10/01/2026 ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুর আবেদন ক্রিস্টা পাইকের, শেষ মুহূর্তে স্থগিত মৃত্যুদণ্ড
odhikarpatra
৩০ September ২০২৬ ২৩:৫৮
অধিকার পত্র ডটকম | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একমাত্র নারী ক্রিস্টা গেইল পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর শেষ মুহূর্তে স্থগিত করেছে ফেডারেল আপিল আদালত। বুধবার তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা ছিল। কার্যকর হলে আধুনিক যুগে টেনেসিতে ২০০ বছরের বেশি সময় পর কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতো।
পাইককে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা ছিল। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, তিনি এর পরিবর্তে একটি নারী সদস্যদের নিয়ে গঠিত ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আবেদন করেছিলেন।
বুধবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের সিক্সথ সার্কিট কোর্ট অব আপিল মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের আদেশ দেয়।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা যাবে না। তবে তার আইনজীবী ক্লাইভ স্ট্যাফোর্ড স্মিথ আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট চাইলে এই স্থগিতাদেশ বাতিল করতে পারে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড স্থগিতের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিল।
১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে পাইক, তার তৎকালীন ১৭ বছর বয়সী প্রেমিক ট্যাডারিল শিপ এবং ১৮ বছর বয়সী শাদোলা পিটারসন—সহপাঠী ১৯ বছর বয়সী কোলিন স্লেমারকে টেনেসির নক্সভিলের একটি জঙ্গলে নিয়ে যান।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, সেখানে স্লেমারকে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। চারজনই তখন নক্সভিলের একটি Job Corps vocational centre-এর শিক্ষার্থী ছিলেন।
মামলাটি ব্যাপক আলোচনায় আসে হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার কারণে। প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, স্লেমারের শরীরে একটি পেন্টাগ্রাম খোদাই করা হয়েছিল। পরে শিপ এ বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেন। পাইক স্লেমারের মাথার খুলির একটি অংশ নিজের কাছে রেখেছিলেন বলেও মামলায় উঠে আসে।
১৯৯৬ সালে পাইক ও শিপ প্রথম-ডিগ্রি হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। পাইককে মৃত্যুদণ্ড এবং শিপকে প্যারোলের সম্ভাবনাসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পাইককে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি ফায়ারিং স্কোয়াড বেছে নেওয়ার আবেদন করেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। প্রাণঘাতী ইনজেকশন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হলেও এর কার্যকারিতা, ওষুধের প্রাপ্যতা এবং মৃত্যুর প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আইনি ও মানবাধিকার বিতর্ক হয়েছে।
তবে পাইকের আইনজীবীরা মূলত তার মৃত্যুদণ্ডই বাতিল করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পক্ষে আবেদন করেছেন।
পাইকের আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছেন, অপরাধের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর এবং তার শৈশব ছিল গুরুতর নির্যাতন ও ট্রমায় ভরা।
তারা আরও দাবি করেছেন, গর্ভাবস্থায় পাইকের মা অতিরিক্ত মদ্যপান করতেন, যা পাইকের মস্তিষ্কের বিকাশ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
আইনজীবীরা আদালতের কাছে পাইকের বর্তমান বয়স ও মানসিক পরিবর্তন বিবেচনার অনুরোধ করেছেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধের সময়ের ১৮ বছর বয়সী পাইক এবং বর্তমানে ৫০ বছর বয়সী পাইক একই ব্যক্তি হলেও তার জীবন ও আচরণে বড় পরিবর্তন এসেছে।
পাইকের আইনজীবী স্টিফেন ফেরেল কিশোর বয়সে মস্তিষ্কের বিকাশ সম্পর্কে আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞানও বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন।
পাইকের আইনি দল টেনেসির গভর্নর বিল লির কাছে মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তরের আবেদন করেছিল। তবে গভর্নর সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন।
জাতিসংঘের একদল মানবাধিকার বিশেষজ্ঞও পাইকের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে নিহত কোলিন স্লেমারের মা মে মার্টিনেজ পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারীর সংখ্যা খুবই কম।
আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড পুনরায় চালুর অনুমোদন দেওয়ার পর থেকে দেশটিতে ১ হাজার ৬৮৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে নারী মাত্র ১৮ জন, অর্থাৎ মোট সংখ্যার সামান্য বেশি ১ শতাংশ।
টেনেসিতে একই সময়ে ১৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। রাজ্যটির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে পাইকই একমাত্র নারী।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে ১৮২০ সালের পর টেনেসিতে প্রথম কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনা ঘটত বলে Death Penalty Information Center-এর তথ্য উল্লেখ করেছে আল জাজিরা।
পাইক মামলাটি যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে—বিশেষ করে অপরাধ সংঘটনের সময় আসামির বয়স, দীর্ঘ সময়ের কারাবাসের পর ব্যক্তির পরিবর্তন, মানসিক ও শারীরিক বিকাশ এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে।
তবে বর্তমানে পাইকের মৃত্যুদণ্ড ফেডারেল আপিল আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে। পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ এবং সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের ওপর তার মামলার পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করছে।
সূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স