10/17/2026 ৪৫তম বিসিএসের গেজেটে নাম নেই মেধাবী নারীর, অসুস্থ ৯ মাসের সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তা
odhikarpatra
১৬ October ২০২৬ ২৩:৪৯
অধিকারপত্র ডটকম, বিশেষ প্রতিবেদন:
ঢাকা:সাত বছরের অধ্যবসায়, একের পর এক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার আত্মবিশ্বাস, বাবা-মায়ের ত্যাগ আর একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন—সবকিছু যেন এক মুহূর্তে অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর এক মেধাবী নারীর। ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেটে নিজের নাম না দেখে গভীর হতাশায় ভেঙে পড়েছেন তিনি। একদিকে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের স্বীকৃতি না পাওয়ার বেদনা, অন্যদিকে অসুস্থ নয় মাসের সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছেন এই নারী।
তাঁর প্রশ্ন একটাই—প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও কেন চূড়ান্ত গেজেটে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হলো না? তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা জানানো হোক। আর কোনো ভুল বা অসংগতি হয়ে থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।
অধিকার পত্র ডটকমের মাধ্যমে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে তাঁর আকুল আবেদন, তাঁর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও স্বপ্নকে যেন অবহেলায় হারিয়ে যেতে না দেওয়া হয়।
মেধার স্বাক্ষর শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে
চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পূর্ব গোমদণ্ডীর বাসিন্দা এই নারী শিক্ষাজীবনে ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফল অর্জন করেছেন বলে জানিয়েছেন।
তিনি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোমদণ্ডী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ এবং চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ অর্জন করেন। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস থেকে স্নাতক সম্মান সম্পন্ন করেন, যেখানে তাঁর সিজিপিএ ৩.৮৮। স্নাতকোত্তরে তাঁর সিজিপিএ ৩.৯৯।
শিক্ষাজীবনের এই ফলাফল তাঁর অধ্যবসায় ও পড়াশোনার প্রতি মনোযোগের পরিচয় বহন করে। এরপর বিসিএসের দীর্ঘ প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় অংশ নেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক—তিনটি ধাপেই উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের পর জানতে পারেন, সেখানে তাঁর নাম নেই।
যে নিয়োগকে ঘিরে তিনি বছরের পর বছর স্বপ্ন দেখেছেন, যে লক্ষ্যে পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়েছেন, সেই স্বপ্নের পরিণতি কী হবে—এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তিনি।
‘আমি শুধু জানতে চাই, আমাকে বাদ দেওয়ার কারণ কী’
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ওই নারী বলেন, দীর্ঘ সাত বছরের পরিশ্রম, বাবা-মায়ের ত্যাগ এবং পরিবারকে ঘিরে দেখা অসংখ্য স্বপ্নের সঙ্গে এই নিয়োগের বিষয়টি জড়িয়ে রয়েছে। সব ধাপ অতিক্রম করার পরও চূড়ান্ত গেজেটে নাম না থাকায় তিনি গভীরভাবে হতাশ ও মর্মাহত।
তাঁর বক্তব্য, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা তাঁকে জানানো হোক। তাঁকে বাদ দেওয়ার পেছনে কী কারণ রয়েছে, সেটিও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হোক।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা রয়েছে। তিনি কাউকে দোষারোপ করতে চান না, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগও তুলতে চান না। তাঁর প্রত্যাশা, পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা হবে এবং যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় কোনো ভুল বা অসংগতি থাকলে তা চিহ্নিত করা হবে।
নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ভিন্ন মতাদর্শ ধারণ করা নিজে কোনো অপরাধ নয়। তাঁর দাবি, তিনি কখনো রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না, কোনো মামলা বা হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও বহিষ্কৃত হননি। পড়াশোনায় মনোযোগী থেকে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।
তাঁর বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, জ্যেষ্ঠ ও অনুজদের কাছে তাঁর পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা তাঁর দীর্ঘদিনের আচরণ ও পথচলার সাক্ষ্য বহন করে।
এসব বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই এবং তাঁর নিয়োগে বাদ পড়ার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
অসুস্থ নয় মাসের সন্তান, নিজেও অসুস্থ
এই গল্পের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি কেবল চাকরির অনিশ্চয়তা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন মায়ের অসহায়ত্ব।
ওই নারী জানিয়েছেন, তাঁর নয় মাস বয়সী সন্তান টানা পাঁচ দিন ধরে অসুস্থ। গেজেট প্রকাশের পর তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এ কারণে সাম্প্রতিক কর্মসূচিতে সরাসরি উপস্থিত হতে পারেননি তিনি।
তাঁর ভাষ্য, সুস্থ থাকলে তিনি অবশ্যই সেখানে যেতেন। কিন্তু অসুস্থ শিশুটিকে রেখে কিংবা তাকে সামলানোর বাস্তব পরিস্থিতিতে তাঁর পক্ষে উপস্থিত হওয়া সম্ভব হয়নি।
একজন মায়ের কাছে সন্তানের অসুস্থতা এমনিতেই গভীর উদ্বেগের বিষয়। তার ওপর নিজের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন অনিশ্চিত হয়ে পড়লে সেই মানসিক চাপ কতটা কঠিন হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
তবে তাঁর এই ব্যক্তিগত দুর্ভোগের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করার পর কোনো প্রার্থী চূড়ান্ত নিয়োগ থেকে বাদ পড়লে, তাঁকে কি সেই সিদ্ধান্তের কারণ জানার সুযোগ দেওয়া হবে না?
মেধার মূল্যায়ন ও বৈষম্যহীনতার প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগ চাই
সরকারের পক্ষ থেকে মেধা, যোগ্যতা ও রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সুযোগের কথা বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মুখপাত্র মাহদী আমিনও ১৫ সেপ্টেম্বর এক আলোচনায় বলেছিলেন, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয়েও যেন মানুষ নিজের মেধার ভিত্তিতে সফল হতে পারেন এবং রাষ্ট্রের সহায়তা পান।
অন্যদিকে, ১ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিসিএসসহ সরকারি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্য করা হবে না বলে আশ্বাস দেন। যদিও ওই বক্তব্য ছিল ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের গেজেট নিয়ে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে, এর মূল বার্তা সরকারি নিয়োগে বৈষম্যহীনতার প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এদিকে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ৪ অক্টোবর গণতন্ত্র কার্যকর করতে বিরোধী দল ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের যথাযথ পরিসর দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
এসব বক্তব্যের আলোকে ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেটে বাদ পড়া প্রার্থীদের বিষয়টি স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনার দাবি আরও গুরুত্ব পায়। তবে ওই নারীকে তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তাই তাঁর ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা ও যাচাইয়ের ফল জানা জরুরি।
সরকারের কাছে অধিকার পত্র ডটকমের মাধ্যমে আকুল আবেদন
৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেটে নাম না থাকা এই নারীর আবেদন কোনো বিশেষ সুবিধা পাওয়ার জন্য নয়। তাঁর চাওয়া, তাঁকে বাদ দেওয়ার কারণ জানানো হোক, তাঁর অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেওয়া হোক এবং পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা হোক।
অধিকার পত্র ডটকমের মাধ্যমে সরকারের নীতিনির্ধারক, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর আবেদন—তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার তথ্য এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় তাঁর অবস্থান যথাযথভাবে যাচাই করা হোক। কোনো সুনির্দিষ্ট ও আইনসম্মত কারণ থাকলে তা তাঁকে জানানো হোক; আর যাচাই-বাছাইয়ে ভুল বা অসংগতি পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
একজন প্রার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা শুধু প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশার সঙ্গেও জড়িত। দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের পর বাদ পড়ার কারণ না জানা একজন প্রার্থীর জন্য গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
এই নারী হয়তো আজ অসুস্থ সন্তানকে কোলে নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু তাঁর আবেদন ব্যক্তিগত বেদনার গণ্ডি ছাড়িয়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে—রাষ্ট্রের নিয়োগব্যবস্থায় মেধা, যোগ্যতা ও ন্যায়সংগত মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি কীভাবে নিশ্চিত হবে?
তাঁর স্বপ্ন যেন অজানা কারণে থমকে না থাকে। তাঁর প্রাপ্য কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়—তিনি চান ন্যায়সংগত মূল্যায়ন, সিদ্ধান্তের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং নিজের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ।
সাত বছরের পরিশ্রমের মূল্য যেন অজানা এক সিদ্ধান্তের আড়ালে হারিয়ে না যায়। একজন মেধাবী প্রার্থীর ভবিষ্যৎ যেন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে না থাকে। সরকারের কাছে তাঁর বিনীত আবেদন—বিষয়টি মানবিকতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগত বিবেচনায় পুনর্বিবেচনা করা হোক।
**অধিকার পত্র ডটকম | বিশেষ প্রতিবেদন**
তথ্য-সম্পর্কিত নোট: এই প্রতিবেদনে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যক্তিগত পরিস্থিতি ও বক্তব্য তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর নাম, বিসিএসের সুপারিশসংক্রান্ত নথি এবং বাদ পড়ার কারণ সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
: সাত বছরের স্বপ্ন, কোলে অসুস্থ ৯ মাসের সন্তান—৪৫তম বিসিএসের গেজেটে নাম নেই মেধাবী এই নারীর!
একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫, স্নাতকে সিজিপিএ ৩.৮৮, স্নাতকোত্তরে ৩.৯৯। প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত গেজেটে নিজের নাম খুঁজে পাননি তিনি।
এখন তাঁর কোলে অসুস্থ নয় মাসের সন্তান। নিজের শরীরও ভালো নেই। সাত বছরের পরিশ্রম, বাবা-মায়ের ত্যাগ আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে তিনি শুধু একটি প্রশ্নের উত্তর চান—কেন তাঁকে বাদ দেওয়া হলো?
অধিকার পত্র ডটকমের মাধ্যমে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে তাঁর আকুল আবেদন, বাদ পড়ার কারণ স্পষ্ট করা হোক, নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি যাচাই করা হোক এবং কোনো ভুল থাকলে তা সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
মেধার মূল্যায়ন হোক, সিদ্ধান্তে থাকুক স্বচ্ছতা—একজন প্রার্থীর স্বপ্ন যেন অজানা অনিশ্চয়তায় হারিয়ে না যায়।
#৪৫তমবিসিএস #বিসিএসগেজেট #মেধারমূল্যায়ন #গেজেটবঞ্চিত #ন্যায়সংগতনিয়োগ #স্বচ্ছতাচাই #অধিকারপত্রডটকম