অধিকারপত্র শিক্ষা সংস্কার ধারাবাহিক│প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবার জন্য উন্মুক্ত—কিন্তু এই ঘোষণা কি প্রত্যেকের ভর্তির অধিকার বা হলের আসন নিশ্চিত করে? বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন কি প্রশাসনকে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধান বিশ্লেষণ করে এই ফিচারে তুলে ধরা হয়েছে ভর্তি, আবাসন, সমতা, শৃঙ্খলা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার্থীকল্যাণের সম্পর্ক। আলোচনায় রয়েছে প্রতিবন্ধী ও লিঙ্গবৈচিত্র্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ, বিধিবদ্ধ সিদ্ধান্তের প্রয়োজন, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার ভারসাম্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার বাস্তব করণীয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির খবর একটি পরিবারের কাছে স্বপ্নপূরণের সংবাদ। দীর্ঘ প্রস্তুতি, অনিশ্চয়তা আর প্রতিযোগিতা পেরিয়ে একজন শিক্ষার্থী যখন নিজের নামটি ভর্তির তালিকায় দেখেন, তখন তাঁর সামনে খুলে যায় নতুন জীবনের দরজা। কিন্তু সেই শিক্ষার্থী যদি হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হন, শ্রবণপ্রতিবন্ধী হন কিংবা ভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রয়োজন হয়—তাহলে দরজাটি খুলে যাওয়ার পরও প্রশ্ন থেকে যায়: তিনি কি শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাতে পারবেন? পাঠ্যবই ও শিক্ষকের আলোচনা কি তাঁর জন্য ব্যবহারযোগ্য হবে? হলে থাকতে, পরীক্ষায় অংশ নিতে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক আয়োজনে যুক্ত হতে কি প্রতিবার আলাদা করে নিজের প্রয়োজন বোঝাতে হবে?
একটি পরিস্থিতি কল্পনা করা যাক। একজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন, কিন্তু তাঁর শ্রেণিকক্ষ ভবনের ওপরের তলায়; সেখানে পৌঁছানোর ব্যবহারযোগ্য ব্যবস্থা নেই। আরেকজন গ্রন্থাগারের সদস্য হয়েছেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় বইটি এমন ডিজিটাল বিন্যাসে নেই, যা তিনি স্ক্রিন রিডারের সাহায্যে পড়তে পারেন। একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকেন, অথচ আলোচনার বড় অংশ তাঁর কাছে পৌঁছায় না। এগুলো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নথিভুক্ত ঘটনা নয়; আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সদস্য হওয়া এবং শিক্ষায় কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারার ব্যবধান বোঝানোর উদাহরণ। এই ব্যবধানেই লুকিয়ে আছে আমাদের মূল প্রশ্ন—ভর্তি হলেই কি বিশ্ববিদ্যালয় সবার হয়ে যায়?
একীভূত উচ্চশিক্ষার অর্থ একই ক্যাম্পাসে বিভিন্ন শিক্ষার্থীকে জায়গা দেওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। এর অর্থ এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্য প্রকাশের বাস্তব সুযোগ পান। শ্রেণিকক্ষ, পাঠদান, পাঠ্যসামগ্রী, পরীক্ষা, আবাসন, যোগাযোগ ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে বাধা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা এই ব্যবস্থার অংশ। কারও জন্য প্রবেশগম্য পথ প্রয়োজন, কারও জন্য ক্যাপশন বা ইশারা ভাষায় যোগাযোগের সহায়তা, কারও জন্য বিকল্প বিন্যাসে পাঠ্যসামগ্রী কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষার ব্যবস্থা। এসব সহায়তাকে অনুগ্রহ হিসেবে দেখলে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ ব্যক্তিগত সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অধিকারভিত্তিক ব্যবস্থায় সহায়তা পাওয়ার পথ হয় স্পষ্ট, নিয়মিত এবং মর্যাদাপূর্ণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে প্রশ্নটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ১৯৭৩ সালের আদেশে বিশ্ববিদ্যালয়কে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার ঘোষণার পাশাপাশি শিক্ষার্থীর আবাসন, শৃঙ্খলা, সহশিক্ষা কার্যক্রম ও স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামো দেওয়া হয়েছে। সেই কাঠামো আজ আমাদের ভাবতে আহ্বান করে: বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ততা দৈনন্দিন জীবনে কতটা কার্যকর? ভর্তি হওয়ার পর একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী যদি পরিবেশগত বা যোগাযোগের বাধায় শিক্ষার সুযোগ ব্যবহার করতে না পারেন, তাহলে অন্তর্ভুক্তির প্রতিশ্রুতি কীভাবে পূর্ণ হবে?
