মাওলানা আবুল কালাম আজাদের বৈপ্লবিক শিক্ষা দর্শন কীভাবে আধুনিক বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের প্রধান প্রেরণা হতে পারে—বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও উৎপাদনশীল জাতি গঠনের এক বিশদ বিশ্লেষণ, এবং বাংলাদেশের আলেম সমাজের জন্য একটি আত্মসমালোচনামূলক আহ্বান।
ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে জাগরণ
স্বাধীনতার প্রভাত কখনো নির্মল হয় না। ১৯৪৭ সালে ভারত যখন স্বাধীন হলো, তখন তার বুকজুড়ে ছিল রক্তাক্ত বিভাজনের দাগ, উদ্বাস্তু মানুষের দীর্ঘশ্বাস, ভাঙা অর্থনীতি, আর ভগ্ন শিক্ষাব্যবস্থা। প্রশ্ন ছিল একটাই—এ রাষ্ট্রকে কীভাবে আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক পথে দাঁড় করানো যাবে?স্বাধীনতার প্রভাত যখন রক্তাক্ত বিভাজনের স্মৃতি বুকে নিয়ে উদিত হলো, তখন ভারত নামের নবজাত রাষ্ট্রটির সামনে ছিল এক কঠিন প্রশ্ন—কীভাবে গড়ে উঠবে একটি আধুনিক, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক সমাজ? রাজনীতির মঞ্চে অনেক নেতা ছিলেন, কিন্তু জাতির আত্মাকে গঠনের দায়িত্ব এসে পড়ল একজন মনীষীর হাতে—মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। তিনি শুধু স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রীই (১৯৪৭–১৯৫৮) নন; তিনি ছিলেন পুরাতন ও নতুন শিক্ষাব্যবস্থার এক জীবন্ত সেতুবন্ধ। তাঁর জীবন ও কর্ম প্রমাণ করে, শিক্ষা কেবল শ্রেণিকক্ষের বিষয় নয়—এটি জাতির চেতনা নির্মাণের প্রকল্প।
রাজনীতির মঞ্চে অনেক নেতা ছিলেন। কিন্তু জাতির আত্মাকে গড়ার দায় এসে পড়ল একজন মনীষীর হাতে—মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী (১৯৪৭–১৯৫৮) হিসেবে তিনি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নেননি; তিনি শিক্ষা-ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রগঠনের কেন্দ্রে বসিয়েছিলেন।
তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল না কেবল শ্রেণিকক্ষের বিষয়। এটি ছিল জাতির মানসিক মুক্তির প্রকল্প। তিনি বুঝেছিলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা টেকসই হবে না যদি মানুষ মানসিকভাবে পরাধীন থাকে। তাই তিনি পশ্চিমা শিক্ষার কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করলেন, কিন্তু অন্ধ অনুকরণ করলেন না। উপমহাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে গড়লেন এক নতুন কাঠামো।
আজাদ পশ্চিমা শিক্ষার নতুন পদ্ধতি ও কৌশল গ্রহণ করে তাকে উপমহাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তাঁর সেই দূরদর্শী চিন্তা আজ বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের প্রেক্ষাপটেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
আজ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন, কিন্তু সংকট কম নয়। জনসংখ্যা, বৈষম্য, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, বিশ্বায়নের চাপ—সব মিলিয়ে শিক্ষা আবারও রাষ্ট্রগঠনের কেন্দ্রে ফিরে এসেছে। এই মুহূর্তে আজাদের শিক্ষা-দর্শন আমাদের জন্য শুধু ইতিহাস নয়, একটি কার্যকর রূপরেখা।
ঘরোয়া শিক্ষার্থী থেকে জাতির শিক্ষানায়ক
আজাদের শিক্ষাজীবন ছিল ব্যতিক্রমী। তিনি কোনো প্রথাগত বিদ্যালয়ে পড়েননি। ছিলেন ঘরোয়া শিক্ষার্থী, স্বশিক্ষিত এক বিস্ময়। পারস্য, আরবি, উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি—ভাষায় তাঁর দখল ছিল প্রবাদপ্রতিম। কৈশোরেই সম্পাদনা করেছেন ‘আল-মিসবাহ’ ও ‘লিসান-উস-সিদক’।
ধর্মীয় ঐতিহ্যে বেড়ে উঠলেও তাঁর মন ছিল প্রশ্নমুখর। রক্ষণশীল পারিবারিক পরিবেশ তাঁকে থামাতে পারেনি। পরে তিনি লিখেছেন: “I could not reconcile myself with the prevailing customs and beliefs… I felt that I must find the truth for myself.”
