অধিকার পত্র ডটকম | বিশেষ অনুসন্ধান
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার আলোচিত ভিডিওটি কে ধারণ করেছিলেন, কে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন—এই প্রশ্নের সঙ্গে আলোচনায় এসেছিলেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর টঙ্গীর তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তবে ২ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, তাহসিফের মৃত্যুর কারণ চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়নি। তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পরীক্ষা করছেন। ৫ আগস্টের ভিডিও বিতর্কের সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর যোগসূত্রও এখন পর্যন্ত প্রমাণিত নয়।
৫ আগস্টের ভিডিও কে ধারণ করেছিলেন?
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিও ধারণের অভিযোগে তাহসিফের নাম বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ২১ জুলাই ‘স্পিক উইথ রাশিদ’ নামের একটি পডকাস্টে তাহসিফ অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ জানতে চান।
ঢাকা ট্রিবিউনের ২৯ অক্টোবরের প্রতিবেদনে পডকাস্টের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, তাহসিফের বক্তব্য অনুযায়ী, একটি সংবাদ প্রতিবেদনে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফীকে ভিডিও ধারণকারী এবং তাঁকে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। তাহসিফ প্রশ্ন করেন, তিনি ভিডিওটি ধারণ বা প্রচার করেছেন—এমন অভিযোগের প্রমাণ কী।
অর্থাৎ ভিডিও ধারণ এবং ভিডিও প্রচারের অভিযোগ দুটি আলাদা বিষয়। তাহসিফ নিজেকে ভিডিওটির ধারণকারী হিসেবে স্বীকার করেননি।
এদিকে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট আইএসপিআর এক প্রতিবাদলিপিতে জানায়, তাহসিফ সুরি ও আরেক কর্মকর্তাকে বিমানবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অবসরে পাঠানো হয়েছিল। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের সঙ্গে তাঁদের অবসরের সম্পর্ক নেই বলে আইএসপিআর জানায়।
সুতরাং, প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে রিফাত আশরাফীকে ভিডিওটির নিশ্চিত ধারণকারী কিংবা তাহসিফকে নিশ্চিতভাবে ভিডিওটি ছড়ানোর ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না।
২৭ অক্টোবর রাতের সিসিটিভি ফুটেজে কী দেখা গেছে?
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও জাগো নিউজের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাতে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে তাহসিফ, তাঁর পরিচিত আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ এবং এক তরুণীকে দেখা যায়।
জাগো নিউজের ১ নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাত ১০টা ১৭ মিনিটে তাহসিফ ও ওই তরুণী রেস্টুরেন্টে আসেন। পরে দীপও সেখানে পৌঁছান। রেস্টুরেন্টের সিসিটিভিতে তিনজনকে একসঙ্গে প্রবেশ করতে এবং লিফটের সামনে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। রাত ১১টা ৫১ মিনিটে তাঁদের বের হতে দেখা যায়।
এরপর ওই তরুণী কোথায় যান এবং তাহসিফ ও দীপ কীভাবে টঙ্গীর মাজারবস্তি এলাকায় পৌঁছান, তা তদন্তকারীরা যাচাই করছেন।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুনের বক্তব্য অনুযায়ী, ফুটেজে ওই তরুণীকে দেখা গেলেও তদন্তের একটি পর্যায়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। একই সংবাদমাধ্যমের আরেকটি প্রতিবেদনে ১৯ বছর বয়সী দিশা নামে এক তরুণীকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। তাঁর পরিচয়, ফুটেজে থাকা তরুণীর সঙ্গে মিল এবং মামলায় তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে তদন্তের চূড়ান্ত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
দীপের বক্তব্যে অসংগতি, চার দিনের রিমান্ড
দ্য ডেইলি স্টারের ১ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাহসিফের পরিচিত আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠান আদালত।
নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন সংবাদমাধ্যমকে জানান, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় দীপের সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভিতে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত তাহসিফের সঙ্গে দীপের চলাচলের তথ্য পাওয়া গেছে। টঙ্গীর মাজারবস্তি এলাকায় দুজন একসঙ্গে যাওয়ার পর দীপ একা ফিরে আসেন বলে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন।
দ্য ডেইলি স্টারের ৩০ অক্টোবরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছিলেন, মাজারবস্তি এলাকায় তাঁদের কয়েকজন ধাওয়া করলে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং তিনি পালিয়ে যান। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, দীপের এই বক্তব্যে তাঁরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন এবং তা যাচাই করা হচ্ছে।
এটি দীপের বক্তব্য—ঘটনার প্রমাণিত বিবরণ নয়।
চারটি সিসিটিভি ফুটেজের দাবি কতটা নির্ভরযোগ্য?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ ১ নভেম্বরের এক প্রতিবেদনে চারটি পৃথক স্থানের সিসিটিভি ফুটেজের কথা বলেছে। প্রতিবেদনে তাহসিফকে অনুসরণ এবং পরিকল্পিতভাবে নদীতে ডুবিয়ে হত্যার দাবি করা হয়েছে।
কিন্তু এই প্রতিবেদনের সব দাবি বাংলাদেশি তদন্তকারী সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা প্রকাশিত মূল ফুটেজ দিয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। বিশেষ করে তাঁকে জোর করে পানিতে ডুবিয়ে হত্যার দাবি এখনো প্রমাণিত নয়।
বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সিসিটিভি-সংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে নেস্ট রেস্টুরেন্টের ফুটেজ এবং তাহসিফ ও দীপের শেষ রাতের চলাচলের বিবরণ পাওয়া যায়। সবগুলো ক্যামেরার পূর্ণাঙ্গ ফুটেজ জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়নি।
মরদেহের সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত
২৮ অক্টোবর বিকেলে টঙ্গীর রাজাবাড়ী ঘাটের কাছে তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও দ্য ডেইলি স্টারের প্রকাশিত সুরতহাল প্রতিবেদনের বিবরণ অনুযায়ী, তাঁর শরীরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। পেট কিছুটা ফোলা ছিল।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে ময়নাতদন্তের পর পাকস্থলী, লিভার, কিডনি ও রক্তের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ডিএনএ পরীক্ষার নমুনাও সংগ্রহ করা হয়।
২৯ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ময়নাতদন্ত ও প্রাথমিক তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
২ নভেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে ফরেনসিক পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল পাওয়া যায়নি। তাই তাহসিফের মৃত্যু পানিতে ডুবে, শ্বাসরোধে, বিষক্রিয়ায়, নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে—এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাচ্ছে না।
পরিবারের বক্তব্য ও তদন্তের দাবি
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ছেলের মৃত্যু আত্মহত্যা বলে তিনি মনে করেন না। তবে কে বা কারা দায়ী, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তিনি প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
দ্য ডেইলি স্টারের ১ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাহসিফের বাবা অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। অভিযোগে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য ও অমীমাংসিত প্রশ্ন
**যা নথি ও প্রকাশিত সংবাদে প্রতিষ্ঠিত:**
- ২৮ অক্টোবর তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার হয়।
- সুরতহাল প্রতিবেদনে দৃশ্যমান বাহ্যিক আঘাতের চিহ্ন না পাওয়ার কথা রয়েছে।
- ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফ, দীপ ও এক তরুণীকে নেস্ট রেস্টুরেন্টের সিসিটিভিতে দেখা গেছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
- দীপকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠানোর খবর প্রকাশিত হয়েছে।
- মৃত্যুর কারণ জানতে ফরেনসিক পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
যা এখনো নিশ্চিত নয়:
- ৫ আগস্টের ভিডিওর মূল ধারণকারী কে।
- তাহসিফ ভিডিওটি প্রথম প্রকাশ করেছিলেন কি না।
- টঙ্গীর মাজারবস্তিতে ঠিক কী ঘটেছিল।
- তাঁকে কেউ ধাওয়া করেছিল কি না।
- তাঁর মৃত্যু হত্যা, দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে।
- ৫ আগস্টের ভিডিও বিতর্কের সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না।
তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু কোনো একটি বক্তব্য বা সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী দাবি দিয়ে মৃত্যুর কারণ কিংবা হত্যার পরিকল্পনা নিশ্চিত করা যায় না।
চূড়ান্ত ময়নাতদন্ত, ভিসেরা ও টক্সিকোলজি পরীক্ষার ফল, ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং তদন্তকারী সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রকাশিত হলেই এ ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
এটা ২ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশ্যে যাচাইযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হিসেবে অধিকার পত্র ডটকম এর।
