odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 8th January 2026, ৮th January ২০২৬
৮২৩ বছর পর প্রকৃতির নিখুঁত ভারসাম্য এবং ফুলতলা গ্রামের এক সামাজিক বিপ্লবের কাল্পনিক উপাখ্যান

মিরাকল ফেব্রুয়ারি ২০২৬: সময়ের গাণিতিক ছন্দে আগামীর বাংলাদেশ

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৬ January ২০২৬ ১৩:১৪

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৬ January ২০২৬ ১৩:১৪

বিশেষ ফিচার ন্যারেটিভ

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসটি কেন একটি 'মিরাকল মাস'? ৮২৩ বছর পর পর আসা সময়ের এক অদ্ভুত গাণিতিক বিন্যাস এবং এর প্রভাবে একটি সাধারণ গ্রামের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প। কীভাবে প্রকৃতির ভারসাম্য আমাদের জাতীয় নির্বাচনে সৎ প্রার্থী বাছাইয়ে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, তা জানতে পড়ুন এই বিশেষ আখ্যান।

মিরাকল ফেব্রুয়ারি ২০২৬: সময়ের এক অলৌকিক ভারসাম্য

প্রারম্ভিক দৃশ্য: স্কুল অভিভাবক সভা

শীতের সকাল। ফুলতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের হলরুমে অভিভাবকদের বেশ ভিড়। বার্ষিক পরীক্ষার ফল আর নতুন বছরের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। হঠাৎ সভার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়লেন প্রবীণ শিক্ষক এবং অভিভাবক মাস্টার আবির হোসেন। তাঁর কন্ঠস্বরে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য আর উত্তেজনা।

তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, "আপনারা কি জানেন, কি সৌভাগ্য আমাদের! এই আসছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসটি কোনো সাধারণ মাস নয়। এটি একটি 'মিরাকল মাস'। আর এই বিশেষ মাসেই আমাদের আগামীর সুন্দর বাংলাদেশ গঠনে জাতীয় নির্বাচন। প্রকৃতি যখন নিজেকে নিখুঁত ভারসাম্যে সাজিয়েছে, তখন আমাদেরও দায়িত্ব সঠিক ভারসাম্য বেছে নেওয়া। মনে রাখবেন, ভোট দিতে হবে মার্কা দেখে নয়, সৎ এবং যোগ্য প্রার্থী দেখে। যদি এই সময়ে আমরা ভুল করি, তবে তার মাসুল আমাদের বছরের পর বছর ভোগতে হবে।"

পেছন থেকে একজন অভিভাবক বিদ্রূপের সুরে বললেন, "মাস্টারমশাই, আপনি বড় বেশি আবেগী কথা বলছেন। রাজনীতিতে আবার মিরাকল কিসের? আর চ্যালেঞ্জ আছে কি আপনার কথায়? সবাই তো দলের কথাই শোনে!"

আবির হোসেন মৃদু হাসলেন। "চ্যালেঞ্জ আছে কি না, তা সময়ের পাতাই বলে দেবে। চলুন, আপনাদের আজ সেই মিরাকলের গল্প শোনাই।"

মূল কাহিনী: ফুলতলার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ

২০২৫ সালের শেষ দিক। বিক্রমপুরের ফুলতলা গ্রামে শীতের আমেজটা এবার একটু জলদিই লেগেছে। ভোরের কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে যখন গ্রামের মানুষ ঘুম থেকে ওঠে, তখন মাস্টার আবির হোসেন তাঁর লাইব্রেরি ঘরে পুরনো একখানা চশমা চোখে দিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টান। তাঁর পুরনো নেশা হলো সময়ের হিসাব রাখা। নক্ষত্রের অবস্থান আর তিথি-নক্ষত্রের জটিল অংক মেলাতে তিনি বড্ড ভালোবাসেন।

২০২৬ সালের ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাতে উল্টাতে ফেব্রুয়ারির পাতায় এসে তাঁর চোখ দুটি যেন স্থির হয়ে গেল। তিনি চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আনলেন। মনে হলো কোথাও ভুল দেখছেন। তিনি আবার আঙুল দিয়ে গুনলেন। ১, ২, ৩... ২৮। ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনের, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু বারের বিন্যাস?

তিনি পঞ্জিকা খুলে আরও একবার নিশ্চিত হলেন। তাঁর বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক উত্তেজনায় কাঁপতে শুরু করল। তিনি তড়িঘড়ি করে স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়ে ধুলো পড়া কিছু পুরনো খাতা আর মহাকাশ বিজ্ঞানের নথি ঘাঁটলেন। হ্যাঁ, তাঁর অনুমানই সঠিক। তিনি আবিষ্কার করলেন এমন এক সময়ের আগমন বার্তা, যা তাঁর জীবদ্দশায় আর কখনো ফিরে আসবে না। এমনকি তাঁর পরবর্তী কয়েক প্রজন্মের জীবনেও নয়।

পরদিন সকালে গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপে সবাইকে জড়ো করলেন মাস্টারমশাই। তাঁর চোখেমুখে এক অন্যরকম দীপ্তি। তিনি বললেন, "আপনারা কি জানেন, আসছে ফেব্রুয়ারি মাসে এক মহাজাগতিক ঘটনা ঘটতে চলেছে?"

গ্রামবাসীরা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। কেউ ভাবল সূর্যগ্রহণ হবে, কেউ ভাবল হ্যালির ধূমকেতু বুঝি আবার ফিরে আসছে। রহমত চাচা জিজ্ঞাসা করলেন, "মাস্টার, আকাশে কি কোনো নতুন নক্ষত্র উঠবে?"

আবির হোসেন ক্যালেন্ডারের পাতাটা সবার সামনে তুলে ধরলেন। "ভালো করে দেখুন। এই আসছে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সাল। এটি কোনো সাধারণ মাস নয়। এই মাসে প্রকৃতির এক নিখুঁত ভারসাম্য তৈরি হতে চলেছে। দেখুন— এই মাসে ঠিক ৪টি রবিবার আছে। ঠিক ৪টি সোমবার। ঠিক ৪টি মঙ্গলবার। ঠিক ৪টি বুধবার। ঠিক ৪টি বৃহস্পতিবার। ঠিক ৪টি শুক্রবার। এবং ঠিক ৪টি শনিবার।"

সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। একজন যুবক বলল, "এতে আর বিশেষ কী? ২৮ দিনের মাস তো এমনই হয়।"

মাস্টারমশাই হাসলেন, এক রহস্যময় হাসি। "সাধারণ দৃষ্টিতে এমনই মনে হয়। কিন্তু জ্যোতিষশাস্ত্র এবং প্রাচীন গণনাকারীদের মতে, সপ্তাহের সাতটি বারের এমন নিখুঁত পুনরাবৃত্তি, যেখানে কোনো দিন বেশি নয়, কোনো দিন কম নয়—এই চক্রটি সম্পূর্ণ হতে সময় লাগে ৮২৩ বছর! আমাদের পূর্বপুরুষরা এর নাম দিয়েছিলেন 'মিরাকল-ইন' (MiracleIn) বা 'সময়ের অলৌকিক ভারসাম্য'।"

নির্বাচন নিয়ে দ্বিধা ও বিতর্ক

৮২৩ বছরের এই তত্ত্ব শোনার পর গ্রামে যখন এক গভীর বিস্ময় তৈরি হলো, তখনই সভার কোণ থেকে যুবক শফিক ফোঁস করে উঠল। সে রাজনীতির মারপ্যাঁচে বেশ অভ্যস্ত। সে কর্কশ গলায় বলল, "মাস্টারমশাই, প্রকৃতি ভারসাম্য মানলে কি হবে? মানুষের রাজনীতি কি ভারসাম্য মানে? আপনি বলছেন মিরাকল ফেব্রুয়ারি, কিন্তু আমি তো দেখছি এটা এক আতঙ্কের মাস! এই মাসেই তো ভোট। অলৌকিক ভারসাম্য দিয়ে কি বোমাবাজি আর সন্ত্রাস থামানো যাবে? নির্বাচন এলেই তো শুরু হয় আইনের শাসনের অপব্যবহার।"

শফিকের কথায় ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। গ্রামের কামার সালাম ভাই যোগ করলেন, "ঠিকই তো! নির্বাচন মানেই তো কালো টাকার ছড়াছড়ি। প্রার্থীরা তো এখন থেকেই টাকার বস্তা নিয়ে মাঠে নেমেছে। আইন-শৃঙ্খলা এখন থেকেই ভেঙে পড়ার পথে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য এই মিরাকল মাস তো যমদূত হয়ে আসতে পারে।"

আবির হোসেন শান্তভাবে সবার কথা শুনলেন। তিনি হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে বললেন, "শফিক, সালাম—তোমাদের ভয়টা মিথ্যে নয়। কিন্তু মনে রেখো, প্রকৃতি যখন ৮২৩ বছর পর পর নিজেকে এমন সুশৃঙ্খলভাবে উপস্থাপন করে, তখন সে আমাদের একটি বার্তা দেয়। বার্তাটি হলো—শৃঙ্খলা ভেতর থেকে আসতে হয়। তোমরা সন্ত্রাসের ভয় পাচ্ছ, কারণ আমরা সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়াই না। তোমরা কালো টাকার কথা বলছ, কারণ আমরা নিজেদের বিবেককে কয়েক হাজার টাকায় বিক্রি করতে রাজি হই। প্রকৃতি যদি তার ৪টি রবিবারের জায়গায় ৫টি দিত, তবে পুরো গ্রহের ভারসাম্য বিগড়ে যেত। তেমনি আমরা যদি সৎ প্রার্থীর জায়গায় অসৎ মানুষকে বসাই, আমাদের সমাজের ভারসাম্যও বিগড়ে যাবে। এই মিরাকল মাস আমাদের সুযোগ দিচ্ছে এই চক্র ভাঙার।"

রহমত চাচা লাঠি ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, "মাস্টার ঠিকই কইছে। আমরা সারাজীবন দল আর মার্কা দেখে ভোট দিয়ে এসেছি, ফলাফল কী হয়েছে? সন্ত্রাস আর অশান্তি। এবার না হয় এই ৮২৩ বছরের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য হলেও আমরা একটু সৎ হই? আমরা কি পারি না এই মিরাকল মাসে একটা মিরাকল ঘটাতে? যেখানে সন্ত্রাসীরা পিছু হটবে আর আমাদের বিবেক জয়ী হবে?"

এই আলোচনা গ্রামের মোড়গুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। চায়ের দোকানে আড্ডার মোড় ঘুরে গেল। কালো টাকা যারা বিলি করতে এসেছিল, তারা দেখল গ্রামের মানুষ টাকা ফিরিয়ে দিচ্ছে। তারা বলছে, "এই মাসে আমরা প্রকৃতির মতো পবিত্র থাকতে চাই।"

ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকেই গ্রামে এক অলৌকিক পরিবর্তন দেখা গেল। এই পরিবর্তন কোনো জাদুকরী মন্ত্রে হয়নি, হয়েছে মানুষের উপলব্ধিতে। গ্রামের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী শমসের আলী, যিনি সবসময় কাজের চাপে পরিবারকে সময় দিতে পারতেন না, তিনি এই মাসে প্রতিজ্ঞা করলেন—কাজের জন্য যতটুকু সময়, পরিবারের জন্যও ঠিক ততটুকু।

গ্রামের হাটে যারা ওজনে কম দিত, তারা ভাবল—"৮২৩ বছর পর প্রকৃতি যখন হিসেবে ভুল করছে না, আমি কেন করব?" যারা খুব বেশি সঞ্চয় করত, তারা কিছুটা দান করল। যারা খুব বেশি কথা বলে ঝগড়া বাধাত, তারা কিছুটা নীরবতা পালন করতে শুরু করল।

