01/07/2026 ‘পথিক, তুমি কি আসলেই মাঠ হারাইয়াছো?’ —ফুটবলের উল্টো যাত্রা, ক্রিকেটীয় উন্মাদনা ও ট্রফিহীনতার মরুভূমিতে বঙ্কিম–নজরুল
Dr Mahbub
৪ January ২০২৬ ০২:২৭
ক্রীড়াঙ্গনের অবক্ষয়, বাফুফের অরাজকতা ও ক্রিকেটে হতাশা, বাংলাদেশের ক্রিকেট ও ফুটবলের দুর্নীতি, নারী ক্রিকেটারদের যৌন হয়রানি, বেতন বৈষম্য এবং ট্রফিহীনতার মরুভূমি নিয়ে বঙ্কিম-নজরুলের শৈলীতে একটি পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্ত —অধিকারপত্র ধারাবাহিক সম্পাদকীয় বিশেষ কলাম (Odhikarpatra Editorial Feature Column Series) - সপ্তম পর্ব
বঙ্কিমচন্দ্রের নবকুমার সমুদ্রতীরে পথ হারাইয়াছিলেন প্রকৃতির মায়াবী ডাকে; আর বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের পথিক আজ পথ হারাইয়াছে ক্ষমতা, দুর্নীতি ও অদক্ষতার ঘন অরণ্যে। ইহা কোনো সাধারণ ক্রীড়া-বিবরণ নহে—ইহা আমাদের তথাকথিত জাতীয় গৌরবের এক নির্মম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নবকুমারের সম্মুখে যখন কপালকুণ্ডলা আবির্ভূত হইয়াছিলেন, তখন সেই পথভ্রষ্টতা ছিল রোমান্টিক, মানবিক ও সাহিত্যিক। কিন্তু আজকের বাংলাদেশের ক্রিকেট-পথিক—যিনি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বা টেলিভিশনের পর্দার সামনে বসিয়া পথ হারান—তাঁহার সম্মুখে উদ্ভাসিত হয় কেবল ‘উইকেট পতন’, ‘ডট বল’ ও ‘রান রেট’-এর এক অন্ধ গোলকধাঁধা। এখানে কোনো কপালকুণ্ডলা নাই, আছে কেবল হতাশার স্কোরবোর্ড।
একদিকে বিসিবি ও বাফুফের অন্দরমহলে দুর্নীতির উইপোকা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অতিকায় সাম্রাজ্য নির্মাণে ব্যস্ত; অন্যদিকে নারী ক্রিকেটারদের ড্রেসিংরুমে নিঃশব্দে জমা হইতেছে লজ্জা, ভয় ও শ্লীলতাহানির দীর্ঘশ্বাস। যাহাদের দায়িত্ব ছিল রক্ষা করা, তাহারাই ‘রক্ষক হইয়া ভক্ষক’ রূপে ক্ষমতার অন্ধ নেশায় মত্ত। সাফল্যের প্রদীপ যখন ক্যামেরার আলোয় ঝলমল করিয়া ওঠে, তখন সেই আলোয় ঢাকা পড়িয়া থাকে বেতন বৈষম্যের ভয়ংকর ছায়া—যেখানে নারী ও পুরুষের শ্রম একই মাঠে ঘাম ঝরাইলেও মূল্যায়নের নিক্তি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ক্রিকেটীয় উন্মাদনার মোড়কে বিপিএলের প্রবঞ্চনা আর ফুটবলে ফিফার নিষেধাজ্ঞার খড়্গ আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের ক্রীড়াঙ্গনকে এক লজ্জার কাঠগড়ায় দাঁড় করাইয়াছে। বিদেশি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক পরিশোধ না করিবার কদর্য সংস্কৃতি আমাদের খেলাধুলাকে পরিণত করিয়াছে এক অনৈতিক দেনা-খেলায়। নজরুলের ‘দুর্দিনের যাত্রী’-রা আজ যদি জীবিত থাকিতেন, তবে তাঁহারাও হয়তো প্রশ্ন করিতেন—এই ক্রীড়া কি মুক্তির, না লুণ্ঠনের?
ট্রফিহীনতার এই ধূ ধূ মরুভূমিতে দাঁড়াইয়া আমরা কি কেবল পতনের হিসাব রাখিব? না কি নজরুলের অগ্নিরথ ডাকিয়া আনিয়া বলিব—আর নয়, এবার হিসাব দিতে হইবে? বঙ্কিম–নজরুলের দার্শনিক আয়নায় বাংলাদেশের ক্রিকেট ও ফুটবলের এই নিদারুণ অবক্ষয় আজ আর রূপক নহে—ইহা এক কঠিন, কটু ও অনিবার্য বাস্তবতা।
এই সম্পাদকীয় কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র নহে; ইহা একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রশ্ন, একটি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, এবং একটি জাতির আত্মসমালোচনার আহ্বান (ডিসক্লেইমার দেখুন)।
বিপরীতমুখী রথ ও ‘খান্নাস জ্বীনের’ কবলে ক্রীড়াঙ্গন বিশেষ করে ফুটবল ও ক্রিকেট
বিশ্বের মানচিত্রে প্রায় প্রতিটি জাতিই যখন ক্রীড়াক্ষেত্রে প্রগতির জয়গানে মত্ত, বাংলাদেশ তখন এক অদ্ভুত ‘পশ্চাদগমন’ বা উল্টো যাত্রার মহাকাব্য রচনা করিতেছে। আমাদের ক্রিকেট ও ফুটবলকে যেন কোনো এক অশুভ ‘খান্নাস জ্বীন’ আসিয়া দখল করিয়াছে। ইহা যেন আলাদিনের সেই প্রদীপের দৈত্যের এক বীভৎস প্রতিরূপ—যাহার ধর্মই হইল এক পা সম্মুখে অগ্রসর হইয়া তিন পা পশ্চাতে হটিয়া যাওয়া।
পরিসংখ্যানের রূঢ় দর্পণে চাহিলে দেখা যায়, গত ২৯ বৎসরে আমাদের ফুটবল কেবল ‘উল্টো হাঁটে’ নাই, বরং ‘ব্যাক গিয়ার’ চাপিয়া পূর্ণবেগে পশ্চাৎপানে দৌড়াইয়াছে। ১৯৯৬ সালের এপ্রিলে যে ফুটবল দল ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১১০তম স্থানে আসিয়া গগনচুম্বী আশার সঞ্চার করিয়াছিল, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সেই দল অতল গহ্বরে তলাইয়া গিয়া ১৮০তম স্থানে আসিয়া ঠেকিল। এই ২৯ বৎসরের ব্যবধানে আমরা কেবল ৭০টি ধাপই হারাই নাই, হারাইয়াছি আমাদের জাতীয় দম্ভ। মালদ্বীপ বা নেপালের ন্যায় ক্ষুদ্র প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহ যেখানে উন্নতির সোপানে আরোহণ করিতেছে, আমরা সেখানে ইতিহাসের কৃষ্ণগহ্বরে বিলীন হইতেছি।
ক্রিকেটের চিত্রপটও এই দীর্ঘশ্বাসের বাহিরে নহে। যে আফগানিস্তানে যুদ্ধের ডামাডোলে মাঠের ঘাসটুকু পর্যন্ত গজিবার অবসর পায় নাই, তাহারাও আজ আমাদিগকে ছাড়িয়া বহুদূরে চলিয়া গিয়াছে। ২০১৮ সালে টেস্টে ৮ম, ২০১৭ সালে ওয়ানডেতে ৬ষ্ঠ এবং ২০১২ সালে টি-২০তে ৪র্থ স্থানে আসিয়া আমরা যে প্রলয়োল্লাস করিয়াছিলাম, ২০২৫ সালের শেষে আসিয়া সেই দর্প চূর্ণ হইয়াছে। ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে সেই ৬ষ্ঠ স্থান হইতে বিচ্যুত হইয়া আমরা আজ ১০ম স্থানে আসিয়া ধুঁকিতেছি। টি-২০ ক্রিকেটেও আমাদের অবস্থান আজ ১০ম এবং টেস্টে ৯ম।
আশ্চর্যের বিষয় এই যে, পুরুষ দলের তুলনায় শতগুণ কম সুবিধা ও অবহেলা সইয়াও আমাদের নারী দল ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে ৭ম স্থানে থাকিয়া পুরুষদের তুলনায় অধিকতর কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখিতেছে। বঙ্কিমচন্দ্র আজ থাকিলে হয়তো ইহাকেই বলিতেন— "যাহার শক্তিতে মদমত্ত হইয়া আমরা দম্ভ করি, পরিসংখ্যানের বিচারে তাহারা আজ নবাগতদের কাছেও ম্লান।" নজরুলের সেই ‘দুর্দিনের যাত্রী’রা আজ কেবল মাঠ হারাইয়াছে তাহাই নহে, বরং এক অদৃশ্য ‘খান্নাসি জ্বীনের’ পাকে পড়িয়া অতল অন্ধকারেই নিমজ্জিত হইতেছে।
এবার নিম্নে পথহারা ফুটবল ও ক্রিকেটকে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. নবকুমারের 'রান' বিভ্রম ও নির্বাচকদের ঝাউবন : বঙ্কিমচন্দ্রের 'কপালকুণ্ডলা' উপন্যাসে নবকুমারকে সহযাত্রীরা নির্জন বনে ফেলিয়া গিয়াছিল। আমাদের দেশের ক্রিকেট নির্বাচক মণ্ডলীও যেন সেই সহযাত্রীদেরই উত্তরসূরি। তাঁহারা মাঝেমধ্যেই কোনো প্রতিশ্রুতিবান তরুণ ক্রিকেটারকে জাতীয় দলের গহীন বনে একাকী ফেলিয়া দিয়া বাড়িতে ফিরিয়া আসেন। আর সেই তরুণ ক্রিকেটার যখন রানের অভাবে বা উইকেটের তৃষ্ণায় বনে বনে ঘুরিতে থাকেন, তখন বঙ্কিমী ঢঙেই নির্বাচকরা প্রশ্ন করেন— "পথিক, তুমি কি ব্যাটিং অর্ডার হারাইয়াছো?" নবকুমার পথ হারাইয়াছিলেন প্রকৃতির মোহে, আর আমাদের ক্রিকেটাররা পথ হারান 'অফ-স্টাম্পের' বাইরের বলে খোঁচা দিতে গিয়া। বঙ্কিমচন্দ্র আজ মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সে বসিলে নিশ্চয়ই ল্যাপটপে টাইপ করিতেন, "যাহারা হাফ-ভলি বলে চার মারিতে পারে না, তাহাদের কেন এই দুর্গম মাঠে নামানো হইয়াছে? ইহারা কি মাঠ হারাইয়াছে না কি কাণ্ডজ্ঞান?"
২. নজরুলের 'দুর্দিনের যাত্রী' ও ট্রফিহীনতার মন্দির: কাজী নজরুল ইসলাম তাঁহার 'দুর্দিনের যাত্রী' প্রবন্ধে তরুণদের রক্ত-যজ্ঞের পূজারি হইতে বলিয়াছিলেন। আজকের বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে সেই রক্ত-যজ্ঞ হইল 'প্রি-ম্যাচ হাইপ' আর 'সোশ্যাল মিডিয়া ট্রোলিং'। নজরুল বলিয়াছিলেন, "ওগো ভৈরবী মেয়ে! এ রক্ত-পথিকের দল, নবকুমারের দল নয়।" কিন্তু আফসোস, আমাদের ক্রীড়াঙ্গনের বীরেরা মাঠের নামিলে অনেক সময় সেই নবকুমারের মতোই দিশেহারা হইয়া পড়েন। নজরুলের প্রবন্ধে এক 'কাপালিক' ছিল, যাহার কপালে ছিল রক্ত-তিলক। আমাদের ক্রীড়াঙ্গনে এই কাপালিকরা হইল তথাকথিত 'ক্রিকেট বোর্ড' আর 'স্পন্সর' গোষ্ঠী। তাঁহারা নজরুলের সেই মন্দিরের মতো আয়োজন করেন—যেখানে লাইট জ্বলে, ডিজে মিউজিক বাজে, বিজ্ঞাপন চলে, কিন্তু দিনশেষে ট্রফি নামক সেই 'শিব' আর জাগে না। ট্রফিহীনতার এই মন্দিরে প্রতি বছর হাজারো সমর্থকের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে বলি দেওয়া হয়। ভক্তরা তখন নজরুলের ঢঙেই চিৎকার করিয়া বলে— "মাভৈঃ! আমরা ট্রফি হারাই নাই, আমরা শুধু পাওয়ার-প্লে হারাইয়াছি!"
৩. ফুটবলের হাহাকার: বনানী-কুন্তলার সেই জনহীন মাঠ: নজরুল বর্ণিত সেই "নিবিড় অরণ্য" আজ যেন আমাদের ফুটবল মাঠ। এককালে ফুটবল ছিল বাঙালির প্রাণের স্পন্দন, আজ সেখানে ঝাউবনের দীর্ঘশ্বাস। বঙ্কিমচন্দ্র যদি আজ বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের সামনে দাঁড়াইতেন, তবে দেখিতেন মাঠের ঘাসগুলি কপালকুণ্ডলার আলুলায়িত কেশের মতো অবিন্যস্ত হইয়া আছে। সেখানে কোনো পথিক নাই, কোনো কোলাহল নাই। ফুটবল ফেডারেশনের কর্তারা নজরুলের সেই 'ভৈরবী'র মতো অসংকোচ দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকাইয়া বলেন, "আমরা পথ হারাই নাই, আমরা ফিফা র্যাঙ্কিং-এর নিচে নামিয়া আসলে নতুন পথের সন্ধান করিতেছি।" অথচ সাধারণ দর্শক বঙ্কিমী ঢঙেই উত্তর দেয়— "ওগো পথিক, তোমরা পথ হারাইয়া কেবল প্রেস কনফারেন্সের অরণ্যে ঘুরিতেছো।" নজরুলের সেই "সিংহ-শার্দূল-শঙ্কিত" পথ আজ ফুটবলের জন্য রুদ্ধ, সেখানে কেবল রাজনীতির 'তাতা থৈথৈ' নাচ চলে।
৪. ক্রীড়াঙ্গনের ব্যবচ্ছেদ— এক নজরে হারের খতিয়ান : কেন আমাদের ক্রীড়া-পথিকরা বার বার পথ হারায়? নিচের টেবিলটি যেন আমাদের স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টের এক ‘পোস্টমর্টেম রিপোর্ট’:

৫. সোশ্যাল মিডিয়া— ডিজিটাল কাপালিকের তান্ডব নৃত্য: নজরুল লিখিয়াছিলেন, "রক্ত-পাগলি বেটির পায়ের চাপে শিব আর্তনাদ করে উঠল।" আমাদের ডিজিটাল জগতে এই 'রক্ত-পাগলি বেটি' হইল সোশ্যাল মিডিয়া। কোনো খেলোয়াড় এক ম্যাচে জিরো রান করিলে এই ডিজিটাল কাপালিকরা তাঁহার শ্রাদ্ধ করিতে বসেন। তাতা থৈথৈ নাচের বদলে কিবোর্ডের ঝনঝনানি শুরু হয়। বঙ্কিমের কপালকুণ্ডলা যেমন নবকুমারকে সতর্ক করিয়াছিলেন, আমাদের ক্রিকেটারদেরও তেমনি কপালকুণ্ডলা রূপী শুভাকাঙ্ক্ষীরা বলেন— "পথিক, তুমি ফেসবুক ডিলিট করো, নতুবা তুমি মানসিক শান্তির পথ হারাইবে।" ফেসবুক কমেন্ট সেকশন আজ নজরুলের সেই "কাপালিকের রক্ত-পূজার মন্দির", যেখানে টপটপ করিয়া পড়ে বিষাক্ত মন্তব্যের কাঁচা ধারা। খেলোয়াড়রা আজ নবকুমারের মতো বিভ্রান্ত—তাঁহারা কি মাঠের লড়াইয়ে মন দিবেন নাকি ইউটিউবারদের হাত হইতে নিজেদের মান-সম্মান বাঁচাইবেন?
৬. পাইপলাইন ও তৃণমূল —সেই রক্ত-আঁকা পথ কোথায়?: নজরুল তরুণদের বলিয়াছিলেন, "এই বনের পথই আমাদের চির চেনা পথ... সিংহ-শার্দূল-শঙ্কিত কণ্টক-কুণ্ঠিত বিপথে আমাদের চলা।" ক্রীড়াঙ্গনের ক্ষেত্রে এই বিপথ হইল তৃণমূল পর্যায় হইতে প্রতিভা তুলিয়া আনা। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারকরা কেবল তৈরি করা বাগান হইতে ফল ছিঁড়িতে জানেন, চারা রোপণের সেই কণ্টকাকীর্ণ পথে হাঁটিতে চাহেন না। তৃণমূলের একেকটি প্রতিভা আজ বঙ্কিমের সেই "বলির নির্ভীক শিশু"। গ্রাম-গঞ্জের আনাচে-কানাচে অনেক নবকুমার ব্যাটিং-বোলিং শিখিতেছে, কিন্তু অর্থের অভাবে বা সুযোগের অভাবে তাহারা মাঠ হারাইয়া বনের পথ ধরিতেছে (অর্থাৎ অন্য পেশায় চলিয়া যাইতেছে)। আমাদের ক্রীড়া সংসদগুলি আজ নজরুলের সেই "নিবিড় অরণ্য", যেখানে মহিরুহ সব দোলে বটে, কিন্তু ফলের দেখা মিলে না।ৎ
৭. অন্ধকারের অন্দরে: যখন রক্ষকই হয় ভক্ষক: মাঠ কি কেবল ঘাস আর গ্যালারির সীমানায় বন্দি? নাকি তা এক পবিত্র মন্দির, যেখানে ঘাম আর স্বপ্নের সংমিশ্রণে রচিত হয় জাতির গৌরবগাথা? কিন্তু আক্ষেপ, 'পথিক' আজ সত্যিই মাঠ হারাইয়াছে; শুধু ট্রফিহীনতার মরুভূমিতে নয়, বরং নৈতিকতার চরম দুর্ভিক্ষে। যে নারী ক্রিকেটাররা বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের নিশান উড়িয়ে আনেন, যাঁদের ব্যাটে-বলে রচিত হয় নতুন ইতিহাস, তাঁদেরই ড্রেসিংরুমের বদ্ধ বাতাসে আজ গুমরে মরছে লাঞ্ছনার দীর্ঘশ্বাস। জাহানারা আলমদের মতো লড়াকু সৈনিকেরা যখন ক্ষমতার দাপটে থাকা নির্বাচক বা কোচের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ তোলেন, তখন বোঝা যায় আমাদের ক্রিকেটের জৌলুসের আড়ালে কতখানি পচন ধরেছে।
মহামান্য হাইকোর্টের ২০০৯ সালের সেই ঐতিহাসিক সুরক্ষা কবচ আজ বিসিবির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের নথিপত্রের ধুলোয় নিভৃতে কাঁদে। পনেরো দিনের তদন্ত যখন ছাপান্ন দিনের নীরবতায় পর্যবসিত হয়, আর অভিযুক্তরা যখন বহাল তবিয়তে ক্ষমতার অলিন্দে বিচরণ করেন, তখন বিচারব্যবস্থা এক করুণ প্রহসনে রূপ নেয়। এই অন্ধকারের ছায়া বিস্তৃত হয়েছে ফুটবলের সবুজ গালিচাতেও। পিটার বাটলারের মতো ভিনদেশি কোচের বডি শেমিং কিংবা মানসিক নিপীড়ন যখন জাতীয় বীরদের আত্মসম্মানে আঘাত হানে, তখন প্রশ্ন জাগে—আমরা কি তবে ক্রীড়াবিদ নয়, ক্রীতদাস তৈরি করছি? একদিকে রাষ্ট্রীয় পদকের উজ্জ্বল আভা, অন্যদিকে প্রশাসনিক উদাসীনতার গাঢ় অন্ধকার; এই বৈপরীত্যই বলে দেয় আমাদের ক্রীড়াঙ্গন আজ এক মরীচিকার পেছনে ছুটছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায় সেই 'পথিক' আজ দিশেহারা, কারণ যে আঙিনায় ন্যায়বিচার পাওয়ার কথা ছিল, সেখানে আজ 'রক্ষকই ভক্ষক' হয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে। ট্রফি না পাওয়ার হাহাকার হয়তো ঘুচবে কোনো একদিন, কিন্তু নারী ক্রীড়াবিদদের এই যে বিশ্বাসের অবমাননা আর মর্যাদার হানি, সেই ক্ষত কি আদৌ কোনো জয় দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব? মাঠ আজ সত্যিই হারাইয়াছে, কারণ সেখানে এখন আর কেবল খেলা হয় না, চলে ক্ষমতার নোংরা পাশাখেলা।
৮. প্রদীপের নীচে অন্ধকার— সাম্যের মোড়কে বঞ্চনার উপাখ্যান: ক্রিকেট আজ আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, কিন্তু এই আলোকোজ্জ্বল প্রদীপের নিচেই জমিয়া আছে এক গভীর অন্ধকার। একই দেশের মানচিত্র বুকে লইয়া যখন পুরুষ ও নারী ক্রিকেটাররা মাঠে নামেন, তখন তাঁহাদের ঘামের মূল্য নির্ধারিত হয় ভিন্ন ভিন্ন নিক্তিতে। ২০২৫ সালের বিসিবির কেন্দ্রীয় চুক্তির দিকে তাকালে এক আকাশ-পাতাল পার্থক্যের ছবি ফুটে ওঠে:

একজন পুরুষ ক্রিকেটার একটি টেস্ট ম্যাচ খেলিলে যে ৬ লক্ষ টাকা পান, একজন নারী ক্রিকেটারের সারা বছরের বেতনও তাহার ধারেকাছে পৌঁছে না। নজরুল তাঁহার কবিতায় 'সাম্যের গান' গাইয়াছিলেন, কিন্তু আমাদের ক্রিকেটীয় কাঠামোয় সেই সাম্য আজ এক সুদূরপরাহত কল্পনা। নারী ক্রিকেটাররা যখন এশিয়া জয় করেন, তখন ফেসবুকের ওয়ালে প্রশংসার জোয়ার আসে; কিন্তু যখনই পারিশ্রমিকের প্রশ্ন ওঠে, তখনই 'বাজেট' আর 'মার্কেট ভ্যালুর' অজুহাতে তাঁহাদের থামাইয়া দেওয়া হয়। ১৫ জন নারীর জন্য সংকুচিত এই চুক্তির তালিকা কি কেবলই সংখ্যা? নাকি এক গভীর অবহেলার দলিল?
৯. ক্ষমতার রঙ্গমঞ্চ— 'হু কেয়ারস' সংস্কৃতি ও দাবার বোর্ডে ক্রিকেট: মাঠের সবুজ গালিচায় যখন ব্যাটে-বলের লড়াই স্তিমিত, মিরপুরের করিডোরগুলোতে তখন চলে অন্য এক 'খেলা'। সে খেলা ট্রফি জেতার নয়, বরং গদি দখলের। ক্রিকেট বোর্ডের নির্বাচনকে ঘিরে যে মহানাটক বা 'ড্রামা'র অবতারণা আমরা দেখি, তা যেন কোনো শেক্সপীয়রীয় ট্র্যাজেডির চেয়ে কম নয়। এক পক্ষ যায়, অন্য পক্ষ আসে; কিন্তু ক্রিকেটের ভাগ্যাকাশে মেঘ কাটে না। পদত্যাগ আর অন্তর্বর্তীকালীন রদবদলের এই মিউজিক্যাল চেয়ার খেলায় প্রকৃত ক্রীড়া সংগঠকরা আজ ক্লান্ত, বিমুখ। যাঁরা মাঠ পর্যায়ে ক্রিকেটার তৈরি করেন, সেই নিবেদিতপ্রাণ সংগঠকদের একটি বড় অংশ আজ ক্রিকেট বর্জনের মিছিলে শামিল। তাঁদের অভিমান কিংবা ক্ষোভের কোনো তোয়াক্কা নেই কারো; নীতিনির্ধারকদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে এক উদ্ধত ভাব— 'হু কেয়ারস' (কে ধার ধারে)! এই তাচ্ছিল্যই আজ বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ক্ষত।
বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, "অধঃপতনেরও একটা সীমা আছে।" কিন্তু আমাদের ক্রিকেট প্রশাসনের অন্দরমহলে সেই সীমানা আজ বিলীন। যে সংগঠকরা একদিন রক্ত পানি করে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ক্রিকেটের চারাগাছ রোপণ করেছিলেন, আজ তাঁরাই ব্রাত্য। দাবার বোর্ডের বোড়ে হিসেবে ব্যবহৃত হতে হতে তাঁরা আজ স্বেচ্ছায় নির্বাসনে। নতুনের আগমনের ডামাডোলে অভিজ্ঞতার যে অপচয় ঘটছে, তার খতিয়ান রাখার দায় কি কারো আছে? বোর্ডের নির্বাচন যেন আজ জনবিচ্ছিন্ন এক উৎসব, যেখানে ক্রিকেটের উন্নতির চেয়ে নিজেদের বলয় ভারী করাই মুখ্য উদ্দেশ্য। যখন মাঠের ক্রিকেটাররা সুবিচার না পেয়ে ডুকরে কাঁদে কিংবা নারী ক্রিকেটাররা শ্লীলতাহানির শিকার হয়ে দ্বারে দ্বারে ঘোরে, তখন এই প্রশাসনিক ড্রামা কেবল প্রহসনই মনে হয়। এই যে 'হু কেয়ারস' মানসিকতা— যেখানে সাধারণ মানুষের আবেগ আর সংগঠকদের ত্যাগের কোনো মূল্য নেই— এটিই কি তবে আমাদের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ? মাঠ হারানোর বিলাপ কি তবে এই অরাজকতার ভিড়েই হারিয়ে যাবে?
১০. অগ্নিরথ ও বিদেশ যাত্রা— যখন 'পারফরম্যান্স' কেবল ট্যুরিজম: নজরুল লিখিয়াছিলেন, "আকাশ থেকে অগ্নিরথ নেমে এল। বলিদানের তরুণরা তাতে চড়ে ঊর্ধ্বে উঠে যেতে লাগল।" আমাদের খেলোয়াড়রা যখন বড় কোনো টুর্নামেন্টে বিমানে চড়িয়া বিদেশে যান, তখন মনে হয় অগ্নিরথ চলিতেছে। কিন্তু বিদেশের মাটিতে গিয়া যখন তাঁহারা অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করেন, তখন বঙ্কিমের সেই লাইনটিই মনে পড়ে— "পথিক, তুমি কি আবহাওয়া আর কন্ডিশনের অজুহাতে পথ হারাইয়াছো?" নজরুলের সেই "ভৈরবপন্থীর কণ্ঠ" আজ কেবল বিজ্ঞাপনী জিঙ্গেলে পর্যবসিত হইয়াছে। খেলা শুরুর আগে টিভিতে যে দেশপ্রেমের হুঙ্কার শোনা যায়, মাঠের পারফরম্যান্স অনেক সময় তাহার বিপরীত—যেন বঙ্কিমের সেই নবকুমার সহযাত্রীদের হাতে পরিত্যক্ত হইয়া নির্জন বনে একা ঘুরিতেছেন।
১১. বিপিএলের মায়া-মহোৎসব— প্রবঞ্চনার গ্লানি ও বিশ্বমঞ্চে ধূসর ভাবমূর্তি: মাঠ হারানোর এই বিলাপ কেবল গ্যালারির শূন্যতায় কিংবা ট্রফিহীনতার হাহাকারেই সীমাবদ্ধ নেই; তা আজ বিপিএলের মতো ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেটের তথাকথিত 'জমকালো' আসরেও এক বিষাদসিন্ধু হয়ে দেখা দিয়েছে। ফ্লাডলাইটের তীব্র আলো আর আতশবাজির ঝলকানিতে আমরা যখন এক কৃত্রিম উৎসবের মায়া তৈরি করি, তখন সেই গ্ল্যামারের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় এক রূঢ় ও কদর্য বাস্তবতা। যে বিদেশি খেলোয়াড়রা আমাদের আমন্ত্রণে দূর-দেশ থেকে ছুটে আসেন, কিংবা যে দেশি অকুতোভয় প্রাণরা মাঠের লড়াইয়ে নিজেদের নিংড়ে দেন, দিনশেষে তাঁদের পারিশ্রমিক নিয়ে যখন টালবাহানা চলে, তখন প্রশ্ন জাগে—এ কেমন আতিথেয়তা? খেলোয়াড়দের চেক বাউন্স হওয়া কিংবা বকেয়া পাওনার জন্য মাসের পর মাস ধরনা দেওয়া এখন বিপিএলের এক নিয়মিত কলঙ্ক। নজরুলের সেই সাম্যবাদী চেতনায় যেখানে শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই মজুরি দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে আমাদের ক্রিকেটের এই করপোরেট সংস্কৃতির ধ্বজাধারীরা প্রবঞ্চনাকেই যেন নিয়মে পরিণত করেছেন।
যখন একজন আন্তর্জাতিক তারকা ক্রিকেটার নিজ দেশে ফিরে গিয়ে বাংলাদেশের অপেশাদারিত্ব আর অর্থ আত্মসাতের গল্প শোনান, তখন বিশ্বের দরবারে আমাদের লাল-সবুজ পতাকার যে মর্যাদা ধুলোয় লুটোপুটি খায়, তার ক্ষতিপূরণ কি কোনো গ্ল্যামার দিয়ে সম্ভব? বিপিএল আজ কেবল চার-ছক্কার আসর নয়, বরং বিশ্ব ক্রিকেটের কাছে এক 'অবিশ্বাসের আতুড়ঘর' হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। বঙ্কিমচন্দ্রের 'বিড়াল' প্রবন্ধের সেই অবহেলিত সত্তার মতো খেলোয়াড়রা আজ প্রশ্ন তুলছেন—"ক্ষুধার্তের কি বিচার নাই?" অথচ বোর্ডের নীতিনির্ধারকরা এই ভাবমূর্তি সংকটের দিনেও নির্বিকার। এই যে ব্যক্তিগত লাভ আর ক্ষমতার দাপটে দেশের সম্মানকে বিসর্জন দেওয়া, এটিই কি তবে আমাদের ক্রীড়া সংস্কৃতির শেষ পরিণতি? প্রদীপের নিচের এই অন্ধকার যখন সীমান্তের ওপারেও জানাজানি হয়ে যায়, তখন সেই পথিক কেবল মাঠই হারায় না, হারায় তার আত্মসম্মান এবং বিশ্বের বিশ্বাসও।
১২. রন্ধ্রে রন্ধ্রে উইপোকা— বিসিবি-বাফুফের অন্দরমহলে দুর্নীতির মহোৎসব: 'পথিক' যখন মাঠের সন্ধানে ক্লান্ত, তখন সে দেখতে পায়—যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঁধে ছিল ক্রীড়াঙ্গনের মালি হওয়ার দায়িত্ব, তারাই আজ ডালপালা কেটে শিকড় চুরিতে মত্ত। মিরপুরের রাজকীয় অট্টালিকা থেকে মতিঝিলের জীর্ণ ভবন, বাংলাদেশের ক্রিকেট ও ফুটবল আজ দুর্নীতির এক নিশ্ছিদ্র জালে বন্দি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আজ কেবল একটি ক্রীড়া সংস্থা নয়, বরং এক অস্বচ্ছ করপোরেট সাম্রাজ্য; যেখানে শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প মানেই প্রভাবশালী পরিচালক আর রাঘববোয়ালদের পকেটস্থ হওয়া। নজরুলের সেই 'কুলি-মজুর'দের মতো ক্রিকেটাররা মাঠে রক্ত পানি করেন, আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে দুর্নীতির নীল-নকশা আঁকেন একদল নীতিনির্ধারক। তৃণমূলের ক্রিকেট যখন অর্থের অভাবে ধুঁকছে, তখন মেগা-প্রজেক্ট আর টেন্ডারবাজির আড়ালে লোপাট হয়ে যাচ্ছে গচ্ছিত তহবিল। স্বচ্ছতার দোহাই দেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু অডিট রিপোর্টের পাতায় পাতায় যে গরমিল, তা যেন বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়—"অন্ধের কাছে দর্পণ" মাত্র।
অন্যদিকে, ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) অবস্থা আরও করুণ। সেখানে দুর্নীতির চেহারাটা এতটাই নগ্ন যে, খোদ আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিফাকেও 'লাল কার্ড' দেখাতে হয়েছে। কর্মকর্তাদের আর্থিক অনিয়ম, ভুয়া ভাউচার আর অনুদানের টাকা ব্যক্তিগত বিলাসিতায় ব্যয়ের কেলেঙ্কারি বিশ্ব দরবারে দেশের ফুটবলকে এক লজ্জার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। যে দেশে ফুটবলের নবজাগরণ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে 'সংগঠক' নামের ছদ্মবেশে একদল মানুষ কেবল নিজেদের ভাগ্যবদল করে গেছেন। মাঠের ঘাস বড় হয়নি, কিন্তু কর্মকর্তাদের ব্যাংক ব্যালেন্স ফুলেফেঁপে মহীরুহ হয়েছে। এই যে প্রাতিষ্ঠানিক পচন, যেখানে দুর্নীতিই এখন অলিখিত সংবিধানে পরিণত হয়েছে—সেখানে সুস্থ ক্রীড়া সংস্কৃতি গড়ে ওঠা কি সম্ভব? বঙ্কিম-নজরুল বেঁচে থাকলে হয়তো আজ ধিক্কার দিয়ে বলতেন, এই পচাগলা ব্যবস্থার নাম ক্রীড়া উন্নয়ন নয়, এটি হলো জাতীয় মেধার সুপরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ। মাঠ আজ সত্যিই হারিয়ে গেছে অর্থলিপ্সার অতল গহ্বরে।
আরো দেখুন: Enjoy the 🎬 প্রোমো - অধিকারপত্র সম্পাদকীয় সিরিজ — পথিক, তুমি কি আসলেই পথ হারাইয়াছো?| বাংলা সাহিত্য × ডিজিটাল বাস্তবতা
১৩. ফিফার 'রক্ত-তিলক' ও লাল কার্ড— বিদেশের অতিথিদের প্রতারণার বিষবাষ্প : মাঠ হারাইবার এই বিষাদগাথা যখন ঘরোয়া গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব দরবারে পৌঁছায়, তখন লজ্জিত হয় আমাদের লাল-সবুজ পতাকা। বিদেশের যে কুশলী ফুটবলাররা এক বুক আশা লইয়া আমাদের দেশের ক্লাবগুলোতে আসিয়াছিলেন, তাঁহাদের শ্রমের মূল্য যখন কুক্ষিগত করা হয়, তখন ফিফা নামক সেই 'ধর্ম-শাসক' কঠোর দণ্ড লইয়া অবতীর্ণ হয়। বাংলাদেশের কতিপয় নামী ক্লাবের উপর ফিফার এই যে নিষেধাজ্ঞা বা 'ট্রান্সফার ব্যান'—ইহা কেবল একটি আইনি দণ্ড নয়, ইহা আমাদের জাতীয় অপেশাদারিত্বের কপালে এক কলঙ্কিত 'রক্ত-তিলক'। বঙ্কিমচন্দ্রের নবকুমার যেমন অপরিচিত স্থানে আসিয়া সাহায্যের প্রত্যাশা করিয়াছিলেন, এই বিদেশি খেলোয়াড়রাও তেমনি আমাদের দেশে আসিয়াছিলেন 'অতিথি' হইয়া। কিন্তু আক্ষেপ! আমাদের ক্লাব কর্তারা নজরুলের সেই 'শোষক' চরিত্রে অবতীর্ণ হইয়া তাঁহাদের ঘামের পারিশ্রমিক দিতে অস্বীকার করিয়াছেন। বিদেশের মাটিতে যখন অভিযোগ ওঠে যে বাংলাদেশের ক্লাবগুলো বেতন দেয় না, তখন কেবল সেই ক্লাব নয়, বরং সমগ্র দেশের ফুটবল সংস্কৃতিই বিশ্ব মানচিত্রে এক 'প্রতারকের চারণভূমি' হিসেবে চিহ্নিত হয়।
ফিফার দরবারে যখন আমাদের দেশের ক্লাবগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমে এবং একের পর এক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার খড়্গ নামিয়া আসে, তখন নজরুলের সেই বিদ্রোহী সত্তা যেন ধিক্কার দিয়া বলিতে চাহে— "অতিথির রক্ত চুষিয়া যে অট্টালিকা গড়া হয়, তাহা তাসের ঘরের ন্যায় ভাঙিয়া পড়িবে!" এই যে বিশ্ব দরবারে শির নত হওয়া, বিদেশের খেলোয়াড়দের অশ্রুসজল চোখে বিদায় দেওয়া—ইহাও কি আমাদের আত্মসম্মানের মাঠ হারাইবারই এক নিদারুণ নামান্তর নয়? প্রদীপের নিচের এই গাঢ় অন্ধকার আজ সীমান্ত পার হইয়া ফুটবল বিশ্বের প্রতিটি দপ্তরে জানাজানি হইয়া গিয়াছে, যাহা আমাদের ক্রীড়া ইতিহাসের এক অক্ষয় কলঙ্ক।
শেষ প্রত্যাশা: শিব জাগাবার পথ কি মিলিবে?
নজরুল বলিয়াছিলেন, "ছেড়ে দে বেটি, ছেড়ে দে শিবকে, কল্যাণকে উঠে দাঁড়াতে দে।" আমাদের ক্রীড়াঙ্গনের সেই 'শিব' হইল প্রকৃত স্পোর্টিং কালচার আর স্বচ্ছতা। আমাদের ক্রীড়া জগতকে কেবল 'বিজ্ঞাপনের যজ্ঞশালা' না বানাইয়া মাঠের প্রকৃত যুদ্ধের ময়দান করিতে হইবে। বঙ্কিমচন্দ্রের নবকুমার যেমন অবশেষে ঘর ফিরিয়াছিলেন, আমাদের ট্রফিহীন ক্রীড়াঙ্গনও যেন জয়ের দেখা পায়।
উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে আমাদের শেষ কথা— ফ্লাইওভার বা মেগা প্রজেক্টের উচ্চতা দিয়া নয়, বরং অলিম্পিকের পদক আর বিশ্বকাপের ট্রফি দিয়া একটি জাতির আত্মসম্মান পরিমাপ করা হয়। নজরুলের সেই 'অগ্নিরথ' যেন কেবল বিমানে চড়িয়া বিদেশ যাত্রা না হয়, বরং তা যেন হয় বিজয়ের ঝাণ্ডা লইয়া ঘরে ফিরিবার রথ।
যদি কোনোদিন আমাদের ক্রিকেট বোর্ড বা স্পোর্টস কাউন্সিল আমাদের জিজ্ঞেস করে, "পথিক, তোমরা কি উন্নয়নের পথ হারাইয়াছো?" আমরা যেন বঙ্কিমী রোমান্টিকতায় না ডুবিয়া নজরুলের তেজে উত্তর দিতে পারি— "আমরা পথ হারাই নাই, আমরা কেবল দুর্দিনের যাত্রী হইয়া সুদিনের প্রতীক্ষায় আছি!"
[শুনুন 🎵 পথিক, তুমি কি আসলেই পথ হারাইয়াছো? | Lok-Rock Satire Song | Lyric Video | অধিকারপত্র সম্পাদকীয় সিরিজ ]
এই সম্পাদকীয়তে উল্লিখিত সকল মতামত, রূপক, উপমা ও ব্যঙ্গাত্মক বিশ্লেষণ সম্পূর্ণভাবে সাহিত্যিক ও সম্পাদকীয় অভিব্যক্তির অংশ। এখানে ব্যবহৃত ঘটনাপ্রবাহ, চরিত্রচিত্রণ ও ভাষা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি অভিযোগ, মানহানিকর বক্তব্য বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে হেয় করা নয়; বরং ব্যঙ্গ, রূপক ও সাহিত্যিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের কাঠামোগত সংকট, নৈতিক অবক্ষয় ও সংস্কার-প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে জনচিন্তা, সংলাপ ও আত্মসমালোচনার পরিসর তৈরি করা। পাঠকের ভিন্নমত ও ভিন্ন ব্যাখ্যাকে আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করি। কোনো অংশে কারও সঙ্গে সাদৃশ্য প্রতীয়মান হইলে তাহা সম্পূর্ণ কাকতালীয় বলিয়া গণ্য করিতে অনুরোধ করা হইতেছে।
(আপনার মতামত আমাদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। কমেন্ট বক্সে জানান আপনার ভাবনা। তবে অনুরোধ—বিনা কারণে রিলস বা অপ্রাসঙ্গিক ভিডিও শেয়ার করবেন না!)
পরের পর্ব: (চোখ রাখুন) অধিকারপত্র ধারাবাহিক সম্পাদকীয় বিশেষ কলাম - অষ্টম পর্ব ‘: পথিক, তুমি কি আসলেই নদী হারাইয়াছো?' : বুড়িগঙ্গা থেকে পশুর—মৃতপ্রায় জলপথের ময়নাতদন্তে বঙ্কিম-নজরুল
— অধ্যাপক ড. মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র
📧 odhikarpatranews@gmail.com
#BangladeshCricket #BCB #BFF #SportsSatire #BankimNazrul #GenderEqualityInSports #Odhikarpatra #CricketPolitics