09/22/2026 সাংবিধানিক সংকটের সমাধানে ‘কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার’-এর কথা বললেন শিশির মনির
odhikarpatra
২১ September ২০২৬ ২২:৪২
অধিকার পত্র ডটকম
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ক্রান্তিকালীন সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা কেবল বিদ্যমান সংবিধানের ১৫৩টি অনুচ্ছেদের আক্ষরিক ব্যাখ্যার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট শিশির মনির।
তার মতে, বিদ্যমান সাংবিধানিক শূন্যতা ও রাজনৈতিক রূপান্তরের আইনি ব্যাখ্যা দিতে জনগণের ‘গাঠনিক ক্ষমতা’ বা কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে দেশের বর্তমান সাংবিধানিক সংকট ও উত্তরণের উপায় নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
শিশির মনির বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সংবিধানের ধারা-উপধারার আক্ষরিক পাঠ দিয়ে বিশ্লেষণ করলে ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সংবিধান বুঝতে এর ঐতিহাসিক পটভূমি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সুপ্রিম কোর্টের অতীতের রায় এবং সাংবিধানিক আইন বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত বিবেচনা করা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নিজের বক্তব্যকে পাঁচটি বিষয়ে ভাগ করেন শিশির মনির। এগুলো হলো—সংবিধান ও সাংবিধানিক আইন, সংশোধন বনাম সংস্কার, গণভোট ও ভিন্নমতের মর্যাদা, ক্রান্তিকালীন সময় এবং ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার রায়ের আলোকে বর্তমান আইনি অবস্থান।
তিনি বলেন, দেশের বর্তমান বাস্তবতায় আংশিক ‘সংশোধন’ নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত ‘সংস্কার’। তার বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই সনদের মূল উদ্দেশ্যও সংস্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও তা বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা ‘বেসিক স্ট্রাকচার’ প্রসঙ্গে শিশির মনির বলেন, সাধারণ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করা যায় না। প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসহ মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো পরিবর্তন শুধু সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে করা সম্ভব নয় বলে তিনি মত দেন।
সংস্কারের আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে সংসদের কার্যপ্রণালিবিধির ২৬৬ বিধির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি। তার বক্তব্য, ওই বিধির অধীনে ‘বিশেষ কমিটি’ গঠনে আইনগত কোনো বাধা নেই এবং বিধিতে ওই কমিটিকে কেবল সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠনের শর্ত নেই।
গণভোটের প্রসঙ্গে শিশির মনির তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন গঠন, উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয় উল্লেখ করেন। এসব বিষয়ে জনগণ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে ম্যান্ডেট দিলে রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত সেই ম্যান্ডেটের বিকল্প হতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের সাংবিধানিক অবস্থার ব্যাখ্যা শুধু সংবিধানের ১৫৩টি অনুচ্ছেদের মধ্যে খুঁজলে পাওয়া কঠিন। এ সময়ের আইনি ভিত্তি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক আইন, রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক বিকাশ এবং গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি জনগণের ‘গাঠনিক ক্ষমতা’ বা কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ারের কথা তুলে ধরেন এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনকালীন সরকার ও ত্রয়োদশ সংশোধনী মামলার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।
সংবিধান সংস্কারের জন্য একটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের কথাও বলেন শিশির মনির। তার মতে, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে এমন একটি পরিষদ গঠন করে কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করা হলে এর সাংবিধানিক ভিত্তি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সাধারণ পদ্ধতিতে সংবিধান সংশোধন করা হলে ভবিষ্যতে আদালতে সেই সংশোধনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। অতীতের কয়েকটি সংশোধনীর আদালত-সংক্রান্ত পরিণতির দৃষ্টান্তও তিনি এ প্রসঙ্গে তুলে ধরেন।
শিশির মনিরের বক্তব্য অনুযায়ী, গণভোটের রায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোনো প্রয়োজন। তবে এসব বক্তব্য তার নিজস্ব আইনি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ; এগুলো বর্তমান সাংবিধানিক অবস্থার ওপর কোনো আদালতের নতুন রায় বা সরকারি সিদ্ধান্ত নয়।