সবচেয়ে বড় মিরাকল ঘটল গ্রামের দীর্ঘদিনের পুরনো জমিজমা সংক্রান্ত বিবাদগুলোতে। গ্রামের দুই প্রধান পরিবার—মন্ডল আর বিশ্বাসদের মধ্যে প্রায় তিন প্রজন্মের শত্রুতা ছিল। ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে তারা মাস্টারমশাইয়ের কাছে এসে বসল। তাদের কথা একটাই—এই ভারসাম্যের মাসে তারা কোনো নেতিবাচকতা মনে পুষে রাখতে চায় না।

আবির হোসেন দেখলেন, মানুষের মনের অন্ধকারগুলো যেন এই গাণিতিক তথ্যের প্রভাবে কেটে যাচ্ছে। নির্বাচনের দিন যখন ঘনিয়ে এল, সারা দেশে যখন বিচ্ছিন্ন অশান্তির খবর আসছে, ফুলতলা তখন শান্ত। সেখানে ভোট হলো উৎসবের মতো। কোনো সন্ত্রাস নেই, কোনো জোরজবরদস্তি নেই। মানুষ লাইন ধরে দাঁড়িয়েছে তাদের জীবনের 'ভারসাম্য' বেছে নিতে।

ফেব্রুয়ারি মাস শেষ হলো। ২৮ তারিখ রাতে সবাই চণ্ডীমণ্ডপে জড়ো হলো। আকাশ থেকে কোনো জাদুকরী আলো নেমে আসেনি, বা হঠাৎ করে কেউ জাদুবলে ধনী হয়ে যায়নি। কিন্তু ফুলতলা গ্রামের জন্য সেটাই ছিল সত্যিকারের মিরাকল। ফুলতলা আর আগের মতো নেই। গ্রামটি এখন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, মানুষের মনে হিংসা কম, আর সবার মুখে এক শান্ত হাসির আভা।

ফেব্রুয়ারির ভারসাম্য, ভোটের ভার, আর আগামীর বাংলাদেশ

মাস্টারমশাই শেষ কথাটি বললেন, "ভোটের ফল যাই হোক, আমরা জিতে গিয়েছি। কারণ আমরা সন্ত্রাস আর কালো টাকার হাত থেকে আমাদের বিবেককে রক্ষা করতে পেরেছি। এই মিরাকল ফেব্রুয়ারি আমাদের শিখিয়েছে—যখন মানুষ একজোট হয়, তখন ৮২৩ বছর অপেক্ষা করতে হয় না, প্রতিদিনও মিরাকল হতে পারে।"

আসন্ন ফেব্রুয়ারি ২০২৬ হয়তো চলে যাবে, ক্যালেন্ডারের পাতায় আবার নতুন মার্চ মাস আসবে, কিন্তু ফুলতলা গ্রামের মানুষের কাছে এটি চিরকাল একটি 'প্রাকৃতিক অলৌকিক' গল্পের মতো বেঁচে থাকবে। তারা শিখেছে যে, সময়ের ভারসাম্যকে সম্মান জানালে জীবনও সুন্দরভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

গ্রাম থেকে রাষ্ট্রের আয়না

ফুলতলা গ্রাম যেন বাংলাদেশেরই এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। এখানে আছে মতভেদ, আছে পুরনো বিরোধ, আছে অবিশ্বাস, আবার আছে আশাও। মাস্টার আবির হোসেন এক সন্ধ্যায় লাইব্রেরির বারান্দায় বসে বলেছিলেন, “গ্রাম আর রাষ্ট্র আলাদা কিছু না। গ্রামে যা ঘটে, বড় করে দেখলে সেটাই রাষ্ট্রে ঘটে।”

আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়েও ঠিক তেমনই অনুভূতি। একদিকে আশার আলো—ভোট মানেই অংশগ্রহণ, ভোট মানেই নিজের কথা বলার সুযোগ। অন্যদিকে চ্যালেঞ্জ—বিশ্বাসের সংকট, রাজনৈতিক উত্তেজনা, সহনশীলতার অভাব, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বিভাজন।

ফুলতলায় যেমন সবাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ‘মিরাকল-ইন’-এর মাসে ভারসাম্য রক্ষা করবে, তেমনি বাংলাদেশও যেন অচেতনভাবেই এক ভারসাম্যের পরীক্ষায় দাঁড়িয়ে গেছে। ক্ষমতা ও বিরোধিতা, উন্নয়ন ও ন্যায়, স্থিতিশীলতা ও পরিবর্তন—সবকিছুর মধ্যে একটি সঠিক অনুপাত খুঁজে পাওয়ার সময় এখন।

ফেব্রুয়ারি: স্মৃতি ও ভবিষ্যতের সেতু

ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে কখনোই শুধু একটি মাস নয়। ভাষার মাস, আত্মত্যাগের মাস, চেতনার মাস। এই মাসেই মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করে—আমরা কে, কোথায় যাচ্ছি, কীভাবে যাবো।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি সেই পুরনো চেতনাকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একদিকে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি, অন্যদিকে ব্যালট বাক্সের সামনে দাঁড়ানো নাগরিক। প্রশ্নটা তাই আরও গভীর—আমরা কি কেবল ভোট দেবো, নাকি দায়িত্বও নেবো?

ফুলতলা গ্রামের মানুষ ফেব্রুয়ারির প্রথম দিন থেকেই যেমন নিজের আচরণ বদলাতে শুরু করেছিল, তেমনি এই নির্বাচনও যদি মানুষকে নিজের ভূমিকা নতুন করে ভাবতে শেখায়, সেটাই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন। ভোট শুধু একটি দিনের কাজ নয়; এটি দীর্ঘদিনের আচরণ, সহনশীলতা, যুক্তিবোধ আর পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চার ফল।

ইতিবাচকতার বীজ, বাস্তবতার কাঁটা

এই গল্পটি কোনো ইউটোপিয়ার গল্প নয়। ফুলতলা-গ্রামেও সব সমস্যা এক মাসে উধাও হয়ে যায়নি। কিছু বিরোধ মিটেছে, কিছু এখনো রয়ে গেছে। কিছু মানুষ প্রতিজ্ঞা ভেঙেছে, কেউ কেউ পারেনি ভারসাম্য ধরে রাখতে। ঠিক তেমনি বাংলাদেশও সব সমস্যার সমাধান এক নির্বাচনে পাবে না—এটা কেউ বিশ্বাস করে না।

চ্যালেঞ্জগুলো স্পষ্ট:
– রাজনৈতিক মেরুকরণ
– তরুণদের হতাশা ও বেকারত্ব
– দ্রব্যমূল্যের চাপ
– মতপ্রকাশের নিরাপত্তা
– নির্বাচনকে ঘিরে আস্থার প্রশ্ন

কিন্তু ইতিবাচক দিকটাও অস্বীকার করা যায় না। এই দেশেই এখন সবচেয়ে বেশি তরুণ ভোটার, সবচেয়ে বেশি সংযুক্ত নাগরিক, সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন করা মানুষ। তারা আর শুধু শোনে না, জানতে চায়। তারা শুধু অভিযোগ করে না, তুলনা করে, বিশ্লেষণ করে।

মাস্টার আবির হোসেন একদিন বলেছিলেন, “অলৌকিক কিছু আকাশ থেকে নামে না। মানুষ নিজে বদলালেই সময় বদলায়।”

এই কথাটাই যেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির মূল সূত্র।

ভোট: ভারসাম্যের আরেক নাম

ভোট মানে কেবল পছন্দের প্রার্থী নির্বাচন নয়। ভোট মানে ভারসাম্য তৈরি করা—ক্ষমতার ওপর নজর, নীতির ওপর প্রশ্ন, প্রতিশ্রুতির ওপর হিসাব। ঠিক যেমন ফেব্রুয়ারির সাতটি দিন একে অপরকে ছাড়িয়ে যায়নি, তেমনি রাষ্ট্রেও কোনো শক্তি যেন নিয়ন্ত্রণহীন না হয়—এটাই গণতন্ত্রের মূল শিক্ষা।

ফুলতলায় যারা খুব বেশি কথা বলত, তারা কিছুটা নীরব হয়েছিল। যারা খুব কম বলত, তারা কথা বলার সাহস পেয়েছিল। এই সমন্বয়ই ছিল ‘মিরাকল-ইন’-এর আসল শিক্ষা। নির্বাচনও ঠিক তেমন—কারও কণ্ঠ রুদ্ধ করা নয়, আবার কারও কণ্ঠ সবকিছু দখল করাও নয়।

ভবিষ্যৎ কি সত্যিই ভালো দিনের ইঙ্গিত দিচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর কোনো শিক্ষক, কোনো রাজনীতিবিদ, বা কোনো জ্যোতিষী একা দিতে পারবে না। উত্তরটা তৈরি হবে কোটি কোটি ছোট ছোট সিদ্ধান্তের ভেতর দিয়ে। আপনি কীভাবে ভোট দেবেন, কীভাবে মত প্রকাশ করবেন, কীভাবে ভিন্নমতকে দেখবেন—এই সবকিছুর যোগফলই ভবিষ্যৎ।

ফেব্রুয়ারি ২০২৬ হয়তো ক্যালেন্ডারের পাতায় আর বিশেষ কিছু হয়ে থাকবে না। পরের বছর আবার মার্চ আসবে, এপ্রিল আসবে। কিন্তু এই ফেব্রুয়ারিতে যদি মানুষ ভারসাম্যের মানে একটু ভালো করে বুঝে নেয়—তাহলে সেটাই হবে ইতিহাসের নীরব মোড়।

মাস্টার আবির হোসেন মাসের শেষ দিনে যেমন বলেছিলেন, “সময় বিশেষ ছিল বলেই আমরা বদলাইনি; আমরা বদলেছি বলেই সময় বিশেষ হয়ে উঠেছে।”

বাংলাদেশও ঠিক সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে। নির্বাচন একটি উপলক্ষ মাত্র। আসল বিষয় হলো—এই উপলক্ষকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করি।

শেষ কথা: অলৌকিক নয়, সচেতনতা

আকাশ থেকে কোনো জাদুকরী আলো নামবে না। একটি ভোটেই সব বদলে যাবে না। কিন্তু যদি মানুষ বিশ্বাস করে যে তার সিদ্ধান্তের ওজন আছে, তার আচরণের প্রভাব আছে, তার নীরবতারও মূল্য আছে—তাহলেই শুরু হবে ভালো দিনের যাত্রা।

ফুলতলা গ্রামের গল্প তাই কেবল একটি গ্রামের গল্প নয়। এটি একটি দেশের গল্প—যে দেশ এখনো শিখছে কীভাবে ভারসাম্য রাখতে হয়, কীভাবে ভিন্নতার ভেতর সহাবস্থান করতে হয়, কীভাবে আশার সাথে বাস্তবতাকে মেলাতে হয়।

ফেব্রুয়ারি আসছে। শীতের শেষ, বসন্তের আভাস। ক্যালেন্ডারের পাতায় সাত দিনের নিখুঁত হিসাব। আর মানুষের হাতে—ভবিষ্যৎ গড়ার এক কঠিন কিন্তু সম্ভাবনাময় সুযোগ।

ভালো দিন আসবে কি না, সেটার উত্তর কোনো অলৌকিকতায় নয়—উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের সম্মিলিত বিবেক, দায়িত্ব আর ভারসাম্যের ভেতরেই।

অধ্যাপক মাহবুব লিটু, উপদেষ্টা সম্পাদক, আমাদের অধিকারপত্র (odhikarpatranews@gmail.com)

#MiracleFebruary2026 #MiracleIn #BangladeshElection2026 #BalanceOfNature #StoryOfChange #সৎপ্রার্থী #মিরাকল_ফেব্রুয়ারি #জাতীয়_নির্বাচন_২০২৬ #ফুলতলা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: