09/02/2026 বিশেষ অনুসন্ধানী সংবাদ স্টোরি│তিন অধ্যাপকের সাময়িক বরখাস্ত: তদন্তের ভেতরে আরেক তদন্ত
Odhikarpatra News Desk
১ September ২০২৬ ২৩:৪৭
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নয়। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলন—দেশের বহু রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বাঁকবদলের সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভূমিকা জড়িয়ে আছে। সেই প্রতিষ্ঠানের তিনজন অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ‘জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান’-সংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তিতে সাময়িক বরখাস্ত এবং ট্রাইব্যুনাল গঠনের ঘটনা এখন তাই নিছক একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ঘটনাটি সামনে নিয়ে এসেছে আরও বড় কয়েকটি প্রশ্ন—বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সীমা কোথায়? তদন্তে অভিযুক্ত শিক্ষকের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কতটা নিশ্চিত হয়েছিল? রাজনৈতিক মত, ব্যক্তিগত অবস্থান ও পেশাগত অসদাচরণের মধ্যে সীমারেখা কোথায়? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—ন্যায়বিচার শুধু করা হয়েছে কি না, নাকি সেটি যে ন্যায়সংগতভাবে করা হয়েছে, সেটিও দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন?
১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ‘বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’-এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবাদপত্র এসব প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। সংগঠনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এম. অহিদুজ্জামান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটুকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠনের ঘটনায় ‘গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও মর্মাহত’ হওয়ার কথা জানিয়েছে। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক ও একাডেমিক পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে। কিন্তু অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন শুধু কে বরখাস্ত হয়েছেন—তা নয়। বরং কী প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্তটি এসেছে, সেটিই এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবাদপত্রে তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার পেছনে ‘জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থানের অভিযোগ’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংযুক্ত নথিটিতে তাঁদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল অভিযোগপত্র, তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন, সিন্ডিকেটের কার্যবিবরণী, সংশ্লিষ্ট বিধি বা ট্রাইব্যুনাল গঠনের আদেশ সংযুক্ত নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের করিডরে একটি সিদ্ধান্ত কখনো কেবল একটি ফাইলের পাতায় আটকে থাকে না। সেই সিদ্ধান্ত ছড়িয়ে পড়ে শ্রেণিকক্ষে, গবেষণাগারে, শিক্ষকদের কক্ষে, শিক্ষার্থীদের আড্ডায়—শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক আবহেও। তিন অধ্যাপককে সাময়িক বরখাস্ত এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গঠনের সাম্প্রতিক ঘটনা তেমনই একটি সিদ্ধান্ত। অভিযোগের ভাষ্যে আছে ‘জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান’; প্রতিবাদকারী শিক্ষক সংগঠনের ভাষ্যে আছে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া, তদন্তপ্রক্রিয়ার ঘাটতি এবং রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের আশঙ্কা। দুই ভাষ্যের মাঝখানে পড়ে আছে অনেকগুলো অদেখা নথি, অনুত্তরিত প্রশ্ন এবং তিনজন শিক্ষকের পেশাগত মর্যাদা।
ঘটনাটি তাই শুধু অধ্যাপক ড. এম. অহিদুজ্জামান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটুর ব্যক্তিগত সংকট নয়। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতা, রাজনৈতিক মত প্রকাশের পরিসর, তদন্তের নিরপেক্ষতা এবং ন্যায়বিচারের দৃশ্যমানতা—সবকিছুর একটি সম্মিলিত পরীক্ষা। অভিযোগ সত্য কি না, সেই রায় দেওয়া সংবাদপত্রের কাজ নয়। কিন্তু অভিযোগ থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পথটি আইন, বিধি ও ন্যায্যতার মানদণ্ডে নির্মিত কি না—সেটি পরীক্ষা করা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার দায়িত্ব।
এই প্রতিবেদনের ভিত্তি ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ‘বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’-এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে প্রকাশিত প্রতিবাদপত্র এবং সংযুক্ত লেখায় উত্থাপিত আইনগত ও প্রক্রিয়াগত প্রশ্ন। তবে কিছু সীমাবদ্ধতার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও টানা হয়নি।
প্রতিবাদপত্রে তিন অধ্যাপকের সাময়িক বরখাস্ত ও ট্রাইব্যুনাল গঠনের ঘটনায় ‘গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও মর্মাহত’ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংগঠনটির মূল আপত্তি শুধু সিদ্ধান্তে নয়, সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায়। তাদের দাবি, অধ্যাপক অহিদুজ্জামান লিখিতভাবে বারবার আবেদন করেও প্রয়োজনীয় জেরা বা প্রশ্ন করার সুযোগ পাননি; তদন্ত কমিটিতে অভিযুক্তের প্রতিনিধি থাকার কথা থাকলেও তাঁর ভূমিকা কার্যকর হয়নি; এমনকি সেই প্রতিনিধির স্বাক্ষর ছাড়াই প্রতিবেদন সিন্ডিকেটে উপস্থাপিত হয়েছে। সংগঠনটি আরও বলেছে, তথ্য-উপাত্ত দিয়ে অভিযোগ খণ্ডনের পরও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই দাবিগুলো সত্য হলে তা গুরুতর। কিন্তু অনুসন্ধানের প্রথম নিয়ম হলো দাবির শক্তি যত বেশি, যাচাইয়ের প্রয়োজনও তত বেশি। প্রতিনিধির স্বাক্ষর সত্যিই অনুপস্থিত কি না, অনুপস্থিত থাকলে কেন; জেরার বিধিগত সুযোগ ছিল কি না; আবেদনগুলো কার কাছে, কবে এবং কী ভাষায় করা হয়েছিল; কমিটি কী সিদ্ধান্ত দিয়েছিল—এসবের উত্তর সংশ্লিষ্ট চিঠি, সভার কার্যবিবরণী ও তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া পাওয়া সম্ভব নয়। একইভাবে ‘তথ্য-উপাত্ত দিয়ে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণ’ করার দাবিও তখনই মূল্যায়নযোগ্য, যখন অভিযুক্তের জমা দেওয়া প্রমাণ এবং কমিটির তার ওপর দেওয়া যুক্তিসঙ্গত মূল্যায়ন পাশাপাশি দেখা যাবে।
এখানে আরেকটি সতর্কতা জরুরি। তিনজনের নাম একই প্রশাসনিক ঘটনায় উচ্চারিত হলেও তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, প্রমাণ, ভূমিকা ও আত্মপক্ষ সমর্থন এক নাও হতে পারে। ন্যায়বিচারের মৌলিক দাবি হলো প্রত্যেক মামলাকে আলাদা করে দেখা। একজনের বিরুদ্ধে ওঠা প্রক্রিয়াগত অভিযোগ দিয়ে অন্য দুজনের মামলা বিচার করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়ায় তিনজনকে একই দায়ে বেঁধে দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
একটি শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়া শুরু হয় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিয়ে। সহজ ভাষায়, অভিযুক্তকে জানতে হবে—তিনি কী করেছেন, কখন করেছেন, কোথায় করেছেন, কোন প্রমাণে তা বলা হচ্ছে এবং কোন বিধির কোন অংশ তাঁর আচরণে লঙ্ঘিত হয়েছে। ‘একটি আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান’ রাজনৈতিক বর্ণনা হতে পারে; কিন্তু চাকরিবিধিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ প্রতিষ্ঠার জন্য এই সাধারণ বর্ণনা যথেষ্ট নয়। বক্তব্য, কাজ, দায়িত্বে ব্যর্থতা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট অসদাচরণকে স্পষ্টভাবে শনাক্ত করতে হবে।
এখানেই রাজনৈতিক মত এবং পেশাগত আচরণের সীমারেখা গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষক কোনো আন্দোলনের কৌশল, নেতৃত্ব, ফলাফল বা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সঙ্গে দ্বিমত করতে পারেন। আবার কোনো শিক্ষক তাঁর পদ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীকে ভয় দেখালে, সহিংসতায় অংশ নিলে, বৈষম্য করলে, তথ্য জাল করলে বা গুরুতর দায়িত্বভঙ্গ করলে বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত করতে পারে—বরং করা উচিত। প্রথমটি মতের ক্ষেত্র; দ্বিতীয়টি আচরণের ক্ষেত্র। দুটিকে এক করে ফেললে জনপ্রিয় মত বিশ্ববিদ্যালয়ের অলিখিত চাকরিবিধিতে পরিণত হয়।
এই মামলায় তাই প্রশাসনের কাছে কেন্দ্রীয় প্রশ্ন: অভিযোগ কি তিন শিক্ষকের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে, নাকি সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলাদা কোনো প্রমাণযোগ্য আচরণ নিয়ে? যদি আচরণ নিয়ে হয়, তবে সেটি কী এবং কোন আইনগত ভিত্তিতে শাস্তিযোগ্য? মূল অভিযোগপত্র প্রকাশ না হওয়ায় এই প্রশ্নের উত্তর এখনও জনসমক্ষে পরিষ্কার নয়। অস্পষ্ট অভিযোগ অভিযুক্তের প্রতিরক্ষাকে দুর্বল করে; একই সঙ্গে প্রশাসনের সিদ্ধান্তকেও রাজনৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ বাড়ায়।
প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পুরোনো কিন্তু অমলিন নীতি—কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিকূল সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁর বক্তব্য অর্থপূর্ণভাবে শুনতে হবে। অর্থপূর্ণ শব্দটি এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়ে লিখিত জবাব গ্রহণ করলেই সব ক্ষেত্রে ন্যায্য শুনানি সম্পন্ন হয় না। অভিযুক্তকে অভিযোগ বুঝতে, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত প্রাসঙ্গিক প্রমাণ জানতে, উত্তর তৈরির যুক্তিসঙ্গত সময় পেতে এবং নিজের প্রমাণ উপস্থাপন করতে দিতে হয়। সাক্ষ্যনির্ভর বিরোধ হলে সাক্ষীর বক্তব্য প্রশ্ন বা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগও পরিস্থিতিভেদে অপরিহার্য হতে পারে।
প্রতিবাদী সংগঠনের ভাষ্য অনুযায়ী, অধ্যাপক অহিদুজ্জামান লিখিতভাবে একাধিকবার আবেদন করেও প্রশ্ন বা জেরার সুযোগ পাননি। এই অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য অন্তত চারটি নথি দরকার: তাঁর আবেদন, আবেদন গ্রহণের রেকর্ড, কমিটির সিদ্ধান্ত এবং প্রযোজ্য তদন্তবিধি। সুযোগ চাওয়া হয়েছিল কিন্তু কারণ না দেখিয়ে প্রত্যাখ্যান করা হলে প্রক্রিয়ার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন জোরালো হবে। আবার বিধি বা মামলার প্রকৃতি অনুযায়ী সরাসরি জেরা প্রযোজ্য না হলে প্রশাসনের সেই ব্যাখ্যাও প্রকাশ করা দরকার।
আত্মপক্ষ সমর্থনের আরেকটি দিক হলো প্রতিরক্ষা-প্রমাণের মূল্যায়ন। কোনো শিক্ষক শত পৃষ্ঠা নথি জমা দিলেন—এটিই তাঁকে নির্দোষ প্রমাণ করে না। তেমনি কমিটি নথি গ্রহণ করল—এটিও বিবেচনার প্রমাণ নয়। একটি যুক্তিনির্ভর প্রতিবেদনে দেখা যাবে: অভিযোগ কী, তার পক্ষে প্রমাণ কী, অভিযুক্ত কী উত্তর দিলেন, তাঁর প্রমাণ কেন গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা হলো, কোন বিধি প্রয়োগ করা হলো এবং সেখান থেকে সিদ্ধান্ত কীভাবে এলো। এই শৃঙ্খল ভেঙে গেলে সিদ্ধান্তটি কেবল কর্তৃপক্ষের ঘোষণা হয়ে দাঁড়ায়, বিচারসঙ্গত সিদ্ধান্ত নয়।
