odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Friday, 6th November 2026, ৬th November ২০২৬
দীর্ঘ ১৩ বছরের সম্পর্কে যাঁকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করেছিলেন, সেই সঙ্গীর বিরুদ্ধেই ধর্ষণের অভিযোগ; আদালতে দোষ স্বীকারের পর ৬ বছর ৮ মাসের কারাদণ্ড

ঘুমের মধ্যে সঙ্গীর ধর্ষণের শিকার, ১৩ বছর পর সত্য জেনে ভেঙে পড়েন অ্যাডেল

odhikarpatra | প্রকাশিত: ১৬ October ২০২৬ ২৩:৪৯

odhikarpatra
প্রকাশিত: ১৬ October ২০২৬ ২৩:৪৯

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | অধিকারপত্র ডটকম

দীর্ঘ ১৩ বছরের প্রেমের সম্পর্ক। সঙ্গীকে মনে করতেন নির্ভরতার জায়গা, ভালোবাসার মানুষ ও নিরাপদ আশ্রয়। শারীরিক অসুস্থতার সময় সেই সঙ্গীই তাঁর দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু একসময় জানতে পারেন, ঘুমের মধ্যে সেই মানুষটির কাছেই তিনি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই সত্য জানার পর ভেঙে পড়ে তাঁর বিশ্বাস, বদলে যায় জীবন।

যুক্তরাজ্যের ডার্বির বাসিন্দা অ্যাডেল ওভারটনের জীবনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা সামনে এসেছে বিবিসির এক প্রতিবেদনে। তাঁর সাবেক সঙ্গী স্টিভেন উডেনের বিরুদ্ধে তাঁকে ধর্ষণের দুটি অভিযোগ আনা হয়। পরে আদালতে দোষ স্বীকার করলে উডেনকে ছয় বছর আট মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

অ্যাডেল জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে যাঁকে তিনি ভালোবাসতেন, তাঁর কাছ থেকেই এমন নির্যাতনের শিকার হওয়ার বিষয়টি মেনে নেওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যমে অন্য নির্যাতিত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান তিনি।

 যেভাবে পরিচয়, তারপর প্রেম

২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যের নটিংহামে একটি জম্বি চলচ্চিত্রের শুটিংয়ে অ্যাডেল ও স্টিভেনের পরিচয় হয়। তখন অ্যাডেলের বয়স ২৯ বছর এবং স্টিভেনের ২৭। দুজনই চলচ্চিত্রটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্টিভেন মেকআপের কাজের পাশাপাশি অভিনয়ও করতেন।

প্রথমে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। পরে ২০১২ সালের ১৩ জানুয়ারি তাঁরা সম্পর্কে জড়ান। দিনটি অ্যাডেলের বিশেষভাবে মনে আছে। সেদিন তাঁরা ‘ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্থ’ চলচ্চিত্রের একের পর এক পর্ব দেখেছিলেন।

অ্যাডেলের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের সম্পর্কগুলোর তুলনায় স্টিভেনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আলাদা। তিনি স্টিভেনকে প্রাণবন্ত, স্নেহশীল ও যত্নশীল মানুষ হিসেবে চিনতেন। দুজন একসঙ্গে একটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে জম্বির চরিত্রে অভিনয়ও করতেন।

কিন্তু ২০১৭ সালে অ্যাডেল এলার্স-ড্যানলস সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর পক্ষে আগের মতো কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ২০১৮ সালের শুরুর দিকে স্টিভেন তাঁর দেখাশোনার দায়িত্ব নেন। অ্যাডেলের ভাষ্য, তাঁর দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব কাজেই সহযোগিতা করতেন স্টিভেন।

 নির্ভরতার সম্পর্কেই বাড়ছিল নিয়ন্ত্রণ

পেছনে ফিরে অ্যাডেল মনে করছেন, সম্পর্কের একপর্যায়ে স্টিভেনের আচরণে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা দেখা দিয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, অন্যরা অ্যাডেলকে কোনো কাজের প্রস্তাব দিলে স্টিভেন প্রায়ই বলতেন, তিনি সেটি সামলাতে পারবেন না। এভাবে অ্যাডেলের সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ছিল বলে তাঁর মনে হয়েছে।

২০২০ সালে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য কেমোথেরাপি নেওয়ার সময় অ্যাডেলের মনে প্রথম গুরুতর সন্দেহ তৈরি হয়। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, এক রাতে ঘুম ভেঙে তিনি দেখতে পান, স্টিভেন তাঁর সঙ্গে যৌনমিলন করছেন।

স্টিভেন তখন দাবি করেছিলেন, তিনি ভেবেছিলেন অ্যাডেল জেগে ছিলেন। তাঁর আচরণ ভুলবশত হয়েছে বলেও বোঝানোর চেষ্টা করেন। অ্যাডেল সেই ব্যাখ্যা বিশ্বাস করতে চেয়েছিলেন। কারণ, তখনও তিনি স্টিভেনকে ভালোবাসতেন এবং সম্পর্কটিকে নিরাপদ মনে করতেন।

অ্যাডেল বলেন, সত্যটি মেনে নেওয়ার চেয়ে ব্যাখ্যাটি বিশ্বাস করা তাঁর কাছে সহজ মনে হয়েছিল। কিন্তু ঘটনার পর তাঁর ঘুমের সমস্যা বাড়তে থাকে। সঙ্গীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার ক্ষেত্রেও মানসিক বাধা তৈরি হয়। অতীতের যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা ও দুঃস্বপ্নও তাঁর কষ্ট বাড়িয়ে দেয়।

 পাঁচ বছর পর স্বীকারোক্তি

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নিজের অন্ত্রের ক্যানসারের চিকিৎসা চলাকালে স্টিভেন তাঁর আচরণ সম্পর্কে স্বীকারোক্তি দেন। এ সময় অ্যাডেলের মনে ২০২০ সালের সেই ঘটনার স্মৃতি ফিরে আসে। স্টিভেনের বক্তব্যের সূত্র ধরে তাঁদের মধ্যে দীর্ঘ কথোপকথন হয়।

অ্যাডেলের বর্ণনা অনুযায়ী, একপর্যায়ে স্টিভেন এক বন্ধুকে ফোন করে নিজের কৃতকর্মের কথা জানান। পরে বাড়িতে ফিরে অ্যাডেলের কাছেও বিষয়টি স্বীকার করেন।

স্বীকারোক্তির পরও অ্যাডেল সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করতে পারেননি। একদিকে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং দেখাশোনার জন্য স্টিভেনের ওপর নির্ভরশীলতাও ছিল।

শেষ পর্যন্ত গ্রুপ থেরাপির এক সেশনে তিনি বিষয়টি জানান। তাঁর কাউন্সেলর তাঁকে স্টিভেনকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া এবং পুলিশকে জানানোর পরামর্শ দেন। পরে নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার পর পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়।

 পুলিশের তদন্ত ও আদালতের রায়

মামলাটির তদন্ত করে ডার্বিশায়ার পুলিশ। ডিটেকটিভ সার্জেন্ট এলেনর কার্টনের ভাষ্য অনুযায়ী, অ্যাডেলের সঙ্গে কথা বলার পর পুলিশ স্টিভেনকে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন বলে তদন্ত কর্মকর্তা জানান।

স্টিভেনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের দুটি অভিযোগ আনা হয়। পরে আদালতে তিনি দোষ স্বীকার করেন এবং তাঁকে ছয় বছর আট মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, অ্যাডেলের সাহসিকতা ও পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা অন্য সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। কারও সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে পুলিশকে জানানোর আহ্বানও জানান তিনি।

ওষুধ প্রয়োগ নিয়ে সন্দেহ, তবে আদালতে প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি

অ্যাডেলের সন্দেহ, স্টিভেন হয়তো তাঁকে ঘুমের মধ্যে রাখার জন্য তাঁর ওষুধের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতেন বা অতিরিক্ত ওষুধ দিতেন। তিনি জানান, নিজের ওষুধের পাত্রগুলো স্টিভেনই গুছিয়ে দিতেন এবং পরে তিনি দেখতে পান, অন্যান্য ওষুধের তুলনায় তাঁর ঘুমের ওষুধ কম ছিল।

তবে এই সন্দেহের পক্ষে আদালতে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ঘটনাগুলো পুরোনো হওয়ায় ফরেনসিক পরীক্ষা ও টক্সিকোলজির মাধ্যমে ওষুধ প্রয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল না।

অ্যাডেলের ভাষ্য অনুযায়ী, স্টিভেন তাঁকে সাত থেকে আটবার এমন নির্যাতনের কথা বলেছিলেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তবে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে দুটি ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছিল। অভিযোগের সংখ্যা ও তাঁর বর্ণিত ঘটনার সংখ্যা এক নয়—এ বিষয়টি আলাদা করে দেখা জরুরি।

মায়ের পাশে দাঁড়ানোর সাহস নিয়ে গর্বিত মেয়ে

অ্যাডেলের মেয়ে শারি ওভারটন বলেছেন, তাঁর মায়ের ওপর এই ঘটনার মানসিক প্রভাব দেখা কষ্টকর ছিল। তাঁর মতে, ঘটনার পর অ্যাডেলের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই কমে গেছে।

তবে পুলিশ ও আদালতের সঙ্গে কথা বলা এবং নিজের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য মায়ের প্রতি গর্ব প্রকাশ করেছেন শারি।

অ্যাডেল মনে করেন, তাঁর অভিজ্ঞতা অন্যদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী বা অন্যের পরিচর্যার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিরা যেন পরিচর্যাকারীর হাতে নির্যাতনকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা অনিবার্য বলে মেনে না নেন।

তিনি বলেন, একসময় তাঁর মনে হয়েছিল, স্টিভেনের কাছ থেকে পরিচর্যা পাওয়ার বিনিময়ে হয়তো তাঁকে এমন ঘনিষ্ঠতার দায় শোধ করতে হবে। পরে তিনি উপলব্ধি করেন, এমন কোনো দায় তাঁর ছিল না।

অ্যাডেলের এই বক্তব্যের মূল কথা—কেউ কারও যত্ন নিলেই তার শরীরের ওপর অধিকার পেয়ে যায় না। ভালোবাসা, সম্পর্ক কিংবা পরিচর্যার বিনিময়ে যৌন সম্মতি আদায় করা যায় না। অসুস্থতা, প্রতিবন্ধিতা বা নির্ভরশীলতা কোনো ব্যক্তির মর্যাদা ও অধিকার কমিয়ে দেয় না।

**সূত্র: বিবিসি বাংলা**

 

 

:যুক্তরাজ্যের অ্যাডেল ওভারটন অভিযোগ করেন, তাঁর দীর্ঘদিনের সঙ্গী ঘুমের মধ্যে তাঁকে ধর্ষণ করতেন। আদালতে দোষ স্বীকারের পর স্টিভেন উডেনের ছয় বছর আট মাসের কারাদণ্ড হয়।