এই ফিচারের অনুসন্ধান তাই আইনের ভাষা থেকে শিক্ষার্থীর জীবনের দিকে। কোন সুযোগ সরাসরি বিধানে রয়েছে, কোন দায়িত্ব বৃহত্তর অধিকার কাঠামো থেকে আসে এবং কোন পরিবর্তনের জন্য নতুন নীতি, অর্থায়ন ও সমন্বয় প্রয়োজন—সেই প্রশ্নগুলোই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কতটা সবার, তার উত্তর পাওয়া যায় সেখানে প্রবেশের অনুমতিতে এবং প্রবেশের পর শেখা, থাকা, মত প্রকাশ ও এগিয়ে যাওয়ার বাস্তব সুযোগে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য সেই সুযোগ নিশ্চিত করার পথেই একীভূত উচ্চশিক্ষার দূরত্ব মাপতে হবে।
১. ভর্তি নিশ্চিত, থাকার নিশ্চয়তা কোথায়?
ধরা যাক, দূরের একটি জেলা থেকে একজন শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেন। পরিবারের আনন্দের সঙ্গে শুরু হলো হিসাব: কোথায় থাকবেন, যাতায়াতে কত খরচ হবে, রাতে পড়ার জায়গা পাবেন কি না। আরেকজন শিক্ষার্থী হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন। তাঁর প্রশ্ন আরও নির্দিষ্ট: কক্ষে পৌঁছাবেন কীভাবে, ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার কোথায়, জরুরি পরিস্থিতিতে বের হওয়ার ব্যবস্থা আছে কি?
এগুলো কোনো নথিভুক্ত ব্যক্তির ঘটনা নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ ও সেখানে অংশগ্রহণের সামর্থ্যের পার্থক্য বোঝানোর উদাহরণ। ভর্তি পরীক্ষার ফল একটি দরজা খুলে দিতে পারে। কিন্তু দরজার পরের পথটি সবার জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য না হলে শিক্ষার সুযোগও সমান থাকে না।
বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনায় সাধারণত পাঠদান, গবেষণা, পরীক্ষা ও ফলাফল সামনে আসে। অথচ একজন শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের শিক্ষা নির্ভর করে ঘুম, খাবার, নিরাপত্তা, যাতায়াত, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপরও। আবাসনের সিদ্ধান্ত তাই শুধু কোথায় বিছানা থাকবে, সেই প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কে নিয়মিত ক্লাস করতে পারবেন, কে গ্রন্থাগারে সময় কাটাতে পারবেন এবং কে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে পিছিয়ে পড়বেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো এই বিস্তৃত জীবনকেই আলোচনায় আনে। তবে সেগুলো থেকে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত টানলে ভুল হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় সবার জন্য উন্মুক্ত মানেই সবাই ভর্তি হবেন—এমন নয়। শিক্ষার্থীর আবাসন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আছে মানেই প্রশাসন যেকোনো শর্ত দিতে পারবে—সেটিও নয়।
২. উন্মুক্ত দরজা, কিন্তু যোগ্যতার শর্তও আছে
আদেশের ৬ অনুচ্ছেদে বিশ্ববিদ্যালয়কে নারী-পুরুষ এবং ধর্ম, জাতি, বিশ্বাস, শ্রেণি বা বর্ণ নির্বিশেষে সব ব্যক্তির জন্য উন্মুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে। এই বিধান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশাধিকার বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী অবস্থান প্রকাশ করে। পরিচয়ের কারণে জ্ঞানের দরজা বন্ধ করে দেওয়ার বিরুদ্ধে এর তাৎপর্য রয়েছে। কিন্তু উন্মুক্ততার অর্থ শর্তহীন ভর্তি নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত আসন, পাঠ্যক্রমের চাহিদা এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রশ্ন থাকে। একটি পরীক্ষাগারে যতজনকে নিরাপদে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব, তার সীমা আছে। কোনো বিষয়ে পূর্বপ্রস্তুতি প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ভর্তির যোগ্যতা যাচাই এবং পরিচয়ভিত্তিক বৈষম্য আলাদা বিষয়।
৪৬(২) অনুচ্ছেদ ডিগ্রি কোর্সে ভর্তির জন্য ইন্টারমিডিয়েট বা স্বীকৃত সমমানের পরীক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্সে নির্ধারিত অতিরিক্ত যোগ্যতার কথা বলে। একই বিধানে নির্দিষ্ট পাঁচ বছর মেয়াদি চারুকলা ডিগ্রির জন্য ম্যাট্রিকুলেশন বা এসএসসি পর্যায়ের যোগ্যতাসংক্রান্ত একটি বিশেষ ব্যতিক্রম রয়েছে। সেটিকে সব বিভাগের সাধারণ ভর্তির নিয়ম হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