তদন্ত কমিটিতে অভিযুক্তের প্রতিনিধি থাকা মানে কেবল একটি অতিরিক্ত চেয়ার পূরণ করা নয়। প্রতিনিধির উপস্থিতি প্রক্রিয়ার ভারসাম্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পারে। কিন্তু প্রতিবাদপত্রে দাবি করা হয়েছে, অভিযুক্তের প্রতিনিধির স্বাক্ষর ছাড়াই প্রতিবেদন সিন্ডিকেটে গেছে। এই বক্তব্য জনমনে সন্দেহ তৈরি করলেও স্বাক্ষর না থাকার কারণ না জানলে আইনগত তাৎপর্য নির্ধারণ করা যায় না।
প্রতিনিধি কি সভায় উপস্থিত ছিলেন? তাঁকে খসড়া প্রতিবেদন দেখানো হয়েছিল? তিনি দ্বিমত পোষণ করে স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন? কোনো ভিন্নমত নোট জমা দিয়েছিলেন? নাকি তাঁর কাছে প্রতিবেদন পাঠানোই হয়নি? আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিতে সব সদস্যের স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক, নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠ মতেই প্রতিবেদন বৈধ—সেটিও দেখতে হবে। একই ‘স্বাক্ষর নেই’ বাক্যের ভেতরে সম্পূর্ণ ভিন্ন কয়েকটি বাস্তবতা থাকতে পারে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার: প্রতিনিধির আপত্তি থাকলে তা চেপে যাওয়া উচিত নয়। সুস্থ প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে ভিন্নমত নোট দুর্বলতা নয়; বরং সিদ্ধান্তগ্রহণের সততার নিদর্শন। সিন্ডিকেটের সদস্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের পাশাপাশি আপত্তির কারণ জানলে তবেই পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধির বক্তব্য এবং সম্ভাব্য ভিন্নমত নোট প্রকাশ এই বিতর্ক নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ।
‘সাময়িক বরখাস্ত’ শব্দটি শুনলে অনেকেই দোষ প্রমাণিত হয়েছে বলে ধরে নেন। আইনগতভাবে এই ধারণা ঠিক নয়। তদন্ত বা ট্রাইব্যুনালের কাজ নিরপেক্ষভাবে চালানো, নথি বা সাক্ষীর ওপর প্রভাব রোধ করা কিংবা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কাজ বজায় রাখার প্রয়োজনে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হতে পারে। এটি চূড়ান্ত চাকরিচ্যুতি নয়।
কিন্তু কাগজে প্রশাসনিক ব্যবস্থা বাস্তবে শাস্তিতে পরিণত হতে পারে। একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষ, গবেষণা, শিক্ষার্থী তত্ত্বাবধান, বিভাগীয় দায়িত্ব ও সহকর্মীদের কাছ থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকলে তাঁর পেশাগত সুনাম ক্ষয়ে যায়। ট্রাইব্যুনাল অনির্দিষ্টকাল চললে ‘সাময়িক’ শব্দটি অর্থ হারায়। অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত না হলেও হারানো সময়, বন্ধ হয়ে যাওয়া গবেষণা, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী ও সামাজিক অপবাদ সহজে ফেরত আসে না।
তাই সাময়িক বরখাস্তের বৈধতা শুধু ক্ষমতা আছে কি না দিয়ে বিচার করা যায় না; প্রয়োজনীয়তা, সামঞ্জস্য ও সময়সীমাও দেখতে হয়। এই তিন শিক্ষকের ক্ষেত্রে প্রশাসনকে জানাতে হবে—কেন কম ক্ষতিকর কোনো বিকল্প যথেষ্ট ছিল না, কতদিন ব্যবস্থা বলবৎ থাকবে, নিয়মিত পর্যালোচনা হবে কি না, বেতন-ভাতা ও গবেষণা-তত্ত্বাবধানের অবস্থা কী এবং ট্রাইব্যুনাল কত সময়ের মধ্যে শেষ হবে। অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে পেশাগত মর্যাদা পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থাও আগেই পরিষ্কার থাকা দরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি কাঠামো শিক্ষককে একদিকে রাজনৈতিক মত ধারণের পরিসর দেয়, অন্যদিকে অসদাচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও প্রতিষ্ঠানের হাতে রাখে। এই দুই নীতি পরস্পরবিরোধী নয়। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র বোঝার চাবিকাঠি এখানেই—মত থাকবে, মতবিরোধ থাকবে, কিন্তু পেশাগত দায়িত্বভঙ্গ হলে নিরপেক্ষ নিয়মে জবাবদিহিও থাকবে।
সংযুক্ত বিশ্লেষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর অনুচ্ছেদ ৩৮-এর বিশেষ তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে। অনুচ্ছেদটির সুনির্দিষ্ট প্রয়োগ মূল নথি ও বিধির আলোকে আইনজ্ঞদের যাচাইসাপেক্ষ; তবে এর মৌলিক দর্শন হলো, একজন শিক্ষক তাঁর রাজনৈতিক মতের কারণে পেশাগত ক্ষতির শিকার হবেন না, আবার নির্ধারিত অসদাচরণ প্রমাণিত হলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। ফলে প্রশাসনকে দেখাতে হবে, ব্যবস্থা মতের কারণে নয়—স্বতন্ত্র, সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণযোগ্য আচরণের কারণে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতার নীতি, ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয় ও আইনানুগ আচরণের সুরক্ষা এবং ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কাঠামো দেয়। এসব অধিকার সীমাহীন নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ও শৃঙ্খলা রক্ষার বৈধ স্বার্থ রাখে। কিন্তু কোনো সীমাবদ্ধতা হতে হবে আইনসম্মত, বৈধ উদ্দেশ্যনির্ভর এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত নয়। ‘প্রশাসন অপছন্দ করেছে’—এটি নিজে শাস্তির আইনগত ভিত্তি হতে পারে না।
এখানে ‘আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা’ এবং ‘ন্যায়সংগত ব্যবস্থা’ একই সূত্রে বাঁধা। কোনো কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা থাকলেই তার প্রতিটি প্রয়োগ ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না। ক্ষমতা কোন উদ্দেশ্যে, কোন প্রমাণে এবং কতটা সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োগ হলো—সেটিও পর্যালোচ্য।