এই আত্মসন্ধানই তাঁকে আধুনিক শিক্ষাচিন্তার পথিকৃৎ করে তোলে। তিনি দেখালেন—ঐতিহ্যকে সম্মান করেও মুক্তচিন্তা সম্ভব। শিকড়ে থেকেও আকাশমুখী হওয়া যায়। বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের প্রথম শিক্ষা এখানেই: প্রশ্ন করতে শেখানো ছাড়া কোনো শিক্ষা আধুনিক নয়।
শিক্ষা মানে মানুষ সৃষ্টি
আজাদের একটি বিখ্যাত বক্তব্য— “The central purpose of our Five Year Plans is not the production of material wealth but the creation of human beings.” —এই কথার ভেতরে তাঁর পুরো দর্শন লুকিয়ে আছে। উন্নয়ন মানে কেবল অবকাঠামো নয়; উন্নয়ন মানে চরিত্র, মূল্যবোধ, চিন্তাশক্তির বিকাশ।
আজ বাংলাদেশের উন্নয়নচিত্রে সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎ আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—মানুষ তৈরির প্রকল্প কতটা এগিয়েছে? আমরা কি এমন নাগরিক তৈরি করছি, যারা চিন্তা করতে পারে, সহনশীল, নৈতিক, দক্ষ?
শিক্ষা যদি শুধু চাকরির প্রস্তুতি হয়, তবে তা অসম্পূর্ণ। শিক্ষা মানুষকে আত্মমর্যাদা দেয়, বিচারবোধ দেয়, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা শেখায়।
ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয় ঐক্যের শিক্ষা
আজাদের দৃষ্টিতে শিক্ষা ছিল জাতীয় ঐক্যের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। ইতিহাস, নাগরিকশাস্ত্র, ভূগোল ও সাহিত্যভিত্তিক পাঠ্যপুস্তকের মাধ্যমে তিনি ‘Unity in Diversity’-এর চেতনা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি বলতেন, “ভারতবর্ষের হিন্দু ও মুসলমান দুটি চোখ—একটি হারালে মুখের সৌন্দর্য নষ্ট হয়।” এটি ছিল না কেবল কাব্যিক উক্তি; এটি ছিল তাঁর রাষ্ট্রদর্শন। তিনি বলতেন, ধর্মীয় পরিচয় রাষ্ট্রের নাগরিক পরিচয়ের বাধা হতে পারে না। শিক্ষা এমন হতে হবে, যা মানুষকে সহাবস্থানের শিক্ষা দেয়।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায়—যেখানে সামাজিক বিভাজন, মতভেদ, এবং কখনো কখনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা দেয়—এই ঐক্যের শিক্ষা আরও জরুরি। শিক্ষা যদি বিভাজন বাড়ায়, তবে তা জাতিকে দুর্বল করে। শিক্ষা যদি সহনশীলতা শেখায়, তবে তা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে।
ধ্বংসস্তূপের ভেতর আধুনিকতার চার স্তম্ভ: আজাদের নির্মাণকৌশল
স্বাধীনতার পর তিনি শিক্ষাকে দাঁড় করালেন চারটি দৃঢ় স্তম্ভের ওপর। এই চার স্তম্ভ আজও বাংলাদেশের জন্য প্রাসঙ্গিক। স্বাধীনতার পর ভারত ছিল নিরক্ষরতা, দারিদ্র্য, সাম্প্রদায়িক ক্ষত আর উপনিবেশিক কাঠামোর ভারে ন্যুব্জ। আজাদ শিক্ষাকে দাঁড় করালেন আধুনিকতার চার দৃঢ় স্তম্ভের ওপর।
স্তম্ভ ১. সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা ও নিরক্ষরতা দূরীকরণ
তাঁর বিশ্বাস ছিল পরিষ্কার—গণতন্ত্র টিকবে তখনই, যখন নাগরিক শিক্ষিত হবে। তিনি বলেছিলেন:“The central purpose of our Five Year Plans is not the production of material wealth but the creation of human beings…”
“Human beings”—এই শব্দটাই তাঁর দর্শনের কেন্দ্র।
১৯৪৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কমিশন, পরে মাধ্যমিক শিক্ষা কমিশন। কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা শিক্ষা বোর্ডে সর্বজনীন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ও প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার ওপর জোর। নারীশিক্ষাকে বিশেষ অগ্রাধিকার। তিনি জানতেন, শুধু স্কুল খুললে হবে না। জনগণের চেতনায় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা জাগাতে হবে। শিক্ষা তাঁর কাছে ছিল জনআন্দোলন।
বাংলাদেশে আজও নিরক্ষরতা, ঝরে পড়া, প্রাথমিকের মান—এই তিন প্রশ্ন রয়ে গেছে। আমরা কি প্রাথমিক শিক্ষা সত্যিই সর্বজনীন ও মানসম্মত করেছি? নাকি কেবল ভর্তি হার বাড়িয়ে স্বস্তি নিচ্ছি?
স্তম্ভ ২. সমঅধিকার ও সামাজিক ন্যায়
ভারতীয় সমাজে বর্ণ, শ্রেণি, লিঙ্গ বৈষম্য ছিল গভীর। আজাদ শিক্ষাকে দেখেছিলেন সামাজিক গতিশীলতার ইঞ্জিন হিসেবে।
তিনি প্রস্তাব দেন:
- নারীশিক্ষা সম্প্রসারণ
- কৃষিশিক্ষা, কারুশিল্প, ক্রীড়া অন্তর্ভুক্তি
- বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত পাঠ্যসামগ্রী
বাংলাদেশেও প্রশ্নটি একই: শিক্ষা কি সত্যিই সামাজিক ন্যায়ের হাতিয়ার? নাকি শহর–গ্রাম, ইংরেজি–বাংলা মাধ্যম, কোচিং–বিহীন শিক্ষার্থীর ব্যবধান আরও বাড়ছে?