পুরোনো আইনে কোনো কোর্সের নাম বা মেয়াদ থাকলেই তা বর্তমান ভর্তি বিজ্ঞপ্তির বিকল্প হয়ে ওঠে না। সংশ্লিষ্ট সংশোধনী, বিধিবদ্ধ নিয়ম এবং কোর্সের পরিবর্তন পরীক্ষা করতে হয়। চারুকলার ওই ব্যতিক্রম দেখিয়ে আজ কোনো আবেদনকারীর সরাসরি ভর্তির অধিকার ঘোষণা করা তাই যথার্থ হবে না।
সমতার প্রশ্নটি অন্য জায়গায়: যোগ্যতা যাচাইয়ের পদ্ধতি কি প্রাসঙ্গিক এবং ন্যায্য? সমান যোগ্যতার আবেদনকারীদের কি একই মানদণ্ডে বিচার করা হচ্ছে? কোনো পরিচয়কে কি অযৌক্তিক বাধা বানানো হচ্ছে? মেধাভিত্তিক নির্বাচন ও বৈষম্যবিরোধী প্রবেশাধিকার একসঙ্গে প্রতিষ্ঠা করাই এখানে প্রয়োজন।
৩. বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শুধু একটি বই নয়
কোনো আবাসন বা শৃঙ্খলাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় প্রায়ই বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মে এমন আছে। সাধারণ শিক্ষার্থীর পক্ষে বোঝা কঠিন—সেই নিয়ম মূল আইন, সংবিধি, অর্ডিন্যান্স, প্রবিধান, নাকি কোনো দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি? অথচ সিদ্ধান্তের বৈধতা বুঝতে এই পার্থক্য জরুরি।
মূল আদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্ধারণ করে। সংবিধি বা স্ট্যাটিউটস বিস্তারিত প্রতিষ্ঠানগত বিধান তৈরি করে। বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স নির্দিষ্ট কার্যক্রমের নিয়ম নির্ধারণ করে। প্রবিধানও রয়েছে। এগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন দলিল নয়; কোন কর্তৃপক্ষ কোন বিষয়ে বিধান করতে পারবে, তার সীমা মূল কাঠামোয় নির্ধারিত থাকে।
৩৮(ফ) অনুচ্ছেদে হল প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং হোস্টেল ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সংবিধিতে বিধান করার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ৪০(জি) অনুচ্ছেদ শিক্ষার্থীর আবাসনের শর্ত, হলে থাকার ফি এবং হোস্টেলের লাইসেন্স বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্সের ক্ষেত্র নির্ধারণ করে। ফলে প্রতিষ্ঠান গঠন এবং দৈনন্দিন আবাসন পরিচালনার নিয়ম একই স্তরের বিষয় নয়।
সহজভাবে ভাবা যায়, একটি ভবনের নকশা এবং সেখানে কক্ষ ব্যবহারের নিয়ম আলাদা। ব্যবহারের নিয়ম নকশার অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করতে পারে না। তেমনি নিচের স্তরের নির্দেশ দিয়ে ওপরের বিধান এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ৪২ অনুচ্ছেদও প্রবিধানকে আদেশ, সংবিধি ও অর্ডিন্যান্সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার শর্তে রাখে।
তবে প্রতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য নতুন অর্ডিন্যান্স প্রয়োজন—এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। বৈধ বিধানে কোনো কর্মকর্তাকে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা দেওয়া থাকতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ক্ষমতার উৎস, বিষয় ও সীমা শনাক্ত করা। একটি বিজ্ঞপ্তির বৈধতা তাই তার নাম দেখে নয়, যে ক্ষমতাবলে সেটি জারি হয়েছে, তা দেখে বিচার করতে হবে।
৪. হলের সঙ্গে যুক্ত থাকা আর হলে থাকা এক নয়
আবাসন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ৪৩ অনুচ্ছেদ। এর বক্তব্য হলো, প্রত্যেক শিক্ষার্থী সংবিধি ও বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্সে নির্ধারিত স্থান এবং শর্ত অনুযায়ী বসবাস করবেন। বিধানটি সরাসরি বলে না যে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেই থাকতে হবে। কোথায় এবং কী শর্তে থাকবেন, সেই বিস্তারিত নিয়ম অন্য বিধিবদ্ধ দলিলে নির্ধারণের কথা বলে।
এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। হল, অনুমোদিত হোস্টেল অথবা অন্য কোনো আবাসনের ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট নিয়মে থাকতে পারে। কিন্তু পরিবারের বাসা বা ব্যক্তিগত বাসাকে অনুমোদিত ধরে নেওয়ার আগে প্রযোজ্য বিধান দেখতে হবে। মূল অনুচ্ছেদের সম্ভাব্য বিস্তৃতি আর কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর অনুমোদিত আবাসন এক বিষয় নয়।
একইভাবে একটি হলের সঙ্গে প্রশাসনিকভাবে যুক্ত থাকা মানেই সেখানে কক্ষ বা আসন পাওয়া নয়। ২০২৫ সালের ডাকসু ও হল সংসদের গঠনতন্ত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর সংজ্ঞায় হলে বসবাসকারী এবং হলের সঙ্গে সংযুক্ত—উভয় ধরনের অবস্থার উল্লেখ রয়েছে। এটি পার্থক্যটির প্রাতিষ্ঠানিক উদাহরণ; তবে ডাকসুর গঠনতন্ত্র একা ৪৩ অনুচ্ছেদের চূড়ান্ত অর্থ নির্ধারণ করে না।
এখানে দুটি বিপরীত দাবি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ৪৩ অনুচ্ছেদ দেখিয়ে সবাইকে হলে থাকার বাধ্যবাধকতা ঘোষণা করতে পারে না, বিস্তারিত বিধান না দেখিয়ে। আবার শিক্ষার্থীও এই অনুচ্ছেদ উপেক্ষা করে বলতে পারেন না যে তাঁর আবাসনের ওপর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিধিবদ্ধ কর্তৃত্বই নেই।
বাস্তব সমস্যার সমাধানে তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত: কোন নিয়মে আবাসিক ও অনাবাসিক অবস্থার সংজ্ঞা রয়েছে? অনুমোদিত স্থান কী? ব্যতিক্রমের সুযোগ আছে কি? এসব উত্তর শিক্ষার্থীকে আগে থেকেই জানানো গেলে অনিশ্চয়তা এবং ভুল বোঝাবুঝি কমতে পারে।
৫. একটি আসনের দাবি এবং আবাসনের দায়িত্ব
একজন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতেই পারেন, বিশ্ববিদ্যালয় যখন আবাসন তত্ত্বাবধান করবে, তখন থাকার জায়গা নিশ্চিত করার দায়িত্বও কি তার নয়? প্রশ্নটি যুক্তিসংগত। তবে আইনগতভাবে প্রত্যেকের একটি নির্দিষ্ট হলের আসন পাওয়ার দাবি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন পরিচালনার দায়িত্ব আলাদা করে দেখতে হবে।
৪(কে) অনুচ্ছেদ বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার্থীদের জন্য হল প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যদের পরিচালিত হোস্টেল অনুমোদন ও লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষমতা দেয়। এই বিধান আবাসনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক কাজের মধ্যে রাখে। কিন্তু এখান থেকে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি পৃথক আসনের নিঃশর্ত নিশ্চয়তা সরাসরি পাওয়া যায় না।
আসনের সীমাবদ্ধতা থাকলেও বণ্টনের পদ্ধতি ন্যায্য হওয়া প্রয়োজন। কে আবেদন করতে পারবেন, অগ্রাধিকার কী, অপেক্ষমাণ তালিকা কীভাবে চলবে এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোথায় আবেদন করা যাবে—এসব স্পষ্ট করা সম্ভব। অবকাঠামো বাড়াতে সময় লাগলেও স্বচ্ছতার কাজ শুরু করতে নতুন ভবনের অপেক্ষা করতে হয় না।
ধরা যাক, দুজন শিক্ষার্থী আসনের আবেদন করেছেন। একজনের পরিবারের বাসা কাছাকাছি; অন্যজনের দৈনিক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। আবার তৃতীয়জনের এমন প্রবেশগম্য কক্ষ প্রয়োজন, যা বাইরে সহজে পাওয়া যায় না। একই মানদণ্ড সবার ক্ষেত্রে যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করলে প্রয়োজনের পার্থক্য অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।
এটি বিশেষ বিবেচনার পক্ষে নীতিগত যুক্তি; কোনো নির্দিষ্ট অগ্রাধিকার ইতিমধ্যে আইনে নিশ্চিত আছে, এমন দাবি নয়। অগ্রাধিকার নির্ধারণে প্রকাশ্য নীতি, প্রমাণ যাচাই, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং আবেদন পুনর্বিবেচনার সুযোগ দরকার। অন্যথায় সহায়তার উদ্দেশ্যে করা ব্যতিক্রমও পক্ষপাতের অভিযোগ তৈরি করতে পারে।
৬. সমান নিয়মের ফল কেন অসমান হতে পারে
সমতা মানে সবাইকে এক কথা বলা—এই ধারণা সহজ, কিন্তু অসম্পূর্ণ। সবাইকে একই সিঁড়ি ব্যবহার করতে বলা হলে নিয়মটি এক হয়। অথচ হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীর জন্য সেই নিয়ম প্রবেশের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কাগজে সমান আচরণ বাস্তবে অসম ফল তৈরি করতে পারে।
এখানেই বাস্তব সুযোগের সমতা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও সমান আশ্রয়ের কথা বলে। ২৮ অনুচ্ছেদ নির্দিষ্ট পরিচয়ের কারণে বৈষম্য এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রতিবন্ধকতা বিষয়ে সুরক্ষা দেয়। একই অনুচ্ছেদ নারী, শিশু ও অনগ্রসর নাগরিকদের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধানের সুযোগও রাখে।
তবে সব বৈষম্যের প্রশ্ন একই বিধানে একইভাবে নিষ্পত্তি হয় না। অর্থনৈতিক অসুবিধা, প্রতিবন্ধিতা বা লিঙ্গপরিচয়ের সমস্যা বিশ্লেষণে প্রাসঙ্গিক অন্য আইনও দেখতে হয়। একটি সাধারণ সমতার ঘোষণা থেকে প্রত্যেক দাবির জন্য একই প্রতিকার ধরে নেওয়া যায় না।
আরেকটি বিষয় হলো একাধিক অসুবিধার সম্মিলিত প্রভাব। দূরবর্তী এলাকার একজন অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর আবাসন সমস্যা শুধু প্রতিবন্ধিতা অথবা শুধু দারিদ্র্য দিয়ে বোঝা যাবে না। যাতায়াত, সহায়তা, বাড়িভাড়া এবং ভবনের নকশা একসঙ্গে তাঁর অংশগ্রহণ সীমিত করতে পারে। জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাবিষয়ক ব্যাখ্যাতেও একাধিক পরিচয়ভিত্তিক বৈষম্যের বিষয়টি এসেছে।
এ কারণে নীতি তৈরির সময় একটি প্রশ্ন দরকার: নিয়মটি কার জন্য সহজ, কার জন্য কঠিন? উত্তর খুঁজতে শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা শুনতে হবে। একই সঙ্গে অভিজ্ঞতার বিবরণ, যাচাইকৃত তথ্য এবং অনুমান আলাদা রাখতে হবে। কয়েকটি ঘটনা দিয়ে পুরো প্রতিষ্ঠানের অবস্থা ঘোষণা করা যেমন ভুল, তেমনি তথ্য নেই বলে সমস্যাকে অস্বীকার করাও অনুচিত।
৭. প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য দরজার পরের পথ
১৯৭৩ সালের আদেশের ৬ অনুচ্ছেদে প্রতিবন্ধিতার আলাদা উল্লেখ নেই। কিন্তু এই অনুপস্থিতিকে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর অধিকার অস্বীকারের অনুমতি হিসেবে নেওয়া যায় না। পরবর্তী অধিকারবিষয়ক আইন এবং প্রাসঙ্গিক সাংবিধানিক সুরক্ষাও বিবেচনায় আনতে হয়।
বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-এর ১৬ ধারায় প্রবেশগম্যতা এবং শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে অংশগ্রহণসহ অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন শুধু ভর্তি তালিকায় নাম থাকার মধ্যে সীমিত থাকে না। শিক্ষার পরিবেশ ব্যবহার করার সামর্থ্যও আলোচনায় আসে।
প্রতিবন্ধিতার মানবাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি সমস্যার অবস্থান বদলে দেয়। শিক্ষার্থীকে একমাত্র সমস্যার উৎস হিসেবে দেখলে সমাধান হয় তাঁকে মানিয়ে নিতে বলা। পরিবেশের বাধা চিহ্নিত করলে প্রশ্ন ওঠে—সিঁড়ির বিকল্প কোথায়, তথ্য কোন মাধ্যমে পাওয়া যায়, আবেদনপত্র ব্যবহারযোগ্য কি না, জরুরি সহায়তা কীভাবে মিলবে।
সবার জন্য প্রবেশগম্য অবকাঠামো এবং ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী যুক্তিসংগত ব্যবস্থা এক জিনিস নয়। প্রবেশগম্যতা আগে থেকেই পরিবেশকে ব্যবহারযোগ্য করে। ব্যক্তিভিত্তিক ব্যবস্থা নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীর বাধা দূর করে। কারও জন্য কক্ষ পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে, কারও জন্য সহজে পড়া যায় এমন নথি, অন্য কারও জন্য যোগাযোগে সহায়তা।
জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদের ২৪ অনুচ্ছেদ উচ্চশিক্ষায় বৈষম্যহীন প্রবেশ এবং যুক্তিসংগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলে। সনদের ব্যাখ্যায় অন্তর্ভুক্তিকে শিক্ষার্থীকে অপরিবর্তিত ব্যবস্থায় বসিয়ে দেওয়ার চেয়ে বিস্তৃত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মানের দেশীয় প্রয়োগ বিশ্লেষণে বাংলাদেশের আইনও বিবেচ্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সমন্বিত সহায়তা কেন্দ্র এই কাজ সহজ করতে পারে। সেখানে প্রয়োজন মূল্যায়ন, আবাসন ও বিভাগীয় সমন্বয়, সহায়ক প্রযুক্তি এবং অভিযোগ অনুসরণের ব্যবস্থা থাকবে। এটি এখানে সংস্কারের প্রস্তাব। বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ব্যবস্থার উপস্থিতি, অনুপস্থিতি বা কার্যকারিতা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত দাবি করা সমীচীন নয়।
৮. পুরোনো ভাষায় নতুন পরিচয়ের প্রশ্ন
১৯৭৩ সালের বিধানের নারী-পুরুষবিষয়ক ভাষা আজ লিঙ্গবৈচিত্র্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। হিজড়া, ট্রান্সজেন্ডার ও ইন্টারসেক্স পরিচয় এক নয়। তাঁদের অভিজ্ঞতা বা আবাসনের প্রয়োজনও একভাবে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
আক্ষরিক ব্যাখ্যায় কেউ পুরোনো দ্বিবিভাজিত ভাষার সীমা সামনে আনতে পারেন। উদ্দেশ্যভিত্তিক ব্যাখ্যায় অন্যজন বলবেন, সব ব্যক্তির জন্য উন্মুক্ততার ঘোষণা কাউকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে পড়া উচিত নয়। সাংবিধানিক সমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠের যুক্তিও রয়েছে। এগুলো ব্যাখ্যার পথ; কোনো নির্দিষ্ট হলের অধিকার বিষয়ে নিশ্চিত বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
একটি উদাহরণ ভাবা যাক। একজন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন, কিন্তু বিদ্যমান হলবিন্যাসে তাঁর জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ব্যবস্থা নির্ধারণ নিয়ে প্রশাসন দ্বিধায় আছে। প্রশাসনের নিরাপত্তা, অবকাঠামো এবং অন্য বাসিন্দাদের প্রয়োজন বিবেচনার যুক্তি রয়েছে। শিক্ষার্থীরও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বাস্তব সুযোগ, গোপনীয়তা এবং মর্যাদার দাবি রয়েছে।
সমাধান খুঁজতে প্রথমে তাঁর মতামত শুনতে হবে। তাঁর সম্মতি ছাড়া পরিচয় প্রকাশ করা অথবা তাঁকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলাদা করে দেওয়ার মধ্যে নতুন ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। একটি নিরাপদ বিকল্পের অর্থ কখনো কক্ষের ব্যবস্থা, কখনো আবাসন পরিবর্তন, কখনো নির্দিষ্ট সুরক্ষা হতে পারে।
এই কাজের জন্য সাধারণ নীতির পাশাপাশি ব্যক্তির পরিস্থিতি বোঝা প্রয়োজন। অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা বাস্তব, কিন্তু সেটি সমস্যার আলোচনা বন্ধ করে দেওয়ার উত্তর হতে পারে না। আবার অন্য দেশের কোনো মডেল সরাসরি এনে প্রয়োগ করাও যথেষ্ট নয়। স্থানীয় আইন, শিক্ষার্থীর পছন্দ এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন মিলিয়ে সিদ্ধান্ত তৈরি করতে হবে।
৯. শৃঙ্খলা রক্ষায় ক্ষমতার সঙ্গে প্রক্রিয়া
বিশ্ববিদ্যালয়কে নিরাপদ রাখতে শৃঙ্খলা প্রয়োজন। সহিংসতা, হয়রানি, সম্পত্তি নষ্ট করা বা অন্যের শিক্ষায় বাধা দেওয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে দুর্বল অবস্থানে থাকা শিক্ষার্থীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার প্রয়োজন তাই অস্বীকার করা যায় না।
৪(এম) অনুচ্ছেদ শিক্ষার্থীর আবাসন ও শৃঙ্খলা তত্ত্বাবধান, সহশিক্ষা কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্য উন্নয়নের ব্যবস্থা করার ক্ষমতা দেয়। কিন্তু এই সাধারণ ক্ষমতার প্রয়োগ বুঝতে সংশ্লিষ্ট বিস্তারিত বিধানও দেখতে হয়।
৪০(ফ) অনুচ্ছেদে আচরণ, শৃঙ্খলা এবং অসদাচরণের জন্য সাময়িক বহিষ্কার ও বহিষ্কারসহ শাস্তি বিষয়ে অর্ডিন্যান্সের বিধান করার সুযোগ রয়েছে। ফলে গুরুতর শাস্তির আলোচনা শুধু কর্মকর্তার অসন্তুষ্টি দিয়ে শেষ হয় না; কোন আচরণ অপরাধ, কে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ।
ন্যায্য প্রক্রিয়ার সাধারণ অর্থ হলো অভিযোগ জানা, বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাওয়া এবং কারণসহ সিদ্ধান্ত পাওয়া। জরুরি নিরাপত্তার প্রয়োজনে সাময়িক ব্যবস্থা ও চূড়ান্ত শাস্তির প্রয়োজনও আলাদা হতে পারে। এই নীতিগুলো প্রয়োগের নির্দিষ্ট পথ প্রাসঙ্গিক বিধান ও ঘটনার ওপর নির্ভর করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত প্রক্টরিয়াল বিবরণে শৃঙ্খলা এবং সংগঠন ও অনুষ্ঠানসংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণের উল্লেখ আছে। তবে ওয়েবপৃষ্ঠায় কোনো বিধান দেখা গেলেই সেটি সব সংশোধনীসহ বর্তমান পূর্ণাঙ্গ বিধিমালা—এমন ধরে নেওয়া উচিত নয়। দলিলের অনুমোদন, সংস্করণ ও পরবর্তী পরিবর্তন জানা প্রয়োজন।
বিতর্ক, সংস্কৃতি ও সংগঠন পরিচালনায় সময়, স্থান এবং শব্দের নিয়ম দরকার হতে পারে। সেই নিয়মের উদ্দেশ্য এবং প্রয়োগ ব্যাখ্যা করা গেলে শিক্ষার্থীর আস্থা বাড়ে। শৃঙ্খলা তখন শুধু নিষেধের তালিকা থাকে না; সবার নিরাপদ অংশগ্রহণের ব্যবস্থা হয়ে ওঠে।
১০. স্বাস্থ্য, স্বায়ত্তশাসন এবং জবাবদিহি
আদেশে শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য উন্নয়নের ব্যবস্থা করার ভাষা রয়েছে। আবাসিক পরিবেশে এই বিষয়টির তাৎপর্য বিস্তৃতভাবে বিবেচনা করা যায়। পরিচ্ছন্নতা, খাবার, বিশ্রাম, রোগ প্রতিরোধ এবং জরুরি সহায়তা শিক্ষার পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত। মানসিক সহায়তাকেও সমকালীন শিক্ষার্থীকল্যাণের অংশ হিসেবে বিবেচনার যুক্তি রয়েছে।
তবে এই ব্যাখ্যা থেকে যেকোনো চিকিৎসার ব্যক্তিগত, নিঃশর্ত নিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে—এমন দাবি করা যাবে না। বরং প্রয়োজন হলো স্বাস্থ্য উন্নয়নের ঘোষিত ক্ষমতা কীভাবে পরিকল্পনা, বাজেট ও সেবায় রূপ নিচ্ছে, সেই প্রশ্ন করা।
উদাহরণ হিসেবে, চিকিৎসাকেন্দ্রে যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ একটি কাজ। জরুরি পরিস্থিতিতে কে দায়িত্ব নেবেন, কীভাবে হাসপাতালে পাঠানো হবে এবং প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী কীভাবে সাহায্য চাইবেন—তার কার্যকর ব্যবস্থা আরেকটি কাজ। সেবার অস্তিত্বের সঙ্গে সেবা পাওয়ার সহজতাও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এসব সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব বিচারক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। বাইরের অনুচিত হস্তক্ষেপ শিক্ষাদান, গবেষণা ও প্রশাসনিক পরিকল্পনা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। স্বায়ত্তশাসন সেই হস্তক্ষেপ থেকে প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষার যুক্তি দেয়। একই সঙ্গে নিজস্ব সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করার দায়িত্বও সামনে আনে।
ইউনেসকোর ১৯৯৭ সালের উচ্চশিক্ষার শিক্ষকবিষয়ক সুপারিশে স্বায়ত্তশাসনকে কার্যকর সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজনীয় স্বশাসন হিসেবে দেখা হয়েছে, যার সঙ্গে জনজবাবদিহি ও মানবাধিকারের সম্পর্ক রয়েছে। এটি বাংলাদেশের আইনের বিকল্প নয়; একটি আন্তর্জাতিক নীতিগত মানদণ্ড।
সুতরাং স্বায়ত্তশাসন ও শিক্ষার্থীর অধিকারকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। ন্যায্য নিয়ম, স্পষ্ট ক্ষমতাবণ্টন এবং পর্যালোচনার সুযোগ প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তকে শক্তিশালী করতে পারে। আইন মেনে নিজের কাজ পরিচালনা করাই স্বশাসনের বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি।
১১. পরিবর্তনের শুরু হোক প্রকাশ্য নিয়ম থেকে
অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম প্রয়োজন জানা: কোন নিয়ম চলছে, কার কী দায়িত্ব এবং সাহায্য কোথায় পাওয়া যাবে। নতুন শিক্ষার্থীকে আবাসন, হলসংযুক্তি, ফি, শৃঙ্খলা, স্বাস্থ্যসেবা ও অভিযোগের পথ সম্পর্কে সহজ বাংলায় একটি নির্দেশিকা দেওয়া যেতে পারে। মূল বিধানের অনুমোদিত সংস্করণের সংযোগও সেখানে থাকবে।
আসন বণ্টনে আবেদন, অগ্রাধিকার, অপেক্ষমাণ তালিকা এবং পুনর্বিবেচনার পদ্ধতি প্রকাশ করা দরকার। ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রেখেই মোট আবেদন, বরাদ্দ এবং অপেক্ষমাণ অবস্থার সমষ্টিগত তথ্য জানানো সম্ভব। এতে শিক্ষার্থী নিজের অবস্থান বুঝবেন এবং প্রশাসনও চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পনার ভিত্তি পাবে।
প্রবেশগম্যতার মূল্যায়ন ভবনের দরজায় শেষ হওয়া উচিত নয়। কক্ষ থেকে শৌচাগার, হল থেকে বিভাগ, আবেদন থেকে সিদ্ধান্ত—পুরো পথ দেখতে হবে। শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বাধা চিহ্নিত করে কোন কাজ দ্রুত করা সম্ভব, কোনটি বাজেটসাপেক্ষ এবং কোনটির সময় লাগবে, তা প্রকাশ করা যেতে পারে।
অভিযোগের পথও ব্যবহারযোগ্য হতে হবে। কে আবেদন নেবেন, কত দিনে প্রাথমিক উত্তর আসবে এবং সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা কোথায় হবে—এসব নীতিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আদেশের ৫২ অনুচ্ছেদে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষের আদেশের বিরুদ্ধে আচার্যের কাছে আবেদন করার বিধান রয়েছে। তবে এতে প্রত্যেক আবেদন মঞ্জুর হওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।
শিক্ষার্থী প্রতিনিধি, শিক্ষক, হল প্রশাসন এবং সেবাসংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনা করা যেতে পারে। পরিবারের ভূমিকা হবে শিক্ষার্থীর প্রয়োজন বুঝতে সহায়তা করা; প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর সিদ্ধান্তকে অকারণ প্রতিস্থাপন করা নয়। সরকারের দায়িত্ব থাকবে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও প্রযোজ্য অধিকার কাঠামোর বাস্তবায়নকে সমর্থন করা।
সবশেষে তথ্যের ঘাটতি পূরণ প্রয়োজন। এই আলোচনা কোনো পূর্ণাঙ্গ আবাসন জরিপ নয়। বর্তমান আসনসংকটের মাত্রা, প্রবেশগম্য কক্ষের সংখ্যা বা অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকারিতা নির্ধারণে আলাদা তথ্য সংগ্রহ দরকার। প্রমাণ ছাড়া সাফল্য ঘোষণা যেমন অনুচিত, তেমনি অনুমান দিয়ে ব্যর্থতার চূড়ান্ত রায়ও গ্রহণযোগ্য নয়।
শেষকথা
শুরুর সেই শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমে একটি সম্ভাবনা। পরে সেটি হয়ে ওঠে প্রতিদিনের পথ: কোথায় থাকবেন, কীভাবে ক্লাসে পৌঁছাবেন, অসুস্থ হলে কার কাছে যাবেন এবং সমস্যায় পড়লে তাঁর কথা কে শুনবেন। এই পথ ব্যবহারযোগ্য হলেই ভর্তির সুযোগ জীবনের সুযোগে রূপ নেয়।
১৯৭৩ সালের আদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা, সমতা ও শিক্ষার্থীজীবন পরিচালনার ভিত্তি দেয়। সেই ভিত্তিকে কার্যকর করতে প্রয়োজন সুস্পষ্ট বিধান, ন্যায্য সিদ্ধান্ত এবং মানুষের অভিজ্ঞতার প্রতি মনোযোগ। একজন শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা খোলা রাখা মূল্যবান; দরজার ভেতরে তাঁর এগিয়ে যাওয়ার পথ নিশ্চিত করাও ততটাই প্রয়োজন।
চূড়ান্ত প্রতিফলন
এই আলোচনার কেন্দ্রীয় শিক্ষা হলো, সুযোগের ঘোষণা এবং সুযোগ ব্যবহার করার সামর্থ্য এক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বিচার করতে পাঠদান ও গবেষণার পাশাপাশি দেখতে হবে—কারা অংশ নিতে পারছেন, কারা বাধায় আটকে যাচ্ছেন এবং প্রতিষ্ঠান সেই বাধা দূর করতে কী করছে। সমতা তখনই দৃশ্যমান হবে, যখন নিয়মের ব্যাখ্যা এবং শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা পরস্পরের সঙ্গে মিলবে।
আগামীকাল পড়ুন:
আইন আছে অধিকার আছে তবু বিশ্ববিদ্যালয়ে অদৃশ্য দেয়াল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি কাঠামো থেকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বাস্তবতা—প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর ভর্তি, শিক্ষা, গবেষণা, আবাসন ও সমান অংশগ্রহণের অধিকার কীভাবে কার্যকর হবে
লেখক: অধ্যাপক ড. মাহবুবুর রহমান লিটু, উপদেষ্টা, অধিকারপত্র : odhikarpatranews@gmail.com
#ঢাকা_বিশ্ববিদ্যালয় #বিশ্ববিদ্যালয়_আদেশ_১৯৭৩ #শিক্ষার্থীর_অধিকার #আবাসন_নীতি #হল_ব্যবস্থাপনা #অন্তর্ভুক্তিমূলক_উচ্চশিক্ষা #প্রতিবন্ধী_শিক্ষার্থীর_অধিকার #প্রবেশগম্যতা #স্বায়ত্তশাসন #জবাবদিহি #অধিকারপত্র
