03/01/2026 রাজনীতির পাঠশালা ও ইতিহাসের মলাট বদল: শিক্ষার রুপান্তরে একটি জাতির শ্বাসকষ্টের উপাখ্যান
Dr Mahbub
১ March ২০২৬ ০০:৪৯
-অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক (পর্ব ৬): শিক্ষা সংস্কার- মরীচিকা না বাস্তবতা
অধিকারপত্রের “শিক্ষা সংস্কার: মরীচিকা না বাস্তবতা” ধারাবাহিকের এই বিশেষ নিবন্ধটি একটি সুদীর্ঘ তাত্ত্বিক ও রূপক বিশ্লেষণ। এখানে আলোকপাত করা হয়েছে শিক্ষা কীভাবে রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হয়ে ওঠে এবং কীভাবে একটি জাতির মেরুদণ্ডকে রাজনৈতিক স্বার্থে বাঁকিয়ে দেওয়া হয়। এই পর্বে আমরা আলোচনা করব শিক্ষা সংস্কারের সেই কৌশলগুলো নিয়ে, যা কেবল কাগজের পরিকল্পনা নয়, বরং একটি জাতির আত্মপরিচয় ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড গড়ার হাতিয়ার।
দর্পণ ও শিকল: শিক্ষার বৈশ্বিক বনাম দেশীয় রাজনীতি
শিক্ষাকে বলা হয় একটি জাতির দর্পণ। কিন্তু বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই দর্পণের কারুকার্য ভিন্ন ভিন্ন বার্তা দেয়। উন্নত বিশ্বে শিক্ষা একটি ‘বৃহত্তর রাজনৈতিক এজেন্ডা’, যা রাষ্ট্রকে আগামীর প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্ব এনে দেওয়ার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। সেখানে রাজনীতি মানে হলো—কীভাবে কারিকুলামকে আরও বিজ্ঞানমনস্ক করা যায়, কীভাবে এআই (AI) যুগে শিশুদের টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়ানো যায়। তাদের কাছে শিক্ষা হলো ‘রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের মহাকাশযান’।
বিপরীতে, আমাদের মতো উন্নয়নশীল জনপদে এই ‘রাজনৈতিক এজেন্ডা’ শব্দটি এক শ্বাসরুদ্ধকর ও সংকীর্ণ অর্থ ধারণ করেছে। এখানে শিক্ষা যেন শাসকগোষ্ঠীর ইচ্ছার এক অনুগত দাস। রাজনীতির লক্ষ্য যখন হয় কেবল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা, তখন শিক্ষাব্যবস্থা হয়ে পড়ে সেই ক্ষমতার বৈধতা দেওয়ার একটি কারখানা। উন্নত বিশ্বে শিক্ষা যেখানে মানুষকে মুক্ত করে, আমাদের দেশে তা অনেক সময় চিন্তার জগতে শিকল পরিয়ে দেয়। এই বৈপরীত্যই আমাদের জাতীয় অগ্রগতির পথে প্রধান অন্তরায়।
মলাট বদলের খেলা: ইতিহাসের গোলকধাঁধা
আমাদের পাঠ্যপুস্তকগুলো যেন একেকটি রাজনৈতিক ইশতেহার। প্রতিবার যখন ক্ষমতার মসনদে রদবদল ঘটে, তখন ইতিহাসের মলাটও বদলে যায়। এটি কেবল তথ্যের পরিবর্তন নয়, এটি একটি প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক ভ্রান্তি তৈরির সুনিপুণ নকশা। একটি রূপক উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি তুলে ধ:রা হলো।
কল্পনা করুন একটি বিশাল অরণ্য, যেখানে একটি আদিবাসী গোষ্ঠী বাস করে। তাদের পূর্বপুরুষদের বীরত্বগাথা একটি পাথরের গায়ে খোদাই করা আছে। কিন্তু প্রতি ১০ বছর অন্তর অরণ্যের সর্দার বদলে যায় এবং নতুন সর্দার এসে আগের খোদাই করা পাথরটি ঘষে মুছে ফেলে সেখানে নিজের বংশের গুণগান লিখে দেয়। ফলে সেই গোষ্ঠীর শিশুরা বুঝতে পারে না তাদের প্রকৃত শেকড় কোথায়। তারা এক শেকড়হীন লতার মতো বেড়ে ওঠে, যাদের নিজস্ব কোনো পরিচয় নেই। আমাদের ইতিহাস বইগুলোও আজ সেই ঘষে ফেলা পাথরের মতো, যেখানে সত্যের চেয়ে ‘সুবিধাজনক আখ্যান’ বেশি গুরুত্ব পায়।
তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: হেজিমনি ও শিক্ষার দাসত্ব
ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসির ‘কালচারাল হেজিমনি’ (Cultural Hegemony) তত্ত্বটি এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শাসকশ্রেণী কেবল পুলিশ বা লাঠি দিয়ে শাসন করে না, তারা মানুষের মনের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। আর এই আধিপত্য বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার হলো শিক্ষা। যখন পাঠ্যপুস্তক থেকে মহানায়কদের নাম মুছে ফেলা হয় বা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে অতি-মানবিক করে তোলা হয়, তখন শিক্ষার্থীদের অবচেতনে এক ধরণের দাসত্ব গেঁথে দেওয়া হয়।
এই তাত্ত্বিক কাঠামোতে শিক্ষাকে ব্যবহার করা হয় ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর টুল হিসেবে। এর ফলে শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে শেখে না, বরং শিখতে থাকে কীভাবে অনুগত থাকতে হয়। এটি একটি জাতির জন্য ‘বৌদ্ধিক শ্বাসকষ্ট’ (Intellectual Suffocation)। যখন ফুসফুস অক্সিজেন হিসেবে কেবল মিথ্যা বা অর্ধসত্য গ্রহণ করে, তখন সেই জাতির মেরুদণ্ড সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তি হারায়।
প্রজন্মের বিভ্রম: কুয়াশায় ঢাকা ভবিষ্যৎ
ইতিহাসের এই ঘনঘন পরিবর্তন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এক বিশাল বিভ্রম তৈরি করছে। একজন শিক্ষার্থী যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক ধরণের ইতিহাস পড়ে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তার সম্পূর্ণ বিপরীত কিছু শোনে, তখন তার ভেতরে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। সে কোনো কিছুকেই আর বিশ্বাস করতে পারে না। এই ‘অবিশ্বাস’ থেকে জন্ম নেয় এক ধরণের নিস্পৃহতা (Apathy)। তরুণ সমাজ তখন দেশ গড়ার চেয়ে ব্যক্তিগত আখের গোছানোতে বেশি মত্ত হয়, কারণ তারা মনে করে ‘দেশ’ বা ‘ইতিহাস’ সবই আপেক্ষিক ও ক্ষমতার হাতিয়ার।
এনালজি: এটি অনেকটা এমন যে, একটি কম্পাসকে চুম্বক দিয়ে বারবার উত্তর-দক্ষিণ দিক বদলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে নাবিক দিশেহারা হয়ে সমুদ্রের মাঝখানে গোল গোল ঘুরতে থাকে, কিন্তু কখনোই তীরে পৌঁছাতে পারে না। আমাদের তরুণ প্রজন্ম আজ সেই দিশেহারা নাবিক, যাদের হাতে থাকা ইতিহাসের কম্পাসটি রাজনৈতিক চুম্বক দিয়ে বারবার বদলে দেওয়া হয়েছে।
উন্নত বিশ্বের পাঠ: ফিনল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের উদাহরণ
আমরা যদি ফিনল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের দিকে তাকাই, দেখব সেখানেও শিক্ষা একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা। কিন্তু সেই রাজনীতি হলো—কীভাবে শিক্ষককে সর্বোচ্চ সামাজিক মর্যাদা দেওয়া যায়। সেখানে কারিকুলাম বদলায় গবেষণার ভিত্তিতে, কোনো রাজনৈতিক নেতার ইচ্ছায় নয়। সেখানে ইতিহাস মানে হলো নির্মোহ সত্যের বিশ্লেষণ, যা থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতি সামনে এগোতে পারে। তারা তাদের শিশুদের ‘রোবট’ বানায় না, বরং ‘মুক্তচিন্তার মানুষ’ বানায়।

আমাদের দেশে ঠিক এর উল্টো। আমরা ‘শিক্ষিত বেকার’ ও ‘অনুগত কর্মী’ তৈরির এক কারখানায় পরিণত হয়েছি। আমাদের নীতিনির্ধারকরা শিক্ষার পেছনে বিনিয়োগকে খরচ মনে করেন, কিন্তু দামী দালান বানানোকে উন্নয়ন মনে করেন। অথচ দালান ভাঙা যায়, কিন্তু একটি পচে যাওয়া শিক্ষাব্যবস্থা পুরো জাতিকে কয়েকশ বছর পিছিয়ে দেয়।
সংস্কারের মরীচিকা বনাম বাস্তবতা
গত কয়েক দশকে আমরা অসংখ্য শিক্ষা কমিশন দেখেছি। কিন্তু কেন সেগুলো সফল হয়নি? কারণ প্রতিটি কমিশন ছিল শাসকগোষ্ঠীর ইচ্ছার প্রতিফলন। কোনো কমিশনই শিক্ষকের পেটের ক্ষুধা আর হৃদয়ের অবমাননার কথা বলেনি। শিক্ষকদের কান ধরে ওঠবস করানো বা রাজনৈতিক মিছিলের লাঠি হিসেবে ব্যবহার করার যে সংস্কৃতি আমরা গড়েছি, তা শিক্ষা সংস্কারকে চিরকাল একটি ‘মরীচিকা’ করে রাখবে।
শিক্ষা সংস্কার করতে হলে আগে রাজনীতির মানসিকতা সংস্কার করতে হবে। শিক্ষাকে ‘দাসত্ব’ থেকে মুক্ত করে ‘স্বাধীনতার’ বাহন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস যেন কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রশস্তি না হয়, বরং তা যেন হয় একটি জাতির সামগ্রিক সংগ্রামের দলিল।
প্রত্যাশিত মুক্তির পথ কোথায়?
আমাদের এই শ্বাসকষ্ট থেকে মুক্তি পেতে হলে শিক্ষাকে রাজনীতির সংকীর্ণ গলি থেকে বের করে প্রশস্ত রাজপথে আনতে হবে। ইতিহাসের পাতায় ধুলোবালি ও মিথ্যার যে আস্তরণ জমেছে, তা পরিষ্কার করার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে ইতিহাস বদলাবে না, বরং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ বদলাবে।
শিক্ষাগুরুদের সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া, মেধার যথাযথ মূল্যায়ন এবং নির্মোহ ইতিহাসের পাঠই পারে আমাদের এই ডুবন্ত তরীকে কূলে ভেড়াতে। মনে রাখতে হবে, একটি জাতি তখনই মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, যখন তার ক্লাসরুমের দেওয়ালে সত্যের প্রতিফলন ঘটে। মরীচিকার পেছনে না ছুটে আসুন আমরা বাস্তবতার কঠিন মাটিতে শিক্ষার ভিত্তি গড়ি।
কার্যকরী কৌশল ও বাংলাদেশে করণীয়
আসলে বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারকে এখন পরিবর্তন না বলে রূপান্তর হিসেবে াভিহিত করা যায়। অথ্যার্ৎ আমাদের শিক্ষার পরবর্তী স্তরে প্রবেশের টার্গেট পূরণে এগিয়ে যাওয়া। তাহলে প্রশ্ন, কেন এই রূপান্তর? সহজ উত্তর শিকড়ের টানে শিক্ষার রূপান্তর। আর এই রূপান্তর ঘটাতে হলে জাতীয় চেতনা ও প্রায়োগিক কৌশলের সমন্বয় সাধন করতে হয়।
শিক্ষা সংস্কারের আলাপ যখন ওঠে, তখন আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে শিক্ষা কেবল চাকরি পাওয়ার মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি জাতির ‘ডিএনএ’ তৈরির প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক মডেলগুলো যেমন আমাদের পথ দেখায়, তেমনি আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ও মাটির প্রয়োজনকেও অস্বীকার করার উপায় নেই। এই পর্বে আমরা এমন কিছু কৌশল নিয়ে আলোচনা করব যা আমাদের জাতীয় পরিচয় রক্ষা করে একটি আধুনিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
এই বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে যেন একজন শিক্ষার্থী স্কুল জীবন শেষ করেই কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ নিতে পারে।
পরিবর্তনের সময় এখনই
মনে রাখতে হবে, হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন ততক্ষণ কোনো কাজে আসবে না, যতক্ষণ না আমরা আমাদের কারিকুলামকে দেশীয় শিকড়ের সাথে মেলাতে পারছি এবং শিক্ষকদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দিতে পারছি। শিক্ষা সংস্কার মানে কেবল সিলেবাস বদল নয়, এটি একটি মানসিক বিপ্লব।
এই লেখনীগুলো হয়তো অনেকের কাছে তেতো লাগতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের সংস্কার চাইলে এই তিক্ত সত্যগুলো হজম করতে হবে। আমরা যদি আজ ব্যবস্থা না নিই, তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
বিশেষ ঘোষণা: পরবর্তী পর্বে আমরা আলোচনা করব: " শিক্ষা সংস্কার: নিয়ত, প্রক্রিয়া ও মরীচিকার রাজনীতি"। চোখ রাখুন আমাদের অধিকারপত্রের অনলাইন পাতায়।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শিক্ষা_রাজনীতি #ইতিহাসের_বিভ্রম #শিক্ষা_সংস্কার #অধ্যাপক_ড_মাহবুব #অধিকারপত্র #PoliticalAgenda #HistoryRevisionism #BangladeshEducation #TeacherDignity