আজাদের শিক্ষা ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক। আমরা কি অন্তর্ভুক্তিকে কেবল স্লোগান বানিয়েছি?
স্তম্ভ ৩. তিন-ভাষা সূত্র: পরিচয় ও বিশ্বসংযোগ
উপনিবেশ-পরবর্তী আবেগে ইংরেজিকে পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি। তিনি বলেছিলেন—আঞ্চলিক ভাষা থাকবে, জাতীয় সংযোগের ভাষা থাকবে, আর আন্তর্জাতিক জ্ঞানসংযোগের জন্য ইংরেজিও থাকবে।
এটি ছিল সংঘাত নয়, ভারসাম্যের দর্শন।
বাংলাদেশে ভাষা-পরিচয় আমাদের অস্তিত্বের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি ইংরেজিকে দক্ষতার ভাষা হিসেবে শেখাচ্ছি, নাকি পরীক্ষার ভয়ের ভাষা বানিয়ে ফেলেছি? ভাষা কি সুযোগের সেতু, নাকি শ্রেণিবিভেদের দেয়াল?
স্তম্ভ ৪. বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির সমন্বয়
আজাদ বলেছিলেন: “It appears to me that increasing emphasis will have to be placed on providing higher education in the field of agriculture, medicine, engineering, science and technology.”
তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়:
- University Grants Commission
- All India Council for Technical Education
- Indian Council for Cultural Relations
- Council of Scientific and Industrial Research
- ১৯৫১ সালে প্রথম Indian Institute of Technology Kharagpur
এখানে লক্ষ্য করুন—তিনি শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বানাননি; পাশাপাশি সংস্কৃতি একাডেমি, শিল্প ও সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। তাঁর দৃষ্টিতে:
- বিজ্ঞান দেবে যুক্তি
- প্রযুক্তি দেবে অর্থনৈতিক শক্তি
- সংস্কৃতি দেবে নৈতিকতা ও পরিচয়
বাংলাদেশে আমরা কি এই সমন্বয় করছি? নাকি বিজ্ঞান বনাম মানবিক—এই বিভাজনে নিজেদের আটকে ফেলেছি?
শিক্ষক: পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দু — আজাদের দৃষ্টিতে শিক্ষার সংস্কারের প্রাণস্পন্দন
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের শিক্ষাদর্শে যদি একটি কেন্দ্রবিন্দু খুঁজতে হয়, তবে সেটি নিঃসন্দেহে “শিক্ষক”। তাঁর কাছে শিক্ষা কোনো দালানকোঠা, নীতিপত্র বা পাঠ্যবইয়ের সমষ্টি নয়; শিক্ষা ছিল এক জীবন্ত সম্পর্ক—শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে জাগ্রত চেতনার সংলাপ। আজাদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণ হচ্ছেন শিক্ষক। তাঁদের মর্যাদা, বেতন ও প্রশিক্ষণ উন্নত না হলে কোনো সংস্কার টেকসই হবে না । তিনি নিজেও ছিলেন এক আদর্শ শিক্ষক—যিনি যা বলতেন, তা নিজে পালন করতেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বিশ্বাস করতেন—“No reform in education can be effective without empowering the teachers; and no policy can be implemented successfully without taking them fully on board.” এই উক্তিটি কেবল প্রশাসনিক বক্তব্য নয়; এটি ছিল তাঁর গভীর উপলব্ধি। স্বাধীনতার পর ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল উপনিবেশিক কাঠামোর ভারে ন্যুব্জ। তিনি জানতেন, কেবল কমিশন গঠন বা নীতিমালা প্রণয়ন করে পরিবর্তন আনা যাবে না। পরিবর্তনের আসল কারিগর হচ্ছেন শিক্ষক—যাঁরা শ্রেণিকক্ষে ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরি করেন।
আজাদের মতে, শিক্ষক যদি অনুপ্রাণিত না হন, সম্মান না পান, আর্থিক নিরাপত্তা না পান, তবে শিক্ষাব্যবস্থা প্রাণহীন হয়ে পড়বে। তাই তিনি শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, উপযুক্ত বেতন এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন । তাঁর বিশ্বাস ছিল—শিক্ষকের দক্ষতা ও চরিত্রই শিক্ষার মান নির্ধারণ করে।
তিনি শিক্ষককে কেবল পাঠদাতা হিসেবে দেখেননি; দেখেছিলেন জাতির নৈতিক অভিভাবক হিসেবে। তাঁর ভাষণে বারবার উঠে এসেছে যে শিক্ষা কেবল জ্ঞানার্জন নয়, এটি চরিত্রগঠন। আর সেই চরিত্রগঠনের প্রথম দায়িত্ব শিক্ষকের।
আজাদ নিজেও ছিলেন এক আদর্শ শিক্ষক-চিন্তক। তিনি যা প্রচার করতেন, তা নিজের জীবনে ধারণ করতেন। তাঁর বহুভাষাজ্ঞান, দর্শনচর্চা এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা শিক্ষকদের জন্য এক জীবন্ত উদাহরণ।
আজকের প্রেক্ষাপটে তাঁর এই দর্শন আরও প্রাসঙ্গিক। যখন শিক্ষাব্যবস্থা নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে—ডিজিটাল বিভাজন, মানের বৈষম্য, নৈতিক অবক্ষয়—তখন আজাদের সেই কণ্ঠ আবার স্মরণ করিয়ে দেয়: শিক্ষা সংস্কারের আসল সূচনা হয় শিক্ষককে শক্তিশালী করার মাধ্যমে। নীতিপত্র পথ দেখায়, কিন্তু শিক্ষকই পথ নির্মাণ করেন।
পাঠ্যক্রমে মানবিকতা — পরীক্ষামুখী নয়, জীবনমুখী: আজাদের শিক্ষাদর্শে জ্ঞান ও চরিত্রের সমন্বয়
মাওলানা আজাদের কাছে পাঠ্যক্রম কখনোই কেবল তথ্যের তালিকা ছিল না। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'India Wins Freedom' ও 'Ghubar-e-Khatir' পড়লে বোঝা যায়, তিনি শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে মন ও চরিত্র গঠনকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি প্রাথমিক স্তরে ‘Learning by doing’ বা হাতে-কলমে শিক্ষার ওপর জোর দিতেন। তিনি ইতিহাস পড়ানোকে কেবল অতীত জানা নয়, বরং সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার শিক্ষা হিসেবে দেখতেন।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের কাছে পাঠ্যক্রম কখনোই কেবল বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের তালিকা ছিল না; এটি ছিল একটি জাতির নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক গঠনপ্রকল্প। তাঁর লেখনী—বিশেষত India Wins Freedom ও Ghubar-e-Khatir—পাঠ করলে বোঝা যায়, শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর ভাবনা ছিল গভীরভাবে মানবিক, মুক্তচিন্তামূলক ও বহুত্ববাদী।
প্রাথমিক স্তরে ‘learning by doing’, মাধ্যমিকে দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানসমৃদ্ধ গবেষণা—এই স্তরভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাঁর পাঠ্যক্রম সংস্কারের মূল কথা । নারীশিক্ষা, কৃষিশিক্ষা, কারুশিল্প, ক্রীড়া ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত পাঠ্যসামগ্রী প্রণয়নেও তিনি গুরুত্ব দেন।
তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের মন ও চরিত্র গঠন। তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে তিনি বলেন: “The central purpose of our Five Year Plans is not merely the production of material wealth but the creation of human beings; and for that, right education is more important than the development of agriculture, industry or trade.” এই উক্তির ভেতরেই লুকিয়ে আছে তাঁর পাঠ্যক্রম দর্শনের মূল কথা। শিক্ষা যদি কেবল অর্থনৈতিক উৎপাদনের যন্ত্র হয়ে ওঠে, তবে তা জাতিকে আত্মিকভাবে শূন্য করে দেয়। তাই তিনি পাঠ্যক্রমে মানবিক মূল্যবোধ, নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক চেতনা সংযোজনের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি ইতিহাস, নাগরিকশাস্ত্র, ভূগোল ও সাহিত্যভিত্তিক পাঠ্যপুস্তককে জাতীয় সংহতি গঠনের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন । তাঁর বিশ্বাস ছিল—সঠিক পাঠ্যসামগ্রী তরুণ প্রজন্মের মধ্যে “unity in diversity”-এর বোধ সৃষ্টি করতে পারে। তাঁর দৃষ্টিতে ইতিহাস পড়ানো মানে কেবল অতীত জানা নয়; বরং সহাবস্থান, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার শিক্ষা দেওয়া।
Ghubar-e-Khatir-এ তিনি মানবমনের স্বাভাবিক অনুসন্ধিৎসা ও স্বাধীন চিন্তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। রুশো-প্রভাবিত তাঁর শিক্ষাদর্শে শিশু নিজস্ব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সত্য অনুধাবনের ক্ষমতা রাখে । ফলে তিনি প্রাথমিক স্তরে “learning by doing”-এর পক্ষে ছিলেন; মাধ্যমিকে দক্ষতা ও নৈতিকতার সমন্বয়; বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ।
তিনি পাঠ্যক্রমে নারীশিক্ষা, কৃষিশিক্ষা, কারুশিল্প, শারীরিক শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার ওপর বিশেষ জোর দেন । তাঁর কাছে সংগীত, নাটক, শিল্পকলা কেবল বিনোদন নয়—মানুষের সৃজনশীল ও নৈতিক বিকাশের অপরিহার্য উপাদান। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তিনি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত পাঠ্যসামগ্রী তৈরির কথাও বলেন —যা তাঁর অন্তর্ভুক্তিমূলক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আজাদ পাঠ্যক্রমকে ধর্মীয় সংকীর্ণতার বাইরে নিয়ে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈশ্বিক নাগরিকত্বের ভিত্তিতে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে, শিক্ষার একটি মৌলিক লক্ষ্য হওয়া উচিত জাতীয় সংহতি ও ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা ।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও প্রাসঙ্গিক। যখন পাঠ্যক্রম প্রায়শই কেবল পরীক্ষামুখী হয়ে পড়ে, তখন আজাদের মানবিক আহ্বান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষা যদি মানুষ তৈরি না করে, তবে তা কেবল তথ্যের স্তুপ। আর মানবিকতা ছাড়া কোনো পাঠ্যক্রম কখনোই আধুনিক হতে পারে না।
ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিকতার সমন্বয়
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক বিজ্ঞান পরস্পরের শত্রু নয়। আজাদের শিক্ষাচিন্তার সবচেয়ে অনন্য দিক ছিল—তিনি কখনোই ইসলামী ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখেননি। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, এই দুই ধারার সৃজনশীল সমন্বয়ই একটি সুস্থ ও শক্তিশালী জাতি গঠনের পূর্বশর্ত।
তিনি নিজেই ছিলেন ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত—আরবি, ফার্সি, কুরআনিক তাফসির, ফিকহ ও হাদিসে পারদর্শী। কিন্তু একইসঙ্গে স্বশিক্ষায় অর্জন করেছিলেন পাশ্চাত্য দর্শন, ইতিহাস ও রাজনৈতিক চিন্তার গভীর জ্ঞান। তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখায় তিনি স্বীকার করেন যে পারিবারিক রক্ষণশীল পরিবেশ তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি; তিনি নিজেই সত্যের অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। তাঁর ভাষায়: “I could not reconcile myself with the prevailing customs and beliefs… I felt that I must find the truth for myself.” এই আত্মদর্শনের ভেতরেই নিহিত আছে তাঁর শিক্ষা-সমন্বয়ের সূত্র। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—অন্ধ অনুকরণ যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি অন্ধ প্রত্যাখ্যানও সমাধান নয়।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের শিক্ষাচিন্তা: মানুষ গড়ার প্রকল্প
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের কাছে শিক্ষা কখনোই কেবল একটি প্রশাসনিক খাত ছিল না। এটি ছিল জাতি গঠনের নৈতিক ভিত্তি, মানসিক মুক্তির পথ এবং একটি সভ্যতার আত্মনির্মাণের প্রক্রিয়া। তিনি শিক্ষাকে দেখেছিলেন এক সমন্বিত দৃষ্টিতে, যেখানে মানবিকতা, যুক্তিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। তাঁর ভাষণ, প্রবন্ধ ও গ্রন্থজুড়ে এই বিশ্বাসের স্পষ্ট ছাপ পাওয়া যায়। শিক্ষা তাঁর কাছে কেবল বিদ্যালয়ের চার দেয়ালের ভেতরের কার্যক্রম নয়; এটি ছিল জাতির চেতনা নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার।
তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা সংস্কার মানে কেবল ভবন নির্মাণ, নীতিমালা প্রণয়ন বা নতুন পাঠ্যবই প্রকাশ নয়। শিক্ষা সংস্কার আসলে মানুষ গড়ার প্রকল্প। তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি—“সঠিক শিক্ষা কৃষি বা শিল্পের উন্নয়নের চেয়েও বেশি জরুরি”—আজও গভীর তাৎপর্য বহন করে। তিনি জানতেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন দৃশ্যমান, কিন্তু নৈতিক ও মানসিক উন্নয়নই স্থায়ী। বিজ্ঞানহীন সংস্কৃতি স্থবির হয়ে পড়ে, আবার সংস্কৃতিহীন বিজ্ঞান হয়ে উঠতে পারে বিপজ্জনক। তাই তিনি সমন্বয়ের কথা বলেছেন। বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের ক্ষেত্রেও এই ভারসাম্য অপরিহার্য—উন্নয়ন ও মানবিকতা, প্রযুক্তি ও নৈতিকতা, দক্ষতা ও মূল্যবোধের একত্র যাত্রা।
আজাদের জন্ম এক কঠোর ওলামা পরিবারে। তাঁর পিতা মাওলানা খৈরুদ্দিন ছিলেন প্রভাবশালী আলেম। শৈশব থেকেই তিনি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় শিক্ষায় দীক্ষিত হন। কিন্তু এই পরিবেশ তাঁর চিন্তাকে আবদ্ধ করতে পারেনি। পিতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখেও তিনি নিজের স্বাধীন চিন্তার অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখেন। তিনি লিখেছিলেন, “I felt that I must find the truth for myself.” এই বাক্যের মধ্যে তাঁর বৌদ্ধিক সাহসের পরিচয় নিহিত। সত্যকে নিজে অনুসন্ধান করার এই মানসিকতাই তাঁকে রক্ষণশীলতার সীমানা পেরিয়ে আধুনিক রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত থেকেও আকাশের দিকে ডানা মেলা সম্ভব।
আজাদের শিক্ষাচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল “মানুষ সৃষ্টি”। তাঁর বিখ্যাত বক্তব্য—“The central purpose of our Five Year Plans is not the production of material wealth but the creation of human beings”—শুধু একটি নীতিগত ঘোষণা নয়; এটি ছিল তাঁর দার্শনিক অবস্থান। তিনি উন্নয়নকে কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে প্রকৃত উন্নয়ন মানে মানুষের চরিত্র গঠন, মূল্যবোধের বিকাশ, চেতনার উন্মেষ। একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিকরা নৈতিকভাবে দৃঢ়, যুক্তিবোধে পরিপক্ব এবং দায়িত্বশীল।
তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা সমাজের বিভাজন কমাতে পারে। ইতিহাস, নাগরিকশাস্ত্র, ভূগোল ও সাহিত্য—এই বিষয়গুলোকে তিনি কেবল তথ্যের ভাণ্ডার হিসেবে দেখেননি; বরং জাতীয় সংহতি গঠনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন। “Unity in diversity” বা বৈচিত্র্যের ভেতর ঐক্য—এই ধারণা তাঁর শিক্ষাদর্শে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। তাঁর মতে, শিক্ষা মানুষকে সহনশীলতা শেখাবে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা শেখাবে, নাগরিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি স্থাপনে শিক্ষার ভূমিকা তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয় ছিল তাঁর চিন্তার আরেকটি মূল স্তম্ভ। রক্ষণশীল ইসলামী পরিবেশে বেড়ে উঠেও তিনি আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিকে অস্বীকার করেননি। বরং তিনি মূল্যায়ন করেছেন, গ্রহণ করেছেন এবং প্রয়োজনমতো রূপান্তর করেছেন। তাঁর কল্পনায় ছিল এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে ইসলামী নৈতিকতা, ভারতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং পশ্চিমা বৈজ্ঞানিক চিন্তা মিলেমিশে এক নতুন সৃজনশীল ধারার জন্ম দেয়। তাঁর দৃষ্টিতে আধুনিকতা মানে আত্মপরিচয় বিসর্জন নয়; বরং নিজস্ব মূল্যবোধকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো।
সর্বজনীন ও গণমুখী শিক্ষার প্রশ্নেও আজাদ ছিলেন অগ্রণী। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, নিরক্ষরতা দূর না হলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে না। তাই প্রাথমিক শিক্ষার সর্বজনীনীকরণ, প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা এবং নারীশিক্ষার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। শিক্ষা হতে হবে সবার জন্য—শহর বা গ্রাম, নারী বা পুরুষ, ধনী বা দরিদ্র—কোনো বিভাজন নয়। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল অধিকার, সুবিধা নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শিক্ষা যদি সমানভাবে বিস্তৃত না হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্ব তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। কৃষি, চিকিৎসা, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে উচ্চশিক্ষার প্রসারে তিনি জোর দেন। তাঁর কাছে বিজ্ঞান ছিল অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ভিত্তি। কিন্তু এই বিজ্ঞানচিন্তা কখনোই নৈতিকতাবর্জিত ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন মানবকল্যাণমুখী বিজ্ঞান—যে বিজ্ঞান মানুষের জীবনমান উন্নত করবে, কিন্তু মানবিকতা নষ্ট করবে না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের মর্যাদা ও কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
শিক্ষক ও পাঠ্যক্রমের প্রশ্নেও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুস্পষ্ট। তাঁর মতে, শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্র শিক্ষক। শিক্ষককে শক্তিশালী না করলে কোনো সংস্কার কার্যকর হতে পারে না। শিক্ষক শুধু পাঠদানকারী নন; তিনি চরিত্রগঠনের পথপ্রদর্শক। তাই তাঁদের মর্যাদা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। পাঠ্যক্রমের ক্ষেত্রেও তিনি ভারসাম্য চেয়েছিলেন। প্রাথমিক স্তরে হাতে-কলমে শেখা, মাধ্যমিকে দক্ষতার বিকাশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চা—এই স্তরভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর চিন্তার অংশ ছিল। তাঁর মতে, শিক্ষা মুখস্থবিদ্যার সমষ্টি নয়; এটি সৃজনশীলতা, যুক্তিবোধ ও নৈতিকতার সমন্বিত বিকাশ।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের শিক্ষাচিন্তা মূলত মুক্তি ও মানবতার দর্শন। তিনি শিক্ষা দেখেছিলেন মানুষ গড়ার মাধ্যম হিসেবে, জাতীয় ঐক্যের শক্তি হিসেবে, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সেতুবন্ধ হিসেবে এবং নৈতিক রাষ্ট্রগঠনের ভিত্তি হিসেবে। তাঁর দৃষ্টিতে শিক্ষা কেবল পেশাগত প্রস্তুতি নয়; এটি জাতির আত্মা নির্মাণের প্রক্রিয়া। তাই তাঁর চিন্তা আজও প্রাসঙ্গিক। যখন শিক্ষা প্রায়শই পরীক্ষামুখী বা বাজারমুখী হয়ে পড়ে, তখন তাঁর আহ্বান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—মানুষ গড়ার প্রকল্প ছাড়া কোনো শিক্ষা পূর্ণতা পায় না।
বাংলাদেশের আলেম সমাজের জন্য আজাদের শিক্ষা: পরিচয়ের ভেতর থেকেই রূপান্তর
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ-এর জীবন শুধু একটি রাষ্ট্রের শিক্ষা নীতির গল্প নয়; এটি একজন আলেমের আত্মরূপান্তরের গল্প। তিনি ছিলেন ঐতিহ্যবাহী ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত। তাঁর পিতা ছিলেন প্রভাবশালী আলেম। তাঁর শৈশব কেটেছে কঠোর ধর্মীয় পরিবেশে। কিন্তু সেই পরিচয় তাঁকে সংকীর্ণ করেনি; বরং দিয়েছে গভীর নৈতিক ভিত্তি।
আজাদ ছিলেন আলেম, কিন্তু সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি রাজনীতি করেছেন, শিক্ষা কমিশন গড়েছেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন।
আজাদ লিখেছিলেন—নিজেকে প্রশ্ন করার সাহস থাকতে হবে। এই সাহস ছাড়া সংস্কার সম্ভব নয়। বাংলাদেশের তথাকথিত “মাওলানারা”—যারা মাদ্রাসা, মসজিদ ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন—তাঁদের জন্য আজাদের জীবন একটি শক্তিশালী আয়না।আজাদের জীবন থেকে বাংলাদেশি আলেমদের জন্য শিক্ষা নিম্নরূপ:
প্রথম শিক্ষা হলো: ধর্মীয় শিক্ষা আধুনিকতার শত্রু নয়।
আজাদ দেখিয়েছেন, ইসলামী ঐতিহ্যের ভেতর থেকেও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা ও ধর্মনিরপেক্ষ নীতির পক্ষে দাঁড়ানো যায়। তিনি ধর্মীয় জ্ঞানকে ব্যবহার করেছেন বিভাজনের জন্য নয়, ঐক্যের জন্য।
দ্বিতীয় শিক্ষা: আলেম মানে কেবল ফিকহের ব্যাখ্যাতা নয়; সমাজনির্মাতা।
আজাদ সাংবাদিকতা করেছেন, জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন, শিক্ষা কমিশন গঠন করেছেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি মসজিদের মিম্বরে সীমাবদ্ধ থাকেননি; রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন।
বাংলাদেশের আলেম সমাজ যদি শিক্ষা সংস্কারের অংশীদার না হন, বরং বাইরে দাঁড়িয়ে সমালোচক হয়ে থাকেন, তবে জাতি বিভক্ত হবে। কিন্তু যদি তাঁরা—
- মাদ্রাসায় বিজ্ঞান, গণিত ও প্রযুক্তির মানোন্নয়নে উদ্যোগী হন,
- ধর্মীয় শিক্ষায় যুক্তিবোধ ও মানবিকতা জোরদার করেন,
- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও নাগরিক দায়িত্বের শিক্ষা দেন,
- তরুণ প্রজন্মকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করার আহ্বান জানান,
তবে তাঁরা হতে পারেন সমাজ রূপান্তরের প্রধান শক্তি।
তৃতীয় শিক্ষা: অন্ধ অনুকরণ নয়, অন্ধ প্রত্যাখ্যানও নয়।
আজাদ পশ্চিমা জ্ঞান গ্রহণ করেছেন, কিন্তু আত্মপরিচয় বিসর্জন দেননি। বাংলাদেশের আলেম সমাজের জন্য এটিই ভারসাম্যের পথ—ঐতিহ্য রক্ষা করতে হলে তাকে সময়োপযোগী করতে হবে। আধুনিকতাকে গ্রহণ করতে হলে তাকে নৈতিক ভিত্তিতে দাঁড় করাতে হবে।
চতুর্থ শিক্ষা: সংকীর্ণতা নয়, আত্মসমালোচনা।
আজাদ লিখেছিলেন—“I felt that I must find the truth for myself.” এই বাক্যের ভেতরে আছে সাহস। নিজের বিশ্বাসকেও প্রশ্ন করার সাহস। বাংলাদেশে ধর্মীয় নেতৃত্ব যদি আত্মসমালোচনার এই চর্চা গড়ে তোলে, তবে সমাজে জ্ঞানের সংস্কৃতি তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় কথা, আজাদ দেখিয়েছেন—একজন আলেম চাইলে কেবল ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রতীক নন; তিনি হতে পারেন জাতির বৌদ্ধিক ও নৈতিক দিকনির্দেশক।
বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কার তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন—
- সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষা মুখোমুখি নয়, সংলাপে যুক্ত হবে;
- আলেম সমাজ জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার হবে;
- ধর্মীয় শিক্ষা মানবিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেবে।
আজাদের জীবন আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে যায়: আমরা কি ধর্মকে দেয়াল বানাব, নাকি সেতু?
চূড়ান্ত প্রতিফলন: একজন মাওলানার স্বপ্ন, আমাদের দায়িত্ব
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ-এর জন্মদিন ১১ নভেম্বর ভারতে জাতীয় শিক্ষা দিবস হিসেবে পালিত হয়। কিন্তু তাঁর দর্শন কোনো এক দেশের সীমায় আবদ্ধ নয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য তা প্রাসঙ্গিক।
তিনি শিখিয়েছেন— শিক্ষা যদি কেবল বিজ্ঞান শেখায়, তবে তা যান্ত্রিক। শিক্ষা যদি কেবল সংস্কৃতি শেখায়, তবে তা স্থবির। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির সমন্বিত শিক্ষা—সেই শিক্ষাই জাতিকে শক্তিশালী, বহুত্ববাদী ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত করে।
বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার আজ এক ক্রান্তিলগ্নে। প্রশ্ন একটাই—আমরা কি দালানকোঠা গড়ব, নাকি মানুষ? আজাদের উত্তর স্পষ্ট ছিল। এখন উত্তর দেওয়ার পালা আমাদের।
বাংলাদেশের ক্রান্তিলগ্ন
বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল রূপান্তরের পথে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, বৈশ্বিক শ্রমবাজার—সবকিছু বদলে যাচ্ছে। শিক্ষা যদি সময়ের সঙ্গে তাল না মেলায়, তবে তরুণ প্রজন্ম পিছিয়ে পড়বে। আজাদের দর্শন আমাদের বলে— শিক্ষা কেবল পেশা নয়; পরিচয়। শিক্ষা কেবল দক্ষতা নয়; মূল্যবোধ। শিক্ষা কেবল অর্থনীতি নয়; মানবতা। ১১ নভেম্বর ভারতে জাতীয় শিক্ষা দিবস হিসেবে পালিত হয় আজাদের জন্মদিন। কিন্তু তাঁর চিন্তা সীমান্তে আটকে নেই।
বাংলাদেশের সামনে আজ বড় প্রশ্ন— আমরা কি শুধু অবকাঠামো গড়ব? নাকি মানুষ গড়ব? দালান নির্মাণ সহজ। মানুষ নির্মাণ কঠিন। কিন্তু জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে মানুষের ওপর। আজাদের শিক্ষা ছিল ভারসাম্যের শিক্ষা। বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি। ঐতিহ্য ও আধুনিকতা। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচিন্তা।
শেষকথা
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ শিক্ষা আধুনিকায়নের যে বীজ বপন করেছিলেন, তা কেবল নীতিমালার ভাষায় সীমাবদ্ধ নয়—এটি ছিল এক সভ্যতার পুনর্জাগরণের প্রকল্প। ধ্বংসস্তূপের ভেতর দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, জাতির মুক্তি আসবে শিক্ষার আলোয়। আজ, যখন আমরা শিক্ষার নতুন রূপরেখা আঁকতে চাই, তখন তাঁর সেই দূরদর্শী কণ্ঠ আবার শোনা যায়— শিক্ষা কেবল ডিগ্রি নয়, এটি জাতির আত্মা।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমাণ করেছেন— ঐতিহ্যের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে আধুনিকতার স্থপতি হওয়া যায়। আলেম হয়েও বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া যায়। ধর্মীয় শিক্ষায় বেড়ে উঠেও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের ভিত্তি গড়া যায়। বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার কেবল নীতিপত্রের প্রশ্ন নয়। এটি মানসিকতার প্রশ্ন। এটি সাহসের প্রশ্ন। এটি আত্মসমালোচনার প্রশ্ন। যদি আমাদের আলেম সমাজ, শিক্ষক সমাজ, নীতিনির্ধারক এবং নাগরিক সবাই মিলে মানুষ গড়ার প্রকল্পে একমত হই—তবে শিক্ষা সত্যিই হবে অধিকারপত্র। আর যদি আমরা বিভাজনে আটকে থাকি, তবে দালান উঠবে, কিন্তু মানুষ উঠবে না।
বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার কেবল নীতিপত্রের প্রশ্ন নয়। এটি মানসিকতার প্রশ্ন। এটি সাহসের প্রশ্ন। এটি আত্মসমালোচনার প্রশ্ন। যদি শিক্ষক, আলেম, নীতিনির্ধারক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক—সবাই মিলে মানুষ গড়ার প্রকল্পে একমত হই, তবে শিক্ষা সত্যিই হবে অধিকারপত্র। আর যদি বিভাজনে আটকে থাকি, তবে দালান উঠবে, মানুষ উঠবে না। আজাদের গল্প অতীত নয়। এটি ভবিষ্যতের আহ্বান। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের।
✍️ –অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)
#শিক্ষা_সংস্কার #মাদরাসা_ও_সাধারণ_শিক্ষা #জামিয়া_মডেল #আজাদী_মডেল #মাওলানা_আবুল_কালাম_আজাদ #সমন্বিত_কারিকুলাম #বাংলাদেশের_শিক্ষা #শিক্ষা_বিপ্লব #ধর্ম_ও_বিজ্ঞান #রাজনৈতিক_নিরপেক্ষতা #বৃত্তিমূলক_শিক্ষা #গবেষণাভিত্তিক_শিক্ষা #শিক্ষা_ও_গণতন্ত্র #EducationReform #IntegratedEducation #MadrasahReform #BangladeshEducation

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: