10/15/2026 আইন আছে অধিকার আছে তবু বিশ্ববিদ্যালয়ে অদৃশ্য দেয়াল
Dr Mahbub
১৫ October ২০২৬ ০৩:১৮
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের আদেশ, সমতার আদর্শ ও শিক্ষার্থীকল্যাণের আলোকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধিকার ও অন্তর্ভুক্তির বাস্তবতা নিয়ে অধিকারপত্রের বিশেষ প্রচ্ছদ প্রতিবেদন। ভর্তি থেকে শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষা থেকে হলের আবাসন—বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সুযোগ কতটা ব্যবহারযোগ্য? প্রবেশগম্য অবকাঠামো, উপযোগী শিক্ষাসামগ্রী, প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ব্যাপী প্রতিবন্ধিতা সহায়তাকেন্দ্রের গুরুত্ব বিশ্লেষণের পাশাপাশি প্রতিবেদনটি তুলে ধরে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব, শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির প্রশ্ন। কাগজে স্বীকৃত সুযোগকে মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা ও স্বাধীন অংশগ্রহণের বাস্তব অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়ার পথ কোথায়?
ভর্তি হওয়ার অধিকার আর শিক্ষা গ্রহণের বাস্তব সুযোগের ব্যবধান বোঝাতে কয়েকটি প্রতিনিধিত্বমূলক দৃশ্য বিবেচনা করা যাক। এগুলো কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর যাচাইকৃত ব্যক্তিগত সাক্ষ্য নয়; সম্ভাব্য কাঠামোগত বাধার উদাহরণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর কথা পৃথকভাবে উল্লেখ নেই। কিন্তু সবার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় উন্মুক্ত রাখা, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও আবাসনের ব্যবস্থা এবং পরবর্তী জাতীয় অধিকার আইন একসঙ্গে পড়লে উঠে আসে জরুরি প্রশ্ন। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অধিকার কি ভর্তি-কোটা ও বৃত্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষা, হল, গ্রন্থাগার ও ডিজিটাল ক্যাম্পাসে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দায়িত্বও বিশ্ববিদ্যালয়কে নিতে হবে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের একটি শ্রেণিকক্ষের সামনে এসে যদি হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী একজন শিক্ষার্থী থেমে যান, কারণ সেখানে ওঠার উপযোগী র্যাম্প নেই—তাহলে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার অধিকার কি পূর্ণ হলো? একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী যদি ভর্তি পরীক্ষায় সফল হওয়ার পর বই পান এমন PDF-এ, যা স্ক্রিন রিডার পড়তে পারে না, তবে তাঁকে কি সত্যিই শিক্ষার সমান সুযোগ দেওয়া হলো? একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী যদি শিক্ষককে দেখতে পান, কিন্তু বক্তৃতা বুঝতে ইশারা ভাষার দোভাষীসেবা, লিখিত ভাষ্য বা প্রয়োজনীয় যোগাযোগসহায়তা না পান—তবে তাঁর উপস্থিতি কি অংশগ্রহণে রূপ নিল? আবার একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হলের সিট পেলেও যদি কক্ষে যাওয়ার পথ, টয়লেট কিংবা খাবারঘর ব্যবহার করতে না পারেন, তাহলে সেই আবাসনকে কি আইনগত অর্থে সমান সুযোগ বলা যায়?
এই প্রশ্নগুলো আর দয়া, সহানুভূতি বা বিশেষ সুবিধার প্রশ্ন নয়। এগুলো অধিকার, সমতা, প্রবেশগম্যতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩কে সংবিধান ও পরবর্তী অধিকার আইনের সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার মূল আইন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে পৃথক কোনো পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় নেই। অনুচ্ছেদ ৬ বিশ্ববিদ্যালয়কে সবার জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা করেছে। সেখানে লিঙ্গ, ধর্ম, জাতি, মতবিশ্বাস, শ্রেণি বা বর্ণের উল্লেখ থাকলেও প্রতিবন্ধিতা শব্দটি স্বতন্ত্রভাবে নেই। এই অনুপস্থিতি সেই সময়ের আইন প্রণয়নের ভাষা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সম্পর্কে ধারণার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে সকল ব্যক্তির জন্য উন্মুক্ত থাকার ঘোষণাটির ব্যাপ্তি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
তাহলে কি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অধিকার এই আইনের বাইরে? উত্তর খুঁজতে শুধু একটি শব্দের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের সংবিধান, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ বিধিবিধান এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনুশীলন একসঙ্গে বিবেচনা করলে আইনগত দায়িত্বের বিস্তৃত ক্ষেত্রটি স্পষ্ট হয়।
ধরা যাক, একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বহু প্রতিকূলতা অতিক্রম করে দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। তাঁর হাতে ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার কাগজ, মনে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন। পরিবারের মানুষেরাও আশাবাদী—এবার হয়তো তাঁর জীবনে নতুন দরজা খুলবে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি বুঝতে শুরু করলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া আর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারা এক বিষয় নয়। তাঁর পাঠ্যপুস্তকগুলো সাধারণ মুদ্রণে, শিক্ষকের দেওয়া নোট ছবিনির্ভর PDF-এ, পরীক্ষার সময় শ্রুতিলেখক পাওয়ার নিয়ম অস্পষ্ট এবং গ্রন্থাগারের অধিকাংশ উপকরণ তাঁর ব্যবহারোপযোগী নয়।
অন্যদিকে একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষের সামনের সারিতে বসে শিক্ষকের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। শিক্ষক কথা বলছেন, বোর্ডে লিখছেন, সহপাঠীরা আলোচনা করছেন। অথচ তিনি আলোচনার বড় অংশই অনুসরণ করতে পারছেন না। তাঁর জন্য বাংলা ইশারা ভাষার দোভাষী নেই, তাৎক্ষণিক লিখিত ভাষ্য নেই, প্রয়োজনমতো লিখিত নির্দেশনাও নেই। উপস্থিতির খাতায় তাঁর নাম আছে, কিন্তু শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়ায় তাঁর উপস্থিতি কতটা কার্যকর?
আবার একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিক্ষার্থী আবাসিক হলে একটি আসন পেলেন। কিন্তু কক্ষ দ্বিতীয় তলায়, লিফট নেই, সিঁড়ির পাশে যথাযথ র্যাম্প নেই, টয়লেট ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব। কাগজে-কলমে তিনি আবাসিক শিক্ষার্থী, কিন্তু বাস্তবে তাঁর আবাসন অন্যের দয়া ও সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। এগুলো কোনো একজন নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর যাচাইকৃত ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সামনে যে ধরনের কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে, তার প্রতিনিধিত্বমূলক দৃশ্য।
এই তিনটি দৃশ্য আমাদের একই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—রাষ্ট্র যখন অধিকার দিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় কি সেই অধিকার ব্যবহার করার পরিবেশ তৈরি করেছে? বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারের অভাব নেই। রয়েছে সাংবিধানিক ভিত্তি, বিশেষ আইন, আন্তর্জাতিক সনদের বাধ্যবাধকতা এবং নীতিগত ঘোষণার বিস্তৃত পরিসর। অথচ আইন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার মধ্যে এমন একটি ফাঁক থেকে যেতে পারে, যেখানে অধিকার আছে কিন্তু অধিকার প্রয়োগের পথ নেই।
আইন ও শিক্ষার্থীর বাস্তব জীবনের এই দূরত্ব যেন নদীর দুই তীরের মাঝখানে অসম্পূর্ণ সেতু। এক তীরে অধিকারের স্বীকৃতি, অন্য তীরে সেই অধিকার ব্যবহার করার প্রয়োজন। সেতুটি সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব কার্যকর বাস্তবায়নব্যবস্থার।
সংবিধান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩, জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ মিলিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকারভিত্তি রয়েছে। কিন্তু ভর্তি থেকে স্নাতকোত্তর গবেষণা, শ্রেণিকক্ষ থেকে হল এবং গ্রন্থাগার থেকে কর্মজীবন পর্যন্ত সেই অধিকার কতটা বাস্তবায়িত হয়? বিচ্ছিন্ন সহায়তার সঙ্গে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সহায়তা ও সম্পদকেন্দ্র এবং সমন্বিত অধিকার বাস্তবায়নব্যবস্থার প্রয়োজন কেন বাড়ছে—সেই প্রশ্নও এই অনুসন্ধানের অংশ।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার অধিকার আলোচনার মৌলিক ভিত্তি। তবে সংবিধানের প্রতিটি বিধানের প্রকৃতি ও প্রয়োগগত সীমা পৃথকভাবে বোঝা প্রয়োজন।
সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ বলছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আইনি সুরক্ষা লাভের অধিকারী। এই সমতার নীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষার্থীর প্রতিবন্ধিতাকে উপেক্ষা করে দৃশ্যত একই নিয়ম প্রয়োগ করলে কখনো কখনো সেই নিয়মই বাস্তব বৈষম্য তৈরি করতে পারে। কারণ একই নিয়মের প্রভাব সব মানুষের ওপর একই রকম হয় না।
সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদ নির্দিষ্ট বৈষম্যের ভিত্তি নিষিদ্ধ করেছে এবং পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান করার সুযোগ রেখেছে। তবে একটি আইনগত পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: ২৮ অনুচ্ছেদে প্রতিবন্ধিতাকে স্বতন্ত্র নিষিদ্ধ বৈষম্যের ভিত্তি হিসেবে সরাসরি তালিকাভুক্ত করা হয়নি। প্রতিবন্ধিতাভিত্তিক অধিকার রক্ষার আরও সুনির্দিষ্ট বিধান পাওয়া যায় ২০১৩ সালের বিশেষ আইনে। অতএব ২৮ অনুচ্ছেদের ভাষাকে প্রসারিত করে এমন দাবি করা যথাযথ নয় যে সেখানে প্রতিবন্ধিতা শব্দটি সরাসরি রয়েছে।
সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদ শিক্ষা সম্পর্কে রাষ্ট্রের দায়িত্বের নীতিগত ভিত্তি নির্ধারণ করেছে। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির অংশ; বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থী এই অনুচ্ছেদের ভিত্তিতেই অবাধে একটি নির্দিষ্ট আসন দাবি করতে পারবেন—এমন ব্যাখ্যা যথাযথ নয়। কিন্তু জাতীয় শিক্ষানীতি, অর্থায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সমতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা নির্মাণের ক্ষেত্রে এই অনুচ্ছেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দিকনির্দেশনা।
এখানে মূল প্রশ্নটি হচ্ছে—সাংবিধানিক সমতার লক্ষ্য কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বাজেট, পরীক্ষা, আবাসন ও শিক্ষাদান পদ্ধতিতে বাস্তব রূপ পাবে? একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে একই প্রশ্নপত্রের ব্যবহারোপযোগী সংস্করণ দেওয়া বৈষম্য নয়; বরং একই শিক্ষাগত দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ সৃষ্টি। একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীর ক্লাস নিচতলায় স্থানান্তর করা বিশেষ অনুগ্রহ নয়; বরং প্রবেশাধিকারের বাধা দূর করা। সমতার সবচেয়ে বড় ভুল ব্যাখ্যা হলো সবাইকে সব পরিস্থিতিতে একইভাবে আচরণ করতে হবে। বাস্তবে সমতার লক্ষ্য হলো মানুষকে এমন সুযোগ দেওয়া, যাতে অপ্রাসঙ্গিক প্রতিবন্ধকতা তাঁদের সক্ষমতা প্রকাশের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যালয় পুনর্গঠনের ধারায় ১৯৭৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ জারি হয়; এর কার্যকারিতা ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে গণ্য করা হয়েছে। সেই সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ততার ঘোষণা পড়তে হয়। পরবর্তী অধিকার আইন এসেছে আরও কয়েক দশক পরে। তাই বর্তমান দায়িত্ব নির্ধারণে পুরোনো প্রতিষ্ঠাতা আইন এবং নতুন অধিকার আইনের ধারাবাহিকতা একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অনুচ্ছেদ ৬-এর কেন্দ্রীয় প্রতিশ্রুতি হলো উন্মুক্ততা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এই ঘোষণার বাস্তব অর্থ নির্ধারণই আজকের চ্যালেঞ্জ। ১৯৭৩ সালের প্রেক্ষাপটে এই বিধান একটি শক্তিশালী বৈষম্যবিরোধী ঘোষণা। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে উন্মুক্ত থাকার অর্থ কি শুধু আবেদনপত্র সংগ্রহ করা কিংবা ভর্তি পরীক্ষায় বসার অনুমতি পাওয়া? শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের পর শিক্ষাগ্রহণ করতে পারছেন কি না, সে প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত।
ধরা যাক, একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলেন, উত্তীর্ণ হলেন, পছন্দের বিষয়ে ভর্তি হলেন। আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির দরজা তাঁর জন্য খুলেছে। কিন্তু প্রথম দিনেই যদি তাঁর বিভাগে ওঠার সিঁড়ি অতিক্রম করা অসম্ভব হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কি বাস্তবে তাঁর জন্য উন্মুক্ত? এই জায়গায় আনুষ্ঠানিক প্রবেশাধিকার এবং বাস্তব ও কার্যকর প্রবেশাধিকারের পার্থক্য সামনে আসে। আনুষ্ঠানিক প্রবেশাধিকার বলবে—তাঁকে ভর্তি হতে বাধা দেওয়া হয়নি।
বাস্তব সমতা বলবে—তিনি অন্য শিক্ষার্থীর মতো শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছেন কি না, সেটিও দেখতে হবে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক আধুনিক আইনচিন্তার আলোকে অনুচ্ছেদ ৬-এর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করলে আনুষ্ঠানিক প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি কার্যকর অংশগ্রহণের প্রশ্ন সামনে আসে। সমতা মানে সবাইকে হুবহু একই ব্যবস্থা দেওয়া নয়; প্রয়োজন অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করে বাস্তবে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা। এটি অধিকারভিত্তিক ব্যাখ্যা; অনুচ্ছেদটির সরাসরি ভাষায় সব সমন্বয়ের তালিকা লেখা নেই।
তাহলে কি অনুচ্ছেদ ৬-এ প্রতিবন্ধিতার আলাদা উল্লেখ না থাকায় প্রতিবন্ধিতাভিত্তিক বৈষম্য বৈধ হয়ে যায়? এমন সিদ্ধান্ত আইনের সামগ্রিক কাঠামোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ সকল নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং সমান আইনি সুরক্ষার অধিকার ঘোষণা করেছে। ২৮ অনুচ্ছেদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশসহ প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে। একই অনুচ্ছেদের দফা (৪) নারী, শিশু ও অনগ্রসর নাগরিকদের অগ্রগতির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রাখে। তবে প্রতিবন্ধিতা শব্দটি ২৮ অনুচ্ছেদের নিষিদ্ধ বৈষম্যের তালিকায় সরাসরি নেই—এই পার্থক্যটি মনে রাখা প্রয়োজন।
এরপর এসেছে আরও বিশেষায়িত অধিকারভিত্তিক আইন—প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩। ফলে ১৯৭৩ সালের একটি বিশ্ববিদ্যালয় আদেশকে ১৯৭৩ সালের সামাজিক ভাষার মধ্যে আটকে রেখে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের দায় নির্ধারণ করা যথেষ্ট নয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে আইন নিজস্ব অধিকারধারী নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সুতরাং অনুচ্ছেদ ৬-এ প্রতিবন্ধিতার স্বতন্ত্র উল্লেখ না থাকা আইনের ভাষাগত একটি ঘাটতি। সেই ঘাটতিকে প্রতিবন্ধিতার কারণে কোনো যোগ্য শিক্ষার্থীকে বাদ দেওয়ার অনুমতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। —বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত—১৯৭৩-এর “সবার জন্য উন্মুক্ত” নীতিকে ২০২৬ সালের অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রে কীভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে?
অনুচ্ছেদ ৪(এম) বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার্থীদের আবাসন ও শৃঙ্খলা তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ, সহশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা এবং তাঁদের স্বাস্থ্যের উন্নয়নে ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছে। এই ক্ষমতাবিধান শিক্ষার্থীকল্যাণমূলক ব্যবস্থা তৈরির আইনগত ভিত্তি; সব নির্দিষ্ট সহায়তার সরাসরি বাধ্যতামূলক তালিকা হিসেবে একে পড়া যথাযথ নয়। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তির আলোচনায় স্বাস্থ্যসংক্রান্ত এই ক্ষমতা তাৎপর্যপূর্ণ। জাতীয় অধিকার আইনের সঙ্গে মিলিয়ে এর ব্যবহার বিবেচনা করলে শিক্ষার্থীকল্যাণের দায়িত্ব আরও বিস্তৃতভাবে বোঝা যায়।
“শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের উন্নয়নে ব্যবস্থা গ্রহণ” শুধু অসুস্থ হলে চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষমতা হিসেবে পড়লে বিধানটির অর্থ খুব সংকীর্ণ হয়ে যায়। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য এবং কার্যকর অংশগ্রহণ অনেক কিছুর সঙ্গে জড়িত—ব্যবহারোপযোগী আবাসন, নিরাপদ চলাচল, সহায়ক সেবা, জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা, ব্যবহারোপযোগী স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারব্যবস্থা, মনোসামাজিক পরামর্শসেবা, পুনর্বাসনসেবার জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠানে পাঠানো এবং প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা।
অনুচ্ছেদ ৪(এম) সরাসরি র্যাম্প নির্মাণের নির্দেশ দেয়নি। তবে শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য ও কল্যাণে ব্যবস্থা গ্রহণের আইনগত ভিত্তি এখানে রয়েছে। কোন ব্যবস্থা প্রয়োজন এবং তার বাধ্যবাধকতার পরিসর কী, তা জাতীয় অধিকার আইন, প্রযোজ্য বিধি ও শিক্ষার্থীর বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে নির্ধারণ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাঠামো নির্ধারণকারী আইন। সব পরিচালনাগত বিস্তারিত বিধান আদেশে থাকবে না। অনুচ্ছেদ ৩৮ সংবিধির বিষয় নির্ধারণ করে, অনুচ্ছেদ ৪০ বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্সের ক্ষেত্র নির্ধারণ করে, আর অনুচ্ছেদ ৪৩ আবাসনের শর্তকে সংবিধি ও বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্সের ওপর ছেড়ে দেয়। এখানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে একটি বড় নীতিগত সুযোগ রয়েছে। যদি ১৯৭৩ আদেশ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তির বিস্তারিত বিধান না দিয়ে থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসিত বিধি প্রণয়নের ব্যবস্থা—সংবিধি, অর্ডিন্যান্স ও প্রবিধান এবং নীতিমালা—সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে।
প্রশ্ন হলো, সেই ক্ষমতা কতটা ব্যবহার করা হয়েছে? আধুনিক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিচ্ছিন্ন বিজ্ঞপ্তির বদলে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্তি ও যুক্তিসংগত সমন্বয় নীতিমালা থাকা কি প্রয়োজন নয়? যেখানে ভর্তি থেকে ডিগ্রি সম্পন্ন করা পর্যন্ত অধিকার ও কার্যপ্রণালি স্পষ্ট থাকবে।
জাতিসংঘের Convention on the Rights of Persons with Disabilities (CRPD) 2006 আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকারভিত্তিক কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশ ২০০৭ সালে এই সনদ অনুসমর্থন করেছে। সনদের অনুচ্ছেদ ২৪ শিক্ষার অধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে। বিশেষত অনুচ্ছেদ ২৪(৫) উচ্চশিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা ও আজীবন শিক্ষার সুযোগে বৈষম্যহীন প্রবেশ এবং প্রয়োজনীয় যুক্তিসংগত সমন্বয়ের বিষয়টি নির্দেশ করে।
অনুচ্ছেদ ৯ প্রবেশগম্যতার বৃহত্তর ধারণা প্রতিষ্ঠা করে; অনুচ্ছেদ ২১ তথ্য ও যোগাযোগের প্রবেশগম্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত; অনুচ্ছেদ ৩০ সাংস্কৃতিক জীবন, বিনোদন, অবসর ও খেলাধুলায় অংশগ্রহণের অধিকারকে গুরুত্ব দেয়।
এখানে একটি আইনগত সতর্কতাও প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সনদ অনুসমর্থন করলেই তার প্রত্যেকটি বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশের আদালতে দেশীয় আইনে স্বতন্ত্র মামলা দায়েরের ভিত্তি হয়ে যায়—এমন নয়। কিন্তু জাতীয় আইন ব্যাখ্যা, নীতি প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার মূল্যায়নে CRPD গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। বাংলাদেশের ২০১৩ সালের আইনও এই অধিকারভিত্তিক আন্তর্জাতিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই আন্তর্জাতিক কাঠামো উচ্চশিক্ষায় একটি গভীর নীতিগত পরিবর্তন এনেছে। অতীতে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শিক্ষায় অংশগ্রহণকে প্রায়ই ব্যক্তিগত অক্ষমতা অতিক্রমের ঘটনা হিসেবে দেখা হতো। আধুনিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকারভিত্তিক কাঠামো প্রশ্নটিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন শুধু—ব্যক্তিটি কী করতে পারেন না—তা নয়। প্রশ্ন হলো—বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে এমন কী আছে, যা তাঁর সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে বাধা দিচ্ছে? যে ভবনে লিফট নেই, সেটি কেবল একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর সমস্যা নয়; সেটি ভবনটির প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা। যে পাঠ্যসামগ্রী স্ক্রিন রিডারে পড়া যায় না, সেটি শুধু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অসুবিধা নয়; সেটি শিক্ষাসামগ্রীর নকশাগত ত্রুটি। —এই উপলব্ধি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বকে দয়াভিত্তিক সহায়তা থেকে অধিকারভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপান্তরিত করে।
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার অধিকার বিশ্লেষণ করতে গেলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ আইন হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩। এই আইনের ১৬(১)(জ) ধারায় শিক্ষার সব স্তরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি সাপেক্ষে, একীভূত বা সমন্বিত শিক্ষায় অংশগ্রহণের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। এখানে সব স্তর কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ শিক্ষা কেবল প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা কলেজে সীমাবদ্ধ নয়; উচ্চশিক্ষাও শিক্ষাব্যবস্থার অংশ।
একই ধারার ১৬(১)(ড) উপধারায় শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রসহ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য উপযোগী পরিবেশ ও ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা—অর্থাৎ যুক্তিসংগত সমন্বয়—পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ১৬(১)(চ) প্রবেশগম্যতার অধিকার এবং ১৬(১)(ছ) সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রসহ পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করেছে। আইনের এই বিধানগুলো উচ্চশিক্ষার আলোচনায় মৌলিক পরিবর্তন আনে। ১৯৭৩ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ পৃথক অধিকারব্যবস্থা নেই—এটি সত্য। কিন্তু ২০১৩ সালের আইন কার্যকর হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিবন্ধিতা-সংক্রান্ত দায়িত্ব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সেই বিশেষ আইন উপেক্ষা করা যায় না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত পার্থক্য রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, প্রশাসন ও ক্ষমতার কাঠামো নির্ধারণ করে। অন্যদিকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন প্রতিবন্ধী নাগরিকদের মৌলিক কার্যকর অধিকার নির্ধারণ করে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় তার অভ্যন্তরীণ বিধান প্রয়োগের সময় প্রাসঙ্গিক জাতীয় আইনকেও বিবেচনায় নিতে বাধ্য। —এই দুই আইনকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নয়, পরিপূরক হিসেবে দেখতে হবে।
ধরা যাক, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরীক্ষাবিধিতে সব শিক্ষার্থীকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাতে লিখে পরীক্ষা দেওয়ার কথা বলা আছে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণে হাতে লেখা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে যুক্তিসংগত সমন্বয় ছাড়া কঠোরভাবে একই বিধি প্রয়োগ করলে ২০১৩ সালের আইনে স্বীকৃত যুক্তিসংগত সমন্বয়ের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে। অতএব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক বিধান শুধু পুরোনো বলেই অপরিবর্তনীয় নয়; তাকে বর্তমান অধিকার আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ৩৩ ধারা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, অথচ এটির কার্যকর ব্যবহার নিয়ে পর্যাপ্ত জনআলোচনা নেই। —এই ধারা অনুযায়ী, অন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কেবল প্রতিবন্ধিতার কারণে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একজন ব্যক্তির ভর্তির আবেদন প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। এমন বৈষম্য ঘটলে নির্ধারিত কমিটির কাছে অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানকে শুনানির সুযোগ দিয়ে কমিটি উপযুক্ত ক্ষেত্রে ভর্তি করার নির্দেশ দিতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করতে পারে।
এটি শুধু নৈতিক আহ্বান নয়; আইনে বর্ণিত একটি নির্দিষ্ট প্রতিকারব্যবস্থা। ধরা যাক, একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিভাগে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেছেন। কিন্তু তাঁকে বলা হলো, বিভাগে ইশারা ভাষার সহায়তা নেই, তাই তাঁকে ভর্তি নেওয়া সম্ভব নয়। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অসুবিধা বাস্তব হতে পারে। দক্ষ দোভাষী পাওয়া কঠিন হতে পারে। অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও থাকতে পারে। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাকে কেবল প্রতিবন্ধিতার কারণে ভর্তি প্রত্যাখ্যানের স্বয়ংসম্পূর্ণ আইনগত ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে কি না, সেটিই ৩৩ ধারার আলোকে পরীক্ষা করতে হবে।
আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একজন আবেদনকারী প্রয়োজনীয় অন্যান্য যোগ্যতা পূরণ করেছেন কি না, প্রত্যাখ্যানের প্রকৃত কারণ কী এবং কোনো আইনসম্মত সমন্বয় বা বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা করা হয়েছিল কি না। তবে ধারা ৩৩কে এমনভাবে পড়াও উচিত নয় যে সব আবেদনকারী যোগ্যতা বা প্রতিষ্ঠানের বৈধ ভর্তি-শর্ত নির্বিশেষে আসন দাবি করতে পারবেন। এই ধারা প্রতিবন্ধিতার কারণে আবেদন প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়; একাডেমিক যোগ্যতার বিধান সম্পূর্ণ বিলোপ করে না। —অধিকার এবং মানদণ্ডের মধ্যে এখানেই প্রয়োজন ন্যায়সংগত ভারসাম্য।
বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই বলি— “প্রতিবন্ধীদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।” ভাষাটি সদিচ্ছাপূর্ণ হলেও অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিকোণে এটি বিভ্রান্তিকর হতে পারে। একটি র্যাম্প কি বিশেষ সুবিধা? না—এটি সিঁড়ি ব্যবহার করতে না পারা একজন মানুষের প্রবেশপথ। ব্রেইল কি বাড়তি সুবিধা? না—এটি মুদ্রিত লেখা না পড়তে পারা মানুষের পাঠ্য। ইশারা ভাষার দোভাষীসেবা কি অনুগ্রহ? না—এটি যোগাযোগে প্রবেশাধিকার। শ্রুতিলেখক কি পরীক্ষায় বাড়তি সুবিধা? না—যদি যথাযথ নিয়মে পরিচালিত হয়, এটি উত্তর প্রকাশের মাধ্যম। —এই পরিবর্তনটি মৌলিক: বিশেষ অনুগ্রহের ধারণা থেকে সমান অংশগ্রহণের অধিকার স্বীকার করার দিকে এই পরিবর্তন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বহু বছর ধরেই প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি-কোটার ব্যবস্থা রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে দৃষ্টি, বাক, শ্রবণ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের কোটার শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ভর্তি-কোটা সমতা প্রতিষ্ঠার একটি ইতিবাচক নীতিগত ব্যবস্থা। এর মূল্য বুঝতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানোর আগের শিক্ষাজীবনের বঞ্চনাও বিবেচনা করতে হবে।
কারণ একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বৈষম্যে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে শুধু বলা—“তোমরা অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কর”—সব সময় বাস্তব সমতা তৈরি করে না। বিদ্যালয় পর্যায়ে ব্যবহার অনুপযোগী শিক্ষা, সহায়ক প্রযুক্তির অভাব, উপযুক্ত পাঠ্যপুস্তক না পাওয়া, চলাচলের প্রতিবন্ধকতা এবং সামাজিক বৈষম্য—সব মিলিয়ে একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় পৌঁছানোর আগেই বহু বঞ্চনা বহন করতে পারেন।
সেই প্রেক্ষাপটে কোটা কোনো করুণা নয়। এটি ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত বঞ্চনা মোকাবিলার একটি নীতিগত উপায়। কিন্তু সমস্যা হয় যখন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তির পুরো ধারণাকে কোটাতে নামিয়ে আনা হয়। একজন শিক্ষার্থীকে কোটায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকিয়ে দিলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং সেখান থেকেই মূল দায়িত্ব শুরু। প্রয়োজনীয় সমন্বয় ছাড়া ভর্তি নিশ্চিত করা হলে কাগজে অন্তর্ভুক্তি ঘটলেও বাস্তবে শিক্ষার্থী বঞ্চনার মুখোমুখি হতে পারেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পোর্টালে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী প্রার্থীদের করণীয় বিষয়ে পৃথক বিজ্ঞপ্তির উল্লেখ রয়েছে। ভর্তিপ্রক্রিয়ায় তাঁদের প্রয়োজন আলাদাভাবে বিবেচনা করার এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাসংক্রান্ত একটি নির্দেশিকাতেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য শ্রুতিলেখক ব্যবহারের ব্যবস্থা দেখা যায়। সেখানে পরীক্ষার্থী নির্দিষ্ট শর্তে একজন শ্রুতিলেখক নির্বাচন করতে পারেন বলে উল্লেখ রয়েছে। এই উদাহরণটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমতা বোঝার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
দৃষ্টিসম্পন্ন শিক্ষার্থী নিজের চোখে প্রশ্ন পড়ে উত্তর লিখবেন। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী একইভাবে উত্তর লিখতে না পারলে তাঁকে যদি বলা হয়—“সবার নিয়ম একই”—তাহলে তা উপরিতলের সমতা। অন্যদিকে শ্রুতিলেখক, ব্যবহারোপযোগী প্রশ্নপত্রের বিন্যাস, সহায়ক প্রযুক্তি বা উপযুক্ত অতিরিক্ত ব্যবস্থা দিলে পরীক্ষার শিক্ষাগত মান কমানো হয় না। বরং পরীক্ষাটি কী জানতে চায়—শিক্ষার্থীর জ্ঞান, নাকি তাঁর চোখে দেখার ক্ষমতা—সেই পার্থক্য রক্ষা করা হয়। —এটাই যুক্তিসংগত সমন্বয়ের দর্শন।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বললেই আমাদের চোখে প্রায়ই হুইলচেয়ার বা সাদা ছড়ি ভেসে ওঠে। কিন্তু সমকালীন প্রতিবন্ধিতা-সংক্রান্ত কাঠামো অনেক বিস্তৃত। অটিজম, স্নায়ুবিক বিকাশগত অবস্থা, মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতা, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, বাক্ ও যোগাযোগপ্রতিবন্ধিতা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা—প্রয়োজনের ধরন ভিন্ন হতে পারে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধিতার আইনগত স্বীকৃতির কাঠামো দিয়েছে এবং কিছু অন্যান্য প্রতিবন্ধিতাও নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় স্বীকৃত হতে পারে।
তাই শুধু র্যাম্প নির্মাণ করলেই “প্রতিবন্ধীবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয়” হয়ে যায় না। ভৌত প্রবেশগম্যতার পাশাপাশি প্রয়োজন: যোগাযোগের প্রবেশগম্যতা, পাঠ্যক্রমে প্রবেশগম্যতা, মূল্যায়নে প্রবেশগম্যতা, ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা এবং অংশগ্রহণের সহায়ক মনোভাব। সবচেয়ে কঠিন বাধা অনেক সময় সিঁড়ি নয়—মানুষের মনোভাব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তির সবচেয়ে সূক্ষ্ম ক্ষেত্র হতে পারে বিষয় নির্বাচন। কোনো শিক্ষক বা প্রশাসক সদিচ্ছা থেকে বলতে পারেন— “আপনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, এই বিষয় আপনার জন্য খুব কঠিন।” “গবেষণাগার আছে, আপনি পারবেন না।” “মাঠকাজ করতে হবে।” “এই পেশা আপনার জন্য নয়।” কখনো প্রকৃতপক্ষে অপরিহার্য শিক্ষাগত শর্ত থাকতে পারে। সব প্রয়োজনীয় সমন্বয় সব শিক্ষাক্রমে সম্ভব—এমন সরল দাবি করা ঠিক নয়। কিন্তু অসুবিধা অনুমান করে নির্বিচারে বাদ দেওয়া করাও ন্যায়সংগত নয়।
— এই তিন প্রশ্ন ছাড়া “আপনি পারবেন না” সিদ্ধান্তটি অভিভাবকসুলভ কর্তৃত্বে পরিণত হতে পারে।
১৯৭৩ আদেশে ব্যবহারোপযোগী শিক্ষণপদ্ধতি, শেখার জন্য সর্বজনীন নকশা, ব্রেইল পাঠ্যপুস্তক, লিখিত ভাষ্যসংবলিত বক্তৃতা, ইশারা ভাষার দোভাষী, ব্যবহারোপযোগী পাওয়ারপয়েন্ট উপস্থাপনা কিংবা স্ক্রিন রিডারে ব্যবহারযোগ্য শিক্ষণ ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্মের কথা নেই। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আইনটি যখন লেখা হয়েছিল, তখন ব্যক্তিগত কম্পিউটারও আজকের অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার অংশ ছিল না। প্রযুক্তির পৃথক তালিকা আইনে নেই বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল প্রবেশগম্যতার প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করার সঙ্গে সেটি শিক্ষার্থীদের ব্যবহারোপযোগী করার প্রয়োজনও যুক্ত।
এখানেই উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন। অনুচ্ছেদ ৭ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান, পাঠ্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালনব্যবস্থার ভিত্তি দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স ও প্রবিধানের মাধ্যমে এর বিস্তারিত নির্ধারণ করা যায়। অনুচ্ছেদ ৬-এর উন্মুক্ততার নীতির সঙ্গে এই ক্ষমতা মিলিয়ে পড়লে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষণ পরিবেশ গড়ে তোলার সুযোগ স্পষ্ট হয়। সমকালীন অধিকারভিত্তিক ব্যাখ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষণ পরিবেশ এমনভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে কোনো যোগ্য শিক্ষার্থী প্রতিবন্ধিতার কারণে অপ্রয়োজনীয় বাধায় বাদ না পড়েন। জাতীয় আইনে স্বীকৃত অধিকারকে শিক্ষাদানের দৈনন্দিন পদ্ধতিতে রূপ দেওয়াই এখানে মূল কাজ।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উচ্চতর ডিগ্রি, গবেষণা, প্রকাশনা এবং বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা শিক্ষকতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু শিক্ষক ভালো গবেষক হলেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষণপদ্ধতিতে দক্ষ হবেন—এমন নয়। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে একজন শিক্ষকের শিক্ষণপদ্ধতিগত দক্ষতার সঙ্গে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে জ্ঞানের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
একজন শিক্ষক যদি শ্রেণিকক্ষে কেবল বোর্ডে লিখে পড়ান এবং লিখিত বিষয়গুলো মুখে ব্যাখ্যা না করেন, তাহলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অসুবিধা হতে পারে। আবার শিক্ষক যদি পুরো সময় শিক্ষার্থীদের দিকে না তাকিয়ে কথা বলেন, দ্রুত বক্তৃতা দেন অথবা আলোচনার মূল বিষয়গুলো লিখিত আকারে না দেন, তাহলে শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
একজন অটিস্টিক শিক্ষার্থীর ইন্দ্রিয়গত প্রয়োজন, একজন ADHD-সম্পর্কিত প্রতিবন্ধিতা থাকা শিক্ষার্থীর প্রয়োজন কিংবা একজন মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতা থাকা শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট সহায়তার প্রয়োজন সম্পর্কে শিক্ষক অজ্ঞ থাকলে অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। এই কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীসহ সবার উপযোগী শিক্ষণপদ্ধতি, শেখার জন্য সর্বজনীন নকশা, ব্যবহারোপযোগী মূল্যায়ন এবং যুক্তিসংগত সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
শেখার জন্য সর্বজনীন নকশা বা UDL-এর মূল লক্ষ্য প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা পাঠ্যক্রম বানানো নয়। বরং শিক্ষার্থীদের শেখা, অংশগ্রহণ এবং অর্জন প্রকাশের একাধিক উপায় তৈরি করা। যেমন, একটি বক্তৃতার সঙ্গে ব্যবহারোপযোগী পাঠ্য, লিখিত ভাষ্যসংবলিত ভিডিও, সুবিন্যস্ত নোট এবং উপযুক্তভাবে পরিকল্পিত কার্যক্রম থাকলে অনেক শিক্ষার্থী উপকৃত হতে পারেন। আবার পরীক্ষায় প্রয়োজনীয় সমন্বয় শিক্ষার্থীর প্রতিবন্ধিতা-সংশ্লিষ্ট বাধা কমিয়ে তাঁর প্রকৃত শিক্ষাগত দক্ষতা মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাদান কোনো বিষয়ভিত্তিক মান কমিয়ে দেওয়ার পদ্ধতি নয়। বরং মান বজায় রেখে অপ্রাসঙ্গিক বাধা সরিয়ে দেওয়ার শিক্ষাবিজ্ঞান।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক ফলাফল, গবেষণার যোগ্যতা ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা গুরুত্ব পায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার পর কীভাবে বৈচিত্র্যময় শিক্ষার্থীদের শেখাতে হয়, কীভাবে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন বুঝতে হয় এবং কীভাবে উপযোগী মূল্যায়ন তৈরি করতে হয়—এসব বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সুযোগ সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
এই ঘাটতির প্রভাব প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর ওপর গভীর হতে পারে। ধরা যাক, একজন শিক্ষক তাঁর পাঠদানে অত্যন্ত দক্ষ। কিন্তু তিনি পাওয়ারপয়েন্টের প্রতিটি স্লাইডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যকে ছবির মধ্যে রেখে দেন। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সেই তথ্যের ব্যবহারোপযোগী বিকল্প পান না। অন্যদিকে আরেকজন শিক্ষক সব ক্লাস ভিডিওর মাধ্যমে নেন, কিন্তু ভিডিওতে লিখিত ভাষ্য নেই। ফলে শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সমানভাবে অংশ নিতে পারেন না। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষক ইচ্ছাকৃত বৈষম্য করছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সব সময় সঠিক হবে না। অনেক সময় সমস্যা আসে পদ্ধতিগত অজ্ঞতা ও প্রতিষ্ঠানগত সহায়তার অভাব থেকে।
তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষক উন্নয়ন কর্মসূচিতে চারটি সক্ষমতা বিশেষভাবে প্রয়োজন: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বিষয়ে জ্ঞান, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষণপদ্ধতি, ব্যবহারোপযোগী শিক্ষাপ্রযুক্তি এবং ন্যায্য মূল্যায়নপদ্ধতি তৈরি। একজন শিক্ষককে সব ধরনের সহায়ক প্রযুক্তির বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। কিন্তু তাঁকে জানতে হবে কোনো শিক্ষার্থী শেখার বাধার মুখে পড়লে কোথায় সহায়তা চাইতে হবে এবং নিজের পাঠদান পদ্ধতিতে কোন পরিবর্তনগুলো কার্যকর হতে পারে।
এখানেই প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সহায়তা ও সম্পদকেন্দ্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষণ উন্নয়নকেন্দ্রের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উন্নয়নকে যদি শুধু গবেষণা প্রকাশনা ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধির সঙ্গে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে শিক্ষাদানের মানবিক ও অধিকারভিত্তিক মাত্রা উপেক্ষিত থেকে যাবে। একজন ভালো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক শুধু কী পড়াবেন তা জানেন না; কীভাবে বিভিন্ন শিক্ষার্থী সেই জ্ঞানে প্রবেশ করবেন, সেটিও বিবেচনা করেন।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শ্রবণপ্রতিবন্ধী ও বধির শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি একটি বিশেষ ভাষাগত প্রশ্নের মুখোমুখি। আমাদের সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু অনেক বধির ব্যক্তির প্রাথমিক ও স্বাভাবিক যোগাযোগের ভাষা বাংলা ইশারা ভাষা হতে পারে। আবার সব শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি বাংলা ইশারা ভাষা ব্যবহার করেন না; কারও প্রয়োজন লিখিত ভাষ্য, লিখিত যোগাযোগ বা শ্রবণসহায়ক প্রযুক্তি। এই ভিন্নতা বিবেচনা না করে শুধু শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা শনাক্ত করলেই উপযুক্ত যোগাযোগসহায়তা নির্ধারণ করা যায় না।
২০১৩ সালের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনে বাংলা ইশারা ভাষাকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। CRPD-এর অনুচ্ছেদ ২৪ও ইশারা ভাষা ও বধির ব্যক্তিদের ভাষাগত পরিচয়ের গুরুত্ব স্বীকার করে। তাই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীকে শুধু বলা যথেষ্ট নয়—“শিক্ষক তো বাংলায় পড়াচ্ছেন।” প্রশ্ন হলো—শিক্ষক যে ভাষা ও মাধ্যমে পড়াচ্ছেন, তা শিক্ষার্থীর কাছে গ্রহণযোগ্য ও বোধগম্য হচ্ছে কি না। বক্তৃতাভিত্তিক ক্লাস, মৌখিক পরীক্ষা, সেমিনার, দলীয় আলোচনা এবং গবেষণা উপস্থাপনায় যোগাযোগের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
অন্যথায় শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত অর্জন তাঁর জ্ঞান বা গবেষণাক্ষমতার বদলে যোগাযোগব্যবস্থার অপ্রতুলতা দ্বারা নির্ধারিত হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব হবে শিক্ষার্থীর যোগাযোগের ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যবস্থা করা—প্রয়োজনমতো ইশারা ভাষার দোভাষী, লিখিত ভাষ্য তৈরি, লিখিত পরীক্ষা-নির্দেশনা অথবা বিকল্প যোগাযোগমাধ্যম। এখানে ভাষা কেবল শব্দের বিষয় নয়; ভাষা উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণের অন্যতম শর্ত।
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায়ই একটি যুক্তি শোনা যায়—“সব শিক্ষার্থীর জন্য একই নিয়ম হওয়া উচিত।” শুনতে খুব ন্যায়সংগত। কিন্তু প্রতিবন্ধিতা নীতিতে এটি অনেক সময় বৈষম্যের উৎস হতে পারে। একজন ডিসলেক্সিয়া থাকা শিক্ষার্থী, একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এবং একজন প্রতিবন্ধিতা নেই এমন শিক্ষার্থীর কার্যসম্পাদনের প্রয়োজন এক নয়। সবাইকে একই সময়, একই বিন্যাস এবং একই উত্তর দেওয়ার পদ্ধতি দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিন্নতা তৈরি করতে পারে; কিন্তু শিক্ষার্থীর প্রতিবন্ধিতা যদি সেই বিন্যাসের কারণে দক্ষতার প্রকাশ বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে পরীক্ষা তাঁর শিক্ষাগত দক্ষতার বদলে প্রতিবন্ধিতার তীব্রতা মাপতে শুরু করতে পারে। —তাই যুক্তিসংগত সমন্বয় শিক্ষাগত মান কমানো নয়। যুক্তিসংগত সমন্বয় মূল্যায়নে অংশ নেওয়ার পদ্ধতিকে ব্যবহারোপযোগী করে; মূল্যায়নের মাধ্যমে যে জ্ঞান বা দক্ষতা যাচাই করা হয়, তা বদলানো এর উদ্দেশ্য নয়। এই পার্থক্য না বুঝলে অন্তর্ভুক্তিমূলক মূল্যায়ন সম্ভব নয়।
শ্রেণিকক্ষের সীমাবদ্ধতা পরীক্ষার হলে এসে আরও দৃশ্যমান হয়। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে শ্রুতিলেখক প্রয়োজন হতে পারে। একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে কম্পিউটারে উত্তর প্রদানের অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। একজন শিক্ষার্থীর দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যগত অবস্থার কারণে বিরতি অথবা উপযোগী আসনব্যবস্থা দরকার হতে পারে। এগুলো কোনো স্বয়ংক্রিয় বা সীমাহীন সুবিধা নয়। প্রতিটি ব্যবস্থার প্রয়োজন, পরীক্ষার প্রকৃতি, নিরাপত্তা এবং একাডেমিক সততা বিবেচনা করতে হবে।
কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন কোনো লিখিত যুক্তিসংগত সমন্বয় নীতি নেই এবং সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়ে। এক বিভাগের শিক্ষক অনুমতি দিলেন, অন্য বিভাগের শিক্ষক দিলেন না। একজন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অতিরিক্ত সময় অনুমোদন করলেন, অন্যজন বললেন এমন বিধান নেই। একজন শিক্ষার্থী সেমিস্টারের শুরুতেই সহায়তা পেলেন, অন্যজন পরীক্ষা শুরুর ঘণ্টাখানেক আগে সিদ্ধান্ত জানতে পারলেন। এভাবে অধিকার কখনো নিয়মে পরিণত হয় না; থেকে যায় অনিশ্চিত অনুগ্রহ।
তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষাসংক্রান্ত একটি স্পষ্ট প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের কার্যপদ্ধতি প্রয়োজন। এতে আবেদন, প্রয়োজন মূল্যায়ন, সিদ্ধান্তের সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পরীক্ষার নিরাপত্তা, আপিল এবং অভিযোগের ব্যবস্থা থাকবে। এর মাধ্যমে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অধিকার যেমন সুরক্ষিত হবে, তেমনি শিক্ষকের ব্যক্তিগত বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ এবং প্রশাসনিক অনিশ্চয়তাও কমবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশের অনুচ্ছেদ ৪৩ বলছে প্রত্যেক শিক্ষার্থী সংবিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স দ্বারা নির্ধারিত স্থান ও শর্তে বসবাস করবেন। অর্থাৎ শিক্ষার্থীর আবাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবদ্ধ পরিচালনব্যবস্থার অংশ। এই বিধান প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন তৈরি করে—আবাসনের স্থান ও শর্ত নির্ধারণ করা করা হলে সেই আবাসন ব্যবহারযোগ্যও হতে হবে কি না? একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীকে তৃতীয় তলার একটি কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হলো, কিন্তু লিফট নেই। আইনের কাগজে তাঁর হলের আসন আছে; বাস্তবে তিনি সেখানে উঠতে পারেন না।
একজন স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন শিক্ষার্থীর কক্ষ আছে, কিন্তু করিডরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর হল আছে, কিন্তু স্পর্শনির্ভর পথনির্দেশনা বা নিরাপদ দিক ও অবস্থান সম্পর্কে ধারণা নেই। একজন শিক্ষার্থী ব্যবহারোপযোগী টয়লেট না থাকায় অন্যের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। এগুলো কি শুধু “সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি”? নাকি সমতা এবং মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের প্রশ্ন? বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত কিছু প্রয়োজনীয় সমন্বয়ভিত্তিক পদক্ষেপ দৃশ্যমান। উদাহরণ হিসেবে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের প্রকাশিত তথ্যে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য চারটি আবাসিক কক্ষ সংরক্ষিত থাকার কথা বলা হয়েছে।
ঢাবির একটি মহিলা হলের প্রকাশিত তথ্যে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য চারটি আবাসিক কক্ষ সংরক্ষণের উল্লেখ রয়েছে। এই তথ্য একটি নির্দিষ্ট উদ্যোগের পরিচয় দেয়; সব হলে একই ব্যবস্থা আছে বা কক্ষগুলোর প্রতিটি সুবিধা ব্যবহারোপযোগী—এমন সিদ্ধান্ত এর ভিত্তিতে টানা যায় না। কিন্তু এর পরেই বৃহত্তর নীতিগত প্রশ্ন উঠে আসে—একটি বা কয়েকটি হলে সংরক্ষিত কক্ষ থাকাই কি যথেষ্ট, নাকি প্রতিটি হলকে পর্যায়ক্রমে প্রবেশগম্য করার প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন?
দুটি বিষয় এক নয়। একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে হলের আসন বরাদ্দে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু কক্ষ, টয়লেট, খাবারঘর, পাঠকক্ষ, প্রার্থনার স্থান ও সাধারণ ব্যবহার্য কক্ষ এবং প্রবেশপথ যদি ব্যবহার অনুপযোগী হয়, তাহলে অগ্রাধিকার কার্যত অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। তাই প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসননীতির চারটি স্তর থাকা প্রয়োজন: প্রথমত, বরাদ্দ—প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্রাধিকার। দ্বিতীয়ত, ভৌত প্রবেশগম্যতা—কক্ষ পর্যন্ত পৌঁছানো এবং অপরিহার্য সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার।
তৃতীয়ত, সহায়তার ব্যবস্থা—প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত সহায়তা, জরুরি সহায়তা বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় যুক্তিসংগত সমন্বয়। চতুর্থত, মর্যাদা ও স্বাধীনতা—সাহায্যের নামে শিক্ষার্থীকে অপ্রয়োজনীয় পরনির্ভরতাতে না ঠেলে দেওয়া। অর্থাৎ প্রবেশগম্য হল মানে শুধু র্যাম্প নয়; এটি একটি সম্পূর্ণ ব্যবহারোপযোগী আবাসিক পরিবেশ।
উচ্চশিক্ষায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন ও পরিবহনকে গৌণ সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী গ্রাম, মফস্বল ও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। তাঁদের জন্য নিরাপদ আবাসন একটি প্রয়োজনীয় শর্ত। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই প্রয়োজন আরও জটিল হতে পারে। একটি হলের প্রবেশদ্বারে র্যাম্প থাকলেই হলটি ব্যবহারোপযোগী হয়ে যায় না। প্রয়োজন ব্যবহারযোগ্য শয়নকক্ষ, টয়লেট, খাবারঘর, পাঠকক্ষ ও সাধারণ ব্যবহার্য স্থান এবং জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা।
একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ওঠার ব্যবস্থা যদি একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর জন্য অনুপযোগী হয়, তাহলে সেই শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন উচ্চমূল্যের বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। এখানে সমতার বিষয়টি শুধু ভৌত অবকাঠামো নয়; অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। যে শিক্ষার্থী সহপাঠীদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে যেতে পারেন না, যাঁকে হলে থাকতে অন্যের সহায়তা নিতে হয়, যাঁর প্রতিটি ক্লাসে যাওয়ার জন্য আলাদা ব্যবস্থা প্রয়োজন—তাঁর শিক্ষাব্যয়, সময় ও মানসিক চাপ অন্যদের তুলনায় বেড়ে যেতে পারে।
সুতরাং অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণে আবাসন ও পরিবহনকে শিক্ষা-অংশগ্রহণের অবিচ্ছেদ্য উপাদান হিসেবে দেখতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাস্তব সমস্যা হলো তার অনেক ভবন ঐতিহাসিক এবং বহু দশক আগে নির্মিত। পাল্টা যুক্তি আসতে পারে—সব পুরোনো ভবন একদিনে ব্যবহারোপযোগী করা বাস্তবসম্মত নয়। সব পুরোনো ভবন একদিনে প্রবেশগম্য করা বাস্তবসম্মত নয়—এই পাল্টা যুক্তির বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। অর্থায়ন, স্থাপত্য, নির্মাণপ্রযুক্তি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করেই পরিকল্পনা করতে হবে। প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার পরিবর্তনের আর্থিক ও স্থাপত্যগত এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা আছে।
কিন্তু এই বাস্তবতা থেকে দুটি ভিন্ন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত: পুরোনো ভবন, তাই কিছু করার নেই। আরেকটি অধিকারভিত্তিক সিদ্ধান্ত: সব একদিনে সম্ভব নয়, তাই অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রবেশগম্যতা বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। র্যাম্প যেখানে সম্ভব, লিফট বা প্ল্যাটফর্ম লিফট, ব্যবহারোপযোগী টয়লেট, হাতল, স্পর্শনির্ভর দিকনির্দেশক চিহ্ন, ক্লাস ব্যবহারোপযোগী স্থানে সরিয়ে নেওয়া, বিকল্প পথ এবং ভবনভিত্তিক নিরীক্ষা—ক্রমশ করা যায়। এই বাস্তব সীমাবদ্ধতা থেকে অনির্দিষ্ট নিষ্ক্রিয়তার যৌক্তিকতা তৈরি হয় না। প্রযোজ্য আইন, প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও সামর্থ্য বিবেচনায় অগ্রাধিকার, সময়সীমা এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করে বাধা দূর করার কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষায়িত রিসোর্স সেন্টার রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান গ্রন্থাগারের তথ্যে “দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের রিসোর্স সেন্টার” এবং এর দায়িত্বে প্রধান প্রতিবন্ধিতা কর্মকর্তা ও শাখাপ্রধানের উল্লেখ পাওয়া যায়। গ্রন্থাগারের সচরাচর জিজ্ঞাসা বিভাগতেও জানানো হয়েছে যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের রিসোর্স সেন্টারটি কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের প্রশাসনিক ভবনেরের নিচতলায় অবস্থিত।
এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তার অবকাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি। কারণ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা স্বল্পদৃষ্টিসম্পন্ন শিক্ষার্থীর জন্য গ্রন্থাগারের প্রবেশগম্যতা শুধু ভবনে প্রবেশের প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হলো— তিনি বইটি পড়তে পারবেন কি? ডিজিটাল পাঠ্য কি স্ক্রিন রিডারে পাঠযোগ্য? তথ্যসূত্রের উপকরণ কি ব্যবহারোপযোগী বিন্যাসে পাওয়া যাবে? স্ক্যান করা PDF কি অনুসন্ধানযোগ্য পাঠ্য? গবেষণার তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করা যাচ্ছে?
ব্রেইল, অডিও বা ব্যবহারোপযোগী ইলেকট্রনিক পাঠ্য আছে? শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির গভীরতম জায়গাটি এখানেই। একজন শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে ঢুকতে পারলেও যদি জ্ঞানের ভাণ্ডারে স্বাধীনভাবে প্রবেশ করতে না পারেন, তাঁর উচ্চশিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধিকার বাস্তবায়নের অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা হলো পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সহায়তা ও সম্পদকেন্দ্র বা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সহায়তা দপ্তরের অপর্যাপ্ত উপস্থিতি। এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত পার্থক্য পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো রিসোর্স সেন্টার নেই—এমন বক্তব্য সঠিক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি রিসোর্স সেন্টার রয়েছে, যা ২০০৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও Sightsavers-এর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ওয়েবসাইটে এই কেন্দ্রের অবস্থান এবং ব্রেইল বই, বিশেষায়িত সফটওয়্যারসমৃদ্ধ কম্পিউটার ও ব্রেইল প্রিন্টারের মতো উপকরণের বিবরণ রয়েছে।
কিন্তু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষায়িত গ্রন্থাগারকেন্দ্র এবং সব ধরনের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অধিকার বাস্তবায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ব্যাপী পূর্ণাঙ্গ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সহায়তা ও সম্পদকেন্দ্র একই প্রতিষ্ঠান নয়। প্রথমটি নির্দিষ্ট শিক্ষাসামগ্রী ও পাঠসহায়তা প্রদান করতে পারে। দ্বিতীয়টির দায়িত্ব হবে ভর্তি, বিভাগীয় পাঠদান, পরীক্ষা, আবাসন, সহায়ক প্রযুক্তি, যোগাযোগ, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং উচ্চশিক্ষা থেকে কর্মজীবনে উত্তরণের পুরো প্রক্রিয়াকে সমন্বয় করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে বিদ্যমান কেন্দ্রটির দায়িত্বকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের প্রতিবন্ধিতা-সংক্রান্ত সেবার সমতুল্য ধরে নেওয়া যেমন ভুল, তেমনি কেন্দ্রটির অস্তিত্ব অস্বীকার করাও ভুল। প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য থেকে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে সব প্রতিবন্ধিতার জন্য পূর্ণাঙ্গ, কেন্দ্রীয়ভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত একটি সমন্বিত DRC-এর কার্যপরিধি নিশ্চিত করা যায়নি। সেটি নির্ধারণের জন্য প্রশাসনিক আদেশ, জনবলকাঠামো, বাজেট, সেবার তালিকা এবং প্রতিবেদন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য থেকে সব ধরনের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ব্যাপী, কেন্দ্রীয়ভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত একটি পূর্ণাঙ্গ সহায়তা ও সম্পদকেন্দ্রের কার্যপরিধি নিশ্চিত করা যায় না। গ্রন্থাগারের কেন্দ্রটিকে সব প্রতিবন্ধিতা-সংক্রান্ত সেবার সমতুল্য বলা যেমন ভুল, তেমনি তার অস্তিত্ব অস্বীকার করাও ভুল। পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা আছে কি না, তা নির্ধারণ করতে প্রশাসনিক আদেশ, জনবলকাঠামো, বাজেট, সেবার তালিকা ও প্রতিবেদন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী কোথায় যাবেন? একজন অটিস্টিক শিক্ষার্থী পরীক্ষার পরিবেশসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের আবেদন জানালে কার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন? একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীর বিভাগ ও হলের প্রবেশগম্যতা সমস্যা সমাধানের সমন্বয় কে করবেন? একজন দৃষ্টিশ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর যোগাযোগসহায়তার দায়িত্ব কোন অফিস নেবে?
যদি প্রতিটি সমস্যার জন্য শিক্ষার্থীকে আলাদা আলাদা প্রশাসনিক দরজায় যেতে হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত তাঁর কাছেই সেই সমন্বয়ের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়, যা প্রতিষ্ঠানটির নিজের করার কথা। এটি যেন এমন একটি হাসপাতাল, যেখানে চিকিৎসক, পরীক্ষাগার, ওষুধ ও জরুরি বিভাগ সবই আছে, কিন্তু রোগীকে নিজেকেই প্রতিটি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় করতে হয়। অধিকারভিত্তিক একটি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সহায়তা ও সম্পদকেন্দ্র এই প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতা দূর করার ব্যবস্থা।
প্রতিবন্ধিতা অনেক সময় অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি করে—পরিবহন, সহায়ক উপকরণ, ব্যক্তিগত সহায়তা, চিকিৎসাসহায়তা, ব্যবহারোপযোগী আবাসন এবং প্রযুক্তির খরচ। তাই আর্থিক সহায়তা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির আবেদন আহ্বানের তথ্য পাওয়া যায়। শিক্ষাবর্ষ এবং অর্থবছর এক নয়; সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তির সময়কাল ও শর্ত সেই পার্থক্য মেনেই পড়তে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রকাশিত কার্যবিবরণীর তথ্য হিসেবে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বেতন মওকুফ এবং স্নাতক পর্যায়ে মাসিক ১,২০০ টাকা ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে মাসিক ১,৫০০ টাকা হারে এক বছর মেয়াদি উপবৃত্তির সিদ্ধান্তের উল্লেখ রয়েছে। এগুলো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের তথ্য; সব শিক্ষার্থীর জন্য বর্তমানে একই হার কার্যকর—এমন সাধারণ দাবি করার আগে সংশ্লিষ্ট কার্যবিবরণী, যোগ্যতার শর্ত ও কার্যকারিতার সময়কাল মিলিয়ে দেখতে হবে।
এর আগে মেধাবী প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বৃত্তির ব্যবস্থার তথ্যও বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশ করেছে। এসব উদ্যোগ মূল্যবান। তবে এখানেও নীতিগত পার্থক্য জরুরি। বৃত্তি শিক্ষার্থীর ব্যয় বহনে সহায়তা করে; প্রবেশগম্যতা তাঁর অংশগ্রহণের বাধা দূর করে। দুটির একটি দিয়ে অন্যটির প্রয়োজন মেটে না। একজন শিক্ষার্থীকে মাসিক বৃত্তি দেওয়া হলো, কিন্তু তাঁর শ্রেণিকক্ষ ব্যবহার অনুপযোগী—তাহলে অর্থ তাঁর শিক্ষাগ্রহণের বাধা দূর করবে না। বৃত্তি পেয়েও কোনো শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে না পারলে তাঁর শিক্ষাগ্রহণের বাধা রয়ে যায়। আবার ভবনে র্যাম্প থাকলেও প্রয়োজনীয় সহায়ক উপকরণ কেনার সামর্থ্য না থাকলে পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় না। —তাই আর্থিক সহায়তা ও প্রবেশগম্যতার উদ্যোগকে পরস্পরের পরিপূরক নীতি হিসেবে নিতে হবে। একটি দিয়ে অন্যটির প্রয়োজন পূরণ হয় না।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। অনলাইন ভর্তি, ইলেকট্রনিক নোটিশ, ডিজিটাল গ্রন্থাগার, অনলাইন ফলাফল, শিক্ষণ ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইন গবেষণার উপকরণ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু ডিজিটাল রূপান্তর এবং প্রবেশগম্যতা সমার্থক নয়। একটি ওয়েবসাইট আধুনিক, আকর্ষণীয় ও প্রযুক্তিনির্ভর হতে পারে; তবু স্ক্রিন রিডারের মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্য নাও হতে পারে। একটি ভর্তি পোর্টালে CAPTCHA থাকতে পারে, যা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আবেদনকারী স্বাধীনভাবে সম্পন্ন করতে পারেন না।
একটি পরীক্ষার ফলাফল শুধু ছবির বিন্যাসে প্রকাশ করা হতে পারে, যা সহায়ক প্রযুক্তি দিয়ে পড়া কঠিন। একটি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন ক্লাসের ভিডিও আপলোড করতে পারে, কিন্তু লিখিত ভাষ্য বা বক্তৃতার লিখিত প্রতিলিপি না থাকায় শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী তথ্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এভাবে প্রযুক্তি, যা হওয়ার কথা ছিল স্বাধীনতার মাধ্যম, তা নতুন পরনির্ভরতা সৃষ্টি করতে পারে। এটিকে বলা যায় ডিজিটাল রূপান্তরের ভেতরে ডিজিটাল বঞ্চনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল অবকাঠামো পরিকল্পনায় তাই Web Content Accessibility Guidelines (WCAG)-এর মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রবেশগম্যতা মানদণ্ড বিবেচনা করা জরুরি।
ডিজিটালভাবে প্রবেশগম্য বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির অর্থ শুধু প্রযুক্তি কেনা নয়। বরং প্রযুক্তি উন্নয়ন, ক্রয়, ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং মূল্যায়নের প্রতিটি পর্যায়ে প্রবেশগম্যতা অন্তর্ভুক্ত করা। বিশেষত বাংলা ভাষায় স্ক্রিন রিডারে ব্যবহারযোগ্যতা, পাঠযোগ্য ইউনিকোড লেখা, বাংলা লিখিত ভাষ্য তৈরি, লেখাকে কথায় রূপান্তর এবং কথাকে লেখায় রূপান্তর প্রযুক্তির উন্নয়ন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ দিতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি গবেষণামুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি শুধু সেবাদান নয়; জাতীয় পর্যায়ে প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তির জ্ঞানভিত্তি তৈরির সম্ভাবনাও।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে আলোচনা সাধারণত ভর্তি, বৃত্তি, আবাসিক সুবিধা কিংবা পরীক্ষায় শ্রুতিলেখক পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে শিক্ষার্থী শুধু জ্ঞান গ্রহণ করেন না; গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞানও সৃষ্টি করেন। তাই প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করতে হলে তাঁদের গবেষণা, স্নাতকোত্তর শিক্ষা, গবেষণাগার, ফিল্ডওয়ার্ক ও একাডেমিক প্রকাশনায় অংশগ্রহণের সুযোগ পরীক্ষা করা অপরিহার্য।
ধরা যাক, একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তর পর্যায়ে একটি গবেষণাপত্র লিখতে চান। তাঁর গবেষণার বিষয় নির্ধারিত হয়েছে, তত্ত্বাবধায়কও আছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিক জার্নাল, গবেষণা ডেটাবেজ এবং পুরোনো থিসিস এমনভাবে সংরক্ষিত, যা স্ক্রিন রিডারের সাহায্যে পড়া যায় না। তিনি গবেষণা করতে চান, কিন্তু গবেষণার উপকরণে তাঁর স্বাধীন প্রবেশাধিকার নেই।
এখানে তাঁর মূল সমস্যা গবেষণাক্ষমতার অভাব নয়। সমস্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানভাণ্ডারের প্রবেশগম্যতা। একইভাবে একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী গবেষক সেমিনার, গবেষণা উপস্থাপনা কিংবা মৌখিক পরীক্ষাতে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে যোগাযোগ-প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে পারেন। একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী গবেষক গবেষণাগার বা ফিল্ডওয়ার্কে প্রয়োজনীয় পরিবেশগত সমন্বয় ছাড়া অংশ নিতে অসুবিধায় পড়তে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় যদি শুধু ভর্তি এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ব্যবস্থা করে, কিন্তু গবেষণায় সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে, তাহলে অন্তর্ভুক্তি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
যে বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানের দরজা খোলা, কিন্তু জ্ঞান সৃষ্টির কর্মশালায় প্রবেশের পথ বন্ধ—সেখানে একাডেমিক সমতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এই কারণে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সহায়তা ও সম্পদকেন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হওয়া উচিত স্নাতকোত্তর গবেষণাসহায়তা। গবেষণার উপকরণ ব্যবহারোপযোগী বিন্যাসে রূপান্তর, গবেষণাগারে প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয়, উপযোগী গবেষণার সফটওয়্যার, ব্যবহারোপযোগী তথ্য বিশ্লেষণের উপকরণ এবং গবেষণা উপস্থাপনায় যোগাযোগসহায়তা—এসবই আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তির অংশ।
কিছু প্রতিবন্ধিতা শিক্ষার্থী আচরণে এমন বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করতে পারে, যা প্রয়োজনীয় ধারণা নেই এমন পর্যবেক্ষক অসহযোগিতা বা শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে ভুল বুঝতে পারেন। অটিস্টিক শিক্ষার্থী ইন্দ্রিয়গত অতিরিক্ত উদ্দীপনার চাপের কারণে শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারেন। মনোসামাজিক প্রতিবন্ধিতা থাকা কোনো শিক্ষার্থী সংকটের মুখোমুখি হতে পারেন। এ ধরনের পরিস্থিতি বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় সচেতনতা ও সহায়তা জরুরি।
যোগাযোগপ্রতিবন্ধিতা থাকা শিক্ষার্থী দ্রুত সাড়া দিতে নাও পারেন। এখানে শৃঙ্খলানীতির সঙ্গে প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে সচেতনতার সংযোগ জরুরি। এর অর্থ অসদাচরণ মাফ করে দেওয়া নয়। বরং শৃঙ্খলাসংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় দেখতে হবে—আচরণের সঙ্গে প্রতিবন্ধিতাসংশ্লিষ্ট প্রয়োজনের সম্পর্ক আছে কি না এবং প্রয়োজনীয় সমন্বয় দেওয়া হয়েছিল কি না। আইনের শাসন এবং প্রতিবন্ধিতার কারণে প্রয়োজনীয় সমন্বয় পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।
সব প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী একই অবস্থান থেকে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করেন না। একজন শহুরে, আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর সুযোগের সঙ্গে প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবারের একই ধরনের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর সুযোগ এক নয়। একজন প্রতিবন্ধী নারী শিক্ষার্থীকে শিক্ষা ও চলাচলের প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি নিরাপত্তা, সামাজিক বিধিনিষেধ এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হতে পারে। আবার বধির নারী, আদিবাসী প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী কিংবা বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা আরও ভিন্ন হতে পারে।
এটিই বহুমুখী বৈষম্যের আন্তঃসম্পর্কের প্রশ্ন—একাধিক সামাজিক ও কাঠামোগত বৈষম্য কীভাবে পরস্পরকে শক্তিশালী করে। বিশ্ববিদ্যালয় যদি শুধু প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের একটি একক প্রশাসনিক শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে এই পার্থক্যগুলো আড়ালে থেকে যাবে। একটি ন্যায়সংগত অন্তর্ভুক্তি নীতিতে তাই প্রতিবন্ধিতার পাশাপাশি লিঙ্গ, দারিদ্র্য, ভৌগোলিক বঞ্চনা ও ভাষা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।
কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের রিসোর্স সেন্টার থাকা মূল্যবান। তবে সব ধরনের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রয়োজন গ্রন্থাগারভিত্তিক সহায়তার চেয়ে বিস্তৃত। পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র গঠনের প্রস্তাব এই বাস্তবায়ন প্রয়োজন থেকেই আসে; ১৯৭৩ সালের আদেশে নির্দিষ্ট নামে এমন কেন্দ্র স্থাপনের সরাসরি নির্দেশ রয়েছে—এমন দাবি নয়।
ভর্তি, পাঠদান, পরীক্ষা, সহায়ক প্রযুক্তি, হল, বৃত্তি, মনোসামাজিক পরামর্শ, পরিবহন ও অভিযোগ নিয়ে একজন শিক্ষার্থীকে যদি একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হয়, তাহলে সেবা থাকলেও তা পাওয়া দুরূহ হয়। প্রতিটি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের ভার শিক্ষার্থীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়। তাই একটি কেন্দ্রীয় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সহায়তা ও সম্পদকেন্দ্র বা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সহায়তা দপ্তর হতে পারে এক জায়গা থেকে সমন্বিত সেবা পাওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। সেখানে থাকতে পারে— ব্যক্তির প্রয়োজন মূল্যায়ন, যুক্তিসংগত সমন্বয় পরিকল্পনা, শিক্ষকদের সঙ্গে পরামর্শ, সহায়ক প্রযুক্তিসেবা, উপকরণ ব্যবহারোপযোগী বিন্যাসে রূপান্তর, ইশারা ভাষার সেবা সমন্বয়, পরীক্ষায় প্রয়োজনীয় সমন্বয়, হলের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার সমন্বয়, কর্মজীবনে উত্তরণের সহায়তা, এবং অভিযোগের প্রতিকার।
একটি আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সহায়তা ও সম্পদকেন্দ্রের ভূমিকা কেবল প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কয়েকটি কম্পিউটার, ব্রেইল বই বা হুইলচেয়ার রাখা নয়। এটি হতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে প্রবেশগম্যতা, প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও অন্তর্ভুক্তির কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রটির অধীনে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বসহ একটি কার্যকর পরামর্শব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এখানে আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আন্দোলনের একটি মৌলিক দর্শন প্রাসঙ্গিক—“আমাদের ছাড়া আমাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নয়।” অর্থাৎ প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়ে সিদ্ধান্ত তাঁদের অংশগ্রহণ ছাড়া নেওয়া যাবে না।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নীতিমালা তৈরি হলো। সেখানে শিক্ষক, কর্মকর্তা, স্থপতি, প্রকৌশলী এবং প্রশাসকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হলো। কিন্তু কোনো প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে কমিটিতে রাখা হলো না। নীতিমালাটির উদ্দেশ্য ভালো হতে পারে। সদস্যদের আন্তরিকতাও প্রশ্নাতীত হতে পারে। তবু একটি মৌলিক ঘাটতি থেকে যায়—যাঁদের জন্য নীতি, তাঁদের অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে নেই। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ ছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি নীতি তৈরি করা অনেকটা নদীর স্রোত না বুঝে তীর থেকে নৌকার নকশা আঁকার মতো। নকশা সুন্দর হতে পারে, কিন্তু নদীতে নামার পর বোঝা যায় কোথায় স্রোত, কোথায় ঘূর্ণি, কোথায় অগভীর পানি।
একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী জানেন কোন ভবনের র্যাম্প বাস্তবে ব্যবহার করা যায় না। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী জানেন কোন ওয়েবসাইটের আবেদন ফর্ম স্ক্রিন রিডারে কাজ করে না। একজন বধির শিক্ষার্থী জানেন কোন ধরনের শ্রেণিকক্ষের যোগাযোগ তাঁর শেখার উপযোগী। একজন অটিস্টিক শিক্ষার্থী জানেন কোন পরিবেশ তাঁকে অতিরিক্ত ইন্দ্রিয়গত চাপের মুখে ফেলে।
সুতরাং তাঁদের অভিজ্ঞতা নিছক ব্যক্তিগত গল্প নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনার জন্য মূল্যবান অভিজ্ঞতালব্ধ প্রমাণ। এই কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিল, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কমিটি, হল প্রশাসন, শিক্ষার্থীকল্যাণের ব্যবস্থা এবং প্রবেশগম্যতার পরিকল্পনার সঙ্গে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পরামর্শমূলক ও প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তবে প্রতিনিধিত্ব যেন কেবল আনুষ্ঠানিক না হয়। একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে কমিটিতে বসিয়ে তাঁর মতামত সিদ্ধান্তে বিবেচনা না করলে সেটি প্রকৃত অংশগ্রহণ নয়; সেটি নামমাত্র প্রতিনিধিত্ব।
অধিকারভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা শুধু সহায়তার আবেদন করবেন না, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি, গবেষণা, সাংস্কৃতিক জীবন এবং নেতৃত্বেও সক্রিয় অংশীদার হবেন।
একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য অধিকার বাস্তবায়নের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি হলো—সমস্যা হলে প্রতিকার কোথায় পাওয়া যাবে? ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থী লিখিতভাবে পরীক্ষায় যুক্তিসংগত সমন্বয় চেয়েছেন। আবেদন নিষ্পত্তি হচ্ছে না। তাঁর পরীক্ষা এগিয়ে আসছে। বিভাগ বলছে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের অনুমতি প্রয়োজন; পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলছেন বিভাগের সুপারিশ প্রয়োজন। এই অবস্থায় শিক্ষার্থীর অধিকার আইনের পাতায় থাকলেও সময়মতো কার্যকর হচ্ছে না। তাই অভিযোগের প্রতিকারব্যবস্থার প্রয়োজন শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়; সময়োপযোগী এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত।
শিক্ষার্থীদের জন্য একটি প্রবেশগম্য অভিযোগব্যবস্থা থাকা উচিত, যেখানে লিখিত, ডিজিটাল, মৌখিক অথবা উপযোগী যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ দেওয়া যাবে। অভিযোগের নিষ্পত্তিতে নির্ধারিত সময়সীমা থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আপিলব্যবস্থা থাকতে হবে। যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি যথাযথ পর্যালোচনা ব্যবস্থাও প্রয়োজন। বিশেষ করে ভর্তি-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধিতাভিত্তিক বৈষম্যের ক্ষেত্রে ২০১৩ সালের আইনের ৩৩ ধারায় নির্দিষ্ট প্রতিকারপথ রয়েছে। অন্যান্য অভিযোগের ক্ষেত্রে বিষয়ভেদে প্রাসঙ্গিক বিধিবদ্ধ কমিটি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ, প্রশাসনিক প্রতিকার এবং প্রযোজ্য বিচারিক পথ পরীক্ষা করতে হবে।
প্রতিটি সমস্যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদালতে যাওয়ার বিষয় নয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কার্যকর সমাধান না থাকলে অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যয় ও জটিলতা বেড়ে যায়। অধিকার তখনই বাস্তব, যখন তার লঙ্ঘনের প্রতিকারও বাস্তবে পাওয়া যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকদের গবেষণা এবং প্রকাশিত শিক্ষক পরিচিতি ও বার্ষিক প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশগম্যতা ও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কাজের উল্লেখ রয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপান্তর নিয়ে একটি গবেষণার শিরোনামও সেখানে পাওয়া যায়: Accessibility and Inclusion of Students with Disabilities in University of Dhaka: Transforming the University in Line with Sustainable Development Goals।—এই গবেষণাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনার প্রয়োজন সামনে আনে।
এ ধরনের গবেষণা অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নটির গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে কোনো গবেষণার শিরোনাম বা অস্তিত্ব থেকেই ক্যাম্পাসের সব ঘাটতি প্রমাণিত হয় না; বাস্তব অবস্থা মূল্যায়নের জন্য গবেষণার পদ্ধতি, ফলাফল এবং সাম্প্রতিক নিরীক্ষাও দেখতে হবে। কিছু ব্যবস্থা থাকার পরও বৃহত্তর রূপান্তরের প্রয়োজন আছে কি না, সে আলোচনায় গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। অর্থাৎ প্রশ্নটি আর— “প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন?” এতটুকু নয়। প্রশ্ন হলো— “তাঁরা কীভাবে পড়েন?”
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় সমস্যা হলো প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী পৃথকীকৃত তথ্যের প্রাপ্যতা ও মান। কতজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন, কতজন ভর্তি হন, কতজন নিয়মিত ক্লাস করেন, কতজন যুক্তিসংগত সমন্বয় পান, কতজন সময়মতো ডিগ্রি সম্পন্ন করেন এবং কতজন বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে ঝরে পড়েন—এই তথ্যগুলো নিয়মিত, তুলনাযোগ্য ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। শুধু মোট প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর সংখ্যা জানাও যথেষ্ট নয়।—প্রতিবন্ধিতার ধরন, লিঙ্গ, সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা, অঞ্চল, বিষয়, শিক্ষাস্তর এবং আবাসন পরিস্থিতি অনুযায়ী তথ্য বিশ্লেষণ করতে হবে। তাহলেই বোঝা যাবে সমস্যার প্রকৃত অবস্থান কোথায়।
ধরা যাক, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি, কিন্তু শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি অত্যন্ত কম। এই পার্থক্য থেকে সরাসরি কোনো কারণ নিশ্চিত করা যাবে না। তবে এটি গবেষণার প্রশ্ন তৈরি করবে—ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, বিদ্যালয় পর্যায়ের সুযোগের ঘাটতি, ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগসহায়তার অভাব কি এর সঙ্গে সম্পর্কিত?
অনুরূপভাবে যদি কোনো বিভাগের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি সম্পন্ন করার হার কম দেখা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে বিভাগের শিক্ষণ-শিখন পরিবেশ পরীক্ষা করতে হবে। এক্ষেত্রে তথ্যসংগ্রহও অধিকারসম্মত হওয়া জরুরি। প্রতিবন্ধিতা-সংক্রান্ত তথ্য সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য; শিক্ষার্থীর সম্মতি, গোপনীয়তা, তথ্যসুরক্ষা এবং প্রকাশের ক্ষেত্রে পরিচয় শনাক্তকরণের ঝুঁকি বিবেচনা করতে হবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে গণনার বিষয়বস্তু বানাবে না; বরং সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করবে তাঁর সুযোগ সম্প্রসারণে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন বা ইউজিসি উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা, অর্থায়ন-সংক্রান্ত সুপারিশ, মানোন্নয়ন ও সমন্বয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে কতটা সমন্বিত নির্দেশনা রয়েছে—এ প্রশ্ন এখন বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
ইউজিসি প্রকাশিত Strategic Plan for Higher Education in Bangladesh: 2018–2030 উচ্চশিক্ষার অবকাঠামো, প্রযুক্তি, পাঠদান, গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিস্তৃত পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। কিন্তু শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করলেই তা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারযোগ্য হয়ে যায় না। নতুন শিক্ষাভবন তৈরি হলেও সেখানে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত না থাকলে উন্নয়ন প্রকল্পই নতুন বৈষম্যের কাঠামো তৈরি করতে পারে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত Bangladesh Journal of Public Administration-এর একটি গবেষণায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য সমন্বিত অন্তর্ভুক্তি নীতির ঘাটতি তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের কথা এবং একটি সুসংহত জাতীয় নীতির প্রয়োজনীয়তা আলোচিত হয়েছে। অবশ্য সেই গবেষণার পর্যবেক্ষণকে ২০২৬ সালের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান নীতিগত অবস্থার চূড়ান্ত নিরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।
এখানে সংস্কারের একটি বড় সুযোগ রয়েছে। ইউজিসি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক মান নিশ্চিতকরণ সেলের কার্যক্রম, কৌশলগত পরিকল্পনা, বার্ষিক প্রতিবেদন এবং প্রকল্প মূল্যায়নের সঙ্গে প্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্তির সূচক যুক্ত করে, তাহলে প্রতিবন্ধিতা আর বিচ্ছিন্ন কল্যাণমূলক কার্যক্রমের বিষয় থাকবে না; এটি উচ্চশিক্ষার মান নির্ধারণের নিয়মিত অংশ হয়ে উঠবে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারের যন্ত্রপাতি, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা এবং ভবন নির্মাণের হিসাব থাকে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ভবনের কত শতাংশ হুইলচেয়ার ব্যবহারোপযোগী, কতটি পাঠ্যক্রম ব্যবহারোপযোগী শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করে, কতজন শিক্ষার্থী যুক্তিসংগত সমন্বয় পেয়েছেন এবং কতজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী অধ্যয়ন অসম্পূর্ণ রেখে চলে গেছেন—এসব তথ্যও সমান গুরুত্ব পাওয়ার কথা।—যে বিষয়টি পরিমাপই করা হয় না, সেটি উন্নয়নের পরিকল্পনায় প্রায়ই অদৃশ্য থেকে যায়।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্তি নিয়ে আলোচনা প্রায়ই নৈতিক অঙ্গীকারের স্তরে থাকে। কিন্তু বাস্তবায়নের প্রশ্ন উঠলেই অর্থের অভাব সামনে আসে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় বলতে পারে—আমরা অন্তর্ভুক্তি সমর্থন করি, কিন্তু ব্যবহারোপযোগী লিফট নির্মাণ, বিশেষায়িত সফটওয়্যার, ব্রেইল প্রিন্টার, লিখিত ভাষ্য তৈরি বা ইশারা ভাষার দোভাষীসেবার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নেই। আর্থিক সীমাবদ্ধতা বাস্তব। বিশেষত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা, অবকাঠামো ও পরিচালনব্যয়ের চাপ অনেক। কিন্তু বাজেটের সীমাবদ্ধতা থেকে অধিকার বাস্তবায়নের পুরো দায়িত্ব অস্বীকার করা যায় না। এখানে প্রয়োজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন বিবেচনায় বাজেট প্রণয়ন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন বাজেটে নতুন ভবনের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা হলে পরে ব্যয়বহুল সংস্কারের প্রয়োজন কমতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির সময় ব্যবহারোপযোগী নকশা গ্রহণ করলে পরবর্তী সংশোধনের খরচও হ্রাস পেতে পারে। শিক্ষক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষণপদ্ধতি যুক্ত করা হলে পৃথক প্রশিক্ষণের অতিরিক্ত ব্যয় কমানো সম্ভব।
অর্থাৎ অন্তর্ভুক্তিকে পরিকল্পনার শুরুতেই যুক্ত করলে অনেক ক্ষেত্রে তা দীর্ঘমেয়াদে আরও কার্যকর ও অর্থসাশ্রয়ী হতে পারে। তবে সব অধিকার বাস্তবায়নকে কেবল খরচ-সাশ্রয়ের যুক্তি দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। কোনো ব্যবস্থা প্রয়োজনীয় ও অধিকারসম্মত হতে পারে, যদিও তার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট আসলে তার অগ্রাধিকারের একটি নৈতিক দলিলও। কোন খাতে অর্থ দেওয়া হচ্ছে, কোন খাত দীর্ঘদিন উপেক্ষিত থাকছে—সেই সিদ্ধান্তেই প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধের বাস্তব প্রতিফলন পাওয়া যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়তাসেবা গড়ে উঠেছে। এগুলো থেকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। যেমন: যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের Disabled Students' Program, যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজের Accessibility and Disability Resource Centre এবং অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার সেবা শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত প্রয়োজন মূল্যায়ন, শিক্ষায় প্রয়োজনীয় সমন্বয়, সহায়ক প্রযুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ মডেল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের আইনগত কাঠামো, অর্থায়ন এবং সেবার পরিধি এক নয়। বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি বিদেশি মডেল অনুকরণ করলেই সফল হবে—এমন নয়। প্রয়োজন বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা, বাংলা ভাষা, সীমিত অর্থায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে উপযোগী করে ব্যবস্থা তৈরি করা।
উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের ছোট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম পর্যায়ে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা কঠিন হতে পারে। সেখানে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় মিলে একটি আঞ্চলিক সহায়ক প্রযুক্তিকেন্দ্র চালু করতে পারে। কিন্তু প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে অবশ্যই নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের কার্যপ্রণালি এবং শিক্ষার্থী-সহায়তার মৌলিক ব্যবস্থা থাকা উচিত।
উন্নত দেশের অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অধিকার নিশ্চিত করা কোনো একজন সহানুভূতিশীল শিক্ষকের ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনব্যবস্থার নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজ।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় একটি নীতি কেন্দ্রীয় গুরুত্ব পাওয়া উচিত—পরিকল্পনায় প্রবেশগম্যতা এবং অধিকার হিসেবে প্রয়োজনীয় সমন্বয়। এর অর্থ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন, ওয়েবসাইট, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা, গবেষণাগার ও শিক্ষাসেবাগুলো শুরু থেকেই যতটা সম্ভব সবার ব্যবহারোপযোগী করে পরিকল্পনা করা হবে। এরপরও কোনো শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ না হলে যুক্তিসংগত সমন্বয়ের মাধ্যমে সেই প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা থাকবে। এখানে দুটি ধারণা পরস্পরকে সম্পূরক করে।
সর্বজনীন নকশা সাধারণ পরিবেশকে যতটা সম্ভব সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য করে। যুক্তিসংগত সমন্বয় ব্যক্তির নির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বা সমন্বয় নিশ্চিত করে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ভিডিওতে লিখিত ভাষ্য থাকলে অনেক শিক্ষার্থী উপকৃত হবেন। কিন্তু একজন নির্দিষ্ট বধির শিক্ষার্থীর হয়তো মৌখিক পরীক্ষাতে একজন দক্ষ বাংলা ইশারা ভাষার দোভাষী প্রয়োজন হবে। প্রথমটি সর্বজনীন নকশার উদাহরণ, দ্বিতীয়টি ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রয়োজনীয় সমন্বয়।
ডিজিটাল অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত Web Content Accessibility Guidelines (WCAG) 2.2 একটি কার্যকর মানদণ্ড। এটি মূলত ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল কনটেন্টকে উপলব্ধিযোগ্য, পরিচালনাযোগ্য, বোধগম্য ও প্রযুক্তিগতভাবে নির্ভরযোগ্য করার নির্দেশনা দেয়। তবে WCAG অনুসরণ করা এবং শিক্ষার্থীর প্রতিটি ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণ করা সম্পূর্ণ একই বিষয় নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর তাদের শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন ও অবকাঠামো নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। কিন্তু প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তির জন্য আলাদা একটি প্রতিবন্ধিতা অন্তর্ভুক্তি ও প্রবেশগম্যতাবিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন চালু করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জবাবদিহিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটতে পারে।
এই প্রতিবেদনে জানানো যেতে পারে, কতজন শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় সহায়তা চেয়েছেন, কতজন তা পেয়েছেন, কতটি ভবনের প্রবেশগম্যতার নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে, কতগুলো পরীক্ষায় প্রয়োজনীয় সমন্বয় দেওয়া হয়েছে এবং প্রবেশগম্যতার উন্নয়নের জন্য কত অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয় হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত প্রতিবন্ধিতা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ না করেই এসব সমষ্টিগত সূচক প্রতিবেদন করা সম্ভব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কিছু পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। যেমন—প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের আবেদনের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি, নতুন ভবনে প্রবেশগম্যতার মানদণ্ড অনুসরণ, ডিজিটাল ওয়েবসাইটের নিয়মিত প্রবেশগম্যতা যাচাই এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অধ্যয়ন অব্যাহত রাখা ও ডিগ্রি সম্পন্ন করার ফলাফল পর্যবেক্ষণ।—এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন শুধু ঘোষণা করবে না যে তারা অন্তর্ভুক্তিকে গুরুত্ব দেয়; তারা প্রমাণও দেখাতে পারবে যে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হচ্ছে।
১৯৭৩ সালের আইন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর নাম নেয়নি। কিন্তু আইনটির মৌলিক কাঠামো বলছে— বিশ্ববিদ্যালয় সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং শিক্ষাদান পরিচালনা করবে; বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর আবাসন নিয়ন্ত্রণ করবে; বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের উন্নয়নে ব্যবস্থা নেবে; বিশ্ববিদ্যালয় সংবিধি ও অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বিধিবিধান তৈরি করবে। এর সঙ্গে সংবিধানের সমতার কাঠামো, ২০১৩ সালের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকারবিষয়ক আইন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোটা, শ্রুতিলেখকের ব্যবস্থা, বৃত্তি, বেতন বা ফি মওকুফ, রিসোর্স সেন্টার ও সংরক্ষিত আবাসিক সুবিধা মিলিয়ে পড়লে একটি বিষয় স্পষ্ট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অন্তর্ভুক্তি কোনো ঐচ্ছিক দাতব্য কার্যক্রম নয়।
এই সমন্বিত পাঠে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তিকে ঐচ্ছিক দাতব্য কাজ হিসেবে দেখার অবকাশ থাকে না। জাতীয় আইনে স্বীকৃত অধিকার বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিক্ষাগত দায়িত্ব রয়েছে; নির্দিষ্ট দায়িত্বের পরিসর সংশ্লিষ্ট বিধান ও পরিস্থিতি অনুসারে নির্ধারিত হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক ইতিবাচক উপাদান আছে—ভর্তি-কোটা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী প্রার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যবস্থা, গ্রন্থাগারের রিসোর্স সেন্টার, বৃত্তি, বেতন বা ফি মওকুফ এবং কিছু হলে সংরক্ষিত আবাসনের ব্যবস্থা। কিন্তু এগুলোকে একটি সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালাতে একত্র করা এখন জরুরি।
একটি পূর্ণাঙ্গ নীতি অন্তত ভর্তি, ব্যবহারোপযোগী মূল্যায়ন, যুক্তিসংগত সমন্বয়, সর্বজনীন নকশা, ডিজিটাল প্রবেশগম্যতা, হলের আসন বরাদ্দে অগ্রাধিকার, ব্যবহারোপযোগী আবাসন, সহায়ক প্রযুক্তি, বৃত্তি, পরিবহন, মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অভিযোগের প্রতিকার, জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা এবং কর্মজীবনে উত্তরণ পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। কারণ একজন শিক্ষার্থীর যাত্রা ভর্তির দরজায় শুরু হলেও সেখানে শেষ হয় না।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে একটি জাতীয়ভাবে সমন্বিত কাঠামো প্রয়োজন।
এই সংস্কারগুলোকে একটি সুসংহত সময়ভিত্তিক পরিকল্পনায় রূপান্তর করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ও নৈতিক অবস্থান রয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু নিজস্ব নীতি তৈরির প্রতিষ্ঠান নয়; দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অনেক ক্ষেত্রে ধারণা, নেতৃত্ব ও অনুশীলনের উৎস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এ স্বায়ত্তশাসিত পরিচালনা, শিক্ষার্থীকল্যাণ, আবাসন ও বিধি প্রণয়নের যে ভিত্তি রয়েছে, তা বর্তমান প্রতিবন্ধিতা অধিকার আইনের সঙ্গে মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ব্যাপী অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া সম্ভব। এর জন্য বিদ্যমান ক্ষমতা, জাতীয় আইন এবং প্রশাসনিক দায়িত্বের সমন্বিত ব্যবহার প্রয়োজন।
এখানে তিনটি কাজ বিশেষ অগ্রাধিকার পেতে পারে। প্রথমত, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের রিসোর্স সেন্টারের বিদ্যমান অবকাঠামো ও অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দিয়ে এবং প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ঘটিয়ে বৃহত্তর বিশ্ববিদ্যালয়ব্যাপী প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী সহায়তা ও সম্পদকেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বিত করা। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অনুষদ, ইনস্টিটিউট, বিভাগ, হল এবং প্রশাসনিক দপ্তরের জন্য একটি অভিন্ন যুক্তিসংগত সমন্বয় কার্যপদ্ধতি চালু করা।
তৃতীয়ত, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সক্রিয় অংশগ্রহণে একটি প্রবেশগম্যতা ও অন্তর্ভুক্তি তদারকির স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক গবেষণা করেন, শিক্ষার্থী জ্ঞান অর্জন করেন, গবেষণাগার নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে। তাহলে সেই বিশ্ববিদ্যালয় কেন নিজের ক্যাম্পাসের প্রবেশগম্যতা সমস্যা সমাধানে গবেষণা, উদ্ভাবন ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণকে কাজে লাগাবে না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে প্রবেশগম্যতাকে শুধু নির্মাণ প্রকল্পের বিষয় না করে একটি আন্তঃবিষয়ক গবেষণা ও উদ্ভাবনের কর্মসূচিতে পরিণত করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও প্রকৌশল বিশেষজ্ঞরা সর্বজনীন নকশা নিয়ে কাজ করতে পারেন। কম্পিউটারবিজ্ঞান বিভাগ বাংলা ভাষার ব্যবহারোপযোগী প্রযুক্তি উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষণপদ্ধতি ও মূল্যায়ন নিয়ে কাজ করতে পারে। সমাজবিজ্ঞান, আইন ও উন্নয়ন অধ্যয়ন সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনব্যবস্থা বিশ্লেষণ করতে পারে। বিভাগীয় কাঠামো অনুযায়ী কাজ ভাগ করে এবং আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা নিয়ে এই উদ্যোগ এগোনো সম্ভব।
তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সেবা গ্রহণের স্থান হবে না; বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উচ্চশিক্ষার জ্ঞান, গবেষণা ও নীতিগত উদ্ভাবনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন—এটি অর্জন। তাঁর জন্য কোটা আছে—এটি সুযোগ। তাঁকে বৃত্তি দেওয়া হলো—এটি সহায়তা। তাঁর জন্য একটি রিসোর্স সেন্টার আছে—এটি প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতি। কিন্তু অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরীক্ষা আরও পরে। তিনি কি স্বাধীনভাবে বিভাগে যেতে পারেন? নিজে গ্রন্থাগার ব্যবহার করতে পারেন? বক্তৃতা বুঝতে পারেন? শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করতে পারেন? নিজের জ্ঞান পরীক্ষায় প্রকাশ করতে পারেন?
হলে মর্যাদার সঙ্গে থাকতে পারেন? সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিতর্ক, খেলাধুলা ও শিক্ষার্থী সংগঠন ও গবেষণায় অংশ নিতে পারেন? জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদে বের হতে পারেন? এবং সবচেয়ে বড় কথা—তাঁকে কি প্রথমে শিক্ষার্থী হিসেবে দেখা হয়, নাকি সব সময় তাঁর প্রতিবন্ধিতা দিয়েই পরিচয় নির্ধারণ করা হয়? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের আদেশ হয়তো এসব প্রশ্নের প্রতিটির আলাদা উত্তর লিখে যায়নি। কিন্তু তার একটি বাক্য এখনো বিশ্ববিদ্যালয়কে তাড়া করে: “বিশ্ববিদ্যালয় সকল ব্যক্তির জন্য উন্মুক্ত থাকবে.” একবিংশ শতাব্দীতে এই বাক্যের প্রকৃত অর্থ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটক বন্ধ না রাখা হতে পারে না।
এর অর্থ হওয়া উচিত—জ্ঞান, শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষা, প্রযুক্তি, হল, গ্রন্থাগার, সংস্কৃতি, নেতৃত্ব এবং বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের প্রতিটি দরজা এমনভাবে খুলে দেওয়া, যাতে প্রতিবন্ধিতা কোনো যোগ্য শিক্ষার্থীর সামনে অপ্রয়োজনীয় দেয়াল হয়ে না দাঁড়ায়। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকার অর্থে প্রতিবন্ধীবান্ধব কি না, তার সবচেয়ে সঠিক মাপকাঠি কতজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন—এ সংখ্যা নয়। মাপকাঠি হবে—ভর্তি হওয়ার পর তাঁদের আর কতবার বলতে হয়, “আমি এখানে পড়ার যোগ্য—কিন্তু ব্যবস্থাটি আমাকে পড়তে দিচ্ছে না।” যেদিন এই বাক্যটি আর কোনো শিক্ষার্থীকে বলতে হবে না, সেদিনই ১৯৭৩ সালের “সবার জন্য উন্মুক্ত” প্রতিশ্রুতি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জীবনেও পূর্ণ অর্থে বাস্তব হবে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিবন্ধীবান্ধব বলার জন্য তার প্রবেশদ্বারে একটি র্যাম্প থাকা যথেষ্ট নয়। যেমন একটি গ্রন্থাগারে ব্রেইল বইয়ের কয়েকটি তাক থাকলেই সব দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর শিক্ষাসামগ্রীতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয় না। অন্তর্ভুক্তি কোনো স্থির বস্তু নয়; এটি একটি চলমান প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি। একজন শিক্ষার্থী যখন ভর্তি হন, তখন তাঁর সামনে জ্ঞানের দরজা খোলে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে প্রবেশের পর যদি আরও অসংখ্য অদৃশ্য দরজা বন্ধ পাওয়া যায়, তাহলে উচ্চশিক্ষার সমতার প্রতিশ্রুতি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বাংলাদেশের আইন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শিক্ষার অধিকার স্বীকার করেছে। আন্তর্জাতিক সনদ উচ্চশিক্ষায় সমান অংশগ্রহণের নীতিগত ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছেও রয়েছে স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনিক ক্ষমতা, শিক্ষক, গবেষক, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো। তবু একটি প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায়। এত আইন, এত প্রতিষ্ঠান এবং এত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে কেন নিজের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বারবার নতুন করে সংগ্রাম করতে হবে?
একজন শিক্ষার্থী যদি পরীক্ষার আগে নিজের জন্য শ্রুতিলেখক খুঁজতে থাকেন, যদি ক্লাসে প্রবেশ করতে অন্যের সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করেন, যদি পাঠ্যবই পাওয়ার জন্য সহপাঠীর করুণার ওপর নির্ভর করেন, তবে তিনি কেবল ব্যক্তিগত সংগ্রাম করছেন না—তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অসম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভারও বহন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হওয়া উচিত সেই ভার কমানো, বাড়ানো নয়। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আগামী দিনের সংস্কারে তাই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যুক্ত করতে হবে— বিশ্ববিদ্যালয় কত বড়, কত পুরোনো, কত গবেষণাপত্র প্রকাশ করে কিংবা আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে কোথায় অবস্থান করে—এসবের পাশাপাশি জানতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিবন্ধী একজন শিক্ষার্থীর জন্য কতটা ব্যবহারযোগ্য, মর্যাদাপূর্ণ এবং ন্যায়সংগত?
কারণ উচ্চশিক্ষার সত্যিকারের উৎকর্ষ কেবল মেধাবীদের প্রবেশ নিশ্চিত করায় নয়; যাঁরা প্রবেশ করেছেন, তাঁদের প্রত্যেককে নিজের সক্ষমতার পূর্ণ বিকাশের সুযোগ দেওয়ায়। আইন একটি দরজা খুলে দিতে পারে। নীতিমালা সেই দরজায় পৌঁছানোর পথ তৈরি করতে পারে। কিন্তু অধিকারকে জীবন্ত করে তোলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন আচরণ, শিক্ষকের পাঠদান, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, বাজেটের অগ্রাধিকার এবং শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা।
যেদিন একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে নিজের অধিকারের জন্য প্রতিটি দরজায় আলাদা করে আবেদন করতে হবে না, যেদিন সহায়তা পাওয়া ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয় বরং স্বাভাবিক প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হবে, যেদিন তাঁর পরিচয়ের প্রথম শব্দ হবে ‘শিক্ষার্থী’—সেদিনই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইনগত অন্তর্ভুক্তি থেকে বাস্তব অন্তর্ভুক্তির দিকে একটি বড় পদক্ষেপ নেবে।
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু তখনই সবার জন্য উন্মুক্ত, যখন সেখানে সবার শেখার, থাকার, অংশগ্রহণ করার এবং মর্যাদার সঙ্গে সফল হওয়ার কার্যকর সুযোগ থাকে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মহত্ত্ব কেবল তার ভবনের উচ্চতায় নয়, বরং তার দরজাগুলো কত মানুষের জন্য খোলা—সেই প্রশ্নেও নিহিত।
যে বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী স্বাধীনভাবে বই পড়তে পারেন না, শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পাঠদান অনুসরণ করতে পারেন না, শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাতে পারেন না অথবা অন্য কোনো প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান না, সেখানে সমস্যাটি শুধু সেই শিক্ষার্থীর নয়। সমস্যাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থাপনার।
বাংলাদেশের সংবিধানের সমতার নীতি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর শিক্ষা, প্রবেশগম্যতা ও বৈষম্যবিরোধী বিধান এ আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ভিত্তি। বিশেষ করে আইনটির ১৬ ধারা অধিকার স্বীকার করে, আর ৩৩ ধারা কেবল প্রতিবন্ধিতার কারণে যোগ্য ব্যক্তির ভর্তি প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট প্রতিকারব্যবস্থা দিয়েছে। তাই উচ্চশিক্ষায় অন্তর্ভুক্তির পরবর্তী অধ্যায় হতে হবে আইন ও বাস্তবতার দূরত্ব কমানোর অধ্যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য রিসোর্স সেন্টার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত জনবল থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এটি একটি মূল্যবান প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। কিন্তু এর সঙ্গে সব ধরনের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য সমন্বিত, বিশ্ববিদ্যালয়ব্যাপী অধিকার বাস্তবায়নব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনকে এক করে দেখা যাবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা উন্নয়নের শুরু। তাঁদের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, গবেষণায় অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব, আত্মমর্যাদা এবং একাডেমিক সাফল্য নিশ্চিত করা হলো সেই উন্নয়নের প্রকৃত পরীক্ষা। একটি র্যাম্প শিক্ষার্থীকে ভবনে প্রবেশের সুযোগ দিতে পারে। একটি ব্যবহারোপযোগী বই তাঁকে জ্ঞানের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। একটি উপযুক্ত পরীক্ষা ব্যবস্থা তাঁর সক্ষমতা প্রকাশের পথ খুলে দিতে পারে। কিন্তু এসব উপাদানকে সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করলেই একটি বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত উৎকর্ষ তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য একা সংগ্রাম করতে হয় না; বরং বিশ্ববিদ্যালয় নিজের কাঠামো, পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গিকে এমনভাবে উন্নত করে, যাতে প্রত্যেক যোগ্য শিক্ষার্থী মর্যাদার সঙ্গে জ্ঞান অর্জন ও সৃষ্টি করতে পারেন। কারণ একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অদৃশ্য দেয়াল ভেঙে দেওয়া মানে শুধু একজন মানুষের পথ খুলে দেওয়া নয়—তা হলো সমগ্র উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও মানবিক, ন্যায়সংগত এবং উৎকৃষ্ট করে তোলা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি কাঠামো, শিক্ষার্থীকল্যাণের ধারণা এবং উচ্চশিক্ষায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি প্রশ্ন সামনে আসে: বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা খোলা থাকলেই কি সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ সমানভাবে উন্মুক্ত হয়? ভর্তি হওয়ার পর কোনো শিক্ষার্থী যদি শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাতে না পারেন, প্রয়োজনীয় পাঠ্যসামগ্রী ব্যবহার করতে না পারেন, পরীক্ষায় নিজের জ্ঞান প্রকাশের উপযোগী ব্যবস্থা না পান কিংবা নিরাপদ আবাসনের অভাবে শিক্ষা চালিয়ে যেতে সমস্যায় পড়েন, তাহলে প্রবেশের সুযোগ ও কার্যকর অংশগ্রহণের মধ্যে বড় ব্যবধান থেকে যায়। এই ব্যবধান দূর করাই অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের কেন্দ্রীয় কাজ।
সেই কাজের জন্য অবকাঠামো, পাঠদান, মূল্যায়ন, আবাসন এবং প্রশাসনিক সেবাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে। প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তার আবেদন কোথায় করা যাবে, কে সিদ্ধান্ত নেবেন, কত দিনের মধ্যে ব্যবস্থা হবে এবং সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে শিক্ষার্থী কোথায় প্রতিকার চাইবেন—এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া জরুরি। সহায়তা পাওয়ার পথ যত অনিশ্চিত থাকে, শিক্ষার্থীর সময় ও শক্তি তত বেশি ব্যয় হয় নিজের প্রয়োজন বারবার ব্যাখ্যা করতে। একটি কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয়ব্যাপী প্রতিবন্ধিতা সহায়তাকেন্দ্র এই প্রক্রিয়ায় সমন্বয় আনতে পারে; পাশাপাশি বিভাগ, হল, গ্রন্থাগার ও পরীক্ষা প্রশাসনকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সংস্কারের অগ্রগতি বিচার করতে হবে শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা দিয়ে। একটি র্যাম্প নির্মাণের পর দেখতে হবে সেটি ব্যবহার করে শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় স্থানে পৌঁছাতে পারছেন কি না। শিক্ষাসামগ্রী ডিজিটাল করার পর জানতে হবে তা সহায়ক প্রযুক্তির মাধ্যমে পড়া যাচ্ছে কি না। সহায়তার নীতি গ্রহণের পর যাচাই করতে হবে আবেদনকারী সময়মতো সেই সহায়তা পাচ্ছেন কি না। এসব মূল্যায়নে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ সিদ্ধান্তকে বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্তির অগ্রযাত্রা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। তার জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট দায়িত্ব, পর্যাপ্ত সম্পদ, প্রশিক্ষিত জনবল, বাস্তবসম্মত সময়সীমা এবং নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমতার প্রতিশ্রুতি তখনই শিক্ষার্থীর জীবনে অর্থবহ হবে, যখন তিনি মর্যাদার সঙ্গে পড়তে, নিজের সামর্থ্য প্রকাশ করতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়সমাজে পূর্ণভাবে অংশ নিতে পারবেন।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বোঝা যায় তার গবেষণা, পাঠদান ও জ্ঞানচর্চায়। সেই মানের আরেকটি পরীক্ষা ঘটে প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতায়—একজন শিক্ষার্থী স্বাধীনভাবে গ্রন্থাগারে প্রবেশ করতে পারছেন কি না, শ্রেণির আলোচনায় অংশ নিতে পারছেন কি না, নিজের প্রয়োজন জানালে সম্মানজনক সাড়া পাচ্ছেন কি না। এসব অভিজ্ঞতা বলে দেয় প্রতিষ্ঠানের সমতার আদর্শ কতটা জীবন্ত।
যে শিক্ষার্থী প্রতিদিন সহপাঠীদের সাহায্যে সিঁড়ি অতিক্রম করেন, তাঁর অধ্যবসায় আমাদের মুগ্ধ করতে পারে। কিন্তু সেই দৃশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটি প্রশ্নও রাখে: তাঁকে স্বাধীনভাবে চলার সুযোগ দিতে প্রতিষ্ঠান কী করেছে? যে শিক্ষার্থী উপযোগী পাঠ্যসামগ্রীর অপেক্ষায় পিছিয়ে পড়েন, তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রামের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার প্রস্তুতিও আলোচনায় আসা প্রয়োজন।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অদৃশ্য বাধাগুলো দৃশ্যমান করে। তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের যুক্ত করা তাই উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ার অপরিহার্য উপায়। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে বিকশিত হতে দেয় এবং সেই সম্ভাবনার পথে থাকা বাধা সরানোর দায়িত্ব গ্রহণ করে।
দিনের শেষে প্রশ্নটি থেকে যায়: বিশ্ববিদ্যালয় কি শিক্ষার্থীকে সুযোগের কথা জানাচ্ছে, নাকি সেই সুযোগ ব্যবহার করার বাস্তব পথও তৈরি করছে? এই প্রশ্নের উত্তরেই সমতার প্রতিশ্রুতি ও শিক্ষার্থীর জীবনের মধ্যে সেতু গড়ে উঠবে।
#অধিকারপত্র #ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয় #উচ্চশিক্ষা #শিক্ষারঅধিকার #প্রতিবন্ধীশিক্ষার্থীরঅধিকার #অন্তর্ভুক্তিমূলকশিক্ষা #প্রবেশগম্যতা #সমানসুযোগ #শিক্ষার্থীকল্যাণ #বিশ্ববিদ্যালয়সংস্কার #DisabilityInclusion #InclusiveHigherEducation #Accessibility #Odhikarpatra