odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Friday, 6th November 2026, ৬th November ২০২৬
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে ঢাকা, গাজীপুর ও আশুলিয়ায় বিক্ষোভ-সংঘর্ষ; বিজিএমইএর হিসাবে ৫২৯ কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, কর্মস্থল ছেড়েছেন প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক

পোশাকশ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ, মজুরি বোর্ড গঠনেও থামেনি আন্দোলন ৫২৯ কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত

odhikarpatra | প্রকাশিত: ১ November ২০২৬ ১৮:২৩

odhikarpatra
প্রকাশিত: ১ November ২০২৬ ১৮:২৩

নিজস্ব প্রতিবেদক | অধিকার পত্র ডটকম

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সংঘর্ষের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পোশাকশ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

রোববার (১ নভেম্বর) রাতে সচিবালয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। তবে বোর্ড গঠনের দিনেও ঢাকা, মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্ব প্রধানমন্ত্রীর

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। শ্রম মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে এবং মজুরি বোর্ডকে শ্রমিকদের কল্যাণের বিষয়টি বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, সরকার দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশ, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার ওপরও জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

 তিন বছর পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিধান

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য প্রতি তিন বছর অন্তর মজুরি বোর্ড গঠনের বিধান রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত এ বিষয়ে সময় থাকলেও সরকার আগেই বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মালিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধির নাম আগে দিলেও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধির নাম পেতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছিল। শনিবার রাতে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধির নাম পাওয়ার পর রোববার সকালে মজুরি বোর্ড গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

 ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ডে যারা রয়েছেন

১ নভেম্বর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় পোশাকশ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের বোর্ড গঠন করে।

বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান।

বোর্ডের অন্য পাঁচ সদস্য হলেন—

- ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদ—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধি।
- আসিফ আইয়ুব—বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের যুগ্ম মহাসচিব ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধি।
- এ বি এম শামসুদ্দিন—বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধি।
- আনোয়ার হোসেন—জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি।
- বাবুল আক্তার—বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি।

মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বোর্ডকে মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের কার্যক্রম শুরু করতে বলা হয়েছে।

তবে বোর্ড গঠনের অর্থ এই নয় যে শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি ইতোমধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। মজুরি নির্ধারণের সিদ্ধান্ত এখনো বোর্ডের আলোচনার বিষয়।

 ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে উত্তাল শিল্পাঞ্চল

বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকদের দাবি, দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই মজুরিতে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে তাঁরা মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন।

শুধু মজুরি বৃদ্ধি নয়, শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহাল এবং শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করার প্রথা বন্ধের দাবিও জানানো হয়েছে।

১ নভেম্বর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। গাজীপুরের কয়েকটি স্থানে পুলিশ বক্স ও যানবাহনে আগুন দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

 ৫২৯ কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত, কর্মস্থল ছাড়েন প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর ১ নভেম্বরের পরিস্থিতি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, সাভার ও আশুলিয়ায় মোট ৫২৯টি পোশাক কারখানার কার্যক্রম শ্রমিক অসন্তোষে ব্যাহত হয়। এ সময় ৯ লাখ ৮৭ হাজার ১৯০ জন শ্রমিক কর্মস্থল ছেড়ে যান।

এর মধ্যে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের ২৭৬টি কারখানায় ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৩৬০ জন শ্রমিকের কর্মস্থলে উপস্থিতি ব্যাহত হয়। সাভার, আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় ১৮৫টি কারখানার ২ লাখ ৯০ হাজার ২০৫ জন এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের আওতাধীন মিরপুর এলাকার ৬৮টি কারখানার ৫১ হাজার ৬২৫ জন শ্রমিক এতে প্রভাবিত হন।

তবে এসব সংখ্যা বিজিএমইএর পরিস্থিতি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকাশিত। ৫২৯টি কারখানার সবগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে—এমন নয়; অনেক কারখানায় সাময়িক ছুটি ঘোষণা বা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।

সহিংসতা নিয়ে কঠোর অবস্থানে সরকার

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য আলোচনার পথ খোলা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সহিংস আন্দোলনের প্রয়োজন ছিল না।

তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনের নামে পুলিশের গাড়িতে আগুন, বিভিন্ন স্থানে হামলা, যানবাহন ভাঙচুর ও কারখানায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়।

সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সহিংসতা ও নাশকতায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দেওয়া হয়েছে।

সাম্প্রতিক বিক্ষোভে মুখোশধারীদের অনুপ্রবেশ ও উসকানির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাবি করেন, সরকারের কাছে থাকা তথ্য বিশ্লেষণে সীমান্তের ওপার থেকে কিছু পক্ষের ইন্ধনের বিষয় উঠে এসেছে। তাঁর অভিযোগ, নিরীহ পোশাকশ্রমিকদের ব্যবহার করে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি এবং রপ্তানি বাণিজ্য ব্যাহত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তবে সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন দেওয়ার এই অভিযোগের পক্ষে বিস্তারিত প্রকাশ্য প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ব্রিফিংয়ে তুলে ধরা হয়নি। ফলে বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ও সরকারের অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।

 কারখানা চালু রাখার আহ্বান

আন্দোলনের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো দ্রুত চালুর আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, মালিক ও শ্রমিকদের পারস্পরিক আলোচনা এবং সমঝোতার মাধ্যমে উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে হবে।

এদিকে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ১ নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শ্রমিকেরা কাজে ফিরে না এলে শ্রম আইন অনুযায়ী সাময়িকভাবে কারখানা বন্ধ রাখার বিষয়ে মালিকপক্ষ আলোচনা করেছে। উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি আদেশ, পণ্য সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

 আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পাচ্ছে শ্রমিক অসন্তোষ

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স ১ নভেম্বরের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শ্রমিকদের মজুরি দাবিকে কেন্দ্র করে শত শত কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। তাদের প্রতিবেদনে বর্তমান ১২ হাজার ৫০০ টাকা মজুরির বিপরীতে ৩০ হাজার টাকা করার দাবির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ সরাসরি কাজ করেন এবং দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক অসন্তোষ দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

 সামনে কী?

২ নভেম্বর প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ নভেম্বর মজুরি বোর্ড গঠনের দিনও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বিজিএমইএর হিসাবে ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। শ্রমিকদের কাজে ফেরানো এবং কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখাই এখন সরকারের সামনে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ।

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, মালিকদের উৎপাদন সক্ষমতা এবং দেশের রপ্তানি স্বার্থের মধ্যে সমন্বয় করে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা এখন মজুরি বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের দাবি কতটা বাস্তবায়িত হয়, সেটিই এখন তৈরি পোশাকশিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

**অধিকার পত্র ডটকম | বিশেষ প্রতিবেদন**

: ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে উত্তাল পোশাকশিল্প, ৫২৯ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ—প্রধানমন্ত্রীর জরুরি নির্দেশ

#পোশাকশ্রমিক #গার্মেন্টস #শ্রমিকআন্দোলন #তারেকরহমান #মজুরিবোর্ড #বিজিএমইএ #বাংলাদেশ #Odhikarpatra