10/06/2026 বইয়ের দোকানে তালা, ইতিহাসের দরজায় প্রশ্ন, আর প্রশ্নের মুখে পাঠের স্বাধীনতা: ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিয়ে কেন এত ভয়?│ বইয়ের সঙ্গে দ্বিমত, পাঠের অধিকারে বাধা কেন?
Dr Mahbub
৪ October ২০২৬ ২৩:১৪
একটি বইকে ‘নিষিদ্ধ’ দাবি করলেই কি তার বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া যায়? শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিতে বাধা, ইউপিএলের বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে তালা এবং দুই কর্মীকে হয়রানির অভিযোগ ঘিরে সামনে এসেছে প্রকাশনার স্বাধীনতা, পাঠকের অধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। দেশি–বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, প্রকাশকদের অবস্থান, নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি পর্যালোচনা করেছে এই বিশেষ ফিচার। পাশাপাশি রয়েছে বইটির ঐতিহাসিক ও গবেষণামূল্য, আত্মজীবনীকে সমালোচনামূলকভাবে পাঠের প্রয়োজনীয়তা এবং বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে সম্ভাব্য প্রভাবের বিশ্লেষণ। কোনো বইয়ের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও কেন তার প্রকাশ, বিক্রি ও পাঠের স্বাধীনতা রক্ষা জরুরি—সেই মৌলিক প্রশ্নের অনুসন্ধান।
কোনো বইকে পাঠকের কাছ থেকে সরিয়ে দিতে সব সময় সরকারি গেজেট, আদালতের নিষেধাজ্ঞা কিংবা আনুষ্ঠানিক সেন্সরশিপের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো একটি দোকানের সামনে কয়েকজন মানুষের উপস্থিতি, বিক্রয়কর্মীকে ভয় দেখানো, শাটার নামিয়ে দেওয়া, পুলিশের কাছে নিয়ে যাওয়া কিংবা ভবিষ্যতে বইটি বিক্রি করলে বিপদ হতে পারে—এমন একটি অনিশ্চিত পরিবেশ তৈরি করাই যথেষ্ট। আইনের পাতায় বইটি তখনো বৈধ, প্রকাশকের তালিকায় বইটি তখনো আছে, কিন্তু বইয়ের দোকানের কর্মী সেটি তাক থেকে বের করতে ভয় পান; পরিবেশক নিতে চান না; প্রকাশক নতুন সংস্করণ প্রকাশের আগে দ্বিতীয়বার ভাবেন; আর পাঠকও বুঝে যান, এই বইটি চাওয়া হয়তো ঝুঁকিমুক্ত নয়। এভাবেই একটি বই আইনত নিষিদ্ধ না হয়েও কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে যেতে পারে।
ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে ঘিরে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ঘটনাটি এই পার্থক্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। ইউপিএল প্রকাশ্যে জানিয়েছে, বইটি সরকার বা আদালতের কোনো সিদ্ধান্তে নিষিদ্ধ—এমন তথ্য তাদের জানা নেই; বরং কেউ বৈধভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তারা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। অথচ প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী কয়েকজন ব্যক্তি বইটিকে ‘নিষিদ্ধ’ দাবি করে বিক্রি বন্ধ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন, শাটার নামিয়ে দেন এবং দুই কর্মীকে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানেই প্রশ্নটি নিছক একটি বইয়ের নয়; প্রশ্ন হলো—আইন যা নিষিদ্ধ করেনি, সামাজিক বা রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করে তা কি নিষিদ্ধের মতো করে তোলা যাবে?
প্রথাগত অর্থে censorship বা সেন্সরশিপ বলতে সাধারণত রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কোনো বক্তব্য, প্রকাশনা, সংবাদ, শিল্পকর্ম বা তথ্য প্রচার নিয়ন্ত্রণ কিংবা নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াকে বোঝানো হয়। কিন্তু আধুনিক সমাজে মতপ্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ শুধু রাষ্ট্রের সরাসরি আদেশের মাধ্যমেই ঘটে না। রাজনৈতিক সংগঠন, ধর্মীয় গোষ্ঠী, প্রভাবশালী ব্যক্তি, অনলাইন জনতা, স্থানীয় শক্তিকেন্দ্র কিংবা সংগঠিত মবও এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে যেখানে আইনি নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই প্রকাশক, লেখক, সম্পাদক বা বই বিক্রেতা নিজেরাই কিছু বিষয় এড়িয়ে চলতে শুরু করেন।
এই পরিস্থিতিকে informal censorship, extra-legal censorship কিংবা কোনো কোনো প্রেক্ষাপটে mob censorship হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। এখানে আনুষ্ঠানিক censor-এর জায়গা নেয় ভয়। কোনো সরকারি কর্মকর্তা হয়তো বলেননি, ‘বইটি বিক্রি করা যাবে না’; কিন্তু প্রকাশক যদি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে বইটি বিক্রি করলে তাঁর দোকান আক্রান্ত হতে পারে, কর্মচারী হেনস্তার শিকার হতে পারেন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে হয়রানির মুখে পড়তে পারেন, তাহলে সেই ভয়ই কার্যত নিষেধাজ্ঞার কাজ করে।
UPL-ঘটনার বিষয়ে The Daily Star-এর একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণের শিরোনামই এই বাস্তবতাকে যথার্থভাবে ধারণ করেছে—“The UPL incident shows how to ban a book without banning it.” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বইটি নিষিদ্ধ নয় এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও এর বিক্রির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই বলে জানিয়েছেন। তবু ঘটনাস্থলে বইটি বিক্রি নিয়ে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, সেটিই দেখায় কীভাবে আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই প্রকাশনা ও বিপণনের স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে।
এই ধরনের পরিস্থিতি বোঝার জন্য মানবাধিকার ও সাংবিধানিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো chilling effect। সহজ ভাষায়, যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনসম্মত একটি অধিকার ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু সম্ভাব্য প্রতিশোধ, মামলা, হুমকি, সামাজিক আক্রমণ, প্রশাসনিক হয়রানি কিংবা অনিশ্চিত পরিণতির আশঙ্কায় সেই অধিকার প্রয়োগ থেকে নিজেই বিরত থাকে—তখন তাকে chilling effect বলা যায়।
চিলিং ইফেক্টের শক্তি এখানেই যে, কাউকে সব সময় সরাসরি নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন পড়ে না। একজন লেখককে একবার আক্রমণ করা হলে আরও দশজন লেখক বিতর্কিত বিষয় এড়িয়ে যেতে পারেন। একটি বইয়ের দোকানকে একবার হুমকি দেওয়া হলে আরও বিশটি দোকান একই বই তাক থেকে সরিয়ে ফেলতে পারে। একটি প্রকাশককে একবার চাপ দেওয়া হলে অন্য প্রকাশকের সম্পাদকীয় বোর্ড এমন পাণ্ডুলিপি গ্রহণের সময় সাবধান হয়ে যেতে পারে। এইভাবে একটি ঘটনার প্রভাব তার প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগীর সীমানা ছাড়িয়ে পুরো knowledge ecosystem-এ ছড়িয়ে পড়ে।
সুতরাং চিলিং ইফেক্টের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ হলো self-censorship—নিজেকে নিজে সেন্সর করা। বাইরে থেকে কেউ আর নির্দেশ দেয় না; ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য বিপদের হিসাব করে নিজেই নীরব হয়। একজন প্রকাশক ভাবেন, ‘এই বইটি প্রকাশ না করলেই ঝামেলা কম’; একজন শিক্ষক বলেন, ‘এই বিষয়টি শ্রেণিকক্ষে না বলাই ভালো’; একজন সাংবাদিক মনে করেন, ‘এই প্রশ্নটি বাদ দিই’; একজন গবেষক বিতর্কিত তথ্য উদ্ধৃত না করার সিদ্ধান্ত নেন। তখন সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কাগজে অক্ষুণ্ণ থাকলেও বাস্তবে তার পরিসর ক্রমশ সংকুচিত হয়।
এখানে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনুচ্ছেদ ৩৯(১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে এবং ৩৯(২) নাগরিকের বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি কিংবা অপরাধে প্ররোচনার মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে “আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ” অনুমোদিত।
এই ভাষার তাৎপর্য গভীর। সংবিধান বলেনি যে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল, সংগঠন বা উত্তেজিত জনতা তাদের নিজস্ব ধারণার ভিত্তিতে মতপ্রকাশের ওপর সীমা নির্ধারণ করতে পারবে। সীমাবদ্ধতা থাকলে তা হতে হবে আইনসম্মত, যুক্তিসঙ্গত এবং নির্দিষ্ট সাংবিধানিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে কোনো বই নিয়ে আপত্তি থাকাই তাকে নিষিদ্ধ করে না। কোনো গোষ্ঠী একটি বইকে ‘ক্ষতিকর’, ‘অগ্রহণযোগ্য’, ‘ইতিহাসবিরোধী’ বা ‘রাজনৈতিকভাবে আপত্তিকর’ মনে করলেও সেই মূল্যায়ন নিজে থেকে আইনি নিষেধাজ্ঞায় পরিণত হয় না।
সংবিধানের ৪০ অনুচ্ছেদও এখানে পরোক্ষভাবে প্রাসঙ্গিক। এটি আইনের দ্বারা আরোপিত সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে নাগরিকের বৈধ পেশা, বৃত্তি ও ব্যবসা পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত করে। একটি বৈধ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কিংবা বইয়ের দোকানের আইনসম্মত ব্যবসা যদি বলপ্রয়োগ বা হুমকির মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত হয়, তবে সেটি কেবল মতপ্রকাশের প্রশ্ন নয়; বৈধ অর্থনৈতিক ও পেশাগত কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নও।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আমরা অনেক সময় শুধু বক্তা বা লেখকের অধিকার হিসেবে দেখি। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো এই অধিকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে—পাঠক বা শ্রোতার তথ্য ও মত গ্রহণ করার অধিকার।
বাংলাদেশ ২০০০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর International Covenant on Civil and Political Rights বা ICCPR-এ যোগ দেয়। ICCPR-এর ১৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে শুধু তথ্য ও ধারণা প্রকাশ করা নয়, বরং তা seek, receive and impart—অর্থাৎ অনুসন্ধান, গ্রহণ ও প্রচারের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক ব্যাখ্যায় বই, সংবাদপত্র, পুস্তিকা এবং অন্যান্য প্রকাশিত মাধ্যমও এই সুরক্ষার আওতায় পড়ে।
এর অর্থ হলো, একটি বইয়ের প্রকাশক বা লেখকের স্বাধীনতার পাশাপাশি একজন নাগরিকের সেই বইটি পড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন নাগরিক শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়তে চাইতে পারেন, আবার একই সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করা কোনো বইও পড়তে চাইতে পারেন। অন্য একজন জিয়াউর রহমান, মওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন আহমদ কিংবা বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্য কোনো ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী বই পাশাপাশি পড়তে চাইতে পারেন। গণতান্ত্রিক জ্ঞানব্যবস্থায় রাষ্ট্র বা কোনো রাজনৈতিক শক্তির দায়িত্ব পাঠকের হয়ে ‘সঠিক ইতিহাস’ নির্বাচন করা নয়; বরং বিভিন্ন তথ্য, দলিল ও মতামতের কাছে যাওয়ার নিরাপদ সুযোগ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলো ইতিহাস ও জ্ঞানচর্চাকে দলীয় ক্ষমতার সঙ্গে বাঁধার প্রবণতা। এক সরকার ক্ষমতায় এসে নিজের পছন্দের ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, ভাষ্য এবং প্রকাশনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে প্রাধান্য দেয়; আরেক সরকার এসে পূর্ববর্তী সময়ের বই ও প্রতীক সরিয়ে নতুন তালিকা তৈরি করে। এর ফলে ইতিহাস হয়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও প্রমাণের ক্ষেত্র নয়, বরং ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত একটি political inventory।
২০২৬ সালের জুলাইয়েই সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসংক্রান্ত তিনটি বই রাখার পূর্ববর্তী নির্দেশনা সমালোচনার মুখে বাতিল করে। এ বিতর্কেও অতীতের ক্ষমতাসীন দলের সময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে দেওয়ার চর্চার সঙ্গে তুলনা উঠেছিল। বিষয়টি দেখায়, সমস্যাটি কোনো একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে ইতিহাসের দৃশ্যমানতা নিয়ন্ত্রণের একটি পুনরাবৃত্ত প্রবণতা রয়েছে।
এ কারণেই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নীতি হওয়া উচিত replacement নয়, plurality—এক ইতিহাসকে সরিয়ে অন্য ইতিহাস বসানো নয়, বরং বহুমাত্রিক দলিল ও ব্যাখ্যাকে পাশাপাশি রাখা। একটি লাইব্রেরিতে শেখ মুজিবের আত্মজীবনী থাকবে, তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকার সমালোচনাও থাকবে; জিয়াউর রহমানকে নিয়ে প্রশংসামূলক গবেষণা থাকবে, সমালোচনামূলক মূল্যায়নও থাকবে; মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন, বাকশাল, সামরিক শাসন কিংবা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাশাপাশি থাকবে। কারণ ইতিহাসের জবাব ইতিহাস দিয়েই দিতে হয়—তাক খালি করে নয়।
রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে আদালত, আইন, গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির কিছু কাঠামো থাকে। কিন্তু mob censorship আরও জটিল, কারণ এর কোনো স্বচ্ছ আদেশ নেই, লিখিত সিদ্ধান্ত নেই, আপিল করার কর্তৃপক্ষও নেই। একটি গোষ্ঠী কোনো বইকে ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করতে পারে, যদিও রাষ্ট্র তা করেনি; তারা কোনো অনুষ্ঠান বন্ধ করতে পারে, যদিও আদালতের কোনো আদেশ নেই; কোনো বক্তার বক্তব্য ঠেকিয়ে দিতে পারে, যদিও তিনি আইন ভঙ্গ করেননি। অর্থাৎ মব নিজেরাই একই সঙ্গে অভিযোগকারী, বিচারক এবং শাস্তিদাতা হয়ে ওঠে।
এখানেই আইনের শাসনের সঙ্গে মব শাসনের মৌলিক সংঘাত। Rule of law বলে—কোনো অধিকার সীমিত করতে হলে পূর্বনির্ধারিত আইন, বৈধ কর্তৃপক্ষ ও প্রক্রিয়া প্রয়োজন। Mob rule বলে—যার সংগঠিত শক্তি বেশি, তার দাবিই তাৎক্ষণিক নিয়ম। প্রথমটি নাগরিককে পূর্বানুমানযোগ্য নিরাপত্তা দেয়; দ্বিতীয়টি তৈরি করে অনিশ্চয়তা। আর অনিশ্চয়তাই chilling effect-এর সবচেয়ে উর্বর ভূমি।
UPL-ঘটনার পর শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করার প্রবণতা ভয় ও সংঘাতের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। The Daily Star-এর সম্পাদকীয়ও ঘটনাটিকে প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচনা করে প্রকাশক ও বই বিক্রেতাদের নিরাপত্তা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে রাষ্ট্রের দায়িত্বকে শুধু একটি negative obligation—অর্থাৎ ‘রাষ্ট্র নিজে বাধা দেবে না’—হিসেবে দেখলে আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাস্তবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের positive obligation-ও রয়েছে: অন্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সহিংসতা, ভয়ভীতি বা বেআইনি চাপের কারণে নাগরিকের অধিকার যেন অকার্যকর না হয়ে পড়ে, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা।
অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজে কোনো বই নিষিদ্ধ না করলেও যদি একটি গোষ্ঠী নিয়মিত বইয়ের দোকানে গিয়ে কোন বই বিক্রি হবে তা নির্ধারণ করতে পারে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা কার্যকরভাবে প্রকাশক ও বিক্রেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত মতপ্রকাশের বাস্তব ক্ষেত্র সংকুচিতই হয়। অধিকার তখন কাগজে থাকে, কিন্তু ব্যবহারযোগ্য থাকে না।
এই কারণেই UPL-এর মতো ঘটনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার মানদণ্ড হওয়া উচিত শুধু ‘বইটি নিষিদ্ধ নয়’ ঘোষণা করা নয়। প্রয়োজন ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের শনাক্তকরণ, আইনের প্রয়োগ এবং প্রকাশক, বই বিক্রেতা, লেখক ও পাঠকদের কাছে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া—কোনো বইয়ের বৈধতা নির্ধারণের অধিকার রাস্তার কোনো দল বা মবের নেই।
Mob censorship-এর সবচেয়ে বড় বিপদ তার precedent effect। যদি সমাজ মেনে নেয় যে রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় একটি বই ভয় দেখিয়ে তাক থেকে সরানো যায়, তাহলে পরবর্তী ধাপে একই কৌশল অন্য বইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা আরও সহজ হয়। এরপর বই থেকে বিষয়টি চলে যেতে পারে নাটক, চলচ্চিত্র, গবেষণাপত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতা, ইতিহাসের পাঠ্যক্রম কিংবা সংবাদ প্রতিবেদনে।
আজ কেউ বলতে পারে, শেখ মুজিবের একটি বই রাখা যাবে না। কাল আরেক পক্ষ বলতে পারে জিয়াউর রহমানকে নিয়ে একটি বই সরাতে হবে। অন্যদিন কেউ মুক্তিযুদ্ধের একটি গবেষণা নিয়ে আপত্তি তুলবে; আবার অন্য কোনো শক্তি ধর্ম, নারী অধিকার, জাতিগত সংখ্যালঘু, লিঙ্গ, রাষ্ট্রনীতি কিংবা মানবাধিকার নিয়ে প্রকাশনা ঠেকাতে চাইবে। একবার যদি আমরা নীতি হিসেবে স্বীকার করি যে ভয় প্রদর্শনের মাধ্যমে জ্ঞানের সীমা নির্ধারণ করা যায়, তাহলে সেই অস্ত্রটির মালিকানা কোনো একটি রাজনৈতিক পক্ষের হাতে থাকবে না।
সেই কারণেই বাক্স্বাধীনতার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা নিজের পছন্দের বক্তব্য রক্ষা করা নয়; বরং যে বক্তব্য, বই বা ইতিহাস-ব্যাখ্যার সঙ্গে আমি গভীরভাবে দ্বিমত করি, তার আইনসঙ্গতভাবে অস্তিত্ব বজায় রাখার অধিকার স্বীকার করা। গণতন্ত্রের শক্তি ঐকমত্যে নয়, শান্তিপূর্ণ মতবিরোধ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতায়।
কোনো বইয়ে ইতিহাস বিকৃত হয়েছে—এমন অভিযোগ থাকতেই পারে। পাণ্ডুলিপির প্রামাণিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কোনো আত্মজীবনীর স্মৃতিচারণ অসম্পূর্ণ, পক্ষপাতদুষ্ট বা আত্মপক্ষসমর্থনমূলক হতে পারে। গবেষকের কাজ সেগুলো পরীক্ষা করা; ইতিহাসবিদের কাজ অন্য দলিল সামনে আনা; সমালোচকের কাজ যুক্তি দিয়ে দুর্বলতা চিহ্নিত করা। কিন্তু এসব প্রশ্নের কোনো উত্তরই বইয়ের দোকানে গিয়ে শাটার নামিয়ে দেওয়া নয়।
সভ্য জ্ঞানচর্চার নিয়ম অত্যন্ত সরল: একটি বইয়ের বিরুদ্ধে আরেকটি বই লিখুন; একটি দলিলের বিপরীতে আরেকটি দলিল হাজির করুন; একটি ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে গবেষণাভিত্তিক বিকল্প ব্যাখ্যা দিন। পাঠককে নির্বাচন করতে দিন। পাঠকের হাতে যত বেশি উৎস থাকবে, ইতিহাস তত বেশি বহুমাত্রিক ও সমালোচনামূলক হবে।
অন্যদিকে একটি বই সরিয়ে দিলে বইটির বক্তব্য খণ্ডন হয় না; বরং অনেক সময় সেটিকে আরও রহস্যময় ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে তোলা হয়। নিষেধাজ্ঞা বা দমন ইতিহাসের সত্য নির্ধারণ করে না—শুধু মানুষের জানার সুযোগ সংকুচিত করে।
UPL-এর বাংলাবাজারের ঘটনাকে তাই কেবল শেখ মুজিবুর রহমান, আওয়ামী লীগ কিংবা অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে কেন্দ্র করে দেখলে এর বৃহত্তর বিপদটি ধরা পড়বে না। প্রকৃত প্রশ্ন হলো: বাংলাদেশে কোনো বৈধ বই বাজারে থাকবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত কার?
যদি উত্তর হয়—আইন, আদালত, প্রকাশনা-নৈতিকতা এবং পাঠকের স্বাধীন সিদ্ধান্ত—তবে একটি গণতান্ত্রিক জ্ঞানসমাজের ভিত্তি অক্ষুণ্ণ থাকে। কিন্তু যদি উত্তর হয়ে দাঁড়ায়—যে গোষ্ঠী মুহূর্তে বেশি শক্তি প্রদর্শন করতে পারবে—তবে সেখানে বইয়ের স্বাধীনতা, গবেষণার স্বাধীনতা এবং শেষ পর্যন্ত চিন্তার স্বাধীনতাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
সুতরাং UPL-ঘটনা আমাদের একটি বড় সতর্কবার্তা দেয়: সেন্সরশিপের সবচেয়ে বিপজ্জনক রূপ কখনো কখনো সেই সেন্সরশিপ, যার কোনো সরকারি আদেশই নেই। তার কোনো কালো তালিকা নেই, কিন্তু বই অদৃশ্য হয়; কোনো আইন নেই, কিন্তু মানুষ ভয় পায়; কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা নেই, কিন্তু প্রকাশক নিজেই পিছু হটে। এই অদৃশ্য নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা হলো আইনের শাসন, বহুমতের প্রতি সহিষ্ণুতা, প্রতিষ্ঠানগত সাহস এবং পাঠকের জানার অধিকারের প্রতি নিঃশর্ত শ্রদ্ধা। কারণ বইয়ের তাককে যদি মব নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, একসময় মানুষের মনেও অদৃশ্য তালা পড়ে।
ক্ষমতার পরিবর্তন কি শুধু সরকার বদলায়, নাকি তার সঙ্গে বদলে যায় জাতির অতীত দেখার আয়নাও? বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রশ্নটি বারবার ফিরে এসেছে। সরকার পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় দপ্তরের দেয়ালে কার ছবি থাকবে, পাঠ্যপুস্তকে কার নাম কতবার আসবে, কোন রাজনৈতিক ঘটনাকে ‘গণ-অভ্যুত্থান’, কোনটিকে ‘বিপ্লব’, কোনটিকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলা হবে, কোন নেতার ভূমিকা বড় করে দেখা হবে, কার অবদান নীরবে ছোট হয়ে যাবে—এসব সিদ্ধান্ত কখনোই নিছক সম্পাদনার বিষয় নয়। এগুলো Memory Politics বা স্মৃতির রাজনীতির অংশ: অতীতের কোন অংশ জাতির সম্মিলিত স্মৃতিতে দৃশ্যমান থাকবে এবং কোন অংশ প্রান্তে সরে যাবে, সেই ক্ষমতার রাজনীতি।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের বিক্রয়কেন্দ্রে অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে ঘিরে সৃষ্ট ঘটনাটি আরও বৃহত্তর তাৎপর্য বহন করে। প্রশ্নটি কেবল একটি বই বিক্রির নয়; এর পেছনে রয়েছে আরও মৌলিক একটি টানাপোড়েন—রাজনৈতিক শাসন বদলালে কি পূর্ববর্তী সময়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, দলিল, বই এবং ঐতিহাসিক বয়ানও জনপরিসর থেকে সরিয়ে দিতে হবে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে ইতিহাস আর গবেষণার ক্ষেত্র থাকে না; সেটি ক্রমে ক্ষমতার সঙ্গে বদলে যাওয়া একটি রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী মরিস হালবওয়াকসের collective memory ধারণা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে মানুষ শুধু ব্যক্তিগতভাবে অতীত মনে রাখে না; পরিবার, প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, রাষ্ট্র, ধর্ম, গণমাধ্যম ও সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্য দিয়েও অতীতকে মনে রাখা শেখে। পরে পিয়ের নোরা তাঁর lieux de mémoire বা ‘স্মৃতির স্থান’ ধারণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, স্মৃতিসৌধ, দিবস, জাদুঘর, বই, ছবি, নাম, ভাষণ—এসবই একটি সমাজের স্মৃতি নির্মাণের বাহক। ফলে পাঠ্যপুস্তকের একটি অধ্যায় কিংবা বইয়ের দোকানের একটি তাক আপাতদৃষ্টিতে ছোট বিষয় হলেও তা বৃহত্তর জাতীয় স্মৃতির অংশ।
কিন্তু collective memory আর history এক জিনিস নয়। স্মৃতি আবেগ, পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান ও বর্তমান প্রয়োজনের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। ইতিহাসচর্চার লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই স্মৃতিকে দলিল, প্রমাণ, বহুমাত্রিক উৎস এবং সমালোচনামূলক পদ্ধতির মাধ্যমে পরীক্ষা করা। সমস্যাটি শুরু হয় যখন রাষ্ট্র বা কোনো রাজনৈতিক শক্তি নিজের পছন্দের collective memory-কেই একমাত্র অনুমোদিত history হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তখন অতীত আর প্রশ্ন করার জায়গা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে আনুগত্য পরীক্ষার ক্ষেত্র।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তনগুলো এই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাঠ্যপুস্তকে বড় ধরনের পরিমার্জন শুরু হয়। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ থেকে নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ইতিহাসের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; একই সঙ্গে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান নিয়েও নতুন লেখা যুক্ত হয়েছে। আবার বিভিন্ন শ্রেণির বইয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে ব্যবহৃত ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং অষ্টম শ্রেণির সাহিত্যকণিকা থেকে ৭ মার্চের ভাষণ-নির্ভর ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ গদ্যটি বাদ পড়েছে।
এখানে দুটি বিষয় পৃথক করা প্রয়োজন। প্রথমত, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মতো জাতীয় জীবনে বড় প্রভাব ফেলা সাম্প্রতিক ঘটনাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ইতিহাস শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা অস্বাভাবিক নয়। ইতিহাস কোনো নির্দিষ্ট বছরে থেমে থাকে না; নতুন ঘটনা তার অংশ হয়। একইভাবে দীর্ঘদিন যথেষ্ট গুরুত্ব না পাওয়া রাজনৈতিক ঘটনা, নেতা বা সামাজিক আন্দোলনকে নতুন গবেষণার আলোকে পাঠ্যক্রমে সংযোজনও প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় প্রশ্নটি আরও জটিল: নতুন বিষয় যোগ করার জন্য কি পুরোনো বিষয় সরিয়ে ফেলতেই হবে? এখানেই addition এবং replacement-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য।
একটি pluralistic ইতিহাস শিক্ষা বলবে—জুলাই ২০২৪ যুক্ত করুন, ১৯৯০ যুক্ত করুন, ১৯৭১-এর বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত করুন, জিয়া, ভাসানী, তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, নারী মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, সাধারণ মানুষ—সবার ভূমিকাকে সামনে আনুন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে অন্য কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে অদৃশ্য করে দিতে হবে। ইতিহাসের পরিসর zero-sum game নয়—একজনকে জায়গা দিতে হলে আরেকজনকে ইতিহাস থেকে সরিয়ে দেওয়াই তার অনিবার্য শর্ত নয়।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রণয়নাধীন পাঠ্যবইয়েও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসছে। ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত এনসিটিবির প্রস্তুতি অনুযায়ী, নতুন বইগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে খালেদা জিয়ার ভূমিকা এবং জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অক্টোবরের শুরুতেও কিছু বিষয়বস্তু চূড়ান্তকরণের পর্যায়ে ছিল।
এই সংযোজনগুলোকে ইতিহাসের পরিসর সম্প্রসারণ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস দীর্ঘদিনই দলীয় দ্বন্দ্বের কারণে দ্বিখণ্ডিত বয়ানের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। এক সময় জিয়াউর রহমানের ভূমিকা কম গুরুত্ব পেয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে; আবার অন্য সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক অবস্থান সংকুচিত করার অভিযোগ এসেছে। একই ঘটনা বিভিন্ন সরকারে ভিন্ন শব্দ, ভিন্ন গুরুত্ব এবং ভিন্ন রাজনৈতিক framing-এ পাঠ্যবইয়ে উপস্থাপিত হয়েছে।
তাই প্রশ্নটি ‘কার নাম থাকবে’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ রাখা যথেষ্ট নয়। আরও জরুরি প্রশ্ন হলো—কী প্রক্রিয়ায় থাকবে, কোন উৎসের ভিত্তিতে থাকবে, কতটা balanced historiography অনুসরণ করা হবে এবং সরকার পরিবর্তিত হলেও সেই ইতিহাস টিকে থাকার মতো পেশাগত স্বাধীনতা পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আছে কি না।
পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও সাম্প্রতিক একটি ঘটনা memory politics-এর আরেকটি দিক স্পষ্ট করেছে। ২০২৬ সালের ৩ জুন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে তিনটি নির্দিষ্ট বই রাখার নির্দেশ দিয়েছিল। ব্যাপক সমালোচনার পর ৬ জুলাই সেই নির্দেশ বাতিল করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সচিবও স্বীকার করেছিলেন যে পূর্ববর্তী সময়েও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল; পরে সরকারের প্রধানের ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্দেশটি প্রত্যাহার করা হয়।
ঘটনাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানে একটি রাজনৈতিকভাবে পরিচিত প্যাটার্ন পুনরাবৃত্ত হওয়ার ঝুঁকি দেখা যায়। পূর্ববর্তী সরকার যদি শাসকদলের নেতা বা পরিবারের সদস্যদের বই রাষ্ট্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষভাবে ছড়িয়ে থাকে এবং পরবর্তী সরকার এসে একই পদ্ধতিতে নিজের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের বই স্থাপন করে, তাহলে ব্যক্তি বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি বদলায় না।
এটি আসলে ‘আমাদের বই বনাম তাদের বই’ সমস্যা নয়। আসল সমস্যা হলো—রাষ্ট্রের অর্থ, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং বিদ্যালয়ের জ্ঞানপরিসরকে ব্যবহার করে কোনো শাসক রাজনৈতিক পরিবার বা দলের স্মৃতিকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া উচিত কি না।
সমাধান তাই একটি পক্ষের বই সরিয়ে অন্য পক্ষের বই স্থাপন নয়। সমাধান হলো স্বচ্ছ, পেশাদার, বহুমাত্রিক এবং দলনিরপেক্ষ library acquisition policy—যেখানে বই নির্বাচন করবেন গ্রন্থাগারবিদ, শিক্ষাবিদ, বিষয়বিশেষজ্ঞ ও স্বাধীন মূল্যায়নকারী; সরকার বা দলীয় আনুগত্য নয়।
বাংলাদেশের স্মৃতির রাজনীতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে যে দুই বিপরীত প্রবণতা দেখা গেছে, সেগুলোকেও একসঙ্গে বিচার করা প্রয়োজন। একদিকে পূর্ববর্তী সময়ে তাঁর ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রীয় বয়ানের প্রায় সর্বব্যাপী কেন্দ্রে নিয়ে আসা, সরকারি অনুষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান, পাঠ্যপুস্তক ও প্রচারে মাত্রাতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার অভিযোগ ছিল। ইতিহাসের বহু অংশগ্রহণকারী এবং বিকল্প বয়ান সেই অতি-কেন্দ্রীকরণের কারণে আড়ালে চলে গেছে—এমন সমালোচনাও যৌক্তিকভাবে উঠেছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক পালাবদলের পর যদি সেই অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতার সংশোধন করতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকা, তাঁর লেখা, তাঁর ভাষণ বা তাঁকে ঘিরে দলিলগুলোকেই জনপরিসর থেকে ক্রমে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে সেটিও ইতিহাস সংশোধন নয়। সেটি হয়ে উঠতে পারে counter-memory politics—আগের অতিরঞ্জনের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আরেক ধরনের বর্জন।
একটি পরিণত ইতিহাসচর্চার কাজ neither deification nor erasure—না দেবত্ব আরোপ, না মুছে ফেলা।
শেখ মুজিবুর রহমানকে ইতিহাসে রাখতে হবে তাঁর প্রকৃত রাজনৈতিক গুরুত্ব, সাফল্য, সীমাবদ্ধতা, সিদ্ধান্ত, বিতর্ক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটসহ। একইভাবে জিয়াউর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মওলানা ভাসানী, খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা কিংবা বাংলাদেশের অন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্রকেও রাজনৈতিক আনুগত্যের বাইরে evidence-based scrutiny-এর অধীন রাখতে হবে।
ইতিহাসের কোনো বড় চরিত্রকে সমালোচনা করা সেই ব্যক্তিকে ইতিহাস থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং সমালোচনা ইতিহাসচর্চার অপরিহার্য অংশ। অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়া মানে বইটির প্রতিটি বক্তব্য নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া নয়। আত্মজীবনী স্বভাবতই একজন ব্যক্তির স্মৃতি, অভিজ্ঞতা এবং নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা। তার সঙ্গে সমসাময়িক সরকারি দলিল, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের স্মৃতিকথা, আন্তর্জাতিক নথি, সংবাদপত্র, গবেষণা এবং অন্য প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ মিলিয়ে দেখতে হয়।
ঠিক একইভাবে জিয়াউর রহমানের কোনো রাজনৈতিক স্মৃতিকথা, সামরিক নথি বা স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি পড়লেও সেটিকে অন্য উৎসের সঙ্গে তুলনা করতে হবে। ইতিহাসে কোনো একটি বই final verdict নয়। সুতরাং সমস্যাটি বই থাকা নয়—সমস্যা হলো শুধু একটি বই থাকতে দেওয়া।
বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের ক্ষেত্রে দায়িত্ব আরও বেশি। শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীর কাছে পাঠ্যবই শুধু তথ্যের উৎস নয়; অনেক সময় সেটিই রাষ্ট্র অনুমোদিত সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়। তাই পাঠ্যপুস্তকে রাজনৈতিক ইতিহাস রচনার সময় শব্দচয়ন, উৎস, কালানুক্রম, causal explanation এবং attribution অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব আরও কঠিন। কারণ ঘটনাগুলো নিয়ে গবেষণা তখনো চলমান থাকে, বহু দলিল অপ্রকাশিত থাকতে পারে, বিচারিক ও তদন্তপ্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থাকতে পারে এবং রাজনৈতিক আবেগও তীব্র থাকে। ফলে কোনো অত্যন্ত সাম্প্রতিক ঘটনাকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে তথ্য ও মূল্যায়নের মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য রাখা দরকার।
এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যান এ কে এম রিয়াজুল হাসানও ২০২৬ সালের নতুন বইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান যুক্ত করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে একই সঙ্গে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এই সতর্কতাটি শুধু জুলাই ২০২৪-এর জন্য নয়; বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক যুগের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
Memory politics-এর একটি বড় বিপদ হলো presentism—বর্তমানের রাজনৈতিক নৈতিকতা, দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার ভারসাম্য দিয়ে অতীতকে সম্পূর্ণ বিচার করা। বর্তমান সরকার যাকে নায়ক বলে, ইতিহাসে তাকেই একমাত্র নায়ক বানানো; বর্তমানের রাজনৈতিক বিরোধীকে অতীতেও শুধু খলনায়ক হিসেবে দেখা—এটি ইতিহাসের পদ্ধতি নয়।
রাজনৈতিক চরিত্রগুলো প্রায় সবসময় জটিল। একই ব্যক্তি একটি পর্যায়ে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নেতা হতে পারেন, অন্য পর্যায়ে কর্তৃত্ববাদী সিদ্ধান্তের অংশ হতে পারেন। কোনো নেতা রাষ্ট্রগঠনে ঐতিহাসিক অবদান রাখতে পারেন, আবার তাঁর শাসনামলে গুরুতর ভুলও ঘটতে পারে। ইতিহাসের দায়িত্ব এই দ্বৈততা ধারণ করা।
একটি পরিণত জাতি তার প্রতিষ্ঠাতা, রাষ্ট্রনায়ক, সেনাশাসক, আন্দোলনের নেতা কিংবা জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মানুষ হিসেবেই ইতিহাসে রাখে—দেবতা কিংবা দানব হিসেবে নয়।
যদি প্রতিটি সরকার ক্ষমতায় এসে পূর্ববর্তী সরকারের ইতিহাস সংশোধন করে, তাহলে কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থী একই দেশের ভিন্ন ভিন্ন ‘সরকারি সত্য’ শেখে। একজন শিক্ষার্থী এক দশকে একটি সংস্করণ পড়ে; তার ছোট ভাই পাঁচ বছর পরে অন্য সংস্করণ পড়ে; আবার তাদের সন্তান তৃতীয় সংস্করণ পায়। অথচ ইতিহাসের মৌলিক দলিলগুলো একই থাকে। এতে তিনটি বড় ক্ষতি হয়:
বাংলাদেশের জন্য তাই অধিক কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে layered history বা স্তরভিত্তিক ইতিহাসচর্চা। অর্থাৎ নতুন দলিল, ঘটনা ও ব্যাখ্যা যোগ হবে; কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদলের কারণে পূর্ববর্তী ইতিহাস যান্ত্রিকভাবে মুছে ফেলা হবে না।
১৯৪৭ থাকবে। ভাষা আন্দোলন থাকবে। ছয় দফা থাকবে। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান থাকবে। ১৯৭০-এর নির্বাচন থাকবে। ৭ মার্চ থাকবে। ২৫ মার্চ থাকবে। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল যথাযথ প্রেক্ষাপটে থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামরিক নেতৃত্ব, প্রবাসী সরকার, সেক্টর কমান্ডার, নারী, শরণার্থী, সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক ভূমিকার বহুস্তরীয় ইতিহাস থাকবে।
একইভাবে ১৯৭২–৭৫-এর রাষ্ট্রগঠন ও সংকট, বাকশাল, ১৫ আগস্ট, জেলহত্যা, ৭ নভেম্বর, সামরিক শাসন, জিয়ার রাষ্ট্রনীতি, এরশাদবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান, পরবর্তী সংসদীয় গণতন্ত্র, ২০০৭–০৮, ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪—সবই থাকবে। কোনো অধ্যায়ই শুধু ক্ষমতাসীন পক্ষের নৈতিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে অদৃশ্য হবে না। ইতিহাসের বইকে palimpsest-এর মতো হতে হবে—নতুন স্তর যোগ হবে, কিন্তু আগের স্তর পুরো মুছে যাবে না।
এই জায়গায় আবার অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং UPL-এর ঘটনাটিতে ফিরে আসা যায়। কোনো সমাজে রাজনৈতিক শাসন বদলের পর যদি পূর্ববর্তী শাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত ঐতিহাসিক ব্যক্তির বই বিক্রি করাই সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়, তাহলে সেই সমাজে regime change ধীরে ধীরে memory regime change-এ রূপ নিচ্ছে কি না—প্রশ্নটি করতেই হয়।
বইটি ভালো না খারাপ, নির্ভুল না পক্ষপাতদুষ্ট, সম্পূর্ণ না অসম্পূর্ণ—এসব নিয়ে বিতর্ক হোক। পাণ্ডুলিপির provenance নিয়ে প্রশ্ন থাকলে গবেষণা হোক। বইয়ের দাবিগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা দলিল প্রকাশিত হোক। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বর্তমান ক্ষমতার কাঠামোতে অপছন্দনীয় হয়ে পড়েছেন বলে তাঁর লেখা বইয়ের সামাজিক বৈধতাই অস্বীকার করা হলে ইতিহাসের প্রশ্নটি জ্ঞানের ক্ষেত্র থেকে ক্ষমতার ক্ষেত্রে চলে যায়।
আজ শেখ মুজিবের বইয়ের সঙ্গে এটি ঘটলে কাল অন্য ক্ষমতায় জিয়ার বইয়ের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। তারপর ভাসানী, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ধর্মীয় চিন্তাবিদ, নারী অধিকারকর্মী কিংবা কোনো গবেষকের বই নিয়েও ঘটতে পারে। কেননা, “Censorship-এর ইতিহাস আমাদের একটি বিষয় বারবার শেখায়: নিষেধাজ্ঞার অস্ত্রটি কখনো শুধু শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত থাকে না। ক্ষমতা বদলালে অস্ত্রটির দিকও বদলায়।”
তাহলে উত্তরণের পথ কী?
একটি জাতির ইতিহাস তার কোনো একটি দল, সরকার, পরিবার বা প্রজন্মের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ১৯৭১ আওয়ামী লীগের একার নয়, বিএনপিরও নয়; মুক্তিযোদ্ধার, শহীদের, নির্যাতিত নারীর, শরণার্থীর, কৃষকের, ছাত্রের, সৈনিকের, বুদ্ধিজীবীর—সমগ্র জনগোষ্ঠীর। একইভাবে ১৯৯০ কিংবা ২০২৪-এর গণআন্দোলনের ইতিহাসও কোনো একটি সংগঠন বা রাজনৈতিক শক্তি এককভাবে মালিকানা দাবি করতে পারে না। তবে
ক্ষমতাসীনরা ইতিহাসে অংশগ্রহণকারী হতে পারেন; ইতিহাসের মালিক হতে পারেন না। সুতরাং একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি historical culture গড়ে তোলা, যেখানে শেখ মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং তাঁর কঠোর সমালোচনা—দুটিই একই বইয়ের দোকানে পাওয়া যাবে; জিয়ার রাজনৈতিক জীবনী এবং তাঁর শাসন নিয়ে সমালোচনামূলক গবেষণা একই লাইব্রেরিতে থাকবে; জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বয়ানও ভবিষ্যতের স্বাধীন গবেষণার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা কোনো ব্যক্তিকে পবিত্র ঘোষণা করার মধ্যে নেই; আবার তাঁকে অদৃশ্য করে দেওয়ার মধ্যেও নেই। ইতিহাসের নিরাপত্তা নিহিত দলিলের সংরক্ষণ, বহুস্বরের স্বীকৃতি, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সত্য অনুসন্ধানের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার মধ্যে। শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত নয়—“এই মুহূর্তে রাষ্ট্র কাকে মনে রাখতে চায়?” বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—“ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কি আমরা এতগুলো দলিল, এতগুলো কণ্ঠ এবং এতটা স্বাধীনতা দিয়ে যাচ্ছি, যাতে তারা নিজেরাই আমাদের ইতিহাসকে বিচার করতে পারে?”
ইতিহাসের বই ও দলিলের অবাধ পাঠের দাবির পাশাপাশি সামনে এসেছে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিতে বাধা এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে তালা দেওয়ার অভিযোগ। ঘটনাটি নিয়ে লেখক, গবেষক ও প্রকাশকদের মধ্যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলাও বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
সজল দাসের লেখা বিবিসি বাংলার “‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বই বিক্রি কি নিষিদ্ধ?” শিরোনামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই ব্যক্তি ইউপিএলের বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে বইটি কিনতে চান। বিক্রয়কর্মীরা বইটি দেখানোর পর তাঁরা সেটিকে ‘নিষিদ্ধ’ দাবি করে বিক্রির কারণ জানতে চান এবং হট্টগোল শুরু করেন। একপর্যায়ে বিক্রয়কেন্দ্রের শাটার নামিয়ে তালা দেওয়া হয়। সেখানকার দুই কর্মীকে পরে ফরিদাবাদ পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া হয়।
বিবিসিকে সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান জানান, ওই দুই কর্মীকে থানায় আনা হয়নি; পুলিশ ফাঁড়ি থেকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে পুলিশের বরাতে আরও বলা হয়, তখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো অভিযোগ দায়ের কিংবা কাউকে আটক করা হয়নি।
সংযুক্ত স্ক্রিনশটে দেখা যায়, ‘Dr. Asif Nazrul’ নামের নীল যাচাইকরণচিহ্নযুক্ত ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পোস্টে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিতে বাধা দেওয়ার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। পোস্টে বলা হয়, “এই বইটি কোনো নিষিদ্ধ বই নয়।”
পোস্টে বই বিক্রিতে বাধা, ইউপিএলের বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে তালা দেওয়া এবং দুই কর্মীকে তুলে নেওয়ার ঘটনাকে বেআইনি ও অপরাধমূলক কাজ হিসেবে অভিহিত করে সরকারের উপযুক্ত পদক্ষেপ চাওয়া হয়।
সেখানে শেখ হাসিনার শাসনামলে বই বিক্রিতে বাধা ও বই নিষিদ্ধ করার ঘটনাগুলোর বিরোধিতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পোস্টের বক্তব্য অনুযায়ী, এখন একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি সেই দমনমূলক আচরণকেই অনুসরণ করে এবং মুক্তচিন্তার মানুষের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে।
বিবিসি বাংলায় উদ্ধৃত ইউপিএলের বিবৃতি অনুযায়ী, কোনো বই নিষিদ্ধ করতে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ক্ষেত্রে এমন কোনো পদক্ষেপের কথা তাদের জানা নেই। সরকার বা আদালত নিয়ম মেনে সিদ্ধান্ত নিলে প্রতিষ্ঠানটি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে বলেও জানিয়েছে।
ইউপিএল ঘটনাটিকে লজ্জাকর ও দুর্ভাগ্যজনক হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, প্রকাশনার ওপর আইনবহির্ভূত চাপ ও হুমকি দেশের সৃজনশীলতা এবং জ্ঞানচর্চার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অতীতেও বিভিন্ন সরকারের সময়ে বই প্রকাশ নিয়ে চাপের মুখে পড়ার কথা জানিয়েছে তারা।
বইটির বিষয়ে সরকারের নতুন কোনো সিদ্ধান্ত আছে কি না, তা জানতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও উত্তর পাওয়া যায়নি বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তির ‘নিষিদ্ধ’ দাবিকে সরকারি নিষেধাজ্ঞার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার ভিত্তি ওই প্রতিবেদনে পাওয়া যায় না।
ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিক্রিকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাটি বাংলাদেশের প্রকাশনা জগৎ, বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা এবং ইতিহাসচর্চার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে—কোন বই পড়া যাবে, কোন বই বিক্রি করা যাবে, কিংবা ইতিহাসের কোন ব্যক্তিকে নিয়ে লেখা বই দোকানের তাকে থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত কি আইন, পাঠক ও জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানগুলো নেবে, নাকি সংগঠিত চাপ ও ‘মব’ তা নির্ধারণ করবে? প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহ্রুখ মহিউদ্দীন যে অবস্থান তুলে ধরেছেন, তার তাৎপর্য এখানেই। তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়, ঘটনাটি শুধু একটি দোকান, একটি বই বা একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের সহনশীলতা, বহুমতের স্বীকৃতি এবং আইনের শাসনের সক্ষমতা।
মাহ্রুখ মহিউদ্দীনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৮ সেপ্টেম্বর ইউপিএলের বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে হামলা হয়, কর্মীদের হেনস্তা করা হয় এবং তাঁদের কয়েক ঘণ্টা পুলিশ ফাঁড়িতে থাকতে হয়। ঘটনার পর মাত্র এক দিন বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ রেখে ইউপিএল আবার নিয়মিত কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটির লিখিত অভিযোগ থানা গ্রহণ করলেও তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী জিডি হিসেবে সেটি নেওয়া হয়নি; অন্যদিকে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ সিসিটিভি ফুটেজ চেয়েছে এবং ইউপিএল তা সরবরাহ করেছে। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বই সরিয়ে নেওয়ার কোনো চাপ তাঁরা অনুভব করেননি এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকেও নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়েছেন। ফলে ঘটনাটিকে সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের সঙ্গে একাকার না করে বরং হামলাকারী বা সম্ভাব্য ইন্ধনদাতাদের ভূমিকা, তাদের উদ্দেশ্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিক্রিয়াকে পৃথকভাবে বিচার করা জরুরি।
কিন্তু সাক্ষাৎকারটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সমাজতাত্ত্বিক বক্তব্য সম্ভবত অন্য জায়গায়। মাহ্রুখ মহিউদ্দীন সতর্ক করেছেন, সমাজ যদি মব তৈরির উপাদানকে প্রশ্রয় দেয় অথবা তার ভয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের গুটিয়ে নেয়, তাহলে একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটবে। এই বক্তব্যের তাৎপর্য কোনো একটি রাজনৈতিক পক্ষের পক্ষে বা বিপক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ, মবের কোনো স্থায়ী মতাদর্শিক আনুগত্য নেই; একবার যদি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে ভয় প্রদর্শন, শারীরিক চাপ বা দলবদ্ধ হুমকি স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে আজ যে পক্ষ এর সুবিধাভোগী, কাল সেই পক্ষই তার শিকার হতে পারে। গণতান্ত্রিক সমাজে তাই শুধু নিজের পছন্দের বক্তব্যের স্বাধীনতা রক্ষা করলেই চলে না; যে বই, মতাদর্শ, ইতিহাস-ব্যাখ্যা বা সংস্কৃতি আমার অপছন্দের, তার আইনসম্মত অস্তিত্বের অধিকারও রক্ষা করতে হয়। সাক্ষাৎকারে এই নীতিগত কথাটিই বিশেষভাবে সামনে এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে ঘিরে বিতর্ক আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ইউপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাক্ষাৎকারে বইটির পাণ্ডুলিপির প্রামাণিকতা নিয়ে তোলা সংশয়ের জবাবে জানিয়েছেন, প্রকাশের আগে প্রতিষ্ঠানটি পাণ্ডুলিপির মৌলিকত্ব ও প্রামাণিকতা যাচাই করেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বইটির ইংরেজি অনুবাদ Penguin থেকে আন্তর্জাতিকভাবে এবং পাকিস্তানে Oxford University Press থেকে ইংরেজি ও উর্দু সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর যুক্তি হলো, একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থকে কেবল বর্তমান রাজনৈতিক আনুগত্য বা বিরাগের মাপকাঠিতে বিচার করা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সংকীর্ণ; বরং বইটির বক্তব্য, দলিলমূল্য, ভাষ্য এবং ইতিহাসের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে পাঠ, গবেষণা ও সমালোচনার মাধ্যমেই মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ব্যক্তি ও ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য। কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে সমর্থন করা, সমালোচনা করা বা তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বিমত করা এক বিষয়; কিন্তু সেই ব্যক্তিকে নিয়ে লেখা বই বাজারে রাখা যাবে কি না—এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন। শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে সমালোচনামূলক বই যেমন জ্ঞানভান্ডারে থাকা প্রয়োজন, তেমনি তাঁর নিজের লেখা, তাঁকে সমর্থনকারী কিংবা বিরোধিতাকারী লেখকের বইও থাকা প্রয়োজন। ইতিহাসকে জানতে হলে পরস্পরবিরোধী দলিল পাশাপাশি রাখতে হয়। রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে যদি গ্রন্থাগার ও বইয়ের দোকানের তাকও বদলে ফেলতে হয়, তবে তা ইতিহাসচর্চা নয়; বরং বর্তমানের রাজনৈতিক শক্তি দিয়ে অতীতকে সম্পাদনা করার প্রবণতা।
মাহ্রুখ মহিউদ্দীনের সাক্ষাৎকারে ইউপিএলের প্রকাশনা-দর্শনের যে বিবরণ উঠে এসেছে, সেটিও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, একটি বই প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি মৌলিকত্ব, তথ্যের যথার্থতা, লেখকের গুরুত্ব, পাঠকের কাছে কাজটির মূল্য এবং বাজার সম্ভাবনা বিবেচনা করে; তবে প্রথম কয়েকটি মানদণ্ডে একটি বই গুরুত্বপূর্ণ হলে সীমিত বাজার সম্ভাবনা সত্ত্বেও তা প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ প্রকাশনা এখানে শুধুই বাণিজ্য নয়, জাতির জ্ঞান ও ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বও। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অতীতে বিভিন্ন সময় প্রকাশিত বইয়ের কারণে ক্ষমতাসীনদের বিরাগভাজন হয়েও ইউপিএল তার প্রকাশনা নীতি পরিবর্তন করেনি।
এই অবস্থান বাংলাদেশের বৃহত্তর প্রকাশনা সংস্কৃতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড সামনে আনে। একটি পেশাদার প্রকাশকের কাজ কোনো সরকারের অনুমোদিত ইতিহাস প্রকাশ করা নয়, আবার কোনো সরকারের বিরোধী ইতিহাস প্রকাশ করাও তার একমাত্র কাজ নয়। তার দায়িত্ব হচ্ছে গবেষণাগত ও সম্পাদকীয় মান বজায় রেখে বহুস্বরে জাতীয় স্মৃতি নির্মাণের সুযোগ তৈরি করা। ফলে মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিব, জিয়াউর রহমান, সামরিক শাসন, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বাম রাজনীতি, ধর্মীয় রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্রগঠনের বিতর্কিত অধ্যায়—সবকিছু নিয়েই প্রমাণনির্ভর, সমর্থনমূলক, সমালোচনামূলক এবং বিকল্প বিশ্লেষণ প্রকাশের জায়গা থাকতে হবে। পাঠককে রক্ষা করার নামে বই সরিয়ে দেওয়া শেষ পর্যন্ত পাঠকের বিচারবুদ্ধিকেই অস্বীকার করে।
সাক্ষাৎকারে সরকারি বই ক্রয়ের স্বচ্ছতার প্রশ্নও উত্থাপিত হয়েছে। মাহ্রুখ মহিউদ্দীন অভিযোগ করেছেন, সাম্প্রতিক একটি বড় সরকারি ক্রয়ে ইউপিএলসহ একাধিক প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনার কোনো বই স্থান পায়নি এবং তিনি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক গ্রন্থ ক্রয়নীতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এই প্রসঙ্গ মূল ঘটনার বাইরে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে একই বৃহত্তর প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত: রাষ্ট্র জ্ঞান উৎপাদন ও বিতরণের ক্ষেত্রে কী ধরনের ecosystem গড়ে তুলবে? সেখানে পেশাদারিত্ব, গবেষণামূল্য ও সম্পাদকীয় মান কি মুখ্য হবে, নাকি অস্বচ্ছতা, রাজনৈতিক আনুগত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাবাদ মান নির্ধারণ করবে?
সবশেষে ইউপিএল-ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এই যে, বইয়ের বিরুদ্ধে শক্তির জবাব বই সরিয়ে দিয়ে দেওয়া যায় না; তার জবাব আরও বই, আরও পাঠ, আরও গবেষণা এবং আরও উন্মুক্ত বিতর্ক। কোনো ইতিহাস ভুল মনে হলে তার বিরুদ্ধে পাল্টা ইতিহাস লিখতে হবে; কোনো ব্যাখ্যায় আপত্তি থাকলে দলিল দিয়ে তা খণ্ডন করতে হবে; কোনো লেখকের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য না হলে পাঠককে তার সমালোচনা করার বুদ্ধিবৃত্তিক উপকরণ দিতে হবে। কিন্তু বইয়ের তাক নিয়ন্ত্রণ করতে দলবদ্ধ ভয় বা হুমকি যখন যুক্তির বিকল্প হয়ে ওঠে, তখন আক্রান্ত শুধু একটি প্রকাশনী নয়—আক্রান্ত হয় সমাজের জানার অধিকার।
এই কারণেই মাহ্রুখ মহিউদ্দীনের ‘ভয় পেয়ে গুটিয়ে গেলে ঘটনা বারবার ঘটবে’—এই সতর্কবাণীকে একটি প্রতিষ্ঠানের আত্মপক্ষসমর্থনের চেয়ে বড় করে দেখা প্রয়োজন। এটি আসলে বাংলাদেশের বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশের প্রতি একটি সতর্ক সংকেত: আজ একটি বই সরানোর দাবি মেনে নেওয়া হলে আগামীকাল আরেকটি বই, তারপর একজন লেখক, একজন শিক্ষক, একটি গবেষণা, একটি শিল্পকর্ম কিংবা একটি মতকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিও স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। গণতান্ত্রিক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজের প্রতিরোধ তাই শুরু হওয়া উচিত একটি সহজ নীতি থেকে—আইনে নিষিদ্ধ নয় এমন বইয়ের অস্তিত্বের অধিকার থাকবে; আর তার সত্য-মিথ্যা, গ্রহণযোগ্যতা বা ঐতিহাসিক মূল্য নির্ধারিত হবে পাঠ, গবেষণা, প্রমাণ ও মুক্ত বিতর্কে—মবের নির্দেশে নয়।
বিবিসি বাংলাকে সময় প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তি পর্যায়ের বলপ্রয়োগে বই বিক্রি বন্ধ করার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনায় রাষ্ট্রের কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত না করার সমালোচনা করেন তিনি।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ লেখালেখি, প্রকাশনা ও পাঠের স্বাধীনতার ওপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা—কোনো বই অপছন্দ হলে একজন ব্যক্তি সেটি না পড়তে পারেন; কিন্তু অন্য পাঠকের পড়ার সুযোগে বাধা দেওয়ার অধিকার তাঁর নেই।
এসব প্রতিক্রিয়া এবং বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন ঘটনাটিকে প্রকাশনার স্বাধীনতা, পাঠকের অধিকার ও বইয়ের দোকানের নিরাপত্তার বৃহত্তর আলোচনায় এনেছে। প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের ইতিহাসচর্চা উন্মুক্ত রাখার আহ্বানের সঙ্গেও বিষয়গুলোর সরাসরি প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। তবে সংগঠনের বিবৃতিটি এই নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য সংগঠনের স্পষ্ট বক্তব্য প্রয়োজন।
শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিতে বাধা, ইউপিএলের বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে তালা এবং দুই বিক্রয়কর্মীকে হয়রানির অভিযোগ দেশের সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি বিদেশি সংবাদমাধ্যমেও স্থান পেয়েছে। সংবাদ প্রতিবেদন, প্রকাশকের বিবৃতি এবং সম্পাদকীয় পর্যালোচনায় ঘটনাটির কয়েকটি দিক সামনে এসেছে—বইটিকে ‘নিষিদ্ধ’ দাবি করার ভিত্তি, কর্মীদের সঙ্গে আচরণ, পুলিশের ভূমিকা এবং প্রকাশনা ও পাঠের স্বাধীনতা। তবে সংবাদ প্রকাশ ও কোনো সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব সম্পাদকীয় অবস্থান পৃথক বিষয়; এই ঘটনায় উভয় ধরনের প্রকাশনাই দেখা যাচ্ছে।
এই সংবাদ ও সম্পাদকীয়গুলোর পর্যালোচনায় তিনটি প্রশ্ন বিশেষভাবে সামনে আসে: আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার তথ্য ছাড়া বই বিক্রি বন্ধের দাবি কেন, বিক্রয়কর্মীদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে এবং প্রকাশক ও পাঠকের স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্র কী ব্যবস্থা নেবে। সংবাদমাধ্যমভেদে গুরুত্বের পার্থক্য থাকলেও ঘটনাটি যে প্রকাশনা ও জ্ঞানচর্চার পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা এসব প্রতিবেদনে স্পষ্ট। প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের ইতিহাসের উৎস সংরক্ষণ এবং অবাধ পাঠ–গবেষণার আহ্বানও এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিতে বাধা এবং ইউপিএলের বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রের কর্মীদের হয়রানির অভিযোগ নিয়ে বিবিসি বাংলা ও দ্য হকের বাইরেও কয়েকটি বিদেশি সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। নতুন করে পাওয়া প্রকাশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ইয়েস পাঞ্জাব নিউজ, জাগরণ ত্রিপুরা এবং দ্য স্টেট লাইন। এসব সংবাদে ঘটনাটির পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রকাশনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ উঠে এসেছে। (yespunjab.com, eng.jagarantripura.com, thestateline.in)
ইয়েস পাঞ্জাব নিউজ ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বই বিক্রিকে কেন্দ্র করে দুই কর্মীর হয়রানি ও পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরে। ইউপিএলের বিবৃতি এবং বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত সংবাদটিতে নাগরিকদের প্রতিবাদের কথাও রয়েছে। সেখানে নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং প্রকাশক ও বই বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিবেদনে উদ্ধৃত প্রতিবাদ বাংলাদেশের নাগরিকদের; সেটিকে বিদেশি ব্যক্তিত্বদের পৃথক প্রতিবাদ হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। (yespunjab.com)
জাগরণ ত্রিপুরা একই ঘটনা নিয়ে ভারতীয় সংবাদসংস্থা আইএএনএসের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংবাদটির সূচনাতেই বাংলাদেশের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের প্রসঙ্গে ইউপিএলের দুই কর্মীর হয়রানির অভিযোগ তুলে ধরা হয়। এর মাধ্যমে ঘটনাটি ভারতের আঞ্চলিক সংবাদপরিসরেও পৌঁছেছে। তবে দ্য হকেও আইএএনএসের প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় এই দুটি প্রকাশনাকে দুটি স্বতন্ত্র অনুসন্ধান হিসেবে গণনা করা যথাযথ হবে না। (eng.jagarantripura.com, thehawk.in)
দ্য স্টেট লাইন ৩০ সেপ্টেম্বর একই শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। অনুসন্ধানে পাওয়া সংবাদাংশে ইউপিএলের কর্মীদের ভয়ভীতি দেখানো এবং বই বিক্রি বন্ধের দাবির বিরুদ্ধে নাগরিকদের উদ্বেগের কথা রয়েছে। এসব প্রকাশনা ঘটনাটির দেশের বাইরেও প্রচার পাওয়ার প্রমাণ দেয়; তবে একই ঘটনাবিবরণ ও স্থানীয় সূত্রের পুনর্ব্যবহার থাকায় সংবাদ প্রকাশের সংখ্যা দিয়ে স্বাধীন আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ব্যাপকতা নির্ধারণ করা যায় না। (thestateline.in)
অনুসন্ধানে নতুন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ডয়চে ভেলেতেও সংবাদ; শহিদুল আলম–সারা হোসেনসহ নাগরিকদের প্রতিবাদ, তদন্ত চায় ব্লাস্ট
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিতে বাধা এবং ইউপিএলের বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রের কর্মীদের হয়রানির ঘটনা নিয়ে আরও অনুসন্ধানে বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং দেশের নাগরিক ও পেশাগত সংগঠনের পৃথক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। এসব সূত্রে প্রকাশনার স্বাধীনতার পাশাপাশি কর্মীদের নিরাপত্তা, পুলিশের ভূমিকা এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি গুরুত্ব পেয়েছে।
জার্মানির ডয়চে ভেলেতে ঘটনাটির সংবাদ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা বিভাগ ২৯ সেপ্টেম্বর আশীষ চক্রবর্ত্তীর নামে “‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র বিক্রয়কেন্দ্রে তালা ও ইউপিএলের বিবৃতি” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে ইউপিএলের বক্তব্যের ভিত্তিতে ২৮ সেপ্টেম্বর বিক্রয়কেন্দ্রে আক্রমণাত্মক আচরণ, শাটার বন্ধ, দুই কর্মীকে হয়রানি এবং পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়ার ঘটনাবিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। বইটির ওপর আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার কথা জানা নেই—প্রকাশকের এই অবস্থানও প্রতিবেদনে এসেছে। ডয়চে ভেলের এই প্রকাশনা আগের তালিকায় থাকা বিবিসি বাংলা ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বাইরে আরও একটি আন্তর্জাতিক সংবাদসূত্র যোগ করে। (amp.dw.com)
৩৬ নাগরিকের যৌথ বিবৃতিতে পরিচিত মানবাধিকারকর্মী, শিক্ষক ও আলোকচিত্রী। সমকালের ২৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউপিএলের শোরুমে হামলা ও কর্মীদের হয়রানির অভিযোগের ঘটনায় নাগরিক সমাজের ৩৬ জন প্রতিনিধি নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং প্রকাশক, বই বিক্রেতা ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন, মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেন, খুশী কবির, লেখক ও অধিকারকর্মী রেহনুমা আহমেদ এবং শিক্ষক সামিনা লুৎফা। (onlinebn.samakal24.com)
দ্য ডেইলি স্টারও এই যৌথ প্রতিবাদের খবর এবং উল্লেখিত কয়েকজন স্বাক্ষরকারীর নাম প্রকাশ করেছে। পত্রিকাটির বিবরণ অনুযায়ী, নাগরিকেরা বলেছেন, বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে দ্বিমত, সমালোচনা ও বিতর্কের অধিকার থাকলেও অন্যের বই প্রকাশ, বিক্রি কিংবা পড়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। ইতিহাসের কোনো গ্রন্থ নিয়ে মতভেদ থাকলে তা আলোচনা, গবেষণা ও যুক্তির মাধ্যমে প্রকাশের ওপর তাঁরা জোর দিয়েছেন। (thedailystar.net)
ব্লাস্টের দাবি: পুলিশের ভূমিকাও তদন্ত করতে হবে। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট—ব্লাস্ট পৃথকভাবে উদ্বেগ জানিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই কর্মীকে পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়া ও সেখানে রাখার ঘটনায় পুলিশের কথিত ভূমিকা তদন্তের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি। প্রকাশনা সীমিত বা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তে স্পষ্ট আইনি ভিত্তি ও যথাযথ প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে ব্লাস্ট। জাগো নিউজও সংগঠনটির তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি নিয়ে পৃথক সংবাদ প্রকাশ করেছে। (thedailystar.net, jagonews24.com)
আদর্শ প্রকাশনীর সংহতি: প্রকাশনার স্বাধীনতায় একই নীতি। বণিক বার্তার ২৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আদর্শ প্রকাশনীও ঘটনাটির নিন্দা জানিয়ে ইউপিএলের পাশে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের ২০২৩ সালের বইমেলায় স্টল বরাদ্দ না পাওয়ার অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তখন ইউপিএল প্রকাশনার স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। এবার একই নীতিগত কারণে তারা ইউপিএলকে সমর্থন করছে। (bonikbarta.com)
আদর্শের বিবৃতিতে আশঙ্কা করা হয়েছে, ভয়ভীতি ও চাপ দিয়ে একটি বইয়ের বিক্রি বন্ধ করা গেলে ভবিষ্যতে ভিন্ন মতাদর্শের বইও একই পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে। এতে প্রকাশনার সিদ্ধান্তে পেশাগত বিবেচনার জায়গা দখল করবে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার ভয়। প্রতিষ্ঠানটি নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনানুগ ব্যবস্থা এবং আইনত নিষিদ্ধ নয় এমন বই প্রকাশ, বিপণন ও পাঠের স্বাধীনতা রক্ষার দাবি জানিয়েছে। (bonikbarta.com)
এই নতুন তথ্যগুলো দেখায়, প্রতিক্রিয়া শুধু ইউপিএলের নিজস্ব বিবৃতি কিংবা একটি শিক্ষক সংগঠনের অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নাগরিকদের যৌথ প্রতিবাদ, আইনি সহায়তা সংগঠনের তদন্তের দাবি এবং অন্য প্রকাশকের সংহতিও যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ডয়চে ভেলের প্রতিবেদন ঘটনাটির আন্তর্জাতিক সংবাদপ্রচারের পরিসর আরও স্পষ্ট করেছে।
বাংলাবাজারে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রিতে বাধা দেওয়ার ঘটনায় দুটি প্রশ্ন একসঙ্গে সামনে এসেছে: বাধাদানকারীরা কী যুক্তি দেখিয়েছিলেন, এবং একটি বইয়ের বিক্রিতে বাধা কেন বৃহত্তর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠল? প্রথম প্রশ্নের উত্তর ঘটনাসংক্রান্ত বক্তব্যে কিছুটা পাওয়া যায়। দ্বিতীয়টির ব্যাখ্যা নিহিত বইটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব, প্রকাশনার স্বাধীনতা এবং নাগরিকের নিরাপত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে।
ইউপিএলের বিবৃতি ও প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বিক্রয়কেন্দ্রে আসা ব্যক্তিরা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’কে ‘নিষিদ্ধ’ দাবি করে এর বিক্রির কারণ জানতে চান। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি তাঁদের জানায়, বইটি নিষিদ্ধ নয়। এরপরও শাটার নামানো এবং দুই কর্মীকে হয়রানি করে পুলিশ ফাঁড়িতে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বরাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্থানীয় বিএনপির লোক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পুলিশের এই বক্তব্য থেকে কোনো দলের কেন্দ্রীয় নির্দেশ, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত কিংবা পরিকল্পিত অভিযানের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। (bdnews24.com)
ঘটনাটির ঘোষিত অজুহাত ছিল বইটি ‘নিষিদ্ধ’—এমন দাবি; কিন্তু এর পেছনের প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়। ভুল ধারণা, রাজনৈতিক বিদ্বেষ, স্থানীয় প্রভাব প্রদর্শন কিংবা অন্য কোনো কারণ কাজ করেছে কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। প্রমাণ ছাড়া কোনো একটি সম্ভাবনাকে নিশ্চিত উদ্দেশ্য হিসেবে উপস্থাপন করলে সংবাদ বিশ্লেষণও অনুমাননির্ভর হয়ে পড়বে।
তবে ঘটনাটির দৃশ্যমান তাৎপর্য হলো, বইটির বিষয়বস্তুর বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর আপত্তির পরিবর্তে সেটি পাঠকের কাছে পৌঁছানোর পথেই বাধা এসেছে। কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তির ভূমিকার সমালোচনা করা, তাঁর আত্মজীবনীর বক্তব্য খণ্ডন করা এবং বিক্রয়কর্মীদের ভয় দেখিয়ে বই সরিয়ে দেওয়া—এসবের সামাজিক ফল এক নয়। শেষের পদ্ধতি বিতর্কের সুযোগ সংকুচিত করে এবং শক্তি প্রয়োগকে সিদ্ধান্তের মাধ্যম করে তোলে।
২০১২ সালে প্রকাশিত বাংলা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ইংরেজি অনুবাদের নাম The Unfinished Memoirs। অনুবাদ করেছেন অধ্যাপক ফকরুল আলম। তাঁর প্রকাশনা-তালিকায় ইংরেজি গ্রন্থটির ঢাকা থেকে ইউপিএল, নয়াদিল্লি থেকে পেঙ্গুইন বুকস এবং করাচি থেকে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের মাধ্যমে ২০১২ সালে প্রকাশের তথ্য রয়েছে। ফলে বইটির পাঠপরিসর শুরু থেকেই বাংলাদেশের সীমানার বাইরে বিস্তৃত হয়েছে। (fakrulalam.com)
বাংলা সংস্করণ পাঠককে লেখকের ভাষা, প্রকাশভঙ্গি ও রাজনৈতিক শব্দচয়নের কাছে নিয়ে যায়। ইংরেজি অনুবাদ বাংলা না-জানা গবেষক, শিক্ষার্থী এবং দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পাঠকের জন্য সেই অভিজ্ঞতা অনুসন্ধানের সুযোগ তৈরি করে। অনুবাদ-গবেষণার দিক থেকেও দুটি সংস্করণ পাশাপাশি পড়া গুরুত্বপূর্ণ: রাজনৈতিক পরিচয়, সাংস্কৃতিক ধারণা কিংবা আবেগের সূক্ষ্মতা অন্য ভাষায় কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তা পরীক্ষা করা যায়। তবে আন্তর্জাতিক প্রকাশকের মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া কোনো গ্রন্থের প্রতিটি বক্তব্যের নির্ভুলতার নিশ্চয়তা নয়; সেটি বইটির প্রাপ্যতা ও সম্ভাব্য পাঠপরিসরের প্রমাণ।
ইউপিএলের গ্রন্থপরিচিতি অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৭–১৯৬৯ সালের কারাবাসের সময়ে স্মৃতিকথাগুলো লেখেন। এতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা, পাকিস্তান আন্দোলনের সময়কার সক্রিয়তা, ভাষা আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রামের বিবরণ রয়েছে। বর্ণিত ঘটনাপ্রবাহ ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত পৌঁছেছে। তাই বইটিকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বাধীনতা-পরবর্তী শাসনের পূর্ণাঙ্গ প্রত্যক্ষ বিবরণ হিসেবে ব্যবহার করা সঠিক হবে না। এর বিশেষ মূল্য বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগের রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমি বোঝার ক্ষেত্রে। (uplbooks.com)
গবেষণার দৃষ্টিতে এটি একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণকারীর আত্মজৈবনিক প্রাথমিক উৎস। একজন কর্মীর রাজনৈতিক উপলব্ধি কীভাবে গড়ে ওঠে, সংগঠনের ভেতরের সম্পর্ক কীভাবে কাজ করে এবং ভাষা ও অধিকারের প্রশ্ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় কীভাবে প্রতিফলিত হয়—এসব অনুসন্ধানে বইটি ব্যবহার করা যায়। রাষ্ট্রীয় নথি সাধারণত কোনো সিদ্ধান্তের প্রাতিষ্ঠানিক বিবরণ দেয়; আত্মজীবনী সেই সময়ের একজন অংশগ্রহণকারীর উপলব্ধি, দ্বিধা, সম্পর্ক ও আত্মব্যাখ্যা জানায়।
কিন্তু স্মৃতিকথা ইতিহাসের চূড়ান্ত রায় নয়। অতীতের ঘটনা পরে স্মরণ করে লেখার সময় স্মৃতির সীমাবদ্ধতা, নির্বাচিত ঘটনার ওপর গুরুত্ব এবং লেখকের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান বর্ণনাকে প্রভাবিত করতে পারে। গবেষকের দায়িত্ব হলো বক্তব্যগুলো সমকালীন সংবাদপত্র, সরকারি নথি, অন্য অংশগ্রহণকারীর স্মৃতিকথা এবং প্রাসঙ্গিক গবেষণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা। উৎসটি পড়ার সুযোগ থাকলেই তার সমালোচনামূলক মূল্যায়ন সম্ভব; উৎসের প্রাপ্যতা কমে গেলে সেই মূল্যায়নের সুযোগও কমে।
বইটির মূল্য নিয়ে আলোচনা সাম্প্রতিক বিতর্কে শুরু হয়নি। ২০১২ সালের একটি পর্যালোচনা অনুষ্ঠানের সংবাদে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান গ্রন্থটিকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন। একই অনুষ্ঠানে আকবর আলি খান এর সাহিত্যিক বর্ণনা ও আত্মসমালোচনার দিক নিয়ে আলোচনা করেন। এগুলো বইটির প্রাথমিক গ্রহণযোগ্যতার ইতিহাস; বর্তমান ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে সেগুলোকে উপস্থাপন করা উচিত নয়। (thedailystar.net)
প্রতিক্রিয়াগুলোর একটি সাধারণ ভিত্তি হলো—লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট বইয়ের সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া প্রয়োজন নেই। আদর্শ প্রকাশনীর বিবৃতি এই অবস্থানটি স্পষ্ট করেছে। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের অতীত অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে ইউপিএলের পাশে দাঁড়িয়েছে প্রকাশনার স্বাধীনতার একই নীতির ভিত্তিতে। তাদের আশঙ্কা, চাপের মুখে একটি বইয়ের বিক্রি বন্ধ করা সম্ভব হলে অন্য মতাদর্শের বইও ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারে। (bonikbarta.com)
এখানে বিক্রয়কর্মীদের অবস্থাটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা বইয়ের লেখক নন, ঐতিহাসিক বিতর্কের নিষ্পত্তিকারীও নন; কর্মস্থলে বই বিক্রি করছিলেন। তাঁদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে পুরো পেশার কাছে ভয়ের বার্তা পৌঁছাতে পারে। তখন প্রকাশক বা বিক্রেতা কোনো বইয়ের আইনগত অবস্থার পাশাপাশি সম্ভাব্য হুমকির কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এই সম্ভাব্য আত্মনিয়ন্ত্রণই জ্ঞানচর্চার পরিবেশের জন্য বড় ঝুঁকি।
নাগরিকদের যৌথ বিবৃতি ও ব্লাস্টের প্রতিক্রিয়ায় তদন্ত, নিরাপত্তা এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার কারণও এখানে। বিষয়টি শুধু কে কোন বই সমর্থন করেন, সেই বিতর্কে সীমিত নেই; ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চাপের মুখে নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, সেটিও বিবেচ্য হয়ে উঠেছে। (thedailystar.net)
ঘটনাটির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আন্তর্জাতিক সংবাদমূল্য তৈরি করে: বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তির আত্মজীবনী, আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশিত ইংরেজি সংস্করণ, প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা সংস্থার বিক্রয়কেন্দ্র এবং বই বিক্রিকে কেন্দ্র করে কর্মীদের হয়রানির অভিযোগ। এগুলোর সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন যুক্ত হওয়ায় ঘটনাটি বিদেশি পাঠকের কাছেও প্রাসঙ্গিক হয়।
ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে ঘটনাবিবরণ ও ইউপিএলের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে, দ্য হকে প্রকাশিত আইএএনএসের সংবাদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে ঘটনাটি উপস্থাপিত হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সংবাদে ঘটনাটি কেবল স্থানীয় বইবাজারের বিরোধ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তবে প্রতিটি সংবাদমাধ্যম কেন খবরটি বেছে নিয়েছে, তা তাদের সম্পাদকীয় বক্তব্য ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না; উপরোক্ত ব্যাখ্যা সংবাদগুলোর বিষয়বস্তুভিত্তিক বিশ্লেষণ। (amp.dw.com, thehawk.in)
দেশের ভাবমূর্তিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের সহনশীলতা, সাংস্কৃতিক উন্মুক্ততা এবং আইনের প্রয়োগ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। বাইরের একজন পাঠক বা গবেষকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে—ঐতিহাসিক বই বিক্রি করতে গিয়ে কর্মীরা নিরাপত্তাহীন হলে বিতর্কিত বিষয় নিয়ে গবেষণা ও প্রকাশনার পরিবেশ কতটা নির্ভরযোগ্য? প্রকাশক, বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক আস্থার ক্ষেত্রেও এমন প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক।
তবে দেশের ভাবমূর্তির কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা পরিমাপ করার মতো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। এই ঘটনার কারণে বিদেশি গবেষণা-সহযোগিতা বন্ধ হয়েছে, কোনো প্রকাশনা চুক্তি বাতিল হয়েছে কিংবা কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া এসেছে—এমন প্রমাণ ছাড়া সেসব দাবি করা যাবে না। এখানে প্রতিষ্ঠিত বিষয় হলো বিদেশি সংবাদপ্রচার; সম্ভাব্য বিষয় হলো সেই সংবাদ পাঠকের ধারণাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
আবার দেশের ভেতরে নাগরিক, প্রকাশক, শিক্ষক ও অধিকারকর্মীদের প্রতিবাদও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। তা দেখায়, প্রকাশনার স্বাধীনতা রক্ষার পক্ষে সমাজে সক্রিয় কণ্ঠ রয়েছে। রাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ—তদন্তের স্বচ্ছতা, কর্মীদের সুরক্ষা, বইটির অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্টতা এবং দায় প্রতিষ্ঠিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা—বাইরের পর্যবেক্ষকের মূল্যায়নেও প্রভাব ফেলতে পারে।
দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার কার্যকর পথ হলো ঘটনাটির ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি। ইতিহাসের কোনো বক্তব্যের জবাব গবেষণা, দলিল ও সমালোচনায় দেওয়ার সুযোগ যত বিস্তৃত হবে, বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চার পরিবেশের ওপর আস্থাও তত শক্ত হবে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্য শুধু নির্বাচন নয়; বরং এই নিশ্চয়তা যে নাগরিকের অধিকার, স্বাধীনতা এবং বৈধ কর্মকাণ্ডের সীমা নির্ধারিত হবে আইনের দ্বারা—ব্যক্তি, দল, সংগঠন কিংবা উত্তেজিত জনতার ইচ্ছায় নয়। কোনো বই নিয়ে কারও আপত্তি থাকতে পারে, তার বক্তব্যকে ইতিহাসবিরোধী মনে হতে পারে, লেখকের রাজনৈতিক পরিচয় অপছন্দ হতে পারে, কিংবা বইটি কোনো জনগোষ্ঠীর কাছে গভীরভাবে অস্বস্তিকরও হতে পারে। কিন্তু একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থায় ‘অপছন্দ’ এবং ‘অবৈধতা’ এক জিনিস নয়। একটি বই আইনত নিষিদ্ধ কি না—তার সিদ্ধান্তের পদ্ধতি থাকতে হবে; কোনো দলবদ্ধ শক্তি বইয়ের দোকানে গিয়ে সেই সিদ্ধান্ত নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।
ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের বিক্রয়কেন্দ্রে অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে ঘিরে সৃষ্ট সাম্প্রতিক ঘটনাটি এই মৌলিক পার্থক্যটিকেই সামনে নিয়ে আসে। এখানে শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে কার রাজনৈতিক মূল্যায়ন কী—সেটি দ্বিতীয় প্রশ্ন। প্রথম প্রশ্ন আরও সরল: একটি আইনসম্মত বই বিক্রি হবে কি হবে না, তা নির্ধারণের বৈধ কর্তৃপক্ষ কে?
যদি কোনো বই প্রচলিত আইনের অধীনে নিষিদ্ধ হয়, আদালত তার প্রচার বন্ধ করার নির্দেশ দেন কিংবা যথাযথ আইনি কর্তৃপক্ষ বৈধ প্রক্রিয়ায় কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করে—তখন প্রকাশক ও বিক্রেতা সেই সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য। কিন্তু এর বাইরে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজের রাজনৈতিক মূল্যায়নকে আইনের বিকল্প হিসেবে চাপিয়ে দিলে সেটি আর মতপ্রকাশের পাল্টা মতপ্রকাশ থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে extra-legal veto—আইনের বাইরে দাঁড়িয়ে অন্যের অধিকার ব্যবহারের ওপর ভেটো প্রয়োগ।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। একই অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় দফায় নাগরিকের বাক্ ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা রয়েছে। অবশ্যই এই অধিকার absolute নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি এবং অপরাধে প্ররোচনার মতো নির্দিষ্ট কারণে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ থাকতে পারে।
এই সাংবিধানিক বাক্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোর একটি হলো—“আইনের দ্বারা”। অর্থাৎ সংবিধান স্বাধীনতার ওপর কোনো সীমা থাকার সম্ভাবনাকে স্বীকার করেছে, কিন্তু সীমা আরোপের ক্ষমতাকে উন্মুক্ত সামাজিক শক্তির হাতে ছেড়ে দেয়নি। কে ক্ষুব্ধ হলো, কে বেশি লোক জড়ো করতে পারল, কার রাজনৈতিক প্রভাব বেশি কিংবা কোন মত মুহূর্তে জনপ্রিয়—এসব কোনো মত বা বই নিষিদ্ধ করার সাংবিধানিক মানদণ্ড নয়।
ফলে কোনো বইয়ের বিরুদ্ধে আপত্তি থাকলে আইনগত প্রতিকার চাওয়া যায়। বইয়ে মানহানিকর উপাদান আছে বলে মনে হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে; অপরাধে প্ররোচনা আছে বলে অভিযোগ থাকলে আদালতের আশ্রয় নেওয়া যেতে পারে; কোনো বিদ্যমান আইন লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মনে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো যায়।কিন্তু আইনের প্রক্রিয়াকে অতিক্রম করে শারীরিক বা সামাজিক চাপ প্রয়োগ করা constitutional restriction নয়—বরং constitutional order-এর প্রতিদ্বন্দ্বী একটি ব্যবস্থা।
এখানে সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ আরও সরাসরি প্রাসঙ্গিক। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রত্যেক নাগরিক এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রত্যেক ব্যক্তির অধিকার হলো আইনের আশ্রয় পাওয়া এবং “আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী” আচরণ লাভ করা। একই সঙ্গে আইন ছাড়া কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতিকর ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
“কেবল আইনানুযায়ী”—এই নীতিটি rule of law-এর কেন্দ্রবিন্দু।
একজন বই বিক্রেতার কাছে কয়েকজন গিয়ে বললেন, ‘এ বই রাখা যাবে না’—এ বক্তব্য নিজে আইন নয়। একটি রাজনৈতিক সংগঠন বিবৃতি দিল যে কোনো লেখকের লেখা অগ্রহণযোগ্য—সেটিও আইন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার মানুষ একটি বই বর্জনের ডাক দিতে পারেন—সেটিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনি নিষেধাজ্ঞা সৃষ্টি করে না।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় boycott-এর অধিকার থাকতে পারে, criticism-এর অধিকার থাকতে পারে, protest-এর অধিকার থাকতে পারে; কিন্তু intimidation-এর মাধ্যমে অন্য নাগরিকের বৈধ অধিকার বন্ধ করার অধিকার নেই।
এই distinction-টি অত্যন্ত জরুরি। আপনি একটি বই কিনবেন না—এটি আপনার স্বাধীনতা। আপনি অন্যদের বইটি না কেনার আহ্বান জানাবেন—সেটিও শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের অংশ হতে পারে। আপনি বইটির বিরুদ্ধে পাঁচশ পৃষ্ঠার সমালোচনা লিখবেন—সেটি জ্ঞানচর্চা। কিন্তু আপনি যদি দোকানে গিয়ে বলেন, “আপনি এটি বিক্রি করতে পারবেন না,” এবং আপনার দাবির পেছনে আইন নয়, সংগঠিত ভয় বা শক্তি কাজ করে—তখন বিষয়টি অন্যের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপে রূপ নেয়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রায়ই একমুখী অধিকার হিসেবে দেখা হয়—লেখক লিখবেন, সাংবাদিক বলবেন, বক্তা বক্তব্য দেবেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে বিষয়টি আরও বিস্তৃত। International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR)-এর ১৯ অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে তথ্য ও ধারণা অনুসন্ধান করা, গ্রহণ করা এবং অন্যকে জানানো—seek, receive and impart—এই তিনটি মাত্রাকেই অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর আওতায় লিখিত প্রকাশনা ও বইসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ধারণা প্রচার ও গ্রহণ অন্তর্ভুক্ত।
এই ধারণার আলোকে বইয়ের স্বাধীনতা তিনজনের অধিকারকে একসঙ্গে যুক্ত করে—লেখকের লেখার অধিকার, প্রকাশকের প্রকাশের অধিকার এবং পাঠকের পড়ার অধিকার।
একটি বই জোর করে তাক থেকে নামিয়ে দিলে শুধু লেখকের কণ্ঠ রোধ হয় না; যে পাঠক বইটি নিজে পড়ে বিচার করতে চেয়েছিলেন, তাঁর স্বাধীন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রও সংকুচিত হয়।
এ কারণে বই নিয়ে বিরোধে প্রায়শই একটি পক্ষকে ভুলে যাওয়া হয়—পাঠককে।
পাঠক কি এতটাই অক্ষম যে রাজনৈতিক সংগঠন তাঁর হয়ে ঠিক করে দেবে তিনি কোন বই দেখবেন? একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, গবেষক কিংবা সাধারণ পাঠক কি একটি বিতর্কিত বই পড়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না? গণতন্ত্র যদি নাগরিককে সরকার নির্বাচনের মতো গুরুতর সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্য মনে করে, তাহলে তাকে বই নির্বাচন করার ক্ষেত্রেও প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
মানবাধিকার আইনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—কোনো বক্তব্য বিতর্কিত, অজনপ্রিয় বা তীব্রভাবে আপত্তিকর হলেই তা মতপ্রকাশের সুরক্ষার বাইরে চলে যায় না। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির General Comment No. 34 স্পষ্টভাবে মতপ্রকাশের অধিকারের বিস্তৃত ক্ষেত্রের কথা বলেছে; এতে রাজনৈতিক আলোচনা, জনস্বার্থের বিষয়ে মন্তব্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং লিখিত প্রকাশনাও অন্তর্ভুক্ত।
এটি বোঝা খুব জরুরি। কারণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রয়োজন সবচেয়ে কম হয় সেই কথার ক্ষেত্রে, যার সঙ্গে সবাই একমত। সবাই যে বই ভালোবাসে সেটি রক্ষার জন্য খুব বেশি সাংবিধানিক সাহস লাগে না। অধিকারের প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হয় যখন একটি বই রাজনৈতিকভাবে অপছন্দনীয়, একটি মত সংখ্যাগরিষ্ঠের বিরুদ্ধে, কিংবা একটি গবেষণা প্রচলিত জাতীয় বয়ানকে প্রশ্ন করে।
তখন প্রশ্ন হয়—রাষ্ট্র কি বলবে, “আপনি দ্বিমত করুন, কিন্তু অন্যকে নীরব করতে পারবেন না”?
নাকি রাষ্ট্র নীরব থাকবে এবং সামাজিক শক্তিই ঠিক করবে কোন মতের জায়গা কতটুকু?
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে freedom of expression absolute নয়। তবে ICCPR-এর ১৯(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে হলে সেটি সাধারণভাবে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়: তা আইনে নির্ধারিত হতে হবে; একটি স্বীকৃত বৈধ উদ্দেশ্য সাধন করতে হবে; এবং সেই উদ্দেশ্যের জন্য তা necessary and proportionate—প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক—হতে হবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি আরও বলেছে, restriction অতিরিক্ত বিস্তৃত হতে পারে না এবং যে উদ্দেশ্য অর্জন করতে চাওয়া হচ্ছে, তার জন্য অপেক্ষাকৃত কম হস্তক্ষেপকারী উপায় থাকলে সেটিই অগ্রাধিকার পাবে।
এখানে মব-চাপের সঙ্গে আইনের মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট। মব কোনো proportionality test করে না। সে আদালতে evidence হাজির করে না। সে প্রতিপক্ষকে procedural hearing দেয় না। সে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা করে না কোন আইনে বইটি নিষিদ্ধ। তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে appeal-এর ব্যবস্থাও থাকে না।
তার যুক্তি সাধারণত একটাই—আমরা এটি সহ্য করব না। আর এ কারণেই mob veto একটি constitutional democracy-এর জন্য এত বিপজ্জনক। কারণ এটি শুধু একটি ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি সৃষ্টি করে না; এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈধ প্রক্রিয়াটিকেই প্রতিস্থাপন করে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে। ধরুন, সরকার নিজে কোনো বই নিষিদ্ধ করেনি। কিন্তু কোনো বেসরকারি দল বা সংগঠিত জনতা বারবার প্রকাশক, দোকানদার বা লেখকদের ভয় দেখিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিচ্ছে। রাষ্ট্র যদি কেবল বলে, “আমরা তো বই নিষিদ্ধ করিনি”—তাহলে কি তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড বলছে—না।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির General Comment No. 34-এ বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষের দায়িত্ব শুধু নিজের সংস্থাকে মতপ্রকাশে অন্যায় হস্তক্ষেপ থেকে বিরত রাখা নয়; প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমন কর্মকাণ্ড থেকেও মানুষকে রক্ষা করতে হবে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করে। একই ব্যাখ্যায় মতপ্রকাশের অধিকার চর্চাকারীদের নীরব করার উদ্দেশ্যে আক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এমন হামলার দ্রুত তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
এই জায়গায় রাষ্ট্রের negative obligation এবং positive obligation-এর পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। Negative obligation হলো—রাষ্ট্র নিজে অন্যায়ভাবে অধিকার লঙ্ঘন করবে না। Positive obligation হলো—তৃতীয় পক্ষ যেন ভয়, সহিংসতা বা coercion-এর মাধ্যমে সেই অধিকার কার্যত ধ্বংস করতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও প্রতিকার নিশ্চিত করা। অর্থাৎ একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হলে শুধু এই ঘোষণা যথেষ্ট নয় যে বইটি নিষিদ্ধ নয়। রাষ্ট্রকে দেখতে হবে, আইনসম্মত বই বিক্রির কারণে কোনো ব্যক্তি নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছেন কি না; আক্রমণের অভিযোগ তদন্ত হয়েছে কি না; দায়ীরা জবাবদিহির আওতায় এসেছে কি না; এবং ভবিষ্যতে একই ঘটনা ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট deterrence তৈরি হয়েছে কি না।
মব-সৃষ্ট পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উত্তেজিত পরিস্থিতিতে কখনো ‘শান্তি রক্ষার’ নামে ক্ষতিগ্রস্ত বা হুমকির মুখে থাকা ব্যক্তিকেই দোকান বন্ধ করতে বলা, স্থান ত্যাগ করতে বলা কিংবা তাঁর বৈধ কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া সহজ প্রশাসনিক সমাধান মনে হতে পারে। কিন্তু এখানেই একটি নীতিগত বিপদ রয়েছে।
যদি কোনো বই বিক্রির কারণে একদল মানুষ হুমকি দেয় এবং পুলিশ সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য বই বিক্রেতাকেই বই সরাতে বলে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে কী incentive তৈরি হয়?
বার্তাটি দাঁড়ায়—যে বেশি হুমকি সৃষ্টি করবে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত তার পক্ষেই যাবে।
একে কখনো কখনো ‘heckler’s veto’ ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়: কোনো বক্তা বা মতের বিরোধীরা এত বেশি বিশৃঙ্খলার হুমকি সৃষ্টি করে যে কর্তৃপক্ষ বিশৃঙ্খলাকারীদের নিয়ন্ত্রণ করার বদলে বক্তাকেই নীরব করে দেয়। বইয়ের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য হতে পারে। একটি rule-of-law state-এর নীতি হওয়া উচিত উল্টো: আইনসম্মত কর্মকাণ্ডকে নিরাপদ করা এবং বেআইনি হুমকিকে নিয়ন্ত্রণ করা। অন্যথায় শান্তি রক্ষার নামে অধিকার বিসর্জনের সংস্কৃতি তৈরি হয়।
মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ‘জনশৃঙ্খলা’ বা public order প্রায়ই ব্যবহৃত একটি যুক্তি। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদেও জনশৃঙ্খলার স্বার্থে আইনের দ্বারা যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু public order-এর যুক্তিকে সীমাহীনভাবে ব্যবহার করা যায় না।
ধরা যাক, একটি বৈধ বই বিক্রি হওয়ায় একটি গোষ্ঠী সহিংস হওয়ার হুমকি দিল। এর সমাধান যদি হয় বইটি সরিয়ে দেওয়া, তাহলে রাষ্ট্র আসলে potential violence-কে একটি reward mechanism দিয়ে দেয়। পরবর্তীবার যে কোনো গোষ্ঠী বুঝবে—পর্যাপ্ত উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারলেই অপছন্দের মত বন্ধ করা সম্ভব। এভাবে public order রক্ষার নামে আসলে public disorder-এর incentive তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের necessity এবং proportionality test-এর গুরুত্ব এখানেই। রাষ্ট্রকে দেখতে হবে—প্রকৃত হুমকি কী, হুমকি কার কাছ থেকে আসছে, এবং মতপ্রকাশ বন্ধ না করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কম restrictive উপায় আছে কি না। মানবাধিকার কমিটি স্পষ্টভাবে বলেছে, কোনো সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হুমকি ও গৃহীত ব্যবস্থার মধ্যে সরাসরি ও তাৎক্ষণিক সম্পর্ক দেখাতে হবে এবং ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত হতে পারবে না।
রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে বইয়ের ক্ষেত্রে এই নীতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ historical inquiry নিজেই প্রায়শই বিতর্ক সৃষ্টি করে। একই ব্যক্তিকে নিয়ে ভিন্ন ইতিহাসবিদ ভিন্ন মূল্যায়ন করবেন; নতুন archive প্রকাশিত হলে পুরোনো ব্যাখ্যা বদলাবে; আত্মজীবনী ও সরকারি নথিতে পার্থক্য থাকবে; মৌখিক ইতিহাস অন্য মাত্রা যোগ করবে।
এটাই scholarship-এর প্রকৃতি।
ইতিহাস নিয়ে যদি শুধু এমন বই প্রকাশ করা যায় যা বর্তমান রাজনৈতিক consensus-এর সঙ্গে মেলে, তাহলে সেটি গবেষণা নয়—official memory production।
কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে মহিমান্বিত করা যেমন scholarly method নয়, তাঁকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত পক্ষের নেতা বলে তাঁর দলিল অদৃশ্য করাও scholarly method নয়। একজন গবেষককে অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়তে হবে; পাশাপাশি তার সমালোচনামূলক গবেষণাও পড়তে হবে। পাকিস্তানি নথি দেখতে হবে, ভারতীয় archival record দেখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী ও বিরোধী রাজনৈতিক ধারার লেখাও পড়তে হবে।
একটি বই রাখা মানে একটি মতকে রাষ্ট্রীয় সত্য ঘোষণা করা নয়। বরং একটি বই সরিয়ে দেওয়া প্রায়ই সেই বইটিকে যাচাই করার সুযোগটাই নষ্ট করে।
এখানে বিপরীত দিকটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিক্রির অধিকার রক্ষা করার অর্থ বইটির সমালোচনা নিষিদ্ধ করা নয়। কেউ বইটির পাণ্ডুলিপির provenance প্রশ্ন করতে পারেন; কোনো ইতিহাসবিদ তথ্যগত অসঙ্গতি তুলে ধরতে পারেন; কেউ শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করতে পারেন; কোনো গবেষক বইটিকে self-representation বা political memoir হিসেবে বিশ্লেষণ করতে পারেন।
এসবই মতপ্রকাশের একই স্বাধীনতার অংশ। অতএব একটি সুস্থ অবস্থান হবে না—“বইটি নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না।” আবার এটিও নয়—“বইটি রাখা যাবে না।” বরং—“বইটি থাকবে, প্রশ্নও থাকবে।”—আর এই একটি বাক্যের মধ্যেই মুক্ত জ্ঞানচর্চার নীতি নিহিত।
এই ধরনের ঘটনায় কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, রাষ্ট্র কি তবে একটি নির্দিষ্ট বই বা ঐতিহাসিক ব্যক্তির পক্ষ নেবে?
রাষ্ট্রের কাজ সেটি নয়। রাষ্ট্রকে অসমাপ্ত আত্মজীবনীর বক্তব্য সত্য বলে ঘোষণা করতে হবে না। আবার এর বিরোধীদের বক্তব্যও গ্রহণ করতে হবে না।
রাষ্ট্রের পক্ষ নেওয়ার জায়গাটি অন্যখানে। রাষ্ট্রকে আইনের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। রাষ্ট্রকে বলতে হবে—
বই আইনত নিষিদ্ধ হলে আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা হবে।
কিন্তু কেউ অন্যের বৈধ অধিকার বলপ্রয়োগে বন্ধ করতে পারবেন না। এই নিরপেক্ষতাই constitutional neutrality।
কোনো একটি দোকান থেকে একটি বই সরানো দৃশ্যমান ঘটনা। কিন্তু এর চেয়েও বড় বিপদ অদৃশ্য। যখন নাগরিকরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে কোনো অধিকার ব্যবহারের আগে আইন কী বলে তা জানার চেয়ে কোন গোষ্ঠী ক্ষুব্ধ হতে পারে তা জানা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন মব ইতিমধ্যেই বড় বিজয় অর্জন করে ফেলেছে।
তখন সম্পাদক আইনের বই দেখেন না—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া দেখেন। প্রকাশক আদালতের নিষেধাজ্ঞা খোঁজেন না—সম্ভাব্য হামলাকারীর অবস্থান বিবেচনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গবেষণাগত সত্যের আগে ভাবেন—“এটা বললে কে ক্ষেপে যাবে?”, একজন শিল্পী সৃজনশীলতার আগে হিসাব করেন—“এটা আঁকা নিরাপদ হবে তো?”
এই জায়গায় এসে censorship-এর আর কোনো অফিস প্রয়োজন হয় না। সমাজ নিজের ভেতরেই censor তৈরি করে নেয়।
সেই অর্থে UPL-এর ঘটনা শুধু একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের crisis নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ constitutional stress test।
আমরা কি এমন রাষ্ট্র চাই যেখানে ইতিহাস নিয়ে বিরোধ আদালত, গবেষণা, বই, প্রবন্ধ ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে চলবে? নাকি এমন সমাজ চাই যেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলের সঙ্গে কোন বই নিরাপদ আর কোন বই বিপজ্জনক—সেটিও বদলে যাবে?
প্রথম ব্যবস্থায় disagreement থাকবে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান টিকে থাকবে। দ্বিতীয় ব্যবস্থায় আপাতত আমার পছন্দের পক্ষ জিততে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারও অধিকার নিরাপদ থাকবে না।কারণ mob power-এর কোনো স্থায়ী বন্ধু নেই।
আজ এটি এক ঐতিহাসিক ব্যক্তির বইয়ের বিরুদ্ধে। আগামীকাল অন্য ব্যক্তির বইয়ের বিরুদ্ধে। পরশু সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, শিল্পী কিংবা সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে।
একটি রাষ্ট্রে rule of law কতটা শক্তিশালী, তার পরীক্ষা সব সময় বড় সাংবিধানিক সংকটে হয় না। কখনো কখনো পরীক্ষা হয় একটি ছোট বইয়ের দোকানে। কেউ এসে বলল—“এই বই বিক্রি করা যাবে না।” দোকানদার জিজ্ঞেস করলেন—“কোন আইনে?”
এই প্রশ্নের উত্তরই গণতন্ত্রের পরীক্ষা। যদি উত্তর হয়—“আইন দেখানো হবে, আদালত সিদ্ধান্ত দেবেন”, তবে constitutional order কাজ করছে। আর যদি উত্তর হয়—“আইনের দরকার নেই, আমরা বলেছি”, তবে সেটি আর শুধু একটি বইয়ের সমস্যা নয়।
সেটি রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের সামনে একটি সমান্তরাল কর্তৃত্বের ঘোষণা। আর এ কারণেই অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিয়ে মতভেদ যত গভীরই হোক না কেন, রাষ্ট্রের অবস্থান একেবারে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন: ইতিহাসের সত্য নির্ধারণ করবে গবেষণা; বইয়ের গুণ বিচার করবে পাঠক ও সমালোচক; আর কোনো প্রকাশনা আইনসঙ্গত কি না, তা নির্ধারণ করবে আইন—মব নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩৯ অনুচ্ছেদের মর্মও শেষ পর্যন্ত এই নীতিতেই এসে দাঁড়ায়—নাগরিকের স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে, কিন্তু সেই সীমা হবে পূর্বনির্ধারিত আইনের, যুক্তিসঙ্গততার এবং বৈধ প্রক্রিয়ার সীমা।
আর তাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সবচেয়ে জরুরি ঘোষণাটি কোনো বিশেষ বইকে কেন্দ্র করে নয়, বরং একটি সাধারণ নীতিকে কেন্দ্র করে হওয়া উচিত—“আপনি বইটির বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন; কিন্তু বইটি নীরব করার জন্য আইনের জায়গায় নিজের শক্তিকে বসাতে পারেন না।”
একটি সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা আছে, তা শুধু এই প্রশ্ন দিয়ে বোঝা যায় না—কতটি বই আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ, কতজন সাংবাদিক কারাগারে, কিংবা কতটি বক্তৃতা প্রশাসনিক আদেশে বন্ধ করা হয়েছে। আরও সূক্ষ্ম অথচ গভীর একটি প্রশ্ন করতে হয়: মানুষ কী বলতে পারত, কিন্তু ভয়, অনিশ্চয়তা বা সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় বলেনি? কোন বই প্রকাশ করা যেত, কিন্তু প্রকাশক ছাপেননি? কোন গবেষণা করা সম্ভব ছিল, কিন্তু শিক্ষক বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন? কোন প্রতিবেদন সংবাদকক্ষে প্রস্তুত হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি? কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু সম্ভাব্য বাধার কথা ভেবে আয়োজকেরাই পিছিয়ে গেছেন?
এই অদৃশ্য অংশটির নামই মূলত chilling effect—এমন এক পরিবেশ, যেখানে আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার আগেই সম্ভাব্য শাস্তি বা প্রতিক্রিয়ার ভয় মানুষের আচরণ বদলে দেয়। আর chilling effect যখন মানুষের চিন্তা, লেখা, গবেষণা, সম্পাদনা বা প্রকাশনার সিদ্ধান্তের ভেতরে স্থায়ীভাবে ঢুকে পড়ে, তখন তার পরবর্তী ধাপ হলো self-censorship বা আত্ম-সেন্সরশিপ।
ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে ঘিরে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ঘটনাটি তাই শুধু একটি বইয়ের বিক্রি বন্ধ করার চেষ্টা হিসেবে দেখলে এর গভীরতর সামাজিক প্রতিক্রিয়াটি ধরা পড়ে না। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকজন ব্যক্তি বইটি ‘নিষিদ্ধ’ দাবি করে ইউপিএলের কর্মীদের হয়রানি করেন, দোকানের শাটার নামিয়ে দেন এবং দুই কর্মীকে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যান; অথচ পুলিশের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা পরে জানান, বইটির ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
ঘটনার দৃশ্যমান অংশ সেখানে শেষ হতে পারে। কিন্তু chilling effect-এর যাত্রা শুরু হয় ঠিক তার পরেই।
ধরা যাক, দেশের বিভিন্ন শহরে আরও একশ বই বিক্রেতা ঘটনাটির খবর পড়লেন। তাঁদের কাউকে সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়নি। পুলিশও তাঁদের কোনো বই সরিয়ে নিতে বলেনি। তবু তাঁদের একজন মনে মনে ভাবতে পারেন—“এই বইটি সামনে না রাখাই ভালো।” আরেকজন হয়তো অর্ডার পেলেও বলবেন, “স্টকে নেই।” কোনো পরিবেশক ভাবতে পারেন, বইটি বহন করে বাড়তি ঝুঁকি নেওয়ার প্রয়োজন কী? অন্য কোনো প্রকাশক হয়তো রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি পাণ্ডুলিপি দেখে সম্পাদকীয় মূল্য নয়, প্রথমেই সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার হিসাব শুরু করবেন।
এই মুহূর্তে কোনো censor অফিসে বসে নেই। কোনো সরকারি নিষেধাজ্ঞাও নেই। কিন্তু ভয় বাজারের সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে।
চিলিং ইফেক্টের প্রকৃত শক্তি এখানেই। একটি দৃশ্যমান ঘটনায় যত মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ পরোক্ষভাবে নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করতে পারে। সে কারণে একটি বইয়ের দোকানে কয়েক ঘণ্টার ঘটনা কখনো কখনো পুরো publishing ecosystem-এর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
UPL নিজেই ঘটনার পর জানিয়েছিল, বিভিন্ন সরকারের আমলে নানাভাবে চাপের মুখে পড়লেও প্রতিষ্ঠানটি তার পেশাগত নীতি ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। এই বক্তব্যের মধ্যে বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা লুকিয়ে আছে: চাপের উৎস বদলাতে পারে, কিন্তু প্রকাশকের সামনে ‘কী প্রকাশ করা নিরাপদ’—এই প্রশ্নটি থেকে যেতে পারে।
আত্ম-সেন্সরশিপকে অনেক সময় ভুলভাবে কেবল নীরব থাকার সঙ্গে তুলনা করা হয়। বাস্তবে এটি আরও জটিল। একজন লেখক পুরো লেখা বন্ধ না করেও self-censor করতে পারেন। তিনি একটি নাম বাদ দেন, একটি উদাহরণ পরিবর্তন করেন, একটি রাজনৈতিক সময়কাল এড়িয়ে যান, একটি স্পষ্ট বাক্যের জায়গায় অস্পষ্ট বাক্য লেখেন। একজন সাংবাদিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি করেন না। একজন শিক্ষক বিষয়টি পড়ান, কিন্তু শ্রেণিকক্ষে বিতর্কের সুযোগ দেন না। একজন গবেষক তথ্য সংগ্রহ করেন, কিন্তু ফলাফল প্রকাশের সময় রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অংশটি দুর্বল করে দেন। একজন সম্পাদক লেখাটি বাতিল করেন না; বরং বলেন, “এই অংশটুকু বাদ দিলে ভালো হয়।” একটি টেলিভিশন চ্যানেল আলোচনা বন্ধ করে না; কিন্তু এমন অতিথি নির্বাচন করে, যাঁরা খুব বেশি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলবেন না। অর্থাৎ self-censorship-এর সবচেয়ে সফল রূপ হলো সেই রূপ, যেখানে বাইরে থেকে দেখে মনে হয় সবকিছু স্বাভাবিক চলছে।
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের আত্ম-সেন্সরশিপের প্রশ্ন নতুন নয় এবং একে কোনো একটি সরকার বা রাজনৈতিক পর্বে সীমাবদ্ধ করলে বাস্তবতার বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। পূর্ববর্তী শাসনামলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিবেদন ও সাংবাদিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক চাপ, আইনি ঝুঁকি, নিরাপত্তা সংস্থার ভয় এবং সংবাদকক্ষের ভেতরে story ‘kill’ করার প্রবণতার সঙ্গে self-censorship-এর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছে। Human Rights Watch ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে লিখেছিল, সরকারের সমালোচনামূলক সংবাদকে কেন্দ্র করে চাপ ও বিচারিক ব্যবস্থার ব্যবহার সংবাদকক্ষকে আরও self-censorship-এর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। International Federation of Journalists-এর দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষণেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের কারণে সাংবাদিকদের মধ্যে ভয় ও আত্ম-সেন্সরশিপের পরিবেশের কথা এসেছে। অর্থাৎ ২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রশ্নটি নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর শিকড় পুরোনো। বরং গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রকৃত পরীক্ষা এখানেই—আগের ভয়কে কি আমরা নতুন ধরনের ভয় দিয়ে প্রতিস্থাপন করছি, নাকি ভয়মুক্ত প্রতিষ্ঠান তৈরি করছি?
বাংলাদেশ মিডিয়া মনিটরের ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে ৮ আগস্ট ২০২৪ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সময়কালে ১১৯টি ঘটনায় ২৪৩-এর বেশি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী সহিংসতা, হুমকি, আটক, মামলা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক চাপের মতো ঘটনার শিকার হয়েছেন বলে নথিভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে অন্তত ৩৫ সাংবাদিক সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছেন বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। এই সংখ্যাগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে পড়তে হবে—এটি একটি monitoring organisation-এর সংগৃহীত তথ্য, কোনো বিচারিক determination নয়। তবু ঘটনাগুলোর সমষ্টিগত তাৎপর্য রয়েছে, কারণ সাংবাদিকের নিরাপত্তা এবং editorial independence-এর মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আছে।
একজন সাংবাদিককে আক্রমণ করা হলে ক্ষতি শুধু সেই সাংবাদিকের নয়। তাঁর সহকর্মীরা ঘটনাটি দেখেন। সম্পাদক দেখেন। তরুণ প্রতিবেদক দেখেন। প্রত্যেকে নিজের জন্য একটি অদৃশ্য সীমারেখা আঁকতে শুরু করলে তখন সংবাদমাধ্যমে censorship আর শুধু বাইরের চাপ নয়—newsroom calculation হয়ে ওঠে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে chilling effect আরও বিপজ্জনক, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক দায়িত্বই হলো এমন প্রশ্ন করা, যেগুলো সহজ, জনপ্রিয় বা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক নয়।
Academic freedom শুধু শিক্ষক ক্লাসে কী বলবেন সেই স্বাধীনতা নয়। এর মধ্যে গবেষণার বিষয় নির্বাচন, evidence অনুসরণ, ফলাফল প্রকাশ, প্রতিষ্ঠানের নীতি সমালোচনা, scholarly association এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কে অংশগ্রহণের স্বাধীনতাও অন্তর্ভুক্ত।
কিন্তু একজন শিক্ষক যদি মনে করেন যে তাঁর বক্তব্যকে তার scholarly context থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করা হতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হতে পারে, সংগঠিত প্রতিবাদ তৈরি হতে পারে কিংবা প্রশাসন তাঁর পাশে দাঁড়াবে কি না তা অনিশ্চিত—তাহলে তিনি এমন বিষয় এড়িয়ে যেতে পারেন যেখানে বিতর্কের সম্ভাবনা বেশি। আর সেখানেই শুরু হয় academic silence।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে University Teachers’ Network, University of Asia Pacific-এর দুই শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতির ঘটনায় তাঁদের পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে ঘটনাটিকে “mob intimidation”-এর কাছে আত্মসমর্পণ এবং academic freedom ও due process-এর গুরুতর প্রশ্ন হিসেবে বর্ণনা করেছিল। এটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নেটওয়ার্কের মূল্যায়ন, কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়; তবু ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠান কীভাবে বাইরের চাপ মোকাবিলা করবে—সেই বৃহত্তর বিতর্কটিকে সামনে এনেছিল।
কারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যখন কোনো বিতর্কিত পরিস্থিতিতে procedural protection-এর বদলে দ্রুত জনপ্রিয় চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করে, তখন শিক্ষকরা একটি বার্তা পেতে পারেন: “আপনার বক্তব্যের scholarly justification-এর চেয়ে তার সম্ভাব্য reaction বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
এই বার্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ধ্বংসাত্মক। কেননা:
এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় knowledge production-এর জায়গা থেকে ধীরে ধীরে risk management-এর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান বিতর্কে প্রায়ই একটি যুক্তি শোনা যায়: পূর্ববর্তী সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করেছে, সুতরাং বর্তমানের কিছু ঘটনা নিয়ে এত উদ্বেগ কেন?
এই প্রশ্নের রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকতে পারে, কিন্তু মানবাধিকারের দৃষ্টিতে এর উত্তর পরিষ্কার। আগের অন্যায় বর্তমান অন্যায়ের বৈধতা তৈরি করে না। বরং একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের নৈতিক শক্তি বিচার হয় সে পূর্ববর্তী ব্যবস্থার repressiveness পুনরুৎপাদন করে কি না তার ওপর।
আগের আমলে সাংবাদিক ভীত হলে আজ সাংবাদিককে ভয়মুক্ত করা উচিত। আগে বিরোধী মতের শিক্ষক আক্রান্ত হলে আজ বিপরীত রাজনৈতিক পরিচয়ের শিক্ষককে একইভাবে সুরক্ষা দিতে হবে। আগে কোনো বই রাজনৈতিক ক্ষমতার কারণে অতিরিক্ত সুবিধা পেলে আজ তার প্রতিক্রিয়ায় বইটি অদৃশ্য করা সমাধান নয়। মানবাধিকার প্রতিশোধের চক্র নয়। আসলে, Freedom-এর সঠিক উত্তর আরও freedom; নতুন censorship নয়।
আধুনিক self-censorship-এর সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষেত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম প্রথমে মানুষকে অসাধারণ মতপ্রকাশের সুযোগ দিয়েছে; একই সঙ্গে তা surveillance, screenshot, mass reporting, targeted harassment এবং context collapse-এর ক্ষেত্রও তৈরি করেছে।
২০২৬ সালে প্রকাশিত Zafarullah ও Nughat-এর একটি peer-reviewed গবেষণা বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে regulatory control এবং self-censorship-এর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছে। তাঁদের গবেষণা বিশেষভাবে Digital Security Act-পর্বের অভিজ্ঞতার ওপর জোর দিয়ে দেখিয়েছে যে আইনি পরিণতি ও নজরদারির আশঙ্কা নাগরিক, সাংবাদিক ও কর্মীদের মধ্যে ভয় এবং আত্ম-সেন্সরশিপ বাড়াতে পারে। কিন্তু ডিজিটাল chilling effect শুধু আইনের কারণে হয় না।
একজন শিক্ষক একটি মত লিখলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে তার screenshot ছড়িয়ে পড়ল। মূল বক্তব্যের আগে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা শুরু হলো। তারপর ফোন, মন্তব্য, সংগঠিত প্রতিবাদ কিংবা প্রতিষ্ঠানের কাছে অভিযোগ।
অন্য দশজন শিক্ষক ঘটনাটি দেখলেন। কেউ তাঁদের কিছু বলেনি। তবু তাঁরা পরেরবার পোস্ট লেখার আগে ভাববেন। একদিন হয়তো লেখাটিই আর পোস্ট করবেন না। এই মুহূর্তে censorship সম্পূর্ণ হয়েছে—কিন্তু censor কে, তা আর শনাক্ত করা সহজ নয়।
সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও chilling effect প্রায় একইভাবে কাজ করে। ২০২৬ সালে দেশের কিছু এলাকায় ধর্মীয় নেতাদের আপত্তির প্রেক্ষাপটে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা কনসার্ট আয়োজন নিয়ে বাধার অভিযোগ ও বিতর্ক দেখা দেয়। আগস্টে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান সরকারের পক্ষ থেকে বলেন, সরকার সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার কোনো নীতি অনুসরণ করছে না; নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান বাতিল হলে নিরাপত্তা বা অন্য কারণ থাকতে পারে।
রাষ্ট্রের এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো বিচ্ছিন্ন অনুষ্ঠান বাতিল হওয়া থেকেই রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক censorship-এর সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তবু broader chilling-effect question থেকে যায়।
যদি কোনো আয়োজক মনে করেন অনুষ্ঠান আয়োজন করলে স্থানীয় চাপ সৃষ্টি হতে পারে, পুলিশি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে কি না জানা নেই, সংঘাত হলে দায় তাঁর ওপরই পড়বে—তাহলে পরবর্তী অনুষ্ঠানটি হয়তো ঘোষণাই করা হবে না। আর যে অনুষ্ঠান ঘোষণা হয়নি, তার cancellation-এর কোনো পরিসংখ্যানও থাকবে না। সেখানেই self-censorship-এর অদৃশ্যতা।
একজন মানুষ ভয় পেতে পারেন—এটি মানবিক। কিন্তু একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান তৈরি করার মূল উদ্দেশ্যই হলো ব্যক্তিকে তাঁর একক সাহসের ওপর নির্ভর করতে না দেওয়া।
এই জায়গায় institutional silence সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ প্রতিষ্ঠান নীরব থাকলে হুমকিদাতা শুধু একটি ঘটনায় জয়ী হয় না; সে ভবিষ্যতের আচরণের নিয়মও তৈরি করে। একটি ঘটনার পর যদি সবাই বুঝে যায়—“এ ধরনের বিষয়ে প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি নেবে না”—তাহলে পরবর্তীবার চাপ প্রয়োগ করতে হয় আরও কম।
Self-censorship-এর একটি গভীরতর পর্যায়কে বলা যায় anticipatory obedience—কেউ নির্দেশ দেওয়ার আগেই আমরা অনুমান করে নিই ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কী চাইতে পারে এবং সে অনুযায়ী নিজেদের আচরণ বদলে ফেলি।
এই পর্যায়ে repression অত্যন্ত কার্যকর এবং অত্যন্ত সস্তা হয়ে যায়। কারণ ক্ষমতাকে আর প্রতিটি ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে হয় না। মানুষ নিজেই অনুমান করে সীমা মেনে চলে।
সমাজে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তটি তখন নয় যখন কেউ বলে—“আমি ভয় পাচ্ছি।” বরং যখন বলা শুরু হয়—“এই বিষয়গুলো না বলাই ভালো।”
এই বাক্যগুলো প্রথমে বাস্তববাদী মনে হয়। কখনো কখনো ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্য তা যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তও হতে পারে। কিন্তু যখন একই logic হাজার মানুষের দৈনন্দিন সিদ্ধান্তে ছড়িয়ে পড়ে, তখন একটি সমাজের intellectual horizon ছোট হয়ে আসে। মানুষ আর আইন কোথায় সীমা টেনেছে তা দেখে না। মানুষ নিজের ভয় যেখানে সীমা টানে, সেখানেই থেমে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে UPL-এর ঘটনার পর দোকান পুনরায় খোলা এবং নিষিদ্ধ নয় এমন বই বিক্রির নীতি বজায় রাখার ঘোষণা শুধু একটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়। এটি chilling effect-এর বিরুদ্ধে institutional resistance হিসেবেও পড়া যায়। একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রতিটি বই নিয়ে সবাইকে সন্তুষ্ট রাখা সম্ভব নয়; কিন্তু তার professional principle যদি হয় আইনে নিষিদ্ধ নয় এবং সম্পাদকীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য—তাহলে সেটি প্রকাশ করা বা বিক্রি করা যাবে, সেই নীতি পুরো জ্ঞানপরিসরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠানকে heroism-এর ওপর টিকিয়ে রাখা যায় না। নাগরিক সমাজ UPL-ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে এবং তদন্ত ও প্রকাশকদের নিরাপত্তা দাবি করেছে; The Daily Star-এর সম্পাদকীয়ও এটিকে free speech-এর ওপর আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। কারণ একটি healthy democracy-তে প্রকাশককে courageous হওয়ার জন্য প্রশংসা করা যেতে পারে, কিন্তু অধিকার ভোগ করতে courageous হওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত নয়।
এসব যদি নাগরিক অধিকার হয়, তবে এগুলোকে প্রতিষ্ঠান ও আইন দ্বারা স্বাভাবিক ও নিরাপদ করে তোলাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
Self-censorship-এর আরেকটি সামাজিক ফল হলো spiral of silence। মানুষ যখন দেখে জনপরিসরে একটি মতই প্রবলভাবে উচ্চারিত হচ্ছে, তখন ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও অনেকেই তা প্রকাশ করেন না। ফলে বাইরে থেকে মনে হয় প্রায় সবাই dominant view-এর সঙ্গে একমত। কিন্তু বাস্তবে হয়তো অনেকে চুপ করে আছেন। তাঁদের নীরবতার কারণে অন্য নীরব মানুষও ভাবেন—“সম্ভবত আমি একাই।”
ফলে নীরবতা আরও বাড়ে।—এই প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মত কতটা প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠ, আর কতটা visible majority created by silence—তা বোঝা কঠিন হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়, মিডিয়া এবং রাজনৈতিক সমাজে এর প্রভাব গভীর। Consensus তখন genuine deliberation থেকে আসে না; আসে dissent-এর অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো সবাইকে একই মত গ্রহণ করানো নয়। বরং disagreement-কে নিরাপদ করা।
—এই নিরাপত্তা ছাড়া pluralism কাগজে থাকে, সমাজে নয়।
শেষ পর্যন্ত chilling effect-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—একটি দেশের freedom index শুধু আনুষ্ঠানিক আইন পড়ে বোঝা যায় না। দেখতে হয় মানুষের দৈনন্দিন আচরণ:
—এসবের কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান থাকে না। তবু গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য বোঝার জন্য এই অপ্রকাশিত লেখা, না-করা প্রশ্ন, বাতিল হয়ে যাওয়া গবেষণা এবং আয়োজনের আগেই পরিত্যক্ত অনুষ্ঠানগুলোর ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
UPL-এর বাংলাবাজারের ঘটনাটি তাই আমাদের শুধু জিজ্ঞেস করে না—একটি বই বিক্রি করা যাবে কি না। এটি আরও বড় প্রশ্ন তোলে—
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ক্রমে ‘না’-এর দিকে যায়, তাহলে কোনো আনুষ্ঠানিক censorship law ছাড়াই একটি সমাজ বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সংকুচিত হতে পারে। কারণ স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় বিপদ সব সময় মুখ বন্ধ করে দেওয়া নয়।
কখনো কখনো সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—মানুষকে এমনভাবে ভয় দেখানো, যাতে একসময় মুখ বন্ধ করার জন্য আর কাউকে বলতে না হয়। সেই মুহূর্তে censor আর রাষ্ট্রের কোনো দপ্তরে বসে থাকে না। সে মানুষের নিজের মনের ভেতর একটি চেয়ার পেয়ে যায়।
কোনো সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানে লিখে দিলেই নিরাপদ হয় না। স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, প্রক্রিয়া ও সংস্কৃতি, যা নাগরিককে এই নিশ্চয়তা দেয়—তিনি আইনসম্মতভাবে লিখতে, প্রকাশ করতে, পড়তে, গবেষণা করতে বা প্রশ্ন তুলতে পারবেন; আর তার জন্য তাঁকে ব্যক্তিগত সাহস, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে না। UPL-এর বাংলাবাজারের ঘটনাটি যে বৃহত্তর প্রশ্নগুলো সামনে এনেছে, তার সমাধান তাই শুধু একটি ঘটনার তদন্তে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন mob veto থেকে institutional protection-এ একটি কাঠামোগত রূপান্তর।
এই রূপান্তরের কেন্দ্রীয় নীতি হওয়া উচিত সহজ কিন্তু দৃঢ়: কোনো বই, বক্তৃতা, গবেষণা বা সাংস্কৃতিক কাজের বৈধতা নির্ধারণ করবে আইন; তার বুদ্ধিবৃত্তিক মান বিচার করবে পাঠক, গবেষক ও সমালোচক; আর নাগরিকের আইনসম্মত অধিকার সুরক্ষিত রাখবে রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশে কোনো বই নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তির একটি হলো—বইটি আদৌ নিষিদ্ধ কি না, তা সাধারণ পাঠক, বিক্রেতা কিংবা কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মীর কাছেও তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার থাকে না। এই অস্পষ্টতাই গুজব ও মব-চাপের জন্য সুযোগ তৈরি করে।
এ কারণে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একটি publicly accessible, regularly updated register থাকা প্রয়োজন, যেখানে আদালত বা বৈধ কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে নিষিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ কোনো প্রকাশনার নাম, আইনি ভিত্তি, আদেশের তারিখ এবং কার্যকারিতার অবস্থা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
এর সুফল বহুমুখী।
আর কোনো গোষ্ঠী সহজে একটি বৈধ বইকে ‘নিষিদ্ধ’ বলে দাবি করে চাপ সৃষ্টি করতে পারবে না। আইনের শাসনের প্রথম শর্ত হলো—আইন দৃশ্যমান ও জানা যায় এমন হতে হবে।
কোনো বই, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বক্তৃতা বা বিশ্ববিদ্যালয় সেমিনার ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে সবচেয়ে সহজ প্রশাসনিক সমাধান হতে পারে অনুষ্ঠান বন্ধ করা, দোকান বন্ধ করতে বলা অথবা বিতর্কিত বস্তু সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু এই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে mob veto-কে উৎসাহিত করতে পারে।
এ কারণে একটি স্পষ্ট Standard Operating Procedure বা SOP প্রয়োজন। সেখানে অন্তত কয়েকটি নীতি থাকা উচিত:
রাষ্ট্রের নীতি হওয়া উচিত: শান্তি রক্ষা করা মানে শান্তিপূর্ণ অধিকার বন্ধ করা নয়; বরং হুমকি থেকে সেই অধিকারকে সুরক্ষিত করা।
বাংলাদেশের প্রকাশনা জগৎ মূলত ছড়িয়ে থাকা ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠাননির্ভর। একটি বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হয়তো আইনজীবী, গণমাধ্যম ও সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে চাপ মোকাবিলা করতে পারে, কিন্তু ছোট প্রকাশকের সেই সক্ষমতা নাও থাকতে পারে।
তাই প্রকাশনা সমিতি, বই বিক্রেতা সংগঠন, লেখক ফোরাম, PEN-ধারার সাহিত্য সংগঠন, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে একটি Publishing Freedom Response Network গড়ে তোলা যেতে পারে।
এই নেটওয়ার্ক জরুরি পরিস্থিতিতে—
—যাতে দিতে পারে। কারণ freedom of publication যদি একেকজন প্রকাশকের ব্যক্তিগত সাহসের ওপর নির্ভর করে, তাহলে দুর্বল প্রতিষ্ঠান আগে নীরব হবে। Collective institutional backing chilling effect কমাতে পারে।
কোনো বই নিয়ে আপত্তি থাকলে তা কীভাবে উত্থাপন করা হবে, তারও একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক কাঠামো থাকা প্রয়োজন। একটি বই নিয়ে প্রশ্ন তোলা, সমালোচনা করা বা তার বিরুদ্ধে পিটিশন করা নিজেই অসাংবিধানিক নয়।
সমস্যা শুরু হয় যখন challenge রূপ নেয় coercive ban-এ। লাইব্রেরি, বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিতর্কিত বই নিয়ে আপত্তি উঠলে একটি transparent review process থাকা যেতে পারে। সেখানে বইটির বিষয়, বয়সোপযোগিতা, শিক্ষাগত প্রয়োজন, গবেষণামূল্য, আইনগত অবস্থান এবং alternative access বিবেচনা করা হবে। কিন্তু review process কখনোই তাৎক্ষণিক মব-চাপের কাছে নত হওয়া উচিত নয়।
মূল নীতি: আপত্তি শোনা হবে, কিন্তু ভয়কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি করা যাবে না।
বিশ্ববিদ্যালয় এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলাই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক ইতিহাস, রাষ্ট্র, ধর্ম, সমাজ, লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয়, যুদ্ধ, মানবাধিকার কিংবা ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে গবেষণা যদি শুধু জনপ্রিয় মতের সীমার মধ্যে আটকে যায়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় তার মূল উদ্দেশ্য হারায়।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি সুস্পষ্ট Academic Freedom and Institutional Due Process Charter থাকা প্রয়োজন। সেখানে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে—
একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত due process রক্ষা করা, জনপ্রিয় ক্ষোভের গতি অনুসরণ করা নয়।
চিলিং ইফেক্ট সংবাদমাধ্যমে বিশেষভাবে ক্ষতিকর, কারণ একটি সংবাদকক্ষ যখন ভয় পায়, পুরো সমাজ তথ্য হারায় প্রতিটি বড় সংবাদমাধ্যমে editorial independence-এর জন্য লিখিত protocol থাকতে পারে, যেখানে—
—এসব ক্ষেত্রে newsroom কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে তাস্পষ্ট করা থাকবে।
সাংবাদিক যদি কোনো sensitive story প্রকাশ করতে গিয়ে একা হয়ে যান, self-censorship বাড়বে। কিন্তু যদি তিনি জানেন প্রতিষ্ঠান তাঁর পক্ষে legal review, security assessment এবং editorial defence দেবে, তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার বাস্তব ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়।
একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে sensational amplification এড়িয়ে চলা। মবের কার্যক্রমকে এমনভাবে প্রচার করা উচিত নয়, যাতে ভয় প্রদর্শন নিজেই political communication-এর কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হয়।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে অপছন্দের বক্তব্যের প্রধান জবাব হওয়া উচিত counter-speech। সভ্য সমাজে যা করা হয়:
এটাই জ্ঞানসমাজের পদ্ধতি। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কৃতিতে counter-speech-এর জায়গায় প্রায়ই silencing দেখা যায়। “আমি একমত নই”—এই বাক্য দ্রুত “এটি থাকতে দেওয়া যাবে না”—তে পরিণত হয়।
এই সংস্কৃতি বদলানো জরুরি। কারণ গণতন্ত্রের উদ্দেশ্য dissent নির্মূল করা নয়; dissent-কে সহিংসতা ছাড়াই পরিচালনা করার সক্ষমতা গড়ে তোলা।
বই নিয়ে বিতর্কে লেখক, প্রকাশক ও রাজনৈতিক পক্ষ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়, কিন্তু পাঠক প্রায়ই অনুপস্থিত থাকেন। অথচ একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের নিজের বই নির্বাচন করার স্বাধীনতাই একটি pluralistic knowledge society-এর কেন্দ্রীয় মূল্যবোধ।
রাষ্ট্র বা কোনো গোষ্ঠী যদি মনে করে পাঠক ভুল বই পড়তে পারেন, তাই আগে থেকেই বই সরিয়ে দেওয়া দরকার—তাহলে তা নাগরিকের বিচারক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করে। একটি পরিণত রাষ্ট্র পাঠককে বলে না: “এই বই পড়বেন না।” বরং বলে: “এই বই পড়ুন, তার সমালোচনাও পড়ুন, দলিল তুলনা করুন, তারপর নিজে সিদ্ধান্ত নিন।”—এই reader-centred approach বিশেষভাবে বিশ্ববিদ্যালয়, পাবলিক লাইব্রেরি এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাস ও রাজনীতি বিষয়ে রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের collection development কোনো সরকারের ideology অনুযায়ী বদলানো উচিত নয়। একটি জাতীয় নীতি থাকতে পারে যেখানে উল্লেখ থাকবে—
—সবকিছুকেই balanced collection-এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
একজন নেতার বই থাকবে মানে তাঁর সমালোচনার বই বাদ যাবে না। একটি সরকারের ইতিহাস থাকবে মানে বিরোধী বয়ান সরিয়ে দেওয়া হবে না। —লাইব্রেরি হওয়া উচিত memory warehouse নয়, contested knowledge-এর নিরাপদ স্থান।
বিদ্যালয়ের ইতিহাস শিক্ষা রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে বারবার পুনর্লিখিত হলে শিক্ষার্থীর কাছে ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়। পাঠ্যক্রমে therefore একটি নীতিগত পরিবর্তন দরকার।
যেখানে ইতিহাসের মৌলিক ঘটনা, তারিখ ও দলিলের ক্ষেত্রে factual consensus স্পষ্ট করা হবে; আর যেখানে scholarly debate আছে, সেখানে বয়সোপযোগীভাবে তা স্বীকার করা হবে।
উদাহরণস্বরূপ: “এ বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে”—এই বাক্য কখনো দুর্বলতা নয়। বরং এটি শিক্ষার্থীকে শেখায় ইতিহাস গবেষণার বিষয়, মুখস্থ রাজনৈতিক বয়ান নয়। পাঠ্যপুস্তক যদি শিক্ষার্থীকে একমাত্র ‘correct political memory’ দেয়, তবে সে আনুগত্য শেখে। কিন্তু যদি একাধিক উৎস মূল্যায়ন করতে শেখায়, তবে সে critical citizenship শেখে।
Mob intimidation-এর সবচেয়ে বড় উৎসাহ আসে impunity থেকে। যদি হুমকি, হামলা, দোকান বন্ধ করা, বক্তৃতা ভাঙচুর বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করার ঘটনায় কোনো দৃশ্যমান investigation না হয়, তাহলে একটি সামাজিক বার্তা তৈরি হয়—এ ধরনের চাপ প্রয়োগে বড় ঝুঁকি নেই।
অপরদিকে দ্রুত তদন্ত, evidence-based prosecution এবং প্রকাশ্যভাবে outcome জানানো deterrence তৈরি করে। এখানে লক্ষ্য রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়।
লক্ষ্য হলো নাগরিককে জানানো: আপনি প্রতিবাদ করতে পারেন; কিন্তু অন্যের বৈধ অধিকার বলপ্রয়োগে বন্ধ করলে তার আইনি পরিণতি আছে।
মব-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শুধু পুলিশ যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো জনপ্রিয় নেতা যখন প্রতিপক্ষের বই, সাংবাদিক, শিক্ষক বা শিল্পীর বিরুদ্ধে অস্পষ্টভাবে ‘ব্যবস্থা নেওয়া উচিত’, ‘মানুষ বিচার করবে’ বা ‘জনগণ সহ্য করবে না’ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দেন, তখন তা ground-level intimidation-কে legitimise করতে পারে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি স্পষ্টভাবে বলে—“আমরা বইটির বক্তব্যের বিরোধিতা করি, কিন্তু এর বৈধ প্রকাশের অধিকার রক্ষা করব”—তাহলে সেটি একটি শক্তিশালী democratic signal।
একটি দেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতা মাপার উপায়গুলোর একটি হলো—ক্ষমতাসীন বা বিরোধী নেতা নিজেদের বিরোধীদের অধিকার রক্ষায় কতটা স্পষ্ট।
বাংলাদেশে নাগরিক সমাজ অনেক সময় ঘটনাভেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে ভিন্ন মানদণ্ড ব্যবহার করে। নিজের রাজনৈতিক পক্ষ আক্রান্ত হলে freedom-এর ভাষা শক্তিশালী হয়; প্রতিপক্ষ আক্রান্ত হলে নীরবতা দেখা যায়।
এই selective solidarity দীর্ঘমেয়াদে স্বাধীনতার সংস্কৃতি দুর্বল করে। একটি consistent civil society position হওয়া উচিত:
কেননা Principle তখনই principle, যখন তা নিজের বিরোধীর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়।
বর্তমান সময়ে mob শুধু রাস্তায় তৈরি হয় না; অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে অনলাইনে তৈরি হয়। একটি screenshot, context ছাড়া একটি quote, একটি edited video, একটি hashtag—দ্রুত একটি ব্যক্তিকে শত্রু হিসেবে নির্মাণ করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানের তাই digital crisis protocol থাকা প্রয়োজন। প্রথম প্রতিক্রিয়া যেন social-media pressure-এর ভিত্তিতে immediate punishment না হয়। বরং verification, context, hearing এবং proportionate response নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, সংবাদমাধ্যম ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে বুঝতে হবে: viral outrage evidence নয়। অনলাইনে পাঁচ হাজার মন্তব্য কোনো disciplinary finding-এর বিকল্প হতে পারে না।
কোনো শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক বা সাংস্কৃতিক কর্মীকে নিয়ে অভিযোগ উঠলে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রবণতা হলো আগে ব্যবস্থা নেওয়া, পরে তদন্ত করা।—এটি mob pressure-এর সবচেয়ে বড় incentive। সঠিক নীতি হওয়া উচিত—
অর্থাৎ punishment before proof নয়; process before punishment। আর যে রাষ্ট্র due process রক্ষা করে না, সেখানে মানুষ শেষ পর্যন্ত আইনের চেয়ে রাজনৈতিক বাতাসের দিক বেশি গুরুত্ব দিতে শেখে।
কেউ ভাবতে পারেন, এসব মূলত liberal intellectual concern। বাস্তবে বিষয়টি আরও গভীর। যে সমাজে প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বই, ইতিহাস, শিক্ষক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও প্রতীকের ওপর প্রতিশোধমূলক পুনর্বিন্যাস হয়, সেখানে political transition সব সময় existential conflict হয়ে ওঠে। কারণ সবাই জানে—ক্ষমতা হারানো মানে শুধু সরকার হারানো নয়; নিজের ইতিহাস, পরিচয়, বই, পেশাগত নিরাপত্তা এবং সামাজিক বৈধতাও হারানোর সম্ভাবনা।—এই ভয় রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে যদি প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চিত করে—
—তাহলে রাজনৈতিক পালাবদল অনেক কম অস্তিত্বসংকটময় হয়। সুতরাং pluralism শুধু নৈতিক মূল্য নয়; এটি political stability-এর infrastructure।
বাংলাদেশ চাইলে বই, জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা রক্ষার জন্য একটি সমন্বিত National Framework for Intellectual and Publication Freedom বিবেচনা করতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে:
১. নিষিদ্ধ প্রকাশনার public legal register;
২. mob intimidation মোকাবিলায় পুলিশের SOP;
৩. publishers’ emergency legal-support mechanism;
৪. public library plural collection policy;
৫. textbook historiography review standards;
৬. university academic-freedom charter;
৭. media editorial-independence safeguards;
৮. cultural-event protection protocol;
৯. digital mob ও online harassment response framework;
১০. দ্রুত investigation ও accountability mechanism;
১১. public officials-এর জন্য freedom-of-expression training;এবং
১২. annual public reporting on threats to writers, publishers, academics, journalists and cultural workers
এ ধরনের কাঠামো কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মত বা বইকে রক্ষা করার জন্য নয়। বরং সব পক্ষের জন্য একই নিয়ম প্রতিষ্ঠা করার জন্য।
UPL-এর বাংলাবাজারের ঘটনা শেষ পর্যন্ত একটি বইকে ঘিরে হলেও, এর শিক্ষা বইয়ের চেয়ে অনেক বড়।—এটি আমাদের দেখায়, একটি প্রতিষ্ঠান যখন বলে—“বইটি আইনত নিষিদ্ধ নয়, তাই আমরা এটি সরাব না”—তখন সেই বক্তব্য শুধু ব্যবসায়িক স্বাধীনতার নয়; এটি rule of law-এর ভাষা।
কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানকে একা এই ভূমিকা পালন করতে দেওয়া উচিত নয়। কেননা প্রকাশককে আইন রক্ষা করবে। পুলিশ বৈধ কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা দেবে। আদালত অধিকার রক্ষা করবে। বিশ্ববিদ্যালয় scholarly disagreement-এর জায়গা তৈরি করবে। সংবাদমাধ্যম চাপের মুখেও তথ্য প্রকাশ করবে। নাগরিক সমাজ principle-এর ভিত্তিতে পাশে দাঁড়াবে। আর রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্পষ্টভাবে বলবে—কোনো বিরোধের সমাধান ভয় দেখিয়ে নয়।
এই institutional chain-এর একটি অংশ দুর্বল হলে chilling effect শুরু হয়।—সবগুলো শক্তিশালী হলে freedom একটি ব্যক্তিগত ঝুঁকি না হয়ে সামাজিক নিয়মে পরিণত হয়।
একটি পরিণত গণতন্ত্রের লক্ষ্য এমন সমাজ তৈরি করা নয়, যেখানে লেখক, প্রকাশক, শিক্ষক ও সাংবাদিক সবাইকে ‘সাহসী’ হতে হবে। বরং লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন রাষ্ট্র, যেখানে সাধারণভাবে নিজের কাজ করতেই অতিরিক্ত সাহস প্রয়োজন হয় না।
—এই স্বাভাবিকতার নামই প্রকৃত স্বাধীনতা। আর সেই স্বাধীনতা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সমাজ স্পষ্টভাবে একটি নীতি গ্রহণ করে—
সেই জায়গাতেই একটি বইয়ের দোকানের ছোট ঘটনা রাষ্ট্রের বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়। এবং সেখানেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়—আমরা কি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে শক্তি ঠিক করবে কোন বই থাকবে, নাকি এমন বাংলাদেশ, যেখানে আইন স্বাধীনতাকে রক্ষা করবে এবং পাঠক নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে কী পড়বে, কী বিশ্বাস করবে, আর কী প্রত্যাখ্যান করবে?
একটি বইয়ের দোকানের শাটার নামিয়ে দেওয়া হয়তো কয়েক মিনিটের ঘটনা। একটি বই তাক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়তো প্রশাসনিক বা সামাজিক চাপের একটি ছোট্ট পরিণতি। কিন্তু এর প্রতীকী অভিঘাত অনেক গভীর। কারণ বই কেবল কাগজে ছাপা শব্দ নয়; বই স্মৃতি বহন করে, মত তৈরি করে, ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের কথোপকথন ঘটায়, প্রতিষ্ঠিত বয়ানকে প্রশ্ন করে, কখনো অস্বস্তি তৈরি করে, আবার কখনো একটি জাতিকে নিজের অতীত নতুন করে দেখতে শেখায়। সে কারণে কোনো বইকে ঘিরে সংগঠিত ভয়, মব-চাপ বা অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা শেষ পর্যন্ত শুধু একটি প্রকাশনার ওপর আঘাত নয়—এটি চিন্তার স্বাধীনতার পরিসর কতটা নিরাপদ, সেই প্রশ্নের পরীক্ষা।
ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে কেন্দ্র করে যে ঘটনা ঘটেছে, তার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা একাধিক হতে পারে; বইটির ঐতিহাসিক মূল্য, পাণ্ডুলিপির প্রামাণিকতা, শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কিংবা বইটির বক্তব্য নিয়েও মতভেদ থাকতেই পারে। বরং থাকা উচিত। ইতিহাস কোনো পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নয়, যার প্রতিটি বাক্য প্রশ্নাতীত; আবার ইতিহাস এমন কোনো রাজনৈতিক দেয়াললিখনও নয়, যা ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে মুছে নতুন করে লেখা যাবে। ইতিহাসের শক্তি তার প্রশ্ন সহ্য করার ক্ষমতায়।
এই কারণেই অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ার অধিকার রক্ষা করা মানে বইটির প্রতিটি বক্তব্যকে সত্য ঘোষণা করা নয়। একইভাবে বইটির সমালোচনা করা মানে সেটি তাক থেকে সরিয়ে দেওয়ার অধিকার অর্জন করা নয়। একটি গণতান্ত্রিক জ্ঞানসমাজের মৌলিক নীতি হওয়া উচিত আরও সরল: বই থাকবে, প্রশ্নও থাকবে; দলিল থাকবে, পাল্টা দলিলও থাকবে; ইতিহাস থাকবে, তার সমালোচনাও থাকবে।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন রাজনৈতিক মতভেদ জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র থেকে শক্তির প্রদর্শনে নেমে আসে। যখন কেউ বইয়ের যুক্তির জবাব বই দিয়ে না দিয়ে বই বিক্রেতাকে ভয় দেখায়; যখন কোনো বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে পাল্টা বক্তব্য নয়, বরং নীরবতা দাবি করা হয়; যখন আইন কী বলে তার আগে প্রশ্ন ওঠে—“কারা ক্ষুব্ধ হবে?” তখন বুঝতে হবে সমাজে rule of law-এর পাশাপাশি rule of fear-এর একটি অদৃশ্য কাঠামো তৈরি হচ্ছে।
এই ভয় সরাসরি নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ নিষেধাজ্ঞার একটি সরকারি আদেশ থাকে, যাকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যায়। কিন্তু chilling effect-এর কোনো কাগজ নেই, কোনো গেজেট নেই, কোনো অফিস নেই। সেটি মানুষের মাথার ভেতরে বাসা বাঁধে। প্রকাশক পাণ্ডুলিপি ফিরিয়ে দেন, সম্পাদক লেখা নরম করেন, শিক্ষক প্রশ্ন এড়িয়ে যান, সাংবাদিক প্রতিবেদন আটকে দেন, শিল্পী কাজটি প্রকাশ করেন না—আর বাইরে থেকে দেখে মনে হয় সবই স্বাভাবিক চলছে।—আর এভাবেই স্বাধীনতার সংকোচন অনেক সময় শব্দ করে আসে না। বরং নীরবে আসে।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় শিক্ষা হলো—আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে রাজনৈতিক পালাবদলের সম্পত্তি বানানো যাবে না। ১৯৭১, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন, ১৯৭৫, সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ১৯৯০, ২০০৭–০৮ কিংবা ২০২৪—এই প্রতিটি অধ্যায়ই বহু মানুষ, বহু প্রতিষ্ঠান, বহু সংঘাত এবং বহু স্মৃতির সমষ্টি।
কোনো একটি দল, পরিবার, সরকার বা প্রজন্ম তার একক মালিক নয়। সুতরাং রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে ইতিহাসের তাকও যদি বদলে যায়, তবে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক বিপজ্জনক বার্তা পাঠাই—সত্যের চেয়ে ক্ষমতা বেশি স্থায়ী। কিন্তু ইতিহাসের কাজ ক্ষমতাকে অনুসরণ করা নয়; বরং ক্ষমতাকেও দলিলের সামনে দাঁড় করানো।
শেখ মুজিবুর রহমানকে ইতিহাসে রাখতে হলে তাঁকে দেবত্ব দিয়ে নয়, পূর্ণ রাজনৈতিক মানুষ হিসেবে রাখতে হবে—অর্জন, ব্যর্থতা, সিদ্ধান্ত, বিতর্ক, বিরোধ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটসহ। একইভাবে জিয়াউর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, মওলানা ভাসানী, খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা কিংবা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক চরিত্রকেও একই scholarly standard-এ বিচার করতে হবে। কেননা মূল বিষয় হওয়া উচিত “না মহিমান্বিতকরণ, না মুছে ফেলা—বরং সমালোচনামূলক স্মৃতি।”
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোনো নির্দিষ্ট বইয়ের সত্যতা ঘোষণা করা নয়। রাষ্ট্রকে বলতে হবে না যে অসমাপ্ত আত্মজীবনীর প্রতিটি বাক্য সঠিক; আবার এটিও বলা রাষ্ট্রের কাজ নয় যে রাজনৈতিক বিরোধের কারণে বইটি জনপরিসর থেকে সরিয়ে দিতে হবে।
রাষ্ট্রের কাজ আরও মৌলিক। রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে যে আইনত নিষিদ্ধ নয় এমন বই প্রকাশ করা যাবে। বিক্রি করা যাবে। পড়া যাবে। সমালোচনা করা যাবে। প্রতিবাদ করা যাবে। কিন্তু বলপ্রয়োগ করে অন্যের বৈধ অধিকার বন্ধ করা যাবে না।—আর এটাই constitutional neutrality। কেননা রাষ্ট্রকে কোনো বইয়ের পক্ষ নিতে হবে না; রাষ্ট্রকে আইনের পক্ষ নিতে হবে।
এই জায়গায় সংবিধানের ৩১ ও ৩৯ অনুচ্ছেদের চেতনাও এক সূত্রে এসে মেলে—নাগরিক আইনের সুরক্ষা পাবেন, আর তাঁর চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হলে তা হবে বৈধ, যুক্তিসঙ্গত ও প্রক্রিয়াসম্মত উপায়ে; রাস্তার তাৎক্ষণিক শক্তির ভিত্তিতে নয়।
তবে এখানেও সতর্কতা প্রয়োজন। মবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা চাইতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় censorship-কে বৈধতা দেওয়া যাবে না। একটি মুক্ত সমাজে দুই ধরনের বিপদই সমানভাবে স্বীকার করতে হয়—state censorship এবং non-state coercion।
রাষ্ট্র যদি নিজে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। আবার রাষ্ট্র যদি বেসরকারি মবের ভয় বা সহিংসতার সামনে নীরব থাকে, তখনও স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। তাই সমাধান আরও শক্তিশালী রাষ্ট্র নয়; সমাধান আইনবদ্ধ, জবাবদিহিমূলক, অধিকার-সচেতন রাষ্ট্র।
এমন রাষ্ট্র, যা নিজের বিরোধী মতকেও রক্ষা করে। এমন পুলিশ, যারা ভিন্নমতকে সমস্যা হিসেবে দেখে না, বরং বেআইনি হুমকিকেই সমস্যা হিসেবে দেখে। এমন আদালত, যেখানে নাগরিক জানেন তাঁর অধিকার লঙ্ঘিত হলে প্রতিকার আছে। এমন বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে popular opinion-এর চেয়ে scholarly evidence গুরুত্বপূর্ণ। এমন সংবাদমাধ্যম, যেখানে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—দুই পক্ষকেই একই কঠিন প্রশ্ন করা যায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে ক্লান্তিকর যুক্তিগুলোর একটি হলো—“আগে ওরা করেছে।” আগে বই সরানো হয়েছে, তাই এবারও হবে। আগে বিরোধী মত দমন করা হয়েছে, তাই এবার পাল্টা দমন যৌক্তিক। আগে ইতিহাস একপেশে লেখা হয়েছে, তাই এবার অন্যপক্ষের একপেশে ইতিহাস চলবে।—এই logic-এর শেষ নেই।
এটি ন্যায়বিচার তৈরি করে না; কেবল প্রতিশোধের উত্তরাধিকার তৈরি করে। একটি নতুন রাজনৈতিক পর্বের নৈতিক শক্তি সেখানে, যেখানে সে বলে—“আগে অন্যায় হয়েছে, তাই এবার আমরা সেই অন্যায় পুনরাবৃত্তি করব না।” গণতান্ত্রিক রূপান্তর মানে শুধু ক্ষমতার হাতবদল নয়। এর অর্থ হলো Rules of The Game বদলানো।
—এটাই জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্য। সভ্য সমাজে একটি ধারণার পরাজয় ঘটানো হয় আরও শক্তিশালী ধারণা দিয়ে, দোকানের শাটার দিয়ে নয়। কারণ বই সরিয়ে দিলে যুক্তি পরাজিত হয় না। বরং অনেক সময় প্রশ্ন আরও বড় হয়—কেন বইটিকে পড়তে দেওয়া হলো না?
UPL ঘটনাটির পর দোকান খুলে কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এটি প্রতিষ্ঠানগত দৃঢ়তার একটি উদাহরণ। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে এমন ব্যবস্থা গড়তে হবে যেখানে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত সাহসের প্রয়োজনই না পড়ে।
বই বিক্রেতাকে একটি বই তাকেতে রাখতে গিয়ে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।
অধিকার যদি সত্যিকার অর্থে অধিকার হয়, তাহলে তার স্বাভাবিক ব্যবহার বীরত্বের কাজ হওয়া উচিত নয়। —আর এই জায়গাতেই institutional protection-এর গুরুত্ব।
সব বিতর্কের মধ্যে যে মানুষটি প্রায়ই হারিয়ে যান, তিনি হলেন পাঠক। কেউ একজন বইটি লিখেছেন। কেউ প্রকাশ করেছেন। কেউ বিরোধিতা করছেন। কেউ রাজনৈতিক অর্থ খুঁজছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন পাঠক বইটি হাতে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চান—তিনি বিশ্বাস করবেন, প্রশ্ন করবেন, নাকি প্রত্যাখ্যান করবেন—এই স্বাধীনতাটিই মুক্ত সমাজের কেন্দ্র।
একজন নাগরিক যদি সরকার নির্বাচন করতে পারেন, রাজনৈতিক দল বিচার করতে পারেন, মত গঠন করতে পারেন, তবে তিনি কোন বই পড়বেন সেটিও নিজে নির্ধারণ করতে পারেন। তাঁর হয়ে রাজনৈতিক দল, মব বা রাষ্ট্রকে বই নির্বাচন করে দিতে হবে কেন? পাঠককে বিশ্বাস করতে শেখাই গণতন্ত্রের একটি মৌলিক পরীক্ষা।
একটি দোকানের শাটার আবার খোলা যায়। একটি ভাঙা জানালা মেরামত করা যায়। বই নতুন করে ছাপা যায়। কিন্তু একটি সমাজ যদি ধীরে ধীরে ভয়কে স্বাভাবিক করে ফেলে, সেই ক্ষতি মেরামত করা অনেক কঠিন। যখন মানুষ নিজেই ভাবতে শেখে—
তখন তালা আর বইয়ের দোকানে থাকে না। তালা পড়ে মনের দরজায়।
একটি জাতির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ সেখানেই। কারণ ইতিহাসে বহু বই নিষিদ্ধ হয়েছে, আবার ফিরে এসেছে; বহু লেখক নির্বাসিত হয়েছেন, পরে পুনর্মূল্যায়িত হয়েছেন; বহু মত দমন করা হয়েছে, পরে নতুন প্রজন্ম আবার তা খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু যে সমাজ প্রশ্ন করার অভ্যাস হারায়, তার বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণ অনেক কঠিন।
তাই UPL-এর ঘটনাটির সবচেয়ে বড় শিক্ষা কোনো একটি বইকে ঘিরে নয়।এটি একটি নীতিকে ঘিরে। কেননা:
আর সবচেয়ে বড় কথা—ক্ষমতা বদলাবে, মত বদলাবে, ইতিহাসের ব্যাখ্যাও বদলাবে; কিন্তু প্রশ্ন করার অধিকার বদলানো চলবে না। কারণ একটি মুক্ত বাংলাদেশের প্রকৃত পরিচয় এই নয় যে সেখানে সবাই একই ইতিহাস বিশ্বাস করে। বরং এই যে—সেখানে মানুষ ভিন্ন ইতিহাস পড়তে পারে, ভিন্নভাবে ভাবতে পারে, তর্ক করতে পারে, ভুল প্রমাণ করতে পারে—তবু কারও হাতে বই কেড়ে নেওয়ার অধিকার থাকে না।
সেই বাংলাদেশেই বইয়ের দোকানের দরজা খোলা থাকবে। লাইব্রেরির তাক পূর্ণ থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন থাকবে। সংবাদপত্রে ভিন্ন মত থাকবে। আর ইতিহাস থাকবে কোনো একক ক্ষমতার দখলে নয়—মানুষের, গবেষণার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উন্মুক্ত। তাই শেষ কথাটি এতটুকুই—তালা যদি পড়েই, তা যেন কেবল দোকানের শাটারে পড়ে; কোনোদিন যেন মানুষের চিন্তার দরজায় না পড়ে।
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা, অধিকারপত্র : odhikarpatranews@gmail.com
#অসমাপ্তআত্মজীবনী #শেখমুজিবুররহমান #ইউপিএল #বাংলাবাজার #প্রকাশনারস্বাধীনতা #পাঠেরস্বাধীনতা #মতপ্রকাশেরস্বাধীনতা #ইতিহাসচর্চা #FreedomToRead #অধিকারপত্র