অধিকারপত্র ডটকম | সাভার প্রতিনিধি
ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় ডেকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডে কাজ করার সময় সুমি আক্তার ওরফে মিশু (২৭) নামের এক নারী পোশাকশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর আগে কারখানার সিসিটিভি ফুটেজে তাঁর সঙ্গে এক পুরুষ কর্মকর্তার উত্তপ্ত পরিস্থিতি ও ওই কর্মকর্তার চড়াও হওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। এ ঘটনায় শ্রমিকের অসুস্থতা, ছুটি না পাওয়া এবং কর্মস্থলে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। তবে ছুটি না দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে এ ঘটনা ঘটে। সুমি ওই কারখানার সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। ঘটনার পর তাঁকে প্রথমে কারখানার চিকিৎসাকেন্দ্রে এবং পরে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাটি নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
সি সি টিভিতে কি দেখা গেছে
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারখানার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বিকেল ৫টা ১ মিনিট ৯ সেকেন্ডে সুমি নিজের মেশিনে বসে কাজ করছিলেন। এ সময় তাঁর পাশে একজন পুরুষ কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে ছিলেন।
এর পাঁচ সেকেন্ড পর কিছুটা দূরে থাকা পাঞ্জাবি পরা আরেক কর্মকর্তা সুমির দিকে এগিয়ে যান। তাঁকে সুমির মেশিনে আঘাত করতে এবং কয়েক দফায় উত্তেজিত আচরণ করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি সুমির হাত থেকে কাজের কাপড় নিয়ে ফেলে দেন।
ফুটেজের সময় অনুযায়ী, বিকেল ৫টা ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে সুমি মেশিনে বসা অবস্থায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে পড়ে যেতে দেখে আশপাশের নারী শ্রমিকেরা এগিয়ে আসেন। পরে বিকেল ৫টা ৪ মিনিট ১৬ সেকেন্ডে তাঁকে স্ট্রেচারে তোলা হয়।
তবে সিসিটিভিতে ধারণ করা ঘটনাগুলোর সঙ্গে সুমির মৃত্যুর চিকিৎসাগত কারণের সম্পর্ক কী, তা ময়নাতদন্ত ও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
অসুস্থতা ও ছুটি না দেওয়ার অভিযোগ
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু সিসিটিভি ফুটেজ, নিহতের স্বজন ও সহকর্মীদের বরাত দিয়ে অভিযোগ করেন, সুমি অসুস্থ অবস্থায় কাজে যোগ দিয়েছিলেন। অসুস্থ বোধ করায় তিনি ছুটি চেয়েও পাননি বলে দাবি করেন তিনি।
মিন্টুর ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হলেও কারখানায় উৎপাদন চলছিল। দুপুরে বাসায় খেতে গিয়ে সুমি তাঁর ছেলেকে শারীরিক অসুস্থতা ও কারখানায় কাজের চাপের কথা জানিয়েছিলেন। পরে তিনি আবার কাজে ফিরে যান।
মিন্টু আরও অভিযোগ করেন, নির্ধারিত ছুটির সময় পার হওয়ার পরও সুমিকে কাজ করতে হচ্ছিল। এ সময় এক কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। এর মধ্যেই তিনি মেশিনে বসা অবস্থায় পড়ে যান।
শ্রমিক নেতার দাবি, ঘটনার দায় এড়াতে পারে না কারখানা কর্তৃপক্ষ। তিনি কারখানার মালিক, কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
আগামী অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান এম শাহাদাত হোসেন কিরনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কারখানার মানবসম্পদ বিভাগের এক্সিকিউটিভ অফিসার হাসান জানান, ছুটির ঠিক আগে সুমি মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে যান। পরে তাঁকে কারখানার চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে নারী ও শিশু হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
সুমি অসুস্থতার কথা জানিয়ে ছুটি চেয়েছিলেন কি না, এমন প্রশ্নে হাসান দাবি করেন, তিনি অসুস্থতার কথা জানিয়ে ছুটি চাননি এবং কর্তৃপক্ষকেও অসুস্থতার কথা জানাননি। তাঁর দাবি, শ্রমিকেরা অসুস্থতার কথা জানিয়ে ছুটি চাইলে তাঁদের ছুটি দেওয়া হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে এক কর্মকর্তাকে সুমির দিকে চড়াও হতে দেখা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে হাসান ওই কর্মকর্তার নাম জানাননি। পরে তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাসপাতাল থেকে মরদেহ নেওয়া নিয়ে জটিলতা
আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালের সিনিয়র ম্যানেজার (অপারেশন) হারুন-অর-রশীদ জানান, সুমিকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় তাঁর স্বামী সাজ্জাদ হোসেন ও কারখানা কর্তৃপক্ষ হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন।
হাসপাতাল কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সুমির স্বামী প্রথমে কোনো অভিযোগ নেই বলে জানিয়েছিলেন এবং মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। পরে মৃত্যু সনদ দিয়ে স্বামী ও কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
তবে হাসপাতাল থেকে অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ নেওয়ার সময় কয়েকজন শ্রমিক বাধা দেন বলে জানান হারুন-অর-রশীদ। এ সময় সুমির স্বামী ও স্বজনেরা অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে যান। পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ মরদেহ নিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেন। এরপর আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফোন করে মরদেহ থানায় নেওয়ার নির্দেশ দেন বলে তিনি জানান।
ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম জানান, কারখানায় অসুস্থ হয়ে এক শ্রমিকের মৃত্যুর পর ঘটনাটি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য সামনে আসে। এ পরিস্থিতিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে মৃত্যুর আগে এক কর্মকর্তাকে সুমির সঙ্গে উত্তেজিত আচরণ করতে দেখা গেলেও তখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছিলেন ওসি।
পরিবার ও কর্মস্থল ঘিরে প্রশ্ন
নিহত সুমি আক্তার রংপুরের ডিমলা উপজেলার খোকারহাট এলাকার বজলার মিয়ার মেয়ে। স্বামী সাজ্জাদ হোসেন ও দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি আশুলিয়ার কাঠগড়া নয়াপাড়া এলাকার সালামের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।
তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় কয়েকটি বিষয় তদন্তে স্পষ্ট হওয়া জরুরি—সুমি অসুস্থ ছিলেন কি না, তিনি ছুটি চেয়েছিলেন কি না, কর্মস্থলে তাঁর সঙ্গে কোনো ধরনের নির্যাতন বা দুর্ব্যবহার হয়েছিল কি না এবং এসব ঘটনার সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না।
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং পুলিশের তদন্তের ফলাফলেই মৃত্যুর কারণ ও দায় নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
