অধিকারপত্র ডটকম | নিজস্ব প্রতিবেদন
পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর মিরপুর ও গাজীপুরে উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। মিরপুর-১১ নম্বরে সড়ক অবরোধের সময় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানার গোডাউনে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
এসব ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছে পুলিশ। ১ নভেম্বর ঢাকা ও গাজীপুরে বেশ কয়েকজনকে আটক ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে শ্রমিকদের মজুরির দাবিতে আন্দোলন এবং সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা এক বিষয় নয়—পুলিশের অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া প্রয়োজন।
মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন, আটকের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য
১ নভেম্বর সকালে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধসহ বিভিন্ন দাবিতে সড়কে নামেন পোশাকশ্রমিকেরা। একপর্যায়ে মিরপুর-১০ ও ১১ নম্বর এলাকায় সড়ক অবরোধ এবং পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোস্টেশনের নিচে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান প্রথম আলোকে বলেন, আটক ব্যক্তিদের কয়েকজনের রাজনৈতিক পদ-পদবি রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লা শতাধিক ব্যক্তিকে সংগঠিত করে শ্রমিকদের আন্দোলনে পাঠিয়েছিলেন। পুলিশের দাবি, তাঁদের একটি অংশ গাড়িতে আগুন ও ভাঙচুরে জড়িত ছিল।
প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে মিরপুরে ২৯ জন আটকের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে আপনার দেওয়া প্রতিবেদনে মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৯ জন আটকের তথ্য রয়েছে—এর মধ্যে ১১ জন ডিবি এবং আটজন থানা-পুলিশের হাতে আটক হন বলে মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদারের বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মিরপুরে আটকের সংখ্যা নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ভিন্নতা রয়েছে।
গাজীপুরে ৩০ জন গ্রেপ্তার
গাজীপুরে শ্রমিক আন্দোলনে উসকানি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ৩০ জনকে গ্রেপ্তার ও আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নয় নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তালিকায় রয়েছেন—কালিয়াকৈর উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ইউসুফ সিকদার, মৌচাক ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার হোসেন, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কালিয়াকৈর উপজেলার সাবেক সহসভাপতি আরিফুল হোসেন, ৯ নম্বর ওয়ার্ড কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুম মিয়া, যুবলীগের সদস্য মোহাম্মদ মেহেদী হাসান মিজান এবং আওয়ামী লীগের সদস্য সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ রাসেল, সৈকত শেখ ও মিজানুর রহমান।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সহিদুল ইসলাম বলেন, শুধু শ্রমিকদের আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে নয়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ছাড়া শিল্প পুলিশ ও গাজীপুর মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকেও আরও ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে। সময় সংবাদের প্রতিবেদনে নয়জনসহ মহানগর পুলিশ ও শিল্প পুলিশের অভিযানে মোট ৩০ জন গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে।
তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনের আশঙ্কা শিল্প পুলিশের
শিল্প পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক গাজী জসিম উদ্দিন পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বাসসকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, শ্রমিকদের দাবি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ইতিমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। আন্দোলনরত শ্রমিকদের শান্ত করার চেষ্টা এবং মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগের কথা তাঁদের জানানো হয়েছিল। এরপরও বিভিন্ন এলাকায় সহিংস বিক্ষোভ অব্যাহত থাকায় এর পেছনে তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রমিক ও শিল্পকারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ধৈর্য ধারণ করেছে। সহিংস পরিস্থিতি মোকাবিলায় ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
শ্রমিকদের দাবি ও সহিংসতার তদন্ত—দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ
পোশাকশ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবি এবং আন্দোলনের সময় সংঘটিত অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ—দুটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি। শ্রমিকদের মজুরিসংক্রান্ত দাবির নিষ্পত্তি যেমন প্রয়োজন, তেমনি সহিংসতার ঘটনায় কারা জড়িত, কীভাবে ঘটনা ঘটেছে এবং কারও বিরুদ্ধে পরিকল্পিত নাশকতার অভিযোগের পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
পুলিশের অভিযোগে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের দায় আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ঘটলে তারও আইনগত তদন্ত ও বিচার প্রয়োজন।
সংখ্যাগত তথ্যের বিষয়ে: ১ নভেম্বরের ঘটনাগুলো নিয়ে প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে মিরপুরে ২৯ জন আটকের কথা বলা হয়েছে; আপনার সরবরাহ করা প্রতিবেদনে মিরপুরে ১৯ জন এবং গাজীপুরে ৩০ জন—মোট ৪৯ জনের হিসাব দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে সংখ্যার এই পার্থক্য থাকায় চূড়ান্ত সরকারি হিসাব প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত মোট আটকের সংখ্যা নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলন, মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন—ঢাকা ও গাজীপুরে আটক-গ্রেপ্তার
#পোশাকশ্রমিক #শ্রমিকআন্দোলন #ন্যূনতমমজুরি #মিরপুর #গাজীপুর #৩০হাজারটাকা #অধিকারপত্রডটকম
