ষা অর্জন করা এক নয়। একটি শিশু শ্রেণি উত্তীর্ণ হতে পারে, পরীক্ষায় বসতে পারে, সনদও পেতে পারে; কিন্তু মৌলিক পড়া, বোঝা, সংখ্যা ব্যবহার, সমস্যা সমাধান এবং বাস্তব জীবনে জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা তৈরি না হলে schooling এবং education-এর মধ্যে গভীর ব্যবধান থেকেই যায়।
ডিজিটাল প্রযুক্তি এই বৈষম্য কমাতেও পারে, আবার নতুন বৈষম্যও তৈরি করতে পারে। MICS 2025 অনুযায়ী দেশের প্রায় ৭২.১ শতাংশ পরিবারের ঘরে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। সংখ্যাটি আশাব্যঞ্জক, কিন্তু “ইন্টারনেট আছে” এবং “শিক্ষার জন্য কার্যকর ডিজিটাল সুযোগ আছে”—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা।
একটি পরিবারের একমাত্র স্মার্টফোনটি যদি বাবা সারাদিন কর্মস্থলে নিয়ে যান, সেটি শিশুর educational device নয়। দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্ক high-speed learning access নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চালাতে পারা digital literacy নয়। আর AI tool-এর নাম জানা AI literacy নয়।
ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিকে তাই পাঁচটি সংযুক্ত ধাপে দেখতে হবে—Connectivity → Device → Affordability → Digital Skills → Educational Use। এই শৃঙ্খলের যেকোনো একটি কড়ি ছিঁড়ে গেলে digital inclusion অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আজকের শিশুর শিক্ষাবৈষম্য তাই আগামী দিনে শুধু বই, শিক্ষক কিংবা বিদ্যালয়ের বৈষম্য থাকবে না; bandwidth, device, digital literacy, AI literacy এবং প্রযুক্তিকে শেখায় ব্যবহার করার সক্ষমতাও নতুন শ্রেণিবিভাজনের রেখা তৈরি করতে পারে।
শিক্ষাবৈষম্যের আরেকটি মাত্রা পাঠ্যবইয়ের ভেতরেও লুকিয়ে থাকতে পারে। পাওলো ফ্রেইরের Critical Pedagogy আমাদের জিজ্ঞেস করতে শেখায়—শিক্ষা কি শিশুকে শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে শেখাচ্ছে, নাকি নিজের বাস্তবতা বুঝতে, প্রশ্ন করতে এবং পরিবর্তন করতে সক্ষম করছে?
গ্রামের শিশুটি যদি পাঠ্যক্রমে নিজের নদী, কৃষি, হাওর, পাহাড়, স্থানীয় ভাষা, লোকজ জ্ঞান, জলবায়ু-সংকট এবং সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাকে খুব কমই খুঁজে পায়, তাহলে বিদ্যালয়ের জ্ঞান তার কাছে দূরের কোনো জগতের ভাষা হয়ে উঠতে পারে। অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা তাই শুধু একই বই সবার হাতে তুলে দেওয়ার বিষয় নয়; কার জ্ঞানকে জাতীয় জ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে, সেটিও equity-এর প্রশ্ন।
একটি শিশুর শেখার ফলাফলকে শুধু বিদ্যালয়ের ব্যর্থতা বলাও তাই যথেষ্ট নয়। ব্রনফেনব্রেনারের ecological perspective থেকে দেখলে তার চারপাশে পরিবার, বিদ্যালয়, শিক্ষক, সহপাঠী, স্থানীয় অর্থনীতি, যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক রীতি, রাষ্ট্রীয় নীতি, জলবায়ু এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন—সব মিলিয়ে একটি learning ecosystem কাজ করে। শিক্ষাবৈষম্য তাই অনেক সময় একটি বৃহত্তর ecosystem of inequality-এর ফল।
টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ৪ বা SDG 4-এর মূল দর্শনের তিনটি শব্দ—Inclusive, Equitable, Quality। বাংলাদেশ বিদ্যালয়ের দরজা খুলতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। শিশুদের স্কুলে আনা, মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
কিন্তু এখন SDG 4-এর দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রশ্ন সামনে এসেছে। দরজা দিয়ে ঢোকার পর শিশুটি কী পাচ্ছে? গ্রাম ও শহরের শিশু কি একই মানের learning opportunity পাচ্ছে? ধনী ও দরিদ্র শিশুর উচ্চমাধ্যমিকে পৌঁছানোর সম্ভাবনা কেন এত আলাদা? প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী reasonable accommodation পাচ্ছে কি? ছেলেরা কেন মাধ্যমিক পর্যায়ে হারিয়ে যাচ্ছে? মেয়েদের শিক্ষাগত অগ্রগতি কি কর্মসংস্থান, নেতৃত্ব এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতায় রূপান্তরিত হচ্ছে?
অর্থাৎ access-এর লড়াই শেষ হয়নি, কিন্তু access দিয়ে আর সাফল্যের পুরো গল্প বলা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের পরবর্তী শিক্ষা সংস্কারের ভাষা হতে হবে access থেকে learning, equality থেকে equity এবং schooling থেকে capability-র দিকে যাত্রার ভাষা।
এখন একটি শহুরে উচ্চবিত্ত ছেলে, একটি শহুরে দরিদ্র মেয়ে, একটি গ্রামীণ দরিদ্র ছেলে এবং একটি প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র প্রতিবন্ধী মেয়েকে পাশাপাশি দাঁড় করানো যাক।
প্রথম শিশুটির ঘরে বই, ডিভাইস, ইন্টারনেট, কোচিং এবং পেশাগত নেটওয়ার্ক আছে। দ্বিতীয় শিশুটি শহরের সুযোগ চোখের সামনে দেখতে পায়, কিন্তু পরিবারের আয় তাকে সব দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে দেয় না। তৃতীয় শিশুটির সামনে কৈশোরেই শ্রমবাজারের ডাক আসে। চতুর্থ শিশুটির ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো থেকে শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণ, accessible learning materials পাওয়া, নিরাপদ যাতায়াত এবং reasonable accommodation—প্রতিটি ধাপই আলাদা সংগ্রাম হতে পারে।
চারজনই বাংলাদেশের নাগরিক। চারজনই একই সংবিধানের অধিকারভুক্ত। চারজনেরই শিক্ষার অধিকার সমান। কিন্তু তাদের educational starting line এক নয়।
এই বাস্তবতাকে একটি সরল সমীকরণে ধারণা করা যেতে পারে—Educational Opportunity = Geography × Gender × Wealth × Disability × Family Education × Digital Access × School Quality। একটি উপাদান শিশুর বিরুদ্ধে গেলে সে পিছিয়ে পড়ে; একাধিক উপাদান একসঙ্গে প্রতিকূল হলে বঞ্চনা শুধু যোগ হয় না, অনেক সময় একে অন্যকে বহুগুণে তীব্র করে।
এটাই intersectional educational inequality। “গ্রামের শিশু”, “মেয়েশিশু”, “দরিদ্র শিশু” কিংবা “প্রতিবন্ধী শিশু”—কোনো একক পরিচয় দিয়ে তাই একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের বাস্তবতা সম্পূর্ণ বোঝা যায় না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি গিয়ে দাঁড়ায় spatial justice-এ। একটি শিশু কোথায় জন্মাবে, সেটি সে নির্বাচন করে না। তাহলে সেই অনির্বাচিত জন্মস্থান কেন তার শিক্ষার মান এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নির্ধারণ করবে?
উচ্চমানের বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষায়িত হাসপাতাল, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, career counselling, প্রযুক্তি ecosystem এবং professional network যদি প্রধানত বড় শহরে কেন্দ্রীভূত থাকে, তাহলে শহরে জন্ম নেওয়া বা বসবাস করাটিই একটি educational resource হয়ে দাঁড়ায়। এটাই Geography of Opportunity—সুযোগেরও একটি ভূগোল আছে।
ফলে গ্রাম–শহর বৈষম্য শুধু school inequality নয়; এটি opportunity-এর spatial distribution-এর বৈষম্য। একই পাঠ্যক্রম এবং একই পরীক্ষা formal equality তৈরি করতে পারে, কিন্তু starting point, learning resources এবং সেই resources-কে capability-তে রূপান্তরের সুযোগ অসম থাকলে substantive educational equality তৈরি হয় না। মূল নথির কেন্দ্রীয় তাত্ত্বিক assertion-ও এই কাঠামোগত ও আন্তঃপ্রজন্মগত বৈষম্যকেই নির্দেশ করে।
একটি প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুর পরীক্ষার ফল কম হওয়ার অর্থ তার সম্ভাবনা কম—এমন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের শিক্ষাবৈষম্য বোঝার সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হতে পারে।
নম্বর দেখার আগে জানতে হবে, সে কেমন শিক্ষক পেয়েছে, তার স্কুলে বিজ্ঞানাগার ছিল কি না, বাড়িতে পড়ার জায়গা ছিল কি না, কতটা বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট পেয়েছে, স্কুলের পর তাকে কাজ করতে হয়েছে কি না, পরিবারে কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে কি না, উচ্চশিক্ষার পথটি তাকে কেউ দেখিয়েছে কি না। প্রতিবন্ধিতা থাকলে জানতে হবে প্রয়োজনীয় assistive support এবং reasonable accommodation সে পেয়েছে কি না। অর্থাৎ পরীক্ষার ফলের আগে পড়তে হবে শিশুটির opportunity history—তার সুযোগের ইতিহাস। এই প্রশ্নগুলোকেই মূল বিশ্লেষণটি ফলাফল ব্যাখ্যার পূর্বশর্ত হিসেবে সামনে এনেছে।
তখন শিক্ষা সংস্কারের ভাষাটিও বদলে যায়। Equality বলবে, সবার জন্য বিদ্যালয় ও মৌলিক সম্পদ নিশ্চিত করো। Equity বলবে, যার বাধা বেশি তাকে বেশি সহায়তা দাও। Justice আরও কঠিন প্রশ্ন করবে—কেন একই ধরনের শিশু বারবার একই বাধার সামনে পড়ছে এবং সেই বাধা তৈরির কাঠামোটি আমরা বদলাচ্ছি কি না?
বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক অঙ্গীকার তাই হতে পারে—কোনো শিশুর জন্মস্থান তার শিক্ষাগত নিয়তি হতে পারে না।
ঢাকার একটি শিশুর যদি বিজ্ঞানী, গবেষক, চিকিৎসক, শিক্ষক, শিল্পী কিংবা প্রযুক্তিবিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখার অধিকার থাকে, তাহলে চর, হাওর, পাহাড়, উপকূল কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুটির স্বপ্নের মূল্যও ঠিক একই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবাই একই starting line-এ দাঁড়িয়ে আছে বলে ঘোষণা করা নয়; রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই starting line-এর অন্যায্য দূরত্ব কমিয়ে আনা। মূল লেখার সমাপনী প্রতিফলনও এই নৈতিক অবস্থানেই এসে পৌঁছায়।
কারণ শিক্ষা শেষ পর্যন্ত শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, দশ বছর শ্রেণিকক্ষে বসা, পরীক্ষা দেওয়া কিংবা একটি সনদ হাতে নেওয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়। শিক্ষা তখনই তার সামাজিক অর্থ পূর্ণ করে, যখন একটি শিশুর জন্মস্থান, পরিবারের আয়, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের অদৃশ্য দেয়াল ভেদ করে তাকে নিজের সম্ভাবনা অনুযায়ী জীবন নির্মাণের বাস্তব স্বাধীনতা দেয়।
সেখানেই শিক্ষা শুধু মানবসম্পদ তৈরির প্রকল্প থাকে না। শিক্ষা হয়ে ওঠে সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক সক্ষমতা, মর্যাদা এবং substantive freedom-এর রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার।
বাংলাদেশ এখন শিক্ষার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম প্রজন্মের লড়াই ছিল—“সব শিশুকে বিদ্যালয়ে আনতে হবে। ” —বাংলাদেশ সেই যুদ্ধে অনেক দূর এগিয়েছে।
দ্বিতীয় প্রজন্মের লড়াই হচ্ছে— “সব শিশুকে সমান মানের শেখার সুযোগ দিতে হবে। ” এই যুদ্ধ অনেক কঠিন। কারণ বিদ্যালয় তৈরি করা যায়। বই বিতরণ করা যায়। ভর্তি বাড়ানো যায়। কিন্তু সমাজে বহু বছর ধরে তৈরি হওয়া শ্রেণি, অঞ্চল, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা ও সুযোগের অসমতা দূর করা শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একার কাজ নয়। এটি রাষ্ট্রের সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রকল্প।
একটি শিশু কোন জেলায় জন্মেছে, তার বাবা কত টাকা আয় করেন, তার মা কতদূর পড়েছেন, সে ছেলে না মেয়ে, তার কোনো প্রতিবন্ধিতা আছে কি না—এসব তার শিক্ষাগত সম্ভাবনার সীমা নির্ধারণ করা উচিত নয়। একটি ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করবে সেই শিশুর পেছনে, যার বাধা সবচেয়ে বেশি। সুতরাং ভবিষ্যতের শিক্ষা সংস্কারের মূলনীতি হওয়া উচিত—
কারণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু ঢাকার একটি নামী বিদ্যালয়ের মেধাবী শিশুর হাতে নয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ একই সঙ্গে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের শিশুর হাতে, সুনামগঞ্জের হাওরের শিশুর হাতে, পার্বত্য এলাকার শিশুর হাতে, শহরের বস্তির শিশুর হাতে, শ্রমে ঢুকে পড়া কিশোরের হাতে, বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা কিশোরীর হাতে এবং বিদ্যালয়ের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে না-পারা প্রতিবন্ধী শিশুটির হাতেও।—তাদের কাউকে পেছনে রেখে বাংলাদেশের শিক্ষা এগিয়েছে বলা যাবে না।
শিক্ষার পরবর্তী বিপ্লব তাই enrollment-এর বিপ্লব নয়—equity-এর বিপ্লব। যেদিন একটি শিশুর পোস্টকোড, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধিতা কিংবা পরিবারের ব্যাংক ব্যালান্স তার শিক্ষার মান নির্ধারণ করবে না, সেদিনই আমরা বলতে পারব—বাংলাদেশে শুধু শিক্ষার প্রসার ঘটেনি; শিক্ষায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#বাংলাদেশেরশিক্ষা #শিক্ষাবৈষম্য #শিক্ষাসংস্কার #গ্রামশহরবৈষম্য #শিক্ষায়সমতা #শিক্ষায়ন্যায্যতা #শিক্ষায়সামাজিকন্যায় #মানসম্মতশিক্ষা #অন্তর্ভুক্তিমূলকশিক্ষা #লিঙ্গবৈষম্য #ছেলেদেরঝরেপড়া #মেয়েদেরশিক্ষা #শিশুশ্রম #দারিদ্র্যওশিক্ষা #শেখারসংকট #ডিজিটালবৈষম্য #প্রতিবন্ধীশিক্ষার্থী #শিক্ষারঅধিকার #সুযোগেরবৈষম্য #শিক্ষানীতি #এসডিজি৪ #অধিকারপত্র #শিক্ষাসংস্কারধারাবাহিক #EducationInequality #EducationalInequality #BangladeshEducation #EducationInBangladesh #RuralUrbanDivide #RuralUrbanInequality #EducationEquity #EducationEquality #EducationalJustice #SocialJustice #InclusiveEducation #QualityEducation #GenderEquality #GenderGap #BoysDropout #GirlsEducation #ChildLabour #PovertyAndEducation #LearningCrisis #FoundationalLearning #DigitalDivide #DigitalEducation #DisabilityInclusion #RightToEducation #EqualOpportunity #OpportunityGap #Intersectionality #EducationalOpportunity #EducationPolicy #EducationReform #SDG4 #LeaveNoOneBehind #HumanCapability #SocialMobility #OdhikarPatra