odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Sunday, 21st June 2026, ২১st June ২০২৬
বিএনপির রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত কিন্তু এখন ক্ষমতার করিডোরের বাইরে হারিয়ে যাওয়া এক জুলাই যোদ্ধার নীরব আর্তনাদ

যুদ্ধ শেষ, যোদ্ধা কোথায়?—ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বিস্মৃত ত্যাগের গল্প│ক্ষমতার করিডোরের বাইরে হারিয়ে যাওয়া এক জুলাই যোদ্ধার নীরব আর্তনাদ: অধিকারপত্রের অনুসন্ধানে এক জুলাই যোদ্ধার করুণ ইতিহাস

অধিকারপত্র নিউজ ডেস্ক | প্রকাশিত: ২১ June ২০২৬ ০৬:০৩

অধিকারপত্র নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১ June ২০২৬ ০৬:০৩

অধিকারপত্র নিউজ ডেস্ক

রাজপথে গুলিবিদ্ধ, বারবার কারাবরণ, হাসপাতালের শয্যা থেকে আবার কারাগার—তবুও নেই স্বীকৃতি। অধিকারপত্রের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ওয়ারীর মো. মামুন হোসেন ভূঁইয়ার হৃদয়বিদারক জীবনসংগ্রাম। তাঁর সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে আন্দোলনের সময়কার ত্যাগ, দীর্ঘ চিকিৎসা, অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকা এক আহত কর্মীর ব্যক্তিগত বেদনা। এই প্রতিবেদন কেবল একজন মানুষের গল্প নয়; এটি আন্দোলনের পর আহত ও প্রান্তিক কর্মীদের পুনর্বাসন, স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ জনআলোচনার আহ্বান। জুলাই আন্দোলনে রাজপথে আহত হয়েছে, একাধিকবার পুলিশের হাতে ধরা পরে জেলে গিয়েছে, কিন্তু পাননি জুলাই যোদ্ধার স্ববীকৃতি। ক্ষমতার পরিবর্তনের পর রেযনো তদার তদ্যাগ সবার কাছে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছে। অধিকারপত্রের অনুসন্ধানে এরকমই এক জুলাই যোদ্ধার করুণ ইতিহাস ফুটে ওঠেছে। 

ইতিহাসের প্রতিটি আন্দোলনেরই দুটি মুখ থাকে। একটি মুখ আলোয় ভেসে ওঠে—যেখানে বিজয়ের পতাকা, মঞ্চ, করতালি, ফুলের মালা আর ক্ষমতার উজ্জ্বল করিডোর। অন্য মুখটি অন্ধকারে থেকে যায়—যেখানে থাকে রক্তাক্ত শরীর, কারাগারের স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, হাসপাতালের বিছানা, অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি আর নিঃসঙ্গ মানুষের দীর্ঘশ্বাস। ইতিহাস প্রায়ই বিজয়ীদের নাম লিখে রাখে; কিন্তু বিজয়ের পথ রচনাকারী অসংখ্য অখ্যাত মানুষের গল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় সময়ের ধুলোর নিচে।

সম্প্রতি এমনই একজন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলো। তাঁর নাম মো. মামুন হোসেন ভূঁইয়া (এলাকায় কালা মামুন নামে পরিচিত)। বয়স ৪৯ বছর ০৮ মাস।  তিনি ঢাকার ওয়ারী এলাকার বনগ্রামের বাসিন্দা। পিতা স্থানীয় বিএনপি নেতা মো: জানে আলম ভূইয়া এবং মাতা ফাতেমা বেগহম। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানের ক্ষতচিহ্ন দেখালেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজপথের আন্দোলন করার কারণে এক সময় তাঁর কবজি কেটে নিতে চেয়েছিরলো তৎকালীূন সরকারীূ দলের ক্যাডাররা। কোপ দিয়ে প্রায় দ্বিখন্ডিত করে দিয়েছিলো। কিন্তু আল্লাহ সহায় থাকাতে সার্জাইরর মাধ্যমে কব্জি িজোড়া লাগানো গেলেও হতাতে এখন তেমন জোর পান না।  জুলাই যুদ্ধে গুরুতরভাবে আহত হয়েছিল; অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেটি পুনর্গঠন করতে হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে এখনো গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাগ বহন করছেন তিনি। ক্ষতগুলো শুধু মাংসের নয়, যেন সময়ের বুকেও খোদাই হয়ে থাকা এক অদৃশ্য ইতিহাস।

মামুনের বক্তব্যে বারবার ফিরে আসে আন্দোলনের দিনগুলোর স্মৃতি। তিনি দাবি করেন, সেই উত্তাল সময়ে তিনি রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, সংঘর্ষে অংশ নিয়েছিলেন এবং পরে আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাও নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, তখন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল একটি বিশ্বাস—দলের প্রতি আনুগত্য, পরিবর্তনের স্বপ্ন এবং একটি কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশাই তাঁকে ঘর থেকে রাস্তায়, নিরাপত্তা থেকে অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে গিয়েছিল।

তাঁর কথায় আরেকটি বেদনাদায়ক অধ্যায়ও উঠে আসে। তিনি জানান, জীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁকে বহুবার কারাগারে যেতে হয়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, তাঁর বাবাও একই ধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতার শিকার হয়েছিলেন। ফলে তাঁদের পরিবারের কাছে রাজনীতি ছিল কেবল মতাদর্শের প্রশ্ন নয়; ছিল ব্যক্তিগত ত্যাগ, সামাজিক মূল্য এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার আরেক নাম। সত্য-মিথ্যার বিচার আদালত বা ইতিহাস করবে, কিন্তু একজন মানুষের বয়ানে যে যন্ত্রণা ধরা পড়ে, তা মনোযোগ দিয়ে শোনা সমাজেরও দায়িত্ব।

সবচেয়ে বেশি কষ্টের জায়গাটি অন্যত্র। মামুনের আক্ষেপ, আন্দোলনের কঠিন সময়ে যাঁরা তাঁকে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছিলেন, আজ তাঁদের অনেকেই আর যোগাযোগ রাখেন না। তাঁর ভাষায়, ক্ষমতার পালাবদলের আগে অসংখ্য প্রতিশ্রুতি শোনা গিয়েছিল—“তোমাকে আমরা দেখব”, “তোমার দায়িত্ব আমাদের।” কিন্তু সময় বদলেছে, ক্ষমতার বাস্তবতা বদলেছে, আর সেই প্রতিশ্রুতিগুলোর অনেকগুলোই যেন বাতাসে মিলিয়ে গেছে। তিনি মনে করেন, তিনি যথেষ্ট শিক্ষিত না হওয়ায় কিংবা পরিচিত মুখ না হওয়ায় প্রাপ্য স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এই অনুভূতি তাঁর ব্যক্তিগত উপলব্ধি, তবে এটি বৃহত্তর এক প্রশ্নও উত্থাপন করে—ত্যাগের মূল্যায়ন কি সব সময় সমানভাবে হয়?

রাজনীতির ইতিহাসে এমন ঘটনা নতুন নয়। প্রায় প্রতিটি গণআন্দোলনেই দেখা যায়, সম্মুখসারির অনেক কর্মী পরবর্তী সময়ে আলোচনার বাইরে চলে যান। নেতৃত্ব বদলে যায়, অগ্রাধিকার বদলে যায়, রাষ্ট্রের এজেন্ডা বদলে যায়; কিন্তু যাঁদের শরীর ও জীবনে আন্দোলনের ক্ষতচিহ্ন রয়ে যায়, তাঁদের জীবন আর আগের জায়গায় ফিরে যায় না। অনেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, মানসিক আঘাত, কর্মসংস্থানের সংকট কিংবা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়াই করেন।

মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত, সহিংসতা এবং কারাবাস একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আতঙ্ক কিংবা ট্রমাজনিত মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হন। যদি সাক্ষাৎকারদাতার বর্ণনায় উল্লিখিত মানসিক কষ্ট সত্যিই থেকে থাকে, তবে তা কেবল ব্যক্তিগত চিকিৎসার বিষয় নয়; বরং সামাজিক পুনর্বাসন ও সহায়তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই হোক না কেন, আন্দোলনে আহত, ক্ষতিগ্রস্ত বা দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভোগা মানুষের প্রতি মানবিক দায়বদ্ধতা অস্বীকার করা যায় না। তাঁদের অবদান, দাবি বা অভিজ্ঞতার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্বচ্ছ ও ন্যায্য প্রক্রিয়া থাকা জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজন পুনর্বাসন, চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ। কারণ একজন মানুষের ক্ষত শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ইতিহাস নয়; অনেক সময় তা একটি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসেরও অংশ হয়ে ওঠে।

মো. মামুন হোসেন ভূঁইয়ার সাক্ষাৎকার তাই কেবল একজন মানুষের বেদনার গল্প নয়। এটি এমন এক প্রশ্নের সামনে আমাদের দাঁড় করায়, যার উত্তর সমাজকে একদিন দিতেই হবে—সংকটের সময় যারা জীবন বাজি রেখে সামনে দাঁড়ায়, সুসময়ের ইতিহাসে তাদের স্থান কোথায়? ক্ষমতার মঞ্চে করতালি থেমে যাওয়ার পরও কি আমরা তাদের কথা মনে রাখি? নাকি বিজয়ের উৎসব শেষ হলেই তারা নীরবে হারিয়ে যায়, আর তাদের ক্ষতচিহ্নগুলোই হয়ে থাকে ইতিহাসের একমাত্র সাক্ষী?

একটি সভ্য রাষ্ট্র ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রকৃত পরিচয় কেবল বিজয় উদ্‌যাপনে নয়; বরং সেই অখ্যাত, অবহেলিত এবং নীরব মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই নিহিত, যাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন—তাঁদের ত্যাগ একদিন ভুলে যাওয়া হবে না।

নিজে মানবেতর জীবনযাপন করলেও দল ক্ষমতায়—তাতেই খুশি

মোহাম্মদ মামুন ভূঁইয়ার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় যে মানুষটির সঙ্গে পরিচয় হয়, তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মী নন; তিনি এমন এক প্রজন্মের প্রতীক, যারা রাজনীতিকে ব্যক্তিগত উন্নতির সিঁড়ি নয়, বরং বিশ্বাস, আদর্শ ও আত্মত্যাগের পথ হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর ভাষ্যমতে, শৈশব থেকেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব, সাহসিকতা এবং দেশপ্রেম তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। কৈশোরে সেই অনুপ্রেরণাই তাঁকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। পরবর্তী সময়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে তিনি নিজের রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, রাজনীতি মানে ক্ষমতা নয়; রাজনীতি মানে আদর্শের জন্য সংগ্রাম এবং প্রয়োজনে ব্যক্তিগত জীবন উৎসর্গ করার প্রস্তুতি।

মামুনের ভাষ্যমতে, সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি রাজপথে নেমেছিলেন। আন্দোলন, মিছিল, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, কারাবাস—কোনো কিছুই তাঁকে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তিনি দাবি করেন, জীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁকে সতেরোবার কারাবরণ করতে হয়েছে, অসংখ্যবার নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, তবুও অন্য কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব তিনি কখনো গ্রহণ করেননি। তাঁর কাছে রাজনৈতিক আনুগত্য ছিল না কোনো সুবিধা অর্জনের মাধ্যম; বরং এটি ছিল একটি নৈতিক অঙ্গীকার, যা তিনি নিজের রক্ত, অশ্রু ও জীবনের বহু মূল্যবান বছর দিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন।

আজ সেই মানুষটিই, তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। আন্দোলনের ক্ষত এখনো তাঁর শরীরে বহমান। আহত হাত আগের মতো কাজ করে না, নিয়মিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়, দীর্ঘ সময় শারীরিক পরিশ্রম করার সক্ষমতা হারিয়েছেন। কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় স্থায়ী আয়ের পথও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সংসারের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শারীরিক কষ্ট এবং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ মিলিয়ে তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে জানান। তবুও তাঁর কণ্ঠে ক্ষোভের চেয়ে বেশি শোনা যায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি। তিনি বলেন, “আমি কষ্টে আছি, কিন্তু দল ক্ষমতায় এসেছে—এতেই আমি খুশি।”

এই একটি বাক্য যেন তাঁর সমগ্র রাজনৈতিক জীবনের সারসংক্ষেপ। এখানে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে আদর্শকে বড় করে দেখার এক বিরল মানসিকতা ফুটে ওঠে। তিনি দাবি করেন, কখনোই রাজনীতিকে পদ, প্রভাব বা অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের পথ হিসেবে দেখেননি। তাই আজও দলের কাছে তাঁর কোনো পদ, ব্যবসায়িক সুযোগ কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার দাবি নেই। তাঁর একমাত্র প্রত্যাশা—তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন বলে দাবি করেন, তার একটি ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি। তাঁর বিশ্বাস, স্বীকৃতি মানে শুধু একটি সনদ নয়; এটি একজন কর্মীর আত্মত্যাগের প্রতি সংগঠন ও সমাজের নৈতিক সম্মান।

তবে তাঁর কথার ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর এক অভিমানও। তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি, দুঃসময়ে যারা জীবন বাজি রেখে রাজপথে থাকে, তারাই একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি। কিন্তু সুসময় এলে অনেক সময় সেই নীরব কর্মীরাই বিস্মৃত হয়ে পড়েন। অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী, পরিচিত বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা নতুন মুখগুলো বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এটি তাঁর ব্যক্তিগত উপলব্ধি হলেও, সেই উপলব্ধি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মসমালোচনার ক্ষেত্র তৈরি করে—সংগ্রামের সময়কার কর্মীদের সঙ্গে সুসময়ের সম্পর্ক কতটা টিকে থাকে?

মামুন ভূঁইয়ার অভিজ্ঞতার সব দিক অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই ও মূল্যায়নের বিষয়। কিন্তু তাঁর জীবনগল্প আমাদের সামনে একটি বৃহত্তর নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলে ধরে। একটি আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস কি কেবল নেতৃত্বের ইতিহাস, নাকি সেই অগণিত অখ্যাত কর্মীরও, যারা কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা না করেই বিশ্বাসের টানে রাজপথে নেমেছিল? যদি সেই মানুষগুলোর একটি অংশ আজ নিজেকে বিস্মৃত, অবহেলিত কিংবা প্রান্তিক মনে করেন, তবে সেটি শুধু ব্যক্তিগত বেদনার বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সংগঠনের দায়বদ্ধতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

মামুনের শেষ কথাগুলো দীর্ঘক্ষণ মনে অনুরণিত হয়—“আমার কিছু নেই, কিন্তু দল ক্ষমতায় এসেছে—এটাই আমার আনন্দ। শুধু চাই, একদিন যেন আমার ত্যাগটুকু ভুলে না যায়।” এই বাক্যে যেমন একজন কর্মীর আদর্শের প্রতি অটল আনুগত্যের প্রতিফলন রয়েছে, তেমনি রয়েছে একটি সমাজ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি নীরব আবেদন—বিজয়ের ইতিহাস যেন শুধু নেতাদের নয়, ত্যাগের ইতিহাসও হয়ে ওঠে।

মামুন ভূঁইয়ার গল্প তাই শুধু একজন কর্মীর ব্যক্তিগত অভিমান নয়; এটি রাজনৈতিক সংগঠন, গণআন্দোলন এবং ত্যাগের মূল্যায়ন নিয়ে এক গভীর মানবিক ও নৈতিক প্রশ্নেরও প্রতিফলন।

স্বীকৃতির অপেক্ষায় এক আহত যোদ্ধা

মো. মামুন হোসেন ভূঁইয়ার জীবনের সংগ্রাম আন্দোলনের দিনগুলোতেই শেষ হয়ে যায়নি; বরং তাঁর ভাষ্যমতে, প্রকৃত সংগ্রাম শুরু হয়েছে আন্দোলনের পর। তিনি জানান, আজও তিনি পুরোপুরি সুস্থ নন। নিয়মিত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। আহত হাতের কবজি আগের মতো কাজ করে না, শরীরের বিভিন্ন অংশে এখনও ব্যথা অনুভব করেন, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা শারীরিক পরিশ্রম করা তাঁর পক্ষে কঠিন। তাঁর মতে, শুধু শরীরই নয়, দীর্ঘ সংঘাত, নির্যাতন ও অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা তাঁর মানসিক অবস্থাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতাও তাঁর জন্য নির্মম। কর্মক্ষমতা হারানোর কারণে নিয়মিত কোনো আয়ের উৎস নেই। ফলে চিকিৎসা, সংসার এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করাই তাঁর পরিবারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর ভাষায়, আন্দোলনের সময় যে সাহস নিয়ে তিনি রাজপথে নেমেছিলেন, আজ সেই মানুষটিই জীবনের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে সংগ্রাম করছেন।

তবে সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা অর্থকষ্ট নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় অভিমান অন্য জায়গায়। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আন্দোলনের কঠিন সময়ে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে দলের জন্য তাঁর ত্যাগ একদিন মূল্যায়িত হবে। কিন্তু আজ তাঁর অনুভূতি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি যেন অনেকের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছেন। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে দলের পক্ষ থেকে কেউ তাঁর খোঁজ নেননি। এই অবহেলার অনুভূতিই তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়।

তবুও তাঁর কথায় প্রতিশোধের ভাষা নেই। বরং আছে এক ধরনের অবিচল আনুগত্য। তিনি বলেন, দলের কাছে তাঁর কোনো পদ বা বিশেষ সুবিধার দাবি নেই। তাঁর একমাত্র আকাঙ্ক্ষা—তিনি যে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন বলে দাবি করেন, তার একটি ন্যায্য স্বীকৃতি। তাঁর বিশ্বাস, যদি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে 'জুলাই যোদ্ধা' হিসেবে স্বীকৃতি পান, তাহলে হয়তো চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য কিছু সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং বাকি জীবনটুকু কিছুটা মর্যাদার সঙ্গে কাটানো সম্ভব হবে।

সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে তাঁর জীবনসংগ্রামের এই গল্প যদি সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের নজরে আসে, তাহলে হয়তো তাঁর আবেদন বিবেচিত হবে। তিনি চান তাঁর অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত কষ্টের বর্ণনা হয়ে না থাকুক; বরং একই ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা অন্যদের জীবন নিয়েও আলোচনার সূচনা হোক।

মামুনের বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। তাঁর অনুভূতি, আন্দোলনের দুঃসময়ে যাঁরা রাজপথে ছিলেন, তাঁদের অনেকেই আজ প্রান্তিক হয়ে পড়েছেন; অন্যদিকে সুসময়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে শক্তিশালী অনেক মানুষ নেতৃত্বের কাছাকাছি চলে এসেছেন। এটি তাঁর ব্যক্তিগত উপলব্ধি, তবে এই উপলব্ধি একটি বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে আনে—রাজনৈতিক আন্দোলনের পরে ত্যাগ, অবদান এবং স্বীকৃতির মূল্যায়নের প্রক্রিয়া কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ এবং ন্যায়সংগত?

মামুন ভূঁইয়ার গল্পের প্রতিটি বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু তাঁর গল্প আমাদের অন্তত একটি মানবিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—যদি সত্যিই কেউ একটি রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য নিজের কর্মক্ষমতা, স্বাস্থ্য ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বছরগুলো হারিয়ে ফেলেন, তবে তাঁর পুনর্বাসন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার দায়িত্ব কি শুধু তাঁর নিজের, নাকি রাষ্ট্র, সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক শক্তিরও কিছু নৈতিক দায় রয়েছে? ইতিহাসের এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির মানদণ্ড নির্ধারণ করবে।

কেমন আছেন জুলাই যোদ্ধারা?

একটি আন্দোলন যখন ইতিহাস হয়ে যায়, তখন ইতিহাসের পৃষ্ঠায় সাধারণত কয়েকজন নেতার নামই বড় অক্ষরে লেখা থাকে। কিন্তু সেই ইতিহাস রচনার পেছনে যে হাজারো অখ্যাত কর্মী রাজপথে রক্ত ঝরিয়েছেন, কারাবরণ করেছেন, পরিবার হারিয়েছেন কিংবা আজীবনের জন্য শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছেন, তাঁদের অধিকাংশের নাম ধীরে ধীরে স্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যায়। বিজয়ের আলো যত উজ্জ্বল হয়, ততই যেন ছায়ার গভীরে চাপা পড়ে যায় সেইসব নিঃশব্দ যোদ্ধাদের জীবনকাহিনি।

এই প্রশ্ন থেকেই অধিকারপত্র শুরু করেছে একটি বিশেষ অনুসন্ধান—"কেমন আছেন জুলাই যোদ্ধারা?" আমাদের উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করা নয়; বরং আন্দোলনের সময় যাঁরা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন, বিশেষ করে বিএনপি, ছাত্রদল এবং তৃণমূল পর্যায়ের ওয়ার্ড রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মীদের বর্তমান জীবন-বাস্তবতা তুলে ধরা। আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলো শেষ হয়েছে, রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলেছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের পর যাঁরা আহত, পঙ্গু কিংবা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে জীবন কাটাচ্ছেন, তাঁদের জীবনের গল্প কতটা আলোচনায় এসেছে?

এই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আমাদের কথা হয় ঢাকার ওয়ারী এলাকার বাসিন্দা মো. মামুন হোসেন ভূঁইয়ার সঙ্গে। তাঁর কথায় উঠে আসে এমন এক জীবনের বয়ান, যা একই সঙ্গে বেদনাদায়ক, প্রশ্নবিদ্ধ এবং গভীরভাবে মানবিক। তাঁর বর্ণিত অভিজ্ঞতার সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি; তবে তাঁর শরীরে দৃশ্যমান ক্ষতচিহ্ন, চিকিৎসার নথি এবং স্থানীয় মানুষের বক্তব্য মিলিয়ে অন্তত এটুকু স্পষ্ট হয় যে, তাঁর জীবন দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে।

মামুন আমাদের সামনে তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশ দেখান। তাঁর ভাষ্যমতে, শরীরজুড়ে যে ক্ষতচিহ্ন রয়েছে, সেগুলো বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ, গুলিবিদ্ধ হওয়া, লাঠিচার্জ এবং নির্যাতনের স্মৃতি বহন করছে। তাঁর ডান হাতের কবজি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে তিনি জানান। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হাতটি কোনোভাবে পুনর্গঠন করা হলেও সূক্ষ্ম নড়াচড়ার ক্ষমতা আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি। আজ তিনি নিয়মিত কোনো কাজ করতে পারেন না। যিনি একসময় রাজপথে দৌড়েছেন, মিছিলের অগ্রভাগে থেকেছেন বলে দাবি করেন, আজ তিনি নিজের পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ করতেও সংগ্রাম করছেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বহুবার গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং সতেরোবার কারাগারে যেতে হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, বিভিন্ন সময়ে পুলিশের নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদের শিকার হয়েছেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতিগুলোর একটি হলো, কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় তাঁর প্রিয় দাদীর মৃত্যু। তিনি বলেন, শেষবারের মতো দাদীর মুখ দেখার জন্যও তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি। একটি পরিবারের কাছে এই ক্ষতি শুধু একজন সদস্যের মৃত্যু নয়; এটি একটি অপূর্ণ বিদায়, যা সারাজীবনের মানসিক ক্ষত হয়ে থাকে।

মামুনের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তাঁর কণ্ঠে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে আদর্শের প্রতি এক ধরনের অটল বিশ্বাসের ছাপ বেশি। তিনি জানান, দলীয় নেতৃত্বের বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, রাজপথে পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন, আহত হয়েছেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু আজও তিনি "জুলাই যোদ্ধা" হিসেবে স্বীকৃতি পাননি বলে তাঁর আক্ষেপ। তিনি বলেন, হাসপাতালে থাকা অবস্থায় অনেক নেতা তাঁকে দেখতে এসেছিলেন, আশ্বাস দিয়েছিলেন; কিন্তু পরবর্তী সময়ে সরকারি গেজেটে তাঁর নাম আর স্থান পায়নি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত কষ্টের পরও মামুনের কথায় দলের প্রতি কোনো প্রতিহিংসা শোনা যায় না। তিনি বলেন, দল ক্ষমতায় এসেছে—এটাই তাঁর আনন্দ। তিনি কোনো পদ চান না, কোনো বিশেষ সুবিধাও চান না। তাঁর একমাত্র প্রত্যাশা, যদি আন্দোলনে আহত ব্যক্তি হিসেবে যথাযথ মূল্যায়ন করে তাঁকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে সেই স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত চিকিৎসা বা আর্থিক সহায়তা তাঁর বাকি জীবনটুকু কিছুটা স্বস্তিতে কাটাতে সাহায্য করবে।

এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মামুনের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তাঁর পিতা অতীতের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় কারাবরণ করেছিলেন এবং বর্তমানে তাঁর ছেলেও ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ একটি পরিবারের তিন প্রজন্ম একই রাজনৈতিক বিশ্বাস বহন করেছে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের মূল্য হিসেবে তারা কী পেয়েছে—এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।

মামুন ভূঁইয়ার গল্প হয়তো হাজারো গল্পের একটি মাত্র। আমাদের অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তির দাবি সত্য বা মিথ্যা ঘোষণা করা নয়; বরং এই প্রশ্ন তোলা—আন্দোলনের পরে আহত, পঙ্গু, ট্রমাগ্রস্ত কিংবা অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত কর্মীদের জীবন সম্পর্কে আমাদের সমাজ কতটা জানে? তাঁদের দাবিগুলো কীভাবে যাচাই করা হয়? পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি? এবং সবচেয়ে বড় কথা, ত্যাগের মূল্যায়নের জন্য কি একটি স্বচ্ছ, ন্যায্য ও মানবিক প্রক্রিয়া গড়ে তোলা সম্ভব?

ইতিহাস কেবল বিজয়ীদের নয়; ইতিহাস সেই মানুষগুলোরও, যাঁদের শরীরে সময়ের ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র ও পরিণত রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় নির্ধারিত হয় শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার মধ্য দিয়ে নয়; বরং সেই অখ্যাত কর্মীদের প্রতিও দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে, যাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন—একদিন তাঁদের ত্যাগও স্মরণ করা হবে।

অধিকারপত্রের এই অনুসন্ধান এখানেই শেষ নয়। আমরা আগামী পর্বগুলোতে আরও বিভিন্ন অঞ্চলের জুলাই আন্দোলনে আহত, কারাবরণকারী ও প্রান্তিক কর্মীদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরব। কারণ একটি জাতির ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় তখনই, যখন মঞ্চের আলোয় দাঁড়ানো নেতাদের পাশাপাশি অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া কর্মীদের কণ্ঠও সমান গুরুত্ব পায়।

দাদীর শেষ বিদায়ও দেখা হলো না: একজন রাজনৈতিক কর্মীর ব্যক্তিগত বেদনার ইতিহাস

মো. মামুন হোসেন ভূঁইয়ার সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অংশগুলো ছিল সেই স্মৃতিগুলো, যেখানে রাজনীতি আর ব্যক্তিগত জীবনের সীমানা একাকার হয়ে গেছে। তিনি যখন নিজের অতীতের কথা বলছিলেন, তখন তাঁর কণ্ঠে ক্ষোভের চেয়ে বেদনা বেশি ছিল। তাঁর ভাষ্যমতে, রাজপথে আন্দোলনের দিনগুলোতে তিনি একাধিকবার মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। লাঠিচার্জে রক্তাক্ত হয়েছেন, অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, আবার চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে হেফাজতে নিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর বয়ানে হাসপাতালের শয্যাও যেন স্বাধীনতার নয়, বরং আরেকটি বন্দিশালার সূচনা।

মামুন বলেন, এমনও দিন গেছে যখন তিনি ভেবেছিলেন, আর হয়তো বেঁচে ফিরবেন না। তাঁর দাবি, এক পর্যায়ে তাঁকে এতটাই নির্মমভাবে প্রহার করা হয়েছিল যে রক্তাক্ত অবস্থায় পুলিশের ভ্যানে ফেলে রাখা হয়। তিনি স্মরণ করেন, সেই মুহূর্তে তাঁর কাছে জীবন ও মৃত্যুর দূরত্ব ছিল মাত্র কয়েকটি নিঃশ্বাসের। পরে তাঁকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এই বর্ণনাগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি; তবে একজন মানুষের স্মৃতিতে সেগুলো আজও গভীর ট্রমা হিসেবে রয়ে গেছে।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক স্মৃতিগুলোর একটি জড়িয়ে আছে তাঁর প্রিয় দাদীর মৃত্যুর সঙ্গে। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় তাঁর দাদী মারা যান। তিনি দাবি করেন, শেষবারের মতো দাদীর মুখ দেখার জন্য প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হলেও সেই সুযোগ তিনি পাননি। জীবনের শেষ বিদায়টুকুও তিনি জানাতে পারেননি। সেই অপূর্ণ বিদায় আজও তাঁর কণ্ঠে গভীর শোক হয়ে ফিরে আসে। অনেক মানুষের কাছে একটি রাজনৈতিক মামলা বা কারাবাস হয়তো পরিসংখ্যানের বিষয়; কিন্তু একজন নাতির কাছে দাদীর শেষ মুখটি দেখতে না পারার যন্ত্রণা কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না।

রাজনৈতিক সংঘাতের মানবিক মূল্য প্রায়ই জনসমক্ষে দৃশ্যমান হয় না। সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয় সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার বা ক্ষমতার পালাবদল; কিন্তু আড়ালে থেকে যায় সেইসব পরিবারের গল্প, যারা প্রিয়জনের অনুপস্থিতি, দীর্ঘ কারাবাস, শারীরিক অক্ষমতা এবং মানসিক ট্রমার ভার বহন করে বছরের পর বছর। মামুনের সাক্ষাৎকার সেই অদৃশ্য মূল্যকেই সামনে নিয়ে আসে।

যে কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক সহিংসতা বা দমন-পীড়নের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইতিহাসের প্রকৃত মূল্যায়ন শুধু কে ক্ষমতায় এলেন, তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সেই মানুষগুলোর জীবনেও নিহিত, যাঁরা দাবি করেন যে রাজনৈতিক বিশ্বাসের জন্য তাঁরা শারীরিক, মানসিক ও পারিবারিকভাবে গভীর মূল্য দিয়েছেন। মামুনের কাহিনি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কখনও কখনও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্ষতগুলো মানুষের শরীরে নয়, তার অপূর্ণ বিদায়, হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক এবং আজীবনের স্মৃতিতে বহমান থাকে।

একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের রাজনীতি, এক মানুষের অসমাপ্ত সংগ্রাম

মো. মামুন হোসেন ভূঁইয়ার গল্পটি শুধু একজন রাজনৈতিক কর্মীর গল্প নয়; এটি একটি পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার প্রতিচ্ছবি। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাঁদের পরিবার বহু বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই তাঁদের পরিবারের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার শুরু। সেই উত্তরাধিকার এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে। মামুনের পিতা বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়, বিশেষ করে ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে, কারাবরণের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন বলে স্থানীয়রা জানান। আজ সেই ধারাবাহিকতায় মামুনের ছেলেও ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বলে এলাকায় প্রচলিত তথ্য থেকে জানা যায়।

এই পরিবারের কাছে রাজনীতি যেন কেবল একটি দলীয় পরিচয় নয়; এটি একটি বিশ্বাস, একটি উত্তরাধিকার এবং অনেক ত্যাগের ইতিহাস। কিন্তু সেই ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত ক্ষতির দীর্ঘ ছায়া।

আজকের মামুন আর রাজপথের সেই চঞ্চল কর্মী নন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আহত হওয়ার পর থেকে তাঁর ডান হাতের কবজি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হাতটি কোনোভাবে জোড়া লাগানো গেলেও সূক্ষ্ম নড়াচড়া বা ফাইন মোটর (fine motor) দক্ষতা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। ফলে তিনি নিয়মিত কোনো পেশাগত কাজ করতে পারেন না। দৈনন্দিন জীবনের অনেক সাধারণ কাজও তাঁর জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। কর্মক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাঁকে এমন এক বাস্তবতায় ঠেলে দিয়েছে, যেখানে জীবনযুদ্ধ এখন রাজপথের নয়, বরং প্রতিদিনের আহার, চিকিৎসা ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো, সাক্ষাৎকারজুড়ে তাঁর কণ্ঠে দলের প্রতি ক্ষোভের চেয়ে অভিমানই বেশি শোনা যায়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, দলের কাছে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো দাবি নেই। তাঁর ভাষায়, দল ক্ষমতায় এসেছে—এটিই তাঁকে আনন্দ দেয়। তিনি কোনো পদ, প্রভাব বা বিশেষ সুযোগ চান না। তাঁর একমাত্র প্রত্যাশা, যদি আন্দোলনে আহত ব্যক্তি হিসেবে তাঁর অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন হয় এবং তিনি 'জুলাই যোদ্ধা' হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পান, তাহলে সেই স্বীকৃতির সঙ্গে যুক্ত সম্ভাব্য চিকিৎসা বা আর্থিক সহায়তা তাঁর এবং তাঁর পরিবারের জীবনকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে পারে।

মামুনের এই আবেদন কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি একটি বৃহত্তর নীতিগত প্রশ্নও উত্থাপন করে। যে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের পরে আহত, ক্ষতিগ্রস্ত বা স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারানো ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা, তাঁদের দাবিগুলো স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। কারণ আন্দোলনের ইতিহাস শুধু বিজয়ের ইতিহাস নয়; এটি সেইসব মানুষেরও ইতিহাস, যাঁরা বিশ্বাসের টানে নিজের শরীর, পরিবার এবং ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছিলেন।

মামুন ভূঁইয়ার গল্পের সত্যতা ও তাঁর দাবিগুলোর আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান ও নথিপত্রের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু তাঁর গল্প আমাদের অন্তত একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—যাঁরা সংগ্রামের দিনগুলোতে সামনের সারিতে ছিলেন বলে দাবি করেন, তাঁদের জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের দায়িত্ব কে নেবে? ইতিহাস কি শুধু বিজয়ীদের নামই মনে রাখবে, নাকি সেই নীরব মানুষগুলোর প্রতিও ফিরে তাকাবে, যাঁদের শরীরে এখনো সময়ের নির্মম ক্ষতচিহ্ন বহমান?

রক্তাক্ত শরীর, নীরব রাষ্ট্র, বিস্মৃত যোদ্ধা

মো. মামুন হোসেন ভূঁইয়ার সঙ্গে প্রথম দেখা হলে তাঁর কথার আগে চোখে পড়ে তাঁর শরীর। তাঁর ভাষ্যমতে, শরীরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন যেন একটি মানুষের নয়, বরং এক অস্থির রাজনৈতিক সময়ের নীরব দলিল। কোথাও অস্ত্রোপচারের দাগ, কোথাও গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্মৃতি, কোথাও নির্যাতনের গভীর ক্ষত। অধিকারপত্রের হাতে থাকা তাঁর শরীরের ছবিগুলোতেও সেই ক্ষতবিক্ষত বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি দাবি করেন, এগুলো কেবল পুলিশের গুলির নয়; বরং দীর্ঘ সময় ধরে পুলিশি নির্যাতন, তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের হামলা এবং গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের স্মৃতি বহন করছে। সত্যতা যাচাইয়ের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হলেও, তাঁর শরীরের ক্ষতগুলো একজন মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের সাক্ষ্য হিসেবে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।

সাক্ষাৎকারে মামুন জানান, তিনি জীবনের ঝুঁকি জেনেও রাজপথ ছাড়েননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনের দিনগুলোতে তিনি বারবার সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়েছেন, পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন এবং পরে চিকিৎসার জন্য চক্ষু হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তিনি আরও দাবি করেন, সেই সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা তাঁকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন এবং আশ্বাস দিয়েছিলেন যে তাঁর ত্যাগের মূল্যায়ন হবে। কিন্তু সময়ের স্রোত বদলে যাওয়ার পর সেই আশ্বাসের অনেকটাই আর বাস্তবে ফিরে আসেনি বলে তাঁর আক্ষেপ।

মামুনের বয়ানে আরও উঠে আসে দীর্ঘ কারাবাসের কথা। তিনি দাবি করেন, জীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁকে সতেরোবার কারাগারে যেতে হয়েছে। তাঁর কাছে কারাগার ছিল না কেবল একটি শাস্তির স্থান; বরং রাজনৈতিক বিশ্বাসের মূল্য। তাঁর ভাষায়, তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য ও আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। আদর্শের প্রতি বিশ্বাস তাঁকে রাজপথে রেখেছিল, আর সেই বিশ্বাসের জন্যই তিনি নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন বলে তাঁর দাবি।

তবে তাঁর কণ্ঠে সবচেয়ে গভীর বেদনা ধরা পড়ে স্বীকৃতির প্রশ্নে। তিনি বলেন, এত কিছু সত্ত্বেও তিনি 'জুলাই যোদ্ধা' হিসেবে কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাননি। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট গেজেটে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। কেন হয়নি—সেই প্রশ্নের জবাবে তিনি নিজের সীমিত শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রান্তিক অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর অনুভূতি, পরিচিত নেতৃত্বের কাছে তিনি একসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন, কিন্তু সময় বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি যেন স্মৃতির আড়ালে হারিয়ে গেছেন।

এই সাক্ষাৎকার কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষোভের বিবরণ নয়; এটি একটি বৃহত্তর নৈতিক প্রশ্নও উত্থাপন করে। যে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনের পরে স্বীকৃতি, পুনর্বাসন এবং অবদানের মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়? কে ইতিহাসের পাতায় স্থান পান, আর কে নীরবে হারিয়ে যান? একজন আহত কর্মীর দাবি সত্য কি না, তা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতার বয়ান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—যে সমাজ ত্যাগের ইতিহাস সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়, সে সমাজ একসময় নিজের ইতিহাসেরই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হারিয়ে ফেলে।

মামুন ভূঁইয়ার গল্প তাই কেবল একজন ব্যক্তির নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, স্মৃতিচর্চা এবং মানবিক দায়বদ্ধতার প্রতিও এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন। ক্ষমতার পালাবদল ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়ম হতে পারে, কিন্তু যারা বিশ্বাসের টানে রাজপথে নেমেছিলেন এবং সেই পথচলায় স্থায়ী শারীরিক ও মানসিক ক্ষত বহন করছেন বলে দাবি করেন, তাঁদের কথা শোনা, তাঁদের দাবির নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনে ন্যায়সঙ্গত সহায়তা নিশ্চিত করা—একটি গণতান্ত্রিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

বিশেষ সংবাদ দাতা, অধিকারপত্র সিটি ডেস্ক

#কেমন_আছেন_জুলাই_যোদ্ধারা #জুলাইযোদ্ধা #অধিকারপত্র #বাংলাদেশ #জুলাইআন্দোলন #মামুনভূঁইয়া #ত্যাগের_স্বীকৃতি #মানবিক_বাংলাদেশ #রাজনীতি #আহত_যোদ্ধা #কারাবরণ #মানবাধিকার #গণতন্ত্র #পুনর্বাসন #রাজপথের_যোদ্ধা #নিঃশব্দ_সংগ্রাম #বাংলাদেশের_ইতিহাস #Odhikarpatra #Justice #Recognition



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: