10/20/2026 ফ্রান্সে বিক্ষোভ-সহিংসতা: আগুনে পুড়ল ঐতিহাসিক ভবন, ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা
odhikarpatra
১৯ October ২০২৬ ২৩:৫৭
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | অধিকারপত্র ডটকম
ফ্রান্সজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং শিক্ষা ও অন্যান্য জনসেবার অবনতির প্রতিবাদে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভের পর দেশটির বিভিন্ন শহরে দোকানপাট, গাড়ি ও সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে ঐতিহাসিক ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রকাশিত ছবিভিত্তিক প্রতিবেদনে প্যারিস, মার্সেই, লিওঁ ও লিমোজ শহরে সহিংসতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ছবিতে পুড়ে যাওয়া গাড়ি, ভাঙচুর করা দোকান এবং আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ঐতিহাসিক ভবন দেখা যায়।
প্যারিসে দোকানপাটে ভাঙচুর, গাড়ি ও স্থাপনায় আগুন
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভের পর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে। দোকানের কাচ ভাঙা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট এবং গাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
প্লাস দে লা রিপাবলিক এলাকায় কিয়স্ক, যানবাহন ও ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঐতিহাসিক এই চত্বরের রিপাবলিকের ভাস্কর্যেও বিক্ষোভকারীদের উপস্থিতি ও ক্ষতিসাধনের চিত্র উঠে এসেছে। ভাস্কর্যটির গায়ে আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে পরিচিত হলুদ রঙের ভেস্ট ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
শহরের কয়েকটি এলাকায় কালো পোশাক, মুখোশ ও বালাক্লাভা পরা ব্যক্তিদের ভাঙচুর ও লুটপাটে অংশ নিতে দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ব্যবহার করে।
প্যারিসের শঁজেলিজে সড়কেও কিছু বিক্ষোভকারী ব্যারিকেড তৈরি করেন। রাজধানীর পোর্ত সাঁ-দেনি এলাকার কাছে গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। একটি বেকারিসহ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়।
মার্সেইয়ের সিটি হলে হামলা, মেঝেতে পড়ে ছিল ভাস্কর্য
ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মার্সেইয়ে বিক্ষোভকারীদের একটি দল ধাতব বেড়া ব্যবহার করে সিটি হলের প্রবেশপথে হামলা চালায়। পরে ভবনের ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর ও তছনছ করা হয়।
এ ঘটনায় ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে পরিচিত ‘মারিয়ানে’র একটি আবক্ষ ভাস্কর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
শহরটির মেয়র বেনোয়া পায়াঁ নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতার বিষয়টি উঠে আসে।
লিওঁর পর্যটন কার্যালয়ে আগুন
লিওঁ শহরে ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি ঐতিহাসিক ভবনে অবস্থিত পর্যটন কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। আগুনে ভবনটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শহরটির মেয়র গ্রেগরি দুসে ঘটনাটিকে ‘একটি ট্র্যাজেডি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ঐতিহাসিক ভবনটি পর্যটনসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হওয়ায় আগুনের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আগুনে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত লিমোজের ১৪৩ বছরের পুরোনো সিটি হল
সহিংসতার সবচেয়ে গুরুতর ঘটনাগুলোর একটি ঘটে মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ শহরে। সেখানে ১৮৮৩ সালে উদ্বোধন করা ঐতিহাসিক সিটি হলে আগুন দেওয়া হয়। অগ্নিকাণ্ডে ভবনটির ছাদ ও উপরের অংশের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং এর সুউচ্চ চূড়াটি ধসে পড়ে।
স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, আগুনে ভবনটির বড় একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে হোত-ভিয়েন বিভাগের প্রিফেক্ট মরিস বারাতে ভবনটিতে পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়ার অভিযোগ করেন।
আগুনের পর ভবনটির আগের ও পরের ছবিতে ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আগে অক্ষত থাকা ছাদ ও চূড়ার জায়গায় দেখা যায় পোড়া কাঠামো এবং ধ্বংসাবশেষ।
ঐতিহাসিক স্থাপনাটির ক্ষতি স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পাশাপাশি সহিংসতা
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং স্কুলসহ বিভিন্ন জনসেবার মানের অবনতির প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করেন। তবে কিছু গোষ্ঠীর সহিংস কর্মকাণ্ডে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
দোকানপাটে লুটপাট, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি ভবনে হামলার কারণে বিভিন্ন শহরে জননিরাপত্তা ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।
ফরাসি কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে, কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরাপত্তা বাহিনীকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে।
পদত্যাগের প্রস্তাব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর, স্থানীয় পর্যায়ে কারফিউয়ের উদ্যোগ
সহিংসতার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু স্থানীয় মেয়রদের নির্দিষ্ট এলাকায় আংশিক কারফিউ জারির সুযোগ দেওয়ার কথা জানান। সহিংসতা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ঠেকিয়ে মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
পরবর্তী শনিবার আবারও বিক্ষোভ হতে পারে—এমন আশঙ্কায় দেশটির বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে।
ফ্রান্সে চলমান এই পরিস্থিতি একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জনসেবার মান নিয়ে মানুষের অসন্তোষ তুলে ধরেছে, অন্যদিকে সহিংসতার কারণে ঐতিহাসিক স্থাপনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জনসম্পদের ব্যাপক ক্ষতির চিত্র সামনে এনেছে।
সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), ইউরোনিউজ**