অধিকারপত্র ডটকম আন্তর্জাতিক ডেক্সনিউজ:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ প্রায় সাত সপ্তাহ ধরে বিশ্বকে চরম উদ্বেগের মধ্যে রেখেছে। গত ১০ দিন ধরে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতিকে কিছুটা স্থির রাখলেও উত্তেজনা এখনো তীব্র।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ৯০ মিলিয়ন জনসংখ্যার তেলসমৃদ্ধ দেশ ইরানে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বিশেষ করে পারমাণবিক স্থাপনার আশপাশেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাল্টা জবাবে ইরান ইসরায়েলসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, সার সংকট এবং শেয়ারবাজারে অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রতিবাদের সংখ্যা তুলনামূলক কম
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা Armed Conflict Location and Event Data (ACLED)-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর প্রথম মাসে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩,২০০টি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তুলনায়, ইউক্রেন যুদ্ধে প্রথম মাসে ছিল প্রায় ৩,৭০০টি এবং গাজা যুদ্ধের সময় ছিল প্রায় ৬,১০০টি বিক্ষোভ।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধটি নিয়ে জনমত নেতিবাচক হলেও তা বড় ধরনের গণআন্দোলনে রূপ নেয়নি।
কম দৃশ্যমান মানবিক বিপর্যয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধে স্থল অভিযান বা ব্যাপক সেনা মোতায়েন না থাকায় মানবিক ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্য কম দৃশ্যমান। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে পরিচালিত এই যুদ্ধকে অনেকেই “ভিডিওগেম যুদ্ধ” হিসেবে অভিহিত করেছেন। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আবেগগত প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক কম তৈরি হচ্ছে।
পূর্ববর্তী আন্দোলনের ক্লান্তি
গাজা যুদ্ধের সময় দীর্ঘদিন ধরে চলা প্রতিবাদ আন্দোলন অনেক কর্মীকে ক্লান্ত ও হতাশ করে তুলেছে। ফলে নতুন করে বড় আকারে সংগঠিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসননীতি, অর্থনৈতিক ইস্যু ও অন্যান্য রাজনৈতিক সংকট মানুষকে বিভক্ত করে রেখেছে, যার ফলে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে মনোযোগ কমে গেছে।
ইরানের ভাবমূর্তি একটি কারণ
বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিস্তিনের মতো নয়, ইরান একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেকের কাছে এই যুদ্ধের বিরোধিতা করা মানে ইরান সরকারকে সমর্থন করা হিসেবে দেখা হতে পারে, যা আন্দোলনে অংশগ্রহণে দ্বিধা তৈরি করছে।
এছাড়া প্রবাসী ইরানিদের মধ্যেও এই যুদ্ধ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে, যা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে ওঠাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সীমাবদ্ধতা
গাজা যুদ্ধের সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ হলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। প্রশাসনিক কড়াকড়ি, শিক্ষার্থী বহিষ্কার, ভিসা বাতিল এবং আইনি চাপের কারণে শিক্ষার্থীরা আগের মতো আন্দোলনে অংশ নিতে পারছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, ভয় ও অনিশ্চয়তা শিক্ষাঙ্গনে প্রতিবাদের পরিধি কমিয়ে দিয়েছে।
ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বদলাতে পারে
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়, বিশেষ করে স্থল অভিযান শুরু হয় বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রাণহানি বাড়ে, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির চাপ সরাসরি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেললে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনও জোরালো হতে পারে।
বর্তমানে যুদ্ধবিরতি পরিস্থিতিকে কিছুটা শান্ত রেখেছে, তবে স্থায়ী সমাধান না হলে যেকোনো সময় উত্তেজনা আবারও বাড়তে পারে।

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: