11/08/2026 আল-কারাউইয়িন থেকে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়: ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী উচ্চশিক্ষার সংকট—বিশ্ববিদ্যালয় কি জ্ঞানের মুক্ত প্রজাতন্ত্র, নাকি ক্ষমতার নতুন মঞ্চ? │বিশ্ববিদ্যালয় ভাবনা | নয়টি মননসূত্রে গাঁথা একটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বীক্ষণ
Dr Mahbub
৮ November ২০২৬ ১০:০২
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম কি কেবল ডিগ্রি প্রদান ও উচ্চশিক্ষার প্রসারের জন্য, নাকি এটি মানুষের মুক্তবুদ্ধি, সত্য অনুসন্ধান, স্বাধীন চিন্তা ও ন্যায়বিচারের এক অনন্য প্রতিষ্ঠান? আসলে বিশ্ববিদ্যালয়—শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শন। ৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে মরক্কোর আল-কারাউইয়িন থেকে প্রাচীন নালন্দা, বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং আধুনিক গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই বিশ্লেষণধর্মী ফিচারে অনুসন্ধান করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত দর্শন ও দায়িত্ব। এইম নবন্ধে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থার ঐতিহাসিক বিকাশ, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে এর ভূমিকা এবং স্বাধীন বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর। বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিঘাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কাঠামো, শিক্ষক রাজনীতি, রাজনৈতিক মেরুকরণ, শিক্ষক হেনস্তা, জোরপূর্বক পদত্যাগের অভিযোগ, মব-সংস্কৃতি, একাডেমিক স্বাধীনতা ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। একই সঙ্গে আলোচিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে যোগ্যতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, যৌথ একাডেমিক শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা। মূল প্রশ্ন একটাই: রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল কি সত্যিই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি বদলাতে পারে? নাকি পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোর জায়গায় নতুন কর্তৃত্বের পুনরাবৃত্তি ঘটে? —আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যৎ, মুক্তবুদ্ধির পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের অধিকার, গবেষণার স্বাধীনতা এবং ন্যায়ভিত্তিক উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একটি ঐতিহাসিক, গবেষণাধর্মী ও সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ।
এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পক্ষে কিংবা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নগুলোকে প্রমাণভিত্তিক ও নীতিনির্ভর আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা না করে সংশ্লিষ্ট তথ্য, নথি, বক্তব্য ও যথাযথ তদন্তের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করাই এই আলোচনার নৈতিক ভিত্তি।
বিশ্ববিদ্যালয় কী—এই প্রশ্নের উত্তর কেবল কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞা দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। এর উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে তাকাতে হয় মানবসভ্যতার জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ইতিহাস, বিভিন্ন সভ্যতায় উচ্চশিক্ষার বিকাশ এবং স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর নির্মাণের অভিজ্ঞতার দিকে। আল-কারাউইয়িন, নালন্দা কিংবা বোলোনিয়ার মতো ঐতিহাসিক জ্ঞানকেন্দ্রগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় তার ভবন, শিক্ষার্থীসংখ্যা কিংবা সনদ প্রদানের ক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং সত্য অনুসন্ধান, মুক্তবুদ্ধি, যুক্তিনির্ভর বিতর্ক, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের মধ্যেই নিহিত তার মৌলিক সত্তা। বিশ্ববিদ্যালয় তাই কেবল সমাজের প্রচলিত জ্ঞান পুনরুৎপাদনের প্রতিষ্ঠান নয়, সমাজ ও সভ্যতাকে নতুনভাবে চিনতে শেখানোরও একটি স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর। এই পর্বে অনুসন্ধান করা হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক জন্ম, দার্শনিক ভিত্তি ও বিশ্বজনীন পরিচয়; পাশাপাশি বিবেচনায় আসবে বৈশ্বিক জ্ঞানব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সম্পর্ক এবং স্থানীয় বাস্তবতার শিকড়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বজনীন জ্ঞানচর্চায় যুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা।
বিশ্ববিদ্যালয়—শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক দর্শন। এটি কেবল কিছু শ্রেণিকক্ষ, পাঠ্যসূচি, পরীক্ষাগার, গ্রন্থাগার, প্রশাসনিক ভবন কিংবা ডিগ্রি প্রদানের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার নাম নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বড় একটি মানবিক ও সভ্যতাগত স্বপ্ন থেকে। সেই স্বপ্নের কেন্দ্রে ছিল জ্ঞান, সত্যের অনুসন্ধান, যুক্তিবোধ, মুক্তচিন্তা, প্রশ্ন করার অধিকার এবং মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাগত ভিত্তি বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় মানবসভ্যতার জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে। যদিও পৃথিবীর প্রথম স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে ৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে মরক্কোর ফেজে প্রতিষ্ঠিত আল-কারাউইয়িন, তবে অনেকেই বলে থাকেন পঞ্চম শতাব্দীতে বিকশিত ভারতের নালন্দা মহাবিহার, ছিল প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১০৮৮ সাল থেকে ঐতিহ্যগতভাবে চিহ্নিত ইতালির বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই ভিন্ন ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিমণ্ডলে উচ্চতর জ্ঞানচর্চার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এগুলোর কোনোটিকে সংজ্ঞাগত বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে এককভাবে 'বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়' বলা যায় না। তবে এসব ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট: উচ্চতর শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল বিদ্যমান জ্ঞান হস্তান্তর নয়, বরং জ্ঞানকে পরীক্ষা করা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা এবং মানুষের চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত করা।
বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটির উৎস লাতিন Universitas। মধ্যযুগীয় ইউরোপে Universitas magistrorum et scholarium বলতে বোঝানো হতো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি সংগঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক সম্প্রদায়। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল পরিচয় কোনো স্থাপনা বা প্রশাসনিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ ছিল না; এর প্রাণ ছিল শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের সম্মিলিত জ্ঞানচর্চা। তাঁরা কেবল পাঠদান ও পাঠগ্রহণের সম্পর্কে আবদ্ধ ছিলেন না; বরং প্রশ্ন, বিতর্ক, যুক্তি, অনুসন্ধান ও জ্ঞান সৃষ্টির একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিসর গড়ে তুলেছিলেন।
এই ঐতিহাসিক ধারণার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি মৌলিক দর্শন নিহিত রয়েছে।
এখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মৌলিক পার্থক্য। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিদ্যমান জ্ঞান শেখাতে পারে; বিশ্ববিদ্যালয়কে সেই জ্ঞান যাচাই, সম্প্রসারণ ও প্রয়োজনে সংশোধন করতে হয়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রচলিত সমাজব্যবস্থার উপযোগী মানুষ তৈরি করতে পারে; বিশ্ববিদ্যালয়কে সেই সমাজব্যবস্থার ন্যায়-অন্যায়, সীমাবদ্ধতা ও অসংগতিও বিশ্লেষণ করতে হয়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পেশাগত দক্ষতা দিতে পারে; বিশ্ববিদ্যালয়কে একই সঙ্গে নৈতিকতা, যুক্তিবোধ, স্বাধীন চিন্তা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটাতে হয়।
অতএব, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য কেবল কতজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি পেলেন, কতটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলো, কতজন শিক্ষক পদোন্নতি পেলেন কিংবা আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে প্রতিষ্ঠানটি কত ধাপ এগোল—এসব পরিসংখ্যান দিয়ে সম্পূর্ণভাবে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ সূচক, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেখানে কতটা স্বাধীনভাবে চিন্তা করা যায়, কতটা নির্ভয়ে প্রশ্ন তোলা যায়, কতটা যুক্তিনির্ভর বিতর্কের সুযোগ রয়েছে এবং ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মর্যাদা কতটা সুরক্ষিত।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন অক্ষত থাকতে পারে, প্রশাসনিক কার্যক্রম চলতে পারে, ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতে পারে, এমনকি সনদও বিতরণ হতে পারে; কিন্তু সেখানে যদি ভয়, দলীয় আনুগত্য, প্রতিহিংসা, অসহিষ্ণুতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দমন-পীড়ন প্রাধান্য পায়, তাহলে তার প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে তার মৌলিক সত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় মূলত মুক্তবুদ্ধির একটি প্রজাতন্ত্র—যেখানে পদমর্যাদার চেয়ে যুক্তির মূল্য বেশি, আনুগত্যের চেয়ে সত্যের মর্যাদা বড়, সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে প্রমাণের শক্তি গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্ষমতার চেয়ে জ্ঞানের কর্তৃত্ব শ্রেয়।—এই দর্শনের আলোকে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: বিশ্ববিদ্যালয় কি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের সম্প্রসারিত প্রশাসনিক কাঠামো, নাকি রাষ্ট্র ও সমাজকে যুক্তি, বিবেক ও জ্ঞানের আলোয় পর্যালোচনা করার একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান?
প্রশ্নটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের ক্ষেত্রে। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক গৌরবের উত্তরাধিকার কেবল স্মৃতিচারণের বিষয় নয়; সেটি প্রতিনিয়ত চর্চা, মূল্যবোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ববিদ্যালয় করে তোলে তার স্বাধীন বিবেক, প্রশ্ন করার সাহস এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা। যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষককে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়, অতীত অবস্থান কিংবা ভিন্নমতের কারণে বিচার করা হয়, শিক্ষার্থীকে যুক্তির পরিবর্তে আনুগত্যের শিক্ষা দেওয়া হয় এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা একাডেমিক স্বাধীনতার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক দর্শনই সংকটে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে তাই প্রথমে তার বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মপরিচয় ফিরে পেতে হবে। কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিবেকের বিকল্প হতে পারে না; সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে, কিন্তু সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার ও অসহিষ্ণুতার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রথমে মনের বিশ্ববিদ্যালয় হতে হয়, তারপর রাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়। তার পরিচয় ক্ষমতার আনুগত্যে নয়, সত্যের অনুসন্ধানে; তার শক্তি প্রশাসনিক কর্তৃত্বে নয়, মুক্তবুদ্ধির চর্চায়। আর তার প্রকৃত সাফল্য শুধু কতজন স্নাতক তৈরি হলো, তাতে নয়—কতজন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শিখল, তার মধ্যেই নিহিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাগত ভিত্তি বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় মানবসভ্যতার জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে। ৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে মরক্কোর ফেজ নগরে প্রতিষ্ঠিত আল-কারাউইয়িনকে সাধারণত বিশ্বের প্রাচীনতম ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, পঞ্চম শতাব্দী থেকে বিকশিত ভারতের নালন্দা মহাবিহারকে অনেক গবেষক প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়-ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করেন। আর ১০৮৮ সালকে ঐতিহ্যগতভাবে ইতালির বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল হিসেবে ধরা হয়, যা ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়-ব্যবস্থার বিকাশে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ঐতিহাসিক চরিত্র, সাংগঠনিক কাঠামো ও শিক্ষাদর্শ এক ছিল না; তাই সংজ্ঞাগত বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে কোনো একটিকে নিঃশর্তভাবে ‘বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন।
তবে এসব ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা একটি মৌলিক সত্য সামনে আনে: উচ্চশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল বিদ্যমান জ্ঞান সংরক্ষণ বা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে তা হস্তান্তর করা নয়। এর লক্ষ্য জ্ঞানকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করানো, প্রচলিত ধারণার সমালোচনামূলক পরীক্ষা করা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা এবং মানুষের চিন্তা ও অনুসন্ধানের দিগন্ত প্রসারিত করা। এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় নিছক পাঠদান, পরীক্ষা ও সনদ প্রদানের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি মুক্তবুদ্ধি, যুক্তিবাদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নির্ভীক জ্ঞানচর্চার একটি স্বতন্ত্র পরিসর।
একটি প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি তার ভবন, অবকাঠামো কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতায় নয়; বরং ভিন্নমত ধারণ করার সক্ষমতা, প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং ক্ষমতাকে যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করার পরিবেশে। এখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—উভয়েই জ্ঞানচর্চার অংশীদার; কোনো রাজনৈতিক আনুগত্য, দলীয় পরিচয় কিংবা প্রশাসনিক নির্দেশনা সত্য অনুসন্ধানের সীমা নির্ধারণ করতে পারে না। এই অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি ‘স্বাধীন প্রজাতন্ত্র’ হিসেবে কল্পনা করা যায়—যেখানে কর্তৃত্বের ভিত্তি পদমর্যাদা নয়, যুক্তি; আনুগত্যের ভিত্তি ভয় নয়, বিবেক; আর সিদ্ধান্তের বৈধতা ক্ষমতার জোর নয়, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া।
সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধা কিংবা শিক্ষকদের ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার প্রশ্নমাত্র নয়। এটি জ্ঞান উৎপাদন, সামাজিক অগ্রগতি এবং গণতান্ত্রিক বিবেকের বিকাশের পূর্বশর্ত। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্নকে অপরাধ, ভিন্নমতকে শত্রুতা এবং রাজনৈতিক পরিচয়কে বিচার-বিবেচনার প্রধান মানদণ্ডে পরিণত করা হয়, সেখানে একাডেমিক স্বাধীনতা শুধু সংকুচিত হয় না—বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাগত ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।–আর “বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঐতিহাসিক ও নীতিগত আদর্শের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতার দূরত্বই বর্তমান আলোচনার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার, ডিজিটাল যোগাযোগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক, বৈশ্বিক শ্রমবাজার এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশ উচ্চশিক্ষাকে জাতীয় সীমানার বাইরে আরও গভীরভাবে সংযুক্ত করেছে। গবেষণা এখন ক্রমশ আন্তদেশীয় সহযোগিতা, বহুবিষয়ক অনুসন্ধান, তথ্যের উন্মুক্ত প্রবাহ এবং বৈশ্বিক জ্ঞান বিনিময়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের শিক্ষাক্রম, গবেষণা কাঠামো, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্পর্ক নতুনভাবে সাজাতে হচ্ছে।
তবে বৈশ্বিক সংযোগের অর্থ স্থানীয় বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া নয়। বরং একটি শক্তিশালী বিশ্ববিদ্যালয়কে একই সঙ্গে স্থানীয় সমাজের প্রশ্ন বুঝতে এবং বৈশ্বিক জ্ঞানচর্চায় অবদান রাখতে সক্ষম হতে হয়। বাংলাদেশের নদী, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, নগরায়ণ, শ্রমবাজার, দারিদ্র্য, ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সামাজিক বৈষম্য—এসব বিষয় আন্তর্জাতিক গবেষণারও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। স্থানীয় অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক জ্ঞানভান্ডারে নিজস্ব অবদান রাখতে পারবে।
এখানে জ্ঞান আমদানি ও জ্ঞান উৎপাদনের মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম, গবেষণাপদ্ধতি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি থেকে শেখা প্রয়োজন; কিন্তু সেই শেখা যেন অনুকরণে সীমাবদ্ধ না থাকে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের ভাষা, ইতিহাস, সমাজ ও বাস্তবতার আলোকে জ্ঞানকে ব্যাখ্যা, প্রয়োগ ও নতুনভাবে নির্মাণের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। স্থানীয় জ্ঞানকে বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের বাইরে রাখা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি বৈশ্বিক জ্ঞানকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কহীনভাবে প্রয়োগ করাও কার্যকর উচ্চশিক্ষার পথ নয়। প্রয়োজন পারস্পরিক সংলাপ, সমালোচনামূলক গ্রহণ এবং সৃজনশীল রূপান্তর।
বিশ্বায়িত উচ্চশিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো একাডেমিক স্বাধীনতা। আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ তখনই অর্থবহ হয়, যখন শিক্ষক ও গবেষক স্বাধীনভাবে প্রশ্ন তুলতে, প্রচলিত ধারণা পর্যালোচনা করতে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, গবেষণার ওপর অযৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ কিংবা ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক সক্ষমতাকেও সীমিত করে। কারণ আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার জন্য কেবল অবকাঠামো, র্যাঙ্কিং বা প্রযুক্তিগত সুবিধা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মুক্ত অনুসন্ধান, গবেষণার সততা এবং স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থার ঐতিহাসিক বিবর্তন পর্যালোচনা করলে কয়েকটি ধারার ধারাবাহিকতা ও পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রাচীন বাংলার জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যে ছিল ধর্মীয়, দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক অনুসন্ধান এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগ। ঔপনিবেশিক আমলে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা উচ্চশিক্ষার নতুন কাঠামো তৈরি করলেও তা ঔপনিবেশিক প্রশাসন ও ক্ষমতার সম্পর্কের বাইরে ছিল না। পাকিস্তান পর্বে বিশ্ববিদ্যালয় আঞ্চলিক প্রবেশাধিকার, ভাষাগত মর্যাদা, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। স্বাধীন বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয় জাতীয় পুনর্গঠন, স্বায়ত্তশাসন, গবেষণা এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা। পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ ও বিশ্বায়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বকে আরও বহুমাত্রিক করেছে।
এই দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদর্শনে একটি মৌলিক সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে: বিশ্ববিদ্যালয় একই সঙ্গে স্থানীয় সমাজের প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক জ্ঞানসম্প্রদায়ের অংশ। তার শিকড় থাকবে নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতায়; কিন্তু তার দিগন্ত থাকবে সমগ্র মানবসভ্যতার জ্ঞান, অনুসন্ধান ও সৃজনশীলতার দিকে। স্থানীয় পরিচয় তাকে প্রাসঙ্গিকতা দেয়, আর বৈশ্বিক সংযোগ তাকে নতুন জ্ঞান, পদ্ধতি ও সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করে। এই দুইয়ের মধ্যে বিরোধ নয়, বরং সৃজনশীল সমন্বয়ই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সার্বজনীন চরিত্র বজায় রাখতে হলে তাকে রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব কিংবা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সংকীর্ণ স্বার্থের অধীন করা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, একাডেমিক স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এগুলো জ্ঞানচর্চার মৌলিক শর্ত। একই সঙ্গে এই স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত থাকবে নৈতিক দায়িত্ব, পেশাগত সততা, গবেষণার জবাবদিহি এবং ন্যায়সংগত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করছে তারা কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে সমকালীন জ্ঞানচর্চার প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তার ওপর। কেবল অতীতের গৌরব স্মরণ কিংবা বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন বিশ্ববিদ্যালয়, যা স্থানীয় সমাজের সমস্যা বুঝবে, বৈশ্বিক জ্ঞানকে সমালোচনামূলকভাবে গ্রহণ করবে, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবে এবং স্বাধীন চিন্তার মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজকে আত্মসমালোচনার সক্ষমতা দেবে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদর্শন কোনো একক যুগের উত্তরাধিকার নয়; এটি জ্ঞানচর্চার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, ঔপনিবেশিক বাস্তবতার অভিজ্ঞতা, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম, জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং বৈশ্বিক মানবসভ্যতার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার এক চলমান বিবর্তন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিকড় থাকবে স্থানীয় মাটিতে, তার চিন্তা হবে মুক্ত, আর তার দিগন্ত উন্মুক্ত থাকবে সমগ্র বিশ্বের জ্ঞান ও মানবিক অগ্রগতির জন্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎকর্ষ পরিমাপের প্রশ্নে বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং একটি প্রভাবশালী মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। QS, Times Higher Education (THE) কিংবা Academic Ranking of World Universities (ARWU)—প্রতিটি র্যাঙ্কিংই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, শিক্ষকতা, আন্তর্জাতিক সংযোগ, সুনাম ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার কিছু নির্দিষ্ট দিক পরিমাপের চেষ্টা করে। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠান জ্ঞান সৃষ্টি করে, নতুন চিন্তার জন্ম দেয় এবং সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে নেতৃত্ব দেয়, তার সামগ্রিক উৎকর্ষ কি কয়েকটি সংখ্যাগত সূচকে ধারণ করা সম্ভব? Mats Benner-এর বিশ্লেষণসহ বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়বিষয়ক বিভিন্ন তাত্ত্বিক আলোচনায় উঠে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুমাত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় এবং উৎকর্ষের ভিন্ন ভিন্ন পথ। এই পর্বে তাই আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও প্রকৃত একাডেমিক সক্ষমতার মধ্যকার সম্পর্ক, র্যাঙ্কিংয়ের পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা এবং সংখ্যাগত সাফল্যের আড়ালে থেকে যাওয়া জ্ঞানচর্চার গুণগত প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করা হবে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও আলোচনার মূল লক্ষ্য হবে—বিশ্বমানের হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে কেবল র্যাঙ্কিংয়ের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত একাডেমিক উৎকর্ষের সঙ্গে যুক্ত করা।
বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বিশ্বমানের’ বা World-Class University হিসেবে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা এখন বিশ্বের উচ্চশিক্ষানীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়। এশিয়া থেকে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য—বিভিন্ন দেশের সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে নিজেদের অবস্থান উন্নত করার জন্য বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। গবেষণার সংখ্যা বাড়ানো, আন্তর্জাতিক শিক্ষক নিয়োগ, বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণ, পেটেন্ট ও উদ্ভাবন বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার বিস্তার—সবই যেন বিশ্বমান অর্জনের অপরিহার্য শর্তে পরিণত হয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়: কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কি কেবল আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে উঁচু অবস্থান অর্জন করলেই বিশ্বমানের হয়ে ওঠে, নাকি বিশ্বমানের প্রকৃত পরিচয় আরও গভীর ও বহুমাত্রিক?
Mats Benner তাঁর “Becoming World Class: What It Means and What It Does” শীর্ষক গবেষণাধর্মী অধ্যায়ে এই প্রশ্নেরই সমালোচনামূলক অনুসন্ধান করেছেন। World Class Universities গ্রন্থে প্রকাশিত অধ্যায়টিতে তিনি দেখিয়েছেন, ‘বিশ্বমান’ ধারণাটি ক্রমে এমন এক পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্যকে প্রায়ই র্যাঙ্কিংয়ের অবস্থান, গবেষণাপত্রের সংখ্যা, উদ্ধৃতি, পেটেন্ট, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অন্যান্য সূচকের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা হয়। তাঁর মূল বক্তব্য হলো, এসব সূচক বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্জন পরিমাপ করতে পারলেও এগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক উৎকর্ষের সমার্থক মনে করা বিপজ্জনক। কারণ, যে বিষয়গুলো পরিমাপ করা সহজ, সেগুলোই একসময় প্রতিষ্ঠানের অগ্রাধিকারে পরিণত হয়; আর যেসব গুরুত্বপূর্ণ কাজ সহজে সংখ্যায় প্রকাশ করা যায় না, সেগুলো উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্ধারণে বহুল আলোচিত কয়েকটি ব্যবস্থা হলো Academic Ranking of World Universities (ARWU), QS World University Rankings এবং Times Higher Education (THE) World University Rankings। এসব র্যাঙ্কিং গবেষণার মান ও প্রভাব, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, আন্তর্জাতিকীকরণ, গবেষণায় উদ্ধৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম এবং অন্যান্য সূচক ব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনামূলক অবস্থান নির্ধারণের চেষ্টা করে।
কিন্তু সমস্যাটি হলো, সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, লক্ষ্য, অর্থনৈতিক সামর্থ্য, শিক্ষার্থীসমাজ, গবেষণার ক্ষেত্র কিংবা জাতীয় দায়িত্ব এক নয়। একটি গবেষণানির্ভর বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়—উভয়ের সাফল্য একই মাপকাঠিতে বিচার করলে তাদের নিজস্ব লক্ষ্য ও সামাজিক অবদান যথাযথভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে। একইভাবে, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের গবেষণা, স্থানীয় ভাষায় জ্ঞান উৎপাদন, শিক্ষাদানের উৎকর্ষ, সামাজিক ন্যায়বিচার কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ—এসব ক্ষেত্রের অবদান অনেক সময় প্রচলিত র্যাঙ্কিংয়ের সূচকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না।
Benner-এর বিশ্লেষণে র্যাঙ্কিং কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান জানানোর একটি পদ্ধতি নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক অগ্রাধিকার, অর্থ বরাদ্দ এবং শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করতে পারে। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয় একসময় শুধু ভালো কাজ করার জন্য নয়, বরং র্যাঙ্কিংয়ে ভালো দেখানোর জন্যও কাজ করতে শুরু করে। তখন পরিমাপের পদ্ধতিই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে থাকে।
Benner বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান, ইতিহাস, সম্পদ ও কৌশলগত ভূমিকার ভিত্তিতে কয়েক ধরনের প্রতিষ্ঠানের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর আলোচনায় চারটি শ্রেণি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এই শ্রেণিবিন্যাসের তাৎপর্য হলো, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে একই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় একই নিয়মে বিচার করা যুক্তিসংগত নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নির্ভর করবে তার ইতিহাস, লক্ষ্য, সম্পদ, শিক্ষার্থীসমাজ এবং সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে তার অর্জনের সামঞ্জস্যের ওপর। বিশ্বমানের ধারণা তাই একমাত্রিক নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ও দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত।
Benner-এর আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাগুলোর একটি হলো—র্যাঙ্কিংয়ের সূচককে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত কাজই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গবেষণাপত্রের সংখ্যা বাড়ানোর চাপ গবেষণার মৌলিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধানকে দুর্বল করতে পারে। বেশি উদ্ধৃতি পাওয়ার প্রতিযোগিতা গবেষণার বিষয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রকাশনার তাগিদে স্থানীয় ভাষা, স্থানীয় সমস্যা এবং জাতীয় প্রয়োজনভিত্তিক গবেষণা গুরুত্ব হারাতে পারে। একইভাবে, দ্রুত দৃশ্যমান ফল অর্জনের প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদি মৌলিক গবেষণা, মানবিক বিদ্যা এবং শিক্ষাদানের মানোন্নয়নের মতো ক্ষেত্রকে পিছনে ঠেলে দিতে পারে।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি রয়েছে—বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনাকেন্দ্রিকতা। যখন প্রতিটি বিভাগ, শিক্ষক ও গবেষকের কাজকে ক্রমাগত সংখ্যাগত সূচকের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হয়, তখন একাডেমিক স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার জায়গা সংকুচিত হতে পারে। গবেষকরা নতুন বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রশ্ন অনুসন্ধানের পরিবর্তে এমন বিষয় বেছে নিতে পারেন, যেগুলো দ্রুত প্রকাশনা, উদ্ধৃতি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি এনে দেবে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টির স্বাধীন ক্ষেত্র না থেকে কখনো কখনো লক্ষ্যপূরণ ও সূচক-ব্যবস্থাপনার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে র্যাঙ্কিং অপ্রয়োজনীয় কিংবা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়। বরং র্যাঙ্কিংকে একটি তথ্যসূত্র, আত্মমূল্যায়নের উপকরণ এবং উন্নয়নের সম্ভাব্য নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে—প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে নয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা জরুরি, কিন্তু সেই তুলনা যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সামাজিক দায়িত্ব, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও একাডেমিক স্বাধীনতাকে গ্রাস না করে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার সামনে বিশ্বমান অর্জনের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাস্তবতা বিবেচনা না করে কেবল আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংকে লক্ষ্য বানালে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। গবেষণায় অপর্যাপ্ত অর্থায়ন, গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতা, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অসংগতি, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক অস্থিরতা, দুর্বল গবেষণা-পরিবেশ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা এবং একাডেমিক স্বাধীনতার প্রশ্ন—এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া শুধু র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতির ঘোষণা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে না।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিজেদের লক্ষ্য ও দায়িত্ব স্পষ্ট করা। কোন প্রতিষ্ঠান মৌলিক গবেষণায় নেতৃত্ব দিতে চায়, কোনটি প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিশেষ অবদান রাখবে, কোনটি শিক্ষক-প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে অগ্রণী হবে, আর কোনটি স্থানীয় ও জাতীয় সমস্যার গবেষণাভিত্তিক সমাধান দেবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। সব বিশ্ববিদ্যালয়কে একই ছাঁচে ফেলার পরিবর্তে তাদের সক্ষমতা ও সামাজিক ভূমিকা অনুযায়ী উন্নয়নের পথ নির্ধারণ করতে হবে।
বিশ্বমান অর্জনের জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা, কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজন মানসম্মত শ্রেণিকক্ষ, যোগ্য ও স্বাধীন শিক্ষকসমাজ, ন্যায্য নিয়োগব্যবস্থা, শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, গবেষণার নৈতিকতা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত একাডেমিক পরিবেশ। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার ভিত্তি হতে হবে প্রকৃত একাডেমিক সক্ষমতা—শুধু প্রচারণা বা র্যাঙ্কিং-উন্নয়নের কৌশল নয়।
[দেখুন: একটি international English-language news channel The WION (World Is One News)-এ প্রকাশিত একটি ডকুমেন্টারি]
বিশেষত ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় অভিজ্ঞতা থেকে একটি মৌলিক শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন: প্রশাসনিক নেতৃত্বের পরিবর্তন, উপাচার্য নিয়োগ কিংবা নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নত হয় না। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক মান অর্জন করতে পারে না। বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে হলে প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়কে ভয়, দলীয় আনুগত্য, প্রতিশোধ ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে মুক্ত করতে হবে।
বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু এমন প্রতিষ্ঠান নয়, যার নাম QS বা THE-এর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। বরং বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে জ্ঞান উৎপাদন ও জ্ঞান বিতরণ—দুই ক্ষেত্রেই উৎকর্ষ থাকে; যেখানে শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে গবেষণা ও মতপ্রকাশ করতে পারেন; শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে, বিতর্ক করতে ও নতুন চিন্তা গড়ে তুলতে পারেন; নিয়োগ ও পদোন্নতি হয় যোগ্যতার ভিত্তিতে; গবেষণায় থাকে নৈতিকতা ও মৌলিকতা; প্রশাসন থাকে জবাবদিহিমূলক; এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন দেশের সমাজ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও মানবিক উন্নয়নে বাস্তব অবদান রাখে।
এমন বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক জ্ঞানজগতের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, কিন্তু নিজের সমাজ ও মানুষের প্রয়োজন থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না। এটি বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করবে, কিন্তু অন্ধভাবে অনুকরণ করবে না। এটি র্যাঙ্কিংকে গুরুত্ব দেবে, কিন্তু র্যাঙ্কিংয়ের জন্য নিজের একাডেমিক আত্মপরিচয় বিসর্জন দেবে না।
সুতরাং বাংলাদেশের জন্য বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো—শুধু বিশ্বের তালিকায় জায়গা করে নেওয়া নয়, বরং এমন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা, যার জ্ঞান, গবেষণা, নৈতিকতা, স্বাধীনতা ও সামাজিক অবদান আন্তর্জাতিক পরিসরে সম্মান অর্জন করে। র্যাঙ্কিং সেই যাত্রার একটি সূচক হতে পারে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মান নির্ধারণ করবে তার জ্ঞানচর্চার গভীরতা, মানবিক মূল্যবোধ, প্রাতিষ্ঠানিক সততা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা।— তাই শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কত, তা নয়; প্রশ্ন হলো—বিশ্ববিদ্যালয়টি জ্ঞান, স্বাধীনতা ও মানবিক উন্নয়নের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পেরেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। এটি একই সঙ্গে একটি জাতীয় আইনগত প্রতিষ্ঠান এবং একটি বিশ্বজনীন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র তার নিজস্ব আইন ও নীতিমালার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে, অর্থায়ন করে এবং পরিচালনার কাঠামো নির্ধারণ করে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানগত পরিচয় কোনো জাতীয় সীমানা, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার প্রকৃত পরিচয় নিহিত রয়েছে জ্ঞান উৎপাদন, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, গবেষণা, সমালোচনামূলক অনুসন্ধান এবং আন্তর্জাতিক জ্ঞানসমাজের সঙ্গে সংযোগের মধ্যে।
জন হেনরি নিউম্যানের The Idea of a University (1852) থেকে Wilhelm von Humboldt-এর গবেষণা ও শিক্ষার ঐক্যের দর্শন—বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাগত ভিত্তিতে একটি বিষয় স্পষ্ট: বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বিদ্যমান জ্ঞান বিতরণ করে না; নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করে, প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করে এবং সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যায়। UNESCO-এর ১৯৯৭ সালের উচ্চশিক্ষা শিক্ষকদের মর্যাদাবিষয়ক সুপারিশেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনকে একাডেমিক স্বাধীনতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে ১৯৯০-এর দশক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন শুরু হয়। ১৯৯২ সালের Private University Act-এর মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইনি সুযোগ তৈরি হয়। পরবর্তী তিন দশকে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। UGC-এর তথ্য অনুসারে, ১৯৯৭ সালে দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ২৭; ২০২৩ সালে তা ১৬৯-এ পৌঁছায়। উচ্চশিক্ষার এই সম্প্রসারণ নিঃসন্দেহে শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সংখ্যাগত সম্প্রসারণের সঙ্গে কি গবেষণা, একাডেমিক সক্ষমতা, শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন এবং আন্তর্জাতিক মানের সমানুপাতিক বিকাশ ঘটেছে?
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা এক বিষয় নয়। একটি আইন পাস করে, প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করে, কয়েকটি বিভাগ চালু করে এবং শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে একটি ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। কিন্তু একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, যোগ্য শিক্ষক, গবেষণাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, পর্যাপ্ত গবেষণা অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং স্বাধীন একাডেমিক পরিবেশ। এই পার্থক্য উপেক্ষা করে কেবল প্রতিষ্ঠানসংখ্যা বৃদ্ধিকে উচ্চশিক্ষার উন্নয়ন হিসেবে বিবেচনা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্যই আড়ালে থেকে যায়।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তাই একটি প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন—আমরা কি বিশ্বমানের জ্ঞানপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি, নাকি অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত পরিচয় ও ডিগ্রি প্রদানের সক্ষমতা তৈরির মধ্যেই উন্নয়নের ধারণাকে সীমাবদ্ধ রেখেছি? বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তার একাডেমিক সক্ষমতা গড়ে তোলার সমন্বয় না ঘটলে এই সম্প্রসারণকে Quantity-driven Expansion বা সংখ্যাগত সম্প্রসারণ বলা যায়। এটি সরাসরি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মান সম্পর্কে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত দেয় না; বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব সক্ষমতা পরিমাপের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে আসে।
এখানে আরেকটি মৌলিক বিষয় হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌগোলিক বিকেন্দ্রীকরণ ও একাডেমিক বিকেন্দ্রীকরণের পার্থক্য। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। কিন্তু একটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই সেখানে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, জ্ঞান উৎপাদন ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের কেন্দ্র গড়ে ওঠে না। একটি প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তাকে স্থানীয় সমাজের প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্ঞানসমাজের সঙ্গেও সংযুক্ত হতে হবে। আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া কোনো দুর্বলতা নয়; বরং আন্তর্জাতিক মানের আঞ্চলিক জ্ঞানকেন্দ্র হয়ে ওঠাই হতে পারে তার লক্ষ্য।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একাডেমিক নিয়ম, পেশাগত যোগ্যতা ও জ্ঞানভিত্তিক কর্তৃত্বের পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত প্রভাব, গোষ্ঠীগত পরিচয় এবং স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো তার পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। Pierre Bourdieu-এর একাডেমিক ক্ষেত্রের ধারণা ব্যবহার করে এই পরিস্থিতিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের সংকোচন হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়। যে প্রতিষ্ঠান একসময় মুক্তবুদ্ধি ও ভিন্নমতের চর্চার কেন্দ্র হওয়ার কথা, সেটি তখন আনুগত্য ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠার ঝুঁকিতে পড়ে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার তাৎপর্য ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও প্রশাসকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত চাপ, পদত্যাগে বাধ্য করা, একাডেমিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অভিযোগের মধ্যেও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব ঘটনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাগত সম্প্রসারণের সরাসরি ফল বলা যাবে না। বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিকীকরণ, দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা, প্রশাসনিক জবাবদিহির ঘাটতি এবং একাডেমিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে এগুলোকে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি তার প্রশাসনিক ভবন, উপাচার্যের পদ, শিক্ষার্থীসংখ্যা কিংবা ডিগ্রি প্রদানের ক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নয়। তার শক্তি হচ্ছে—এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একজন শিক্ষক তাঁর রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত পরিচয় নির্বিশেষে স্বাধীনভাবে জ্ঞানচর্চা করতে পারবেন; একজন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে পারবেন; ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারবেন; গবেষক প্রচলিত সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারবেন এবং কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।
বিশ্ববিদ্যালয় যখন এই বৈশিষ্ট্য হারায়, তখন তার ভবন ও আইনগত পরিচয় অক্ষুণ্ণ থাকলেও তার বিশ্বজনীন একাডেমিক চরিত্র সংকুচিত হতে থাকে। তখন প্রতিষ্ঠানটি কেবল ভৌগোলিক অর্থে স্থানীয় থাকে না; বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থেও স্থানীয় ক্ষমতার বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই অবস্থাকে বলা যেতে পারে Parochialisation of the University—বিশ্বজনীন জ্ঞানপ্রতিষ্ঠানের স্থানীয় ক্ষমতানির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় সংকটের গভীরে তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে: আমরা কি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়াতে চেয়েছি, নাকি বিশ্ববিদ্যালয় নামক বিশ্বজনীন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করেছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, অর্থায়ন, নিয়োগ, গবেষণা, প্রশাসন, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব—সবকিছুকে একই বিশ্লেষণী কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রের একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হতে পারে; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠা একটি দীর্ঘমেয়াদি বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন।
একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া সহজ; কিন্তু তাকে বাস্তবে গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞান উৎপাদনের উৎকর্ষকেন্দ্রে পরিণত করা দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের বিষয়। এর জন্য প্রয়োজন যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক-গবেষক, অনুসন্ধিৎসু শিক্ষার্থী, পর্যাপ্ত ও টেকসই গবেষণা অর্থায়ন, আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং একাডেমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতা। একই সঙ্গে প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব ও সুশাসন, যেখানে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে মেধা, যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য গুরুত্ব পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎকর্ষ কোনো বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের ফল নয়; এটি একটি সুসংহত উচ্চশিক্ষা পরিবেশতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্জন। এই পর্বে অনুসন্ধান করা হবে, কীভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয় তার মানবসম্পদ, গবেষণা অবকাঠামো, অর্থায়ন, নেতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের সমন্বয়ে জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করে এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার জন্য কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে কী প্রয়োজন? বিশাল ক্যাম্পাস, দৃষ্টিনন্দন ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে উচ্চ অবস্থান কিংবা বিপুল শিক্ষার্থী—এসবের কোনোটিই এককভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উৎকর্ষ নিশ্চিত করতে পারে না। বিশ্বমানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, মেধার বিকাশ, গবেষণায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ, স্বাধীন একাডেমিক পরিবেশ এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের সম্মিলিত প্রয়াসে।
বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত The Road to Academic Excellence: The Making of World-Class Research Universities (২০১১) গ্রন্থে ফিলিপ জি. অল্টবাখ ও জামিল সালমি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, গবেষণায় উৎকর্ষ অর্জনের কোনো একক বা সর্বজনীন ছক নেই। চীন, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভারত, নাইজেরিয়া, চিলি, মেক্সিকো ও রাশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উত্থান, সাফল্য, সীমাবদ্ধতা এবং পুনর্গঠনের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন: বিশ্বমানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠার পেছনে তিনটি মৌলিক শক্তির সমন্বয় অপরিহার্য—মেধার উচ্চ ঘনত্ব, পর্যাপ্ত ও টেকসই অর্থায়ন এবং অনুকূল নেতৃত্ব ও শাসনব্যবস্থা।
বিশ্বমানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ তার ভবন বা যন্ত্রপাতি নয়; তার শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থী। একটি বিশ্ববিদ্যালয় তখনই জ্ঞান উৎপাদনের আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে, যখন সেখানে এমন শিক্ষক ও গবেষকের সমাবেশ ঘটে, যাঁরা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক গবেষণায় অবদান রাখার সক্ষমতা রাখেন।
গ্রন্থটির বিভিন্ন কেস স্টাডিতে দেখা যায়, সাংহাই জিয়াওতং বিশ্ববিদ্যালয়, হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পোহাং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (POSTECH) শুরু থেকেই শিক্ষক নিয়োগে আন্তর্জাতিক মান ও মেধাকে গুরুত্ব দিয়েছে। বিদেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষিত নিজ দেশের গবেষক, প্রবাসী শিক্ষাবিদ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞদের নিয়োগের মাধ্যমে তারা দ্রুত শক্তিশালী একাডেমিক ভিত্তি তৈরি করেছে। একই সঙ্গে অভিজ্ঞ অধ্যাপকদের পাশাপাশি সম্ভাবনাময় তরুণ গবেষকদের নিয়োগ করে গবেষণা-দলের মধ্যে প্রজন্মগত ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে: শুধু প্রতিষ্ঠিত নাম বা খ্যাতিমান অধ্যাপক নিয়োগ করলেই গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয় না। প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে তরুণ গবেষকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন, নতুন ধারণা পরীক্ষা করতে পারবেন এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও গবেষণার সুযোগ যদি রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক কিংবা প্রশাসনিক পছন্দের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে মেধার ঘনত্ব তৈরি হওয়ার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠান ক্রমে প্রতিভা হারায়।
গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান শিক্ষার্থী। মেধাবী শিক্ষার্থীকে আকৃষ্ট করা, যোগ্যতার ভিত্তিতে ভর্তি নিশ্চিত করা এবং তাদের গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করা—এই তিনটি বিষয় পরস্পর সম্পর্কিত। গ্রন্থটিতে আলোচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর, সাংহাই জিয়াওতং বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভারতের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউটস অব টেকনোলজি (IIT) নিজ নিজ দেশের সেরা শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল।
তবে এখানে আরেকটি সতর্কতা জরুরি। প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি প্রক্রিয়া যেন কেবল ধনী পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ তৈরি না করে। উচ্চমানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে মেধাভিত্তিক নির্বাচন প্রয়োজন, কিন্তু আর্থিক সামর্থ্য যেন প্রতিভার বিকাশের পথে বাধা না হয়, সে জন্য বৃত্তি, আর্থিক সহায়তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় আরও স্পষ্ট হয় স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ের শিক্ষার শক্তির মাধ্যমে। গবেষণার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত গবেষক, সক্রিয় গবেষণা-দল, গবেষণাগার এবং জ্ঞান সৃষ্টির ধারাবাহিকতা। তাই স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার পাশাপাশি স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি গবেষণার সক্ষমতা তৈরি করা অপরিহার্য। তবে এর অর্থ এই নয় যে স্নাতক শিক্ষাকে অবহেলা করা যাবে। বরং গবেষণার সংস্কৃতিকে শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু বিদ্যমান জ্ঞান মুখস্থ না করে প্রশ্ন করতে, অনুসন্ধান করতে এবং প্রমাণের ভিত্তিতে চিন্তা করতে শেখে।
গবেষণা ব্যয়বহুল। মানসম্মত গবেষণাগার, আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল লাইব্রেরি, বৈজ্ঞানিক তথ্যভান্ডার, গবেষণা-সহায়ক কর্মী, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং দক্ষ শিক্ষক ধরে রাখার জন্য ধারাবাহিক অর্থায়ন প্রয়োজন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়ের হিসাব দিয়ে বিচার করা যায় না; দেখতে হয় সেই অর্থ গবেষণা, শিক্ষার মান, উদ্ভাবন ও জ্ঞান সৃষ্টিতে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
গ্রন্থটির তুলনামূলক বিশ্লেষণে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর ও POSTECH-এর মতো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা তাদের দ্রুত উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিপরীতে, অর্থের সীমাবদ্ধতা চিলির কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাশিয়ার হায়ার স্কুল অব ইকোনমিকসের গবেষক নিয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। লেখকরা দেখিয়েছেন, শুধু প্রতিষ্ঠার সময় বিপুল অর্থ বরাদ্দ করলেই হবে না; গবেষণার অর্থায়ন দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখতে হবে।
এখানে অর্থায়নের উৎসের বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি অনুদানের পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান, গবেষণা-প্রকল্প, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অনুদান এবং অন্যান্য বৈধ উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। তবে অর্থের উৎস যত বৈচিত্র্যময়ই হোক, গবেষণার বিষয়, ফলাফল ও প্রকাশনার স্বাধীনতা যেন কোনো দাতা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে না যায়।
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান। গবেষণার প্রস্তাব, পদ্ধতি, সম্ভাব্য অবদান ও মান যাচাই করে স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে অনুদান বণ্টন করা হলে গবেষকরা যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ পান। বিপরীতে, আমলাতান্ত্রিক সমতা রক্ষার নামে সবাইকে সমান অর্থ দিয়ে দিলে উৎকর্ষের জন্য প্রয়োজনীয় বড় ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ গবেষণায় বিনিয়োগ মানে শুধু নতুন ভবন নির্মাণ বা যন্ত্রপাতি কেনা নয়; বরং এমন একটি আর্থিক কাঠামো তৈরি করা, যা গবেষককে কাজের স্বাধীনতা, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দেয়।
বিশ্বমানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তৃতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কার্যকর নেতৃত্ব ও অনুকূল শাসনব্যবস্থা। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য, গবেষণার অগ্রাধিকার, শিক্ষক নিয়োগ, অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং একাডেমিক কর্মসূচি নির্ধারণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। কিন্তু সেই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়ন করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের যথেষ্ট স্বাধীনতা দিতে হবে।
গ্রন্থটির কেস স্টাডিগুলো দেখায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন শুধু একটি সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক শব্দ নয়; এটি গবেষণার সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, বেতন ও গবেষণা-সুবিধা নির্ধারণ, অর্থ সংগ্রহ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সরকারি বা আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
ভারতের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউটস অব টেকনোলজি তুলনামূলকভাবে বিশেষ প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা ভোগ করেছে। গ্রন্থটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অন্যান্য সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো একই ধরনের কঠোর প্রশাসনিক বিধিনিষেধের অধীন হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও সক্ষমতা এতটা বিকশিত হতো কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। একইভাবে, হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির দ্রুত উত্থানের পেছনে সুস্পষ্ট লক্ষ্য, শক্তিশালী নেতৃত্ব, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ এবং সহায়ক শাসন কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে, মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালায়া ও সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের তুলনা দেখায়, একই ঐতিহাসিক শিকড় থেকে যাত্রা শুরু করেও নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা, নীতিগত সিদ্ধান্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের পার্থক্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতির পথ ভিন্ন হতে পারে।
তবে স্বায়ত্তশাসন মানে জবাবদিহিহীনতা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়কে একদিকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকতে হবে, অন্যদিকে তার অর্থব্যবস্থা, নিয়োগ, গবেষণার নৈতিকতা, শিক্ষার মান এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে। স্বাধীনতা ও জবাবদিহি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ নেই, সেখানে মৌলিক গবেষণা বাধাগ্রস্ত হয়; আর যেখানে জবাবদিহি নেই, সেখানে স্বায়ত্তশাসন ব্যক্তিস্বার্থ বা গোষ্ঠীগত ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
একটি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় রাতারাতি বিশ্বমানের হয়ে ওঠে না। গ্রন্থটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একাডেমিক উৎকর্ষ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাণপ্রক্রিয়া। পাঁচ বছর বা দশ বছরের রাজনৈতিক মেয়াদে র্যাঙ্কিংয়ে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা সহজ; কিন্তু গবেষণার সংস্কৃতি, দক্ষ শিক্ষকসমাজ, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ভারতের IIT এবং হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অভিজ্ঞতা দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা এবং নিয়মিত বিনিয়োগের সমন্বয় ছাড়া টেকসই অগ্রগতি সম্ভব নয়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে শুরু থেকেই উপযোগী প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা কখনো কখনো পুরোনো প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার চেয়ে সহজ হতে পারে। কিন্তু পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে সংস্কার করে উৎকর্ষের পথে এগিয়ে নেওয়াও সম্ভব—যদি নেতৃত্ব, নীতি, অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা যায়।
এই অভিজ্ঞতা আরও একটি বিষয় সামনে আনে: সব বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য একই হওয়া উচিত নয়। কোনো প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশেষায়িত হতে পারে, কোনোটি সামাজিক বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে, আবার কোনোটি বিস্তৃত জ্ঞানচর্চা ও জাতীয় উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা জরুরি, কিন্তু নিজস্ব শক্তি, জাতীয় প্রয়োজন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বিবেচনা না করে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল অনুকরণ করলে প্রত্যাশিত ফল নাও আসতে পারে।
জামিল সালমির বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ হলো—একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য শুধু তার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে না; বৃহত্তর জাতীয় পরিবেশও তার অগ্রগতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি এই বহিরাগত উপাদানগুলোর সমষ্টিকে বলেছেন Tertiary Education Ecosystem বা উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক পরিবেশতন্ত্র।
এই পরিবেশের মধ্যে রয়েছে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, মৌলিক স্বাধীনতার সুরক্ষা, উচ্চশিক্ষা বিষয়ে জাতীয় নেতৃত্বের সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহির কাঠামো, গবেষণা ও শিক্ষার মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা, অর্থায়ন ও প্রণোদনা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার মধ্যে সংযোগ এবং ডিজিটাল ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো।
এই উপাদানগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনের শাসনের দুর্বলতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা, শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণার স্বাধীনতা এবং অর্থায়নকে প্রভাবিত করতে পারে। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের অনিশ্চয়তা আধুনিক গবেষণা, আন্তর্জাতিক জার্নাল ব্যবহার এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। আবার উচ্চশিক্ষা বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সমন্বিত পরিবেশ তৈরি হয় না।
হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতায় সহায়ক জাতীয় পরিবেশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার মধ্যে তুলনামূলক সামঞ্জস্য দেখা যায়। বিপরীতে, নাইজেরিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ইবাদানের অভিজ্ঞতা দেখায়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট ও গবেষকদের দেশত্যাগ একটি প্রতিষ্ঠানের অর্জিত সক্ষমতাকেও দুর্বল করে দিতে পারে।
এখানে একাডেমিক স্বাধীনতার প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণার পাশাপাশি ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও মানবিক বিদ্যার গবেষণাও স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে হবে। রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল প্রশ্ন তোলা, প্রচলিত নীতি বিশ্লেষণ করা কিংবা রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষমতাকাঠামো নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ না থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। গবেষণার উৎকর্ষের জন্য শুধু অর্থ ও যন্ত্রপাতি নয়, প্রশ্ন করার স্বাধীনতাও অপরিহার্য।
এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাগুলো বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থার সামনে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি মেধাবী শিক্ষক ও গবেষককে আকৃষ্ট করতে পারছে? শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি কি স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও যোগ্যতাভিত্তিক? গবেষণার জন্য কি পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক অর্থায়ন রয়েছে? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে একাডেমিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে? পিএইচডি ও স্নাতকোত্তর গবেষণার জন্য কি পর্যাপ্ত সুযোগ, গবেষণাগার, তথ্যভান্ডার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা রয়েছে?
The Road to Academic Excellence–এর ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো—একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে উৎকর্ষের পথে নিতে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর প্রয়োজন। মেধাবী শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, পর্যাপ্ত ও টেকসই অর্থায়ন, দূরদর্শী নেতৃত্ব, স্বায়ত্তশাসন, জবাবদিহি এবং সহায়ক জাতীয় পরিবেশ—এই উপাদানগুলো একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
বিশ্বমানের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার অর্থ কেবল আন্তর্জাতিক তালিকায় জায়গা করে নেওয়া নয়। এর অর্থ এমন একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠা, যেখানে শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে পারেন, শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে শেখে, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি হয়, গবেষণার ফল সমাজের কাজে লাগে এবং প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জ্ঞানজগতের সঙ্গে অর্থবহ সম্পর্ক গড়ে তোলে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু—কোন বিশ্ববিদ্যালয় কত নম্বরে উঠবে, তা নয়। আরও মৌলিক প্রশ্ন হলো: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারছে, যেখানে মেধা বিকশিত হবে, গবেষণা স্বাধীন থাকবে, নেতৃত্ব জবাবদিহিমূলক হবে এবং জ্ঞানচর্চা রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে?
কারণ বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় কোনো ঘোষণায় তৈরি হয় না; তৈরি হয় মেধার প্রতি সম্মান, গবেষণায় বিনিয়োগ, স্বাধীনতার সুরক্ষা এবং উৎকর্ষের প্রতি কয়েক দশকের অবিচল অঙ্গীকারে।
বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত আমাদের ফিরিয়ে আনে একাডেমিক স্বাধীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহির প্রশ্নে। কারণ মেধা, অর্থায়ন ও নেতৃত্বের সম্ভাবনা তখনই দীর্ঘস্থায়ী উৎকর্ষে রূপ নেয়, যখন শিক্ষক-গবেষকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন এবং প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর থাকে। এই ভিত্তিগুলোর বিশদ আইনগত ও নীতিগত তাৎপর্যই পরবর্তী অধ্যায়ের আলোচ্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা কেবল একটি দার্শনিক আকাঙ্ক্ষা নয়; এটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অধিকার, জ্ঞানচর্চার পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি মৌলিক প্রশ্ন। একাডেমিক স্বাধীনতা শিক্ষককে প্রচলিত মতের বাইরে গিয়ে চিন্তা, গবেষণা, প্রশ্ন ও সমালোচনার সুযোগ দেয়; অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করে সেই স্বাধীনতার দায়িত্বশীল প্রয়োগ। কিন্তু কোনো অভিযোগ উঠলেই যদি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধের বিকল্প প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতা উভয়ই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের সংবিধানে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, Natural Justice বা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর স্বায়ত্তশাসন-সংক্রান্ত বিধান এই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই পর্বে বিশ্লেষণ করা হবে একাডেমিক স্বাধীনতার প্রকৃত পরিসর, অভিযোগ নিষ্পত্তির ন্যায্য প্রক্রিয়া, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আপিলের অধিকার এবং স্বাধীনতা ও জবাবদিহির পারস্পরিক সম্পর্ক। কারণ রাজনৈতিক মতাদর্শ যা-ই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকার সুরক্ষার মানদণ্ড হওয়া উচিত আইন, প্রমাণ ও ন্যায়বিচার—পরিচয় বা ক্ষমতার অবস্থান নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট কেবল তখনই শুরু হয় না, যখন কোনো শিক্ষক রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে আক্রান্ত হন কিংবা কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বিতর্কের জন্ম দেয়। সংকট আরও গভীর হয় তখন, যখন বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব ন্যায়বিচারের মানদণ্ড, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব শুধু আইন, বিধি ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়; এর নৈতিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে এমন কিছু মৌলিক নীতির ওপর, যেগুলো ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত হওয়ার কথা নয়।
এই নীতিগুলোর মধ্যে একাডেমিক স্বাধীনতা, প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কতটা স্বাধীন, কতটা ন্যায়সংগত এবং কতটা গণতান্ত্রিক—তা বোঝার অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হলো রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে তার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত।
Academic Freedom বা একাডেমিক স্বাধীনতা আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় দর্শনের অন্যতম মৌলিক ধারণা। এর অর্থ শুধু একজন শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের স্বাধীনতা নয়। বরং এর পরিসর আরও বিস্তৃত। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের স্বাধীনতা রয়েছে প্রচলিত জ্ঞানকে প্রশ্ন করার, গবেষণার বিষয় ও পদ্ধতি নির্বাচনের, গবেষণার ফলাফল প্রকাশের, প্রচলিত রাজনৈতিক ও সামাজিক ধারণার সমালোচনা করার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে যুক্তিনির্ভর মতামত প্রকাশের।
একাডেমিক স্বাধীনতা মূলত এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করে, যেখানে জ্ঞান কোনো পূর্বনির্ধারিত মতাদর্শের অধীন থাকবে না। একজন শিক্ষক তাঁর গবেষণায় সরকারের কোনো নীতির সমালোচনা করতে পারেন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের অবস্থানকে প্রশ্ন করতে পারেন, কিংবা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রচলিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধেও প্রমাণনির্ভর সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করতে পারেন।—এখানে তাঁর প্রধান দায়বদ্ধতা কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের প্রতি নয়; বরং জ্ঞানের সততা, গবেষণার নৈতিকতা, প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং একাডেমিক দায়িত্বশীলতার প্রতি।
১৯৯৭ সালের ১১ নভেম্বর ইউনেসকোর সাধারণ সম্মেলনে গৃহীত Recommendation concerning the Status of Higher-Education Teaching Personnel উচ্চশিক্ষার শিক্ষক-কর্মীদের অধিকার ও মর্যাদা বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করে। এতে একাডেমিক স্বাধীনতাকে উচ্চশিক্ষার অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সুপারিশটির ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে পাঠদান, আলোচনা, গবেষণা, গবেষণার ফলাফল প্রকাশ, নিজ প্রতিষ্ঠানের নীতিব্যবস্থা সম্পর্কে মতপ্রকাশ এবং পেশাগত প্রতিনিধিত্বমূলক সংগঠনে অংশগ্রহণের স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের নির্ধারিত বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োজিত নন। তাঁর দায়িত্ব জ্ঞানকে পরীক্ষা করা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা এবং সমাজের প্রচলিত ধারণার বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যায়ন করা। তবে একাডেমিক স্বাধীনতার অর্থ সীমাহীন দায়মুক্তি নয়। গবেষণায় তথ্য জালিয়াতি, শিক্ষার্থীর প্রতি বৈষম্য, হয়রানি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা পেশাগত অসদাচরণ একাডেমিক স্বাধীনতার আড়ালে বৈধতা পেতে পারে না। স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতা, সততা ও অন্যের সমান স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাও যুক্ত।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক একই সঙ্গে একজন গবেষক, শিক্ষক এবং নাগরিক। নাগরিক হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস, মতপ্রকাশ, সংগঠন ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষক হিসেবে তাঁর রয়েছে গবেষণা, পাঠদান ও একাডেমিক আলোচনার বিশেষ স্বাধীনতা।
এই দুটি অধিকার পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও এক নয়।
একজন শিক্ষক কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক হতে পারেন। তিনি সরকারের নীতির পক্ষে কিংবা বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারেন। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে অন্য শিক্ষক একমত না-ও হতে পারেন। কিন্তু সেই মতপার্থক্য তাঁর একাডেমিক যোগ্যতা, পেশাগত মর্যাদা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার অধিকারের স্বয়ংক্রিয় মূল্যায়ন হতে পারে না।
বাংলাদেশের সংবিধানও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্রদান করে। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং আইনসাপেক্ষে বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ৩৮ অনুচ্ছেদে সংগঠন করার অধিকার, ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় ও আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ২৯ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগের ক্ষেত্রে সুযোগের সমতার কথাও বলা হয়েছে। তবে এসব অধিকারকে তাদের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা ও প্রযোজ্য আইনসহ বুঝতে হবে। বিশেষ করে ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আইননির্ধারিত কিছু যুক্তিসংগত বিধিনিষেধের সুযোগ রয়েছে।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো, কোনো শিক্ষক তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস বা শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের কারণে পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কি না। যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অসদাচরণ বা অপরাধের অভিযোগ থাকে, তাহলে তার বিচার হওয়া উচিত প্রমাণ ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধের বিকল্প প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে অসংগত।
Natural Justice বা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার প্রশাসনিক ও বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি মৌলিক নীতিগত ভিত্তি। এর মূল কথা হলো, কোনো ব্যক্তির অধিকার, মর্যাদা বা স্বার্থের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে—এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁকে ন্যায্য প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের দুটি বহুল স্বীকৃত মৌলিক নীতি রয়েছে।
এই দুটি নীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ধরা যাক, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন, তাঁদের হুমকি দিয়েছেন কিংবা কোনো ধরনের সহিংসতায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযোজ্য বিধি অনুসরণ করে সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নিতে পারে। কিন্তু অভিযোগ উত্থাপন, তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং চূড়ান্ত শাস্তি—এই প্রতিটি পর্যায়ের মধ্যে প্রক্রিয়াগত পার্থক্য বজায় রাখতে হবে।
একটি গ্রহণযোগ্য তদন্তপ্রক্রিয়ায় অন্তত কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন:
এসব শর্ত শুধু অভিযুক্ত শিক্ষকের অধিকার রক্ষা করে না; অভিযোগকারী, শিক্ষার্থী এবং সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের আস্থাও বাড়ায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন ও প্রশাসনিক কাঠামো বোঝার জন্য The Dhaka University Order, 1973 একটি মৌলিক আইনগত দলিল। রাষ্ট্রপতির ১১ নম্বর আদেশ হিসেবে ১৯৭৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জারি করা এই আদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য, ক্ষমতা, কর্তৃপক্ষ ও পরিচালন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। আদেশের প্রস্তাবনায় শিক্ষাদান, গবেষণা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নয়নের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এই আদেশের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতার মধ্যে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষা প্রদান, গবেষণার ব্যবস্থা, জ্ঞানের অগ্রগতি ও বিস্তার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার কথা বলা হয়েছে।
আদেশের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে একাডেমিক কাউন্সিলকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষা, পাঠদান, পরীক্ষা এবং একাডেমিক মান বজায় রাখার বিষয়ে এই কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব রয়েছে। অন্যদিকে সিনেট, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল, অনুষদ ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।
এই কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সিদ্ধান্ত একক ব্যক্তির ইচ্ছা বা প্রশাসনিক নির্দেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কথা নয়। বরং আইন ও বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মধ্যে দায়িত্ব ও ক্ষমতা বণ্টনের ব্যবস্থা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রধান নির্বাহী ও একাডেমিক কর্মকর্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তাঁর ক্ষমতাও ১৯৭৩ সালের আদেশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধি ও অধ্যাদেশের অধীন। একইভাবে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও নির্ধারিত আইনগত কাঠামোর মধ্যে প্রয়োগ করতে হয়। অতএব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনকে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের সীমাহীন ক্ষমতা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। স্বায়ত্তশাসনের প্রকৃত অর্থ হলো—আইনসম্মত ও অংশগ্রহণমূলক কাঠামোর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একাডেমিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়: ১৯৭৩ সালের আদেশে একাডেমিক স্বাধীনতা শব্দটি সরাসরি প্রতিটি ক্ষেত্রে সংজ্ঞায়িত না হলেও গবেষণা, জ্ঞানের অগ্রগতি, একাডেমিক কর্তৃপক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন একাডেমিক চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি।
Institutional Neutrality বা প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন একটি নীতিগত অবস্থান বোঝায়, যেখানে প্রতিষ্ঠানটি কোনো রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা মতাদর্শের স্বার্থরক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে না।—এর অর্থ এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নে নীরব থাকবে। বরং বিশ্ববিদ্যালয় মানবাধিকার, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, বৈষম্য, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের প্রশ্নে সুস্পষ্ট নৈতিক অবস্থান নিতে পারে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে আনুগত্য প্রতিষ্ঠা কিংবা বিরোধী মতাদর্শের ব্যক্তিদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্জন করা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নয়।
একটি নিরপেক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় একই নীতিতে সব শিক্ষককে মূল্যায়ন করবে। কোনো শিক্ষক যদি রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক হন, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও একইভাবে তদন্ত করতে হবে। আবার বিরোধী দলের সমর্থক কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
এখানে নিরপেক্ষতা মানে সব পক্ষকে একই ফল দেওয়া নয়; বরং সবার ক্ষেত্রে একই ন্যায়সংগত নিয়ম প্রয়োগ করা। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নিরপেক্ষতা কখনো অন্যায়ের প্রতি উদাসীনতা নয়। বরং অন্যায় যে পক্ষই করুক, তার বিরুদ্ধে প্রমাণ ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতাই প্রকৃত নিরপেক্ষতা।
১৯৯৭ সালের UNESCO Recommendation উচ্চশিক্ষার শিক্ষক-কর্মীদের পেশাগত মর্যাদা, অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নির্দেশনামূলক কাঠামো তৈরি করেছে।—এই সুপারিশের ১৭ থেকে ২০ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনকে একাডেমিক স্বাধীনতার কার্যকর পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের স্বায়ত্তশাসনের বিরুদ্ধে আসা হুমকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো একাডেমিক সম্প্রদায়ের সদস্যকে যথাযথ ও পর্যাপ্ত কারণ এবং নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের শুনানি ছাড়া শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার অধীন করা উচিত নয়। ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদে শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে ন্যায্য সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদে বরখাস্তের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্বাধীন বাহ্যিক কর্তৃপক্ষের কাছে আপিলের সুযোগের কথা উল্লেখ রয়েছে।
তবে এখানে আইনগত অবস্থানটি পরিষ্কার করা প্রয়োজন: UNESCO-এর এই সুপারিশ কোনো আন্তর্জাতিক বাধ্যতামূলক চুক্তি নয়। এটি একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও নীতিনির্দেশনা। ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর মূল্যায়ন করতে হবে সংবিধান, প্রচলিত আইন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিধিবিধান এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। তবু এর গুরুত্ব কম নয়। কারণ এটি দেখায়, আধুনিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষককে শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক সুবিধা বা রাজনৈতিক প্রয়োজনের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে একাডেমিক স্বাধীনতা, পেশাগত নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা রক্ষা করা প্রশাসনের দায়িত্ব। কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা করলে, পেশাগত অসদাচরণ করলে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি লঙ্ঘন করলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার প্রযোজ্য বিধিবিধানের অধীনে থাকতে পারে। কিন্তু প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কয়েকটি স্তর পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
এই পার্থক্যগুলো উপেক্ষা করলে তদন্তাধীন ব্যক্তিকে আগেই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার তদন্তের নামে অনির্দিষ্টকাল কাউকে পেশাগত দায়িত্ব থেকে দূরে রাখাও ন্যায়সংগত প্রশাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এখানে আরও একটি বিষয় বিবেচ্য: কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ একই ধরনের বিষয় নয়। এগুলোর তদন্তের কর্তৃপক্ষ, প্রযোজ্য আইন ও সিদ্ধান্তের পরিণতি পৃথক হতে পারে। একটি প্রক্রিয়ার ফলাফল অন্যটির বিকল্প নয়।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বুঝতে হলে তাদের বর্তমান কাঠামো ও সংকটের পাশাপাশি ফিরে দেখতে হবে এই ভূখণ্ডে আধুনিক উচ্চশিক্ষার ঐতিহাসিক বিকাশ। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রশাসনিক ও শিক্ষানীতিগত উত্তরাধিকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শন, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত জাতীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা—সবকিছু মিলেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক পরিচয়। স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশ উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ালেও একই সঙ্গে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে শিক্ষা, গবেষণা, অর্থায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা নিয়ে। এই পর্বে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক যাত্রাপথ পর্যালোচনার মাধ্যমে অনুসন্ধান করা হবে—কোন আদর্শ, রাজনৈতিক বাস্তবতা ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে এবং ঐতিহাসিক গৌরবের উত্তরাধিকার বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর কী ধরনের দায়িত্ব অর্পণ করে।
বিশ্ববিদ্যালয় কোনো নির্দিষ্ট সময়ের প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটানোর প্রতিষ্ঠানমাত্র নয়; এর জন্ম ও বিকাশের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি সমাজের জ্ঞানতাত্ত্বিক আকাঙ্ক্ষা, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক চেতনা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থার ইতিহাসও তেমনই একটি দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস। প্রাচীন বাংলার জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য থেকে ঔপনিবেশিক আমলে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা, পাকিস্তান পর্বে উচ্চশিক্ষার আঞ্চলিক বিস্তার ও রাজনৈতিক অধিকারবোধের বিকাশ, স্বাধীন বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ এবং বর্তমান বিশ্বায়িত জ্ঞানব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ—প্রতিটি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা নতুন বাস্তবতা ও প্রত্যাশার মুখোমুখি হয়েছে।
এই বিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয় কাদের জন্য, কী উদ্দেশ্যে এবং কোন জ্ঞানদর্শনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে? বিশ্ববিদ্যালয় কি কেবল রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করবে, নাকি মানুষের চিন্তা, অনুসন্ধান, সৃজনশীলতা ও স্বাধীন বিচারবোধ বিকাশেরও স্বাধীন পরিসর হয়ে উঠবে? স্থানীয় সমাজের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগ বজায় রেখেও কীভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক জ্ঞানচর্চার অংশ হতে পারে? বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্মদর্শন ও ঐতিহাসিক বিবর্তন অনুধাবনের জন্য এই প্রশ্নগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বহু শতাব্দী আগে থেকেই জ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় ও দার্শনিক অনুশীলন, ভাষা-সাহিত্য, চিকিৎসা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা এবং বিভিন্ন কারুশিল্পভিত্তিক শিক্ষার ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলায় বৌদ্ধ বিহার, মঠ, টোল, মাদ্রাসা এবং অন্যান্য শিক্ষাকেন্দ্র জ্ঞান সংরক্ষণ ও বিস্তারে ভূমিকা পালন করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো বা ধারণার সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা ঐতিহাসিকভাবে যথাযথ হবে না। তবে এগুলো এ অঞ্চলে প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানচর্চা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, পাণ্ডিত্যচর্চা এবং বৃহত্তর বৌদ্ধিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভিত্তি নির্মাণ করেছিল।
এ প্রসঙ্গে নওগাঁর পাহাড়পুরে অবস্থিত সোমপুর মহাবিহারের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাল শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত এই মহাবিহার অষ্টম শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্ম, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। এর প্রভাব শুধু বাংলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের বৌদ্ধ স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ইতিহাসেও এর প্রভাবের স্বীকৃতি রয়েছে। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবিষয়ক বিবরণেও সোমপুর মহাবিহারকে প্রাচীন বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বাংলার জ্ঞানচর্চা কখনোই কেবল স্থানীয় সীমানায় আবদ্ধ ছিল না। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ, পাণ্ডিত্য বিনিময় এবং জ্ঞান বিস্তারের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চল বৃহত্তর এশীয় বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্রগুলোর জ্ঞানদর্শন, সামাজিক প্রবেশাধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা থেকে ভিন্ন ছিল। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি স্বাধীন অনুসন্ধান, বহুমাত্রিক গবেষণা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন এবং বিভিন্ন মত ও পদ্ধতির সহাবস্থান। ফলে প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ককে সরল ধারাবাহিকতা হিসেবে নয়, বরং জ্ঞানচর্চার দীর্ঘ ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ও নতুন প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের সম্পর্ক হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বর্তমান ভূখণ্ডে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থার বিকাশ ঔপনিবেশিক শাসনের বৃহত্তর শিক্ষানীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্রিটিশ শাসনামলে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তার একদিকে নতুন জ্ঞান, বিজ্ঞান, আইন, প্রশাসন ও সাহিত্যচর্চার সুযোগ তৈরি করে; অন্যদিকে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের জন্য শিক্ষিত জনবল তৈরি এবং শাসনব্যবস্থার প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যও বহন করে। ফলে আধুনিক উচ্চশিক্ষার সূচনালগ্ন থেকেই জ্ঞানচর্চা ও ক্ষমতার সম্পর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বাস্তবতা হিসেবে উপস্থিত ছিল।
১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের কলেজগুলো তার অধিভুক্তির মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে শুরু করে। বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে তখনো কোনো স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ঢাকা কলেজ, রাজশাহী কলেজসহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও পরীক্ষাভিত্তিক সনদ প্রদানের কার্যক্রম পরিচালনা করত। ফলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক প্রশাসন, পাঠ্যক্রম ও সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কলকাতাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হতো।
এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বাংলার শিক্ষিত সমাজে আধুনিক জ্ঞান, পেশাগত দক্ষতা এবং নতুন সামাজিক পরিচয়ের বিকাশ ঘটলেও উচ্চশিক্ষায় আঞ্চলিক বৈষম্য ও প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পূর্ববঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক ও পেশাগত ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ এবং নিজস্ব অঞ্চলে উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দাবি জোরালো হতে থাকে। অর্থাৎ আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা কেবল নতুন ডিগ্রি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অর্জনের আকাঙ্ক্ষা থেকে তৈরি হয়নি; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল আঞ্চলিক মর্যাদা, সামাজিক গতিশীলতা এবং জ্ঞানচর্চায় অধিকতর অংশগ্রহণের প্রশ্ন।
এই ঐতিহাসিক বাস্তবতার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ১৯১২ সালে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ, নাথান কমিটির পরিকল্পনা, ১৯১৭ সালের স্যাডলার কমিশনের পর্যালোচনা এবং ১৯২০ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়নের ধারাবাহিকতায় ১৯২১ সালের ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনটি অনুষদ, বারোটি বিভাগ, ষাটজন শিক্ষক, ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী এবং তিনটি আবাসিক হল নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মকে কেবল ঔপনিবেশিক প্রশাসনের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এর প্রতিষ্ঠার সঙ্গে পূর্ববঙ্গের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, শিক্ষিত সমাজের বিকাশ এবং একটি অঞ্চলের বুদ্ধিবৃত্তিক আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক ছিল। একই সঙ্গে এর পাঠ্যক্রম, প্রশাসনিক কাঠামো ও শিক্ষার ভাষায় ঔপনিবেশিক উচ্চশিক্ষার প্রভাবও বিদ্যমান ছিল। ফলে প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দুটি পরস্পরসম্পর্কিত দায়িত্ব উপস্থিত হয়—একদিকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক জ্ঞানচর্চায় অংশগ্রহণ, অন্যদিকে স্থানীয় সমাজের প্রয়োজন, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে উচ্চশিক্ষার সংযোগ প্রতিষ্ঠা।
১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে পরিণত হয়। রাজনৈতিক রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন ঘটলেও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্য, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং কেন্দ্রনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রশ্নগুলো বহাল থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য সেখানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সহজলভ্য ছিল না। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন অঞ্চলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ক্রমশ গুরুত্ব পায়।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ছিল উচ্চশিক্ষার ভৌগোলিক বিস্তারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি এবং ঢাকাকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজন থেকেই এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গড়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে কৃষি, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, বিজ্ঞান এবং অন্যান্য বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনেও নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ১৯৬১ সালে কৃষি ও প্রকৌশল শিক্ষার জন্য পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা এ বিস্তারের ধারাকে আরও সম্প্রসারিত করে।
এই পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণায় একটি নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। উচ্চশিক্ষা আর কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক সাধারণ শিক্ষার বিষয় থাকেনি; কৃষি, প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রয়োজনও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম বিবেচ্য হয়ে ওঠে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়কে ক্রমশ জাতীয় উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা শুরু হয়। তবে এই সম্প্রসারণের মধ্যেও শিক্ষার ভাষা, সাংস্কৃতিক পরিচয়, রাজনৈতিক অধিকার এবং আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রশ্ন উচ্চশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে থাকে।
পাকিস্তান পর্বে ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, শিক্ষানীতিবিরোধী আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় তখন কেবল পেশাগত যোগ্যতা অর্জনের প্রতিষ্ঠান ছিল না; রাষ্ট্রের ভাষানীতি, সাংস্কৃতিক আধিপত্য, রাজনৈতিক বৈষম্য এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে যুক্তি ও প্রতিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর হয়ে ওঠে।
এই অভিজ্ঞতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদর্শনে একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়। জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা ও উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি ভাষাগত মর্যাদা, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ভূমিকার অংশ হয়ে ওঠে। এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্রমশ স্থানীয় সমাজের আত্মপরিচয় ও বৃহত্তর রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থার সামনে নতুন রাষ্ট্র ও সমাজ নির্মাণের দায়িত্ব উপস্থিত হয়। পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের উন্নয়ন-প্রত্যাশা উচ্চশিক্ষার নতুন দর্শন নির্ধারণে প্রভাব ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব তখন কেবল বিদ্যমান জ্ঞান বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকেনি; জাতীয় পুনর্গঠন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ, সামাজিক ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত হয়।
স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইনগত ও প্রশাসনিক কাঠামো নতুন রাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৭২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় আইনসমূহের অভিযোজনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী শাসনামলের আইনগুলো বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামো ও একাডেমিক কর্তৃপক্ষের ভূমিকা পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে ১৯৭৩ সালের একই আইন বা আদেশ দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রযোজ্য ছিল না; বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে পৃথক আইন ও বিধির মাধ্যমে তাদের প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে।
এই সময় উচ্চশিক্ষা খাতে সমন্বয়, অর্থায়ন ও উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়; ১৯৭৩ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে এটি আইনগত কাঠামো লাভ করে। প্রাথমিকভাবে দেশের বিদ্যমান ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ও একাডেমিক চাহিদা বিবেচনা করা ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়ন, মানোন্নয়ন, গবেষণা ও সুশাসন-সংক্রান্ত দায়িত্বও সম্প্রসারিত হয়েছে।
স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদর্শনে স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন বিশেষ গুরুত্ব পেলেও এর অর্থ কখনোই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্নতা নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো উচ্চশিক্ষার জন্য অর্থায়ন, অবকাঠামো, নীতিগত সহায়তা ও আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা; অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব হলো জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, পাঠদান ও একাডেমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা বজায় রাখা। এই সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত সহযোগিতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও একাডেমিক স্বাধীনতার পারস্পরিক স্বীকৃতি।
তবে স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ, শিক্ষক রাজনীতির দলীয়করণ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং গবেষণার অপর্যাপ্ত সুযোগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিকাশকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলে স্বায়ত্তশাসনের আইনগত স্বীকৃতি থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা এবং একাডেমিক স্বাধীনতার পরিসর নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থেকেছে। এই বৈপরীত্য বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা, শিক্ষার চাহিদা, অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চশিক্ষার পরিসরও সম্প্রসারিত হতে থাকে। প্রথম পর্যায়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর উচ্চশিক্ষার প্রধান দায়িত্ব থাকলেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি, আসনসংকট এবং বিভিন্ন অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের প্রয়োজন নতুন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পথ তৈরি করে। সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষি, চিকিৎসা, প্রকৌশল, ব্যবসায় শিক্ষা এবং অন্যান্য বিশেষায়িত ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রবণতা বাড়তে থাকে।
১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথক আইন প্রণয়ন উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোর উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম সমন্বয়ের একটি বৃহৎ কাঠামো তৈরি করে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রচলিত ক্যাম্পাসনির্ভর শিক্ষার বাইরে দূরশিক্ষণ ও বিকল্প শিক্ষাপদ্ধতির সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি উদ্যোগের জন্য একটি আইনগত ভিত্তি তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন মান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নতুন কাঠামো প্রবর্তন করে।
এই সম্প্রসারণ উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ও পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্নও সামনে এনেছে। উচ্চশিক্ষা কি কেবল শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যম, নাকি এর দায়িত্ব আরও বিস্তৃত—মানবিক মূল্যবোধ, সমালোচনামূলক চিন্তা, গবেষণা, সৃজনশীলতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধের বিকাশ? বেসরকারি উদ্যোগের বিস্তার, পেশাভিত্তিক শিক্ষার চাহিদা এবং উচ্চশিক্ষার বাজারমুখী প্রবণতার মধ্যে এই প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি বা শিক্ষার্থীর প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ অবশ্যই ইতিবাচক অগ্রগতির সূচক হতে পারে; কিন্তু এগুলো একাই উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করে না। পর্যাপ্ত শিক্ষক, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, গবেষণা অর্থায়ন, মানসম্মত পাঠদান, একাডেমিক সততা এবং কার্যকর প্রশাসনিক জবাবদিহি ছাড়া উচ্চশিক্ষার বিস্তার কেবল সনদপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়াতে পারে, জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতা নয়। তাই উচ্চশিক্ষার গণতন্ত্রীকরণের পাশাপাশি গুণগত মান, গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক দর্শন যখন সত্যের অনুসন্ধান, মুক্তবুদ্ধির বিকাশ ও মানবিক সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসকে কেবল একটি নতুন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মের পেছনে ছিল একটি বিশেষ ঐতিহাসিক বাস্তবতা, একটি সামাজিক প্রয়োজন এবং একটি বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষা। ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন পূর্ববঙ্গের মানুষের উচ্চশিক্ষা, সামাজিক অগ্রগতি, প্রশাসনিক অংশগ্রহণ এবং আধুনিক জ্ঞানচর্চায় প্রবেশাধিকারের প্রশ্নের সঙ্গে এর প্রতিষ্ঠার ইতিহাস গভীরভাবে যুক্ত।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯১১ সালে তা রদের মধ্যবর্তী সময় পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময়। বঙ্গভঙ্গের ফলে ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠিত হলে এই অঞ্চলের প্রশাসনিক, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক বিকাশের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনগোষ্ঠীর একটি অংশের মধ্যে বঞ্চনা ও প্রত্যাশাভঙ্গের অনুভূতি তৈরি হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ক্রমশ গুরুত্ব পায়। ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সরকার ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা, নাথান কমিশনের সুপারিশ এবং আইন প্রণয়নের ধারাবাহিকতা অতিক্রম করে ১৯২০ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণীত হয়। অবশেষে ১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
এই প্রতিষ্ঠার ঘটনাকে তাই কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে দেখলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা অনালোচিত থেকে যায়। এটি ছিল উচ্চশিক্ষায় আঞ্চলিক প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, নতুন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ এবং পূর্ববঙ্গের মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক অগ্রগতির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক সাংগঠনিক কাঠামোর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল এর আবাসিক-শিক্ষাদানভিত্তিক চরিত্র। তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনায় আবাসিক হলগুলোকে কেবল শিক্ষার্থীদের থাকার জায়গা হিসেবে দেখা হয়নি; এগুলো ছিল শিক্ষাজীবন, সাংস্কৃতিক বিকাশ, সামাজিক মেলবন্ধন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলনের গুরুত্বপূর্ণ পরিসর।
এই কাঠামোর মধ্যে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সম্পর্ক, শ্রেণিকক্ষের বাইরের আলোচনা, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা, বিতর্ক এবং সমষ্টিগত জীবনযাপনের একটি শিক্ষামূলক তাৎপর্য ছিল। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল পাঠদান ও পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষায়তনিক পরিবেশ নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছিল।
প্রতিষ্ঠার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা, বিজ্ঞান ও আইন অনুষদ নিয়ে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। তিনটি আবাসিক হল—ঢাকা হল, জগন্নাথ হল ও মুসলিম হল—প্রাথমিক আবাসিক কাঠামোর অংশ ছিল। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাক্ষেত্র, বিভাগ, গবেষণা ও সাংগঠনিক পরিসর বিস্তৃত হয়।
এই ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে করিয়ে দেয়: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ কেবল তার পাঠ্যক্রমে নয়, তার সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে। একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করেন না; তিনি শেখেন ভিন্নমতকে সহ্য করতে, যুক্তির মুখোমুখি হতে, সামাজিক বৈচিত্র্য বুঝতে এবং নিজের চিন্তাকে পর্যালোচনা করতে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের বিশেষত্ব হলো, এটি সময়ের প্রবাহে কেবল উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, গণতান্ত্রিক অধিকার, স্বাধিকার আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট বুদ্ধিজীবী সমাজের ভূমিকা গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ মাতৃভাষার মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের সংগ্রামকে নতুন মাত্রা দেয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর রাজনৈতিক আন্দোলনেও বিশ্ববিদ্যালয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় লক্ষণীয়। বিশ্ববিদ্যালয় যখন রাষ্ট্র ও সমাজের প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোকে প্রশ্ন করার সক্ষমতা অর্জন করে, তখন তা কেবল শিক্ষার কেন্দ্র থাকে না; হয়ে ওঠে সামাজিক বিবেকেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক অবদান তাই শুধু কতজন রাষ্ট্রনায়ক, প্রশাসক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক কিংবা পেশাজীবী তৈরি করেছে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর বড় অবদান হলো, বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক চেতনা, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং অধিকারবোধের বিকাশে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংগঠনিক পরিসর তৈরি করা।
তবে ইতিহাসের গৌরবকে কেবল স্মৃতিচারণের উপকরণে পরিণত করলে তার প্রকৃত শিক্ষা অধরাই থেকে যায়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকা তার বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের মধ্য দিয়েও মূল্যায়িত হওয়া প্রয়োজন।
যে বিশ্ববিদ্যালয় ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে, সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত? যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রামে অংশ নিয়েছে, সেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিন্নমত কতটা সম্মানিত? যে প্রতিষ্ঠান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে, সেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থী বৈষম্য কিংবা নিপীড়নের শিকার হলে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়?
এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা ইতিহাসের প্রতি অসম্মান নয়; বরং ইতিহাসের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবনের শর্ত। কারণ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য তার অতীতের অর্জনের মধ্যে যেমন নিহিত থাকে, তেমনি তার বর্তমানের নৈতিক অবস্থানের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। অতীতের সংগ্রামের গৌরব দিয়ে বর্তমানের অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া যায় না। একইভাবে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অতীত ভূমিকার সমালোচনার নামে তার মৌলিক অধিকার ও একাডেমিক মর্যাদাও অস্বীকার করা যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক পরিচয় যদি মুক্তবুদ্ধি, অধিকারচেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে সেই পরিচয়ের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়গুলোতে। ক্ষমতার পালাবদলের পর বিশ্ববিদ্যালয় কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারে, কতটা প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে এবং কতটা ভিন্নমতকে নিরাপদ রাখতে পারে—সেখানেই তার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের প্রকৃত মূল্যায়ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কেবল অতীতের গৌরবগাথা নয়; এটি একটি চলমান নৈতিক অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকারের কেন্দ্রে রয়েছে জ্ঞান, স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার। প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ঐতিহ্য রক্ষা করতে হলে তার ভবন, স্মৃতিস্তম্ভ ও ঐতিহাসিক অর্জনের পাশাপাশি এই মূল্যবোধগুলোও রক্ষা করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা, সম্প্রসারণ কিংবা একাডেমিক সাফল্যের ইতিহাস নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক বিকাশ, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত।
১৯২১ সালে যাত্রা শুরু করা এই বিশ্ববিদ্যালয় সময়ের পরিক্রমায় এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক পরিসরে পরিণত হয়েছিল, যেখানে শ্রেণিকক্ষের পাঠ্যসূচি ছাড়িয়ে সমাজ, রাষ্ট্র, ভাষা, সংস্কৃতি, অধিকার ও মানুষের মুক্তি নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ তৈরি হয়। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবদান সেই বৃহত্তর ঐতিহাসিক ভূমিকার সাক্ষ্য বহন করে।
এই ইতিহাসের তাৎপর্য কেবল অতীতের গৌরব স্মরণে সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরে নিহিত রয়েছে একটি নৈতিক প্রত্যাশা—বিশ্ববিদ্যালয় হবে এমন এক স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর, যা অন্যায়, বৈষম্য, কর্তৃত্ববাদ ও চিন্তার সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার সাহস জোগাবে; যেখানে জ্ঞানচর্চা কেবল পেশাগত সাফল্যের উপায় হবে না, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রকে আরও ন্যায়সংগত, মানবিক ও গণতান্ত্রিক করে তোলার শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
তবে ইতিহাসের উত্তরাধিকার কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য স্থায়ী নৈতিক সনদ নয়। অতীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল বলেই বর্তমানে তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অতীতে তার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন বলেই বর্তমান প্রজন্ম অন্যায় থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবে, এমনটিও নয়। ইতিহাসের গৌরব বর্তমানের দায়িত্বকে আরও বড় করে তোলে; কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না।
প্রতিটি প্রজন্মকে নিজ নিজ সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও সেই পরীক্ষা আজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ কেবল তার অতীতের ঐতিহ্য ধারণের ওপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে সেই ঐতিহ্যের অন্তর্নিহিত মুক্তচিন্তা, ন্যায়বিচার, সাহস ও মানবিক মূল্যবোধকে বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক জীবনে কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে তার ওপর।
এই ইতিহাসের তাৎপর্য শুধু অতীতের গৌরব স্মরণে নয়। এর গভীরে রয়েছে একটি নৈতিক প্রত্যাশা—বিশ্ববিদ্যালয় অন্যায়, বৈষম্য, কর্তৃত্ববাদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার সাহস জোগাবে। কিন্তু ইতিহাসের উত্তরাধিকার কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য স্থায়ী সনদ নয়। অতীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল বলে বর্তমানে তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অতীতে তার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন বলে আজকের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অন্যায় থেকে মুক্ত থাকবেন, এমনও নয়। আসলে, প্রতিটি প্রজন্মকে নিজ নিজ সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও সেই পরীক্ষাটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
একটি দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়; কিন্তু সেই সম্প্রসারণ কি প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সমার্থক? বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্রুত বিস্তার, নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের প্রবণতা এবং রাজধানী ও কয়েকটি মহানগরকেন্দ্রিক ভৌগোলিক কেন্দ্রীভবন বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা ও বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবধান তৈরি করেছে। কোথাও স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই, কোথাও পর্যাপ্ত শিক্ষক ও গবেষণাগারের অভাব, আবার কোথাও প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের ঘাটতি উচ্চশিক্ষার গুণগত মানকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের বৈষম্য এবং বিশ্বজনীন জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো ও সংকীর্ণ স্বার্থের অধীনস্থ হয়ে পড়ার প্রবণতা—যাকে ধারণাগতভাবে Parochialisation of the University বলা যায়। এই পর্বে পর্যালোচনা করা হবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণের নীতিগত দর্শন, সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ব্যবধান, ভৌগোলিক বৈষম্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বজনীন পরিচয় সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি। মূল অনুসন্ধান থাকবে একটি মৌলিক প্রশ্নে: আমরা কি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়াচ্ছি, নাকি সেই অনুপাতে স্বাধীন জ্ঞানপ্রতিষ্ঠানও নির্মাণ করতে পারছি?
আসলে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে একটি গ্লোবাল ইনস্টিটিউশন যেটি একটি দেশে একটি নির্দিষ্ট আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচালিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশে বিগত সময়ে তিন দশকে উনিশশো নব্বই সালের পর থেকে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ধারণাটি সঠিকভাবে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং জেলায় জেলায় এই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে। কিন্তু বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান করার চেয়ে একটি সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার দিকেই আগ্রহ বেশি ছিল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাঙাচির মতো মাশরুম গ্রোথ করে গ্রোথ করা হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ধারণাটি-ই এখানে বিকৃত হয়ে গেছে। তবে এই বিকৃতি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সমালোচনা হিসেবে দেখলে মূল সমস্যাটি ধরা পড়বে না। এখানে অন্তত চারটি আন্তঃসম্পর্কিত প্রশ্ন রয়েছে:
এক্ষেত্রে শিক্ষাবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক অবস্থান হলো: বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত সম্প্রসারণের ফল হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাগত পরিচয়, প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক-সামাজিক ক্ষমতার সঙ্গে তার সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি বিচ্যুতি হিসেবে বিশ্লেষণ করা অধিক যুক্তিসংগত। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও বুঝতে হবে, যদিও জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিজে কোনো সমস্যা নয়। উচ্চশিক্ষার সুযোগের ভৌগোলিক বিকেন্দ্রীকরণ একটি প্রয়োজনীয় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। সমস্যা হলো, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় একাডেমিক, আর্থিক, গবেষণাগত ও প্রশাসনিক সক্ষমতার সমানুপাতিক বিকাশ ঘটেছে কি না।
বাংলাদেশে গত তিন দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলেও এই সম্প্রসারণ সমানভাবে ভৌগোলিক, অবকাঠামোগত ও একাডেমিক সক্ষমতার বিকাশ ঘটাতে পারেনি। বরং পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান, পরিচালনাগত প্রস্তুতি এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বৈষম্য দেখা যায়।
BANBEIS-এর Bangladesh Education Statistics 2023 অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে মোট ১৭১টি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। এর মধ্যে ৫৫টি সরকারি (৩২ শতাংশ) এবং ১১৬টি বেসরকারি (৬৮ শতাংশ)। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী ছিল ১০,৬৯,৫৭৯ জন এবং শিক্ষক ছিলেন ৩২,৯১৭ জন। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৬,২৫৫ জন হলেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড় শিক্ষার্থীসংখ্যা ছিল ১৩,১৯৯ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ২,৯৬২ জন। —এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে: বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর আকার, শিক্ষার্থী ধারণক্ষমতা এবং পরিচালনাগত বৈশিষ্ট্যেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানগত বৈষম্যের একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র পাওয়া যায় ২০১৮ সালের UGC-ভিত্তিক একটি গবেষণায়। সে সময় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় বাদ দিয়ে ১৪৮টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৮২টি ছিল ঢাকা মহানগর এলাকায় এবং ২৫টি চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায়। অর্থাৎ, এই দুই মহানগরেই অবস্থিত ছিল মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৭২.৩ শতাংশ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫টি ক্যাম্পাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৫টি ছিল ঢাকা মহানগরে; অন্যদিকে ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৪টি ছিল ঢাকায়।
আরও সাম্প্রতিক ভৌগোলিক চিত্র পাওয়া যায় UGC-সংশ্লিষ্ট Higher Education Acceleration and Transformation (HEAT) প্রকল্পের Environmental and Social Management Framework-এ। সেখানে ব্যবহৃত ২০১৬ সালের UGC-ভিত্তিক তথ্য অনুসারে, ১৫৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ছিল ৮৬টি, অর্থাৎ প্রায় ৫৫.৫ শতাংশ। এর মধ্যে ১৯টি সরকারি ও ৬৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বিপরীতে বরিশাল বিভাগে ছিল মাত্র ৪টি এবং ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে ৫টি করে।
দুটি পরিসংখ্যানের সময়কাল ও ভৌগোলিক একক আলাদা—একটি মহানগরভিত্তিক, অন্যটি বিভাগভিত্তিক। তাই এগুলোকে সরাসরি তুলনীয় না ধরে উচ্চশিক্ষার স্থানিক কেন্দ্রীভবনের দুটি পৃথক প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
সাম্প্রতিক সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছে প্রথম আলো। UGC-সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ২৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই। এর মধ্যে ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অনুমোদন পেয়েছিল। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ভাড়া করা ভবনে, কোনোটি অন্য প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ব্যবহার করে এবং কোনোটি একাধিক অস্থায়ী স্থানে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশের বিভাগসংখ্যা দুই থেকে সাতটির মধ্যে। অন্যদিকে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১০টি ঢাকায়, ৫টি চট্টগ্রামে এবং ৫টি গাজীপুরে অবস্থিত। অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌগোলিক বিস্তার ঘটলেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানগত বণ্টনেও উল্লেখযোগ্য কেন্দ্রীভবন রয়েছে।
এই বাস্তবতা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে কি তার স্থায়ী ক্যাম্পাস, পর্যাপ্ত শিক্ষক, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, আবাসন, আর্থিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক পরিকল্পনা নিশ্চিত করা হয়েছে, নাকি প্রশাসনিক অনুমোদন ও শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর মধ্য দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে?
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও সংখ্যাগত সম্প্রসারণের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রথম আলো-এর সাম্প্রতিক UGC-ভিত্তিক প্রতিবেদনে দেশে ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৪টি নিজস্ব ক্যাম্পাসে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই, ৮৯টিতে উপ-উপাচার্যের পদ শূন্য এবং ৪০টিতে কোষাধ্যক্ষ নেই। আরও ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই তিনটি শীর্ষ পদই শূন্য ছিল। প্রতিবেদনে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী সনদ পাওয়ার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থানের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীভবন স্পষ্ট। ওই প্রতিবেদনে ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৯টি ঢাকা জেলায়, ১০টি চট্টগ্রামে এবং ৫টি করে সিলেট ও নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, একদিকে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের প্রবণতা রয়েছে, অন্যদিকে বেসরকারি উচ্চশিক্ষার একটি বড় অংশ এখনও রাজধানী ও তার আশপাশে কেন্দ্রীভূত। একই সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ একাডেমিক ও প্রশাসনিক পদে শূন্যতা রয়েছে। এটি শুধু অবস্থানগত বৈষম্য নয়; প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনাগত সক্ষমতার বৈষম্যও নির্দেশ করে।
BANBEIS-এর ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ছিল ১:৪৪, অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ছিল ১:২১। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে ২৯৮ জন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪২ জন শিক্ষক ছিলেন।
এখানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক বেশি শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের পার্থক্য লক্ষণীয়। তবে শুধু এই অনুপাত দিয়ে শিক্ষার মান নির্ধারণ করা যায় না। বিভাগভিত্তিক শিক্ষার্থীসংখ্যা, ল্যাবরেটরির প্রয়োজন, শিক্ষকদের কর্মঘণ্টা, গবেষণায় সম্পৃক্ততা এবং পূর্ণকালীন শিক্ষকের সংখ্যা বিবেচনা করাও জরুরি। —পরিসংখ্যানের সমন্বিত তাৎপর্য হচ্ছে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণের সঙ্গে ভৌগোলিক বণ্টন, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয় বিকাশকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।
উপরের তথ্যগুলো থেকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে তিনটি বিষয় স্পষ্টভাবে গবেষণার দাবি রাখে।
তবে এসব তথ্য থেকে সব নতুন বিশ্ববিদ্যালয়কে নিম্নমানের বলা যাবে না। বরং এগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নীতি, পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও মাননিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কত বেড়েছে, তা নয়; বরং এই সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে কতগুলো প্রকৃত জ্ঞানপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কতগুলো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক গবেষণা, মুক্তবুদ্ধি, একাডেমিক স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে? একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আইনগত স্বীকৃতি প্রয়োজন, কিন্তু সেই স্বীকৃতিই বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠার নিশ্চয়তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্বের মধ্যকার এই ব্যবধানই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম মৌলিক সংকট।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ২০২৪-পরবর্তী অস্থিরতা কি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, নাকি এর পেছনে দীর্ঘদিনের ধারণাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারও ভূমিকা রয়েছে? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো নয়; এটি জ্ঞানচর্চা, যুক্তিবোধ, মতপ্রকাশ, সমালোচনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি স্বায়ত্তশাসিত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর। এই মৌলিক চরিত্র দুর্বল হয়ে পড়লে রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক অসন্তোষ কিংবা নেতৃত্বের সংকট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু সেই বিস্তারের সঙ্গে সব ক্ষেত্রে সমানতালে গড়ে ওঠেনি গবেষণার পরিবেশ, পর্যাপ্ত শিক্ষক, আধুনিক শিক্ষণ-উপকরণ, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, আবাসন, শিক্ষার্থীবান্ধব অবকাঠামো এবং কার্যকর একাডেমিক প্রশাসন। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও বাস্তব শিক্ষার পরিবেশের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা যে মানের শিক্ষা, গবেষণার সুযোগ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সংলাপ এবং পেশাগত প্রস্তুতি প্রত্যাশা করে, প্রতিষ্ঠান সব সময় তা নিশ্চিত করতে পারেনি। এই ব্যবধান থেকে অসন্তোষ জন্ম নিতে পারে। তবে সেই অসন্তোষের কারণ কেবল অবকাঠামোগত ঘাটতি নয়; শিক্ষার মান, প্রশাসনিক জবাবদিহি, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, আবাসিক সুবিধা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগও এর সঙ্গে যুক্ত।
এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন: শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি, প্রশাসনিক জবাবদিহির আন্দোলন এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এক বিষয়; আর অভিযোগের বিচার না করে কাউকে পদত্যাগে বাধ্য করা, সামাজিকভাবে হেয় করা, শারীরিকভাবে হুমকি দেওয়া কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শিক্ষককে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে; দ্বিতীয়টি সেই সংস্কৃতির পরিপন্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদের অধিকার যেমন থাকতে হবে, তেমনি অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারও নিশ্চিত করতে হবে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক শূন্যতা, উপাচার্য ও অন্যান্য কর্মকর্তার পদত্যাগ এবং শিক্ষকবিরোধী চাপের ঘটনা এই সংকটকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। ২৩ আগস্ট ২০২৪-এ প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর এক প্রতিবেদনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, ৫ আগস্টের পর কয়েক দিনের মধ্যে অন্তত ৩০ জন উপাচার্য, ১৫ জন উপ-উপাচার্য এবং ২১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি পদত্যাগ করেছিল। অন্যদিকে ৩১ আগস্ট ২০২৪-এ দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ৫ থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত ১৫০ জন শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা তাদের হিসাবে উঠে এসেছে। এই ১৫০ জনের তথ্য কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নয়; তাই একে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পরিসংখ্যান হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। তবে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় চাপ ও জবরদস্তির বিস্তৃতি বোঝার ক্ষেত্রে এটি প্রাসঙ্গিক।
পরবর্তী সময়েও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একাডেমিক স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি শেষ হয়ে যায়নি। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ৪৪ জন শিক্ষককে কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং আরও ২৫ জনের পাঠদান সীমিত করা হয়েছিল। সংস্থাটির পর্যালোচনায় ২০টির বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, একাডেমিক কার্যক্রমে বাধা এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনা ও ব্যক্তির দায় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো শিক্ষক যদি সহিংসতা, দুর্নীতি বা গুরুতর অনিয়মে জড়িত থাকেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত ও আইনসম্মত ব্যবস্থা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ বা পূর্ববর্তী প্রশাসনের সঙ্গে কথিত সংশ্লিষ্টতা নিজে কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়।
এখানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাগত সংকটের সঙ্গে ২০২৪-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের একটি গভীর সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্ব নির্বাচনে দলীয় আনুগত্য প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার ওপর প্রাধান্য পায়, সেখানে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পর একই কাঠামো উল্টো দিক থেকে প্রতিশোধমূলক চাপের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বদলালেও যদি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সংস্কৃতি না বদলায়, তবে ক্ষমতার পালাবদল এক ধরনের নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটিয়ে আরেক ধরনের নিয়ন্ত্রণের পথ খুলে দিতে পারে। তখন বিশ্ববিদ্যালয় আর যুক্তি, গবেষণা ও ন্যায়বিচারের স্বাধীন পরিসর থাকে না; বরং তা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
এই প্রবণতাকে বোঝার জন্য ‘বিশ্বজনীন বিশ্ববিদ্যালয়’ এবং ‘পাড়াকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান’-এর মধ্যকার পার্থক্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কোনো জেলা, শহর বা অঞ্চলে হতে পারে; কিন্তু তার জ্ঞানচর্চার পরিসর, গবেষণার মান, একাডেমিক মূল্যবোধ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব স্থানীয় সংকীর্ণতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় স্থানীয় সমাজের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী, দলীয় আনুগত্য, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ কিংবা সাময়িক জনমতের অধীনস্থ হবে না। এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি হবে আইন, প্রমাণ, একাডেমিক মানদণ্ড ও ন্যায়বিচার—তাৎক্ষণিক সামাজিক চাপ বা সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগ নয়।
অতএব, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় সংকটকে কেবল ‘শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ’ কিংবা ‘রাজনৈতিক পালাবদলের প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে এর গভীরতর কারণগুলো আড়ালে থেকে যাবে। আবার ২০২৪-পরবর্তী সব ঘটনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত দুর্বলতার সরাসরি ফল বলাও বিশ্লেষণগতভাবে যথার্থ হবে না। বরং বলা যায়, দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ, রাজনৈতিক মেরুকরণ, দুর্বল প্রশাসনিক জবাবদিহি, শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান এবং একাডেমিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা—এসব উপাদান একত্রে এমন একটি ভঙ্গুর পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের অভিঘাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে তীব্র অস্থিরতায় রূপ নেয়।
সুতরাং, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নীতি পুনর্বিবেচনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার দর্শনও পুনর্গঠন করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি পূরণ, শিক্ষার মান ও অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, গবেষণায় বিনিয়োগ, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যেকোনো অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে হবে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগের ভিত্তিতে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে পাড়ার প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেললে তার নাম, ভবন কিংবা ডিগ্রি প্রদানক্ষমতা হয়তো টিকে থাকবে; কিন্তু তার বিশ্বজনীন বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়, কোনো প্রশাসকের ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের ক্ষেত্রও নয়, আবার সাময়িক জনরোষের বিচারালয়ও নয়। এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা যায়, মতের ভিন্নতা সহ্য করা হয় এবং সত্য অনুসন্ধানের অধিকার রাজনৈতিক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে থাকে।
তাই বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সংকট তাই শুধু শিক্ষার মান বা অবকাঠামোর সংকট নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বুঝতে ও পরিচালনা করতে না পারার সংকট। আইন দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা যায়, কিন্তু জ্ঞান, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতা ছাড়া তাকে প্রকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা যায় না।
৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করে; সেই পরিবর্তনের অভিঘাত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও গভীরভাবে অনুভূত হয়। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক কাঠামো, নেতৃত্বের বৈধতা, শিক্ষক-প্রশাসকদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাবিন্যাস নতুন করে আলোচনায় আসে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পদত্যাগ, দায়িত্ব পুনর্বণ্টন, শিক্ষক ও প্রশাসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তদন্ত এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘটনা উচ্চশিক্ষার পরিবেশে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করে। একই সময়ে শিক্ষক হেনস্তা, শিক্ষার্থীদের চাপ, মব-আচরণ এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্বের সীমাবদ্ধতা নিয়ে নানা অভিযোগ ও বিতর্ক সামনে আসে। পরিবর্তনের পর একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক বিশ্ববিদ্যালয়ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার ব্যবধানও তাই অনুসন্ধানের দাবি রাখে। এই পর্বে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া, শিক্ষক নিপীড়নের অভিযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন পর্যালোচনা করা হবে। লক্ষ্য কোনো পক্ষের রাজনৈতিক অবস্থানকে বিচার করা নয়; বরং পরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সত্যিকার অর্থে স্বাধীন, ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পথে কতটা এগিয়েছে, তা অনুসন্ধান করা।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ তৈরি করে। ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন ক্রমে ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনের অভিঘাত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপরও সরাসরি পড়ে।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সম্পর্ক নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, প্রক্টর, ডিন ও অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদত্যাগ বা দায়িত্ব পরিবর্তনের ঘটনা ঘটে। কোথাও শিক্ষার্থীদের দাবি, কোথাও প্রশাসনিক অনাস্থা, আবার কোথাও রাজনৈতিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ এসব পরিবর্তনের পটভূমি তৈরি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও এই বাস্তবতার বাইরে ছিল না। শিক্ষকসমাজের সাংগঠনিক অবস্থান, প্রশাসনিক নেতৃত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং একাডেমিক পরিবেশ নতুন করে আলোচনায় আসে। বিশেষত আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে পরিচিত কিংবা জুলাই আন্দোলনের সময় সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠা কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি উত্থাপিত হয়।
তবে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এক বিষয় নয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেই তার প্রশাসনিক সংস্কৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি কিংবা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হয় না। বরং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতার বৈধতা, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও জবাবদিহির মানদণ্ড নতুন করে প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন দেখা দেয়।
এই পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে ওঠে: বিশ্ববিদ্যালয় কি নিজস্ব আইন, বিধি, ন্যায়বিচার ও একাডেমিক স্বাধীনতার ভিত্তিতে নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারছে, নাকি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরেও ক্ষমতার নতুন বিন্যাস তৈরি হচ্ছে?
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক নেতৃত্বের দ্রুত পরিবর্তন একদিকে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ও অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, অন্যদিকে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন সামনে আনে।
অভ্যুত্থানের পরপরই দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে পরিবর্তন ঘটে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও উপাচার্য ও একাধিক প্রশাসনিক দায়িত্বে পরিবর্তন আসে। এর ফলে নতুন নেতৃত্বের বৈধতা, নিয়োগের ভিত্তি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
অতীতে কোনো প্রশাসক ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন কি না, কিংবা কোনো শিক্ষক নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্যানেলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না—এসব পরিচয় তাঁর পেশাগত যোগ্যতা বা দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার একমাত্র নির্ণায়ক হতে পারে না। একইভাবে, অতীতের ক্ষমতার অপব্যবহার বা অনিয়মের অভিযোগও উপেক্ষা করা যায় না। প্রয়োজন হলো অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণভিত্তিক দায় নির্ধারণ।
এই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর প্রভাব পরিবর্তিত হতে থাকে। অতীতে যেসব শিক্ষকগোষ্ঠী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধায় প্রভাব বিস্তার করত বলে অভিযোগ ছিল, তাদের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি অন্য রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকগোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধির প্রবণতাও আলোচনায় আসে। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে: বিশ্ববিদ্যালয় কি সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হচ্ছে, নাকি পুরোনো ক্ষমতাবলয়ের জায়গায় নতুন ক্ষমতাবলয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে?
পরবর্তী সময়ে উপাচার্য ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ নিয়েও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, শিক্ষক সংগঠনের পরিচয় এবং পেশাগত যোগ্যতার আপেক্ষিক গুরুত্ব নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। ২০২৬ সালেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে নেতৃত্ব পরিবর্তন ও নিয়োগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলোচনায় এসেছে।
এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পরিবর্তন দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাসনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়োগ, পদোন্নতি, দায়িত্ব বণ্টন ও প্রশাসনিক জবাবদিহির স্থায়ী, স্বচ্ছ এবং রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ কাঠামো।
৫ আগস্টের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আন্দোলনবিরোধী ভূমিকা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সামনে আসে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে ৩ নভেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত Human Rights Watch-এর প্রতিবেদন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ৪৪ জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছিল এবং আরও ২৫ জনের পাঠদানের দায়িত্ব সীমিত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ছয়জন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত এবং আরও ১৪ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনটির মূল উদ্বেগ ছিল এসব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত, অভিযোগের যথাযথ প্রমাণ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সাক্ষাৎকার, বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠিপত্র, ভিডিও এবং সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানের তথ্য পর্যালোচনা করে HRW তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে।
এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন, HRW-এর প্রতিবেদন একটি মানবাধিকার সংস্থার গবেষণা ও মূল্যায়ন; এটি কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়। একইভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তির সমার্থক নয়।
পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির ব্যাপ্তি আরও স্পষ্ট হয়। ২১ এপ্রিল ২০২৬ প্রকাশিত bdnews24.com-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা কিংবা আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৬৮ জন শিক্ষক তখনো একাডেমিক কার্যক্রম থেকে বিরত ছিলেন। তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে আসে।
এখানে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন:
দীর্ঘদিন কোনো শিক্ষককে পাঠদান, গবেষণা কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্তের প্রাতিষ্ঠানিক ও মানবিক প্রভাব রয়েছে। বিশেষত অভিযোগের নিষ্পত্তি না করে অনির্দিষ্টকাল দায়িত্ব থেকে বিরত রাখলে তা কার্যত শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে।
অবশ্য আন্দোলনের সময় সহিংসতা, অপরাধে সহযোগিতা কিংবা শিক্ষার্থীদের অধিকার লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করা অপরিহার্য। কিন্তু তদন্তকে অনির্দিষ্টকাল ধরে শাস্তির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের বৃহত্তর পরিস্থিতিরই একটি অংশ। ৩ নভেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত Human Rights Watch-এর প্রতিবেদনে দেশের ২০টিরও বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বরখাস্ত, সাময়িক বরখাস্ত, পাঠদানের দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা, পদোন্নতিতে বাধা এবং শিক্ষার্থী বহিষ্কারের মতো পদক্ষেপের কথা উঠে আসে। সংস্থাটি বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে যে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বিশ্বাস বা সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
প্রতিবেদনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাব, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে দলীয় ঘনিষ্ঠতা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পক্ষপাতের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যদি একই ধরনের প্রবণতা নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পুনরাবৃত্ত হয়, তাহলে প্রত্যাশিত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অর্জিত হবে না।
এখানে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তদন্তের তথ্যও প্রাসঙ্গিক। তবে এসব সংখ্যা ও অভিযোগের প্রকৃতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি, তদন্তের অগ্রগতি এবং স্বাধীন যাচাইয়ের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তদন্তাধীন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
এই পর্যবেক্ষণ কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নয়। বরং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে একাডেমিক স্বাধীনতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি।
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদ, পদত্যাগের দাবি, সামাজিক চাপ এবং হয়রানির ঘটনা আলোচনায় আসে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও শিক্ষকদের প্রকাশ্যে অপদস্থ করা, প্রশাসনিক ভবনে চাপ সৃষ্টি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণের অভিযোগ উঠে আসে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে Dhaka Tribune দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের একাধিক ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষককে প্রকাশ্যে অপমান, হুমকি এবং প্রশাসনিক দপ্তরে আটকে রাখার অভিযোগ এতে উল্লেখ করা হয়।
এসব ঘটনা কেবল সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের ব্যক্তিগত মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে না; বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব ও আইনানুগ শৃঙ্খলাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর, প্রতিবাদ করার এবং প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি দাবি করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু অভিযোগের নিষ্পত্তির দায়িত্ব কোনো অনানুষ্ঠানিক চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং বিধিসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।
প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক অধিকার; কিন্তু ভয়ভীতি, অপমান, জবরদস্তি ও বিচারবহির্ভূত শাস্তি সেই অধিকারের বৈধ প্রয়োগ নয়। - এখানে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ যথাযথ গুরুত্ব পাবে এবং একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া পাওয়ার অধিকারও অক্ষুণ্ণ থাকবে।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল, দীর্ঘদিনের দলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক পক্ষপাত ও রাজনৈতিক মেরুকরণ অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একাডেমিক স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তন নিজে থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করে না। একটি রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে গেছে। একইভাবে অতীতের প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসা মানেই সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, এমনটিও নয়।
যদি পুরোনো পক্ষপাতের পরিবর্তে নতুন পক্ষপাত প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে কাঠামোগত সংকটের সমাধান হয় না; কেবল ক্ষমতার অবস্থান বদলায়। অতীতে কোনো শিক্ষক রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বঞ্চিত হয়ে থাকলে নতুন সময়ে অন্য রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাঁকে বঞ্চিত করাও একই ধরনের নীতিগত বিচ্যুতি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কার তাই কেবল নেতৃত্ব বা ক্ষমতাবলয়ের পরিবর্তন নয়। এর জন্য প্রয়োজন:
অতএব, ৫ আগস্ট-পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয় অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একটি রাজনৈতিক কর্তৃত্বের পতন নিজে থেকেই গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে না। নতুন নেতৃত্বের আগমনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে একাডেমিক স্বাধীনতা কিংবা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক পরিবর্তনের অর্জনকে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রে রূপান্তর করা। বিশ্ববিদ্যালয় যেন ক্ষমতার আনুগত্যের ক্ষেত্র না হয়ে সত্য, যুক্তি, মুক্তচিন্তা ও ন্যায়বিচারের স্বাধীন আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতির আলোচনায় শিক্ষক রাজনীতি একটি জটিল ও বহুমাত্রিক বিষয়। একদিকে শিক্ষকের রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও নাগরিক অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে; অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক দায়িত্ব, পেশাগত নিরপেক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতাও রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির ইতিহাসে নীল, সাদা ও গোলাপি দলের অবস্থান, বিভিন্ন সময়ের আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্কের পরিবর্তন এই জটিলতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। বিশেষত যখন আদর্শিক অবস্থান ও একাডেমিক বিতর্কের জায়গা সংকুচিত হয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা ক্ষমতার প্রতিযোগিতা মুখ্য হয়ে ওঠে, তখন শিক্ষক রাজনীতির প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন দেখা দেয়। ৫ আগস্ট-পরবর্তী অভিজ্ঞতায় মব-চাপ, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিতকরণ, অভিযোগের ভিত্তিতে হেনস্তা এবং বিচারবহির্ভূত শাস্তির বিতর্ক এই প্রশ্নকে আরও জরুরি করে তুলেছে। এই পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতার আলোকে শিক্ষক রাজনীতির ঐতিহাসিক বিবর্তন, আদর্শিক অবস্থান থেকে ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় রূপান্তর, শিক্ষকতার সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে ন্যায়বিচারের অভিন্ন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষণ করা হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি সমাজের বিবেক, যুক্তিবোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর নির্মাণেরও একজন গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতি নিজেই কোনো অস্বাভাবিক বা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকও সমাজের একজন সচেতন নাগরিক। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে মতামত এবং বিভিন্ন আদর্শের প্রতি সমর্থন থাকতে পারে। গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি তাঁর অবস্থান প্রকাশের অধিকার রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সচেতনতা গণতান্ত্রিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন রাজনৈতিক পরিচয় শিক্ষকের একাডেমিক পরিচয়কে ছাপিয়ে যায়; যখন যোগ্যতা, গবেষণা ও পেশাগত অবদানের পরিবর্তে দলীয় আনুগত্য নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্ব পাওয়ার অন্যতম বিবেচ্য হয়ে ওঠে।
শিক্ষক সমিতি ও প্যানেলভিত্তিক সংগঠন যদি শিক্ষকদের পেশাগত অধিকার রক্ষা এবং একাডেমিক পরিবেশ উন্নয়নের পরিবর্তে জাতীয় রাজনৈতিক দলের শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হয়, তখন শিক্ষক রাজনীতি তার স্বাভাবিক নাগরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্র হারিয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির ইতিহাসে এই দ্বৈত বাস্তবতা স্পষ্ট। একদিকে শিক্ষকসমাজ জাতীয় রাজনৈতিক আন্দোলন, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে; অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ক্ষমতা, নিয়োগব্যবস্থা ও একাডেমিক পরিবেশে দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজের রাজনৈতিক ভূমিকা কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরা জাতীয় রাজনীতি, সামাজিক সংস্কার, ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মতামত দিয়েছেন। ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামো, ভাষার অধিকার, স্বায়ত্তশাসন ও মুক্তিযুদ্ধের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহে তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান এবং সংগঠিত প্যানেলভিত্তিক শিক্ষক রাজনীতি এক বিষয় নয়। প্রথমটি নাগরিক স্বাধীনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানের প্রকাশ; দ্বিতীয়টি সম্মিলিত সাংগঠনিক ও নির্বাচনী তৎপরতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর জাতীয় রাজনীতির আদর্শিক বিভাজন ক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজেও প্রতিফলিত হতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের শিক্ষকরা নিজস্ব সাংগঠনিক বলয় তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে শিক্ষক সমিতির নির্বাচন এবং সিনেট, সিন্ডিকেটসহ বিভিন্ন প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামোয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এসব বলয় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
তবে শিক্ষক রাজনীতির ইতিহাসকে শুধু দুটি প্রধান প্যানেলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাস হিসেবে দেখলে এর বহুমাত্রিকতা হারিয়ে যায়। নীল ও সাদা দলের পাশাপাশি বামপন্থী শিক্ষকদের গোলাপি দলেরও ঐতিহাসিক উপস্থিতি ছিল। এ ছাড়া দলীয় প্যানেলের বাইরে থেকেও অনেক শিক্ষক নিজস্ব রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান বজায় রেখেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিতে রঙভিত্তিক প্যানেল পরিচিতি সময়ের সঙ্গে একটি দৃশ্যমান সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। সাধারণভাবে নীল দল আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক-আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে পরিচিত। সাদা দল বিএনপি ও জামায়াতপন্থী শিক্ষক রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে সংবাদমাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। অন্যদিকে গোলাপি দল ঐতিহাসিকভাবে বামপন্থী ও প্রগতিশীল শিক্ষকদের একটি পৃথক সাংগঠনিক বলয় হিসেবে পরিচিত ছিল।—তবে এসব পরিচয়কে প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা কর্মকাণ্ডের অব্যর্থ প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
২০১০ সালে The Daily Star-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী লেখায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রঙভিত্তিক শিক্ষক প্যানেলগুলোকে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত সাংগঠনিক পরিচয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। লেখাটিতে নীল, সাদা ও গোলাপি প্যানেলের পাশাপাশি দলীয় কাঠামোর বাইরে থাকা শিক্ষকদের অস্তিত্বের কথাও উল্লেখ করা হয়।
এই প্যানেলগুলো একদিকে শিক্ষকদের রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্র তৈরি করেছে; অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। ফলে শিক্ষক রাজনীতির মূল্যায়নে শুধু আদর্শিক অবস্থান নয়, প্রশাসনিক ভূমিকা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় ছিল ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল। এই সময়ে নীল ও সাদা দলের মধ্যে শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভারসাম্যের চিত্র দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে দুই প্যানেলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিযোগিতা ছিল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ২০০৪ ও ২০০৫ সালে নীল দলের প্রার্থীরা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। আবার ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরও ২০০৯, ২০১০ ও ২০১৩ সালের নির্বাচনে সাদা দলের প্রার্থীরা সাধারণ সম্পাদক পদে জয়লাভ করেছিলেন।
এই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, জাতীয় পর্যায়ে কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজের সাংগঠনিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অবিলম্বে বিলুপ্ত হয়ে যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে বিকল্প মতাদর্শ, সংগঠন ও নির্বাচনী প্রতিযোগিতার নিজস্ব বাস্তবতা থাকতে পারে। তবে এই সময়কে সম্পূর্ণ দলীয় প্রভাবমুক্ত বা আদর্শিক সহাবস্থানের আদর্শ যুগ হিসেবে চিহ্নিত করাও যথার্থ হবে না। বরং একে তুলনামূলক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সাংগঠনিক ভারসাম্যের একটি পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা অধিক যুক্তিসংগত।
২০১৫–২০২৪ সময়কালে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ও অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ ঘটলেও বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত নবীন, ছোট ও ভৌগোলিকভাবে প্রান্তিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক নেতৃত্ব, নিয়োগব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক সামনে এসেছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক যোগ্যতা, গবেষণায় অবদান, প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক সম্পর্ক প্রাধান্য পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) ২০২১ সালের ৪৮তম বার্ষিক প্রতিবেদনেও অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব পদে নিয়োগের জন্য সুস্পষ্ট ও অভিন্ন নির্দেশিকা এবং কার্যকর পদ্ধতির অভাবের বিষয়টি উঠে আসে। কমিশন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মধ্য থেকে যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় তাদের মতামত বিবেচনার সুপারিশ করে। এর ফলে মূল প্রশ্নটি কেবল কে উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য হচ্ছেন, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং কোন যোগ্যতা, কী প্রক্রিয়া এবং কার কাছে তাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক আনুগত্য যখন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রভাবশালী বিবেচনায় পরিণত হয়, তখন গবেষণা ও পাঠদানে নিবেদিত শিক্ষকদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বিপরীতে, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও প্রশাসনিক ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম ব্যক্তিদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বাড়ে।
এই প্রশাসনিক সংস্কৃতির সঙ্গে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক সুপারিশ, নিয়োগ বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও সম্পর্কিত। ২০১৯ সালে UGC দেশের ১৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নেয়। ২০২০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে UGC-এর তদন্ত প্রতিবেদনে বিধিবহির্ভূত নিয়োগের তথ্য উঠে আসে; প্রতিবেদনে ৩৪ জন শিক্ষকের নিয়োগ বাতিলের সুপারিশের পাশাপাশি উপাচার্যের পরিবারের সদস্যদের নিয়োগের ক্ষেত্রে বিধি শিথিল করার বিষয়টিও আলোচিত হয়। নবীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতাও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম শুরুর পর তৎকালীন উপাচার্যের বিরুদ্ধে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় UGC-এর তদন্তে উপাচার্যের ছেলে, ভায়রা ও কয়েকজন ভাগনেকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে এবং তাঁদের নিয়োগ বাতিলের নির্দেশ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এসব ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগব্যবস্থায় মেধা, স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন, শিক্ষকের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা নাগরিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিজে কোনো সমস্যা নয়; সংকট তৈরি হয় তখন, যখন রাজনৈতিক পরিচয় একাডেমিক যোগ্যতার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায় এবং শিক্ষকতার মৌলিক দায়িত্ব—পাঠদান, গবেষণা, জ্ঞান উৎপাদন ও শিক্ষার্থীর বৌদ্ধিক বিকাশ—রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত কর্তৃত্বের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে এমন একটি ক্ষমতাকাঠামো গড়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে, যেখানে একাডেমিক উৎকর্ষের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং প্রশাসনিক ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ শিক্ষকগোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণে অধিক প্রভাব বিস্তার করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সংকট শুধু নেতৃত্ব নির্বাচন কিংবা শিক্ষক নিয়োগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; জমি অধিগ্রহণ, অবকাঠামো নির্মাণ, উন্নয়ন প্রকল্প, দরপত্র, যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব ক্ষেত্রে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। UGC-এর ২০২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও উন্নয়ন প্রকল্প ও নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কমিশনের তদন্ত-সুপারিশ বাস্তবায়নে জবাবদিহি জোরদারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য শিরীণ আখতারের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে মামলা—এসব ঘটনাও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। তবে অভিযোগ, তদন্তে পাওয়া তথ্য, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। একইভাবে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও একাডেমিক নেতৃত্বের সম্পর্ক বিশ্লেষণেও শিক্ষকের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাব একাডেমিক নেতৃত্বের বিকাশকে নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং গবেষণা, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, পাঠদানের মান, একাডেমিক উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিবেশকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিসরে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহণযোগ্যতা শুধু অবকাঠামো বা শিক্ষার্থীর সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গবেষণার স্বাধীনতা, শিক্ষক নিয়োগের মান, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা।
অতএব, ২০১৫–২০২৪ সময়কালের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে আনে। উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগে স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক নির্বাচনপ্রক্রিয়া, স্বাধীন সার্চ কমিটি, প্রকাশ্য মূল্যায়ন মানদণ্ড, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে মেধা ও নিরপেক্ষতা, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বাধীন নিরীক্ষা এবং UGC-এর তদন্ত ও সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষকের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ, গবেষণা, পাঠদান ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে দলীয় কর্তৃত্বের বাইরে রাখার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভবন, জমি কিংবা প্রশাসনিক কাঠামো নয়; বরং জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা, মেধাবী শিক্ষকসমাজ এবং নেতৃত্বের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধার চেয়ে আনুগত্য, গবেষণার চেয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং একাডেমিক নেতৃত্বের চেয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক কর্তৃত্ব অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ই সংকটের মুখে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হওয়া কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার নয়; এটি জ্ঞান, বিবেক, ন্যায়বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা রক্ষার গুরুদায়িত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়কে তার প্রকৃত পরিচয়ে ফিরিয়ে আনতে হলে নেতৃত্বকে রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রভাব থেকে মুক্ত করে জ্ঞানচর্চার নৈতিক, বৌদ্ধিক ও একাডেমিক কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
শিক্ষক রাজনীতির বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো এর উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধির সম্প্রসারণ। শুরুতে রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থান প্রকাশ, জাতীয় প্রশ্নে মতামত প্রদান এবং শিক্ষকদের সম্মিলিত স্বার্থ রক্ষার যে সাংগঠনিক প্রয়োজন ছিল, সময়ের সঙ্গে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক পদে প্রতিনিধিত্ব, নীতিনির্ধারণে প্রভাব, নিয়োগ ও পদোন্নতির পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের প্রশ্ন।
শিক্ষকদের পেশাগত অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা, গবেষণার সুযোগ, পদোন্নতি ও একাডেমিক মর্যাদা রক্ষায় সংগঠিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু পেশাগত স্বার্থের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার সম্পর্ক অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলে সংগঠনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদ যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার গুরুত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। একইভাবে, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক পরিচয় প্রভাব বিস্তার করলে মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গবেষণার মান, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের আস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপরও পড়তে পারে।
তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে নির্বাচনী ফলাফল, নিয়োগের নথি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিচয় একা কোনো ব্যক্তির অনিয়মের প্রমাণ নয়; আবার রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অনিয়মের অভিযোগ উপেক্ষা করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনৈতিক মতসম্পন্ন নাগরিক হতে পারেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর প্রথম দায়বদ্ধতা হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, একাডেমিক মূল্যবোধ, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ, গবেষণার স্বাধীনতা এবং ন্যায়সংগত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার প্রতি।
একজন শিক্ষক নীল, সাদা, গোলাপি কিংবা অন্য কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকতেই পারেন। কিন্তু তাঁর নিয়োগ, পদোন্নতি, গবেষণা অনুদান, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও একাডেমিক মর্যাদা নির্ধারিত হওয়া উচিত যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতির ভিত্তিতে।
রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমতাবলম্বী হওয়ার কারণে কোনো শিক্ষকের একাডেমিক অবদান অস্বীকার করা যায় না। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতির সঙ্গে অসংগত, তেমনি সেই পরিচয়ের কারণে কাউকে অপমান, বঞ্চনা কিংবা শাস্তির লক্ষ্যবস্তু করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি তার অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ধারণ করার সক্ষমতায়। যে শিক্ষকসমাজে ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও সহকর্মীর একাডেমিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে, সেখানে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ শক্তিশালী হয়। বিপরীতে, সহকর্মীকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হলে পারস্পরিক আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্প্রদায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। অতএব, শিক্ষক রাজনীতির প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত নীল বনাম সাদা কিংবা এক রাজনৈতিক মতাদর্শ বনাম অন্য মতাদর্শের প্রশ্ন নয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্রের প্রশ্ন। শিক্ষকসমাজ কি বহুমতের সহাবস্থানে বিশ্বাসী একটি একাডেমিক সম্প্রদায় হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে, নাকি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এক গোষ্ঠীর জায়গায় অন্য গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে অভিযোগ উত্থাপন, প্রতিবাদ এবং প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি দাবি করার অধিকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েরই রয়েছে। কিন্তু কোনো অভিযোগের নিষ্পত্তি যদি অনানুষ্ঠানিক চাপ, ভয়ভীতি, প্রকাশ্য অপমান কিংবা জবরদস্তির মাধ্যমে করা হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে।
মব-চাপের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি প্রমাণ ও প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠের তাৎক্ষণিক আবেগকে সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে; একই সঙ্গে অভিযুক্ত শিক্ষকের বক্তব্য, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং আপিলের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।
এখানে দুটি নীতি সমান গুরুত্বপূর্ণ:
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা মানে অন্যায়ের প্রতি নীরব থাকা নয়। বরং অভিযোগের গুরুত্ব ও অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় নির্বিশেষে একই নীতিতে বিচার নিশ্চিত করা।
আনুষ্ঠানিক অভিযোগ নিষ্পত্তি ও বিচারপ্রক্রিয়া দুর্বল হলে মব-সংস্কৃতি শক্তিশালী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এর সমাধান শিক্ষার্থীদের কণ্ঠরোধ নয়; বরং অভিযোগ নিষ্পত্তির বিশ্বাসযোগ্য, স্বাধীন ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে কাউকে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য দলবদ্ধ চাপ কিংবা অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতার আশ্রয় নিতে না হয়।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক শক্তি সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হয় ক্ষমতার পরিবর্তনের মুহূর্তে।
রাজনৈতিক ক্ষমতা যখন একটি গোষ্ঠীর হাতে থাকে, তখন তারা নিজেদের সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের পর একই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি যদি নতুন গোষ্ঠীর হাতে চলে যায়, তাহলে প্রকৃত সংস্কার ঘটে না। শুধু ক্ষমতার অধিকারী বদলায়।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে তাই একটি মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন: অতীতের অন্যায়কে ভবিষ্যতের অন্যায়ের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। কোনো শিক্ষক অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সহকর্মীকে বঞ্চিত করে থাকলে তাঁর ভূমিকা তদন্তযোগ্য। আবার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কোনো শিক্ষক একই ধরনের প্রতিশোধমূলক আচরণের শিকার হলে তাঁর অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন।
ন্যায়বিচারের কোনো রাজনৈতিক পক্ষ থাকা উচিত নয়। ন্যায়বিচারের পক্ষ থাকা উচিত। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে হবে—
শিক্ষকের পরিচয় কেবল তাঁর পদবি, বেতন, গবেষণাপত্র কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন শিক্ষক একই সঙ্গে জ্ঞানের অনুসন্ধানী, শিক্ষার্থীর পথপ্রদর্শক এবং সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাঁর দায়িত্ব শুধু পাঠ্যসূচি শেষ করা কিংবা পরীক্ষার ফলাফল নিশ্চিত করা নয়; বরং শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে শেখানো, যুক্তিবোধ বিকশিত করা, জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা বুঝতে সাহায্য করা এবং সত্য অনুসন্ধানের নৈতিক সাহস জাগিয়ে তোলা।
তবে শিক্ষককে সমাজের বিবেক বলা হলে তাঁর নিজের আচরণও সেই নৈতিক প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে সুবিধা গ্রহণ, ভিন্নমতের সহকর্মীকে বর্জন, শিক্ষার্থীর ওপর কর্তৃত্বের অপব্যবহার কিংবা প্রশাসনিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগ—এসব কোনোভাবেই একাডেমিক মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একইভাবে, কোনো শিক্ষক রাজনৈতিকভাবে সংখ্যালঘু বা অজনপ্রিয় মতের অনুসারী হলেই তাঁর পেশাগত মর্যাদা খর্ব করা যায় না।
শিক্ষকসমাজের জন্য তাই আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি অপরিহার্য। অতীতের অন্যায়কে অস্বীকার না করে, আবার নতুন অন্যায়কেও বৈধতা না দিয়ে নিজেদের পেশাগত ও নৈতিক অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হবে। একাডেমিক স্বাধীনতার দাবি যেমন রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করে, তেমনি তা নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তির অজুহাত হতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যদি নিজেদের মধ্যকার মতপার্থক্যকে সহাবস্থান ও যুক্তিবিনিময়ের মাধ্যমে পরিচালনা করতে না পারেন, তাহলে শিক্ষার্থীদের কাছে গণতন্ত্র, সহনশীলতা ও মানবিক মর্যাদার শিক্ষা তাঁদের কতটা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠবে?
এই প্রশ্নের উত্তর কেবল বক্তব্যে নয়; শিক্ষকসমাজের বাস্তব আচরণ, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটের বিশ্লেষণ তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা উত্তরণের পথও নির্দেশ করে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস কিংবা নেতৃত্বের পরিবর্তন একা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে তার মৌলিক আদর্শে ফিরিয়ে নিতে পারে না; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি, জবাবদিহির কাঠামো এবং ন্যায়বিচারের মানদণ্ডে মৌলিক পরিবর্তন। মবের চাপ নয়, যুক্তি ও সংলাপ; রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনের শাসন; ব্যক্তিগত আনুগত্য নয়, মেধা ও যোগ্যতা—এই নীতিগুলোর ভিত্তিতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনর্জাগরণ সম্ভব। এ জন্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রশাসন, নীতিনির্ধারক ও রাষ্ট্রের প্রত্যেকের রয়েছে পৃথক অথচ পরস্পরসম্পর্কিত দায়িত্ব। এই শেষ পর্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন, ন্যায়বিচার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মালিকানা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, তা নির্ভর করবে তারা কতটা রাজনৈতিক আনুগত্য ও প্রতিশোধের সংস্কৃতি অতিক্রম করে স্বাধীন জ্ঞানচর্চা, মানবিক মর্যাদা, যুক্তিবাদ ও ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে তার ওপর। শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে পুনরুদ্ধার করার অর্থ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা নয়; বরং একটি সমাজের চিন্তা করার, প্রশ্ন তোলার এবং সত্য অনুসন্ধানের স্বাধীনতাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট কখনো তার প্রশাসনিক ভবন, কয়েকটি বিভাগ কিংবা কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে শ্রেণিকক্ষে, গবেষণাগারে, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কে, জ্ঞানচর্চার পরিবেশে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে যখন ভিন্নমতের জায়গা সংকুচিত হয়, ন্যায়বিচারের পরিবর্তে প্রভাব ও চাপ সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যক্তির একাডেমিক ও পেশাগত অবস্থানকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তখন সংকট আর কোনো একক প্রতিষ্ঠানের থাকে না; তা সামগ্রিক উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার সংকটে পরিণত হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে সৃষ্ট ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সামনে এই বাস্তবতাকেই নতুন করে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও এটি আত্মসমালোচনা ও প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্বিবেচনার গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
এই সংকটের মূলে রয়েছে কয়েকটি পরস্পরসম্পর্কিত প্রশ্ন—বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন কতটা কার্যকর, শিক্ষক রাজনীতির প্রকৃতি কী, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য ও পেশাগত বঞ্চনার আশঙ্কা কতটা বাস্তব, একাডেমিক স্বাধীনতা ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার কীভাবে সুরক্ষিত হবে এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক মর্যাদা ও দায়িত্ববোধ কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল প্রশাসনিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্যে পাওয়া যাবে না। প্রয়োজন ক্ষমতার চর্চা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এবং জবাবদিহির কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন।
রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেই কোনো প্রতিষ্ঠানের চরিত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে বদলে যায় না। প্রশাসনের নেতৃত্বে নতুন ব্যক্তির আগমনও প্রশাসনিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দেয় না। অতীতের অনিয়ম ও অন্যায়ের বিচার করতে গিয়ে যদি নতুন বৈষম্য, প্রতিহিংসা কিংবা অন্যায়ের জন্ম হয়, তবে তাকে সংস্কার বলা যায় না। সেটি কেবল ক্ষমতার অবস্থান ও পরিচয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পুরোনো প্রবণতার পুনরাবৃত্তি। প্রকৃত সংস্কার তখনই সম্ভব, যখন অতীতের ভুল ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নিরপেক্ষ মূল্যায়নের পাশাপাশি এমন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, যেখানে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় অন্যায় করার সুযোগ তৈরি করবে না, আবার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ ন্যায়বিচার থেকেও বঞ্চিত হবেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বাংলাদেশের জাতীয় জীবন, রাজনৈতিক চেতনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা ও স্বাধিকার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন সংগ্রামে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এসব ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং জাতীয় বিবেক, মুক্তবুদ্ধি ও গণতান্ত্রিক চেতনার গুরুত্বপূর্ণ পরিসর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু ইতিহাসের গৌরব বর্তমানের ব্যর্থতা আড়াল করার ঢাল হতে পারে না। ইতিহাসের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা প্রদর্শনের অর্থ হলো তার অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ—মুক্তচিন্তা, ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, বৈষম্যের বিরোধিতা এবং ক্ষমতার জবাবদিহি—নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক আচরণে প্রতিফলিত করা। অতীতের সংগ্রামের স্মৃতি ধারণ করেও যদি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তার বর্তমান সদস্যদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার আনুষ্ঠানিক স্মৃতিচারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
অতএব, অতীতের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ যেমন নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে, তেমনি বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা মতাদর্শের কারণে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের হয়রানি, বৈষম্য বা পেশাগত বঞ্চনার অভিযোগও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কোনো অভিযোগকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সত্য বা মিথ্যা ধরে নেওয়া যাবে না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে তথ্য, নথি, সাক্ষ্য এবং ন্যায়সংগত তদন্তের ভিত্তিতে। কোনো ব্যক্তি, প্যানেল কিংবা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়—বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি দায়বদ্ধতা, সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবিচল আস্থাই হওয়া উচিত শিক্ষকসমাজের সম্মিলিত নৈতিক ভিত্তি।
বিশ্ববিদ্যালয় রাজনৈতিকভাবে সচেতন হবে—এটাই স্বাভাবিক। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক মতাদর্শ ধারণ করবেন, রাষ্ট্র ও সমাজের নানা বিষয়ে মতপ্রকাশ করবেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন। কিন্তু রাজনৈতিক সচেতনতা আর দলীয় নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যখন কোনো রাজনৈতিক দল, শিক্ষক প্যানেল কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থের অধীন হয়ে পড়ে, তখন জ্ঞানচর্চার স্বাধীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশাসনিক দায়িত্ব বণ্টন, গবেষণা অনুদান, একাডেমিক নেতৃত্ব কিংবা শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণে রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, দক্ষতা ও ন্যায্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা কিংবা নির্দিষ্ট শিক্ষক প্যানেলের সমর্থক হিসেবে পরিচিতি একা কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের ভিত্তি হতে পারে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা যাচাই করতে হবে এবং প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি: বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন কোনো ব্যক্তি বা প্রশাসনের ইচ্ছামতো কাজ করার স্বাধীনতা নয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, যা আইন, নৈতিকতা ও জবাবদিহির সঙ্গে সম্পর্কিত। স্বায়ত্তশাসনের অর্থ জবাবদিহি থেকে মুক্তি নয়; বরং বাইরের অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থেকে নিজস্ব বিধি ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত হওয়ার সক্ষমতা। তাই রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, শিক্ষক প্যানেল কিংবা অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকেন্দ্র—কোনো পক্ষেরই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
অতীতের অন্যায়, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার অবশ্যই প্রয়োজন। তবে বিচার হতে হবে আইনের শাসন, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগের ভিত্তিতে। অভিযোগ উত্থাপিত হওয়া মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়; তদন্তাধীন অবস্থাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করাও ন্যায়সংগত নয়।
প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিগুলো—অভিযোগ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার অধিকার, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিচার এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকারের ব্যবস্থা—বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়ায় কার্যকর থাকতে হবে। অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয়ের মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে। তদন্তের গোপনীয়তা বজায় রেখেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।
যে বিশ্ববিদ্যালয় ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের শিক্ষা দেয়, তার নিজের প্রশাসনিক আচরণেও এসব মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকা অপরিহার্য। পাঠ্যসূচিতে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা থাকলেই একটি বিশ্ববিদ্যালয় গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে না; তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় এসব মূল্যবোধ দৈনন্দিন প্রাতিষ্ঠানিক আচরণে কতটা অনুসৃত হচ্ছে, তার মধ্য দিয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় হলো প্রশ্ন, বিতর্ক, মতভিন্নতা ও যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানের জায়গা। এখানে কোনো সিদ্ধান্ত কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণায় কিংবা তাৎক্ষণিক জনচাপের ভিত্তিতে চূড়ান্ত হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ, সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকার গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরিহার্য অংশ। কিন্তু সেই অধিকার অন্যের নিরাপত্তা, মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের অধিকার অস্বীকার করার অনুমতি দেয় না।
মব-সংস্কৃতি কেবল প্রকাশ্য সংঘাত বা দলবদ্ধ চাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক ও ডিজিটাল পরিসরে কাউকে লক্ষ্যবস্তু করা, যাচাইহীন অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া, ব্যক্তিগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা কিংবা দলবদ্ধভাবে কাউকে নীরব করে দেওয়ার প্রবণতাও মুক্তবুদ্ধির পরিবেশকে সংকুচিত করতে পারে। কোনো শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার নিষ্পত্তি হবে প্রাতিষ্ঠানিক বিধি ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ায়; ভয়ভীতি, সামাজিক চাপ কিংবা বিচারবহির্ভূত শাস্তির মাধ্যমে নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি সবাইকে একই মতের মানুষে পরিণত করার মধ্যে নয়; বরং ভিন্নমতের মানুষকে একই প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে জ্ঞানচর্চার সুযোগ দেওয়ার সক্ষমতায়। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন করাকে অবাধ্যতা, ভিন্নমতকে শত্রুতা এবং সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, সেখানে মুক্ত জ্ঞানচর্চা বিকশিত হতে পারে না। তাই মবের সংস্কৃতির বিপরীতে যুক্তি, প্রমাণ, সংলাপ ও ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন কোনো একক পক্ষের দায়িত্ব নয়। শিক্ষকসমাজকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাগত মর্যাদা, একাডেমিক স্বাধীনতা এবং সহকর্মীদের ন্যায্য অধিকার রক্ষায় সম্মিলিত অবস্থান গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকরা কেবল পাঠদানকারী নন; তাঁরা জ্ঞানচর্চার পথপ্রদর্শক, সমালোচনামূলক চিন্তার অনুশীলনকারী এবং সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেকের অংশ। তাই তাঁদের ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক আচরণেও নৈতিকতা, যুক্তিবাদ, সহনশীলতা এবং আত্মসমালোচনার দৃষ্টান্ত থাকা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদেরও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রশ্ন তোলা ও মতপ্রকাশের অধিকার চর্চার পাশাপাশি ভিন্নমতের সহপাঠী ও শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে হবে। গণতন্ত্রের প্রকৃত শিক্ষা কেবল নিজের মত প্রকাশে নয়, অন্যের ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারকে স্বীকার করার মধ্যেও নিহিত।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব ক্ষমতার প্রদর্শন নয়; বরং আইন, বিধি, যুক্তি ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে প্রাতিষ্ঠানিক সেবা ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া; কিন্তু সেই সহায়তার নামে একাডেমিক সিদ্ধান্ত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার ওপর অযৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা নয়।
বৃহত্তর সমাজেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটকে কেবল দলীয় বিরোধ কিংবা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে এর গভীরতর একাডেমিক ও মানবিক মাত্রা আড়ালে থেকে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা সংকুচিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমাজের প্রশ্ন করার ক্ষমতা, সত্য অনুসন্ধানের সক্ষমতা এবং নিজেদের ভুল সংশোধনের বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষা কোনো নির্দিষ্ট পেশাজীবী গোষ্ঠীর স্বার্থ নয়; এটি সমগ্র সমাজের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তারা অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে কী শিক্ষা গ্রহণ করে এবং সেই শিক্ষাকে কতটা কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে রূপ দিতে পারে, তার ওপর। কেবল নতুন প্রশাসন, নতুন শিক্ষক নেতৃত্ব কিংবা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না। প্রয়োজন এমন একটি কাঠামো, যেখানে নিয়োগ ও পদোন্নতি হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে, অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ায়, গবেষণা ও পাঠদান থাকবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, শিক্ষার্থীরা পাবেন নিরাপদ ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ এবং প্রশাসন থাকবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক।
এই পুনর্গঠন কোনো একদিনে সম্পন্ন হওয়ার বিষয় নয়। এর জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতিগত উদ্যোগ, প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা, অংশীজনদের সংলাপ এবং বাস্তবায়নের নিয়মিত মূল্যায়ন। সংস্কারের অগ্রগতি পরিমাপ করতে হবে কেবল ঘোষণার সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন জীবনে তার দৃশ্যমান প্রভাব দিয়ে। শিক্ষক কি রাজনৈতিক পরিচয়ের ভয় ছাড়াই পাঠদান ও গবেষণা করতে পারছেন? শিক্ষার্থী কি ভিন্নমত প্রকাশের জন্য নিরাপদ বোধ করছেন? প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কি বিধি ও প্রমাণের ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে? গবেষক কি যোগ্যতা ও কাজের মান অনুযায়ী সুযোগ পাচ্ছেন? এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে সংস্কার কতটা বাস্তব হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে আবার বিশ্ববিদ্যালয় করে তোলার অর্থ কোনো অতীত ব্যবস্থাকে অবিকল ফিরিয়ে আনা নয়। বরং অতীতের অর্জন ও ব্যর্থতা—উভয় অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও স্বাধীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক এবং জ্ঞাননির্ভর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য কোনো রাজনৈতিক শক্তির অনুগত নাগরিক তৈরি করা নয়; বরং এমন মানুষ তৈরি করা, যাঁরা প্রশ্ন করতে পারেন, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারেন এবং ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান করতে পারেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, কোনো শিক্ষক প্যানেলের নয়, কোনো প্রশাসকেরও নয়। এটি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও বৃহত্তর সমাজের জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান; একই সঙ্গে মানবসভ্যতার জ্ঞানভান্ডারে অবদান রাখার এক সার্বজনীন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর। এর শিক্ষকরা জ্ঞানচর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদার রক্ষক, শিক্ষার্থীরা এর বর্তমান ও ভবিষ্যতের নির্মাতা, আর প্রশাসন এর পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত। কেউই এর একক মালিক নন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বাংলাদেশের জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক জ্ঞানজগতের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ধারণ করে। একইভাবে বাংলাদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাস, অর্জন ও জ্ঞানচর্চার পরিসরকে জাতীয় উন্নয়ন এবং বিশ্বমানবতার অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে একাডেমিক যোগ্যতা, ক্ষমতার আধিপত্যের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং বিভাজনের পরিবর্তে মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান।
তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজের প্রতি আহ্বান—রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে পেশাগত মর্যাদা, একাডেমিক স্বাধীনতা, সহকর্মীর অধিকার এবং জ্ঞানচর্চার সার্বজনীন মূল্যবোধের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হোন।
শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান—প্রশ্ন করুন, প্রতিবাদ করুন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান; তবে যুক্তি, সহনশীলতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের নীতিকে সমুন্নত রাখুন। মনে রাখবেন, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল মতপ্রকাশের অধিকার শেখায় না; ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতিও গড়ে তোলে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান—ক্ষমতা প্রয়োগের আগে আইন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে যুক্তি এবং শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আগে ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করুন। রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান—বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার না করে জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন ও মুক্তবুদ্ধির স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকশিত হতে দিন। আর বৃহত্তর সমাজের প্রতি আহ্বান—বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটকে সাময়িক রাজনৈতিক অবস্থানের নিরিখে নয়, বরং একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করুন।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচানো মানে শুধু তার ভবন, হল, গ্রন্থাগার কিংবা প্রশাসনিক কাঠামোকে রক্ষা করা নয়। তাকে বাঁচানো মানে তার প্রশ্ন করার সাহসকে রক্ষা করা, ভিন্নমতের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা, জ্ঞান অনুসন্ধানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে সত্য বলার নৈতিক শক্তিকে অক্ষুণ্ণ রাখা।
যে বিশ্ববিদ্যালয় একদিন একটি জাতিকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজেরই প্রয়োজন মুক্তবুদ্ধি, ন্যায়বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার পুনর্জাগরণ। বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েরও প্রয়োজন একই আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধনের সাহস। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা কেবল শিক্ষকদের পেশাগত অধিকার কিংবা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের প্রশ্ন নয়; এটি একটি জাতির চিন্তা করার, প্রশ্ন করার, সত্য অনুসন্ধানের এবং নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্ষমতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত।
আজ তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরেকটি রাজনৈতিক বিজয় নয়; প্রয়োজন একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিজয়—যেখানে প্রতিশোধের পরিবর্তে ন্যায়বিচার, আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, ভয়ের পরিবর্তে স্বাধীনতা এবং মবের পরিবর্তে যুক্তির প্রতিষ্ঠা ঘটবে।
বিশ্ববিদ্যালয়কে মবের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না; আবার ক্ষমতার হাতে জিম্মি করেও রাখা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়কে ফিরতে হবে তার নিজস্ব বিবেকের কাছে—যেখানে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা থাকবে, ভিন্নমত মর্যাদা পাবে, ন্যায়বিচার সবার জন্য সমান হবে এবং জ্ঞানচর্চা কোনো রাজনৈতিক আনুগত্যের কাছে পরাধীন থাকবে না।
মবের মুখে নয়, বিবেকের আলোয় ফিরুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় যখন স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, তখনই একটি জাতি স্বাধীনভাবে তার ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে শেখে।
মনন’ গভীর চিন্তা, দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রতীক; আর ‘সূত্র’ পৃথক বিষয় ও আলোচনার অন্তর্নিহিত সম্পর্ক, সংযোগ ও ধারাবাহিকতাকে নির্দেশ করে। শব্দবন্ধটি বাংলা ভাষায় স্বাভাবিক, অর্থবহ ও স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ। এই নামের মাধ্যমে ধারাবাহিক ফিচারের প্রতিটি স্বতন্ত্র আলোচনা একটি বৃহত্তর বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। তাই ‘মননসূত্র’ কেবল পর্বের বিকল্প নাম নয়; এটি ফিচারটির নিজস্ব সম্পাদকীয় পরিচয় ও চিন্তাভিত্তিক বিন্যাসের প্রতিফলন। প্রকৃতপক্ষে, ’মননসূত্র’ শব্দবন্ধটি লেখকের নিজস্ব পছন্দ ও সৃজনশীল ভাষাবোধ থেকে নির্বাচিত। শব্দটি প্রচলিত না হলেও বাংলা ভাষার শব্দগঠন ও অর্থগত বিবেচনায় স্বাভাবিক, বোধগম্য এবং তাৎপর্যপূর্ণ।
–অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#বিশ্ববিদ্যালয় #ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় #বাংলাদেশেরউচ্চশিক্ষা #বিশ্ববিদ্যালয়সংস্কার #একাডেমিকস্বাধীনতা #শিক্ষকসমাজ #শিক্ষার্থীঅধিকার #বিশ্ববিদ্যালয়স্বায়ত্তশাসন #মবসংস্কৃতি #ন্যায়বিচার #মুক্তবুদ্ধি #উচ্চশিক্ষাসংকট #৫আগস্ট২০২৪ #শিক্ষাব্যবস্থা #অধিকারপত্র #UniversityEducation #AcademicFreedom #UniversityAutonomy #HigherEducationBangladesh #DhakaUniversity #UniversityReform #AcademicGovernance #ProceduralJustice #EducationReform #StudentRights #BangladeshEducation #PostAugust2024