odhikarpatra@gmail.com ঢাকা | Thursday, 1st October 2026, ১st October ২০২৬
যুদ্ধের পর হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন প্রায় ৮০ শতাংশে ফিরলেও উচ্চ বিমা ব্যয়, সামরিক ঝুঁকি ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা এখনো সরবরাহকে অনিশ্চিত করে রেখেছে

হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল প্রবাহ বাড়ছে, ইরানের কৌশলগত প্রভাব কি কমছে?

odhikarpatra | প্রকাশিত: ৩০ September ২০২৬ ১৮:২৭

odhikarpatra
প্রকাশিত: ৩০ September ২০২৬ ১৮:২৭

অধিকারপত্র ডটকম, আন্তর্জাতিক ডেস্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক :

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সাত মাসের সংঘাত অবসানে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চলার মধ্যেই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন আবারও বাড়তে শুরু করেছে। এতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও, প্রণালীকে ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হরমুজ দিয়ে তেল প্রবাহ যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশে ফিরে এসেছে। তবে এই প্রবাহ কতটা স্থায়ী হবে এবং এর ফলে ইরানের দর-কষাকষির ক্ষমতা কতটা কমবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরু হওয়ার পর ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতাকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরির একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু বিপুল পরিমাণ তেল যদি আবারও এই জলপথ দিয়ে নিরাপদে পরিবহন হতে থাকে, তাহলে আলোচনায় তেহরানের সেই চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা কিছুটা সীমিত হতে পারে।

হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন বাড়ছে

পণ্যবাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দৈনিক আনুমানিক ১ কোটি ৬৩ লাখ ২৮ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই সর্বোচ্চ মাসিক মাত্রা।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে সেপ্টেম্বর মাসে দৈনিক প্রায় ৯৭ লাখ ১৯ হাজার ব্যারেল তেল পরিবহন হওয়ার অনুমান করা হয়েছে।

এই বৃদ্ধিতে সৌদি আরবের রপ্তানি পুনরুদ্ধার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আগস্টে দেশটির দৈনিক তেল রপ্তানি ছিল প্রায় ২৪ লাখ ৪৬ হাজার ব্যারেল। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে প্রায় ৫৪ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে।

কেপলারের হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধের আগের মাত্রার প্রায় ৮০ শতাংশে ফিরে এসেছে। তবে ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে দৈনিক যে ১ কোটি ৯৫ লাখ ১৩ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি হতো, তার তুলনায় বর্তমান প্রবাহ এখনো প্রায় ৩২ লাখ ব্যারেল কম।

স্যাটেলাইট বা ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ রাখা জাহাজের তথ্য এই হিসাবের বাইরে থাকায় প্রকৃত প্রবাহ আরও বেশি হতে পারে।

যুদ্ধের চূড়ান্ত সময়ে জাহাজ চলাচলে ধস

যুদ্ধের আগে প্রতিদিন আনুমানিক ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করত। এর প্রায় অর্ধেক ছিল তেলবাহী ট্যাংকার। এসব জাহাজের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হতো।

কিন্তু সংঘাত তীব্র হওয়ার পর জলপথটিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যায়। এক পর্যায়ে প্রতিদিন মাত্র দুটি তেলবাহী ট্যাংকারও প্রণালী অতিক্রম করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ এখনো পুরোপুরি নিরাপদ বা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি।

ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট সুসানাহ স্ট্রিটার আল জাজিরাকে বলেন, হরমুজ দিয়ে তেল প্রবাহ চালু হওয়া ইতিবাচক বিষয় হলেও সংঘাতের বৃহত্তর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই প্রবাহকে পুরোপুরি নিরাপদ বা নিশ্চিত বলে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।

তেলের দাম কমলেও ঝুঁকি রয়ে গেছে

মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ বাড়ার খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমেছে।

মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ৫৯ ডলারে নেমে আসে। তবে সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে দাম প্রায় ১৩ শতাংশ বাড়ার পথে ছিল।

বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্পের মতে, তেল সরবরাহ পুনরুদ্ধারের তথ্য বাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তবে এই পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সতর্কতা রয়েছে।

স্ট্রিটার বলেন, হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল বাড়লেও অঞ্চলটির ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি এখনো তেলের দামের মধ্যে একটি অতিরিক্ত ঝুঁকি-প্রিমিয়াম হিসেবে কাজ করছে।

ট্যাংকারের বিমা ব্যয়ও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে আরও বেশি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করলেও তেল পরিবহনের সামগ্রিক ব্যয় এখনো স্বাভাবিক হয়নি।

শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, জ্বালানি সরবরাহেও চাপ

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ দিয়ে অপরিশোধিত তেলের প্রবাহ বাড়ার বিষয়টি পুরো জ্বালানি বাজারের চিত্র তুলে ধরে না।

ডিজেল ও পেট্রলের মতো পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ এখনো সীমিত রয়েছে। একই সঙ্গে সংঘাতে অবকাঠামোর ক্ষতি জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো বিভিন্ন দেশের কৌশলগত তেল মজুত।

সরবরাহ সংকট সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ কৌশলগত মজুত থেকে তেল বাজারে ছেড়েছে। ফলে এসব মজুতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ভবিষ্যতে আবার বড় ধরনের সরবরাহ বিঘ্ন ঘটলে আগের তুলনায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য মজুতের সুরক্ষা কম থাকতে পারে।

ইরানের অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ

সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি ইরান এখন তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও রয়েছে।

ইরানের স্ট্যাটিস্টিক্যাল সেন্টারের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২১ মার্চ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত সময়ে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। একই সময়ে তেল ও গ্যাস খাতের সংকোচন হয়েছে ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ।

দেশটিতে মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নও অব্যাহত রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের বিনিময় হার ২২ লাখের বেশি রিয়ালে পৌঁছায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সেপ্টেম্বরে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ৬৯ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ এসলামি ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিকে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি একটি ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ হিসেবেও বর্ণনা করেছেন।

তার মতে, হরমুজে অবরোধের ফলে ইরানের তেল, পেট্রোকেমিক্যাল ও অন্যান্য রপ্তানি থেকে ডলার আয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।

তবে তিনি সতর্ক করেছেন, শুধু মুদ্রার বিনিময় হার দিয়ে ইরানের অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করা ঠিক হবে না।

হরমুজ নিয়ে ইরানের অবস্থান

তেল প্রবাহ বাড়ার পর ইরানের ওপর হরমুজ প্রণালীকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সক্ষমতা কমছে—এমন বিশ্লেষণ সামনে এসেছে।

তবে ইরান এই মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি মঙ্গলবার বলেন, মার্কিন সহায়তায় কিছু জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করতে পারছে—এর অর্থ এই নয় যে প্রণালীটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।

অর্থাৎ তেল পরিবহন পুনরুদ্ধার হলেও তেহরান এখনো হরমুজকে তার কৌশলগত সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে।

আলোচনার দরজা এখনো খোলা

সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।

গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা প্রায় তিন ঘণ্টা পরোক্ষ আলোচনায় অংশ নেন। মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে বৈঠক করেন।

পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈঠকটিকে ‘খুব ভালো’ এবং ‘খুব ফলপ্রসূ’ বলে বর্ণনা করেন।

এরপর ইরান সাত দিনের একটি রোডম্যাপের প্রস্তাব দেয়। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করলে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিয়ে স্বাভাবিক সামুদ্রিক চলাচল ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়।

ইরানের শর্তগুলোর মধ্যে ছিল দেশটির ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং জব্দ থাকা ইরানি অর্থ ছাড় করা।

তবে ট্রাম্প ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

মতপার্থক্য এখন মূলত ‘কীভাবে’ ও ‘কখন’

রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আল জাজিরা জানিয়েছে, বুধবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন।

আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে মূল মতপার্থক্য এখন আর আলোচনার সম্ভাব্য বিষয়গুলো নিয়ে নয়; বরং কোন পদক্ষেপ আগে এবং কোনটি পরে বাস্তবায়ন করা হবে—তা নিয়ে।

ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন পুনরুদ্ধার হলেও সংঘাতের স্থায়ী সমাধান এখনো নির্ভর করছে বৃহত্তর কূটনৈতিক সমঝোতার ওপর।

হরমুজের বর্তমান পরিস্থিতি তাই একদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে উচ্চ বিমা ব্যয়, সামরিক ঝুঁকি, অর্থনৈতিক চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অনিশ্চয়তা দেখাচ্ছে যে স্বাভাবিক অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে যেতে এখনো সময় লাগতে পারে।