নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র
দীর্ঘ দুই দশক পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে এককভাবে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে দলটির প্রথম এবং সামগ্রিকভাবে বিএনপি সরকারের ১৩তম জাতীয় বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর এটিই প্রথম বাজেট। অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট পেশ করা হচ্ছে, যা দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বাজেট।
বাজেটের আকার ও ব্যয়ের বিবরণ
অর্থ বিভাগ সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত এই বাজেটের আকার চলতি ২০২৫-২৬ সালের সংশোধিত বাজেটের (৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা) তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। বিশাল এই ব্যয়ের একটি বড় অংশ চলে যাবে পরিচালন খাতে।
পরিচালন ব্যয়: ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা (সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ, ভর্তুকি ও প্রণোদনা)।
উন্নয়ন ব্যয়: ৩ লাখ ১৬property হাজার ৭৫ কোটি টাকা।
ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণের ওপর ভরসা
বিশাল অঙ্কের এই বাজেটের খরচ সামলাতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রধান অংশ (৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা) আদায় করবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব আয়ের পরও বাজেটে ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা (যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ)। এই ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। বাকি অর্থ বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা থেকে সংগ্রহ করা হবে।
যে সব পণ্যের দাম কমতে পারে
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে চাল-ডাল, আলুসহ প্রায় ৬০টি প্রযুক্তি ও কৃষি পণ্যের ওপর বিদ্যমান উৎসে কর কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হতে পারে। দাম কমার তালিকায় রয়েছে:
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য: ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্যতেল, চিনি, লবণ ও মাছ-মাংস।
স্বাস্থ্য খাত: হার্টের রিং (দাম কমতে পারে ২০ হাজার টাকা), চোখের লেন্স (দাম কমতে পারে ৫ হাজার টাকা) এবং কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের শুল্ক প্রত্যাহারের কারণে প্রতি ডায়ালাইসিসে খরচ কমবে প্রায় ৮০০ টাকা।
প্রযুক্তি ও বিনোদন: মোবাইল সিমের ওপর থাকা কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার হতে পারে। এ ছাড়া ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, প্রিন্টার ও মনিটরের শুল্ক-ভ্যাট মওকুফ এবং বাদ্যযন্ত্র ও সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরার শুল্ক কমানোর প্রস্তাব থাকছে।
পরিবহন: বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) আমদানিতে বিশেষ ছাড় ও রেজিস্ট্রেশন ফি ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সর্বনিম্ন ২৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে। (বিপরীতে জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়ির শুল্ক বাড়বে)।
কর কাঠামো ও করজাল সম্প্রসারণের কঠোর উদ্যোগ
এবারের বাজেটে বড় ব্যবসায়ীদের তদারকিবিহীন বন্ডেড সুবিধা ও ব্যবসা সহজীকরণের জন্য ‘বাংলাবিজ’ নামক ডিজিটাল ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর ঘোষণা থাকলেও করজাল বাড়াতে সাধারণ মানুষের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে:
ব্যাংক হিসাবে টিআইএন (TIN) বাধ্যতামূলক: ছাত্র ও বিশেষ কিছু অব্যাহতি প্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া সবার ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন লাগবে। আয় করযোগ্য না হলেও টিআইএন থাকলে রিটার্ন দেওয়া বাধ্যতামূলক, অন্যথায় জরিমানা গুনতে হবে।
বিআইএন (BIN) বাধ্যতামূলক: ভ্যাটের জাল ছড়াতে ব্যাংকে ব্যবসায়িক হিসাব খুলতে বিআইএন বাধ্যতামূলক হচ্ছে। খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে ০.২০% অগ্রিম কর নেওয়া হবে।
এনবিআরের বিশেষ ক্ষমতা: করদাতার ব্যাংক হিসাব, ইউটিলিটি সেবা ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরাসরি প্রবেশাধিকার পাবে এনবিআর।
মানবসম্পদ, ফ্রিল্যান্সার ও সামাজিক সুরক্ষায় বিশেষ জোর
প্রথাগত অবকাঠামোর চেয়ে এবারের বাজেটে মানবসম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তরুণ ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ধামাকা: তরুণদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে ৩০০ কোটি টাকা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২,০০০ কোটি টাকার বিশাল তহবিল গঠন করা হচ্ছে।
সামাজিক সুরক্ষা: ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের আওতা বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে।
কর্মসংস্থান: বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধান চ্যালেঞ্জ: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯.৪২ শতাংশ (মে মাসের হিসাব), সেখানে আগামী অর্থবছরে তা ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে। এই বিশাল আকারের বাজেট বাজারে অর্থ সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিতে পারে। তাই কঠোর বাজার মনিটরিং ও সঠিক মুদ্রানীতির সুষম সমন্বয় ছাড়া ৬.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করা বেশ কঠিন হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন অবশ্য আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সাথে শতভাগ সামঞ্জস্য রেখে এই কল্যাণমুখী বাজেট প্রস্তুত করা হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে। উল্লেখ্য, আগামী ১৫ জুন চলতি অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট পাস হবে। এরপর ১৬ জুন থেকে নতুন বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়ে আগামী ৩০ জুন চূড়ান্তভাবে বাজেট পাস হবে।
--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র

আপনার মূল্যবান মতামত দিন: