অধিকারপত্র ডটকম | আন্তর্জাতিক
জেরুজালেম :ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় বিকল্প সরকার গঠনের উদ্যোগ জোরদার করছেন বিরোধী নেতারা। এরই অংশ হিসেবে ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান আরব রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড আরব লিস্ট—রা’আমের নেতা মনসুর আব্বাসের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গোলান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বৈঠকের একটি ছবি প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ভোটারদের রায় বাস্তবায়ন এবং দ্রুত একটি ‘পরিবর্তনের সরকার’ গঠনের প্রচেষ্টা এগিয়ে নিতে এই বৈঠক হয়েছে।
আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকটি কোথায় অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা গোলান উল্লেখ করেননি। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত মনসুর আব্বাসও এ বৈঠক নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
গোলান বলেন, পরিবর্তনের সুযোগ হাতছাড়া না করা এখন তাঁদের দায়িত্ব। তবে বৈঠক হলেও নতুন সরকার গঠনের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হয়নি।
নির্বাচনে কে কত আসন পেল?
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। ভোট গণনার পর প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, কোনো প্রধান রাজনৈতিক শিবিরই এককভাবে এই সংখ্যায় পৌঁছাতে পারেনি।
- ১.নেতানিয়াহুর জোট:** ৫৩ আসন
- ২.বিরোধী পরিবর্তনপন্থী জোট:** ৪৮ আসন
- ৩ আরব দলগুলো:** সম্মিলিতভাবে ১৯ আসন
আনাদোলু এজেন্সি ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আরব দলগুলোর মধ্যে রা’আম পেয়েছে ৮টি আসন এবং জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে ১১টি আসন।
এই হিসাব অনুযায়ী, বিরোধী জোট ও আরব দলগুলোর আসন যোগ করলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৭। অর্থাৎ, রাজনৈতিক সমঝোতা হলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের গাণিতিক সুযোগ রয়েছে।
তবে আসনসংখ্যা যোগ করলেই সরকার গঠন নিশ্চিত হয় না। কোন দল সরকারে যোগ দেবে, কে বাইরে থেকে সমর্থন দেবে এবং কোন নীতিতে সমঝোতা হবে—এসব বিষয়ে দলগুলোর ঐকমত্য প্রয়োজন।
আরব দলের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে বিরোধীদের মধ্যেই মতভেদ
নতুন সরকার গঠনের প্রচেষ্টায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিরোধী শিবিরের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য। গোলান আরব দল রা’আমকে সম্ভাব্য সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু বিরোধী শিবিরের সব নেতা এ বিষয়ে একমত নন।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল বেইতেনু দলের নেতা আভিগদর লিবারম্যান আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছেন।
অন্যদিকে, গোলান বিরোধী শিবিরের নেতাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করে বিকল্প সরকার গঠনের পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, বর্তমান আসনবিন্যাসে আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ পরিস্থিতিতে বিরোধী নেতাদের সামনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে: আরব দলগুলোর সঙ্গে কী ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা সম্ভব এবং সেই সমঝোতা নেতানিয়াহুবিরোধী সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কি না।
গোলানের আরও বৈঠক, আলোচনায় আইজেনকট ও লাপিদ
আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে ইসরায়েলি সংবাদপত্র *ইসরায়েল হায়োম*-এর বরাতে বলা হয়েছে, গোলান বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ এবং ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকটের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।
নির্বাচনের পর বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং সরকার গঠনের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়াই এসব বৈঠকের লক্ষ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব আলোচনার ভিত্তিতে কোনো চূড়ান্ত জোট চুক্তি হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
নেতানিয়াহুর সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি আসন পাওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন থেকে আটটি আসন পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী জোটের ৪৮টি আসন থাকলেও আরব দলগুলোর সমর্থন বা সহযোগিতা ছাড়া তাদের পক্ষেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সম্ভব নয়।
এই পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের আলোচনা কেবল আসনসংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান, পারস্পরিক আস্থা এবং সরকার পরিচালনার বিষয়ে সমঝোতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ইসরায়েলি রাজনীতিতে আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত। ফলে গোলান ও আব্বাসের বৈঠক নতুন সরকার গঠনের সম্ভাব্য পথ নিয়ে আলোচনা বাড়ালেও এর বাস্তব ফল নির্ভর করবে অন্যান্য দলের অবস্থানের ওপর।

এখন কী হবে?
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি ভোট গণনা শেষ হওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের আগে যাচাইপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। আনাদোলু এজেন্সির ২৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চূড়ান্ত ফল ৪ নভেম্বর প্রকাশের কথা ছিল।
এরপর সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করবেন এবং সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
এখন পর্যন্ত কোনো বিকল্প সরকার চূড়ান্তভাবে গঠিত হয়নি। গোলান-আব্বাস বৈঠককে তাই সরকার গঠনের প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে, তবে এটিকে নেতানিয়াহুর সরকারের পতন বা নতুন সরকার গঠনের নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
অধিকার পত্র ডটকমের পর্যবেক্ষণ:
ইসরায়েলের নির্বাচনী ফল সরকার গঠনের প্রশ্নকে জটিল করে তুলেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসন পেতে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার পাশাপাশি আরব দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক সমীকরণ কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে আসন্ন আলোচনা ও আনুষ্ঠানিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপর।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, *দ্য টাইমস অব ইসরায়েল*; *সিবিএস নিউজ*।