১৯৯৭ সালের UNESCO Recommendation concerning the Status of Higher-Education Teaching Personnel উচ্চশিক্ষার শিক্ষকদের মর্যাদা, একাডেমিক স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্যাখ্যা করে। এটি আন্তর্জাতিক চুক্তির মতো সরাসরি বাধ্যতামূলক আদালত-প্রয়োগযোগ্য আইন নয়; কিন্তু রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। এর মূল বার্তা—শিক্ষককে গবেষণা, শিক্ষা, প্রকাশনা, প্রতিষ্ঠান ও সমাজ সম্পর্কে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে; অভিযোগ উঠলে ন্যায়সংগত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিচার করতে হবে।
একাডেমিক স্বাধীনতা ‘যা ইচ্ছা বলা’র লাইসেন্স নয়। তথ্য জাল করা, শিক্ষার্থীর প্রতি বৈষম্য, হয়রানি, দুর্নীতি, সহিংসতা বা পদমর্যাদার অপব্যবহার এর সুরক্ষা পায় না। স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ব জড়িত। কিন্তু দায়িত্ব নির্ধারণের ক্ষমতাও এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে না, যাতে রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় প্রশ্ন বা গবেষণা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ হয়ে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ সরকারি দপ্তরের মতো নয়। এখানে জ্ঞান জন্মায় প্রশ্ন থেকে; প্রশ্ন প্রায়ই ক্ষমতাবান, জনপ্রিয় বা প্রচলিত ধারণাকে অস্বস্তিতে ফেলে। শিক্ষক যদি প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদনের পর নিজের পুরোনো বক্তব্য নতুন ক্ষমতার মানদণ্ডে মাপতে বাধ্য হন, তাহলে গবেষণা ও শ্রেণিকক্ষে সততার জায়গা সংকুচিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের অর্থ তাই কেবল প্রশাসনিক স্বাধীনতা নয়; বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতাকে ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়ায় সুরক্ষা দেওয়াও।
একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রভাব তাঁর কক্ষের দরজায় থেমে থাকে না। তরুণ শিক্ষক দেখেন কোন বিষয়ে কথা বলা নিরাপদ, গবেষক ভাবেন কোন উপসংহার প্রকাশ করলে পদোন্নতি আটকে যেতে পারে, শিক্ষার্থীও শেখে জনপ্রিয় মতকে প্রশ্ন করার মূল্য কতটা। এই অদৃশ্য প্রভাবকে বলা হয় ‘চিলিং ইফেক্ট’—শাস্তির আশঙ্কায় মানুষ নিজেই নিজের কণ্ঠ রুদ্ধ করে।
চিলিং ইফেক্টের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এর জন্য আনুষ্ঠানিক সেন্সরশিপ লাগে না। কোনো বই নিষিদ্ধ করতে হয় না, কোনো নির্দেশনায় ‘চুপ থাকুন’ লিখতে হয় না। কয়েকটি অস্পষ্ট অভিযোগ, দীর্ঘ সাময়িক বরখাস্ত এবং অনির্দিষ্ট তদন্তই সহকর্মীদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে পারে—কিছু প্রশ্ন না করাই নিরাপদ। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি এভাবেই ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়।
তবে প্রতিটি শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থাকে মত দমন বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীত মেনে নেওয়াও ঠিক নয়। বিশ্বাসযোগ্য প্রক্রিয়াই এই দুই চরম অবস্থার মাঝখানে সেতু। অভিযোগ সুনির্দিষ্ট, প্রমাণ যাচাইযোগ্য, কমিটি নিরপেক্ষ, শুনানি অর্থপূর্ণ এবং সিদ্ধান্ত যুক্তিসংবলিত হলে প্রকৃত অসদাচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা একাডেমিক স্বাধীনতাকে দুর্বল করে না; বরং দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে শক্তিশালী করে।
অধ্যাপক অহিদুজ্জামানের ক্ষেত্রে প্রতিবাদপত্রে প্রক্রিয়াগত অভিযোগ তুলনামূলকভাবে বিস্তারিত: লিখিত আবেদন, প্রশ্ন বা জেরার সুযোগ এবং প্রতিনিধির স্বাক্ষর নিয়ে আপত্তি। এসব দাবির প্রতিটি নথি দিয়ে যাচাই করা সম্ভব। তাঁর জমা দেওয়া তথ্য-উপাত্ত কী ছিল এবং কমিটি কেন তা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করেছে—এটিও প্রকাশযোগ্য প্রশ্ন।
অধ্যাপক মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কাজ বা প্রমাণের পূর্ণ বিবরণ সংযুক্ত প্রতিবাদপত্রে পাওয়া যায় না। একইভাবে অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান লিটুর বিরুদ্ধেও কোন বক্তব্য, কাজ বা দায়িত্বভঙ্গকে অভিযোগের ভিত্তি করা হয়েছে, তা নথিটি স্পষ্ট করে না। এই তথ্যশূন্যতার মধ্যে তাঁদের দোষী বা নির্দোষ ঘোষণা করা সাংবাদিকতাসঙ্গত নয়। বরং প্রশাসনের প্রতি দাবি হওয়া উচিত ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও চলমান তদন্তের ন্যায্যতা রক্ষা করে যতটা সম্ভব অভিযোগের আইনগত ভিত্তি, প্রক্রিয়া ও সময়সীমা প্রকাশ করা।
একই ঘটনার ছাতার নিচে তিনজনকে আনলেও প্রত্যেকের অভিযোগপত্র আলাদা হওয়া উচিত; প্রমাণ, উত্তর, মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্তও পৃথক হওয়া প্রয়োজন। সম্মিলিত রাজনৈতিক তকমা ব্যক্তিগত দায় প্রমাণ করতে পারে না। আবার একজনের পক্ষে শক্তিশালী প্রক্রিয়াগত আপত্তি থাকলেই অন্য দুজন স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়মুক্ত হন না। ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিচারই ন্যায্যতার প্রথম শর্ত।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে শুধু অভিযুক্তের অধিকারের দিক থেকে দেখলে চিত্র অসম্পূর্ণ থাকবে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; গুরুতর দায়িত্বভঙ্গ, ভয়ভীতি, দুর্নীতি বা সহিংসতার অভিযোগ তদন্ত করা; এবং একাডেমিক কার্যক্রম সচল রাখা প্রশাসনের বৈধ দায়িত্ব। কোনো অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বলেই তদন্ত বন্ধ রাখা উচিত নয়। বরং প্রমাণযোগ্য অপরাধ হলে নিষ্ক্রিয়তা নিজেই প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
কিন্তু রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত ঘটনায় প্রশাসনের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কমিটির সদস্যদের স্বার্থের সংঘাত আছে কি না, তদন্তকারীরা পূর্বেই প্রকাশ্যে মত দিয়েছেন কি না, অভিযুক্ত ও অভিযোগকারী উভয়ের প্রমাণ একই মানদণ্ডে যাচাই হয়েছে কি না এবং সিন্ডিকেট পূর্ণ নথি দেখেছে কি না—এসব নিশ্চিত করতে হয়। কারণ পক্ষপাতের বাস্তব উপস্থিতির পাশাপাশি পক্ষপাতের যৌক্তিক আশঙ্কাও প্রতিষ্ঠানের আস্থা নষ্ট করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রক্ষা মানে সমালোচনা ঠেকানো নয়। বরং এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া, যা বিরোধী পক্ষও নথি দেখে বুঝতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরিষ্কার যুক্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে; অভিযোগ প্রমাণিত না হলে একই দৃঢ়তায় অব্যাহতি ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠান জেতে, যদি প্রক্রিয়া বিশ্বাসযোগ্য হয়।
এই ঘটনার পূর্ণ চিত্র পেতে প্রয়োজন তিন শিক্ষকের পৃথক অভিযোগপত্র ও কারণ দর্শানোর নোটিশ; তাঁদের লিখিত জবাব; তদন্ত কমিটি গঠনের আদেশ ও কার্যপরিধি; প্রাসঙ্গিক সভার কার্যবিবরণী; অভিযোগের পক্ষে ব্যবহৃত নথি, ডিজিটাল উপাদান ও সাক্ষ্য; প্রতিরক্ষা-প্রমাণ; অধ্যাপক অহিদুজ্জামানের কথিত আবেদনগুলো; অভিযুক্তপক্ষের প্রতিনিধির বক্তব্য ও সম্ভাব্য ভিন্নমত নোট; তদন্ত প্রতিবেদন; সিন্ডিকেটের প্রাসঙ্গিক সিদ্ধান্ত; সাময়িক বরখাস্তের আদেশ; ট্রাইব্যুনাল গঠনের আদেশ; এবং ট্রাইব্যুনালে শিক্ষক মনোনীত প্রতিনিধির সুযোগসংক্রান্ত চিঠিপত্র।
এসব নথির সবটুকু জনসমক্ষে দেওয়া সব সময় সম্ভব নাও হতে পারে—ব্যক্তিগত তথ্য, সাক্ষীর নিরাপত্তা কিংবা চলমান প্রক্রিয়ার অখণ্ডতা রক্ষার প্রশ্ন আছে। কিন্তু অন্তত অভিযোগের সারাংশ, প্রযোজ্য বিধি, প্রক্রিয়ার ধাপ, সময়সীমা এবং সিদ্ধান্তের যুক্তি প্রকাশ করা যায়। প্রয়োজন হলে সংবেদনশীল অংশ আড়াল করে নথির সম্পাদিত সংস্করণও দেওয়া সম্ভব। গোপনীয়তা যেন অস্বচ্ছতার অজুহাত না হয়, আবার স্বচ্ছতা যেন বিচারের ক্ষতি না করে—এই ভারসাম্যই জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া প্রতিবেদনটি স্বভাবতই অসম্পূর্ণ। প্রশাসনের কাছে জানতে হবে: প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী; কোন প্রমাণে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ টেকসই মনে হয়েছে; কোন বিধির কোন ভিত্তি প্রয়োগ করা হয়েছে; রাজনৈতিক মত ও কথিত অসদাচরণ কীভাবে আলাদা করা হয়েছে; প্রমাণ দেখার ও চ্যালেঞ্জ করার কী সুযোগ দেওয়া হয়েছে; প্রতিনিধির স্বাক্ষর না থাকার অভিযোগ সত্য কি না; সাময়িক বরখাস্ত কেন প্রয়োজনীয়; এবং পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার নির্ধারিত সময়সীমা আছে কি না।
রাজনীতি বদলায়; বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায়বিচারের মানদণ্ড বদলানো উচিত নয়। আজ যে মত জনপ্রিয়, কাল তা অস্বস্তিকর হতে পারে। আজ যে আন্দোলনের সমালোচনা অপরাধ বলে মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেই আন্দোলনের সমর্থনই অন্য ক্ষমতার কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা যদি শৃঙ্খলার মানদণ্ড হয়, তবে প্রতিটি ক্ষমতার পালাবদলের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে মতাদর্শিক শুদ্ধি অভিযানের পথ খুলে যায়।
এই কারণেই নিয়ম, প্রমাণ ও যথাযথ প্রক্রিয়া কেবল বর্তমান অভিযুক্তকে রক্ষা করে না; ভবিষ্যতের প্রশাসনকেও সীমাবদ্ধ করে। আজ যে শিক্ষক রাজনৈতিকভাবে অপছন্দনীয়, তাঁকে ন্যায়বিচার দেওয়া মানে তাঁর মতকে সমর্থন করা নয়। এর অর্থ হলো প্রতিষ্ঠান নিজের নীতিকে সাময়িক জনমত ও ক্ষমতার ঊর্ধ্বে রাখতে পেরেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস আন্দোলন ও প্রতিরোধে সমৃদ্ধ। কিন্তু ইতিহাসের নৈতিক বিচার আর চাকরিবিধির বিচার এক নয়। ইতিহাস কোনো বক্তব্যকে ভুল, অদূরদর্শী বা অজনপ্রিয় বলতে পারে; প্রশাসনিক শাস্তির জন্য তবু নির্দিষ্ট বিধিভঙ্গ ও প্রমাণ প্রয়োজন। এই পার্থক্য মুছে গেলে ইতিহাসের নামে বর্তমান ক্ষমতাই বিচারকের আসনে বসে।
এই বিতর্ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কেবল সুনামের সংকট নয়; শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থাকে আধুনিক ও বিশ্বাসযোগ্য করার সুযোগও। বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে অভিযোগের ন্যূনতম সুনির্দিষ্টতা নির্ধারণ করে প্রকাশ্য প্রোটোকল করতে পারে; তদন্ত কমিটির সদস্যদের স্বার্থের সংঘাত ঘোষণার বিধান বাধ্যতামূলক করতে পারে; অভিযুক্তকে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ দেওয়ার নিয়ম স্পষ্ট করতে পারে; প্রতিনিধিত্ব ও প্রশ্ন করার অধিকার কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রয়োগ হবে তা নির্ধারণ করতে পারে।
প্রতিটি তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ থেকে সিদ্ধান্ত পর্যন্ত যুক্তির ধাপ দেখানো, ভিন্নমত নোট সংযুক্ত রাখা, সাময়িক বরখাস্ত নিয়মিত পর্যালোচনা করা এবং ট্রাইব্যুনালের সর্বোচ্চ সময়সীমা নির্ধারণও জরুরি। দীর্ঘসূত্রতা যেন শাস্তির বিকল্প না হয়। অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়া ব্যক্তির পেশাগত পুনর্বাসন, গবেষণা ও শিক্ষার্থী তত্ত্বাবধান পুনর্বহাল এবং সুনাম পুনরুদ্ধারেরও লিখিত নীতি থাকা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় সংস্কার হতে পারে রাজনৈতিক মত ও পেশাগত অসদাচরণের মধ্যে একটি স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্রাচীর। মত যত অজনপ্রিয়ই হোক, কেবল মতের জন্য শাস্তি নয়; আবার মতের আড়ালে প্রমাণিত দায়িত্বভঙ্গের দায়মুক্তিও নয়। এই দ্বৈত অঙ্গীকারই স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি।
কোনো তদন্ত কমিটি গঠন হলেই তদন্ত নিরপেক্ষ হয়ে যায় না। কমিটি কারা বেছে নিলেন, সদস্যদের সঙ্গে অভিযোগকারী বা অভিযুক্তের প্রত্যক্ষ বিরোধ আছে কি না, তাঁরা ঘটনার বিষয়ে আগে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন কি না এবং তাঁদের কাজের পরিধি কতটা স্পষ্ট—এসবও পরীক্ষা করতে হয়। কমিটি যদি শুরুতেই একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তকে সত্য ধরে নিয়ে শুধু তার সমর্থনে উপাদান সংগ্রহ করে, তাহলে সেটি সত্য অনুসন্ধান নয়; পূর্বধারণা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া।
বিশ্বাসযোগ্য তদন্তে অভিযোগের পক্ষে ও বিপক্ষে উভয় ধরনের উপাদান খোঁজা হয়। সাক্ষীর বক্তব্য পরস্পরবিরোধী হলে কেন একজনকে বিশ্বাস করা হলো এবং অন্যজনকে নয়, তার কারণ লিখতে হয়। কোনো ফেসবুক পোস্ট, ভিডিও, অডিও বা বার্তার স্ক্রিনশট ব্যবহার করা হলে সেটি সম্পাদিত কি না, উৎস ও সময় নির্ভরযোগ্য কি না, বক্তব্যের আগের-পেছনের প্রসঙ্গ কী—এসব যাচাই জরুরি। ডিজিটাল যুগে একটি কাটা ভিডিও বা অসম্পূর্ণ স্ক্রিনশট মুহূর্তে জনমত তৈরি করতে পারে; প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মানদণ্ড অবশ্যই তার চেয়ে কঠোর হওয়া উচিত।
একইভাবে সভার উপস্থিতি নিজে সব সময় সভার প্রতিটি বক্তব্যের সমর্থন প্রমাণ করে না; কোনো তালিকায় নাম থাকা অংশগ্রহণও প্রমাণ নাও করতে পারে। আবার ব্যক্তি পরে অস্বীকার করলেই প্রামাণ্য রেকর্ড মুছে যায় না। তাই প্রমাণের ধরন, নির্ভরযোগ্যতা ও প্রসঙ্গ আলাদা করে মূল্যায়ন করতে হবে। অনুমান থেকে অভিযোগ এবং অভিযোগ থেকে দোষ—এই দুই লাফই ন্যায়বিচারের জন্য বিপজ্জনক।
তদন্তের আরেকটি মাপকাঠি হলো একই ধরনের ঘটনায় একই মানদণ্ড। একই আচরণের জন্য একজনকে শাস্তির মুখে ফেলা হলেও রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ আরেকজনকে উপেক্ষা করা হলে সমতার প্রশ্ন ওঠে। প্রশাসনকে তাই শুধু এই তিন মামলার ভেতরে নয়, আগের তুলনীয় মামলার সঙ্গে নিজের সিদ্ধান্তের সামঞ্জস্যও দেখাতে হবে। ভিন্ন সিদ্ধান্ত হলে কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। ন্যায়বিচার নির্বাচিত হলে তা আর ন্যায়বিচার থাকে না।
তদন্ত কমিটি সাধারণত তথ্য সংগ্রহ ও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত দেয়; চূড়ান্ত প্রশাসনিক দায় অন্য কর্তৃপক্ষের ওপর থাকতে পারে। ফলে ‘কমিটি বলেছে’ বলে সিন্ডিকেটের দায়িত্ব শেষ হয় না। সিন্ডিকেটকে দেখতে হবে অভিযোগ সুনির্দিষ্ট ছিল কি না, কমিটি নিজের কার্যপরিধির মধ্যে ছিল কি না, অভিযুক্তের জবাব সত্যিকার অর্থে বিবেচিত হয়েছে কি না এবং সুপারিশের সঙ্গে প্রমাণের সম্পর্ক আছে কি না। তদন্ত প্রতিবেদন দুর্বল হলে তা ফেরত পাঠানো, অতিরিক্ত অনুসন্ধান চাওয়া বা প্রক্রিয়াগত ত্রুটি সংশোধনের ক্ষমতা থাকলে সেটি প্রয়োগ করাই বিচক্ষণতা।
ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরও একই নীতি প্রযোজ্য। ট্রাইব্যুনাল যেন আগের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের আনুষ্ঠানিক মঞ্চ না হয়; তাকে স্বাধীনভাবে অভিযোগ, প্রমাণ ও প্রতিরক্ষা শুনতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষক নিজের মনোনীত প্রতিনিধি দেওয়ার সুযোগ পান কি না, শুনানির তারিখ ও নথি সময়মতো পান কি না, আইনজীবী বা সহায়তাকারীর সুযোগ কী এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বা পুনর্বিবেচনার পথ কোথায়—এসব পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিচার আদালত নয়, কিন্তু তার ফল অনেক সময় আদালতের রায়ের মতোই জীবন বদলে দেয়। পদ, আয়, গবেষণা, পদোন্নতি, সামাজিক সম্মান এবং শিক্ষার্থীর সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক—সবকিছু প্রভাবিত হতে পারে। তাই প্রমাণের মান ফৌজদারি মামলার সমান না হলেও সিদ্ধান্ত যেন জল্পনা বা জনচাপের ওপর না দাঁড়ায়। অভিযোগ যত গুরুতর এবং সম্ভাব্য ক্ষতি যত বড়, প্রক্রিয়াগত সুরক্ষাও তত শক্তিশালী হওয়া উচিত।
সিন্ডিকেটের কার্যবিবরণীতে অন্তত বোঝা প্রয়োজন সদস্যরা কী নথি পেয়েছিলেন, প্রক্রিয়াগত আপত্তি তাঁদের জানানো হয়েছিল কি না এবং সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত না সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। সংবেদনশীল তথ্য বাদ দিয়েও সিদ্ধান্তের যুক্তিসার প্রকাশ করা যায়। এতে ট্রাইব্যুনাল প্রভাবিত না করে জনআস্থা রক্ষা সম্ভব।
একজন অধ্যাপক সাময়িকভাবে দায়িত্বের বাইরে গেলে ক্ষতি কেবল তাঁর নয়। চলমান গবেষণা প্রকল্পে অর্থায়নের শর্ত, তথ্য সংগ্রহের অনুমতি ও সময়সীমা জড়িয়ে থাকে। এমফিল বা পিএইচডি গবেষকের তত্ত্বাবধায়ক বদলে গেলে গবেষণার তাত্ত্বিক দিক, পদ্ধতি ও ধারাবাহিকতা ব্যাহত হতে পারে। কোনো বিশেষায়িত কোর্সে বিকল্প শিক্ষক না থাকলে শিক্ষার্থীর পাঠ অসম্পূর্ণ থাকে। প্রশাসনিক আদেশে এসব ক্ষতির হিসাব প্রায়ই দৃশ্যমান হয় না।
তাই সাময়িক বরখাস্তের আদেশের সঙ্গে একটি একাডেমিক ধারাবাহিকতা পরিকল্পনা থাকা দরকার। কোন শিক্ষক কোন কোর্স নেবেন, গবেষকরা কাকে যোগাযোগ করবেন, যৌথ প্রকাশনা বা প্রকল্পের দায়িত্ব কীভাবে চলবে এবং অভিযুক্ত শিক্ষক নির্দোষ প্রমাণিত হলে পূর্বের তত্ত্বাবধান পুনর্বহাল করা সম্ভব কি না—এসব আগেই নির্ধারণ করলে শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তার শিকার হন না। বিকল্প ব্যবস্থা যেন আবার সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের গবেষণাগত অবদান মুছে ফেলার উপায় না হয়, সেদিকেও সতর্কতা দরকার।
সুনামের ক্ষতিও বাস্তব। ‘সাময়িক বরখাস্ত’ সংবাদ শিরোনাম হয়; কয়েক মাস বা বছর পরে অব্যাহতির খবর অনেক কম মানুষ দেখে। ফলে তদন্ত চলাকালেই সামাজিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে তাই নিরপেক্ষ ভাষা ব্যবহার, অভিযোগ এখনও প্রমাণিত নয়—এ কথা স্পষ্ট করা এবং গোপনীয় নথি রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহার না হওয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে অভিযোগকারী বা সাক্ষীকেও প্রতিশোধ, অপমান কিংবা অনলাইন হামলা থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া একপক্ষের ঢাল নয়; সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার ব্যবস্থা। শিক্ষার্থী সাক্ষী থাকলে ক্ষমতার অসম সম্পর্ক বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে, আবার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগও নষ্ট করা যাবে না।
রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত ঘটনায় সংবাদমাধ্যমও বিচারের পরিবেশকে প্রভাবিত করে। ‘অভিযুক্ত’, ‘সাময়িক বরখাস্ত’ এবং ‘দোষী’—এই তিন শব্দ এক নয়। অভিযোগপত্র না দেখে অপরাধের নিশ্চিত বর্ণনা দেওয়া যেমন ক্ষতিকর, তেমনি প্রতিবাদপত্রের প্রতিটি বক্তব্যকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে প্রকাশ করাও ভুল। সংবাদে উৎস শনাক্ত করা, প্রতিপক্ষের বক্তব্য চাওয়া এবং কী নথি পাওয়া যায়নি তা পাঠককে জানানো—এগুলো শুধু পেশাগত শিষ্টাচার নয়, সত্যের সুরক্ষা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি ছবি, পুরোনো বক্তব্য বা রাজনৈতিক পরিচয় মিলিয়ে দ্রুত একটি গল্প তৈরি হয়। সেই গল্প আবেগে শক্তিশালী হলেও প্রমাণে দুর্বল হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জনচাপকে উপেক্ষা করতে পারবে না, কিন্তু জনচাপকে প্রমাণের বিকল্পও করতে পারবে না। ‘সবাই জানে’ কোনো প্রশাসনিক finding নয়; একইভাবে ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ বলাও নথি ছাড়া পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়।
অভিযুক্ত শিক্ষকদেরও দায়িত্ব আছে তদন্ত নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় সাক্ষীকে হেয় না করা, গোপন নথি বিকৃতভাবে প্রকাশ না করা এবং নিজেদের সমর্থকদের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি না করা। শিক্ষক সংগঠন প্রতিবাদ করতে পারে, আইনি ও প্রক্রিয়াগত প্রশ্ন তুলতে পারে; কিন্তু তদন্তের ফল আগেই ঘোষণা করলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হয়। প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই সংযম জরুরি।
এই প্রতিবেদনের ভাষায় তাই অভিযোগকে অভিযোগ, দাবি কে দাবি এবং যাচাইকৃত নথিকে নথি হিসেবে আলাদা রাখা হয়েছে। পাঠকের আবেগ জাগানো কভার স্টোরির কাজ হতে পারে, কিন্তু সেই আবেগ যেন প্রমাণের ওপর ছায়া না ফেলে। আকর্ষণীয় ভাষা সত্যকে সহজবোধ্য করবে; সত্যের জায়গা নেবে না।
বিতর্ক নিরসনের বাস্তব পথ খুব জটিল নয়, যদি উভয় পক্ষ ন্যায্য প্রক্রিয়াকে লক্ষ্য মানে।
এ পথনকশা কোনো শিক্ষককে দায়মুক্তি দেয় না, প্রশাসনের ক্ষমতাও কেড়ে নেয় না। বরং প্রমাণিত অসদাচরণের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ় করে এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধের অভিযোগ থেকে প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেয়।
এই প্রক্রিয়া তদারকির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় নির্দিষ্ট বিরতিতে সংক্ষিপ্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে। সেখানে মামলার গোপন তথ্য নয়, বরং কতটি শুনানি হয়েছে, পরবর্তী ধাপ কী এবং নির্ধারিত সময়সীমা মানা হচ্ছে কি না—এ ধরনের প্রক্রিয়াগত তথ্য থাকবে। এতে গুজব কমবে এবং তদন্তাধীন ব্যক্তির মর্যাদাও অযথা ক্ষুণ্ন হবে না। একই সঙ্গে শিক্ষক সমিতি, সিনেট বা উপযুক্ত কোনো স্বাধীন একাডেমিক ফোরাম বিধিগত দুর্বলতা পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতের জন্য সুপারিশ দিতে পারে।
সবচেয়ে জরুরি হলো, নিয়ম যেন ঘটনার পরে ব্যক্তি অনুযায়ী তৈরি না হয়। আগে থেকে প্রকাশিত, সবার জন্য সমান এবং সহজ ভাষায় লেখা পদ্ধতি থাকলে অভিযুক্ত জানবেন তাঁর অধিকার কী, অভিযোগকারী জানবেন তাঁর সুরক্ষা কোথায়, আর প্রশাসনও জনচাপের মুহূর্তে স্থির মানদণ্ড অনুসরণ করতে পারবে। প্রতিষ্ঠান তখন ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নয়, নিয়মের শক্তির ওপর দাঁড়ায়।
তিন অধ্যাপকের বিরুদ্ধে অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হতে পারে; তাঁরা অব্যাহতিও পেতে পারেন। এই প্রতিবেদনের কাছে পূর্ণ নথি নেই, তাই কোনো রায় দেওয়ার সুযোগও নেই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে প্রশ্নটি এখন স্পষ্ট: এমন একটি প্রক্রিয়া কি তৈরি হয়েছে, যেখানে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয়েই জানেন—তাঁদের প্রমাণ সমান গুরুত্বে শোনা হবে, সিদ্ধান্তের কারণ লেখা থাকবে এবং রাজনৈতিক পরিচয় ফল নির্ধারণ করবে না?
ন্যায়বিচারের সবচেয়ে শক্তিশালী পরীক্ষা হলো অজনপ্রিয় ব্যক্তির বিচার। নিজের মতের মানুষের প্রতি সুবিচার করা সহজ; কঠোর বিরোধীর অধিকার রক্ষা করাই প্রতিষ্ঠানের চরিত্র প্রকাশ করে। একজন শিক্ষকের মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেও বলা সম্ভব হওয়া উচিত, তাঁর বিচার ন্যায়সংগত হয়েছে। সেই আস্থা প্রশাসনিক আদেশে জন্মায় না; জন্মায় উন্মুক্ত নথি, নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর আত্মপক্ষ সমর্থন এবং যুক্তিসংবলিত সিদ্ধান্তে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তাই তিনজন মানুষকে ঘিরে আরও বড় একটি ঐতিহাসিক পরীক্ষা। রাজনৈতিক পালাবদলের পরও কি তার ন্যায়বিচারের মানদণ্ড অপরিবর্তিত থাকবে? শৃঙ্খলার নামে মতকে শাস্তি দেওয়া হবে না, আবার একাডেমিক স্বাধীনতার নামে প্রমাণিত অসদাচরণও উপেক্ষিত হবে না—বিশ্ববিদ্যালয় কি এই ভারসাম্য দেখাতে পারবে?
এখন প্রয়োজন স্লোগানের চেয়ে নথি, অনুমানের চেয়ে প্রমাণ এবং প্রতিপক্ষ তৈরির চেয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা। প্রয়োজন অভিযুক্তদের পূর্ণ বক্তব্য এবং প্রশাসনের যুক্তি। সত্য যে পক্ষেই থাকুক, তাকে দৃশ্যমান হতে দিতে হবে। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে ন্যায়বিচারের শেষ প্রমাণ কোনো সিলমোহর নয়; শেষ প্রমাণ হলো—ভিন্নমতের মানুষটিও বিশ্বাস করতে পারেন, তাঁর কথা শোনা হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন অধ্যাপকের বিরুদ্ধে অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হতে পারে। আবার তাঁরা অভিযোগ থেকে অব্যাহতিও পেতে পারেন। এই প্রতিবেদনের কাজ সেই verdict দেওয়া নয়।
কিন্তু verdict-এ পৌঁছানোর পথ পরীক্ষা করা সাংবাদিকতার দায়িত্ব। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে justice-এর মূল্য শুধু outcome-এ নয়। Process-এও। কেননা একজন অভিযুক্ত শিক্ষককে শাস্তি দেওয়া সহজ। অপরদিকে, এটিও সত্যি যে, এমন একটি প্রক্রিয়া তৈরি করা কঠিন, যেখানে তাঁর সবচেয়ে কঠোর সমালোচকও শেষে বলতে বাধ্য হন—“আমি তাঁর মতের বিরোধী; কিন্তু তাঁর বিচার ন্যায়সংগত হয়েছে।”
সেটিই institutional legitimacy। —ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এখন সেই পরীক্ষা। ১৯৭৩ সালের যে আইনি কাঠামো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে political views ধারণের জায়গা দিয়েছে, সেই একই কাঠামো misconduct-এর বিরুদ্ধে disciplinary action-এর ক্ষমতাও দিয়েছে।
দুটি বিধানের সহাবস্থান কোনো দুর্ঘটনা নয়। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন লুকিয়ে আছে— মত থাকবে। আবার, মতবিরোধ থাকবে।একইসাথে শৃঙ্খলাও থাকবে।কিন্তু বিচার হবে নিয়মে।
আজ অধ্যাপক ড. এম. অহিদুজ্জামান, অধ্যাপক ড. মো. মশিউর রহমান এবং অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমানের ঘটনা সেই নীতিরই পরীক্ষা। —এখানে তিনজন মানুষের চাকরি ও মর্যাদার প্রশ্ন আছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কিছু আছে। প্রশ্নটি হলো—রাজনৈতিক পালাবদলের পরও কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায়বিচারের মানদণ্ড অপরিবর্তিত থাকবে? — যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক—প্রমাণ, আত্মপক্ষ সমর্থন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং reasoned decision-এর পথেই এগোতে হবে।
আর যদি কোনো শিক্ষকের political opinion-ই তাঁর বিরুদ্ধে disciplinary action-এর মূল ভিত্তি হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের আইনেই স্বীকৃত political views ধারণের অধিকারের সঙ্গে সেই ব্যবস্থা কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই কারণেই এখন প্রয়োজন কোনো পক্ষের স্লোগান নয়। প্রয়োজন নথি।প্রয়োজন evidence। প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা। প্রয়োজন অভিযুক্তদের পূর্ণ বক্তব্য। এবং প্রয়োজন এমন একটি স্বাধীন ও দৃশ্যমান প্রক্রিয়া, যেখানে সত্য যে পক্ষেই থাকুক, তাকে বেরিয়ে আসতে দেওয়া হবে। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে ন্যায়বিচারের সবচেয়ে বড় প্রমাণ কোনো প্রশাসনিক আদেশ নয়।
সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—ভিন্নমতের মানুষটিও যেন বিশ্বাস করতে পারেন, তাঁর কথা শোনা হবে।
-বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা।
বিশেষ ঘোষণা: প্রতিবেদনটির দ্বিতীয় পর্বে উত্থাপিত অভিযোগ ও অধিকারসংক্রান্ত প্রশ্নগুলোর বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং অপর পক্ষের বক্তব্য ও ব্যাখ্যা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
#ঢাকা_বিশ্ববিদ্যালয় #তিন_অধ্যাপকের_সাময়িক_বরখাস্ত #তদন্তের_ভেতরে_তদন্ত #একাডেমিক_স্বাধীনতা #শিক্ষকের_অধিকার #ভিন্নমতের_অধিকার #মতপ্রকাশের_স্বাধীনতা #প্রক্রিয়াগত_ন্যায়বিচার #আত্মপক্ষ_সমর্থনের_অধিকার #স্বচ্ছ_তদন্ত #নিরপেক্ষ_তদন্ত #প্রাকৃতিক_ন্যায়বিচার #বিশ্ববিদ্যালয়_স্বায়ত্তশাসন #প্রশাসনিক_জবাবদিহি #রাজনৈতিক_ভিন্নমত #সাময়িক_বরখাস্ত #বিশ্ববিদ্যালয়_ট্রাইব্যুনাল #উচ্চশিক্ষা #শিক্ষাঙ্গন #শিক্ষক_নিপীড়ন #মানবাধিকার #ন্যায়বিচার #আইনের_শাসন #বাংলাদেশের_শিক্ষা #অনুসন্ধানী_প্রতিবেদন #বিশেষ_কভার_স্টোরি #শিক্ষা_সংস্কার #অধিকারপত্র #AcademicFreedom #TeachersRights #FreedomOfExpression #DueProcess #NaturalJustice #FairInvestigation #UniversityAutonomy #HigherEducation #HumanRights #RuleOfLaw #DhakaUniversity #InvestigativeJournalism #BangladeshEducation #OdhikarPatra