odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Monday, 6th April 2026, ৬th April ২০২৬
সমর নায়কদের উপর যুদ্ধের বিজয় নির্ভর করে

পেন্টাগনে রক্তক্ষরণ: যুদ্ধের ময়দানে যখন সেনাপতিদের বিদায় ঘণ্টা বাজে

Dr Mahbub | প্রকাশিত: ৫ April ২০২৬ ২২:০৫

Dr Mahbub
প্রকাশিত: ৫ April ২০২৬ ২২:০৫

-বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন | ৫ এপ্রিল, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসে এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখা যায়নি। একদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের দামামা বাজছে, অন্যদিকে খোদ পেন্টাগনের ভেতরেই চলছে এক নজিরবিহীন ‘শুদ্ধি অভিযান’। রক্ষণশীলদের প্রিয়মুখ এবং বর্তমান প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ যেন একাই পাল্টে দিতে চাইছেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী কাঠামো। গত বৃহস্পতিবার সেই অভিযানের সর্বশেষ শিকার হলেন সেনাবাহিনীর শীর্ষ জেনারেল র‍্যান্ডি জর্জ। তাকে কেবল পদত্যাগ করতেই বাধ্য করা হয়নি, বরং তার জায়গায় স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে হেগসেথেরই এক সময়ের সামরিক সহকারী ক্রিস্টোফার ল্যানিভকে।

এই আকস্মিক ডামাডোলের প্রেক্ষাপটে একজন সামরিক বিশেষজ্ঞের মন্তব্য এখন ওয়াশিংটনের বাতাসে ভাসছে: “যুক্তিসঙ্গত কারণে কোনো সিনিয়র অফিসারকে বরখাস্ত করা এক কথা। কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই এভাবে একের পর এক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া আমাদের জাতির ইতিহাসে নজিরবিহীন।”

একতরফা নির্দেশ এবং ‘সম্মানজনক’ বিদায়ের হুমকি

গল্পের শুরুটা হয়েছিল গত সেপ্টেম্বরে। জেনারেল ও অ্যাডমিরালদের সামনে দেওয়া এক ভাষণে হেগসেথ বেশ স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে, আধুনিক যুদ্ধের মূল চাবিকাঠি হলো ‘টেস্টোস্টেরন’ বা পুরুষালি তেজ। সেখানে তিনি এক প্রকার হুমকি দিয়েই বলেছিলেন, তার আদর্শের সঙ্গে যাদের মত মিলবে না, তাদের জন্য ‘সম্মানজনক’ পথ হলো পদত্যাগ করা। সেই বার্তারই যেন প্রতিফলন ঘটছে বর্তমান পেন্টাগনে।

জেনারেল র‍্যান্ডি জর্জ কোনো বিতর্কিত ব্যক্তি ছিলেন না। ২০২৩ সালে যখন সিনেট তাকে অনুমোদন দেয়, তখন ভোটের ব্যবধান ছিল ৯৬-১। অর্থাৎ দুই দলের কাছেই তিনি ছিলেন সমান গ্রহণযোগ্য। অথচ হেগসেথ তাকে সরিয়ে দিলেন কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই। কেবল জর্জ নন, তার সঙ্গে বিদায় নিতে হয়েছে ট্রেনিং কমান্ডের প্রধান জেনারেল ডেভিড হোডনে এবং সেনাবাহিনীর চ্যাপলিন প্রধান মেজর জেনারেল উইলিয়াম গ্রিন জুনিয়রকেও।

অস্থিরতার চোরাবালি

নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, এই ঝামেলার মূলে কোনো সামরিক কৌশলের পার্থক্য নেই; বরং এটি হেগসেথের ব্যক্তিগত ক্ষোভ এবং সেনাবাহিনী সচিব ড্যানিয়েল পি. ড্রিসকলের সঙ্গে তার তিক্ত সম্পর্কের ফল। এই ‘পার্সোনাল ভেন্ডেটা’ বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার বলি হচ্ছেন অভিজ্ঞ জেনারেলরা।

তালিকায় চোখ বুলালে দেখা যায়, গত কয়েক মাসে পেন্টাগনের শীর্ষ পর্যায়ের প্রায় প্রতিটি স্তম্ভেই আঘাত হানা হয়েছে:

  •  সাইবার কমান্ড ও এনএসএ: জেনারেল টিমোথি হগ।
  •  জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ: জেনারেল চার্লস কিউ. ব্রাউন জুনিয়র।
  •  ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি: লেফটেনেন্ট জেনারেল জেফরি ক্রুস।
  •  কোস্টগার্ড ও নেভি: অ্যাডমিরাল লিন্ডা ফ্যাগন এবং লিসা ফ্রানচেত্তি।

এমনকি সামরিক আইনি উপদেষ্টা থেকে শুরু করে ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নারী কর্মকর্তাদেরও রেহাই দেওয়া হয়নি। যুদ্ধের এই সংকটকালীন মুহূর্তে নেতৃত্বের এই শূন্যতা মার্কিন সামরিক শক্তির স্থিতিশীলতাকে গভীর সংকটে ফেলেছে।

ভয়ের সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রের সংকট

এমআইটির অধ্যাপক ক্যাটলিন ট্যালম্যাজ সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, যুদ্ধের মাঝে এই গণ-বরখাস্তের ফলাফল কী হতে পারে? এর উত্তর মিলছে পেন্টাগনের অন্দরেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা বলছেন, পেন্টাগনে এখন ‘ভয় ও অবিশ্বাসের’ পরিবেশ বিরাজ করছে। সত্য কথা বলতে বা দ্বিমত পোষণ করতে ভয় পাচ্ছেন কর্মকর্তারা, কারণ পরবর্তী কোপ কার ওপর পড়বে তা কেউ জানে না।

ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি এবং সাবেক মেরিন কর্মকর্তা সেথ মুলটন এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, সামরিক বাহিনীকে এভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা কেবল কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র যেমন—রাশিয়া, চীন বা উত্তর কোরিয়াতেই মানায়।

শেষ কথা

সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব জিম ম্যাটিসসহ পাঁচজন সাবেক পেন্টাগন প্রধান এই কর্মকাণ্ডকে ‘বেপরোয়া’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু ক্যাপিটল হিলে রিপাবলিকান নেতাদের নীরবতা হেগসেথকে আরও সাহসী করে তুলেছে। প্রশ্ন এখন এটাই—যখন রণাঙ্গনে শত্রু মোকাবিলায় একক সংহতি প্রয়োজন, তখন ঘরের ভেতরে নেতৃত্বের এই ভাঙন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তাকে কোন অতলে তলিয়ে নিয়ে যাবে? পেন্টাগনের এই রক্তক্ষরণ কি তবে কোনো বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস? 

উত্তর হয়তো সময়ের গর্ভে, কিন্তু বর্তমান দৃশ্যপট মার্কিন সামরিক আভিজাত্যের জন্য এক অশনি সংকেত।

কৃতজ্ঞতা: MaddowBlog এর সম্পাদক Steve Benen এর লেখা অবলম্বনে রচিত।
-ড. মাহবুব, উপদেষ্টা সম্পাদক, অধিকারপত্র



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: