odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Wednesday, 24th June 2026, ২৪th June ২০২৬
ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা ও চরম ঝুঁকির অবসান; ওমান সাগর পেরিয়ে ফুজাইরাহ বন্দরের পথে বাংলাদেশি জাহাজ

মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা: সাড়ে চার মাস পর হরমুজ প্রণালি পার হলো ‘বাংলার জয়যাত্রা’

Special Correspondent | প্রকাশিত: ২৩ June ২০২৬ ২৩:৫৫

Special Correspondent
প্রকাশিত: ২৩ June ২০২৬ ২৩:৫৫

নিউজ ডেস্ক | অধিকারপত্র

দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার মাস পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের চরম যুদ্ধাবস্থার মধ্যে আটকে থাকার পর অবশেষে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস ফেলছেন বাংলাদেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’র নাবিকরা। সব ধরনের অপারেশনাল চ্যালেঞ্জ ও ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা কাটিয়ে মঙ্গলবার (২৩ জুন) বাংলাদেশ সময় ভোররাত ৩টার দিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালি সফলভাবে অতিক্রম করেছে জাহাজটি। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন এই জাহাজে থাকা ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক ও প্রকৌশলী বর্তমানে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুস্থ রয়েছেন। দীর্ঘ বন্দিদশা ও মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে মুক্ত হয়ে বর্তমানে জাহাজটি জ্বালানি সংগ্রহ এবং তলার অংশ পরিষ্কার করার (বটম-ক্লিনিং) জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

যেভাবে শুরু হয়েছিল সংকট

চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। এরপর ২ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে পণ্য বহন করে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে জাহাজটি। ২৬ ফেব্রুয়ারি কাতারের একটি বন্দর থেকে প্রায় ৩৯ হাজার মেট্রিক টন স্টিল কয়েল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রসহ মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করলে পুরো অঞ্চলের জলসীমা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যত পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে জাহাজটি। পরবর্তীতে ঝুঁকি এড়াতে কুয়েত যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করে সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে প্রায় ৩৭ হাজার টন সার বোঝাই করে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের উদ্দেশ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জাহাজটি দীর্ঘ সময় রাস আল খায়ের বন্দরে এবং পরে ওমানের মিনা সাকার বন্দরের বহির্নোঙরে আশ্রয় নিয়ে অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়।

৩ বার ব্যর্থতার পর কৌশলী জয়

সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে ট্রাফিক সেপারেশন স্কিম (টিএসএস) বা নৌযান চলাচল পৃথকীকরণ ব্যবস্থা চালু করে সেখানে সামুদ্রিক মাইন স্থাপন করে ইরান। এর আগে তিন দফায় প্রণালিটি অতিক্রমের চেষ্টা করেও নিরাপত্তাজনিত কারণে এবং গত ১০ এপ্রিল ইরানি কোস্ট গার্ডের বাধার মুখে ফিরে আসতে বাধ্য হয় বাংলার জয়যাত্রা। এরপর জাহাজটি হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ২৫ নটিক্যাল মাইল দূরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ অ্যাঙ্কারেজে নোঙর করে অবস্থান নেয়।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক জানান, হরমুজ পাড়ি দেওয়ার জন্য দুটি পথ খোলা ছিল হয় ইরানের চাহিদামাফিক টোল দেওয়া, না হয় কূটনৈতিক আলোচনা। টোল দেওয়ার টাকা থাকলেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার (স্যাংশন) ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা ছিল। ফলে বাংলাদেশ সরকারকে অত্যন্ত কৌশলে কাজ করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের অপারেটর কোম্পানির কাছ থেকে মৌখিক গ্রিন সিগন্যাল এবং মেরিন ট্রাফিক ওয়েবসাইটে অন্যান্য জাহাজের মুভমেন্ট দেখে সোমবার সকালে জাহাজটিকে মুভ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

 

মাইন ও কামানের গর্জন এড়িয়ে ৩৫ মাইলের রোমাঞ্চকর যাত্রা

সাধারণত টিএসএস রুট দিয়ে এলে ২৫ নটিক্যাল মাইল পাড়ি দিলেই চলতো, কিন্তু মাইনের কারণে বাংলার জয়যাত্রাকে বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করে ৩৫ নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। জাহাজের চিফ ইঞ্জিনিয়ার রাশেদুল হাসান এই যাত্রাকে মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসা হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রত্যক্ষ করেছি। আমাদের বন্দিদশার অবসান হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই আমরা বের হয়ে এসেছি।

নাবিকরা জানান, তারা যখন প্রণালিটি পার হচ্ছিলেন তখন কাছাকাছি মাত্র ৩-৪টি জাহাজ ছিল। ওদিকে রেডিওতে ইরানের নৌবাহিনীর ঘোষণা আসছিল কোনো ধরনের মিলিটারি জাহাজ দেখলে সরাসরি গুলি করা হবে। এমন চরম উত্তেজনার মধ্যে অত্যন্ত ধীরগতিতে সাড়ে তিন ঘণ্টা চলার পর ভোররাত সাড়ে ৩টার দিকে নিরাপদে হরমুজ পার হয় জাহাজটি। পার হওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জাহাজের ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর আমরা নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়েছি। আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের তৎপরতা ও পরবর্তী গন্তব্য

বিএসসির বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, নির্দেশনা ও কূটনৈতিক তৎপরতার ফলেই এই সাফল্য এসেছে, যা জাহাজের ক্রু সদস্যদের মনোবল ধরে রাখতে বিশেষ সহায়তা করেছে। কর্পোরেশনটি এ ঘটনাকে বাংলাদেশের সামুদ্রিক ইতিহাসে বড় ধরনের পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে।

হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিলেও জাহাজটি এখনই দেশে ফিরছে না। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থানের কারণে তলদেশে শ্যাওলা জমে যাওয়ায় এবং জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে এটি ফুজাইরাহ বন্দরে অবস্থান করবে। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও জ্বালানি সংগ্রহ শেষে জাহাজটি দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের উদ্দেশ্যে তার যাত্রা অব্যাহত রাখবে।

--মো: সাইদুর রহমান (বাবু), বিশেষ প্রতিনিধি. অধিকারপত্র



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: