10/03/2026 যে হাত আমাদের বড় করেছে, বার্ধক্যে সে হাত একা কেন? │International Day of Older Persons-এ সকল প্রবীণের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা
odhikarpatra
২ October ২০২৬ ২৩:২২
১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে প্রবীণদের অবদান, বৃদ্ধ মা-বাবার সেবা, ইসলামের মানবিক শিক্ষা, একাকিত্ব ও অবহেলার পরিণতি নিয়ে অধিকারপত্রের বিশেষ ফিচার। বাংলাদেশের পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, সামাজিক সুরক্ষা, সম্মতিভিত্তিক পরিচর্যা এবং শিক্ষার সংস্কারের আলোকে আলোচনা করা হয়েছে মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্য নিশ্চিত করার বাস্তব পথ।
১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে এই নিবন্ধ উৎসর্গ করছি বাংলাদেশের সকল প্রবীণ মানুষ এবং সকল মা-বাবার প্রতি—যাঁদের শ্রম, স্নেহ ও নীরব ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের বেড়ে ওঠা। যাঁরা নিজের চাওয়া সরিয়ে রেখে আমাদের স্বপ্নের জন্য জায়গা করে দিয়েছেন, আমাদের নিশ্চিন্ত ঘুমের পাশে কাটিয়েছেন কত নির্ঘুম রাত।আজ তাঁদের কারও হাঁটা ধীর, কারও দৃষ্টি ঝাপসা, কারও দিন কাটে আপনজনের একটি ফোনের অপেক্ষায়। এই লেখা তাঁদের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার নিবেদন; সেই সঙ্গে আমাদের নিজেদের কাছে একটি অঙ্গীকার—যে হাত ধরে আমরা পৃথিবী চিনেছি, বয়সের ভারে কাঁপতে থাকা সেই হাতটি যত্নে ধরে রাখব।জীবনের শেষ বিকেলে তাঁরা যেন অনুভব করেন—এই ঘরে, এই পরিবারে, এই পৃথিবীতে তাঁদের জন্য এখনও সময় আছে, আপনজনের পাশে একটি প্রিয় জায়গা আছে।
একটি দৃশ্য কল্পনা করুন। সন্ধ্যা হয়েছে। ঘরের বাতি জ্বলছে। একজন প্রবীণ মানুষ চশমা পরে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে আছেন। সন্তান ফোন করবে বলেছিল। তিনি একবার পর্দা দেখেন, আবার ফোনটি পাশে রাখেন। রান্নাঘরে খাবার আছে, টেবিলে ওষুধও রাখা। তবু কিছু একটা নেই। কথা বলার মানুষ নেই। আজ শরীর কেমন, দুপুরে খেয়েছেন কি না, পুরোনো ব্যথাটা বেড়েছে কি না—এসব জানতে চাওয়ার সময় কারও হয়ে ওঠেনি।
এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাক্ষাৎকারভিত্তিক ঘটনা নয়। প্রবীণদের যত্নের প্রশ্নটি বোঝাতে একটি পরিচিত পরিস্থিতির চিত্র। এমন পরিস্থিতি আমাদের মনে করায়, ভালো থাকার সব উপকরণ বাজারে পাওয়া যায় না। ওষুধ কেনা যায়; মন দিয়ে কথা শোনার মানুষ কেনা যায় না। ঘর দেওয়া যায়; সেই ঘরে নিজের প্রয়োজন ও পছন্দের মূল্য আছে—এই অনুভূতি তৈরি করতে সম্পর্কের যত্ন লাগে।
আবার অন্য দৃশ্যও সম্ভব। কর্মস্থল থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে একজন মেয়ে বাবার চিকিৎসার কাগজ গোছাচ্ছেন। ছেলে দূরে থাকলেও খরচ ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করছে। প্রতিবেশী সকালে খোঁজ নিচ্ছেন। নাতি দাদিকে ফোনের নতুন সুবিধা শেখাচ্ছে। এসব ছোট কাজে বড় ঘোষণা নেই, কিন্তু দায়িত্ব আছে। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের তাৎপর্য শেষ পর্যন্ত এই দৈনন্দিন ব্যবহারে ধরা পড়ে: বয়স বাড়লে একজন মানুষের পৃথিবী ছোট হয়ে আসতে পারে; আমরা কি সেই পৃথিবী আরও ছোট করছি, নাকি পাশে দাঁড়িয়ে তার দরজা খোলা রাখছি?
১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৪৫/১০৬ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস (International Day of Older Persons) হিসেবে নির্ধারণ করে। এই স্বীকৃতি বার্ধক্যকে আন্তর্জাতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে আনে। প্রবীণদের অবদান স্মরণ করার পাশাপাশি তাঁদের জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা ও অধিকার সম্পর্কে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব বিবেচনার সুযোগ তৈরি করে দিবসটি।
প্রবীণদের অবদান বলতে আমরা প্রায়ই দৃশ্যমান পেশাগত অর্জন বুঝি। একজন শিক্ষক কত শিক্ষার্থী পড়িয়েছেন, একজন কর্মকর্তা কী দায়িত্ব পালন করেছেন কিংবা একজন উদ্যোক্তা কী প্রতিষ্ঠান গড়েছেন—এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমাজের বড় একটি অংশের শ্রম এমন হিসাবের বাইরে থাকে। সংসার সামলানো, সন্তানকে বড় করা, অসুস্থ মানুষের পাশে থাকা, জমিতে কাজ করা কিংবা প্রতিকূল সময়ে পরিবারকে টিকিয়ে রাখার অবদানও স্বীকৃতি দাবি করে। কোনো কাজের বেতন বা আনুষ্ঠানিক সম্মাননা না থাকলে তার সামাজিক মূল্য কমে যায় না।
এই স্বীকৃতির সঙ্গে একটি মৌলিক নীতিও যুক্ত থাকতে হবে: মানুষের মর্যাদা তাঁর অতীত অবদানের পরিমাণের ওপর নির্ভরশীল নয়। যিনি সমাজে বড় পদে ছিলেন, তাঁর যেমন অধিকার আছে, যিনি কোনো পরিচিত পদে ছিলেন না, তাঁরও সমান অধিকার আছে। যাঁর স্মৃতি দুর্বল হয়েছে কিংবা যিনি নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করতে পারেন না, তাঁকেও সম্মান ও যত্ন দিতে হবে। বয়সের সঙ্গে সক্ষমতা পরিবর্তিত হতে পারে; ব্যক্তির মানবিক মূল্য তার সঙ্গে কমে না।
জাতিসংঘের প্রবীণবিষয়ক নীতিতে স্বাধীনতা, অংশগ্রহণ, যত্ন, আত্মবিকাশ ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ধারণাগুলোকে দৈনন্দিন জীবনে অনুবাদ করলে বিষয়টি সহজ হয়। স্বাধীনতা মানে নিজের জীবন সম্পর্কে মত দেওয়ার সুযোগ। অংশগ্রহণ মানে পরিবার ও সমাজের সিদ্ধান্তে স্থান পাওয়া। যত্ন মানে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া। আত্মবিকাশ মানে বয়স বাড়লেও শেখা ও আগ্রহের কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ। মর্যাদা মানে সাহায্য গ্রহণের সময়ও অপমান, অবজ্ঞা বা অযথা নিয়ন্ত্রণের শিকার না হওয়া।
ফলে দিবসটির তাৎপর্য অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রবীণদের হাতে ফুল তুলে দেওয়ার সঙ্গে জানতে হবে, তাঁদের চিকিৎসা পাওয়া সহজ কি না, সেবার নিয়ম তাঁরা বুঝতে পারেন কি না এবং নিজের ঘরে তাঁদের বক্তব্য শোনা হয় কি না। দিবসের অঙ্গীকার অর্থবহ হবে তখনই, যখন তা দৈনন্দিন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনবে। একজন প্রবীণ মানুষের কাছে সম্মানের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হয়তো মঞ্চের প্রশংসা নয়; প্রয়োজনের সময়ে সহজে সহায়তা পাওয়া।
প্রতি বছর ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর এই দিনটি নির্ধারণ করে। দিবসটির উদ্দেশ্য প্রবীণদের দৃশ্যমান করা, তাঁদের অবদান স্বীকার করা এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অধিকার ও প্রয়োজন নিয়ে সমাজকে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা। এটি কেবল শুভেচ্ছা জানানোর উপলক্ষ নয়; আমাদের প্রতিষ্ঠান ও আচরণ পরীক্ষা করারও সুযোগ।
একদিন প্রবীণদের হাতে ফুল তুলে দেওয়া সুন্দর উদ্যোগ। কিন্তু পরদিন হাসপাতালের দীর্ঘ সারিতে তাঁদের দাঁড়িয়ে থাকতে হলে, ব্যাংকের নিয়ম বুঝতে গিয়ে অপমানিত হতে হলে বা নিজের ঘরে কথা বলার অধিকার হারাতে হলে সেই সম্মানের স্থায়িত্ব কোথায়? অনুষ্ঠানের ছবি দেখে দায়িত্বের হিসাব করা যায় না। হিসাব করতে হয় সেবা, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণের সুযোগ দেখে।
জাতিসংঘের প্রবীণবিষয়ক নীতিমালায় স্বাধীনতা, অংশগ্রহণ, যত্ন, আত্মবিকাশ ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রবীণ মানুষ শুধু সাহায্য গ্রহণ করবেন—এমন ধারণা অসম্পূর্ণ। তিনি নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন, সমাজে অংশ নেবেন এবং আগ্রহ অনুযায়ী শিখবেন বা কাজ করবেন। প্রয়োজন হলে সহায়তা পাবেন, কিন্তু সহায়তা পাওয়ার কারণে তাঁর ব্যক্তিসত্তা ছোট হবে না।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের পরিচিত একটি অভ্যাস বদলাতে বলে। পরিবারের প্রবীণ সদস্যকে কখনো আমরা এতটাই ‘রক্ষা’ করতে চাই যে তাঁর মতামত নেওয়াই বন্ধ করে দিই। কোথায় থাকবেন, কী খাবেন, কার সঙ্গে দেখা করবেন—সব ঠিক করি আমরা। যত্নের শুরু হওয়া উচিত তাঁর কথা শুনে। নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হয়; একটিকে নিশ্চিত করতে গিয়ে অন্যটি মুছে দেওয়া চলে না।
আজকের প্রবীণেরা একরকম নন। তাঁদের মধ্যে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, গৃহিণী, উদ্যোক্তা, সরকারি কর্মচারী, মুক্তিযোদ্ধা ও নানা পেশার মানুষ আছেন। কারও অবদান নথিতে লেখা, কারও অবদান পরিবারের স্মৃতিতে। কেউ বিদ্যালয় গড়েছেন, কেউ জমিতে খাদ্য ফলিয়েছেন, কেউ সন্তানকে পড়ানোর জন্য নিজের প্রয়োজন কমিয়েছেন। যাঁরা সংসারের যত্নের কাজ করেছেন, তাঁদের অনেকের শ্রমের কোনো বেতন ছিল না। বেতন না থাকা সেই কাজের মূল্য কমায় না।
একজন মায়ের অবদান শুধু সন্তান জন্ম দেওয়া নয়। অসুস্থ শিশুর পাশে রাত জাগা, সীমিত আয়ে খাবার ভাগ করা, পরিবারের সম্পর্ক সামলানো—এসবের মধ্যেও শ্রম আছে। একজন বাবার অবদানও কেবল অর্থ উপার্জনে সীমাবদ্ধ নয়। নিরাপত্তা দেওয়া, বিপদের সময় স্থির থাকা, ভুলের পরে আবার চেষ্টা করতে শেখানো—এসব কাজ পরিবারের ভিত তৈরি করে। অবশ্য সব পরিবারের অভিজ্ঞতা সমান সুখকর নয়; অবদান স্বীকার করতে গিয়ে কারও ক্ষতিকর আচরণ আড়াল করাও ঠিক হবে না।
প্রবীণদের অভিজ্ঞতা সমাজেরও সম্পদ। স্থানীয় কৃষির পরিবর্তন, নদীর গতিপথ, এলাকার দুর্যোগের স্মৃতি, পেশাগত দক্ষতা বা লোকসংস্কৃতির অনেক জ্ঞান তাঁদের কাছে থাকে। বিদ্যালয় ও স্থানীয় সংগঠন এই অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করতে পারে। তবে বয়স বেশি হলেই প্রতিটি মত সঠিক—এমন দাবি প্রয়োজন নেই। অভিজ্ঞতাকে সম্মান করে প্রশ্ন করা যায়, তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়, নতুন জ্ঞানের সঙ্গে সংলাপও করা যায়।
সবচেয়ে জরুরি কথা হলো, মানুষের মর্যাদা তাঁর উৎপাদনক্ষমতার পুরস্কার নয়। যিনি এখন কাজ করতে পারেন না, যাঁর স্মৃতি দুর্বল হয়েছে কিংবা যিনি কাউকে আর পরামর্শ দিতে পারেন না, তাঁর অধিকারও সমান। পরিবারের সদস্যপদ চাকরির চুক্তি নয় যে কর্মক্ষমতা কমলে তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০৩০ সালে পৃথিবীর প্রতি ছয়জন মানুষের একজনের বয়স হবে ৬০ বছর বা তার বেশি। ২০৫০ সালে এই বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ২১০ কোটিতে পৌঁছাবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এগুলো ভবিষ্যতের অনুমিত হিসাব, বর্তমান গণনা নয়। তবে এগুলো যে পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত করে, তার জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক ব্যবস্থাকে প্রস্তুত করতে হয় এখন থেকেই।
বাংলাদেশেও পরিবর্তনটি স্পষ্ট। জাতিসংঘের বাংলাদেশ কার্যালয়ের ২০২৩ সালের একটি বিশ্লেষণে জনশুমারির তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রবীণদের অনুপাত ২০১১ সালের ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ৯ দশমিক ২৯ শতাংশ হয়েছে। সেখানে ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি বলা হয়েছে। এগুলো ২০২২ সালের তথ্য; ২০২৬ সালের বর্তমান সংখ্যা হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।
দীর্ঘ জীবন একটি অর্জন। কিন্তু অতিরিক্ত বছরগুলো কীভাবে কাটছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আয় না থাকলে, চিকিৎসা নাগালের বাইরে হলে কিংবা নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা না থাকলে দীর্ঘায়ু উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে শুধু ‘বোঝা’ হিসেবে দেখলে নীতির শুরুতেই ভুল হয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, বেশি মানুষ দীর্ঘ জীবন পাচ্ছেন—তাঁদের সেই জীবন ভালো রাখার ব্যবস্থা কী?
একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বাড়লে আমরা শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক ও আসনের কথা ভাবি। প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়লে একইভাবে পরিচর্যা, চিকিৎসা, আয় ও চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে। ভালোবাসা এই প্রস্তুতির ভিত্তি হতে পারে; কিন্তু হাসপাতালের র্যাম্প, প্রশিক্ষিত সেবাকর্মী বা নির্ভরযোগ্য আয় শুধু ভালোবাসা দিয়ে তৈরি হয় না। তার জন্য পরিকল্পনা ও অর্থ লাগে।
মুসলিম পরিবারের কাছে বৃদ্ধ মা-বাবার সেবা একটি গভীর ধর্মীয় দায়িত্ব। সুরা আল-ইসরার ২৩–২৪ আয়াতে মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ, বার্ধক্যে তাঁদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ না করা, সম্মানজনকভাবে কথা বলা এবং তাঁদের জন্য দোয়ার শিক্ষা রয়েছে। এই নির্দেশনার কেন্দ্রে আছে সম্পর্কের কোমলতা—ক্ষমতাবান হয়ে দুর্বল মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, তাঁর সঙ্গে সদয় ব্যবহার করা।
এই ধর্মীয় বোধ থেকে মা-বাবাকে সেবা করার সুযোগকে আল্লাহর রহমত হিসেবে গ্রহণ করা যায়। যাঁরা শৈশবে আমাদের অসহায় অবস্থায় যত্ন করেছেন, তাঁদের প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ সব সময় থাকবে না। আজ যে মানুষটির জন্য ওষুধ আনতে বিরক্তি হচ্ছে, একদিন তাঁর জন্য কিছু করার সুযোগই আর পাওয়া যাবে না। দায়িত্বের মূল্য অনেক সময় আমরা বুঝি সুযোগটি হারিয়ে যাওয়ার পরে।
তবে সেবাকে শুধু বড় আয়োজনের মধ্যে খুঁজলে চলবে না। ধীরে হাঁটা বাবার সঙ্গে নিজের গতি কমানো, কম শুনতে পাওয়া মায়ের সঙ্গে স্পষ্টভাবে কথা বলা, একই কথা আবার শুনেও তাঁকে বিব্রত না করা—এসবও সেবা। নামাজ, দোয়া ও ধর্মীয় আলোচনা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; সেই শিক্ষার প্রকাশ ঘরের কথাবার্তায়ও থাকা প্রয়োজন। বাইরের মানুষের কাছে ভদ্র অথচ নিজের বৃদ্ধ মা-বাবার কাছে অসহনশীল হলে আচরণের এই অসংগতি নিয়ে ভাবতে হয়।
বাংলাদেশের সব পরিবার একই ধর্ম পালন করে না। তাই জনপরিসরে প্রবীণদের যত্নের ভিত্তি হতে হবে মানবিক মর্যাদা ও সমান অধিকার। ধর্মীয় শিক্ষা মানুষকে সেই দায়িত্ব পালনে শক্তি দিতে পারে। কিন্তু কোনো প্রবীণ মানুষ ধর্ম, পরিচয় বা পারিবারিক অবস্থানের কারণে সেবা থেকে বাদ পড়তে পারেন না।
অবহেলা সব সময় দরজার বাইরে ফেলে দেওয়ার মতো দৃশ্যমান নয়। একই বাড়িতে থেকেও একজন প্রবীণ মানুষ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেন। তাঁর প্রয়োজনকে ঝামেলা বলা, খাবার ও চিকিৎসায় উদাসীন থাকা, নিয়মিত অপমান করা অথবা তাঁর টাকা ব্যবহারে তাঁকেই কোনো কথা বলতে না দেওয়া—এসব পরিস্থিতি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হয়। পারিবারিক বিষয় বলেই ক্ষতি ছোট হয়ে যায় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যপত্রে উল্লেখ করা ২০১৭ সালের একটি গবেষণা-পর্যালোচনায় ২৮ দেশের ৫২টি গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পরিবার ও সমাজের মধ্যে বসবাসকারী ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব মানুষের প্রায় ছয়জনের একজন আগের এক বছরে কোনো না কোনো নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এটি আন্তর্জাতিক গবেষণার সম্মিলিত হিসাব; বাংলাদেশের নির্যাতনের হার নয়।
এই তথ্যের গুরুত্ব সংখ্যার বাইরেও আছে। নির্যাতন বলতে কেবল মারধর বোঝায় না। মানসিক অপমান, আর্থিক শোষণ, পরিত্যাগ ও প্রয়োজনীয় যত্ন না দেওয়াও ক্ষতির কারণ হতে পারে। ফলে দৃশ্যমান আঘাত না থাকলেও প্রবীণ মানুষের অভিযোগ মন দিয়ে শুনতে হবে। তাঁর কথা শুরু হওয়ার আগেই “এই বয়সে সবাই একটু বেশি অভিযোগ করে” বলে থামিয়ে দেওয়া ন্যায্য নয়।
সম্পত্তির প্রশ্নে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। প্রবীণ ব্যক্তিকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জমি লিখে দিতে চাপ দেওয়া বা সইয়ের বিষয় না বুঝিয়ে কাগজ এগিয়ে দেওয়া স্বাধীন সিদ্ধান্তের সুযোগ নষ্ট করে। আবার শুধু পারিবারিক বিরোধ দেখেই অপরাধের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক নয়। প্রয়োজন নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, নিরাপদে কথা বলার সুযোগ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সহায়তা।
কোনো বৃদ্ধ মা-বাবাকে যেন শেষ জীবনে এক আশ্রয় থেকে অন্য আশ্রয়ে ঘুরে বেড়াতে না হয়—এই আকাঙ্ক্ষা গভীরভাবে মানবিক। সন্তান ও পরিবার দায়িত্ব এড়িয়ে তাঁদের এমন অনিশ্চয়তায় ফেলতে পারে না। কিন্তু সব প্রবীণ নিবাসকে একই চোখে দেখলে কিছু মানুষের বাস্তব প্রয়োজন অস্বীকার করা হয়। কারও সন্তান নেই, কারও নিরাপদ বাড়ি নেই, কারও সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষিত পরিচর্যা প্রয়োজন।
সুতরাং পার্থক্যটি করতে হবে পরিত্যাগ এবং সম্মতিভিত্তিক পরিচর্যার মধ্যে। একজন প্রবীণ ব্যক্তি নিজের পছন্দে নিরাপদ আবাসনে থাকতে পারেন। পরিবার তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ও দায়িত্ব বজায় রাখতে পারে। আবার নিজের বাড়িতে থেকেও তিনি অবহেলিত হতে পারেন। ঠিকানার নাম দেখে যত্নের মান নির্ধারণ করা যায় না; দেখতে হয় নিরাপত্তা, সম্মতি, সম্পর্ক ও সেবার বাস্তব অবস্থা।
বাংলাদেশের পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩-এর ধারা ৩(৪) অনুযায়ী, কোনো সন্তান পিতা বা মাতাকে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও বসবাসে বাধ্য করতে পারে না। আইনটি এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রবীণ ব্যক্তির ইচ্ছাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
পরিবারে থাকার সুযোগ বাড়াতে ঘরভিত্তিক সহায়তা, দিনের বেলায় পরিচর্যা ও পরিচর্যাকারীর সাময়িক বিশ্রামের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। আবাসিক সেবা প্রয়োজন হলে সেখানে প্রশিক্ষিত কর্মী, অভিযোগের সুযোগ ও নিয়মিত তদারকি থাকতে হবে। সম্মানের অর্থ কাউকে জোর করে বাড়িতে রাখা নয়; আবার সুবিধার জন্য তাঁকে সম্পর্কহীন করে পাঠিয়ে দেওয়াও নয়।
প্রবীণদের যত্ন নিয়ে আলোচনায় সন্তানকে দোষ দেওয়া সহজ। কিন্তু দায়িত্ব পালনের বাস্তব শর্তগুলোও দেখতে হবে। কম আয়, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, দূরে চাকরি, ছোট বাসস্থান বা একাধিক অসুস্থ সদস্যের পরিচর্যা একটি পরিবারকে চাপে ফেলতে পারে। এই চাপ অবহেলার অজুহাত নয়। তবে চাপের কারণ না বুঝলে সমাধানও কার্যকর হয় না।
ধরা যাক, একজন কর্মজীবী নারী নিজের মা, শ্বশুর এবং ছোট সন্তানের যত্ন করছেন। পরিবারের অন্য সদস্যেরা তাঁর কাজকে স্বাভাবিক দায়িত্ব মনে করেন। এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে শুধু আরও ধৈর্য ধরতে বলা সমস্যার ভার একই মানুষের কাঁধে রেখে দেয়। পুত্র, কন্যা, ভাইবোন ও অন্য সদস্যদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ ভাগ করতে হবে। পরিচর্যাকে কেবল নারীর দায়িত্ব মনে করার সুযোগ নেই।
সব সন্তান একইভাবে অবদান রাখতে পারবেন না। কেউ চিকিৎসার খরচ দিতে পারেন, কেউ হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারেন, কেউ নিয়মিত খাবার ও ওষুধের ব্যবস্থা দেখতে পারেন। দূরে থাকা সন্তান স্থানীয় সহায়তা সংগঠিত করতে পারেন। কে কোন কাজ করবেন, জরুরি সময়ে কাকে ফোন করতে হবে এবং ব্যয় কীভাবে ভাগ হবে—এসব আগে ঠিক করলে অনিশ্চয়তা কমে। প্রবীণ ব্যক্তির মতামত নিয়েই পরিকল্পনা করা উচিত।
কিছু পরিবারের ইতিহাসে সহিংসতা বা গুরুতর ক্ষতির অভিজ্ঞতা থাকে। সেখানে একই ছাদের নিচে থাকাই একমাত্র সমাধান বলা যায় না। নিরাপদ দূরত্ব রেখে দায়িত্বশীল সহায়তা, পেশাগত পরামর্শ ও পৃথক থাকার ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। নৈতিক দায়িত্বকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়, যাতে একজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে অন্যজনের নিরাপত্তা অস্বীকার করা হয়।
প্রবীণ মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে কথা উঠলে ওষুধ ও পরীক্ষার আলোচনা সামনে আসে। এগুলো প্রয়োজনীয়। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনও দেখতে হবে। তিনি কি নিরাপদে গোসল করতে পারেন? বাজারে যেতে পারেন? বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে পারেন? প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝতে পারেন? নিজের পছন্দের কাজে সময় দিতে পারেন? যত্নের পরিকল্পনায় এসব প্রশ্নের জায়গা থাকা দরকার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য’ ধারণা ভালো থাকার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্ষমতা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়। সহজভাবে বললে, রোগ থাকলেও উপযুক্ত সহায়তায় মানুষ তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করতে পারেন। স্বাস্থ্যকর বার্ধক্য মানে অবশ্যই সব রোগ থেকে মুক্ত থাকা নয়।
একটি উদাহরণে বিষয়টি পরিষ্কার হয়। হাঁটতে অসুবিধা হওয়া একজন মানুষ খাড়া সিঁড়ি, পিচ্ছিল বাথরুম ও দূরের পরিবহনের কারণে ঘরে আটকে যেতে পারেন। নিরাপদ প্রবেশপথ, হাতল ও সহজ যাতায়াত থাকলে তাঁর অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ে। এখানে পরিবেশের পরিবর্তনও যত্নের অংশ। মানুষকে সারাক্ষণ অন্যের ওপর নির্ভরশীল রাখার বদলে যতটা সম্ভব নিজের কাজ করার সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
ডিজিটাল সেবাতেও একই নীতি দরকার। অনলাইনে আবেদন করতে না পারা মানেই অযোগ্য হওয়া নয়। বড় অক্ষর, সহজ নির্দেশনা, সহায়তা ডেস্ক ও বিকল্প সেবাপদ্ধতি থাকলে অনেক বাধা কমানো যায়। আমরা ফোনের সফটওয়্যার নিয়মিত হালনাগাদ করি; পরিবারের ধৈর্যের সংস্করণটি কখনো বহু বছর পুরোনো থেকে যায়। প্রযুক্তি শেখানোর আগে সেই সংস্করণটিও একটু উন্নত করা দরকার।
আমি তখন প্রথম শ্রেণিতে পড়ি। শীতকালে গ্রামে দাদুর বাড়িতে গিয়েছি। এক রাতে ঘন কুয়াশার মধ্যে একজন মানুষ দাদুর কাছে এলেন। কোনো একটি সামাজিক বা পারিবারিক বিষয়ে পরামর্শ নিতে এসেছিলেন তিনি। সমস্যাটির বিস্তারিত আজ আর মনে নেই। কিন্তু দাদুর উত্তরটি এত বছর পরও মনে রয়ে গেছে।
দাদু গ্রামের গণ্যমান্য মানুষ ছিলেন। সামাজিক বিষয়ে অনেকে তাঁর পরামর্শ নিতেন। সেই মানুষটিকেই তিনি বললেন, আমাদের গ্রামে কয়েকজন ‘তিন মাথাওয়ালা মানুষ’ আছেন। তাঁদের যেকোনো একজনকে খুঁজে পরামর্শ নিতে। তাঁদের বুদ্ধি তাঁর চেয়েও ভালো হতে পারে।
শিশুমনে কথাটি বিস্ময় জাগানোর মতো। তিন মাথাওয়ালা মানুষ আবার কেমন? পরে বুঝেছি, দাদু বলছিলেন বয়সের ভারে নুয়ে পড়া অতি প্রবীণ মানুষদের কথা। যাঁরা লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটেন, বসলে শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে আসে, মাথাটি দুই হাঁটুর কাছে নেমে যায়। দুই হাঁটু ও মাথা মিলিয়ে দূর থেকে যেন তিনটি মাথার অবয়ব। দাদুর ভাষায় তাঁরাই ‘তিন মাথাওয়ালা মানুষ’।
কথাটিতে গ্রামীণ রসিকতা ছিল। কিন্তু আমার স্মৃতিতে তার গভীর অর্থ হয়ে আছে শ্রদ্ধা। দাদু তাঁদের শারীরিক দুর্বলতার আড়ালে জীবনের অভিজ্ঞতা দেখতে পেয়েছিলেন। নিজে সামাজিক মর্যাদার অধিকারী হয়েও আরও অভিজ্ঞ মানুষের কাছে পরামর্শ নিতে বলেছিলেন। নিজের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠার বদলে অন্যের প্রজ্ঞা স্বীকার করার এই ক্ষমতাটিও ছিল তাঁর শিক্ষার অংশ।
আজ ঘটনাটি মনে পড়লে মনে হয়, সেই শীতের রাতে আমি বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ের বাইরের একটি পাঠ পেয়েছিলাম। মানুষকে বুঝতে হলে তার শরীর কতটা সোজা, হাঁটার গতি কতটা দ্রুত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সনদ কতগুলো—শুধু তা দেখলে চলে না। দেখতে হয়, সে কত জীবন দেখেছে, কত ভুল থেকে শিখেছে এবং অন্যের সংকট কতটা বুঝতে পারে।
তবে একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি দিয়ে অতীতের পুরো সমাজের ছবি আঁকা যায় না। আগের দিনে সব প্রবীণ সম্মান পেতেন, আর এখন কেউ পান না—এমন সিদ্ধান্তও সঠিক হবে না। এই স্মৃতির মূল্য অন্য জায়গায়: এটি দেখায়, আমাদের সামাজিক অভিজ্ঞতার মধ্যে প্রবীণদের জ্ঞানকে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি ধারা ছিল। সেই ধারার মানবিক শক্তিটুকু আজও কাজে লাগানো সম্ভব।
দাদুর সেই প্রবীণদের হয়তো উচ্চশিক্ষার সনদ ছিল না। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং জীবনের শিক্ষা এক জিনিস নয়। কেউ বিদ্যালয়ে পড়ে তত্ত্ব শেখেন; কেউ দীর্ঘদিন মানুষ, প্রকৃতি ও কাজের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে বাস্তব বিচারবোধ গড়ে তোলেন। দুটির শক্তি ও সীমাবদ্ধতা আছে। একটিকে স্বীকার করতে অন্যটিকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই।
এখানে ‘অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান’ এবং ‘স্থানীয় জ্ঞান’ (Local Knowledge) ধারণা দুটি প্রাসঙ্গিক। অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান হলো কাজ করতে করতে, পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে অর্জিত বোঝাপড়া। স্থানীয় জ্ঞান হলো কোনো এলাকার পরিবেশ, জীবিকা ও সামাজিক সম্পর্ক সম্পর্কে দীর্ঘ পরিচয় থেকে পাওয়া জ্ঞান। একজন পুরোনো কৃষক জমির পানি ধরে রাখার বৈশিষ্ট্য জানেন। একজন অভিজ্ঞ কারিগর কাজে ত্রুটি কোথায় হতে পারে বুঝতে পারেন। দীর্ঘদিন সামাজিক বিরোধ সামলানো কেউ হয়তো বুঝতে পারেন, কোন কথাটি আলোচনা এগিয়ে দেবে আর কোনটি উত্তেজনা বাড়াবে।
এই জ্ঞানের কিছু অংশ সহজে বইয়ে লেখা যায় না। কখন কথা বলতে হবে, কখন একটু থামতে হবে কিংবা কার বক্তব্যের পেছনে কষ্ট লুকিয়ে আছে—এসব বোঝার জন্য পরিস্থিতি দেখার অভিজ্ঞতা লাগে। দাদু সম্ভবত সেই বিচারবোধের দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন। বয়সের কারণে তাঁরা বেশি জানেন—এই সরল ধারণার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, দীর্ঘ জীবন তাঁদের শেখার সুযোগ দিয়েছে।
বাংলার খনার বচনেও অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণকে স্মরণযোগ্য ভাষায় ধরে রাখার ঐতিহ্য দেখা যায়। কৃষি, ঋতু ও গ্রামীণ জীবনসংক্রান্ত এসব বচন লোকজ জ্ঞানের পরিচিত উদাহরণ। তবে খনার জীবন নিয়ে প্রচলিত কিংবদন্তিকে যাচাইকৃত জীবনী হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিক বিষয় হলো, বাংলার লোকসংস্কৃতিতে বাস্তব জীবন সম্পর্কে জ্ঞান ছড়া ও বচনের মাধ্যমে বহন করা হয়েছে।
লোকজ জ্ঞানের প্রতিটি বক্তব্য অবশ্যই আজকের বাস্তবতায় সঠিক হবে—এমন নয়। পরিবেশ বদলেছে, নতুন গবেষণা হয়েছে, অনেক পুরোনো ধারণার সংশোধন প্রয়োজন। তাই সম্মানজনক পথ হলো জ্ঞানটি শোনা, নথিবদ্ধ করা এবং প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। অবজ্ঞা করে ফেলে দিলে শেখার সুযোগ হারাই; যাচাই ছাড়া গ্রহণ করলে ভুলের ঝুঁকি থাকে।
দাদুর সময়ের গ্রামীণ সম্পর্ক আর আজকের নগরজীবনের সম্পর্ক একইভাবে চলে না। এই পরিবর্তন বোঝার একটি উপায় হলো দেখা, জীবনের প্রয়োজন মেটাতে আমরা এখন কার কাছে যাই। জীবিকা, চিকিৎসা, শিক্ষা বা প্রশাসনিক কাজের জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীর ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে কোনো পরিবারের প্রবীণ সদস্য আর সব বিষয়ে পরামর্শের প্রধান কেন্দ্র থাকেন না। এই পরিবর্তনের মধ্যে অগ্রগতিও আছে; বিশেষজ্ঞের জ্ঞান ও আধুনিক সেবা মানুষের সুযোগ বাড়ায়।
সমস্যা হয় যখন নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতার পরিবর্তনকে মানুষের সামগ্রিক মূল্য হারানো বলে ধরে নেওয়া হয়। বাবা অনলাইনে আবেদন করতে পারেন না বলে তাঁর জীবনবোধও অপ্রয়োজনীয়—এই সিদ্ধান্তের কোনো যুক্তি নেই। মা নতুন প্রযুক্তি বোঝেন না বলে পারিবারিক বিষয়ে তাঁর মতামত বাদ দেওয়া যায় না। একটি দক্ষতার ঘাটতি দিয়ে একজন মানুষের সমস্ত অভিজ্ঞতা মাপা অন্যায্য।
একই সঙ্গে কর্মস্থলের চাপ, যাতায়াত, বাসস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং দূরে বসবাস নিয়মিত যোগাযোগকে কঠিন করতে পারে। বড় পরিবারের দৈনন্দিন আলাপের সুযোগ ছোট পরিবারে কমে যেতে পারে। এগুলো সম্ভাব্য ব্যাখ্যা; প্রতিটি পরিবারের অভিজ্ঞতা এক নয়। একক পরিবারে গভীর যত্ন থাকতে পারে, যৌথ পরিবারেও অপমান ও অবহেলা থাকতে পারে। পরিবারের আকারের পাশাপাশি সম্পর্কের মান এবং দায়িত্ব ভাগ করার ব্যবস্থা দেখতে হবে।
সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠিও এখানে বিবেচ্য। যখন আয়, পদ ও দৃশ্যমান সাফল্যকে মানুষের মূল্য নির্ধারণের প্রধান উপায় করা হয়, তখন উপার্জন বন্ধ হওয়া প্রবীণ মানুষ পিছিয়ে পড়েন। এই মানসিকতার সমস্যা হলো, যে যত্ন ও অভিজ্ঞতা পরিবারকে টিকিয়ে রাখে, তার অনেকটাই হিসাবের বাইরে থেকে যায়। সংসারে বাজারের ব্যয় লেখা হয়; কার ধৈর্যে সংসারটি টিকে আছে, তার কোনো আলাদা খাতা থাকে না।
প্রবীণদের প্রতি অবহেলার কোনো ঘটনা দেখলে নতুন প্রজন্মকে নিয়ে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ‘জেন জেড মা-বাবাকে সম্মান করে না’—এমন সামগ্রিক সিদ্ধান্তের জন্য যথাযথ প্রমাণ প্রয়োজন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা কয়েকটি আলোচিত ঘটনা দিয়ে একটি পুরো প্রজন্মের চরিত্র নির্ধারণ করা যায় না। তাতে সমস্যার কারণ খোঁজার বদলে নতুন একটি দূরত্ব তৈরি হয়।
তরুণেরা পরিবারের আচরণও দেখে। বড়রা নিজের মা-বাবার সঙ্গে কীভাবে কথা বলেন, প্রয়োজনের সময় দায়িত্ব নেন কি না এবং দুর্বল মানুষের প্রতি কেমন ব্যবহার করেন—এসব থেকে শিশুরা সম্পর্কের পাঠ পায়। তাই শুধু তরুণদের উদ্দেশে নৈতিক বক্তৃতা দিলে হবে না। প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধার যে আচরণ আমরা চাই, প্রাপ্তবয়স্কদেরও তা দেখাতে হবে।
এখানে ‘সামাজিক শিক্ষণ’ (Social Learning) ধারণাটি আলোচনাকে গভীর করে। সহজভাবে বললে, মানুষ অন্যের আচরণ দেখে এবং সেই আচরণের গ্রহণযোগ্যতা বুঝে নিজের ব্যবহার গড়ে তোলে। একটি শিশু যদি দেখে, দাদুর কথা শেষ হওয়ার আগেই সবাই তাঁকে থামিয়ে দেয়, সে নীরব মানুষটির সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে একটি বার্তা পায়। আবার দাদুর মতামত মন দিয়ে শোনা হলে সে ভিন্ন পাঠ শেখে। এটি একটি ধারণাগত ব্যাখ্যা; প্রত্যেক শিশুর আচরণ একইভাবে তৈরি হবে, এমন দাবি নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বয়সের ভিত্তিতে তৈরি নেতিবাচক ধারণা, বিরূপ মনোভাব ও বৈষম্যকে ‘এজিজম’ (Ageism) বলে। এটি প্রবীণ ও তরুণ—উভয়ের বিরুদ্ধেই ঘটতে পারে। তাই প্রবীণদের সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তরুণদেরও এক নামের অধীনে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। পারস্পরিক মর্যাদাই প্রজন্মের সম্পর্কের ভিত্তি।
প্রবীণ মানুষের কথা নিয়মিত গুরুত্ব না পেলে প্রথম ক্ষতিটি সম্পর্কের মধ্যে হয়। তিনি অনুভব করতে পারেন, পরিবারের সিদ্ধান্তে তাঁর আর স্থান নেই। প্রয়োজন জানানোও তখন কঠিন হয়ে যায়। বাইরে থেকে শান্ত দেখালেই সেই পরিস্থিতি স্বস্তির—এমন ধরে নেওয়া যায় না। কেউ কথা বলা কমিয়ে দিয়েছেন বলে তাঁর চাওয়া-পাওয়াও কমে গেছে, এই সিদ্ধান্ত বিপজ্জনক।
দ্বিতীয় ক্ষতি জ্ঞান ও স্মৃতির। স্থানীয় ইতিহাস, কাজের দক্ষতা, পুরোনো দুর্যোগের অভিজ্ঞতা কিংবা পরিবারের সংগ্রামের বিবরণ নথিবদ্ধ না হলে হারিয়ে যেতে পারে। নতুন প্রজন্ম তখন ফলাফল দেখে, কিন্তু সেই ফলাফলের পেছনের শ্রম বোঝে না। ঘরটি আছে; ঘর গড়তে কে কত বছর নিজের প্রয়োজন কমিয়েছেন, সেই গল্পটি নেই।
তৃতীয় ক্ষতি আমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য। মানুষের মূল্য যদি শুধুই বর্তমান উপার্জন বা দ্রুত কাজ করার ক্ষমতা দিয়ে বিচার করা হয়, তবে সেই মানদণ্ড একদিন আজকের কর্মক্ষম মানুষদের ওপরও প্রয়োগ হতে পারে। প্রবীণদের জন্য মর্যাদার ব্যবস্থা গড়ে তোলা তাই একটি প্রজন্মের প্রতি সদিচ্ছার পাশাপাশি সবার জীবনপথ সম্পর্কে দায়িত্বশীল চিন্তা।
তবে পুরোনো সামাজিক কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনাই সমাধান নয়। শুধু বয়সের কারণে কারও বক্তব্যকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা যায় না। বৈষম্যমূলক মত, ক্ষতিকর প্রথা বা ভুল পরামর্শের সমালোচনা করা প্রয়োজন। সম্মান এবং অন্ধ আনুগত্যের পার্থক্য এখানেই। আমরা মানুষকে মর্যাদা দেব, তাঁর বক্তব্য শুনব, তারপর যুক্তি ও প্রমাণ দিয়ে বিচার করব।
দাদুর স্মৃতিটি শিক্ষা সংস্কারের জন্য একটি বাস্তব ধারণা দিতে পারে। বিদ্যালয় স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত শেখার কার্যক্রম আয়োজন করতে পারে। একজন প্রবীণ কৃষক তাঁর অভিজ্ঞতা বলবেন, একজন কারিগর কাজ দেখাবেন, একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এলাকার শিক্ষার পরিবর্তন ব্যাখ্যা করবেন। শিক্ষার্থীরা সম্মতি নিয়ে কথা শুনবে, প্রশ্ন করবে এবং শেখা বিষয় নথিবদ্ধ করবে।
এর সঙ্গে যাচাইয়ের অনুশীলনও থাকবে। কোনো লোকজ ধারণা নিয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক, প্রাসঙ্গিক বই বা বিশেষজ্ঞের সহায়তায় অনুসন্ধান করতে পারে। এভাবে প্রবীণের অভিজ্ঞতা ও নতুন জ্ঞানের মধ্যে সংলাপ তৈরি হবে। শিক্ষার্থী শিখবে, শ্রদ্ধা মানে প্রশ্ন বন্ধ করা নয়; প্রশ্ন করার ভাষা ও পদ্ধতিও সম্মানজনক হতে পারে।
পরিবারেও ছোট পরিবর্তন সম্ভব। প্রবীণ সদস্যের সঙ্গে কেবল শরীর ও ওষুধের কথা না বলে তাঁর অভিজ্ঞতা, পছন্দ এবং বর্তমান উদ্বেগ নিয়ে কথা বলা যায়। তরুণেরা প্রযুক্তি শেখাবে, প্রবীণেরা নিজেদের জানা বিষয় ভাগ করবেন। এখানে দুই পক্ষই শেখার সুযোগ পাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনায়ও বয়সভিত্তিক বৈষম্য কমাতে শিক্ষা ও প্রজন্মের মধ্যে অর্থবহ যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
কিন্তু একটি সীমা মনে রাখতে হবে। প্রবীণ মানুষের সম্মান পাওয়ার জন্য প্রতিবার নিজের জ্ঞানের উপযোগিতা প্রমাণ করতে হবে না। যিনি কথা বলতে পারেন না, স্মৃতি হারিয়েছেন কিংবা কোনো দক্ষতা আর শেখাতে পারেন না, তাঁর যত্নের অধিকারও সমান। অভিজ্ঞতা তাঁদের একটি সম্পদ; মানবিক মর্যাদা তার ওপর নির্ভরশীল নয়।
শৈশবের সেই শীতের রাত এখন আমার কাছে একটি প্রশ্ন রেখে যায়। দাদু যাঁদের কাছে পরামর্শ নিতে পাঠাতেন, আমরা কি তাঁদের কথা শোনার সুযোগ রাখছি? নাকি নুয়ে পড়া শরীরটি দেখেই ধরে নিচ্ছি, বলার মতো কিছু আর অবশিষ্ট নেই?
সময় একদিন আমাদেরও গতি কমাবে। তখন হয়তো সবচেয়ে বেশি কষ্ট হবে সাহায্য চাইতে নয়, কথা বলার আগেই অন্যের চোখে অধৈর্য দেখতে। দাদুর ‘তিন মাথাওয়ালা মানুষ’-এর স্মৃতি তাই শুধু অতীতের গল্প হয়ে থাকুক কেন? আজ পরিবারের সবচেয়ে ধীরে কথা বলা মানুষটির পাশে বসে তাঁর কথাটি শেষ পর্যন্ত শোনা দিয়েই সেই শিক্ষার নতুন শুরু হতে পারে।
শৈশবের সেই শীতের রাতে দাদু একজন মানুষকে পরামর্শের জন্য পাঠিয়েছিলেন গ্রামের অতি প্রবীণদের কাছে। বয়সের ভারে তাঁদের শরীর নুয়ে পড়েছিল, কিন্তু সমাজে তাঁদের অভিজ্ঞতার মূল্য ছিল। অনেক বছর পরে উত্তরার একটি ফ্ল্যাটের আরেকটি ঘটনা আমাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।
আমার জানা ঘটনাটির বর্ণনা অনুযায়ী, ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরপ্রাপ্ত একজন অধ্যাপক। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মানুষটি একাই বসবাস করতেন। তাঁর সন্তানরা বিদেশে স্থায়ীভাবে বসতি গড়েছিলেন। একসময় প্রতিবেশীরা ফ্ল্যাটের পাশের করিডোর দিয়ে চলাচলের সময় তীব্র দুর্গন্ধ পান। পরদিনও সেই গন্ধ পাওয়ার পর পুলিশকে জানান। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে অধ্যাপকের পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করে।
এই ঘটনার নির্দিষ্ট তারিখ, মৃত্যুর কারণ কিংবা পরিবারের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ যোগাযোগের তথ্য এখানে নেই। ফলে কেন এমন হয়েছিল, তা নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বর্ণনাটি একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে আনে: একজন মানুষ মারা গেলেন, অথচ তাঁর অনুপস্থিতি সময়মতো কারও নজরে এল না কেন?
জীবনের একটি বড় অংশ তিনি কাটিয়েছিলেন পড়িয়ে, মানুষ গড়ে এবং নিজের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে চেষ্টা করে। আমার জানা বিবরণে, সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করতে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যও বিসর্জন দিয়েছিলেন। সেই মানুষটির জীবনের শেষ মুহূর্তে পাশে কেউ ছিলেন না। মৃত্যুর পরে তাঁর সন্ধান মিলল প্রতিবেশীদের পাওয়া গন্ধের সূত্রে।
ঘটনাটির বেদনা প্রকাশ করতে আর কোনো অলংকারের প্রয়োজন হয় না। শুধু এটুকু ভাবলেই থেমে যেতে হয়—একসময় যাঁর কথা শোনার জন্য শ্রেণিকক্ষে মানুষ বসত, শেষ বয়সে তাঁর ঘরের নীরবতা ভাঙার মতো নিয়মিত উপস্থিতি কি ছিল?
সন্তানরা বিদেশে থাকেন বলেই তাঁদের মা-বাবার প্রতি মমতা নেই, এমন বলা অন্যায্য। দূরে থেকেও বহু সন্তান দায়িত্ব পালন করেন। আবার একই বাড়িতে থেকেও কেউ প্রয়োজনের সময় পাশে থাকেন না। তাই ভালোবাসা বিচার করার জন্য শুধু ভৌগোলিক দূরত্ব যথেষ্ট নয়।
এই অধ্যাপকের সন্তানদের যোগাযোগ, আর্থিক সহায়তা কিংবা পরিচর্যার ব্যবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য আমাদের জানা নেই। তিনি নিজে কীভাবে থাকতে চেয়েছিলেন, সেটিও জানা প্রয়োজন। তাঁকে কেন্দ্র করে পরিবারের বিচার করার বদলে ঘটনাটি থেকে বৃহত্তর প্রশ্ন তোলা বেশি দায়িত্বশীল: অনুভূতির ভালোবাসা কীভাবে নির্ভরযোগ্য যত্নে পরিণত হবে?
ভালোবাসা মানুষের মনের অবস্থা। যত্ন হলো সেই ভালোবাসার নিয়মিত কাজ ও ব্যবস্থা। কে প্রতিদিন খোঁজ নেবেন, অসুস্থ হলে কে পৌঁছাবেন, ফোন না ধরলে কে দরজায় যাবেন—এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে আন্তরিক সম্পর্কের মধ্যেও বিপজ্জনক ফাঁক থেকে যেতে পারে।
একজন সন্তান হয়তো নিয়মিত অর্থ পাঠান। কিন্তু অর্থ পাঠানো আর জরুরি সময়ে উপস্থিত সহায়তা একই প্রয়োজন মেটায় না। চিকিৎসার খরচ আছে, অথচ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার লোক নেই—এমন পরিস্থিতি হতে পারে। ফোন আছে, কিন্তু পড়ে যাওয়ার পরে সেটি হাতে নেওয়ার সক্ষমতা নেই—সেখানেও ভিন্ন সহায়তা দরকার।
এই কারণেই বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব শুধু “আমরা তো তাঁদের ভালোবাসি” বাক্যে শেষ করা যায় না। ভালোবাসার পাশে একটি কার্যকর পরিকল্পনাও থাকতে হয়।
শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বিদেশে যাওয়া মানুষের বৈধ আকাঙ্ক্ষা। কখনো সেই সিদ্ধান্ত পরিবারের চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করার সুযোগও তৈরি করে। সব অভিবাসনকে স্বার্থপরতা বলা বাস্তবতাকে সহজ করে দেখা হবে।
কিন্তু উন্নতির লক্ষ্য যখন জীবনের অন্য সম্পর্কগুলোকে ক্রমাগত পিছিয়ে দেয়, তখন প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। আমরা কার জন্য ভালো জীবন চাইছি? সেই ভালো জীবনের মধ্যে বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা, সঙ্গ ও মানসিক স্বস্তির জায়গা কতটুকু?
ক্যারিয়ার তখন মরীচিকার মতো হয়ে উঠতে পারে, যখন পরবর্তী সাফল্যের অপেক্ষায় বর্তমান দায়িত্ব বারবার স্থগিত হয়। আরেকটি পদোন্নতি হলে সময় দেব, আয় একটু বাড়লে ব্যবস্থা করব, পরের ছুটিতে দীর্ঘদিন থাকব—এই পরিকল্পনাগুলো আন্তরিকও হতে পারে। কিন্তু মানুষের শরীর ও আয়ু আমাদের কর্মপরিকল্পনা মেনে অপেক্ষা করে না।
এখানে ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে কাঠামোগত চাপও আছে। চাকরির অনিশ্চয়তা, ছুটির সীমাবদ্ধতা, ভিসার নিয়ম, ব্যয়বহুল যাতায়াত ও পারিবারিক অর্থনৈতিক প্রয়োজন সিদ্ধান্তকে কঠিন করতে পারে। তাই শুধু সন্তানকে অপরাধবোধে ফেললে সমস্যার সমাধান হয় না। প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যা দূরে থাকা অবস্থাতেও দায়িত্ব পালনের সুযোগ বাড়ায়।
তবু সব বাধা স্বীকার করার পর একটি দায়িত্ব থেকে যায়: নিজের অনুপস্থিতির মধ্যে মা-বাবার পাশে কে থাকবেন, তা নির্ধারণ করা। দূরত্ব অনিবার্য হতে পারে; যত্নের শূন্যতা অনিবার্য হওয়া উচিত নয়।
সামাজিক পরিবর্তনের একটি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় সমাজবিজ্ঞানী ফার্দিনান্দ টনিসের সম্প্রদায়ভিত্তিক সম্পর্ক ও আনুষ্ঠানিক সমাজের পার্থক্যের ধারণায়। সহজভাবে বললে, এক ধরনের সম্পর্কে আত্মীয়তা, পরিচিতি ও নিয়মিত মুখোমুখি থাকা গুরুত্বপূর্ণ; অন্য ধরনের সম্পর্কে কাজ, চুক্তি ও নির্দিষ্ট দায়িত্বের ভিত্তিতে যোগাযোগ চলে। বাস্তব সমাজে এই দুই ধরনের সম্পর্কই থাকে।
দাদুর গ্রামের ঘটনাটিতে নিয়মিত পরিচিতির একটি জগৎ দেখা যায়। মানুষ জানত, কার কাছে পরামর্শ পাওয়া যাবে। উত্তরার ফ্ল্যাটের ঘটনা আমাদের ভাবায়, কাছাকাছি বাস করেও মানুষ কতটা অপরিচিত থাকতে পারেন। এটি গ্রাম ভালো, শহর খারাপ—এমন সিদ্ধান্ত নয়। বরং প্রশ্নটি হলো, বদলে যাওয়া জীবনযাত্রায় পুরোনো যোগাযোগের জায়গায় নতুন কোনো সহায়তার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে কি না।
যৌথ পরিবারের সব সম্পর্ক নিরাপদ ছিল না। সেখানে দ্বন্দ্ব, নিয়ন্ত্রণ ও বৈষম্যও থাকতে পারত। আবার একক পরিবার স্বাধীনতা, গোপনীয়তা ও নিজের মতো থাকার সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু পরিবারের সদস্যসংখ্যা কমলে অসুস্থতার সময় সহায়তা দেওয়ার মানুষও কমতে পারে। ফলে যে দায়িত্ব আগে উপস্থিতির মধ্যে ভাগ হয়ে যেত, এখন তা সচেতনভাবে সংগঠিত করতে হয়।
আরেকটি প্রাসঙ্গিক ধারণা হলো ‘যত্নের নৈতিকতা’ (Ethics of Care)। এর মূল বক্তব্য, মানুষের জীবন পারস্পরিক সম্পর্ক ও নির্ভরতার মধ্যে চলে। স্বাধীন মানুষও কোনো পর্যায়ে অন্যের সাহায্য প্রয়োজন করেন। তাই নৈতিক দায়িত্ব শুধু কাউকে ক্ষতি না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রয়োজনের সময়ে সাড়া দেওয়াও তার অংশ।
এই দৃষ্টিতে অধ্যাপকের ঘটনাটি একটি পরিবারের সম্ভাব্য সংকটের পাশাপাশি আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার প্রশ্ন। একা থাকা প্রবীণ মানুষের সহায়তার প্রয়োজন শনাক্ত করার কোনো পথ আছে কি? স্থানীয় পরিচিতি, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি সহায়তার মধ্যে সংযোগ আছে কি? পরিবার দূরে থাকলে দায়িত্বের পুরো ভার ব্যক্তির একার ওপর পড়ে যাচ্ছে কি?
একা বসবাস মানেই নিঃসঙ্গ হওয়া নয়। কেউ নিজের পছন্দে একা থাকেন, নিয়মিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং নিরাপদে জীবন পরিচালনা করেন। অন্যদিকে পরিবারের মধ্যে থেকেও কেউ আবেগগতভাবে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারেন। এই পার্থক্য না বুঝলে যত্নের নামে প্রবীণ মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার ঝুঁকি থাকে।
‘সামাজিক বিচ্ছিন্নতা’ (Social Isolation) বলতে মানুষের যোগাযোগ ও সহায়তার সম্পর্ক সীমিত হওয়াকে বোঝানো হয়। ‘নিঃসঙ্গতা’ (Loneliness) হলো প্রয়োজনমতো সম্পর্ক বা সঙ্গ না পাওয়ার ব্যক্তিগত অনুভূতি। একজন মানুষের ক্ষেত্রে দুটি একসঙ্গে থাকতে পারে, আবার আলাদাও হতে পারে। তাই কতজন আত্মীয় আছেন, তার পাশাপাশি জানতে হবে—প্রয়োজনে কাকে পাওয়া যায় এবং তিনি নিজে সম্পর্কগুলো নিয়ে কেমন অনুভব করেন।
বৃদ্ধ মা-বাবা স্নেহ চান—কথাটি সত্য হতে পারে। কিন্তু তাঁদের শিশুর মতো অক্ষম ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তাঁরা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ; তাঁদের পছন্দ, গোপনীয়তা ও সিদ্ধান্তের অধিকার আছে। কোমল আচরণ প্রয়োজন, সঙ্গে সম্মানও। অনুমতি ছাড়া তাঁদের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যত্নের ভালো রূপ নয়।
যত্নের প্রশ্নটি তাই হওয়া উচিত: “আপনার কী প্রয়োজন, আমরা কীভাবে সাহায্য করতে পারি?” উত্তর শুনে ব্যবস্থা করতে হবে। কখনো প্রয়োজন চিকিৎসা, কখনো সঙ্গ, কখনো নিরাপদ চলাচল; আবার কখনো শুধু নিজের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়ার নিশ্চয়তা।
দূরে থাকা সন্তানদের জন্য একটি সহজ পারিবারিক পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। প্রবীণ মা-বাবার সম্মতি নিয়ে যোগাযোগের নিয়ম, স্থানীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা নির্ধারণ করা যায়। একজন প্রতিবেশী বা পরিচিত মানুষকে দায়িত্ব দিতে হলে তাঁর সম্মতি ও বাস্তব সক্ষমতাও জানতে হবে। নামমাত্র কাউকে যোগাযোগের ব্যক্তি লিখে রাখলে কাজ হবে না।
নিয়মিত যোগাযোগ ব্যাহত হলে কী করা হবে, তা আগেই ঠিক করা প্রয়োজন। নির্ধারিত সময়ে ফোনে পাওয়া না গেলে আবার যোগাযোগের চেষ্টা, তারপর স্থানীয় পরিচিত ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী জরুরি সহায়তা চাওয়া—এই ধাপগুলো পরিবার নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সাজাতে পারে। কোনো উত্তর না পাওয়াকে দীর্ঘ সময় স্বাভাবিক ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়।
বাড়ি বা আবাসনের ব্যবস্থাপনাও সহায়ক হতে পারে। একা থাকা প্রবীণ বাসিন্দা চাইলে জরুরি যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ, প্রয়োজনমতো খোঁজ নেওয়া এবং বিপদের লক্ষণ দেখা গেলে যথাযথ সহায়তা চাওয়ার নিয়ম করা যায়। তবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। প্রবীণ মানুষকে সারাক্ষণ নজরদারির মধ্যে রাখা এর উদ্দেশ্য নয়।
প্রযুক্তি কিছু কাজে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু যন্ত্র কেনার আগে দেখতে হবে, তিনি সেটি ব্যবহার করতে পারেন কি না এবং সংকেত গেলে কেউ সাড়া দেবেন কি না। কোনো ব্যবস্থা পরীক্ষা না করে সেটির ওপর নিশ্চিন্ত হয়ে নির্ভর করা উচিত নয়। মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের প্রয়োজনও প্রযুক্তি পুরোপুরি পূরণ করে না।
এসব কাজের পাশাপাশি স্থানীয় স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবাকে সহজলভ্য করা দরকার। পরিবারের সহায়তা নেই এমন মানুষও আছেন। তাঁদের নিরাপত্তা কেবল আত্মীয়ের সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে আমাদের প্রতিজ্ঞা শুধু শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সেই প্রতিজ্ঞার একটি ব্যক্তিগত রূপ থাকবে: মা-বাবার কথা শুনব, তাঁদের প্রয়োজন জানব, নিজের অনুপস্থিতির সময়ে সহায়তার ব্যবস্থা করব। একটি পারিবারিক রূপ থাকবে: দায়িত্ব ভাগ করব, একজন পরিচর্যাকারীকে একা সব ভার বহন করতে দেব না। একটি সামাজিক রূপ থাকবে: আশপাশের প্রবীণ মানুষকে বয়সের কারণে গুরুত্বহীন ভাবব না।
শিক্ষাতেও এই প্রতিজ্ঞা বাস্তব হতে হবে। সন্তানকে শুধু বড় চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখাব কেন? দায়িত্বশীল সম্পর্ক গড়ার দক্ষতাও শেখাতে হবে। প্রশ্ন করা, মন দিয়ে শোনা, সাহায্যের আগে অনুমতি নেওয়া এবং বিপদের সময় সাড়া দেওয়া—এসব মানবিক অভ্যাসও শিক্ষার অর্জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বয়সভিত্তিক বৈষম্য কমাতে শিক্ষা এবং বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে অর্থবহ যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
মুসলিম পরিবারের কাছে মা-বাবার সেবা আল্লাহর দেওয়া একটি মূল্যবান সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সেই উপলব্ধি যত্নের কাজে প্রকাশ পেলে তার অর্থ গভীর হয়। দেশের সব প্রবীণ মানুষের জন্য এই দায়িত্বের সামাজিক ভিত্তি হবে সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা—তিনি যে ধর্মের, যে পেশার কিংবা যে পরিবারেরই হন।
দাদুর সেই শীতের রাত আর উত্তরার বন্ধ দরজা আমার কাছে দুটি প্রশ্ন রেখে যায়। প্রথমটি জানতে চায়, প্রবীণ মানুষের অভিজ্ঞতা আমরা কতটা শুনি। দ্বিতীয়টি জানতে চায়, তাঁদের নীরবতা আমরা কতটা লক্ষ্য করি।
কাউকে ভালোবাসার সব প্রমাণ বড় আয়োজন নয়। কখনো একটি ফোন, কখনো দরজায় উপস্থিতি, কখনো প্রয়োজনের সময়ে নির্ভরযোগ্য একজন মানুষ। আমরা যেন এমন সমাজ গড়তে পারি, যেখানে একজন প্রবীণ মানুষের খোঁজ শুরু হয় তাঁর উত্তর না পাওয়া থেকে—দরজার বাইরে ছড়িয়ে পড়া গন্ধ থেকে নয়।
নোয়াখালীর একটি প্রবীণ নিবাসের কথা আমার কাছে এসেছে। বর্ণনাটি অনুযায়ী, কয়েকটি বাড়ি নিয়ে গড়ে তোলা ওই বেসরকারি আবাসনে একদল অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা একসঙ্গে থাকেন। তাঁদের মধ্যে ২৯ জন সাবেক সচিব আছেন বলে বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচয় ও বাসিন্দাদের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি; তাই এটিকে নিশ্চিত সংবাদ হিসেবে নয়, যাচাইয়ের অপেক্ষায় থাকা একটি বর্ণনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এই বর্ণনায় বলা হয়, তাঁদের অনেকের সন্তান বিদেশে স্থায়ী হয়েছেন। কারও সন্তান দেশে থাকলেও কর্মব্যস্ততার কারণে নিয়মিত সময় দিতে পারেন না। নিজেদের সঙ্গ ও নিরাপদ বসবাসের প্রয়োজন থেকে প্রবীণেরা মিলিতভাবে আবাসনের ব্যবস্থা করেছেন। সন্তানদের যোগাযোগ কম—এমন অভিযোগের কথাও এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রবীণ ও তাঁদের পরিবারের বক্তব্য ছাড়া অভিযোগগুলোর সত্যতা কিংবা প্রতিটি পরিবারের পরিস্থিতি নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
তারপরও বর্ণনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্ন সামনে আনে। অর্থ, পদমর্যাদা ও প্রতিষ্ঠিত সন্তান থাকলেই কি বার্ধক্যে মানুষের সব প্রয়োজন পূরণ হয়? চাকরিজীবনে যাঁরা বড় দায়িত্ব পালন করেছেন, অবসরে তাঁদের প্রয়োজন বদলে গেলে সমাজ ও পরিবার কি সেই পরিবর্তন বুঝতে পারে?
একসময় কর্মস্থলে একজন কর্মকর্তার উপস্থিতি বহু মানুষের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকে। অবসরের পরে সেই যোগাযোগের বড় অংশ কমে যেতে পারে। কিন্তু তাঁর নিজের পরিচয়, কথা বলার প্রয়োজন কিংবা সম্পর্কের প্রত্যাশা শেষ হয় না। পদ থেকে অবসর নেওয়া আর মানুষের জীবন থেকে অবসর নেওয়া এক বিষয় নয়।
এই বর্ণনার সবচেয়ে ভাবনার জায়গা হলো, আর্থিক সামর্থ্য এবং সম্পর্কের নিরাপত্তার মধ্যে পার্থক্য। অর্থ দিয়ে ভালো আবাসন, খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করা যায়। এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সন্তান বা প্রিয়জনের মনোযোগ একইভাবে কেনা যায় না।
সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এখানে ‘অর্থনৈতিক পুঁজি’ ও ‘সামাজিক পুঁজি’ (Social Capital) আলাদা করে দেখা যায়। অর্থনৈতিক পুঁজি বলতে আয় ও সম্পদের মতো উপকরণ বোঝায়। সামাজিক পুঁজি বলতে সম্পর্কের মাধ্যমে পাওয়া আস্থা, সহযোগিতা ও সহায়তার সুযোগ বোঝানো হয়। একজন মানুষের প্রথমটি যথেষ্ট থাকতে পারে, অথচ দ্বিতীয়টি দুর্বল হতে পারে।
বার্ধক্যের প্রস্তুতিতে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। পেনশন ও সঞ্চয়ের পরিকল্পনা প্রয়োজন, পাশাপাশি ভাবতে হয়—অসুস্থ হলে কাকে পাওয়া যাবে, কার সঙ্গে নিয়মিত কথা হবে, প্রয়োজনের সময়ে কে পাশে দাঁড়াবেন? সামাজিক সম্পর্ককে শুধু চাকরির পরিচিতি বা আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের ওপর দাঁড় করালে অবসরের পরে শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
তবে প্রবীণ মানুষের নিঃসঙ্গতার জন্য তাঁকেই দায়ী করা ঠিক নয়। সম্পর্ক গড়ে ওঠে একাধিক মানুষের অংশগ্রহণে। কর্মজীবনের সীমাবদ্ধতা, অভিবাসন, অসুস্থতা এবং পরিবারের পরিবর্তনও সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য দোষ নির্ধারণ নয়; কোথায় সহায়তার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা বোঝা।
প্রবীণেরা নিজেরা মিলে আবাসন গড়লে সেটিকে শুধু পরাজয়ের গল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। এই উদ্যোগে তাঁদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, সংগঠনের দক্ষতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতাও প্রকাশ পেতে পারে। একা থাকার পরিবর্তে পরিচিত মানুষের সঙ্গে থাকা কারও সচেতন ও স্বস্তিকর পছন্দ হতে পারে।
এখানে ‘যৌথ আবাসন’ (Co-housing) ধারণাটি প্রাসঙ্গিক। সহজভাবে বললে, ব্যক্তিগত থাকার জায়গার পাশাপাশি কিছু সেবা ও সামাজিক পরিসর ভাগ করে নেওয়া। প্রবীণদের জন্য এমন ব্যবস্থা দৈনন্দিন যোগাযোগ, সহযোগিতা ও নিরাপত্তার সুযোগ তৈরি করতে পারে। বাস্তবে কতটা সুফল হবে, তা নির্ভর করবে ব্যবস্থাপনা, সেবার মান এবং বাসিন্দাদের প্রয়োজনের ওপর। কিন্তু একই আবাসন ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। একজন নিজের পছন্দে সেখানে স্বস্তি পান। আরেকজন পরিবারের কাছে থাকার সুযোগ না পেয়ে সেখানে যান। তাই বাইরে থেকে সুন্দর ভবন দেখে সুখ নিশ্চিত করা যায় না; আবার প্রবীণ নিবাসে থাকলেই সবাই পরিত্যক্ত—এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না।
প্রশ্ন করতে হবে: সিদ্ধান্তটি কি তাঁদের নিজের? তাঁরা কি পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারছেন? প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা আছে কি? নিজের পছন্দ পরিবর্তনের সুযোগ আছে কি?
যদি তাঁরা স্বাধীনভাবে ভালো থাকার একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, সমাজের উচিত সেই উদ্যোগকে সম্মান করা। যদি আবাসনটি অনিচ্ছাকৃত বিচ্ছিন্নতার ফল হয়, তবে সম্পর্কের ঘাটতিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। একটি ভবন নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে; পারিবারিক দায়িত্বের সমাপ্তির সনদ হতে পারে না।
সামর্থ্যবান প্রবীণদের এমন অভিজ্ঞতা শুনলে মনে হতে পারে, কম আয়ের মানুষের অবস্থা নিশ্চয় আরও ভয়াবহ। কিন্তু একটি গোষ্ঠীর বর্ণনা থেকে অন্য সব গোষ্ঠীর সম্পর্কের অবস্থা নির্ধারণ করা যায় না। দরিদ্র পরিবারেও গভীর যত্ন ও সহযোগিতা থাকতে পারে। সম্পদশালী পরিবারেও আন্তরিক সম্পর্ক থাকে। আয় দিয়ে ভালোবাসার পরিমাণ মাপা যায় না।
যা বলা যায়, তা হলো—আর্থিক সীমাবদ্ধতা যত্নের ব্যবস্থা করার সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে। চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থান, যাতায়াত বা বেতনভিত্তিক পরিচর্যা দরকার হলে সীমিত আয়ের পরিবার কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়ে। মমতা থাকলেও উপকরণের অভাব থাকতে পারে। অন্যদিকে অর্থ থাকলেও নিয়মিত সঙ্গ ও দায়িত্বশীল যোগাযোগের ঘাটতি থেকে যেতে পারে।
এই দুই ধরনের সংকটের সমাধানও এক নয়। একটি পরিবারে প্রয়োজন আয় ও সেবার সহায়তা; অন্যটিতে প্রয়োজন সম্পর্ক ও উপস্থিতির পরিকল্পনা। অনেক ক্ষেত্রে দুটোই দরকার। তাই প্রবীণ নীতিতে শুধু দরিদ্রতা কিংবা শুধু নিঃসঙ্গতা—একটি বিষয় দেখলে চলবে না।
জাতিসংঘের বাংলাদেশবিষয়ক বিশ্লেষণেও প্রবীণদের জন্য আয়-নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবাকে সামাজিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পরিবারকে দায়িত্বশীল করার পাশাপাশি এই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও বজায় রাখতে হবে।
মা-বাবা সন্তানের শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠার জন্য পরিশ্রম করেন। সন্তান সফল হলে তাঁদের আনন্দ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষাগত বা পেশাগত সাফল্য নিজে থেকেই দায়িত্বশীল সম্পর্ক নিশ্চিত করে না। সেই সম্পর্কের জন্য সময়, অভ্যাস এবং সচেতন সিদ্ধান্ত লাগে।
এখানে আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য নিয়েও ভাবতে হয়। আমরা সন্তানকে প্রতিযোগিতায় এগোতে শেখাই, কিন্তু পরিবারের অসুস্থ সদস্যের প্রয়োজন বুঝতে কতটা শেখাই? উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের পরিকল্পনায় বার্ধক্যজনিত যত্নের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা হয় কি? ছেলে ও মেয়েকে কি সমানভাবে শেখানো হয় যে পরিচর্যা পরিবারের সবার দায়িত্ব?
আবার মা-বাবার আত্মত্যাগকে সন্তানের ওপর সীমাহীন নিয়ন্ত্রণের যুক্তি করা উচিত নয়। সন্তান নিজের জীবন গড়বেন, দূরে যাবেন, নিজের সিদ্ধান্ত নেবেন। সম্পর্ককে ঋণ আদায়ের হিসাব বানালে তার মানবিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দায়িত্বের ভালো ভিত্তি হলো পারস্পরিক মর্যাদা এবং প্রয়োজনের সময়ে সহায়তা।
বিদেশে থাকা সন্তান নিয়মিত যোগাযোগ, স্থানীয় পরিচর্যার ব্যবস্থা এবং জরুরি পরিকল্পনা করতে পারেন। দেশে থাকা সন্তানও বাস্তবসম্মতভাবে সময় ও দায়িত্ব ভাগ করতে পারেন। ব্যস্ততা সত্য হতে পারে; সেই সত্যের মধ্যে যত্নের ব্যবস্থা খুঁজে বের করাও দায়িত্বের অংশ।
১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস এই বর্ণনাকে করুণ দৃশ্য হিসেবে দেখার চেয়ে বড় সুযোগ দেয়। আমরা জানতে চাইতে পারি, প্রবীণেরা কী ধরনের জীবন চান এবং সেই জীবন সম্ভব করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কী করবে।
নিজ উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রবীণ আবাসনে বাসিন্দাদের সিদ্ধান্তের অধিকার, চিকিৎসা, জরুরি সহায়তা ও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। স্থানীয় সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগও রাখা যায়। আবাসন যেন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ হয়ে না ওঠে।
পরিবারের দায়িত্ব হবে তাঁদের পছন্দকে সম্মান করে সম্পর্ক বজায় রাখা। নিয়মিত যোগাযোগের সময় নির্ধারণ, সামর্থ্য অনুযায়ী সাক্ষাৎ এবং প্রয়োজনের সময়ে উপস্থিত সহায়তা নিশ্চিত করা যায়। শুধু “সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি” বলে দায়িত্ব শেষ হয় না; যাঁর জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে, তিনি কেমন আছেন—সেটিও জানতে হয়। আর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অঙ্গীকার হবে, ভালো থাকার সুযোগ যেন কেবল ব্যক্তিগত সামর্থ্যের ওপর নির্ভর না করে। যে প্রবীণ নিজের আবাসন গড়তে পারেন না, তাঁরও নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা ও যত্নের অধিকার আছে।
নোয়াখালীর এই বর্ণনা যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু যে প্রশ্নটি এটি আমাদের সামনে রাখে, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। জীবনে আমরা অনেকের জন্য ঘর তৈরি করি, ভবিষ্যৎ গড়ি, নিরাপত্তার ব্যবস্থা করি। বার্ধক্যে এসে একজন মানুষ যেন সেই গড়া জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে না থাকেন।
সব আয়োজনের মাঝেও তাঁর একটি ছোট প্রত্যাশা থাকতে পারে—কেউ সময় নিয়ে পাশে বসুক। পদমর্যাদা জানতে নয়, প্রয়োজনের তালিকা করতে নয়; শুধু তাঁর কথাটি শুনতে।
সন্ধ্যা নামলে একটি ঘরের নীরবতা কখনো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাতি জ্বলে, রান্নাঘরে খাবার থাকে, টেবিলে ওষুধও সাজানো থাকে। একজন প্রবীণ মানুষ চশমা পরে মোবাইলের পর্দার দিকে তাকান। সন্তান ফোন করবে বলেছিল। তিনি ফোনটি হাতে নেন, কিছুক্ষণ পরে আবার পাশে রাখেন। এই দৃশ্যটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জীবনের বিবরণ নয়; প্রবীণদের যত্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বোঝানোর জন্য কল্পিত পরিস্থিতি। মানুষের ভালো থাকার উপকরণ উপস্থিত থাকলেও সম্পর্কের উষ্ণতা অনুপস্থিত থাকতে পারে। বয়সের সঙ্গে প্রয়োজন বদলায়, কিন্তু আপনজনের কাছে নিজের গুরুত্ব অনুভব করার আকাঙ্ক্ষা শেষ হয় না।
প্রবীণদের জীবন নিয়ে ভাবতে গেলে আমার শৈশবের একটি স্মৃতি ফিরে আসে। আমি তখন প্রথম শ্রেণিতে পড়ি। শীতকালে গ্রামে দাদুর বাড়িতে গিয়েছি। ঘন কুয়াশার এক রাতে একজন মানুষ সামাজিক বা পারিবারিক বিষয়ে পরামর্শ নিতে দাদুর কাছে এলেন। দাদু নিজেও গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তি ছিলেন। অথচ তিনি আগন্তুককে বললেন, গ্রামে কয়েকজন ‘তিন মাথাওয়ালা মানুষ’ আছেন; তাঁদের কারও কাছে গেলে আরও ভালো পরামর্শ পাওয়া যেতে পারে। কথাটির অর্থ পরে বুঝেছি। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষগুলো বসলে তাঁদের মাথা দুই হাঁটুর কাছে নেমে আসত। মাথা ও দুই হাঁটু মিলিয়ে যেন তিনটি মাথার অবয়ব। দাদুর কথায় রসিকতা ছিল, কিন্তু তার ভেতরে ছিল অভিজ্ঞতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
সেই স্মৃতির পাশে দাঁড়ায় উত্তরার একটি ফ্ল্যাটে একা থাকা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকের মৃত্যুর বর্ণনা। আমার জানা বিবরণ অনুযায়ী, প্রতিবেশীরা দুর্গন্ধ পেয়ে পুলিশকে জানানোর পরে তাঁর মরদেহ উদ্ধার হয়। ঘটনাটির পূর্ণ তথ্য এখানে নেই; ফলে কোনো পরিবারের বিরুদ্ধে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। তবু বর্ণনাটি আমাদের ভাবায়: একজন মানুষের নীরবতা কখন উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে? তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি কিংবা যোগাযোগ বন্ধ হলে কে খোঁজ নেন? নোয়াখালীর প্রবীণ আবাসনে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একসঙ্গে থাকার যে বর্ণনা এসেছে, সেটিও যাচাইসাপেক্ষ। তবে তা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সঙ্গ ও পারস্পরিক সহায়তার প্রয়োজন নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।
এই অভিজ্ঞতা ও বর্ণনাগুলো বাংলাদেশের সব প্রবীণের জীবনের প্রতিনিধিত্ব করে না। কিন্তু এগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ প্রশ্ন আছে—বয়স বাড়ার পরে একজন মানুষের প্রয়োজন, অভিজ্ঞতা ও সিদ্ধান্তকে আমরা কতটা গুরুত্ব দিই? উত্তর খুঁজতে হলে শুধু সন্তানের আচরণ কিংবা পরিবারের আকার দেখলে হবে না। কর্মজীবনের চাপ, অভিবাসন, আয়, স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যার ব্যবস্থা এবং সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তনও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রবীণদের মর্যাদার প্রশ্নটি তাই ঘরের ভেতরের হলেও তার সমাধান ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকে না।
বার্ধক্যে সাহায্যের প্রয়োজন বাড়লে কাউকে ‘বোঝা’ হিসেবে দেখার প্রবণতা মানুষের জীবন সম্পর্কে একটি সংকীর্ণ ধারণা প্রকাশ করে। আমরা প্রত্যেকেই জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে অন্যের সহায়তায় বাঁচি। শিশুকালে সেই নির্ভরতা দৃশ্যমান থাকে; প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায়ও অসুস্থতা, সংকট কিংবা মানসিক বিপর্যয়ে সহায়তা প্রয়োজন হয়। বার্ধক্য সেই পারস্পরিক নির্ভরতার আরেকটি পর্যায়। পরিবারের একজন সদস্যের প্রয়োজন বেড়ে গেলে তাঁর মর্যাদা কমিয়ে দেওয়ার কোনো যুক্তি তৈরি হয় না।
যত্নের নৈতিকতা (Ethics of Care) এই সম্পর্কের দিকটিই বুঝতে সাহায্য করে। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষের প্রয়োজন সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সেই প্রয়োজনের প্রতি দায়িত্বশীলভাবে সাড়া দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ভালোবাসার অনুভূতি থাকলেই যত্ন সম্পূর্ণ হয় না। সেই অনুভূতি কাজে প্রকাশ করতে হয়—সময় দেওয়া, কথা শোনা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং নিজের অনুপস্থিতিতে সহায়তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে। দূরে থাকা সন্তান আন্তরিকভাবে মা-বাবাকে ভালোবাসতে পারেন; সেই ভালোবাসাকে নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থায় রূপ দেওয়াও তাঁর দায়িত্বের অংশ।
মুসলিম পরিবারের কাছে মা-বাবার সেবা একটি গভীর ধর্মীয় দায়িত্ব। সুরা আল-ইসরার ২৩–২৪ আয়াতে তাঁদের সঙ্গে সদাচরণ, বার্ধক্যে বিরক্তি প্রকাশ না করা, সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা এবং তাঁদের জন্য দোয়ার শিক্ষা রয়েছে। এই বোধ থেকে বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে থাকার সুযোগকে আল্লাহর রহমত হিসেবে গ্রহণ করা যায়। তার বাস্তব প্রকাশ ঘটে ধৈর্যে, কোমল আচরণে এবং প্রয়োজনের সময়ে উপস্থিতিতে। দায়িত্ব পালনের সুযোগটি স্থায়ী নয়—এই উপলব্ধি সেবার মূল্য আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে।
তবে সব পরিবারের আয়, সময় ও সামর্থ্য সমান নয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, দূরে চাকরি, বাসস্থানের সংকট কিংবা একাধিক অসুস্থ সদস্যের পরিচর্যা পরিবারকে চাপে ফেলতে পারে। সেই বাস্তবতা বোঝা প্রয়োজন। পরিচর্যার সব দায়িত্ব একজন নারী বা একজন সন্তানের ওপর রেখে অন্যরা কেবল পরামর্শ দিলে ন্যায্য ব্যবস্থা তৈরি হয় না। সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ, সময়, যাতায়াত ও দৈনন্দিন সহায়তার দায়িত্ব ভাগ করতে হবে। পরিচর্যাকারীর বিশ্রাম এবং সহায়তার প্রয়োজনও সেই পরিকল্পনার অংশ।
বাংলাদেশের পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩-এ খাবার, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বসবাসের পাশাপাশি সঙ্গ প্রদানকেও ভরণ-পোষণের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পিতা-মাতাকে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধ নিবাস কিংবা অন্য কোথাও বসবাসে বাধ্য না করার বিধানও রয়েছে। আইনের এই ভাষা মনে করিয়ে দেয়, যত্নের মধ্যে সম্পর্ক এবং ব্যক্তির ইচ্ছা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। পৃথকভাবে থাকা বা আবাসিক সেবা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট মানুষের প্রয়োজন, সম্মতি ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে।
পরিবারের দায়িত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্রের দায়িত্বও স্পষ্ট হওয়া দরকার। নির্ভরযোগ্য আয়, নাগালের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ চলাচল এবং মানসম্মত পরিচর্যার ব্যবস্থা পরিবারকে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করে। যাঁদের সন্তান নেই, সহায়তাকারী নেই কিংবা পরিবারে নিরাপত্তা নেই, তাঁদেরও সুরক্ষা প্রয়োজন। ধর্মীয় অনুপ্রেরণা ও পারিবারিক মমতা মূল্যবান; জনসেবার ভিত্তি হতে হবে সবার সমান অধিকার। মানুষের শেষ জীবনের নিরাপত্তা কেবল ব্যক্তিগত সৌভাগ্য বা আত্মীয়ের সদিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলতে শিক্ষার সংস্কার জরুরি। কিন্তু নতুন একটি অধ্যায় যোগ করলেই উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। শিশু যদি বইয়ে সম্মানের কথা পড়ে এবং বাড়ি বা বিদ্যালয়ে দুর্বল মানুষকে উপহাস করতে দেখে, তাহলে পাঠ ও অভিজ্ঞতার মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। তাই পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের আচরণ ও পরিবেশেও পরিবর্তন প্রয়োজন।
প্রাথমিক স্তরে শিশুকে মন দিয়ে শোনা, প্রয়োজন জিজ্ঞেস করা, অপেক্ষা করা ও বয়স নিয়ে বিদ্রূপ না করার অভ্যাস শেখানো যায়। সাহায্যের আগে অনুমতি নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রবীণকে দেখেই তাঁর হাত ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া সব সময় সহায়তা নয়। তিনি হয়তো নিজেই হাঁটতে চান। শিশুদের বোঝাতে হবে, সম্মানজনক সাহায্য অন্যের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেয়।
মাধ্যমিক স্তরে বার্ধক্য, পারিবারিক দায়িত্ব, পরিচর্যার কাজ এবং সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা করা যায়। নাগরিক শিক্ষা ও ধর্মশিক্ষায় নৈতিক দায়িত্বের সঙ্গে বাস্তব দক্ষতা যুক্ত হতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে সহায়তা চাওয়া, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা এবং আর্থিক প্রতারণা শনাক্ত করার মৌলিক শিক্ষা তরুণ ও প্রবীণ উভয়ের কাজে আসে। চিকিৎসা সম্পর্কে প্রশিক্ষণহীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার উৎসাহ দেওয়া উচিত নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বয়সভিত্তিক বৈষম্য কমাতে শিক্ষা, আইন ও নীতি এবং বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে অর্থবহ যোগাযোগকে কার্যকর কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বয়সের কারণে কাউকে কম সক্ষম বা কম মূল্যবান ধরে নেওয়াই এখানে বয়সভিত্তিক বৈষম্য বা ‘এজিজম’ (Ageism)। এই ধারণা বোঝালে শিক্ষার্থী বুঝতে পারে, কেবল ভদ্র সম্বোধন করলেই সব দায়িত্ব শেষ হয় না।
শিক্ষার্থীকে “বড় হয়ে মা-বাবার যত্ন নেব” বলানো সহজ। সেই অঙ্গীকারকে অভ্যাসে পরিণত করাই শিক্ষার কাজ। বিদ্যালয়ে একটি প্রস্তাবিত কার্যক্রম হতে পারে স্থানীয় প্রবীণদের জীবন ও কাজ সম্পর্কে জানা। শিক্ষার্থীরা সম্মতি নিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনবে, একটি বিষয় নথিবদ্ধ করবে এবং কী শিখেছে তা আলোচনা করবে। এতে প্রবীণ ব্যক্তি দয়ার পাত্র হয়ে নয়, জ্ঞানের অংশীদার হয়ে যুক্ত হবেন।
প্রজন্মের মধ্যে শেখা দুই দিকেই চলতে পারে। তরুণেরা ফোনের ব্যবহার দেখাবে; প্রবীণেরা পেশাগত অভিজ্ঞতা, স্থানীয় ইতিহাস বা কোনো দক্ষতা শেখাবেন। তবে একদিন দেখা করা আর নিয়মিত সম্পর্ক গড়া এক নয়। কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও যৌথ কাজ থাকা প্রয়োজন। শুধু ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করাই যেন প্রকল্পের প্রধান অর্জন না হয়ে যায়।
বাড়ির কাজ হিসেবে শিশু পরিবারের কোনো প্রবীণ সদস্যের পছন্দের গল্প শুনতে পারে। কিন্তু যাদের দাদা-দাদি, নানা-নানি বা মা-বাবা নেই, তাদের বিকল্প দিতে হবে। প্রতিবেশী, স্থানীয় প্রবীণ বা শিক্ষক-নির্বাচিত উপকরণ ব্যবহার করা যায়। কোনো শিশুর পারিবারিক ক্ষতি বা জটিল সম্পর্ককে শ্রেণিকক্ষে প্রকাশ করতে বাধ্য করা যাবে না। প্রবীণদের সম্মান শেখাতে গিয়ে শিশুর মর্যাদাও রক্ষা করতে হবে।
মূল্যায়নে মুখস্থ উত্তর ছাড়াও কাজের মান, শ্রবণদক্ষতা ও নিজের ধারণার পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। শিশু কি আগে ভেবেছিল সব প্রবীণ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন না? সাক্ষাতের পর তার ধারণা কি বদলেছে? এ ধরনের প্রতিফলন শেখাকে গভীর করে। শিক্ষার লক্ষ্য হবে ভবিষ্যতের দায়িত্ব সম্পর্কে দৃঢ়তা তৈরি করা, সঙ্গে সেই দায়িত্ব পালনের দক্ষতা ও বিচারবোধ গড়ে তোলা।
বাংলাদেশের পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩-এ ভরণ-পোষণের মধ্যে খাবার, বস্ত্র, চিকিৎসা, বসবাস এবং সঙ্গ প্রদান অন্তর্ভুক্ত। একাধিক সন্তানের মধ্যে আলোচনা করে দায়িত্ব নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যের নিয়মিত খোঁজ রাখা এবং পৃথকভাবে বসবাসের ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও আর্থিক সহায়তার বিধানও রয়েছে। আইনটির সংজ্ঞায় সক্ষম ও সামর্থ্যবান পুত্র বা কন্যার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষভাবে লক্ষ করার বিষয়, আইন সঙ্গ দেওয়াকেও দায়িত্বের অংশ করেছে। অর্থ পাঠানো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের সব প্রয়োজন অর্থে মেটে না। তবে আইনের ভাষা থাকলেই বাস্তবে সহায়তা সহজ হয়ে যায় না। একজন প্রবীণ ব্যক্তি কোথায় যাবেন, কাকে বলবেন এবং অভিযোগ করলে নিরাপদ থাকবেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও দরকার।
প্রবীণদের সুরক্ষায় জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও পেনশনব্যবস্থার মতো নীতিগত কাঠামো রয়েছে। জাতিসংঘের বাংলাদেশবিষয়ক বিশ্লেষণেও এসব উদ্যোগের পাশাপাশি বহু প্রবীণের সুরক্ষার বাইরে থাকার কথা বলা হয়েছে। তাই পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার পরিধি ও কার্যকারিতা যাচাই করাও প্রয়োজন।
জবাবদিহির জন্য প্রস্তাবিতভাবে দেখা যেতে পারে, প্রয়োজনীয় সেবা পেতে কত সময় লাগছে, সহায়তা যথাসময়ে পৌঁছাচ্ছে কি না এবং অভিযোগের পরে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে কি না। আবাসিক পরিচর্যাকেন্দ্রের মানও যাচাই করতে হবে। শুধু প্রতিষ্ঠানের তালিকা বা অনুষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপলে মানুষের অভিজ্ঞতা আড়ালে থেকে যায়। সুরক্ষা ব্যবস্থা কতটা কাজ করছে, তা জানার জন্য প্রবীণদের নিজেদের কথা শুনতে হবে।
পরিবর্তনের শুরু ঘরেই হতে পারে। পরিবারের প্রবীণ সদস্যের সঙ্গে বসে তাঁর প্রয়োজন, পছন্দ ও উদ্বেগ জানুন। নিয়মিত যোগাযোগ, চিকিৎসার সহায়তা, নিরাপদ বাসস্থান এবং জরুরি পরিস্থিতির পরিকল্পনা করুন। দায়িত্ব একজনের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে ভাগ করুন। অর্থের পরিকল্পনায় প্রবীণ ব্যক্তির সম্মতি ও অধিকার বজায় রাখুন। তিনি যতটা পারেন, নিজের জীবন পরিচালনা করবেন—এই সুযোগটিও যত্নের অংশ।
পাড়া ও স্থানীয় সরকার পর্যায়ে একা থাকা প্রবীণদের জন্য সম্মতিভিত্তিক খোঁজ নেওয়া, সহজ সেবা-তথ্য এবং প্রয়োজনমতো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর সহায়তা গড়ে তোলা যেতে পারে। স্থানীয় পাঠাগার, বিদ্যালয় ও সামাজিক সংগঠন নিয়মিত মিলন ও শেখার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য কাউকে নজরদারিতে রাখা নয়; প্রয়োজন হলে যেন সাহায্য পাওয়া যায়, সেই সম্পর্ক গড়ে তোলা।
রাষ্ট্রের কাজে আয়, স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যাকে সমন্বিতভাবে ভাবতে হবে। বিদ্যালয়ে ছোট পরিসরে প্রজন্মের যোগাযোগের কার্যক্রম শুরু করে ফল দেখা যেতে পারে। প্রবীণ দিবসে যেসব ঘোষণা দেওয়া হবে, পরের বছর সেগুলোর অগ্রগতি জানানো উচিত। কতটি অনুষ্ঠান হলো, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ—কতজন মানুষের দৈনন্দিন জীবন একটু সহজ হলো।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব ব্যক্তিগতও। যে মানুষটি ধীরে কথা বলেন, তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই আমরা কি উঠে যাই? যিনি সাহায্য চাইতে সংকোচ করেন, তাঁর প্রয়োজন বুঝতে চেষ্টা করি? ব্যস্ততার মধ্যে সামান্য সময় রেখে দেওয়া সব সমস্যার সমাধান নয়; কিন্তু অনেক দায়িত্বের শুরু সেখানেই।
একদিন আমরা বাড়ি ফিরতে দেরি করলে কেউ দরজার কাছে অপেক্ষা করতেন। এখন হয়তো সেই মানুষটিই আমাদের একটি ফোনের অপেক্ষায় আছেন। তাঁর জন্য বড় কোনো বক্তব্য প্রস্তুত করার আগে ফোনটি হাতে নেওয়া যায়। প্রথমে শুধু জিজ্ঞেস করি—“কেমন আছেন?” তারপর উত্তরটি শোনার জন্য একটু থামি। কারণ কোনো এক সন্ধ্যায় ফোন থাকবে, সময়ও হবে; কিন্তু ওপাশে সেই কণ্ঠটি আর থাকবে না।
পাশে থাকা বলতে সারাক্ষণ একই ঘরে থাকার বাধ্যবাধকতা বোঝায় না। একজন প্রবীণ মানুষ নিজের পছন্দে একা থাকতে পারেন, আবার যৌথ আবাসন বা পরিচর্যাকেন্দ্রেও থাকতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি প্রয়োজনের সময়ে সহায়তা পান কি না এবং তাঁর পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়া হয় কি না। একসঙ্গে বসবাস সম্পর্কের নিশ্চয়তা নয়; দূরে থাকাও সম্পর্কের সমাপ্তি নয়। যত্নের মান বুঝতে নিয়মিত যোগাযোগ, বাস্তব সহায়তা এবং ব্যক্তির অভিজ্ঞতা দেখতে হয়।
এখানে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা (Social Isolation) ও নিঃসঙ্গতার (Loneliness) পার্থক্য জানা প্রয়োজন। প্রথমটি যোগাযোগ ও সহায়তার সম্পর্ক সীমিত হওয়ার পরিস্থিতি; দ্বিতীয়টি প্রয়োজনমতো সঙ্গ বা সম্পর্ক না পাওয়ার ব্যক্তিগত অনুভূতি। পরিবারের মধ্যে থেকেও কেউ নিঃসঙ্গ হতে পারেন। আবার একা থাকলেও কেউ সক্রিয় সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন। তাই শুধু কে কোথায় থাকেন, তা জানলে যত্নের প্রয়োজন বোঝা যায় না। তাঁর নিজের কথা শুনতে হয়।
বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি মায়া দেখাতে গিয়ে তাঁদের শিশুর মতো বিবেচনা করাও ঠিক নয়। বয়স বাড়লে কেউ ধীরে হাঁটেন, কম শোনেন কিংবা নতুন প্রযুক্তি শিখতে সময় নেন। এসব কারণে তাঁর মতামত অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় না। সাহায্যের আগে অনুমতি নেওয়া, প্রয়োজন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা এবং তিনি যা নিজে করতে পারেন, তা করার সুযোগ দেওয়া সম্মানজনক পরিচর্যার অংশ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে অযথা স্বাধীনতা কমিয়ে দিলে যত্নের ভেতরেই নিয়ন্ত্রণ ঢুকে পড়ে।
দূরে থাকা পরিবারের জন্য পরিকল্পিত যোগাযোগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। প্রবীণ সদস্যের সম্মতি নিয়ে নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার সময়, স্থানীয় সহায়তাকারী এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় নির্ধারণ করা যায়। ফোনে পাওয়া না গেলে কে খোঁজ নেবেন, চিকিৎসার প্রয়োজনে কে পৌঁছাবেন—এসব আগে ঠিক থাকলে অনিশ্চয়তা কমে। প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে, তবে সেটি ব্যবহারযোগ্য কি না এবং কোনো সংকেত পেলে কেউ সাড়া দেবেন কি না, তা নিশ্চিত করতে হয়। দায়িত্বের তালিকায় একটি নাম থাকলেই বাস্তবে সহায়তা পাওয়া যাবে—এমন ধরে নেওয়া উচিত নয়।
মর্যাদার এই পরীক্ষা শিক্ষার মধ্যেও শুরু হয়। শিশু যদি দেখে, পরিবারের প্রবীণ সদস্য কথা বললে সবাই অধৈর্য হয়ে ওঠেন, সে সম্পর্কের একটি নির্দিষ্ট পাঠ পায়। আবার তাঁর বক্তব্য মন দিয়ে শোনা হলে অন্য অভ্যাস শেখে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দায়িত্বশীল করতে পাঠ্যবইয়ের বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তব আচরণে শিক্ষা দিতে হবে। প্রবীণ ও তরুণদের অর্থবহ যোগাযোগ, যৌথ কাজ এবং পারস্পরিক শেখার সুযোগ বয়সভিত্তিক বৈষম্য কমাতে সহায়ক—বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনাতেও এর গুরুত্ব রয়েছে।
প্রবীণদের সম্মান প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তরুণদের সবাইকে অবিবেচক বলা সমানভাবে অনুচিত। প্রজন্মের সম্পর্ক উন্নত হয় সংলাপে, সামগ্রিক দোষারোপে নয়। তরুণেরা নতুন দক্ষতা নিয়ে আসেন; প্রবীণেরা জীবন ও কাজের অভিজ্ঞতা ভাগ করতে পারেন। উভয়েরই সীমাবদ্ধতা আছে, শেখার সুযোগও আছে। দাদুর ‘তিন মাথাওয়ালা মানুষ’-এর স্মৃতি এই বিনয়ের পাঠ দেয়: নিজের জানা যথেষ্ট মনে না করে অন্যের অভিজ্ঞতার দিকে মনোযোগ দেওয়া।
প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে আমাদের ভাবনার দুটি দিক একসঙ্গে এগোতে হবে। একদিকে সম্পর্কের আচরণ বদলাতে হবে, অন্যদিকে যত্নের উপকরণ ও সেবা গড়ে তুলতে হবে। আন্তরিকতা ছাড়া ব্যবস্থা যান্ত্রিক হতে পারে; আবার ব্যবস্থা ছাড়া আন্তরিকতা প্রয়োজনের সময়ে অসহায় হয়ে পড়তে পারে। পরিবারের মমতা, স্থানীয় সহযোগিতা এবং রাষ্ট্রীয় সেবার মধ্যে সংযোগ তৈরি করাই এখানে মূল কাজ।
পরিবারে শুরু হতে পারে একটি মনোযোগী আলোচনার মাধ্যমে। প্রবীণ সদস্য কীভাবে থাকতে চান, কোন কাজ করতে অসুবিধা হয়, কাকে প্রয়োজনের সময়ে কাছে পান এবং কী নিয়ে উদ্বিগ্ন—এসব জানতে হবে। তারপর দায়িত্ব ভাগ করে যোগাযোগ, চিকিৎসা ও জরুরি সহায়তার পরিকল্পনা করা যায়। তিনি যতটা সম্ভব নিজের সিদ্ধান্ত নেবেন; সহায়তা সেই সিদ্ধান্তকে নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত করতে কাজ করবে। পরিবারের জটিল ইতিহাস বা নিরাপত্তার সমস্যা থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী পৃথক বসবাস ও পেশাগত সহায়তার প্রয়োজনও বিবেচনা করতে হবে।
বিদ্যালয়ে প্রবীণদের সঙ্গে শেখার কার্যক্রম গড়ে তোলা যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা সম্মতি নিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনবে, প্রশ্ন করবে, স্থানীয় ইতিহাস বা দক্ষতা নথিবদ্ধ করবে এবং প্রাসঙ্গিক তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে। এতে শ্রদ্ধা ও সমালোচনামূলক চিন্তা একসঙ্গে চর্চা হবে। কোনো শিশুকে তার পারিবারিক ক্ষতি বা জটিল সম্পর্ক প্রকাশ করতে বাধ্য করা যাবে না; অংশগ্রহণের বিকল্প রাখতে হবে। দায়িত্বশীল মানুষ গড়ে তোলার শিক্ষা নিজেও মর্যাদাপূর্ণ হতে হবে।
স্থানীয় সমাজ ও রাষ্ট্রের কাজে প্রয়োজন সহজে পাওয়া যায় এমন সেবা এবং কার্যকর জবাবদিহি। একা থাকা প্রবীণদের সম্মতিভিত্তিক খোঁজ, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবার তথ্য, নিরাপদ যাতায়াত এবং পরিচর্যার সহায়তা গড়ে তোলা যায়। আবাসিক সেবায় বাসিন্দাদের স্বাধীনতা, অভিযোগ জানানোর সুযোগ ও সেবার মান গুরুত্ব পাবে। ঘোষণার সাফল্য বিচার করতে হবে মানুষের অভিজ্ঞতা দিয়ে—সহায়তা সময়মতো মিলছে কি না, প্রয়োজন পূরণ হচ্ছে কি না এবং অভিযোগের পরে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে কি না।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের অঙ্গীকার তখনই স্থায়ী অর্থ পাবে, যখন তা পরের দিনের কাজেও থাকবে। পরিবারের নিয়মিত যোগাযোগ, বিদ্যালয়ের শেখার অভ্যাস, স্থানীয় সহায়তা এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার মধ্যে সেই অঙ্গীকারকে জায়গা দিতে হবে। প্রবীণেরা কেমন আছেন, তার উত্তর অনুমান করে নেওয়ার পরিবর্তে তাঁদের কাছ থেকেই জানতে হবে।
দাদুর সেই শীতের রাত আমার কাছে অভিজ্ঞতার মূল্য বোঝার একটি স্মৃতি। উত্তরার বন্ধ দরজার বর্ণনা মানুষের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করার দায়িত্ব নিয়ে ভাবায়। আর প্রবীণদের নিজেদের আবাসন গড়ার আলোচনা মনে করিয়ে দেয়, বয়স বাড়লেও মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারেন এবং নতুনভাবে জীবন সাজাতে পারেন। এসবের মধ্যে পার্থক্য আছে; তবু একটি মানবিক প্রশ্ন তাদের যুক্ত করে—এই জীবনের মধ্যে আপনজন ও সমাজের কাছে তাঁর স্থান কতটুকু?
মা-বাবার আত্মত্যাগকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা প্রয়োজন। সেই স্মরণ যেন সন্তানের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের হিসাব না হয়ে, প্রয়োজনের সময়ে দায়িত্বশীল হওয়ার প্রেরণা হয়। একইভাবে প্রবীণদের যত্ন পাওয়ার জন্য অতীতের অবদান প্রমাণ করতে হবে না। স্মৃতি দুর্বল হলেও, কথা বলতে অসুবিধা হলেও কিংবা আর কোনো কাজ করতে না পারলেও তাঁর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে। পাশে থাকার অর্থ সেই মর্যাদাকে দৈনন্দিন আচরণে স্বীকার করা।
আমাদের জীবনেও এমন সময় আসতে পারে, যখন দ্রুত চলার বদলে কারও সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে হবে, কথা বোঝাতে একটু বেশি সময় লাগবে কিংবা একটি ফোনের অপেক্ষা দীর্ঘ মনে হবে। আজকের প্রবীণদের জন্য আমরা যে সম্পর্ক ও ব্যবস্থা তৈরি করি, তা আমাদের ভবিষ্যৎ সমাজের চরিত্রও নির্ধারণ করে। এই উপলব্ধি ভয় থেকে নয়, মানুষের জীবন সম্পর্কে সংবেদনশীলতা থেকে আসা প্রয়োজন।
আজ হয়তো একটি ফোন করা যায়। কথার শুরু হতে পারে পরিচিত প্রশ্নে—“কেমন আছেন?” তারপর নিজের কাজের তাড়া সামান্য সরিয়ে উত্তরটি শোনা যায়। কারণ যত্নের একটি বড় অংশ কোনো কথা বলার মধ্যে নয়, অন্যের কথার জন্য সময় রাখার মধ্যে থাকে। একদিন সেই পরিচিত কণ্ঠ আর পাওয়া যাবে না। যতদিন পাওয়া যাচ্ছে, ততদিন তার জন্য আমাদের সময়টুকুও পাওয়া যাক।
#অধিকারপত্র #Odhikarpatra #বাংলাদেশ #Bangladesh #আন্তর্জাতিকপ্রবীণদিবস #InternationalDayOfOlderPersons #প্রবীণদেরমর্যাদা #OlderPersons #প্রবীণঅধিকার #ElderRights #মাবাবারযত্ন #CareForParents #সম্মানজনকবার্ধক্য #AgeingWithDignity #স্বাস্থ্যকরবার্ধক্য #HealthyAgeing #শিক্ষাসংস্কার #EducationReform #প্রজন্মেরবন্ধন #IntergenerationalSolidarity #সামাজিকসুরক্ষা #SocialProtection #প্রবীণনির্যাতনপ্রতিরোধ #StopElderAbuse